ইসলাম ও বিজ্ঞানপাঠকের পাতা

কুরআনে ভূমিকম্পের সংজ্ঞা

কুরআন এক বিস্ময়কর কিতাব, বিজ্ঞানময় কিতাব! শুধু বিজ্ঞানই নয়, বিজ্ঞান ছাড়াও বহু বিষয়ের ইঙ্গিত কুরআনে দেয়া আছে । জিওলজি বা ভূতত্ত্ব আমাদের নিকট পরিচিত একটি বিষয়ের নাম । এই বিষয়টির বহু টপিকের ইঙ্গিত রয়েছে কুরআন মাজিদে । যেমন ভূমিকম্প । ভূমিকম্প, আমাদের সকলের নিকট অতি পরিচিত একটি  শব্দ । ছোট-বড় সকলেই জানে যখন পৃথিবী হঠাৎ কেঁপে ওঠে, তাকে আমরা ভূমিকম্প বলে অভিহিত করি ।

প্রথমে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে  ভূমিকম্প আলোচনা করা যাক ।

উইকিপিডিয়া থেকে  ভূমিকম্পের   সম্পর্কে এমন জানা যায়,   ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয় । এই রূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে । কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয়, তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায় ।

ভূমিকম্পের কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো টেকটোনিক বা ভূপৃষ্ঠজনিত কারণ ।

আমাদের ভূ -পৃষ্ঠ অনেকগুলো প্লেট-এর সমন্বয়ে গঠিত । যেমন, বাংলাদেশ, ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মার (মায়ানমারের) টেকটনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে। এই প্লেটগুলো একটি আরেকটির থেকে আলাদা থাকে ফল্ট বা ফাটল দ্বারা । এই প্লেটগুলোর নিচেই থাকে ভূ-অভ্যন্তরের সকল গলিত পদার্থ । কোন প্রাকৃতিক কারণে এই গলিত পদার্থগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলোরও কিছুটা স্থানচ্যুতি ঘটে । এ কারণে একটি প্লেটের কোনও অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায়, যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আর এই কম্পনই ভূমিকম্প রূপে আমাদের নিকট আবির্ভূত হয়।

এবার একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে ভূমিকম্প বোঝার চেষ্টা করি !

ভূপৃষ্ঠের গঠনকে আমরা একটি ডিমের গঠনের সাথে তুলনা করতে পারি, যেমন ডিমকে ৩ টি স্তরে ভাগ করা যায়, বিশেষ করে সেদ্ধ অবস্থায় তা সুন্দরভাবে বোঝা যায় । বাইরের  স্তরটি হলো খোসা, মধ্যের স্তরটি  হলো এর সাদা অংশ এবং ভেতরের  হলো এর কুসুম । তেমনি ভূপৃষ্ঠে এমন ৩ টি প্রধান স্তর বা আবরণ রয়েছে, ক্রাস্ট, মেন্টল এবং কোর । ক্রাস্টকে ডিমের খোসা, মেন্টলকে ডিমের সাদা অংশ এবং কোরকে ডিমের কুসুমের মতো ধরা যায় । গঠনগত দিক থেকে  ডিমের খোসা যেমন শক্ত বৈশিষ্ট্যের তেমনি ক্রাস্টও শক্ত বৈশিষ্ট্যের । অনুরূপভাবে  মেন্টল ও ডিমের সাদা অংশ হালকা নরম এবং কোর ও ডিমের কুসুম নরম বৈশিষ্ট্যের ।

সেদ্ধ ডিম ফাটালে তাঁর খোসার টুকরোগুলো সাদা পাতলা আবরণ দিয়ে একে অপরের সাথে লেগে থাকে । তাঁর সাথে আমরা টেকটনিক প্লেটকে তুলনা করতে পারি । টেকটনিক প্লেটগুলো ও এমনভাবে একে অপরের সাথে লেগে থাকে।

একটি ডিমকে আমরা যদি সেদ্ধ করার জন্য পানিসহ চুলোয় দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দেই, প্রথমে ঠান্ডা পানিতে ডিমটা স্থির থাকবে । তারপর ধীরে ধীরে পাত্রটির তাপমাত্রা ও চাপ বাড়তে থাকবে । যখন পাত্রটির তাপমাত্রা ও চাপ খুব বেড়ে যাবে তখন ডিমটা কাঁপতে শুরু  করবে  এবং  একসময় চাপ সহ্য করতে না পেরে তাঁর খোসা  ফাটিয়ে দিবে, অর্থাৎ ডিমটা এর মাধ্যমে তাঁর উপর আরোপিত চাপকে অবমুক্ত করবে । নিচ থেকে আগুনের তাপ আবার আবদ্ধ পাত্রের চাপ উভয়ে মিলিত  হয়ে প্রচন্ড এক চাপীয় অবস্থার উৎপত্তি ঘটায়।

