ধর্মীয় মতভেদ

‘শিয়া’ ফেরকা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবিগণ আবুবকরের নিকট সর্বসম্মতিতে বায়‘আত গ্রহণ করেন, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কিংবা কেউ তাতে বিরোধিতা করেন নি। অনুরূপ ঐকমত্য গঠন হয় ওমরের খিলাফত সম্পর্কে, অতঃপর উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফত সম্পর্কে।

যখন ফিতনার সূচনা হল এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু শহীদ হন, তখন যারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে সমর্থন দেয় ও তার পক্ষে যুদ্ধ করে তাদের উপর প্রয়োগ করা হয় শিয়া শব্দটি। অতঃপর নির্দিষ্ট ফেরকার নাম হয়, যারা বিশেষ আকিদা লালন করে।

যখন উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে যায়েদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং শিয়াদেরকে তার সাথে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান তখন তারা আবুবকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার সাথে তাকে সম্পর্ক ছেদ করতে বললে তিনি বলেন: “আমি তাদের সাথে কীভাবে সম্পর্ক ছেদ করব, অথচ তারা উভয়ে আমার নানা—অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের—উযীর ছিল, এ জন্য ঐ শিয়া লোকেরা যায়েদ ইবন আলীকে ত্যাগ করে। তাই তিনি বলেন: ‘রাফাদতুমুনী’ (তোমরা আমাকে ত্যাগ করলে)”। তখন থেকে তাদেরকে যায়েদের অনুসারীদের (যায়দিয়াদের) থেকে পৃথক করে ‘রাফেদাহ’ বলা হয়।

‘শিয়া’ নামের আড়ালে অনেক ফেরকা আত্মপ্রকাশ করে, যার কতক ফেরকা ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বাইরে।

আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে শিয়া:

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে যখন শিয়াদের উন্মেষ ঘটে তখন তারা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল:

১. মুফাদ্দালাহ: (প্রাধান্য দানকারী), তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে আবু বকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের উপর প্রাধান্য দিত।

২. সাব্বাবাহ: (গালমন্দকারী), তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, এমন কি আবুবকর ও ওমরকে পর্যন্ত গালমন্দ করে।

৩. গুলাত: (সীমালঙ্ঘনকারী), তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইলাহ (উপাস্য) জানে, অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করে তিনি ইলাহ, অথবা তার মাঝে ইলাহের কোনো অংশ প্রবেশ করেছে, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিশ্বাস করে। তারা যিন্দিক।

তাদেরকে যিন্দিক বলার কারণ: তারা প্রকাশ্যভাবে ইসলামের ঘোষণা দেয়, কিন্তু অন্তরে কুফর গোপন করে।

শিয়াদের ব্যাপারে আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ফয়সালা:

১. মুফাদদালাহ: আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং ঘোষণা দিতেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর সর্বোত্তম উম্মত আবুবকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম, যেমন সহি বুখারিতে তার সূত্রে বর্ণিত আছে।

সহি সূত্রে তার থেকে আরো প্রমাণিত, তিনি বলেছেন:

«لَا أَجِدُ أَحَدًا يُفَضِّلُنِي عَلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ، إِلَّا وَجَلَدْتُهُ جَلْدَ حَدِّ الْمُفْتَرِي»

“আবুবকর ও ওমরের উপর আমাকে প্রাধান্য দানকারী ব্যক্তিকে যদি আমার নিকট উপস্থিত করা হয় আমি অবশ্যই তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত করবো”।

২. সাব্বাবাহ: তাদেরকে হত্যা করা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফয়সালা ছিল। তার দলের কতক লোক আবুবকর ও ওমরকে গালমন্দ করে, এরূপ কথা তার নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে হত্যার জন্য তলব করেন, কিন্তু তারা পলায়ন করে।

৩. গুলাত (যিন্দিক): তাদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত ছিল আগুনে পোড়ানো, তিনি পুড়িয়েছেনও, যেমন সহি বুখারিতে প্রমাণিত।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদেরকে পোড়ানো নিয়ে আপত্তি করেন, কারণ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই তাদেরকে তিনি তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে বলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা… ও সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াবাদের প্রতিষ্ঠা:

