পাঠকের পাতা

সিয়াম সাধনা: মানব জীবনে এর বহুমাত্রিক প্রভাব

সিয়াম সাধনা ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত । এটি একটি শারিরীক বাধ্যতামূলক ইবাদত। আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও তাকওয়া অর্জনের অন্যতম প্রধান উপায় হলো সিয়াম পালন। মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভ করার এটি একটি অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনেও সাওম বা রোজা অপরিহার্য ও অনিবার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়ন সাধন, দৈহিক শৃঙ্খলা বিধান, পারস্পরিক সম্প্রীতি-সহানুভূতি এবং সামাজিক সাম্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সাওমের ভূমিকা খুবই অনস্বীকার্য।

রমজান মাসে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ-সবল জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর ওপর রোজা রাখা ফরজ। অবশ্য রোজা পালনে অক্ষম, অসুস্থ, মুসাফির বা পর্যটক ব্যক্তিদের পরবর্তীকালে রোজা পালনের সুযোগ রয়েছে। আল কুরআনের ভাষায়, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাসে উপস্থিত হয় সে যেন রোজা রাখে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফরে থাকে সে যেন পরবর্তী দিনগুলোতে তা আদায় করে’ (বাকারা-১৮৬)। সাওম হলো-সারাদিন নির্দিষ্ট সময় সকল ধরণের পানাহার যৌনাচার ও যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ থেকে নিজেকে বিরত থাকার কঠোর সাধনা করা। এ সাধনার মাধ্যমে ব্যক্তি জীবনে মৌলিক মানবীয় বৈশিষ্টাবলীর সমৃদ্ধি ঘটার পাশাপাশি আত্মিক উন্নতির বিকাশ ঘটে থাকে। আলোকিত মানুষে পরিণত হওয়ার পথে সম্মুখপানে সিয়ামপালনকারী ব্যক্তি এগিয়ে চলে । যদি সে সঠিকভাবে সিয়ামের আদাবসহ রোজা রেখে থাকে।

আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক উন্নতিতে রোজার গুরুত্ব এত ব্যাপক যে প্রত্যেক নবী-রাসূলের অনুসারীদের ওপর তা অপরিহার্য ছিল। জালালুদ্দিন সুয়ূতির লেখা ‘আলওয়াসাইলু ইলা মা’রিফাতিল আওয়ায়েল’ গ্রন্থে বলা হয়েছে- তাওবা কবুলের পরে আদম (আঃ) প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩,১৪, ও ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করতেন। ঐ বইতেই ধাহ্হাক বলেন, প্রথম সিয়াম পালন করেন নূহ (আঃ); প্লাবন শেষে নৌকা থেকে নেমে তিনি রোজা রাখেন।  নূহ (আঃ) দুই ঈদ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ-১৭১৪) ইবনে কাছীরের ভাষ্যমতে (২:১৮৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন) নূহ (আঃ) থেকে তিন দিন রোজা রাখা ফরজ ছিলো। দাউদ (আঃ) বছরের অর্ধেক সময় রোজা রাখতেন। ইব্রাহীম (আঃ) প্রতি চন্দ্রমাসে তিনদিন তথা ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন।’ (বুখারী ৩৪২০) আয়েশা (রাঃ) এর ভাষ্য মতে, জাহেলী যুগেও আশুরার রোজা রাখা হতো। (বুখারী : ৩৮৩১) আল কুরআনের ভাষায়, ‘তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো। (বাকারা-১৮৪)। কালের বিবর্তনে ও সময়ের পরিবর্তনে প্রত্যেক জাতির রোজার পদ্ধতি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন। আর তা হলো আধ্যাত্মিক উন্নতি-আল্লাহভীতি অর্জন। আধ্যাত্মিক উন্নতি অর্জনের জন্য আহলে কিতাব বা ঐশী ধর্মগুলো ছাড়াও অন্যান্য ধর্মে বিভিন্নভাবে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়া হয়। যেমন হিন্দুধর্মের উপবাস, বৌদ্ধ ধর্মের সংসার ত্যাগ আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান বলে মনে করা হয়। আর ইসলামী বিধান অনুযায়ী আধ্যাত্মিকতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম রমজান মাসের সিয়াম সাধনা।

