ধর্মীয় উত্সব/উপলক্ষ

হাসিল না দিলে কি কুরবানি শুদ্ধ হয়?

7th Anniversary

শাইখ আব্দুল্লাহ আযযাম রহিমাহুল্লাহ তাফসীর সূরা আত তাওবায় একটা গল্প বলেছিলেন। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদের সময়কার ঘটনা। সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়ার কারণে এক লোককে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। নিম্ন আদালত লোকটির মৃত্যুদণ্ড দেয়। উচ্চ আদালতে গেলে লোকটির পরিধানের কাপড় সহ যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হলেও মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হয়। লোকটি মুক্তি পেয়ে স্লোগান দিতে থাকে “ন্যায় বিচার জিন্দাবাদ”।

কুরবানির হাটের হাসিল সংক্রান্ত বিষয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে অনলাইনে প্রায় সবজায়গাতে একটি ফতোয়াই দেখতে পেয়েছি। ফতোয়াটি দেশের প্রখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়াও বটে। সেখানে হাসিল না দিলে কুরবানী জায়েয হবে বলা হলেও হাসিলকে হাটওয়ালার হক বলা হয়েছে, যা প্রদান না করাকে হক নষ্ট করার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং গুনাহগার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। হ্যাঁ বুঝলাম, ইজারাদার টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছেন তাই এটা তার হক। কিন্তু এই হক্বটার প্রতিষ্ঠার সাথে যে সামগ্রিক জুলুমের সম্পর্ক রয়েছে সেকথা কে বলবে?

অথচ গোটা হাটটাই যে ছিল জনগণের অধিকার। এবং হাসিলের নামে যে চাঁদাবাজি চলছে সে বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই নেই সে ফতোয়ায়। সেক্যুলার ব্যবস্থার মধ্যে দির্ঘদিন থাকতে থাকতে আমাদের অধিকারবোধটুকুও আজ বুঝি বিলুপ্তির পথে। আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলিই যদি আমাদের ইসলামি অধিকারের কথা ভুলে যায় তবে কে আমাদের তা স্মরণ করিয়ে দেবে?

আরও অত্যন্ত দুঃখজনক যে চিত্রটি হাটগুলোতে—সাধারণত রাজধানির বড় বড় হাটগুলোতে দেখা যায় তা হলো, হাসিলঘরগুলোতে মাদ্রাসা পড়ুয়া হুজুরদের বসানো হয় হাসিল আদায় করতে। আর তাদের উপস্থিতিতেই বারবার মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয় “হাসিল ছাড়া কুরবানি শুদ্ধ হবে না”। এর দ্বারা কায়েমি স্বার্থবাদীদের এই চাঁদাবাজিকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া হয়। যথারীতি আমাদের মৌলভীরা সেখানে এশটাবলিশমেন্টের প্রতি অনুগত ও উচ্ছিষ্টভোগী চরিত্রের রোলই প্লে করে থাকেন। এসব বিষয়ে আমাদের মৌলভী সাহেবদের আরও সচেতন ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সৌদি আরব থেকে আমেরিকা, প্রাচ্য থেকে প্রতিচ্য, দুনিয়ার সব সেক্যুলার রাষ্ট্রই জনগণের কাছ থেকে নানারকম অন্যায় ট্যাক্স আদায় করে থাকে। এসব ট্যাক্স আদায় ও আদায়কারীদের ব্যাপারে ইসলামে ভয়ঙ্কর রকম সাবধানবাণী রয়েছে—একে অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। সে যা-ই হোক, যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই, সেহেতু সেটা নিয়ে কথা বলেও লাভ নেই। কিন্তু সেই ট্যাক্স যেখানে মারাত্মক চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য জুলুমের পর্যায়ে নেমে এসেছে সেখানে বসে, তার উচ্ছিষ্ট খেয়ে, সেটাকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া আরও ভয়ঙ্কর রকম অন্যায়। যারা করছে তারা তো করছেই, প্রতিরোধ না করতে পারলে অন্তত উচ্ছিষ্ট খেয়ে নিজেদেরকে সেই জুলুমের অংশীদার বানানো থেকে দূরে থাকুন, জনগণকে জানতে দিন এটা অন্যায় এবং তার অধীকারের ব্যাপারে ভুল বার্তা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

