ধর্মীয় উত্সব/উপলক্ষ

ঈদ এবং …

eid live

আমরা অনেক সময়ই আমাদের দ্বীন নিয়ে গর্ব করি – নিজেদেরকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ভিত্তিক জাতি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করি । একই কথা ভৌগলিক সীমারেখা ভিত্তিক ন্যাশন-স্টেটের বেলায়ও প্রযোজ্য। আমরা স্বভাবতই আমাদের দেশকে ভালোবাসি এবং একধরনের গর্ব বোধও করি। ভালোবাসতে যদিও কোন বিশেষ কারণের বা যুক্তির ধার ধারতে হয় না, কিন্তু গর্ব বোধ করতে হলে কিছু কারণ থাকতে হয় বইকি! আমি যখন কাউকে গর্ব মিশ্রিত স্বরে বলবো: ইসলাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ দ্বীন (বা ধর্ম) – তখন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করতেই পারে যে, কেন বা কিভাবে? প্রিয় ভাই-বোনেরা আপনারা ভেবে দেখেছেন যে, হঠাৎ কেউ যদি

আপনাকেই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে বসে, তবে আপনি কি জবাব দেবেন? বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থাকলে আপনি হয়তো অনেক কিছু বলে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তার অবকাশ না থাকলে তৎক্ষণাৎ কি বরবেন?

আমরা খুব সহজ তিনটি দিক বলতে পারি:

১) আর সকল ধর্মেই কোন না কোন রূপে সৃষ্ট বস্তুর পূজা, অর্চনা, আরাধনা বা ইবাদত করা হয়। কিন্তু ইসলাম কেবলই এক আল্লাহ‌ তথা সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করতে নির্দেশ দেয়। এখানে কোন ছাড় পাবার উপায় নেই – আল্লাহ‌ কুর’আনে বলেছেন যে, তিনি “শিরক” ক্ষমা করবেন না, তবে এর চেয়ে ছোট [তাঁর কাছে করা] যে কোন পাপ/অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন [অবশ্য বান্দার হক্ব নষ্ট করা যে কোন পাপের হিসাব, ঐ মজলুম বান্দার সাথে বোঝাপড়া করতে হবে]। ইবাদতের কোন কাজে কাউকে অংশীদার ভাবার/করার কোন অবকাশ ইসলামে নেই।

২) আর সকল ধর্মাবলম্বীরা তাদের মর্জিমত আইন বা অনুশাসন পরিবর্তন করে থাকে – সামাজিক, মানসিক বা পারিপর্শ্বিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে। যেমন ধরুন এখন থেকে ২০০ বছর আগেও খৃষ্টানরা সুদকে, আমরা যেমন হারাম মনে করি, তেমনি হারাম মনে করতো – কিন্তু এখন আর করে না। অথবা মাত্র ৫০ বছর আগেও পশ্চিমা খৃষ্টান জগতে সমকামিতা লজ্জার বিষয় ছিল, অথচ আজ তা গর্বের বিষয়। কিন্তু ইসলামে, ধর্মের আইন বা অনুশাসন

অপরিবর্তিত থাকে – নও মুসলিম বা সাময়িক বিচ্যুত ও বিপথগামী মুসলিমকে সেই অলঙ্ঘনীয় আইনে ও অনুশাসনে ফিরে আসতে হয়। আমার বাবা জানতেন না যে, ইসলামে সুদ হারাম, তাই তিনি হয়তো সুদভিত্তিক ব্যাঙ্ক ঋণ নিতেন – কিন্তু আমি যখন জেনেছি যে সুদ হারাম, আমাকে আমার পরিবারসহ আবার শুদ্ধ মূল ধারায় ফিরে আসতে হবে।

এজন্যই খৃষ্টানের ছেলে জন্মগতভাবেই খৃষ্টান হয়ে থাকে, ইংলিশম্যানের ছেলে জন্মগতভাবেই ইংলিশ হয়ে থাকে – কিন্তু মুসলিমের ছেলে অটোম্যাটিক মুসলিম হয়ে যায় না। তাকে সজ্ঞানে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হতে হয়। তা না হলে, তার একটা মুসলিম নাম থাকে বটে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মুসলিম স্ট্যাটাস থাকে না।

