জীবনের বাঁকে বাঁকে

শাসিতের শোষণ

আমরা এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এমন নিষ্ঠুরতা আগে কখনও দেখা যায়নি। এত হৃদয়হীনতা ছিল না। এত নাটক, এত ক্ষমতালোভের মুখোমুখি আমরা আগে হইনি। কেউ অচেনা-অজানা মানুষকে কয়েকটা টাকার লোভে পেট্রলবোমা দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এই অগ্নিযজ্ঞের আয়োজন করছে, অর্থায়ন করছে। কেউ প্রতিশোধ নিচ্ছে স্টেনগান দিয়ে। গোঁফ গজায়নি এমন ছেলেদের মৃত্যুদণ্ড লেখা হয়ে যাচ্ছে মাতাল ঝোঁকে, গাঁজার আসরে।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম মিফতাহ দার আস-সাদাহ বইটিতে আমাদের বিশাল এক আত্মজিজ্ঞাসার সামনে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি লিখেছিলেন, মানুষের নেতা তাদের মতই হয়। যখন মানুষ ভালো হয় তখন তাদের শাসকরাও ভালো হয়। যখন মানুষেরা একে অন্যের উপরে অত্যাচার করে, রাজারা তখন মানুষের উপরে অত্যাচার চালায়। যখন মানুষ আল্লাহর অধিকার আদায় করে না, তখন শাসকরা শাসিতদের অধিকার খর্ব করে। যখন সবলেরা দুর্বলদের ঠকায় তখন ক্ষমতাসীনেরা মানুষদের উপরে জোর খাটায়। মানুষরূপী শয়তানদের নেতা হবে সবচেয়ে বড় শয়তান—এটাই কি স্বাভাবিক না?

কিন্তু এর শেষ কী এখানেই?

আল্লাহ সুবহানাহু বলেছেন,

وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلا هُوَ

আর কেউ জানে না তোমার রবের বাহিনীর সংখ্যা কত, সৈন্যের সংখ্যা কত। একমাত্র তিনিই জানেন। [ ৭৪:৩১]

আমরা মানুষেরা আমাদের রবকে দেখি না। আমরা চোখের সামনে মানুষকে দেখি। মানুষের ক্ষমতা দেখি। আমাদের চোখের সামনে ভারী সাঁজোয়া যানে বসে থাকে ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বিশালদেহী সৈন্য। এদের আঙুলের চাপে ঝাঁজরা হয়ে যায় বুক। উনিশটা গুলি দেহ ভেদ করে যায় নির্মম আক্রোশে। যেই মাটিতে এই সেনারা দাঁড়িয়ে থাকে সেটা আল্লাহর সৈন্য। যে জমিনে তাদের বাহন চলে সেটা আল্লাহর সৈন্য। এই মাটি দিয়ে আল্লাহ লুত নবীর জাতিকে জ্যান্ত কবর দিয়েছিলেন তাদের বিকৃত কামনার পাপের কারণে।

যে বাতাসে তাদের জঙ্গী বিমান ওড়ে সেটা আল্লাহর সৈন্য। যে বাতাস তাদের ফুসফুসের ব্রঙ্কিওল বয়ে অ্যালভিওলাইগুলো বাতাসে ফুলিয়ে রাখে, সেই বাতাস আল্লাহর বাহিনী। বিশাল, বিশাআআল সব স্তম্ভ বানানো আদ জাতির মানুষদের আল্লাহ মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন এই বাতাস দিয়ে। গ্রানাইটের পাথরের প্রাসাদও আল্লাহর বাতাস ঠেকাতে পারেনি।

আরও দেখুন:  কোথায় যাচ্ছো?

যে সাগরের বুকে তাদের রণতরী ভাসে সেটা আল্লাহর সৈন্য। যে পানি আমাদের দেহের সত্তরভাগ জুড়ে আছে, এ পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ জুড়ে আছে, সেই পানি আল্লাহর অনুগত। এই পানিতে ডুবে মরেছিল নুহ নবীর জাতি, পাহাড়ে উঠেও শেষ রক্ষা হয়নি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর একটি লোহিত সাগরে একদিনে, একসাথে হারিয়ে গিয়েছিল। টোটাল অ্যানিহিলেশন!

