জীবনের বাঁকে বাঁকে

সত্যের সন্ধানে

একজন মুসলমান বিশ্বাস করে তার তাকদীরকে। আর নিশ্চিতভাবে এটাও তাকে বিশ্বাস করতেই হয় যে, এই তাকদীর বা ভাগ্যের বন্টক ও নিয়ন্ত্রক মহান আল্লাহ তা‘আলাই। এই তাকদীরের বিষয়ে কোন রদবদল, কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, কিঞ্চিৎ সংশোধন কিংবা অন্যভাবে কিছু এদিক ওদিক করার এখতিয়ার সর্বশক্তিমান, পরমদাতা দয়ালু আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো নেই। এই নশ্বর পৃথিবী সৃষ্টিরও পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বে সমগ্র সৃষ্টির তাকদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এই বিষয়টির কোন একটিও অবিশ্বাস করার সুযোগ কারও নেই। আর সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছায় আমি একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় আশৈশব উপরে বর্ণিত প্রতিপাদ্য বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয় অন্তরের গভীরে দ্বিধাহীনভাবে লালন করে আসছি।

স্বাভাবিকভাবেই মনে একটি প্রশ্ন নিজেকে মুহুর্মুহু ক্ষতবিক্ষত করে যে, এই বিশ্বাসের বিষয়টি এভাবে নিষ্কলংক সফেদ সাদা কাগজের বুকে কলমের কালো অাঁচড়ে খোদিত করার অর্থ কি? এই প্রশ্নের জবাব অনেক কিছুই হ’তে পারে। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, অন্তত আত্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বলছি না বা লিখছি না, মাত্র বিয়াল্লিশ বৎসর অতীত হয়েছে বিশ্বে নযীরবিহীন এক রক্তক্ষয়ী মহা সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই মুক্তিযুদ্ধে আমি নিজেও একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। শুধু তাই নয়, অন্যান্য অনেকের মতই আমাকে সর্বস্বান্ত হ’তে হয়েছে শুধু সহায়-সম্পদ হারিয়ে নয়, বরং সকল সম্পদের উপরে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ আমার প্রাণপ্রিয় সত্যনিষ্ঠ পিতাকেও হারাতে হয়েছে পাকিস্তানী হায়েনাদের হাতে। সেই আমি আজ আমার চারপাশে যা কিছু দেখছি, যা কিছু শুনছি, যা কিছু অনুভব করছি তার সব কিছুতেই সত্যের শতভাগ অনুপস্থিতি লক্ষ করছি। দেখছি মিথ্যার ছড়াছড়ি, জড়াজড়ি। আজকাল আমরা সত্য বলতে ভয় পাই, শুনতে ভয় পাই এবং সহ্য করতেও ভয় পাই। এই পরিস্থিতিতে বারবার আমার স্মৃতিতে উদিত হচ্ছে আমার শহীদ পিতার অমোঘ উক্তিটি ‘পৃথিবীতে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের কাছে কোন কিছুই কঠিন বা অসম্ভব নয়, কঠিন বা অসম্ভব কেবল সত্য বা হক কথা সহ্য করা’।

যে তাকদীরের উল্লেখে আলোচ্য নিবন্ধের সূচনা করেছি সেই তাকদীরের বদৌলতে আমার মত একজন অতি নগণ্য মানের মানুষের সুযোগ হয়েছিল বেশ কিছুদিন ইউরোপ এশিয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে কিছু পড়াশোনা করার, শিক্ষা সফর করার। আর আমার একটি সহজাত অভ্যাস, যখন কোন দেশে যাই বা কোন নতুন পরিবেশে নতুন কোন জাতির লোকের সংগে সাক্ষাৎ হয়, মেলামেশার সুযোগ হয়, তখনই কেবল নিজের সংগে বিশেষ করে নিজের জাতীয় স্বভাব আচরণের সংগে সংশ্লিষ্ট দেশের অধিবাসীদের স্বভাব আচরণের তুলনা করে দেখা বা মিল খুঁজে দেখা। এরূপ করতে গিয়ে কোথাও এরকম সান্ত্বনা খুঁজে পাইনি যে, তাদের সাথে মন মানসিকতায় ও আচার-আচরণের কোন ক্ষেত্রে জাতি হিসাবে আমরা সমানে সমান আছি। উপরেতো কখনই নয়, এমনকি সামান্য নিচের অবস্থানেও নয়। বরং অনেক অনেক নিচেই আমাদের অবস্থান। বিশেষ করে সত্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে। অন্য দেশ, অন্য জাতির লোকেরা যে মিথ্যা বলে না এমনটা নয়, তবে তাদের এই মিথ্যার ব্যবহার ও প্রচলন অত্যন্ত বিরল এবং তাও পরিদৃষ্ট হয় কেবল জীবন-মরণ সমস্যার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমনকি জাতীয় জীবনেও মিথ্যা-অন্যায়ের ব্যবহার অবিরাম, অবিরত এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে মিথ্যারই বিজয় পরিদৃষ্ট হয়। এখানেই জাতি হিসাবে আমাদের সীমাহীন লজ্জা ঢাকার কোন আবরণ খুঁজে পাই না। আমরা সত্যের সন্ধান করি না, সত্যের আশ্রয় নেই না বা চাই না। আমরা অসত্য, অন্যায় আর ছলনা-প্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয়াকেই অগ্রাধিকার দিতে অভ্যস্ত হয়েছি। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বেশী কলংকের আর কী থাকতে পারে বুঝে উঠতে পারি না।

