জীবনের বাঁকে বাঁকে

দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন, আল্লাহ সবকিছু সহজ করে দেবেন

আজ পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি একটা দিনও রেস্টুরেন্টে খাইনি।

আমাদের বিয়ের প্রায় চার বছর হতে চললো, কিন্তু এই সময়ের মাঝে একটা দিনও নেই যেদিন আমরা একসাথে কোন রেস্টুরেন্ট বা অন্যকোথাও বসে কিছু খেয়েছি।

এতোটুকু পড়ার পর আপনি হয়তো ভাবছেন স্বামী হিশেবে আমি হয় ঘরকুনো নয়তো-বা একটু কৃপণ! যদি তা না-ই হবো, তাহলে চার বছরেও একটা দিন বউকে নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাবো না কেনো, তাই না?

আসলে সেটা করা হয় না নিতান্তই আমার স্ত্রীর ইচ্ছাতেই।

তিনি বাইরে খেতে পছন্দ করেন না মোটেও। এমন না যে বাইরের খাবার তাঁর পছন্দ নয়, তবে রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোথাও খেতে হলে তাঁকে হাতের গ্লাভস (হাত মোজা) আর নিকাব খুলে খেতে হবে বিধায় তিনি বাইরে একেবারেই খেতে চান না। সাধারণত রেস্টুরেন্টগুলো খোলামেলা হয়। চারপাশে অসংখ্য আসন পাতা থাকে আর তাতে থাকে অনেক কাস্টমার। এমন পরিবেশে হাত মোজা আর নিকাব খুলে খেতে কোনোদিন তিনি রাজি হবেন না।

কিছু কিছু রেস্টুরেন্টে ফ্যামিলি কামরা থাকে, কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে সেখানে সার্ভ করে পুরুষ মানুষ। এই কারণে এসব কামরাতে বসে খেতেও তাঁর আপত্তি। এতো বিপত্তি করে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার চাইতে আমরা রেস্টুরেন্টের খাবার প্যাক করে বাসায় এনে খাই।

একবার ফ্যামিলি ট্যুরে বান্দরবান গিয়েছিলাম। সকালবেলা আমাদের নৌকা ভ্রমণের প্ল্যান। দুটো নৌকা ভাড়া করা হয়েছে। একটাতে মহিলারা বসবে, অন্যটায় পুরুষ। সময় কম থাকায় ঠিক হলো যে সবাই সকালের নাস্তা নিয়ে নৌকায় উঠবো এবং সেখানেই নাস্তা করে নেবো। কিন্তু মেয়ের মা রাজি হয় না কোনোভাবে। বললেন, ‘নৌকার মধ্যে কীভাবে খাবো?’

আমি বললাম, ‘কেনো, নৌকায় তো আপনারা মহিলারাই থাকবেন। কোন পুরুষ থাকবে না’।

তিনি বললেন, ‘নৌকা যিনি চালাবেন, তিনিও কি মহিলা?’

আমি খলখল করে হেসে বললাম, ‘এই ব্যাপার! আচ্ছা, ওই লোকটাকে বলে রাখবো যেন সে নৌকার ভেতরে কোনোভাবে চোখ না দেয়। আর, সে তো নৌকা চালানোয় ব্যস্ত থাকবে, আপনি অন্যদিকে ফিরে খেয়ে নিয়েন’।

আরও দেখুন:  ভারত বিরোধীতা

আমতা আমতা করে রাজি হলেন। যেহেতু সময় নেই আর ফ্যামিলি ট্যুর, দ্বিমত করার সুযোগও কম। আমি তাঁর নাস্তা নিয়ে নৌকায় পৌঁছে দিতে যাবো, ওমনি দলের ডিসিশান পরিবর্তন হলো। বলা হলো— নৌকায় খাওয়া হবে না, সবাই বরং রিসোর্টের ডাইনিংয়ে বসে খাওয়া দাওয়া করবো। কিন্তু, তিনি রিসোর্টের ডাইনিংয়ে খাবেন না। ডাইনিংয়ে এতোগুলো পুরুষের সামনে নিকাব আর গ্লাভস খুলে খাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অগত্যা আমাকে নাস্তাগুলো নিয়ে পুনরায় আমাদের রুমে ফিরে আসতে হলো। রুমে খেয়েদেয়ে যখন বের হই, তখন দেখি অনেকে খাওয়াও শুরু করতে পারেনি।

আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘খুব কি দেরি হয়ে গেলো? দেখলেন, আল্লাহ কীভাবে সহজ করে দিলেন?’

