ছালাত/পবিত্রতা বিষয়ক

বৃষ্টির কারণে দুই নামায একত্রিত করে আদায় করা কি জায়েয?

ইসলাম সহজ, সরল ও সুন্দর একটি দ্বীন। মানুষের উপর সহজ করা এর অন্যতম বৈশিষ্ট। এই জন্যই ইসলামের রুকনগুলো পালনে যথেষ্ট সহজতার বিধান লক্ষ করা যায়।
জামআতের সাথে ও যথা সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম করা ইসলামের দ্বিতীয় রুকন। তবে জামাআতে ও যথা সময়ে নামায পড়া অনেক সময় কষ্ট সাপেক্ষ। তাই সফর অবস্থায়, যুদ্ধের সময়, অসুস্থার সময় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় দুই নামাযকে এক সাথে আদায় করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সফরের সময় কসর ও একত্র করা উভয়ই জায়েয।
প্রতিকূল আবহওয়া বলতে এমন বৃষ্টিপাত, যাতে ঘর থেকে বের হলে কাপড় ভিজে যায়, প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস এবং ঝড় ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। তাই বৃষ্টির সময় যোহরের নামাযের সময় এক আযানে এবং দুই ইকামতে যোহর ও আসরের নামায এক সাথে আদায় করা জায়েয হওয়ার কথা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। এমনিভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও। যোহরের সাথে আসর এবং মাগরিবের সাথে ইশা পড়াকে جمع تقديم জমা তাকদীম বলা হয়। আর প্রথটাকে পড়েরটার সময় পড়াকে جمع تأخير জমা তাখীর তথা বিলম্বের সাথে একত্র করণ বলা হয়। পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রতি খেয়াল রেখে উভয় পদ্ধতিই অবলম্বন করা জায়েয।

সুতরাং বৃষ্টির সময় এবং অন্যান্য কারণে সহজার্থে দুই নামায একত্র করে আদায় করার দলীল সমূহ নিম্নরূপঃ
১) عن ابن عباس قال: جمع رسول الله –صلى الله عليه وسلم- بين الظهر والعصر والمغرب والعشاء بالمدينة في غير خوف ولا مطر
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূল (সাঃ) মদীনাতে বৃষ্টি ও ভয় ছাড়াও যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশার নামায একত্রিত করে আদায় করেছেন। (মুসলিম)
টিকাঃ
হাদীছে বর্ণিত বৃষ্টি ছাড়াও কথাটি প্রমাণ করে যে বৃষ্টির সময় তখন দুই নামায একত্রে আদায় করার বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত ছিল। আমার পক্ষ থেকে লাগানো টিকা এ পর্যন্তই।
ইমাম আলবানী (রঃ) বলেনঃ হাদীছে ভয় ও বৃষ্টির কথাটি এসেছে। এথেকে বুঝা যাচ্ছে যে, বৃষ্টির সময় দুই নামায একত্রে করে পড়ার বিষয়টি তাদের কাছে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি আরও বলেনঃ বৃষ্টির সময় দুই নামায একত্র করে পড়া জায়েয না হলে এখানে বৃষ্টির কথা উল্লেখ করা অর্থহীন। (দেখুন ইরওয়াউল গালীল, ৩/৪০)
২) মুস্তাহাযার রোগে আক্রান্ত মহিলাদেরকে রাসূল (সাঃ) একবার গোসল করে দুই নামায একত্র করে পড়ার আদেশ দিয়েছেন।
৩) তাবুক যুদ্ধে রাসূল যোহর-আসর এবং মাগরিব-ইশা একত্র করে আদায় করেছেন। (মুসলিম)
৪) সফরের সময় দুই নামায একত্র করে পড়ার হাদীছগুলো খুবই প্রসিদ্ধ।
আলেমগণ বলেনঃ কষ্টের কারণে সফর অবস্থায় দুই নামাযকে একত্র করে পড়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর বৃষ্টি, অসুস্থতা, ভয়, প্রচন্ড ঠান্ডা ও বন্যার কারণেও প্রতি ওয়াক্তে যথা সময়ে মসজিদে গিয়ে নামায পড়া কষ্টকর। এই কষ্ট লাঘব করার জন্যও উপরোক্ত অবস্থায় দুই নামায একত্র করে পড়া জায়েয। সুতরাং এই অনুমতি গ্রহণ করাই আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়।
৫) ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহ যেমন তার নাফরমানী করাকে অপছন্দ করেন তেমনি তার রুখসতগুলো তথা যে সমস্ত ক্ষেত্রে তিনি অনুমতি দিয়েছেন, তা গ্রহণ করাও ভালবাসে। (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে খুজায়মা। ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন। দেখুন ইরওয়াউল গালীল হাদীছ নং- ৫৬৪)
৬) ইমাম মালেক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাফে (রঃ) বলেনঃ খলীফা ও আমীরগণ যখন বৃষ্টির সময় মাগরিব ও ইশার নামায একত্রে আদায় করতেন, তখন ইবনে উমারও তাদের সাথে উভয় নামায একত্র করে আদায় করতেন। দেখুন ইরওয়াউল গালীল হাদীছ নং- ৫৮৩)
৭) মুসা ইবনে উকবা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ উমার বিন আব্দুল আযীয বৃষ্টি হলে মাগরিব ও ইশার নামায একত্রে আদায় করতেন। সাঈদ বিন মুসায়্যেব, উরওয়া ইবনুয যুবায়ের, আবু বকর বিন আব্দু রাহমানসহ সেই সময়ের বিজ্ঞ আলেমগণ আমীরদের সাথে তাই করতেন। তারা এর কোন প্রতিবাদ করতেন না। (দেখুনঃ ইরওয়া, ৩/৪০)
উপসংহারঃ
সুতরাং কোন ইমাম যদি দুই নামায একত্রিত করে আদায়ের ক্ষেত্রে রুখসত (জায়েয হওয়ার বিধান) গ্রহণ করে এবং বৃষ্টির সময় উপস্থিত মুসল্লীদেরকে নিয়ে দুই নামাযকে একত্রিত করে আদায় করতে চায়, তখন ইমামের বিরোধীতা করা মুসল্লীদের জন্য বৈধ নয়। আরও স্মরণ রাখা দরকার যে এটি সুন্নাত ও মুস্তাহাব; ওয়াজিব বা ফরজ নয়।
ইমাম মুনাভী (রঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি শরীয়তের হালাল, মুস্তাহাব ও সুন্নাত বিষয়গুলো পালন করতে অহংকার করবে তার দ্বীনদারী নষ্ট হয়ে যাবে।
আল্লাহ্ তাআলা সুন্নাত ও মুস্তাহাব বিষয়গুলো পালন করাকেই পছন্দ করেন।
আমাদের দেশে হাদীছের ব্যাপক চর্চা ও গবেষণা না থাকার কারণে দ্বীনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা মুসলিমদের অজানা রয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের উচিত নিরপেক্ষভাবে হাদীছের ব্যাপক চর্চা ও আলোচনা করা। আল্লাহ্ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন। আমীন।

আরও দেখুন:  কোন নামাজ শেষে রাসুল (সা.) মুসল্লীদের দিকে ঘুরে বসতেন?

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button