আরও দেখুন:  খাদ্য ও ক্ষুধা

আমাদের মিথ্যা ও অন্যায় ক্রিয়া-কর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ইদানীং আমরা প্রয়োজনে ইসলামের দোহাই দেই। বলি এটা ইসলামী বিধান, ওটা ইসলামী বিধি। যদিও বাস্তবে ইসলামী শরী‘আত আমাদের কথিত আচরণ ও বক্তব্যের সস্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থেকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অহরহ নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমনি একটি ব্যাপক মিথ্যাচার শুরু হয়েছে ইসলামের একটি সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আমল ‘জিহাদ’কে নিয়ে। কিছু ইসলামী পরিচয় দেয়া ব্যক্তি বা সংগঠন জিহাদের অপব্যাখ্যা দিয়ে একে সন্ত্রাস, গুপ্ত হত্যা ও জঙ্গীবাদের সমার্থক হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এগুলো সবই করা হচ্ছে পশ্চিমা নৈতিকতা বিবর্জিত অপশক্তির প্ররোচনায় এবং সার্বিক সহযোগিতায়।

অথচ যাঁরা আল্লাহর অকাট্য বাণী পবিত্র কুরআন এবং ছহীহ হাদীছের সঠিক উদ্ধৃতি ও প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা দিয়ে জিহাদকে অন্যায়-অবিচার, যুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে জোরালো এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে ধরার নিরন্তর প্রচেষ্টা নিজেদের কথায়, কাজে ও লেখনীর মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদেরই বিরুদ্ধে দেশের প্রশাসনযন্ত্রসহ তথাকথিত ইসলামী সংগঠনের কথিত ইসলামী চিন্তাবিদগণ সকল প্রকার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন। আমাদের কি একটি বারের জন্যও ভেবে দেখা উচিত নয় যে, এই মানুষকেই আল্লাহ তা‘আলা আশরাফুল মাখলূকাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ উপরোক্ত আক্বীদার কারণে আমরাই নিজেকে আতরাফুল মাখলূকাত হিসাবে পরিচিত করছি।

দেখা যায়, যে ব্যক্তি কঠিন তাক্বওয়ার অধিকারী, সত্য ও ন্যায়ের আলোকে জীবন যাপনে অভ্যস্ত এবং সর্বোপরি কথায়, কাজে ও লেখনীতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে যার কঠোর অবস্থান, সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় অরাজনৈতিক ও কঠিন তাক্বওয়া সমৃদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধেও নির্লজ্জভাবে জঙ্গীবাদের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।

প্রতীয়মান হয় যে, দেশটা প্রায় সত্যবাদী শূন্য অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। এই অবস্থার প্রমাণ হিসাবে আমার অবসর জীবনের একটি অতি সত্য ঘটনা এখানে উল্লেখ করেই আলোচনার সমাপ্তি টানতে যাচ্ছি। ঘটনাটি এমন ‘আমি সরকারী চাকুরী থেকে সবেমাত্র অবসর নিয়ে নিভৃত পল্লীর নির্জন জরাজীর্ণ বাসভবনে বসবাস শুরু করেছি। একদিন আমার পরিচিত এক বেকার যুবক আমার কাছে আবদার নিয়ে হাযির। তাকে একটা চাকুরী জুটে দিতে হবে। হৌক সেটা সরকারী, আধা-সরকারী বা বেসরকারী। তবে মাসিক বেতনটা অন্তত দশ হাযার টাকা না হ’লে ৪/৫ জনের সংসার চালানো যাবে না। আমি তাকে বললাম, এ রকম বেতনে সে আমার কাছেই কোন চাকুরী করতে রাযী কি-না। সে জানতে চাইল কাজ কি ধরনের। বললাম, কাজ তেমন কিছু না। প্রতি মাসে একজন লোককে সংগ্রহ করে আমার কাছে উপস্থিত করতে হবে যে প্রকৃতই সত্যবাদী, কখনও মিথ্যা কথা বলে না।