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ষড়যন্ত্রকারী ইয়াহূদী ব্যক্তি, ইসলামকে ধ্বংস ও বিনষ্ট করার মানসে বাহ্যত ইসলাম প্রকাশ করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর উপর ফেতনার আগুন প্রজ্বলিত ও তার জীবন নিঃশেষ করার সূচনায় ছিল ইবনে সাবা। অনুরূপ জামাল তথা উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন মুসলিমদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠার পর ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা পুনরায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করে, যেরূপ সীমালঙ্ঘন করেছিল কট্টর ইয়াহূদী বুলিস[1] (পল) ঈসা ‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে, উদাহরণত:

১. ইবনে সাবা দাবি করে বর্তমান কুরআন প্রকৃত কুরআনের এক নবমাংশ, আলী ব্যতীত কেউ পূর্ণ কুরআন জমা করতে সক্ষম হয়নি। আলী ও তার পরিবারকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাতেনি ইলম দ্বারা ভূষিত করেছেন।

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ইবনে সাবাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কোনো ইলম দ্বারা খাস করেন নি। তিনি মিম্বারের দাঁড়িয়ে এ ঘোষণা দেন, যেমন ইমাম আহমদ ও বুখারি সহি সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

আরও দেখুন:  ‘মু‘তাযিলা’ ফেরকা

তিনি ইবনে সাবাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন: “আল্লাহর কসম তিনি—অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম—আমাকে একান্তে কিছু প্রদান করেন নি যা অন্যান্য মানুষ থেকে গোপন করেছেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি: কিয়ামতের পূর্বে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী হবে, তুমি অবশ্যই তাদের একজন”।

২. আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর উলুহিয়াত মতবাদ প্রকাশ করে:

ইবনে সাবা এ কুফরি আবিষ্কার করে তার অনুসারীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়, তাদের একদল আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর দরজায় এসে বলে:

আপনিই সে? তিনি বলেন: সে মানে? তারা বলল: আপনি আল্লাহ। তিনি তাদেরকে তিন দিন সময় দেন, অতঃপর তাদেরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারেন।

৩. ইবনে সাবা শায়খাইন তথা আবু বকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে গালমন্দ করার উক্তি প্রকাশ করে, সে ধারণা করে আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। যখন আলী পর্যন্ত এ কথা পৌঁছে, তিনি বলেন: “আমার সাথে ও এ কালো খবিসের সম্পর্ক কি? আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত খারাপ কিছু গোপন করা থেকে”। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে মাদায়েন নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং বলেন: “আমার সাথে এক শহরে সে কখনো থাকতে পারে না”। অতঃপর তিনি মিম্বারে দাঁড়ান, যখন মানুষেরা জড়ো হল, তিনি আবু বকর ও ওমরের অনেক প্রশংসা করেন, এবং জনগণকে শাসিয়ে তিনি এ বলে ভাষণ সমাপ্ত করেন: “জেনে রেখো, যার সম্পর্কে পৌঁছবে যে, সে আমাকে তাদের উপর প্রাধান্য দেয় আমি অবশ্যই তাকে অপবাদের দোররা মারব”।

এ তথ্য স্মরণ রাখুন, দ্বিতীয়ত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ইবনে সাবাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেন, কিন্তু তিনি নিজের বাহিনীতে ফেতনার আশঙ্কা করলেন, কারণ ইবনে সাবার অনুসারীরা তার দলে ঘাপটি মেরে ছিল, তাই তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ও দূরে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হন”।

পারস্যে (ইরানে) শিয়াদের বিস্তার:

পারস্যরা একটি বড় জাতি, মুসলিমরা ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে তা জয় করে, ফলে তাদের থেকে বিভিন্ন জাতি দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে। অনেক বীর-বাহাদুর ও আলেম উঠে তাদের থেকে আসেন। তাদের অনেক অবদান ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে জিহাদ ও ইলমের ময়দানে, এতদ সত্ত্বেও পারস্য ছিল অনেক বাতিল ফেরকার জন্ম ও চর্চা কেন্দ্র, সেসব বাতিল ফেরকাসমূহের একটি হচ্ছে আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় সীমালঙ্ঘনকারী শিয়া ফেরকা:

সেটা হচ্ছে এই যে, শাস্তিস্বরূপ আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ইবনে সাবাকে মাদায়েন নির্বাসনে পাঠান, কিন্তু খবিস ইয়াহূদীর নফস থেকে নাপাকি দূর করার জন্য এ শাস্তি যথেষ্ট হয়নি, বরং ঐ অঞ্চলে তার গোমরাহি ও বিষ ছড়ানোর জন্য এটাকে সে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। কয়েকটি কারণে সেখানে সে গ্রহণযোগ্যতা ও অনুকূল পরিবেশ পায়:

১. ইরান (পারস্য) ছিল ইসলামে প্রবেশকারী নতুন অনারব দেশ, তাতে বসবাসকারী সাধারণ লোকদের অন্তর সাবেক আকিদার ভ্রান্তি থেকে তখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি, তারা যে কোনো দাওয়াত পরিপালন ও তা গ্রহণ করার জন্য উৎসুক ছিল।

২. পারস্যের কতক ব্যক্তি—বিশেষ করে ক্ষমতাধর ও সম্পদশালীরা—ইসলাম ও তার অনুসারীদের ব্যাপারে হিংসা লালন করত, কারণ ইসলাম তাদের রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে, তাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে ও তাদের অগ্নিপূজার ধর্ম নিশ্চিহ্ন করেছে।

তাদের পক্ষে ইসলামকে মুখোমুখি মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না, তাই ভেতর থেকে তারা ইসলামকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র ও গোপন পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

এখানে আমরা স্মরণ করিয়ে দেই যে, পারস্যদের মাঝে ইয়াহূদীরা গুরুত্বপূর্ণ এক জাতি ছিল।

৩. পারস্যের জনগণের স্বভাব ছিল শাসক পরিবারকে নিষ্পাপ জানা, প্রভুর স্তরে তাদের আনুগত্য প্রদান করা, শাসক পরিবার থেকে পরম্পরায় রাজত্বের মালিক বানানো, এমন কি তাতে পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীই রাজত্বের মালিক হত। তারা শাসক পরিবারের বাইরে কাউকে রাজা হিসেবে গ্রহণ করত না, দেশ পরিচালনায় তার দক্ষতা, রাজনীতি ও নেতৃত্বে তার পারঙ্গমতা যা-ই থাক, যেমন রুস্তম ও তার ন্যায় মহান ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তারা কিসরার মেয়েকে গ্রহণ করেছিল।

আরও দেখুন:  সাহাবা ও ইমামগণকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ

এ তিনটি নীতির উপর: অর্থাৎ ইসলাম সম্পর্কে মূর্খতা, বিদ্বেষ ও শাসক পরিবারকে সীমালঙ্ঘন পর্যায়ে সম্মান ও নিষ্পাপ জানার উপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা শিয়া ফেরকার অধিকাংশ আকিদা তৈরি করে, নিম্নে তার বর্ণনা দেখুন:

শিয়াদের আকিদায় এ তিন নীতির প্রভাব:

১. ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগ্নিপূজকদের ধ্বংসাবশেষ থেকে শিয়াদের আকিদায়: ‘হুলুল’ বিশ্বাসের জন্ম হয়, অর্থাৎ আল্লাহ তার কোনো মখলুকের মধ্যে প্রবিষ্ট হন। অথচ আল্লাহ তাদের কুসংস্কার থেকে কতই না পবিত্র!

