জীবনের বাঁকে বাঁকে

“যতদিন তোমার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ”

বিজয় সরণির মোড়ে বিশাল বিলবোর্ডে একটা মেয়ের ছবি। বস্ত্রবালিকা। হাতে টিফিন বাটি। পত্রিকাটির মতে এই মেয়েটির হাতে দেশ।

আসলে মেয়েটির হাতে দেশ নেই—আছে একটা বাটি। এমন বাটি অনেকগুলো দেখেছিলাম রানা প্লাজাতে। ভাতের বাটি। সাদা ভাত। তরকারি ছিল হয়ত কোনো কোনোটাতে। চোখে পড়েনি। ক্রমাগত লাশ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। মাঝে মধ্যে আহত মানুষ। ভাতের বাটির কী দাম আছে? বস্ত্রশ্রমিকদের হাতে দেশ থাকে না। দেশ থাকে তাদের হাতে যারা শ্রমিকদের পুড়িয়ে মারে। কিংবা কংক্রিট চাপা দিয়ে। কিংবা পদতলে পিষ্ট হয়ে। তারা সরকারের সাথে বসে মুলামুলি করে—৫৩০০ টাকা বেতন? ফাজলামো পেয়েছ?

যা কিছু ভালো তার সাথেই আছেন এই ভদ্দরনোকেরা। তারা ভালোই জানে দেশ কাদের হাতে। তবে সেটা তারা আমাদের বলবে না। অন্তত বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলবে না। তারা বয়ান দেবে—নিরাপদ কাজের পরিবেশ চাই। শিক্ষা চাই। মনের কথা খুলে বলতে চাই। মনের কথা বলতে গিয়ে যদি কেউ গ্রেপ্তার হয়, কিংবা কাউকে পিটিয়ে আধমরা করা হয় তখন কিন্তু প্রথম আলো আপনাদের সে ঘটনা বলবে না। সব ঘটনা সবার জানতে হয় না। জানলে আপনারা ভালো থাকবেন না যে।

কৃষকের হাতে কাস্তে। আমাদের মনে আশা জাগে সোনালী ফসলের। বাংলাদেশ পথ হারাবে না। বাংলাদেশের ফসল পাশের দেশ কেটে নিয়ে গেছে। পথ হারিয়ে যাবে কই বেচারা? চারপাশ থেকে বন্ধুত্বের নাগপাশ যে! পত্রিকাগুলো বলবে না কৃষকেরা কেমন আছে। বলবে না কেমন করে আমাদের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। নদীর বুক দিয়ে বন্ধুর গাড়ি চলছে। খালি বলবে কৃষকেরা ভালো আছে। মডেল কৃষকের মুখে হাসি, হাতে কাস্তে । ভোঁতা কাস্তে। ধার আছে রামদাতে। সেটা হাতে ছাত্রলা দেশ পাহাড়া দিচ্ছে।

মহাখালির উড়াল সেতুর নীচে হীরের দ্যুতি আর অর্ধনগ্ন নারীদেহ দেখার পরে পত্রিকাটির সুশীল বচন দেখতে পাওয়া যায়। বিলবোর্ডটির ভাড়া মাসে লাগে ৪০ লক্ষ টাকা। বিজয় সরণিতে দিনে লাখ টাকার কাছাকাছি।

বিজ্ঞাপন মানুষ কিসের জন্য দেয়? কিছু বেচার জন্য। গার্মেন্টস মালিকেরা খুব খারাপ। তারা শ্রমিকদের শোষণ করে কাপড় বেচে । অসহার শ্রমিকদের দেখে আমাদের মনে সহানুভূতি জাগে। আমাদের কাছ থেকে এই সহানুভূতিটা নিয়ে আমাদের কাছেই বিক্রি করে ভালোত্বের বণিকেরা। আর বিক্রি করে ভালো থাকার মিথ্যে অনুভূতি। আপনার মগজে কোষে ঢুকিয়ে দেয় আপনার হাতেই ক্ষমতা আছে। উটপাখি নয় দাদা, আপনি এখন মানুষ হয়েচেন।

আরও দেখুন:  আমেরিকায় পড়তে যেতে ইচ্ছুক সেই মৃত ছেলেটির কথা

হোক না হরতাল । দেশের আইন-শৃংখলা বাহিনী এখন আর চোর-ডাকাত ধরে না । ছাত্রদের ধরে, সাধারণ মানুষ ধরে । দাড়ি দেখলে গা হাতড়ায়। কাউকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সারাজীবনের জন্য পঙ্গু। বিনা বিচারে গুলি চলে । নিজের দেশের মানুষদের বুকে । যে রাজার নাম ছিল স্বৈরাচারী সেও এমন কাজ করেনি। আমাদের করের টাকা এখন আর রাস্তা বানাতে খরচ হয় না। বুলেট কিনতে খরচ হয়। আমাদের নাম লেখা আছে হয়ত সে বুলেটে। খবরের কাগজ বলেছে যাদের মারা হয়েছে সব জঙ্গি। এদেরকে এভাবে মারলে কোনো সমস্যা নেই। আসুন আমরা ফাঁসি চাই। মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনা আজ মৃত্যুময়।

প্রিয় বন্ধুসভার বন্ধুরা, এখন দেশ আপনাদের হাতে আছে । ভালো আছে। সুপথে আছে। যা বদলানোর বদলে গেছে। এখন থেকে এভাবেই চলতে থাক। আপনারা চিন্তা করবেন না। জয় সাইকেল বাংলাময় বিজ্ঞাপন দেখুন। আনন্দ সংগীত গাইতে থাকুন। আর ঘুমান। বাস্তব জীবনে চলতে থাকা বন্ধুদেশের বানানো সিরিয়াল দেখেও না দেখার ভান করে ঘুমিয়ে পড়ুন ।

 

– শরীফ আবু হায়াত অপু / ৯ মুহাররম ১৪৩৫ হিজরী।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button