আড়ালে তার সূর্য হাসে

সবুজ জমিনের উপর মাখন রঙা ফুলতোলা আমার প্রিয় জায়নামাজটি, আমার ঘরের এককোণে বিছিয়ে নির্বিঘ্নে নামাজ পড়ার যে প্রশান্তি; তা আমি পাই না আর কোথাও। এমনকি জায়নামাজটি সরিয়ে আমাদের বাসার অন্য যেকোনো ঘরে নিয়ে গেলেও নয়। বুঝতে পারি কেন রাসুল (স) বলেছেন নিজ গৃহে নামাজ পড়াই মহিলাদের জন্য শ্রেয়[১]।
আমাদের বাসায় যে দু’জন পুরুষ আছেন, তাদের বয়স যথাক্রমে ১১ এবং ৭. �সুতরাং প্রায় সমস্ত কাজই সারতে মা’তে আর আমাতে মিলে। যে সময়গুলোতে বাবা থাকেন, সে সময়গুলোতে ম্যাজিকের মত সব কাজ হয়ে যায়। আর যে সময়টুকুতে তিনি থাকেন না, সে সময়টুকু আমাদের জন্য রীতিমত দুঃস্বপ্ন!
খুব চেষ্টা করি বাইরে থাকার সময়টা যেন নামাজের সময়ের সাথে ক্ল্যাশ না করে। তাই সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার সময়টাই বেছে নেই। কিন্তু যেহেতু মাকেও বেরুতে হয় (তিনি আমার চেয়ে ঢের বেশি কাজ করেন!) তাই অড সময়গুলো আমাকেই বেছে নিতে হয়। আর মাস্টার্সের ক্লাসগুলো তো শুরুই হয় বিকেলে! না চাইতেও তাই অনেক সময়ই আমার প্রিয় জায়নামাজটি বিছিয়ে ক্বাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো হয় না। খুব মনে হয়, এমন কোনো ডিভাইস যদি থাকতো যা দিয়ে আমার ঘরের নির্দিষ্ট জায়গাটুকু জায়নামাজসমেত গুটিয়ে নিয়ে ব্যাগে ভরে ফেলা যেতো, কতইনা ভালো হত! আশ্বস্ত হই যখন ভাবি, ক্বাবাকে ক্যারি করতে হয় না! ক্বাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো যায় যেকোনো স্থান থেকেই। ভাবতে ভাল লাগে, আমাদের মত মেয়েদের কথা ভেবেই বুঝি হাদিসটির শুরুতেই “তোমরা মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করো না”[১], ক্লজটি অ্যাড করা হয়েছে।
ধাক্কাটা খেয়ছিলাম, যতটা না মোটামুটি কোনো মসজিদেই মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেয় তা দেখে, তার চেয়ে বেশি বাইরে থাকা মেয়েদের নামাজের প্রতি অনীহা দেখে। কিভাবে যেন ওদের ধারণা জন্মেছে, বাইরে থাকলে মেয়েদের সমস্ত নামাজ মাফ, বাসায় গিয়ে ক্বাযা পড়ে দিলেই হবে! রেহনুমা ম্যামের মসজিদে (দেশে) নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা শুনে, ও-মুখো আর হইনি। আমি বেছে নিয়েছিলাম শপিং মলগুলো। ছোট্ট, মোটামুটি কখনোই ঝাড়ু না দেয়া, অযত্নে অবহেলায় অনেকটা দায় সারা গোছে তৈরি নামাজের ঘরগুলোতে ঢুকতে মনটা খারাপই হয়। তবু, এতটুকু ব্যবস্থা করে দেবার জন্য, এ সমস্ত শপিংমল কত্রিপক্ষ অন্তত কিছুটা হলেও প্রশংসার হকদার।
সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে, শুধুমাত্র আল্লাহ্র আব্দ হয়ে না জন্মে আমাত হয়ে জন্মেছি বলে, বাইরে নামাজ পড়তে এত বাধাবিপত্তি। আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন যিনি[২], আমি ডাকলেই যিনি দৌড়ে চলে আসেন[৩], তাঁর সামনে কৃতজ্ঞতার মাথা নোয়াতে গিয়ে, তিক্ত অভিজ্ঞতার ঝুলি এতটা ভারি হবে ভাবিনি কখনো।
