মুক্তবাসিনী

পর্দাহীন শিক্ষা : শেষ সম্বল চোখের জল

ইসলাম সব সময় শিক্ষার কথা বলে। নারী-পুরুষের কোনও ভেদাভেদ নেই এখানে। শিক্ষার গুরুত্ব ইসলামে যেভাবে দেয়া হয়েছে, অন্য কোনও ধর্মেই সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :

«طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ »

‘ইলম অন্বেষণ করা (নারী-পুরুষ) সব মুসলিমের জন্য ফরয।’ [ইবন মাজাহ্‌ : ২২৪]

তবে এই শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে ইসলামের চিন্তা ও দৃষ্টিভিঙ্গ আলাদা। ইসলাম চায়, নারীরা একটা নিরাপদ পরিবেশে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। এমন পরিবেশে, যেখানে সম্ভ্রমখুনের দাঁতালো কোনও জানোয়ার প্রবেশ করতে পারে না। মানবজীবের আকৃতি ধারণকারী কোনও জন্তু তাদের গায়ে আঁচড় কাটতে পারে না। অবাধ মেলামেশা ও পর্দাহীনতার সুযোগে কোনও নারী কিংবা কোনও পুরুষ সম্ভ্রমলুটের শিকার হয় না।

ইসলামের এই চাওয়া, এই দাবি কি অযৌক্তিক? বাড়াবাড়ির কিছু? সাম্প্রতিক সমাজ এবং বর্তমান ঘটনাবলীই এসব প্রশ্নের যথাযথ জবাব। আজ যেদিকে তাকাই, সেদিকেই এমন এমন অভিজ্ঞতা আর দুর্যোগের ঘনঘটা পরিলক্ষিত হয়, যা ইসলামের এই চাওয়াকে অতি যৌক্তিক ও সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে উপযোগী বলে প্রমাণিত করে। ইসলামের চাওয়া যদি বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে আজ আমাদের সামনে এসব ঘটনা ঘটত না, যা আমাদের সমাজ ও দেশের অবস্থাকে দিন দিন নাজুক করে তুলছে। আজ মাত্র ষোল বছরের একটি মেয়ে বেপর্দার সুযোগে সমবয়সী একজন ছেলের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে, মা বাবার সঙ্গে প্রতারণা করে সমাজ-সংসারে তাদের মুখে চুনকালি মেখে দিচ্ছে। এধরনের ঘটনা খুব কম ঘটছে কিংবা দুর্লভ- তা নয়। বরং অহরহ ঘটছে এসব ঘটনা। আর এসব অবুঝ কচি মেয়েদের সরলতার সুযোগে প্রেমিক নামের প্রতারকরা তাদের সম্ভ্রমের অমূল্য ধনটুকু কেড়ে নিচ্ছে দেদারছে। তাই ইসলামের কঠোরতার সমালোচনা না করে সমাজব্যবস্থার নাজুকতার দিকে তাকান। দেখুন দেশজুড়ে কী ঘটছে… আরেকটা ঘটনা বলি।

এবারের ঘটনার নির্মমতার শিকার চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের অজোবড়া গ্রামের নুরেসা খাতুন (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রী। সে মৃত্যুর এই নির্মম পেয়ালা পান করেছে। এই পেয়ালার সাকি তার কথিত প্রেমিক মাহবুব! মেয়েটির পরিবারের অভিযোগ, নুরেসার প্রেমিক মাহবুব পাশবিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করেছে। ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাবাসী মাহবুব ও তার বন্ধু আজিমকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে।

এলাকাবাসী জানায়, বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের বেগুনবাড়ী গ্রামের মনিরুল ইসলামের মেয়ে স্থানীয় বিআইবি বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী নুরেসার সঙ্গে অজোবড়া গ্রামের আবদুল ওয়াহাবের ছেলে মাহবুবের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাহবুব বাঙ্গাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাত্র নবম শ্রেণীর ছাত্র!

কী অদ্ভূত কাণ্ড দেখুন! মাত্র নবম শ্রেণীর একজন ছাত্র! সেও সমাজের পঙ্কিলতায় কীভাবে দু’পা ডুবিয়ে দিয়েছে! কী নিষ্ঠুরভাবে পদস্খলন হচ্ছে এসব অবুঝ কিশোরদের! যে বয়সে প্রেম-ভালোবাসা আর নারী সম্পর্কে ধারণা থাকারই কথা নয়, সেই বয়সেই সে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে কার্পণ্য করছে না! কাঁচা বয়সের এসব তরুণরা অপরিপক্বতার কারণে ভয়ানক সব দুর্ঘটনা ঘটিয়ে সমাজব্যবস্থাকে অস্থির, বেচাইন করে তুলছে।