আরও দেখুন:  সুখান্বেষণ

সিয়াম শুধু আবশ্যকীয় ইবাদতই নয়; বরং আত্মিক উন্নতির সাথে সাথে  নৈতিক উৎকর্ষ সাধনেও এর ভূমিকা ব্যাপক। কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি মানবিক কুপ্রবৃত্তি যাবতীয় বর্জনীয় গুনাবলী থেকে দূরে রাখে সিয়াম সাধনা। শয়তানের প্ররোচনা ও নফসের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মাকে হেফাজত রাখতেও সিয়ামের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এ জন্যই রাসূল (সাঃ) রোজাকে ‘ঢাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রোজার মাধ্যমেই একজন মুসলিম নিজেকে আত্মসংযমী করে গড়ে তুলতে পারে। যাবতীয় পাপকর্মের চিত্তাকর্ষক হাতছানি থেকে বাঁচাতে পারে। দুনিয়াবী পাপাচারের ক্লেদাক্ত মানসিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। এতে করে সে সোনার মানুষে নিজে পরণত করতে পারে। সিয়ামের কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ সিয়াম আদায়কারীকে প্রকৃত মুসলিম হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মুসলমানরা সিয়াম পালনের মাধ্যমেই মহান আল্লাহর সঙ্গে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। আদাবের সাথে যথাযথভাবে সিয়াম পালনের মাধ্যমেই মানবহৃদয়ে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়। সিয়াম পালনকারীর ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়েও শুধু মহান আল্লাহর ভয়ে পানাহার ও অন্যান্য বর্জনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভের আশায় ইন্দ্রিয় স্বাদ-তৃপ্তি থেকে নিজেকে বিরত থাকেন রোজাদার। এর মাধ্যমে ব্যক্তির তাকওয়া অর্জন ও সামগ্রিকভাবে তাকওয়াভিত্তিক জীবন ও সমাজ গঠনই সিয়াম সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। কারন সিয়ামের মৌলিক উদ্দেশ্যই হলো খোদাভীতি অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তিকে পুতপবিত্র করা এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তির সৎগুনাবলী সমূহের বিকাশের প্রভাবে সমাজে একটি পজিটিভ ইম্পেক্ট ফেলা।

অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে রোজার পদ্ধতি ও মর্যাদা ভিন্ন। স্বাভাবিক কারণেই নামাজসহ অন্যান্য ইবাদত প্রদর্শিত হয়। কিন্তু রোজা কোনোরূপ প্রদর্শন ছাড়াই নীরবে-নিভৃতে পালন করা যায়। রোজার গোপনীয়তা সম্পূর্ণ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন। এজন্য আল্লাহ তায়ালা রোজার জন্য বিশেষ প্রতিদানের ঘোষণা দিয়েছেন। হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ আছে, ‘মহান আল্লাহ বলেন, আদম সন্তানের প্রত্যেক আমল তার জন্য কিন্তু সিয়াম ব্যতিক্রম। কেননা সিয়াম বা রোজা আমার জন্য করা হয় আর আমিই এর প্রতিদান দেবো’ (বুখারি ও মুসলিম)। সততা ও ন্যায়পরায়ণতাসহ বিভিন্ন মানবীয় গুণাবলি বিকাশ এবং মানবজীবনের সার্বিক সফলতার জন্য আত্মসংযম-আত্মনিয়ন্ত্রণ একান্ত প্রয়োজন। সংযম সাধনা ছাড়া মানবিকতার বিকাশ হয় না। এছাড়া বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব অর্জনের জন্যও নিজের প্রবৃত্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। আর সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই তা অর্জন সম্ভব হয়। ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেছেন, ‘দৈহিক কৃচ্ছতা ও সংযমের সঙ্গে যখন অন্তরের সাধনা যুক্ত হয় তখনই আদর্শ সংযম চেতনার শ্রেষ্ঠতায় প্রতিফলিত হয় রমজানের সিয়াম সাধনায়।’ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহঃ) বলেছেন, ‘পাশবিক বাসনার প্রাবল্য ফেরেশতাসুলভ চরিত্র অর্জনের পথে আন্তরায়, তাই এ উপকরণগুলোকে পরাভূত করে পাশবিক শক্তিকে আয়ত্তাধীন করাই এর আসল তাৎপর্য।’