রাত ১০টার ট্রেনে সিলেট যাব। ট্রেনে যে আলাদা একটি প্রেয়ার-কার থাকে জানতাম না তখন। আমাদের কিছুতেই ইচ্ছে করছিলো না, সীটে বসে বসে নামাজ পড়তে। দুই বন্ধুতে মিলে খুঁজতে লাগলাম তাই। এত বড় ষ্টেশনে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো জায়গা পেলাম না। যা পেলাম তা, যদি মুসলমান ভাইয়েরা ঠিকঠাক সময়মত নামাজ আদায় করেন, তবে তাদের ক্ষুদ্র একাংশকে ধারণ করতে পারবে কিনা সন্দেহ। সে যাক। ভেতরে তখন তিনজন তিন বয়সী ভদ্রলোক নামাজ পড়ছিলেন। আমরা তাই বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম তাদের নামাজ শেষ হবার। সবার আগে বেরিয়ে আসলেন দাড়িওয়ালা পাগড়ি মাথায় দেয়া ভদ্র(?)লোকটি। বের হয়েই তুবড়ি ছোটালেন। রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, আমরা দাঁড়িয়ে আছি দেখে নাকি ওনাদের নামাজ হচ্ছে না। অথচ আমরা অনেকটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেতর থেকে আমাদের উপস্থিতি টের পাওয়ারই কথা না। জানতে চাইলেন আমরা ওখানে নামাজ পড়ার কথা ভাবছি কি না। উত্তর শুনে ফতোয়া দিয়ে দিলেন- আমাদের হিজাব-টিজাব কিচ্ছু হচ্ছে না। এ জাতীয় সিচুয়েশানে আমি চুপটি করে থাকিনা। কিন্তু সেদিন এতটাই চমকে গিয়েছিলাম, মুখে কোনো কথা সরেনি। নামাজটা ওখানেই পড়েছিলাম, সবার শেষে, নির্বিঘ্নে।
সারাটা দিন ধরে পাথর-চাপা পড়ার অনুভূতি হয়, চোখ বেয়ে নামে অশ্রুর বন্যা; যখন জানতে পারি আমার খুব কাছের বন্ধুটি ‘ব্যটা ছেলে’ উপাধি পেয়েছে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে, শুধুমাত্র খুব প্রয়োজনে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার কারণে।
খারাপ লাগে যখন মসজিদে মসজিদে শুধু ভাইদের জন্যই আয়োজন দেখি। কষ্ট পাই যখন আমার ১১ বছর বয়সী ভাইটির কাছ থেকে কিছু বুঝতে পারা অনেকটাই না বোঝা জুমার খুৎবার বিবরণ শুনতে হয়। বাকহারা হয়ে যাই, যখন দেখি রেকর্ডেড ক্লিয়ার সারাওন্ড সাউন্ড আজান শোনার পরও বোরখা পরিহিতা মহিলারা দোকানগুলো থেকে বিরেয়ে মিনিট পাঁচেকের জন্য পাশের “মহিলা ইবাদাতখানায়” যাবার অবকাশটুকু পান না।
আলহামদুলিল্লাহ্, অভিজ্ঞতার ঝুলিটি তিক্ততা দিয়েই ভরে উঠেনি। আনন্দাশ্রু বইয়ে দিতে পারার মতো সুখস্মৃতিও আছে। কোনো ফ্লোরেই মহিলাদের জন্য নামাজের স্থানের দেখা না পেয়ে এক শপিং সেন্টারের একেবারে টপ ফ্লোরে ছেলেদের নামাজের জায়গায় উঠে গিয়েছিলাম, ওখানে হয়তো কোনো ব্যবস্থা থাকবে এই আশায়। কোনো ব্যবস্থা না দেখে ফিরে আসবো ঠিক তখনই সেই মসজিদের ইমাম সাহেব বেরিয়ে এলেন। আমি নামাজের জায়গা খুঁজছি এ কোথাটি তাকে উচ্চারণ করে বুঝিয়ে বলতে হয়নি। টপ ফ্লোর বলে জায়গাটির বড় একটি অংশ খালি ছিল, থাই গ্লাসে ঢাকা বলে সেটি আমি দেখতে পাইনি। তিনি নিজেই সেখানে আমার নামাজের ব্যবস্থা করে দিলেন। মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক এই সুব্যবস্থা দেখে নিচে নেমে তার সহধর্মিণীকে ডেকে নিয়ে এলেন। কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, স্রষ্টার সামনে আপনাআপনি মাথা নুয়ে আসে। এটি ছিল ঠিক সেরকম একটি মুহূর্ত।