৩) অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের উৎসবগুলো হচ্ছে বাঁধনহারা আনন্দ, অবারিত ইন্দ্রিয়সুখে নিমজ্জিত হবার আয়োজন – শরীরী ভোগসুখে গা ভাসিয়ে দেবার সুবর্ণ সুযোগ। যারা ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় ক্রিসমাস বা নববর্ষ দেখেছেন , যারা মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডে ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল দেখেছেন, অথবা যারা ভারতে দীপাবলি বা হোলী দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাচ্ছি – মদ, জুয়া আর ব্যভিচারের বন্যা বয়ে যায়, আর তার সাথে সীমাহীন অপচয় তো রয়েছেই। আর ইসলামের উৎসব – যা বাৎসরিক মাত্র দু’টি [আর সাপ্তাহিক পর্যায়ে

একটি অর্থাৎ জুম্মা] সেগুলো কেমন হবার কথা? প্রথমত সেগুলো হচ্ছে ভাব গম্ভীর ইবাদত বা উপাসনার দিন – বাঁধভাঙ্গা উচ্ছৃঙ্খলতার মৌসুম মোটেই নয়। আমরা এমনি দিনে ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, কিন্তু ঈদের দিনে আমরা আরো একটা অতিরিক্ত সালাত আদায় করি আরো বড় সামাজিক জামাতে – যেখানে আমরা প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ‌ যেন আমাদের সংশ্লিষ্ট ইবাদতগুলি [যেমন, সিয়াম, তারাবী, ইতিকাফ ইত্যাদি] কবুল করেন। আমরা দান খয়রাত করি, জাকাত-ফিতরা আদায় করি – আল্লাহ‌ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন তা আত্মীয় স্বজনের সাথে শেয়ার করি। আমাদের মাঝে আরো প্রশান্তি ও শান্তির ছায়া নেমে আসার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিবেশী হিন্দুদের অনুকরণে বা পশ্চিমা প্রভুদের অনুকরণে আমরা সেই স্বাতন্ত্র্য ও সেসব ঐতিহ্য ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি – এমনকি ঈদের সুন্নাহ‌ শুভেচ্ছা বা সম্ভাষণটাও আমরা ভুলে গিয়েছি। আজ দেখা যায়, ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে খাবার ভাগাভাগি করা মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে আমরা দেড় লক্ষ টাকার লেহেঙ্গা বা গারারা কেনার নির্লজ্জ প্রতিযোগীতায় মেতে উঠি, যাতে ঈদের দিন আমাদের বধূ-মাতা-কন্যারা পর-পুরুষের দেহ মনে পুলক সৃষ্টি করে নির্লজ্জ অহঙ্কারে রাস্তায় হেটে বেড়াতে পারে। পুরু লোহা-নির্মিত রুদ্ধ সিংহদ্বারের ভিতরে আবদ্ধ একান্ত নিজস্ব প্রকোষ্ঠে বসে ভুরিভোজন উত্তর ঢেকুর তুলতে তুলতে আমরা ভাবি, টেলিভিশনের কোন চ্যানেলের অশ্লীলতার কোন বিশেষ আয়োজনটা আজ, ঈদের দিনে, উপভোগ করবো! বাজারে কেনাকাটা আর অপচয়ের প্রতিযেগিতার ধূম আর ভোগ-সুখের আয়োজন দেখে, যে কারো পশ্চিমের ক্রিসমাস অথবা পুরাতন বাংলা উপন্যাসে দুর্গা-পূজার আয়োজনের কথা মনে পড়ে যাবে – সহজেই বোঝা যায় যে, আমরা এসব উচ্ছলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা অন্যদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছি।

কে বলবে যে, দীর্ঘ একমাস সময় আমরা সংযম আর কৃচ্ছতার ট্রেনিং নিয়েছি! আল্লাহ‌, তুমি তোমার অন্ধ বান্দাদের অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে নিয়ে আসো – ভোগ-সুখে গা ভসিয়ে দেবার জন্য মুসলিমরা যে পৃথিবীতে আসেনি, একথাটা তাদের আবার মনে করিয়ে দাও!!

যাহোক ‘ঈদ মুবারাক নয়’, ঈদের সুন্নাহ‌ শুভেচ্ছা হচ্ছে:

”তাকব্বালাল্লাহু মিননা ওয়া মিনকুম”

আল্লাহ‌ যেন আমাদের ভালো কাজগুলো [এই একমাসের যাবতীয় ইবাদত, সাদাক্বা ইত্যাদি] এবং তোমাদের ভালো কাজগুলো কবুল করেন।

(ইসলামের স্বাতন্ত্র্য – মো. এনামুল হক)

– শরীফ আবু হায়াত অপু

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button