চিত্র: পৃথিবীর গঠনের সাথে ডিমের গঠনের তুলনা

তেমনি ভূগর্ভের ফাটল ও স্তরচ্যুতি   ইত্যাদি হওয়া,অগ্নুৎপাত, ভূমিধস, খনিতে বিস্ফোরণ বা ভূগর্ভস্থ নিউক্লিয়ার গবেষণায় ঘটানো আণবিক পরীক্ষা থেকেও হতে পারে । সহজ ভাষায় বলা যায়, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভর, তাদের নির্মিত বহুতল ভবন, বিভিন্ন স্থাপনা, ইত্যাদির ভরের   কারণে  ক্রাস্ট বা ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্লেটে আরোপিত চাপ এবং অন্যদিকে ভূ-অভ্যন্তরে উত্তপ্ত, গলিত পদার্থের তাপ, উভয়ে মিলে প্রচণ্ড চাপের উদ্ভব ঘটায় । আর এ চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পৃথিবী তার বিভিন্ন প্লেটের ফাটল, জয়েন্ট ইত্যাদি  দিয়ে চাপকে অবমুক্ত করে । যখনই সঞ্চিত চাপ বের হয় তখন মৃদুভাবে বা প্রবলভাবে কম্পিত হয় পৃথিবী ! যাকে আমরা ভূমিকম্প বলে অভিহিত করি । এ থেকে আমরা ভূমিকম্পের একটি সহজ ধারণা পেলাম ।

চিত্র: ভূমিকম্পের ফলে রাস্তার ফাটল

এবার আল কুরআনের দিকে তাকাই!

আমরা অনেকে জেনে আশ্চর্য হব যে, আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ভূমিকম্পের নামে একটি সূরাই নাযিল করেছেন!

সূরাটির নাম হল ‘যিলযাল’। আরবি ‘যিলযাল’ অর্থ হলো ভূমিকম্প । সূরা যিলযাল এর প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে প্রচন্ডভাবে পৃথিবীকে প্রকম্পিত  হওয়ার কথা বলে দ্বিতীয় আয়াতে চমৎকারভাবে ভূমিকম্পের সংজ্ঞা দিয়েছেন ।প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতটি হলো,

“যখন পৃথিবী তার কম্পনে প্রকম্পিত হবে , আর যমীন তার বোঝা বের করে দেবে” । (সূরা যিলযাল, আয়াত ১-২)

মানুষের  আরোপিত প্রচণ্ড চাপের কারণে পৃথিবী সে বোঝা বা চাপ অবমুক্ত করে ভূমিকম্পের মাধ্যমে । আর তা কত সুন্দর ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে  কুরআন মাজীদে । উল্লেখিত প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে  আহসানুল বায়ান থেকে জানা যায়,

“অর্থাৎ, এর অর্থ হল ভূমিকম্পের কারণে সারা পৃথিবী কেঁপে উঠবে । আর সমস্ত বস্তু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এই অবস্থা তখন হবে, যখন শিঙ্গায় প্রথমবার ফুৎকার করা হবে”। দ্বিতীয় আয়াতের তাফসীরে ও মানুষকে পৃথিবীর বোঝা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে ।

ভূমিকম্প এমন এক দুর্যোগ যা কোনো পূর্বাভাস দিয়ে আসে না । যেকোনো সময় সংঘটিত হয় । তেমনি কিয়ামত দিবস সম্পর্কে কেউ জানে না যে ঠিক কখন তা সংঘটিত হবে । আর এ থেকে কিয়ামত দিবস ঠিক কখন সংঘটিত হবে তা সম্পর্কে মানুষ বলতে পারে না, এটি যে অকাট্য, তা প্রমাণিত হলো !

যাইহোক আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো ভূমিকম্প!

ব্রিটানিকার (BRITANICA) ভূমিকম্প ( Earthquake) আর্টিকেল থেকে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সিসমোলজি অর্থাৎ ভূকম্পবিদ্যা বা ভূকম্পতত্ব আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ভূমিকম্প সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানতে পেরেছিল ।সেখানে হাজার বছরের ও পূর্বে নাযিলকৃত কুরআনে রয়েছে ভূমিকম্পের সুস্পষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা ! আর এ থেকে প্রমাণিত হয় কুরআনের ঐশ্বর্য , দূরদর্শিতা ও অনন্যতা! কুরআনের আরও কয়েক জায়গায় ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ রয়েছে । পত্রটি অধিক দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার আশংকায় তা আর দেয়া হলো না।

সরল আলোচনার ক্ষেত্রে, আমার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক ড. আশরাফ স্যার এবং প্রভাষক বিপুল স্যারের ক্লাসের প্রশংসা করছি ও তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি!

এই পত্রটির প্রশংসা করেছেন,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, স্বনামধন্য জিওলজিস্ট, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক,ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী স্যার । কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় সম্মতি ও প্রশংসা করেছেন, হাফেজ মাওলানা মুফতি মাকসুদুর রহমান সাহেব (দাঃবাঃ) , যিনি বর্তমানে সিনিয়র মুহাদ্দিস,জামিয়াতুস্ সুন্নাহ্ মুযাহিরুল উলূম মাদ্রাসা, শিকারীকান্দা, ময়মনসিংহ, এবং মুহতাতিম,দারুস সূফ্ফা মাদ্রাসা, পোল্ট্রিফার্ম সংলগ্ন, কেওয়াটখালী, ময়মনসিংহ ।আমি আন্তরিকতার সাথে তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

লেখক: এস.এ.এম. গাজী হাসান
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ,
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
ইমেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button