জীবনের বাঁকে বাঁকে

সময়মতো সালাত

eid live

ফজরের আজান দিচ্ছে, সাথে সাথে ফোনের এলার্মটাও বেজে চলেছে একনাগাড়ে। এই নিয়ে চারবার বাজলো তাও হুঁশ নেই আমিনার, সে ঘুমিয়েই চলেছে বেঘোরে, আজানের আওয়াজ কান পর্যন্ত না পৌঁছালেও পাঁচ নম্বর এলার্ম টোনে যেন হুঁশ ফিরে পায় আমিনা।

হাতড়ে বন্ধ করে এলার্ম, চারটা বেজে পাঁচ মিনিট। ঘুমে চোখ খুলতেও কষ্ট হয় যেন, কাল অনেক রাত করে ঘুমিয়েছিল, আর একটু না ঘুমালে হবেই না কিছুতেই, চোখ ভেঙে ঘুম আসছে, এইতো আর মিনিট দশেক ঘুমিয়েই উঠে পড়বে এই ভেবে ঘুমিয়ে পড়ে আবার। সেই ওঠা আর হয়ে ওঠেনা, ঘুম ভাঙে একদম সাড়ে ছয়টায়, উঠে ফ্রেশ হতে হতে সাতটা। তারপর খাবার রেডি করা, বাচ্চাদের তোলা, তাদের স্কুলে পাঠানো সব করতে করতে সাড়ে আটটা বেজে যায়।

নয়টার দিকে একটু সময় পায়, তখন ফজরের সালাতটা আদায় করে নেয়। মনটাই খারাপ হয়ে যায় আমিনার, আজকের দিনটাই মনে হচ্ছে মাটি, ফজরের সালাত আওয়াল ওয়াক্তে না পড়লে কেমন জানি অশান্তি হয় তার। নাহ, অন্যান্য ওয়াক্তের সালাতগুলো আওয়াল ওয়াক্তে পড়বে ইনশাআল্লাহ।

আবার শুরু হয় কাজের পশরা, ঘর ঝাড়ু দিয়ে, এঁটো বাসনগুলো মেজে নিজে কিছু খেয়ে নেয়৷ ফেলে রাখা নোংরা জামাকাপড় গুলো কেঁচে শুকোতে দেয়, ওর আবার খুঁতখুঁতে স্বভাব, প্রতিদিনই এতো এতো কাপড় জমে।

ছাদে যেয়েই নিচতলার ভাবীর সাথে দেখা, বাড়িওয়ালার বাসায় নাকি কি নিয়ে ঝগড়া লেগেছে সেটাই আধঘন্টা ধরে রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করলো ভাবী। ভীষণ বিরক্ত লাগছিলো আমিনার কিন্তু ভদ্রতা বজায় রেখে মুখের উপর বলতেও পারছিলোনা কিছু।

বাসায় ঢোকার পর আবার মায়ের ফোন, ওখানে গেল আধঘন্টা। বাটা মসলা শেষ হয়ে গেছে মনেই ছিলোনা একদম, মসলা বেটে, তরিতরকারি কুটে রান্নার যোগাড়যন্ত্র করতে করতেই দুপুর একটা বেজে যায়। যোহরের আজান শোনা যায়, সালাতের জন্য তাড়াহুড়ো করে আমিনা।

এমন সময় বাচ্চাগুলো স্কুল থেকে আসে, আর শুরু হয় তাদের বাঁদরামো, সব সামলে তরকারি চড়িয়ে দেয়, বাচ্চাদের বাবা আবার ডাল ছাড়া ভাত খেতে পারেনা, ডাল এখনো করা হয়নি ওদিকে সময় বেড়েই চলেছে, চট করে সালাত টা পড়ে আসলেই পারে কিন্তু রান্নাবান্নার পরে গোসল না করে সালাত পড়তে পারেনা আমিনা, অস্বস্তি লাগে ওর। ডাল টা চড়িয়েই গোসলে যাবে ভাবলো। সব হতে হতে দুইটা।