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ‘হুলুল’ আকিদা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সম্পর্কে রচনা করে তার ব্যাপক প্রচার করে, এমন কি যখন তার নিকট আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হত্যার সংবাদ পৌঁছে, সে বলে: “যদি তোমরা একটি থলিতে তার মগজ নিয়ে আস আমি তার মৃত্যু বিশ্বাস করব না”। সে আরো বলে: “হত্যাকৃত ব্যক্তি আলী নয়, বরং শয়তান তার আকৃতি ধারণ করেছে, আলী আসমানে উঠে গেছে, সে মেঘে হাঁটে, বিদ্যুৎ চমক তার দোররা, মেঘের গর্জন তার আওয়াজ। অতিসত্বর সে জমিনে ফিরে আসবে, অতঃপর তা ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবে, যেমন তা ফাসাদ দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেছে”। অধিকন্তু শিয়াদের মাঝে অগ্নিপূজকদের প্রতীক এখনো বিদ্যমান, যেমন নওরোজ (নববর্ষ) উৎসব পালন করা।

২. অগ্নিপূজকদের হিংসাকে পুঁজি করে ইবনে সাবা তার অনুসারী পারস্যদের মাঝে সাহাবিদের বিদ্বেষ ও গালমন্দ করার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে আমিরুল মুমেনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব সম্পর্কে, যার মুজাহিদ বাহিনী তাদের দেশ জয় ও তাদের রাজত্ব ধ্বংস করেছে। তাদের এক অগ্নিপূজক আবু লুলু ওমরকে অতর্কিত হামলা করে শহীদ করে, যা সবার জানা।

এভাবে ইবনে সাবা যে ফেতনার উদ্ভব ঘটিয়েছে তা পূর্ণ করে ছাড়ে এবং উসমান, তালহা, যুবায়ের ও অনেক সাহাবিকে হত্যা করে, আর এভাবেই শিয়াদের মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে সাহাবিদের কাফের বলা, প্রকাশ্যভাবে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা ও তাদেরকে লা‘নত করা।

সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, ইসলামের দাবি করে অগ্নিপূজক আবু লুলুর কর্মে গর্ব করা, তাকে সম্মান জানানো ও তাকে বীর-বাহাদুর উপাধি দেয়া, কীভাবে তা করা যায়[2]!!!

৩. ক্ষমতার অধিকারী ও সম্মানিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে পারস্যদের সীমালঙ্ঘনকে পুঁজি করে ইবনে সাবা তাদের মাঝে আলীকে ইলাহ বানানোর বিদ‘আত এবং তার ও তার পরিবারের খিলাফতের হকদারিত্ব প্রচার করার সুযোগ পায়। তারা ইমামদের সম্মানে এতটা সীমালঙ্ঘন করেছে যে, নবী ও মালায়েকাদের মর্যাদার উপরে তুলেছে তাদেরকে, বরং তাদেরকে আল্লাহর সিফাতে ভূষিত করেছে, যেমন তারা বলে: “নিশ্চয় অস্তিত্বশীল প্রতিটি বস্তু ইমামদের অধীনতা স্বীকার করে এবং তারা ভুল, গাফলতি ও বিচ্যুতি থেকে পবিত্র।”

পারস্য-সম্রাট কিসরার রীতি মোতাবেক খিলাফতকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার এবং আলী ও তার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত বলে। তাদের নিকট খিলাফত দীনের একটি রুকন ও মৌলিক নীতি, তবে সকল আহলে বাইতের বিপরীতে হুসাইন ও তার সন্তানদেরকে তারা খিলাফতের বেশি হকদার মনে করে, কারণ তিনি তাদের বাদশাহ কিসরার মেয়ে বিয়ে করেছেন, তাদের সকল ইমাম তার (কিসরার মেয়ের) বংশ থেকে।

৪. শিয়াদের মাঝে ইয়াহূদীদের নির্দশন সুস্পষ্ট, তাদের যেসব আকিদা ইবনে সাবা শিয়াদের মাঝে দাখিল করে ও পূর্ণতা দেয়, তা নিম্নরূপ:

ক. তামসীল ও তাশবীহ: শিয়াদের পূর্বপুরুষরা তামসীল (আল্লাহর জন্য সাদৃশ্য স্থাপন) ও তাশবীহ (আল্লাহর জন্য উপমা দেওয়ার) আকিদায় বিশ্বাসী ছিল, পরবর্তীতে তারা মু‘তাযিলাদের সাথে একাত্ম হয়, যেমন আমরা পূর্বে বলেছি, এভাবে তারা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকারকারী মু‘আত্তিলা ফেরকায় পরিণত হয়।

খ. ইয়াহূদীরা বিশ্বাস করে, শেষ জামানায় একজন মসীহ ইয়াহূদী আসবেন, তিনি পুরো দুনিয়া দাউদের শরীয়ত দ্বারা ফয়সালা করবেন, তার সাহায্যকারী হবেন মূসা ও ইউসা ইবনে নুনের সাথীগণ। আর শিয়াদের আকিদায় রয়েছে, তাদের প্রতিশ্রুত মাহদি দাউদের শরীয়ত দ্বারা ফয়সালা করবেন, তার সাথে অনেক সাহায্যকারী প্রেরণ করা হবে, তারা হবে মূসা ও ইউসা ইবনে নুনের সাথী।

গ. ইয়াহূদীরা বিশ্বাস করে, আল্লাহর পক্ষে আল-বাদা (অর্থাৎ ভুল হওয়া) সম্ভব, এ কথার অর্থ আল্লাহ কোনো বিষয়ে নির্দেশ করেন, অতঃপর তার ভুল স্পষ্ট হয়, ফলে তিনি তার বিপরীত নির্দেশ করেন। অথচ আল্লাহ এ থেকে পবিত্র। এ হচ্ছে আল্লাহ সম্পর্কে শিয়াদের আকিদার একটি অংশ।

আরও দেখুন:  ‘খাওয়ারিজ’ ফেরকা

শিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ আকিদা:

শিয়ারা বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়েছে, এসব ফেরকা থেকে সবচেয়ে বড় ফেরকা হচ্ছে শিয়া দ্বাদশ ইমামিয়া। যখন শিয়া অথবা রাফিদা বলা হয় তখন তারাই উদ্দেশ্য।

আর তাদের গুরুত্বপূর্ণ আকিদা হচ্ছে:

১. ইমামত (খিলাফত) দীনের রুকনসমূহ থেকে একটি রুকন, নবীর উপর ওয়াজিব তার পরবর্তী খলিফা নির্ধারণ করা।

২. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরবর্তী খলিফা আলীকে নির্দিষ্ট করেছেন, এ সম্পর্কে কুরআনের অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে, কিন্তু সাহাবিরা তা একযোগে গোপন করে ও তার বিরোধিতা করে। আবু বকর, ওমর ও উসমান খিলাফত ছিনতাই করে, তাই সাহাবিরা কুফরি করে ও ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়, তবে অল্প সংখ্যক ব্যতীত।

৩. ইমামরা ভুল, গাফলতি, বিস্মৃতি ও ত্রুটি থেকে মুক্ত, তারা সরাসরি আল্লাহর থেকে ইলম গ্রহণ করেন, কি হয়েছে ও কি হবে তারা জানেন। অস্তিত্বশীল প্রত্যেক অণু তাদের বশ্যতা স্বীকার করে, তারা জানেন কখন মারা যাবেন, তারা স্বীয় ইচ্ছা ব্যতীত মারা যান না। তাদেরকে আহ্বান করা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা এবং তাদের দাসত্ব ধারণ করে নামকরণ করা বৈধ।[3]

৪. ইমামের সংখ্যা বারোজন, প্রথম ইমাম: আলী, অতঃপর হাসান, অতঃপর হুসাইন, অতঃপর আলী ইবনে হুসাইন (জয়নুল আবেদীন), যার মা কিসরার মেয়ে, অতঃপর ইমামদের পরম্পরা তার সন্তানদের ভেতর চলমান থাকে কাল্পনিক দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারি পর্যন্ত, যার সম্পর্কে তারা বিশ্বাস করে, তিনি সামুররা নামক স্থানে ২৬১হি. গুহায় আত্মগোপন করেন। অতিসত্বর তিনি শেষ জমানায় বের হবেন এবং মানুষের মাঝে দাউদের বিধানে ফয়সালা করবেন। তিনি আলী ও তার অনুসারীদের শত্রুদের জীবিত করার নির্দেশ দিবেন, তন্মধ্যে প্রথম ব্যক্তি আবুবকর অতঃপর ওমর, অতঃপর অন্যান্য সাহাবি ও খলিফাগণ, অতঃপর তার বের হওয়ার সময় পর্যন্ত সকল মুসলিম খলিফা, এদের সবাইকে তিনি পুনরায় হত্যা করবেন।

