ধর্মীয় মতভেদ

‘বাতেনিয়াহ’ ফেরকা

eid live

বাতেনিয়াহ: ইসলামি ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও খারাপ দল হচ্ছে বাতেনি ফিরকা। বাতেনিরা ইসলামি দল নয়, বরং মুসলিমদের ঐকমত্যে তারা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। বাতেনিরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দল আমরা উল্লেখ করবো:

কেন বাতিনিয়াহ বলা হয়?

বাতিনিয়াহ বলার কারণ, তারা বিশ্বাস করে কুরআন ও সুন্নার দু’টি অবস্থা: জাহির ও বাতিন। জাহির হচ্ছে যা মানুষ জানে ও আলেমরা যা শিখায়, বাতিন হচ্ছে প্রকৃত ইলম, যা আহলে বাইতের অদৃশ্য ইমামগণ ব্যতীত কেউ জানে না, তারা মানুষকে সে ইলম সরাসরি বা নায়েব ও পর্দার আড়াল থেকে শিক্ষা দেন।

বাতেনিদের উৎস ও উদ্দেশ্য:

আল্লাহ তা‘আলা সত্য দীন ও হিদায়েত দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন সকল দীনের উপর তাকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে, যদিও মুশরিকরা অপছন্দ করে। কাফেরদের দেশে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে তাদের আকিদা, রাজত্ব ও কর্তৃত্ব খর্ব করে, তাই বিলুপ্ত ধর্ম ও পতিত রাজত্বের উত্তরসূরিরা ভেবে দেখল—বিশেষ করে অগ্নিপূজক ও ইয়াহূদীরা—ইসলামকে ধ্বংস ও তার থেকে প্রতিশোধ নিতে হলে পরস্পর সহযোগিতা ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ব্যতীত গত্যন্তর নেই।

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গুপ্ত হত্যার ষড়যন্ত্র দিয়ে তারা শুরু করে। অতঃপর ফেতনার সূচনা করে, যার নেতৃত্ব দেয় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক ব্যক্তি খলীফা উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার যুগে, যেমন পূর্বে গত হয়েছে।

কিন্তু তারা দেখল ইসলাম তাদের সকল ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় অনেক শক্তিশালী, ফলে তারা এক মাযহাব সৃষ্টির সূচনা করে, যা শিয়াদের চেয়েও অধিক প্রভাবশালী ও ক্ষতিকর—যদিও তার শুরু শিয়াদের নীতি ও তাদের ছদ্মাবরণে—এভাবে তারা বাতেনি মাযহাবের গোড়া পত্তন করে, তাদেরকে সাধারণত ইসমাইলিয়া বলা হয়, ইসমাইল ইবনে জাফর সাদিকের সাথে সম্পৃক্ত করে। তাদের ইমামদের ধারণা এই যে, আকিদা ও বংশের দিক থেকে তারা ইসমাইল ইবনে জাফর সাদিকের সাথে সম্পৃক্ত।

তাদের মাযহাবের মূলনীতি তৈরিতে অগ্নিপূজক, ইয়াহূদী ও যিন্দিকদের একটি জামা‘আত অংশ নেয়, তারা মৌলিকভাবে গ্রীক দর্শনকে সামনে রেখে অগ্নিপূজক ও সাবায়িদের চিন্তার সাথে মিল করে বাতেনি মাযহাব তৈরি করে।

চতুর্থ শতাব্দীর শুরুতে বাতেনি মাযহাবের মূলনীতির উপর তারা প্রথম কিতাব রচনা করে (رسائل إخوان الصفا وخلَّان الوفا) নামে।

বাতেনিরা বাতেনিয়াহ রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সফল হয়। তারা মুসলিম উম্মাহকে টুকরো টুকরো করাসহ ইয়াহূদী ও মোগলি আগ্রাসনের জন্য মুসলিম খিলাফতকে প্রস্তুত করে, লাখো সাধারণ মুসলিমের আকিদা বিনষ্ট করার কৃতিত্ব তো আছেই তাদের।

বাতেনিদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রসমূহ:

১. উবাইদি রাজত্ব (ফাতেমিয়া):

উবাইদি রাজত্ব মূলত নাস্তিক্যবাদ বাতেনি রাজত্ব ছিল, যা প্রতিষ্ঠা করেছে একজন ইয়াহূদী, নাম আব্দুল্লাহ ইবনে মায়মুন আল-কাদ্দাহ, তার ধারণা সে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার বংশধর। তারা প্রায় দুই শতাব্দী মিসর ও অন্যান্য দেশে রাজত্ব করে, তাদের নিদর্শন:

উম্মতে মুসলিমার মাঝে শির্ক ও মৃত ব্যক্তির ইবাদত দাখিল করা, অনুরূপভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতাতেই খৃস্টানরা মুসলিমদের অপমান ও লাঞ্ছিত করে তাদের দেশে প্রবেশ করে কুদস দখল করে নেয়। পরবর্তীতে সালাউদ্দিন আইউবি রাহিমাহুল্লাহ প্রথম উবাইদি রাজত্ব ধ্বংস করেন, অতঃপর খৃস্টানদের উচ্ছেদ করেন।

২. কারামিতাহ রাজত্ব:

উবাইদিদের প্রাচ্যে কারামিতাদের রাজত্ব ছিল, অর্থাৎ শাম, দক্ষিণ ইরাক ও জাযিরাতুল আরবের পূর্বাঞ্চলে। তারা ৩১৭হি. (৮-যিলহজ্ব) তারবিয়ার দিন, মক্কায় প্রবেশ করে হাজি ও মুসল্লিদের হত্যা করে, হাজরে আসওয়াদকে খুলে তাদের সাথে আহসা নিয়ে যায়, সেখানে তাদের নিকট হাজরে আসওয়াদ ২২বছর থাকে, অতঃপর তারা কাবা ও পুরো মক্কা লুণ্ঠন করে।

৩. হাশশাশিউন:

হাশশাশিয়াহ মূলত উবাইদি রাজত্বের উত্তরসূরি ইসমাইলি সম্প্রদায়ের একটি দল। তারা ইরানে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং যুদ্ধ, লুণ্ঠন ও অপহরণ করে উম্মতে মুসলিমার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়। তারা বহু রাজনৈতিক ও ইসলামিক ব্যক্তিকে গুপ্ত হত্যা করে, যাদেরকে গুপ্ত হামলার মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা করেছে তন্মধ্যে সালাহুদ্দিন আইউবি অন্যতম।

ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে তাদের রাজত্ব আরম্ভ হয়, তাতারিদের দ্বারা ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের দৌরাত্ম্য চলমান থাকে।

তবে তাদের দাওয়াত এখনো বিদ্যমান, এখন তারা আগাখানিয়াহ নামে পরিচিত, তাদের নেতা আগাখানের সাথে সম্পৃক্ত করে আগাখানিয়াহ বলা হয়।

বাতেনিদের আকিদা ও বিভিন্ন দল:

বাতেনিদের কতক নীতি আছে যৌথ, যেখানে গিয়ে তারা সবাই মিলে যায়। আবার তাদের ফেরকার যৌথ নীতিও রয়েছে, তবে তার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা একমত নয়।

কতক বাতেনি ফেরকা আছে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাই আমরা ইসমাইলি ফেরকার আকিদা উল্লেখ করব, যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ক্বারামিতা, উবাইদিয়া, ইসমাইলিয়াহ আগাখানিয়াহ ও ইসমাইলিয়াহ বুহরাহ ফেরকা। তাদের থেকে দ্রূয ও নুসাইরিয়া ফেরকার আলোচনা পৃথকভাবে করবো।

 

লেখক: ড. সফর ইবনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি
অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button