আরও দেখুন:  কাক বাবা-মা'র গল্প

আমার কথা শুনে যুবকটি একটি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো। বললাম, এভাবে হাসলে কেন? সে বলল, এটা একটা চাকুরী হ’ল? বললাম, তোমারতো বেতন দরকার, আর কাজ যত হালকা হয় ততই ভাল। সে বলল, বেতনটা ঠিক ঠিক মত দিবেন তো। বললাম, আমাকে কি মিথ্যাবাদী মনে হয়? সে বলল, আমাকে কতদিন এভাবে বেতন দিবেন? বললাম,

যতদিন আমি জীবিত থাকব আর যতদিন তুমি একজন সত্যবাদী লোককে আমার সামনে হাযির করতে পারবে, ততদিনই তোমার বেতন তুমি ঠিক ঠিক পাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাবে। তবে শর্ত এই যে, ঐ ব্যক্তিকে পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে সত্যবাদী প্রমাণ করতে হবে এবং প্রতিমাসে একজনের বেশী দরকার নেই এবং একই ব্যক্তিকে একাধিক বার গ্রহণ করা হবে না। সে বলল, ঠিক আছে।

তারপর মাসের পর মাস চলে যায়, এমনকি বছরের পর বছর। কিন্তু বেকার সেই যুবকটির আর দেখা নেই। বছর ৪/৫ পর একদিন বাজারের পথে তার সঙ্গে দেখা। বললাম, কি ব্যাপার তুমি যে আর আসলে না? সে বলল, চাচা আপনি আমাকে চাকুরী যোগাড় করে দিবেন না তাই আমাকে এমন শক্ত শর্ত দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ঐ যে লোকে বলে না ‘নয় মণ ঘিও জুটবে না, রাধাও নাচবে না’। বললাম, বেশতো সুন্দর বলেছ। আমার শর্তটা আসলেই কি শক্ত? সে বলল, শক্ত বলে শক্ত। কোন চাকুরীতেই এমন কঠিন কাজের শর্ত নেই। বললাম, কেন এটা শক্ত বলছ? সে বলল, আশে পাশে খুঁজে খুঁজে হয়রান। পেরেশান হ’লাম- কিন্তু মিথ্যা বলে না কাউকে পেলাম না। বললাম, তোমারতো টাকার খুব দরকার? সে বলল, তা আর বলতে? বললাম, তুমি অন্ততঃ এক মাসের বেতন দশ হাযার টাকাতো অবশ্যই নিতে পারতে এবং অতি সহজেই নিতে পারতে। সে জিজ্ঞেস করল, কিভাবে তা সম্ভব? বললাম, তুমিতো নিজেকে উপস্থিত করে নিজেকেই সত্যবাদী দাবী করে এক মাসের বেতন নিয়ে যেতে পারতে? সে বলল, চাচা আমিতো সত্য বলতেই জানি না। আমি জীবনে আজই একটি সত্য কথা বললাম, যার উপর আর কোন সত্য নেই। বললাম, কোন সে কথা? সে বলল, এই যে, ‘আমি সত্য বলতেই জানি না’। এটাই পরম সত্য কথা। এমন সত্য কথা কি কেউ কখনো বলে চাচা? আমিই কি কোনদিন বলেছিলাম অতীত জীবনে? বললাম, কেন বলনি? সে বলল, একথা যে শুনতো সেই আমাকে পাগল বলতো। বললাম, এসো তোমার এই সত্যবাদিতার জন্য তুমি অন্ততঃ একমাসের বেতন দশ হাযার টাকা নিয়ে যাও। কিন্তু সে কিছুতেই রাযী হ’ল না।

– মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম প্রধান
অবসরপ্রাপ্ত বি.সি.এস (সমবায়) কর্মকর্তা এবং ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button