আবরাহার হাতির বিশাল বাহিনীটাকে আল্লাহ যেসব পাথর দিয়ে পরাজিত করেছিলেন তার আকার মটরদানার চেয়েও ছোট। ছোট্ট ছোট্ট পাখি সেগুলো মুখে আর পায়ে করে বয়ে এনেছিল। পাথর বৃষ্টি শেষ হবার পরে সেই সেনাবাহিনীর দৃশ্য যেন ছাগলে মুড়ে খাওয়া চারাগাছ! কেউ কী জানে আল্লাহর সেই বাহিনীতে কতগুলো পাখি ছিল?

প্রতিটি ক্ষণ-মূহুর্ত-সেকেন্ড আল্লাহর বাহিনী। কত দাম্ভিক রাজা, কত কত ডাইনি বুড়ি এক সময় দুনিয়া কাঁপাতে চেয়েছে। মানুষ মেরেছে। প্রয়োজনীয় সব কিছুই করেছে। কিন্তু টিকতে পারেনি। কোথায় হারিয়ে গেছে! যেদিন তাদের সময় শেষ হয়েছিল সেদিন তারা মানুষের ঘৃণা সাথে নিয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। যেদিন তারা আবার পুনরুত্থিত হবে সেদিনও তারা মানুষের অভিশাপ ঘাড়ে করে উঠবে।

আল্লাহর সৈন্যরা আমাদের সাথে থাকে। আমাদের দেখে। আমাদের প্রতিটি কাজ দেখে। দেখে আর লেখে। আমাদের পাপের আর যুলমেরও হিসাব হয়। আমাদের ক্ষমতা কম তাই আমাদের অত্যাচার করার মাত্রাও কম। মানুষের দেহ আর শয়তানের আত্মা নিয়ে যারা সিংহাসনে বসে থাকে তারা কিন্তু আমাদের-ই ছবি। আমরা আয়নাতে তাদের নয়, আমাদের মুখেই থু থু দিই।

আমরা কবে আল্লাহকে ভয় পাবো? আমরা কবে ভালো হবো? ‘আমরা’ মানে কিন্তু অনেকে নয়, আমি—একা। আমার কবরে আমি যাবো। চোখের সামনে যে নরক দেখছি, তাতে কী বিশ্বাস হচ্ছে না মৃত্যুর পরে আরো ভয়াবহ অবস্থা হবে আমাদের? আমি আমার চিন্তা করি। আল্লাহ আমাদের চিন্তা করবেন। যারা আল্লাহর সাথে শির্ক করবে না এবং একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে তাদের তিনি নিরাপত্তা দেওয়ার ওয়াদা করেছেন সূরা আল ফুরকানে।

আরও দেখুন:  আমেরিকায় পড়ি

যারা এই লেখাটি পড়লেন তাদের কাছে অনুরোধ—আমাদের জীবনে কোথাও শির্ক ঢুকে পড়ছে কিনা খেয়াল করি। আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেদের বিরত রাখি। অন্যকে সৎ কাজে উৎসাহ দিই, অসৎ কাজ থেকে বুঝিয়ে বিরত করার চেষ্টা করি। আজকের দিনে করা একটি ভালো কাজের কথা মনে করে সেটার কথা উল্লেখ করি আল্লাহর কাছ থেকে যুলম থেকে মুক্তি চাই, অশান্তি থেকে মুক্তি চাই। যদি কোনো ভালো কাজের কথা মাথায় না আসে, তাহলে বুঝে নিই আমাদের দুর্দশা। দুটি রাকাত সলাত আদায় করে আল্লাহর কাছে হাত পেতে দিই। হাতের তালু আকাশের দিকে। হাতের পিঠ মাটির দিকে। প্রসারিত দুটি হাত। চোখে পানি আনি। শান্তি ভিক্ষা চাই আল্লাহর কাছে। আল্লাহ আস-সালাম। সকল শান্তি, নিরাপত্তা তার কাছ থেকেই আসে।

 

– শরীফ আবু হায়াত অপু

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button