হাটবাজার ব্যবস্থাপনা—হোক সেটা কুরবানির কিংবা দৈনন্দিন—এটা সরকারের সাধারণ বাধ্যতামূলক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সেটা হোক সেক্যুলার সরকার কিংবা ইসলামি সরকার। এ হাটগুলো সরকারি জায়গায় বসে; এগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির সাধারণ দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ধর্মীয় এমন একটি পবিত্র উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেসী মহলকে জনগণের কাছ থেকে হাসিলের নামে এমন চাঁদাবাজি করা লাইসেন্স দেওয়া মোটেই ঠিক নয়। কতটুকু অর্থই বা সরকার পায় এত্থেকে?

০৫ আগস্ট ২০১৯ এ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬-১৮ তিন বছরে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন কুরবানির হাট ইজারা বাবদ পেয়েছে ৫৭ কোটি টাকা। ইজারাদাররা প্রদত্ত তথ্যমতে হাসিল আদায় করেছেন ২৩৬ কোটি টাকা। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়িই আদায়কৃত হাসিল ইজারা মূল্যের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ। এই টাকাগুলো যাবে হাতে গোণা কয়েকজন মানুষের পকেটে, যারা ইতিমধ্যেই হয়তো অর্থ রাখার জায়গার অভাবে সুইস ব্যাংকে গোপন একাউন্ট খুলে বসে আছে। কিন্তু একজন গরু লালনপালনকারী, কিংবা ব্যবসায়ীর কাছে ৫% মূল্য অনেক বড় কিছু। এটা তার গোটা ব্যবসাটাকে অন্য স্তরে নিয়ে যেতে পারে।

এই পঞ্চাশ ষাট কোটি টাকা সরকারের কাছে তেমন বেশি কিছু হওয়ার কথা না, কিন্তু এই চাঁদাবাজিটা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তাতে সরকারের প্রাপ্তি এর চেয়ে হাজারগুণ বেশি হবে বলে আমরা মনে করি।

কোনো সেক্যুলার রাষ্ট্রেও সরকার যদি ইসলামপ্রিয় মানুষের সমর্থন পাওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তবে এই কুরবানির হাটগুলোকে হাসিলমুক্ত করে দেওয়া হতে পারে অন্যতম একটি উপলক্ষ্য। এসব হাট থেকে সরকার যতটুকু রাজস্ব পায় তা খুবই সামান্য। ইজারাদাররা তার চেয়ে কমপক্ষে চার পাঁচ গুণ বেশি হাসিল আদায় করে। যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের স্থানীয় চেলাচামুণ্ডারাই মূলত এগুলো ইজারা ‘পেয়ে’ থাকে। হাতে গোণা এই দু’চারজন মানুষের চেয়ে সাধারণ ধর্মপ্রিয় মানুষেরা সরকারের কাছে অনেক গুরুত্বপুর্ণ হওয়া উচিৎ, কেবল রাজনৈতিক বিবেচনাতেও।

সার কথা হলো, হাসিল দেওয়া না দেওয়ার সাথে ধর্মীয়ভাবে কুরবানী শুদ্ধ হওয়া না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। হাটবাজার ব্যবস্থাপনা সরকারের সাধারণ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সরকারের উচিৎ ধর্মপ্রীয় মানুষদের স্বার্থে, গরু লালনপালনকারী গরীবের স্বার্থে, সাধারণ গরু ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এই হাসিল প্রথা বন্ধ করে দেওয়া। এই পদক্ষেপ অত্যন্ত উৎপাদনশীল গুরত্বপুর্ণ এই খাতটিকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সিয়ান পাবলিকেশন

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button