সবর বা ধৈর্যশীলতা মানবজীবনের অপরিহার্য একটি মৌলিক গুণ। ধৈর্য্যের মাধ্যমে জীবনের যেকোনো বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানো সম্ভব। সত্য-ন্যায়ের পথে চলতে হলে ধৈর্য ও ত্যাগের প্রয়োজন। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হলে সবর অপরিহার্য। মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলো যথাযথভাবে পালন করতেও সবর বা ধৈর্য্যের প্রয়োজন হয়। মূলত ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রসহ মানবজীবনের সামগ্রিক ক্ষেত্রে ধৈর্য বা সবরের বিশেষ প্রয়োজন। আর রমজান মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সারা দিন প্রচণ্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা সত্ত্বেও পানাহার বর্জন করে রাতে দীর্ঘ সময় তারাবির নামাজ আদায় এবং ভোররাতে সেহরি গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে রোজাদারের ধৈর্য্যের প্রশিক্ষণ হয়। যারা এ প্রশিক্ষণে কামিয়াব হন তাদের জন্য রয়েছে পরম কাঙ্খিত জান্নাত। রাসূল সা. বলেছেন, ‘রমজান মাস ধৈর্য্যের মাস আর ধৈর্য্যের বিনিময় হচ্ছে জান্নাতের পরম সুখ।’রমজানের সিয়াম সাধনা এক অনন্য ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশীলন। সিয়াম বলতে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা বোঝায় না বরং অন্যায়-অসত্য, পরনিন্দা-অশ্লীলতা ইত্যাদি পাপাচার থেকে আত্মাকে কলুষমুক্ত করা বোঝায়। রোজার পুণ্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য পানাহার বর্জনের সাথে পাপাচার-অশ্লীলতা বর্জনও শর্ত। অন্যথায় রোজার মূল উদ্দেশ্যে সাধনই ব্যর্থ। এজন্য রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকতে না পারে তার পানাহার থেকে বিরত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই’(বুখারি)।

আরও দেখুন:  ‘দাইউস’ (বেহায়া, আত্মমর্যাদাহীন) – এর পরিচিতি, ভয়াবহ পরিণতি ও উত্তরণের উপায়

আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির পাশাপাশি দৈহিক উন্নতিতেও রোজার ভূমিকা লক্ষণীয়। দীর্ঘসময় পানাহার বর্জনে পরিপাকতন্ত্র সতেজ হয় বলে চিকিৎসকদের অভিমত। পারস্পরিক সহানুভূতি-সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতি-ভ্রাতৃত্ববোধসহ মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত করতে রোজার ভূমিকা অনন্য। ভোগবিলাসে অভ্যস্ত মানুষরা রোজার মাধ্যমে ক্ষুধা-তৃষ্ণার ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারে। এতে দরিদ্র মানুষের প্রতি বিত্তশালীদের সহানুভূতি-সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত হয় এবং সমাজে সাম্য-মৈত্রীর পরিবেশ গঠন করতে সহায়তা করে। সিয়াম সাধনা মুসলিম সমাজে পবিত্র-পুণ্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। সিয়ামের  মাধ্যমে মানুষ ধাবিত হয় পুণ্যের দিকে এবং দূরে থাকার সুযোগ পায় অন্যায়-পাপাচার থেকে। কঠোর সংযম সাধনা-সৎচিন্তায় রোজাদারের মন পাপ-পঙ্কিলমুক্ত হয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে। তাই রোজার মাসে সমাজের সর্বত্র সৌম্য-শান্ত পবিত্রতা বিরাজ করে। আর গোটা সমাজ মহান আল্লাহ তায়ালার রহমতের ধারায় সিক্ত হয়ে ওঠে। হাদিসের ভাষায়, ‘রমজান মাসে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। অপরদিকে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়’ (বুখারি ও মুসলিম)।

সিয়াম সাধনা মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য-সমৃদ্ধির স্মারক। রমজান মাসেই বিশ্ববাসীর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন। এ মাসের শেষ বেজোড়  রাতেই লুকিয়ে আছে হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠ রাত ‘লাইলাতুল কদর’। আর এ মাসেই বদর যুদ্ধে অল্প সংখ্যক মুসলিম সৈনিক বিজয়ী হয়েছিলেন প্রশিক্ষিত বিশাল কাফির কুরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে। এ রকম অনেক সুখকর ঘটনা ঘটেছে মহিমান্বিত রমজান মাসে। প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিক-নৈতিক উন্নতি, পারস্পরিক সহানূভূতি-সহমর্মিতা, সামাজিক উন্নয়ন-সম্প্রীতি অর্জনের লক্ষে রোজার কঠোর সংযম সাধনা এক অনন্য ইবাদত। তাই মুসলিম সমাজে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাপক ও অসাধারণ। আসুন আমরা সবাই যথাযথভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি, দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ অন্বেষণ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সে তৌফিক দান করুন। আমিন!

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button