পাঠকের পাতা

করোনা মহামারিতে দান-সাদাকাহ: ইসলামের নির্দেশনা

আল্লাহ তায়ালা মহা গ্রন্থ আল কুরআনে অনেক জায়গায় নিকটাত্মীয়-স্বজন ও গরীব-দুঃস্থদের দান করার নির্দেশ দিয়েছেন। দান করা ইসলামের অনবদ্য ও শাশ্বত এক বিধান। ছাদাকাহ তথা দান বান্দার প্রতি পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার অন্যতম নির্দেশনা। এর মাধ্যমে মানব জীবনের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধিত হয়। স্বচ্ছল ও সামর্থ্যবান ব্যক্তি কর্তৃক অসচ্ছল ও অসামর্থ্যবান ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কিছু দান করাকে ছাদাকাহ বলে। ছাদাকাহ প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে। বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক। ব্যাপক অর্থে মানুষের সাথে হেসে কথা বলা, ভালো পরামর্শ দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা ও অন্যায় কাজের নিষেধ করা অর্থ্যাৎ যা দ্বারা মানুষের উপকার হয় সবকিছুই সাদাকার অন্তর্ভূক্ত। তবে যাকাত ও ফেতরা হলো বাধ্যতামূলক ছাদাকাহ। এছাড়াও অন্যান্য দান ঐচ্ছিক ছাদাকার পর্যায়ভুক্ত। করোনা মহামারীতে গরীব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে সাধারণ সাদাকাহ বা দান নিয়ে আজকের আলোচনা ।

দয়াল নাবী (সা.) দান-সাদাকাহ করার জন্য অনেক হাদীসে বিভিন্ন ভাবে উম্মতদের উৎসাহ দিয়েছেন । কারণ দান-সাদাকা করলে আল্লাহর রোষ প্রশমিত হয়, আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়, গোনাহ মোচন হয়, আল্লাহ জান-মাল হেফাযত করেন, ব্যক্তির বিপদ-আপদ দূর হয়, দান-সাদাকায় সওয়াব বৃদ্ধি হয়, সম্পদের বরকত হয়, জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ হয়, মৃত্যুর পরেও দান-সাদাকার সওয়াব জারী থাকে এবং মহান আল্লাহ পরকালে আরশের ছায়ায় স্থান দেন ইত্যাদি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দানের মাধ্যমে মহান আল্লার প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে; যিনি আমাদের অর্থ সম্পদ অর্জন ও ভোগের সুযোগ দিয়েছেন। তাঁর সুযোগ প্রদানের কারণেই অনেকেই আমরা স্বাবলম্বী বা অবস্থা সম্পন্ন; এটা মহান আল্লাহর একান্ত মেহেরবাণী ও দয়া। এমনও তো হতে পারতো আমাদের তিনি ভিন্ন পরিবেশে দুনিয়ায় আগমন ঘটাতে পারতেন। বরং তিনি তা না করে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আমাদের অনেক বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা উপভোগের সুযোগ দিয়েছেন। তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটবে তার দেওয়া সুযোগের উপর ভিত্তি করে অর্জিত সম্পদ যখন আল্লাহর রাস্তায় সাধারণ অনাহারি লোকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। আমরা ধর্মীয় চেতনা থেকে এতোটাই গাফিল যে, এত কোরআন ও হাদীসের নির্দেশনার পরও মানুষ অজ্ঞতার কারণে দান-সাদাকাহ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। অথচ ঐচ্ছিক ছাদাকাহ প্রদানে ছাওয়াবেরই অংশ বেশি,যদিও অধিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দান না করাতে গুণাহ আছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এটাই বলা যেতে পারে যে, বাধ্যতামূলক ছাদাকাহ (যাকাত) এর ব্যাপারে গুণাহমুক্তি, সম্পদের প্রবিত্রতা অর্জন এবং ঐচ্ছিক ছাদকার ব্যাপারে ছাওয়াব অর্জনের প্রাধান্যই বেশি।