সেদিনের আরেকটা ঘটনা। নৌকা ভ্রমণ শেষে আমরা খেতে নেমেছি রিসোর্টের বাইরের অন্য এক পাহাড়ি রেস্টুরেন্টে। বলাই বাহুল্য, এ-ধরণের রেস্টুরেন্টগুলোতে আগে থেকে অর্ডার দিয়ে যেতে হয়। আমরা ঘুরতে যাওয়ার আগে সেখানে নৌকা থামিয়ে অর্ডার দিয়ে গিয়েছিলাম।

দুপুরে যখন খেতে আসি তখন দেখি সেখানে অনেক মানুষের খাওয়ার বন্দোবস্ত করা। আমরা ছাড়াও আরো অনেক পর্যটক সেখানে খাবে তখন। যেহেতু খোলামেলা রেস্টুরেন্ট আর চারপাশে অনেক পুরুষ খেতে বসবে, আমার স্ত্রী নৌকা থেকে নেমেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমাকে বললেন, ‘এখানে তো খাওয়া যাবে না।’

এখানে যে খাওয়া যাবে না তা আমিও জানি। কিন্তু তাহলে খাবো কোথায়? আমাদের রিসোর্টও তো ম্যালা দূর! আমি বললাম, ‘তাহলে খাবো কোথায়?’

তিনি মন খারাপ করে বললেন, ‘আমি বরং না খাই’।

  • ‘ওমা, তা হয় নাকি?’
  • ‘তাহলে?’
  • ‘ওয়েট, একটা ব্যবস্থা করছি’।

আমাদের নৌকা দুটো খালি ছিলো। সবাই তখন খাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে। মাঝিরাও খেতে চলে গেছে। আমি বললাম, ‘এক কাজ করি, আমাদের খাবার-দাবার নৌকায় নিয়ে আসি, কী বলেন? নৌকায় খাই আমরা। একটা পিকনিক পিকনিক আমেজ থাকবে। হা হা’।

আরও দেখুন:  প্রতিযোগিতা

যা বলা তা-ই কাজ। রেস্টুরেন্টের লোকগুলোকে বললাম আমাদের খাবারগুলো দেন, আমরা নৌকায় বসে খাবো। তারা একটু অবাক হয়ে বললো, ‘ভাই, নৌকায় নিয়ে দেওয়ার তো সুযোগ নেই। দেখছেন তো অনেক ভিড়।’

  • ‘আপনাদের নিয়ে যেতে হবে না। আমাকে টেবিলে সার্ভ করেন, আমি নৌকায় নিয়ে যাচ্ছি। খাওয়ার পর এনেও দিবো’।

খাবার নিয়ে আমরা নৌকায় উঠে পড়লাম। চারপাশে পানির কলকল ধ্বনি, পাহাড় থেকে বয়ে আসা ঝিরঝিরে হাওয়া আর আমাদের নৌকা-ভোজন! সব মিলিয়ে জম্পেশ খাওয়া দাওয়া হয়েছিলো আলহামদুলিল্লাহ।

সব শেষে তিনি আবার আমাকে বললেন, ‘দেখলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা কীভাবে সব সহজ করে দেন?’

সত্যিই, যারা আল্লাহর দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে আর তাতে কোন কমপ্রোমাইজের সুযোগ রাখে না, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা অবশ্যই তাঁদের জন্য সবকিছু সহজ করে দেন। দ্বীনকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে তাদের হয়তো ত্যাগ করতে হয় সাময়িক কিছু আনন্দ আর উচ্ছ্বাস, কিন্তু তার বিনিময়ে অন্তরে যে প্রশান্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা ঢেলে দেন সেটা তো অমূল্য!

‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য সমস্যা থেকে উদ্ধারের পথ অবশ্যই বের করে দেন।’— আত ত্বালাক, আয়াত-০২

আরিফ আজাদ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button