বাচ্চাদের গোসল হয়ে গেছে অনেক আগেই, তার দুটি মেয়েই মায়ের হাতে ছাড়া খেতে পারেনা, না খাইয়ে তো আর রাখা যায়না ওদের, তাই গোসলের আগে ওদের খাওয়াতে বসলো। খাওয়ানো শেষে গোসল শেষ করে বেড়িয়ে দেখে ঘড়িতে তিনটা বেজে দশ মিনিট। আঁৎকে ওঠে আমিনা, দেরি করবেনা করবেনা করেও আজও এতো দেরী হয়ে গেল। দ্রুত সালাত পড়ে নেয় সে।

খাওয়ার পর ক্লান্ত লাগে ভীষণ, একটু গড়িয়ে নেওয়ার জন্য যখন বিছানায় শোয়, তখন বাজে চারটা। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে পাঁচটা পার হয়ে যায়, মেয়েরা বায়না ধরে নাশতা খাওয়ার তাই কিছু হালকা নাশতা বানিয়ে আসরের সালাত আদায় করতে করতে ছয়টা বেজে যায়।

এরপর ছাদে যেয়ে একটু রিফ্রেশমেন্ট, বাচ্চাদের খেলাধুলা, একসময় মাগরিবের আজান, আজান দিতেই বাচ্চাদের নিয়ে রুমে এসে সালাত আদায় করে। মাগরিবের সালাতই একমাত্র সঠিক সময়ে আদায় করতে পারে আমিনা, প্রশান্তি লাগে অনেক।

সালাত শেষে মেয়েদেরকে পড়তে বসায়, পড়াতে পড়াতেই একসময় এশার আজান হয়, বাচ্চাদের বাবা আসে এসময়, তার জন্য নাশতা রেডি করে, মানুষটা এসেই ফ্রেশ হয়ে নাশতা চাইবে জানা আছে তার।

আমিনার স্বামী আসলে তার ফ্রেশ হওয়া, নাশতা দেওয়া, গল্পগুজব করতে করতে নয়টা বাজে। শ্বশুরবাড়ির সকলের সাথে কথা হয় এসময়। রাতের খাবার খেয়ে, প্লেট বাটি ধুতে ধুতে সাড়ে এগারোটা বাজে। এরপরে টুকটাক কাজ সেরে এশার সালাত আদায় করে ঘুমাতে ঘুমাতে সাড়ে বারোটা।

নাহ, আজও দেরি হয়ে গেল, কাল সবগুলো সালাত সময়মতো আদায়ের চেষ্টা করবে বলে নিজেকে প্রবোধ দেয় আমিনা, পাঁঁচবারে আবার এলার্ম দিয়ে রাখে, কাল কিছুতেই ফজরের সালাতে দেরি করা চলবে না ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়ে, ঘুম ধরতে ধরতে একসময় একটা পার হয়ে যায়! এভাবেই পার হয়ে যায় আমি, আপনি সহ অসংখ্য আমিনার দিনগুলো। আমরা ভুলে যাই আমাদের সবচেয়ে জরুরী দায়িত্বের কথা, আমরা ভুলে যাই সমস্ত কাজের আগে সালাত কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা, এভাবেই আওয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় করা বেশীরভাগ সময়েই আমাদের হয়ে ওঠেনা।

বিবাহিতা, অবিবাহিতা সবারই এ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কিন্তু আমাদের একটু আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে। কোথাও একটা পড়েছিলাম,

“Don’t Blame Your Alarm! Check Your Iman!”
আমাদের উচিৎ আমাদের ঈমান কে আরও জোরদার করা, যথাসম্ভব সঠিক সময়ে সালাত আদায়ে সচেষ্ট হওয়া, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।

– তাসনিমা আক্তার
রৌদ্রময়ী- গ্রুপ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button