ইউনিভার্সিটির সময়টুকু আমাকে কোএডে পড়তে হয়নি। নামজের ভালই ব্যবস্থা ছিল। মাস্টার্সের সময় মূল বিভাগীয় ভবনে যেতে হতো নানা কাজে। মাঝে মাঝে সেখানেই আসর কিংবা মাগরিবের সময় হয়ে যেত। দেখতাম কিভাবে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে, ছেলেগুলো নামাজের স্থানটি আমাদের জন্য ছেড়ে দিত। বিকল্পটা ওরা নিজেদের জন্যই বেছে নিত।
স্টাডি ট্যুরগুলোর কল্যাণে হোটেলে থাকার ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে। মনটা ভাল লাগায় ভরে যেত যখন চেক ইন করার সময় আমাদের পোশাক দেখে সবার আগে ওরা জানিয়ে দিত, জায়নামাজ রুমের ঠিক কোন জায়গাটিতে আছে।“আপনাদের এখানে নামাজের ব্যবস্থা আছে?” শুধুমাত্র এই একটি প্রশ্ন করে কত জায়গায় ভি.আই.পি ট্রিটমেন্ট পেয়েছি! ব্যবস্থা হয়ত একেবারেই নেই, ছিল না কোনো কালেই; তবু কিভাবে কিভাবে যেন ব্যবস্থা ওরা ঠিকই করেছে। এই মানুষগুলোর পরিচয় জানা হয়নি কখনো। উত্তম প্রতিদানটুকু আল্লাহ্ই উনাদের দেবেন।
প্রবাসী পরিচিতজনেরা এফবি-তে উনাদের জুমা, তারাবীর অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত স্ট্যাটাস দেন। দেশি ভাইদেরকে সেসব স্ট্যাটাসে মন্তব্য করতে দেখি “দেশে থাকলে তো এসব সম্ভব হত না” এজাতীয় কথা লিখে। আলহামদুলিল্লাহ্, নৈরাশ্য আমাকে এভাবে গ্রাস করেনি। আমি খুবই আশাবাদী। ঐ সমস্ত ভাইয়ের জ্ঞাতার্থে জানাই, এই চিটাগাং শহরেই আমার জানা মতে তিন তিনটে ভ্যেনুতে তারাবীহ এবং ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়। এবং প্র্তি বছর সেখানে মহিলা নামাযীর সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। ঢাকায়ও আছে এমন ব্যবস্থা। কিছু মসজিদে জুমার নামাজের আয়োজনও করা হয়। সংখ্যায় হয়ত এসমস্ত আয়োজন খুবই নগণ্য। আমি বলব, সিন্ধুর শুরু তো বিন্দু থেকেই।
মনে-প্রাণে অনুভব করি পরিবর্তন আসছে যখন রোযার বিধান এবং মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বক্তারা ভাইদের বলেন মহিলাদের মসজিদে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে। বলেন, “আপনারা মহিলাদের, বাজারের মতো নিকৃষ্ট জায়গায় যেতে দেন খুব সহজে। তবে কেন মসজিদের মতো পবিত্র জায়গায় যেতে দিতে এত ফিতনার আশংকা করেন? দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেদের জগতটা ইচ্ছে মতো পরিব্যাপ্ত করছেন; মা-বোনদের জগতটাকে কেন করে দিচ্ছেন এতটা সঙ্কীর্ণ?” আশ্চর্য ভাল লাগায় মনটা ভরে যায় যখন দেখি, পাশে বসা আমার দাদীর বয়সী ভদ্রমহিলাটি এসমস্ত কথা শুনে “তওবা আস্তাগফিরুল্লা” করছেন না। বরং শুনছেন এবং নতুন করে ভেবে দেখছেন, মেনে নিচ্ছেন।
আমি কেন আশা হারাবো, যখন আমার রব আমাকে বলেছেন নিরাশ না হতে[৪]. কেন আমি ধরে নেব, এই দেশে কিচ্ছু হবে না; যখন ইসমাইল একেবির[৫] মত ভায়েরা কলম ধরেছেন আমাদের হয়ে? আশেপাশে এত চেষ্টা দেখে কেন আমি সেসব মুখস্ত মানুষের দলে যোগ দেব যারা , “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে” এই পঙ্কতি দুটোকে ব্যবহার করেছেন কেবল ভাবকে পরীক্ষার খাতায় সপ্প্রসারিত করতে? আমাদের উপর আল্লাহ্র অশেষ রহমতই বলতে হবে, সূর্যটিকে আমরা শুধু আড়াল হয়ে হাসতেই দেখিনি; অল্প অল্প করে চারপাশ উদ্ভাসিত করে বেরিয়ে আসতেও দেখছি!
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.