৫. কুরআনুল কারিমে বিকৃতি ও হ্রাস রয়েছে, যার স্রষ্টা সাহাবিরা, আলীর মুসহাফ পরিপূর্ণ মুসহাফ, যার উত্তরাধিকারী হন দ্বাদশ ইমাম, তিনি তা নিয়ে গুহায় প্রবেশ করেন, যা বর্তমান কুরআন অপেক্ষা তিনগুণ। তাতে আহলে সুন্নাদের কুরআনুল কারিমের এক হরফও নেই।

এ কুরআনের অপর নাম: মুসহাফে ফাতিমা, তাদের মুজতাহিদরা আহলে বাইতের ইমামদের সম্পর্কে রচনা করা মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা দ্বারা এ কুরআন তৈরি করার প্রচেষ্টা চালায়।

কিন্তু তারা তাদের ইমামদের থেকে আমাদের কুরআন পড়া, তার ভিত্তিতে ইবাদত ও আমল আঞ্জাম দেওয়ার নির্দেশ বর্ণনা করে, যতক্ষণ না সত্যিকার ইমাম প্রকৃত কুরআন নিয়ে আসবেন।

৬. বিশ্বাস করা যে, কুরআন সৃষ্ট ও মখলুক।

৭. আল্লাহর সিফাৎ ও তাকদীর অস্বীকার করা।

সারকথা, মৌলিকভাবে আকিদার ক্ষেত্রে তারা মু‘তাযিলা ফেরকার অনুসারী, কিন্তু ‘আল-বাদা’ মতবাদের কারণে তারা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন।

৮. শিয়াদের নিকট সুন্নাহ:

শিয়ারা সুন্নিদের প্রসিদ্ধ কিতাব স্বীকার করে না, যেমন সহি বুখারি, সহি মুসলিম, মুসনাদে ইমাম আহমদ ও অন্যান্য সুনান গ্রন্থসমূহ। তাদের নিকট সুন্নত তা-ই যা আহলে বাইতের সূত্রে পৌঁছেছে। তাদের দৃষ্টিতে নিষ্পাপ ইমামদের থেকে বর্ণিত বিষয়ে তারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে।

মূলনীতিতে তারা যেরূপ আহলে সুন্নার বিরোধিতা করে, ফিকহি অনেক মাসাআলার ক্ষেত্রেও তাদের বিরোধিতা করে।

তন্মধ্যে: তাদের নিকট জিহাদ ও জুমা ওয়াজিব নয়, যতক্ষণ না আত্মগোপনে থাকা ইমাম বের হবেন। যখন তিনি বের হবেন বিশেষ ইলম প্রচার করবেন—তাদের ধারণায়—, তারা যার নামকরণ করে (ইলমে জফর), তাতে আছে ফিকহ, আহকাম ও পূর্ণ কুরআন।

এ আকিদা প্রমাণ করে শিয়া মাযহাব রচনাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল শরীয়ত বাতিল করা এবং শরীয়তকে এমন বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করা যা কখনো অস্তিত্বে আসবে না, এটা সবচেয়ে ঘৃণিত ষড়যন্ত্র।

 –

লেখক: ড. সফর ইবনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি
অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া


[1] নাসারা অধ্যায় দেখুন।

[2] অথচ এটাই শিয়াদের সবাই করে থাকে। [সম্পাদক]

[3] যেমন: আব্দুল হুসাইন, আব্দুর রিদা, আব্দুল কাযিম ও আব্দুল আমীর।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button