আজকের করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীর গতি শ্লথ হয়ে মানুষ কোয়ারাইন্টাইনে নিজ নিজ বাড়ী-ঘরে জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত। সমাজের নিম্ম আয়ের মানুষ চরম অর্থ সঙ্কটে, তীব্র দারিদ্রতার কষাঘাতে চরম দূর্বিসহ জীবন-যাপন করছে। নিম্ম মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা অন্যের কাছে অভাবে হাত পাততে পারে না, তাদের অবস্থা আরো করুণ। দিন মুজুর ও ‘কাজ আছে, খাবার আছে; কাজ নেই খাবার নেই’- এ শ্রেণির মানুষের কোয়ারাইন্টানে বন্দি জীবনে আয়- রোজগারের চাকা একবারেই বন্ধ। কি এক ভয়াবহ দূর্বিষহ জীবন-যাপন তারা করে যাচ্ছে। এর চেয়ে ভয়াবহ খবর হলো, ব্রাকের গবেষণা মতে, দেশে এখন ১৪% মানুষের ঘরে কোনো খাবার নেই। সরকার কিছু ত্রাণের ব্যবস্থা করেছে। কিছু কিছু জায়গায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে আলোকিত কিছু মানুষ প্রতিবেশী গরীবদের সহযোগিতা করছে। প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা ও আয়োজন যথেষ্ট অপ্রতুল; তাই প্রয়োজন স্বাবলম্বি ও ধনীদের এ কঠিন সময়ে অসহায় আত্মীয়-স্বজন ও অভাবী প্রতিবেশীদের পাশে সাহায্যের হাত বাড়ানো ও অসহায়দের সাহার্য্যার্থে সামাজিকভাবে গঠনমুলক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

দুর্দিনে মানুষের প্রতি আন্তরিকতার সাথে প্রদত্ত এই দান-সাদাকাহ কিয়ামতের কঠিন সময়ে নাজাতের উসিলাহ হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! আমার দেওয়া রিজিকের কিয়াদাংশ দান করে দাও এমন এক মহা সংকটপুর্ণ দিন আসার পূর্বে যে দিন না কোন বেচা কিনা চলবে, না কোন বন্ধুত্ব কাজে আসবে এবং আল্লাহর অনুমতি ভিন্ন না কোন সুপারিশের সুযোগ হবে।’ (২:২৫৪) দানের ব্যাপারে উৎসাহিত করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘এবং তোমরা যারা আল্লাহর রাস্তায় দান করবে, উহার প্রতিদান তোমাদিগকে পুরাপুরি দেয়া হবে। আর তোমাদের প্রতি কোনপ্রকার জুলুম করা হবে না।’ (৮:৬০) দান করলে ব্যক্তির সম্পদ অনেকগুন আল্লাহ তায়ালা বাড়িয়ে দেন। যেমন তিনি বলেন- ‘আল্লাহ তাআলা সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং সাদাকা কে বর্দ্ধিত করে দেন।’ (২: ২৭৬) এ উক্তি আখেরাতের দিক দিয়ে তো সম্পূর্ণ পরিষ্কার; সত্য উপলব্ধির সামান্য চেষ্টা করলে দুনিয়ার দিক দিয়েও সুস্পষ্ট। কারণ সুদ ও জুয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই অজস্র পুঁজির মালিক কোটিপতি দেখতে দেখতে দেউলিয়া ও ফকিরে পরিণত হয়। মানুষকে দান করা অসাধারণ এক অনবদ্য পবিত্র কাজ। এ জন্য দানের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে দয়াময় আল্লাহ অসাধারণ উপমা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেনঃ ‘যারা আপন ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে তাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ দানার মত, যেখান হতে এরূপ সাতটি ছড়া বের হলো যার প্রত্যেকটিতে একশত করে দানা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (২: ২৬১) এ আয়াতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবগ্রস্থ, দীন-দুঃখীদের জন্য ব্যয় করার শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এত করে সম্পদের প্রবৃদ্ধি বাড়াবেন তিনি সীমাহীনভাবে।

আরও দেখুন:  সোশাল মিডিয়া ডিসটেন্স বজায় রেখে মাহে রমজানে তাক্বওয়ার পরিচর্যা করি