আর বালিকাদের অবস্থাও দেখুন। নুরেসার বয়স মাত্র ষোল। এদেশের অদ্ভুত আইন অনুযায়ী এই বয়সের একটা মেয়ে সাবালিকাই নয়। সেই বয়সেই সে কী না করছে! প্রেম করছে, পরিণামের কথা না ভেবে প্রেমিকার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। আর শেষ পর্যন্ত মুখে বিষ নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে! নুরেসার পুরো ঘটনাটা এরূপ :

একদিন বিকেলে নুরেসা প্রাইভেট পড়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে অজোবাড়া গ্রামে যায় মাহবুবের সঙ্গে দেখা করতে। ওই গ্রামে মাহবুবের বন্ধু আজিমের বাড়িতে তারা দীর্ঘক্ষণ একসঙ্গে কাটায়। হঠাৎ করে মাহবুব ও আজিম স্থানীয় এলাকাবাসীকে জানায়, নুরেসা বিষপান করেছে। গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার সময় সে মারা যায়।

নুরেসা বেগমের মা নাসিমা বেগম অভিযোগ করেছেন, মাহবুব ও তার বন্ধুরা গণধর্ষণের পর নুরেসাকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর মাহবুব তাকে ফোন করেছে। নুরেসার শরীরে ধর্ষণের বিভিন্ন আলামত থাকায় তিনি নিশ্চিত তাকে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। [সূত্র : দৈনিক আমার দেশ, ২/১২/২০১০ ইং]

তো যে তরুণী বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শিশু- এই বয়সেই প্রেম মদিরায় ডুবে যায়, সে কি কখনও ভেবেছিল এই পিচ্ছিল পথে পা ফেলার অশুভ পরিণামের কথা? তার শিক্ষা কী তাকে এই পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল কখনও? প্রচলিত শিক্ষা কি শুধু জাগতিক জাগ্রনেই সীমাবদ্ধ ছিল না? যে শিক্ষা একজন তরুণীর পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে না, সেই শিক্ষা পুরো জাতিকে কতদূর নিয়ে যেতে পারবে? যে শিক্ষা তাকে এই ঘটিত বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারত, সেই শিক্ষা, সেই ইসলামী আদর্শ ও পর্দা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেন এতো সংগ্রাম, বিদ্রোহ?

আল্লাহয়ী বিধান ও পর্দাপালন ছাড়া কোনও নারীর মুক্তি নেই। নুরেসাদের নির্মম পরিণতির অশ্রুসজল কাহিনী আমাদেরকে যেমনিভাবে ব্যথিত করে, তেমনি শিক্ষাও দিয়ে যায়। কিন্তু আমরা শিক্ষা নিই না; বরং শিক্ষার পথকে কর্দমাক্ত করি।

বোন নুরেসা! যে বয়সে আইন (দেশীয়) তোমাকে সাবালিকা বলেই স্বীকার করে না, সেই বয়সে তুমি এমন খেলা কেন খেলতে গেলে যার জন্য সারা জীবন তোমার বিদেহী আত্মা তোমাকে ভর্ৎসনা করবে? যখন সমাজের প্রতারক প্রেমিকদের না চিনে ডেটিং করতে গিয়েছো, তখন কি একবারও ভেবেছ তোমার পারিবারিক মর্যাদার কথা? এই পাপযাত্রার সময় একবারের জন্যও কি মনে হয়নি তোমার মা বাবার কথা? কিংবা তোমার নিজের কথা? সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যে মহামূল্যবান আমানত দান করেছেন, সেই আমানতের মর্যাদা রক্ষার কথাও কি মনে হয়নি অন্তত একবার? তুমি গ্লানী আর লাঞ্ছনাকে সঙ্গী করে পরপারের বাসিন্দা হয়েছো, কিন্তু তুমি তোমার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনের জন্য কী রেখে গেছো? চোখের পানিই কী একজন সন্তানের কাছে মা-বাবার একমাত্র প্রাপ্য!

মা-বাবা কী চোখের পানির জন্য সন্তান জন্ম দেয়? কিংবা কোনও বাবা কি চায় পৃথিবীর সবচে’ ভারি বোঝা- সন্তানের লাশটা- কাঁধে তুলতে? কবে হবে এসব সমস্যার সমাধান? কবে নাগাদ আমরা পাবো এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর?

যেদিন আমরা আল্লাহর বিধান আঁকড়ে ধরব, পর্দার মধ্যে আমাদের নারী সমাজের মর্যাদা ঢেকে রাখবো, কেবল সেদিনই মিলবে এসব প্রশ্নের উত্তর।

– আবু বকর সিরাজী

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button