এ ভাবে দান-সাদাকাহ নিয়ে আরো বলা হয়েছে যে কেয়ামতের বিপদে দান দাতাকে চিন্তামুক্ত করবে। তবে শর্ত হলো দান করে খোঁটা বা কটু কথা বলা যাবে না। আজ আমরা দেখি কোয়ারান্টাইনে আবদ্ধ গরিব মানুষকে ত্রাণের প্যাকেট দেওয়ার সময় ভিডিও করছে, সেল্ফি উঠাচ্ছে, দানে মাল গ্রহণের সময় ক্যামেরার দিকে তাকানো হয়নি এ জন্য ধমকাচ্ছে। এসব সত্যিকারভাবে সাদাকাহ বা দানের আদাব বা শিষ্টাচার নয়। ইসলামে অনেক ভদ্রতার সাথে দান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যারা তাদের মাল আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, অতঃপর দান গ্রহিতার প্রতি কোন প্রকার খোঁটাও দেয় না অথবা কটু কথাও বলে না, স্বীয় প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য প্রতিদান রয়েছে। কেয়ামতের দিন তাদের কোন ভয় নেই এবং কোন প্রকার চিন্তাযুক্তও হবে না।’ (২: ২৬২)

দান হলো পরোপকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নির্ভেজাল ভাবে দান করার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহকে খুশিকরার মাধ্যমেই ব্যক্তির তাকওয়ার প্রকাশ ঘটে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘এবং তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের তরফ হতে ক্ষমা প্রাপ্তির দিকে এবং এমন জান্নাতের দিকে দৌড়াতে থাক, যার প্রশস্ততা হবে সাত আসমান ও জমীনের সমতুল্য, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে এমন সব মোত্তাকীনদের জন্য যারা সুখ-দুঃখ উভয় হালতেই আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত করে থাকে এবং রাগ আসলে উহা হজম করে লয়; মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা পরোপকারী লোকদের ভাল বাসেন।’ (৩:১৩৩-১৩৪। যারা আল্লাহ তায়ালার পথে স্বীয় অর্থ সম্পদ ব্যয় করতে অভ্যস্ত, তাদের ব্যাপারে এখানে বলা হয়েছে। তারা স্বচ্ছল হউক কিংবা অভাব –অনটনে থাকুক, সর্বাবস্থায় তারা সাধ্যানুযায়ী মানুষের জন্য ব্যয় করে থাকে। বেশী হলে বেশী এবং কম হলে কমই ব্যয় করে। এতে এক দিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তিও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে নিজেকে মুক্ত মনে করবে না এবং সৌভাগ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে না। এর বরকতে আল্লাহ তায়ালা আর্থিক সচ্ছলতা ও স্বাচ্ছন্দ্য দান করবেন। অসহায়দের দানের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমার সৌভাগ্যও হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদিগকে অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়, আর আল্লাহ তাআলা দান করার বিনিময়ে ক্ষমা করা ও সম্পদ বৃদ্ধি করার ওয়াদা করেন। বস্তুতঃ আল্লাহপাক সমৃদ্ধিশালী, সর্বজ্ঞানী। (২:২৬৮)। যখন কারো মনে এ ধারণা জন্মে যে, দান-সাদাকাহ করলে ফকির হয়ে যাবে, বিশেষতঃ আল্লাহ তায়ালার তাক্বীদ শুনেও স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করার সাহস না হয় এবং আল্লাহর ওয়াদা থেকে মুখ ফিরিয়ে শয়তানি ওয়াদার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন বুঝতে হবে যে, এ প্ররোচনা শয়তানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে যদি মনে ধারণা জন্মে যে, দান-সাকাহ করলে গুনাহ মাফ হবে, সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং বরকত হবে, তখন মনে করতে হবে এ বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে। এমতাবস্থায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ। আল্লাহর ভান্ডারে কোনো কিছুর অভাব নেই। এভাবে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- ‘যারা স্বীয় ধন-সম্পদ রাত্রে এবং দিনে, গোপনে এবং প্রকাশ্যে দান করে থাকে তাদের প্রতিদান আপন প্রতিপালকের নিকট সুরক্ষিত থাকবে, আর তারা ভয়শূন্য ও চিন্তা মুক্ত থাকবে ‘। (২: ২৭৪) তবে শর্ত হলো খাঁটি নিয়্যাতে দান করতে হবে। নাম যশের নিয়্যাত থাকলে চলবে না। প্রকাশ্য দান করার কোনো প্রয়োজন দেখা না দেওয়া পর্যন্তই গোপনে দান করার শ্রেষ্ঠত্ব সীমাবদ্ধ। যেখানে এরূপ প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে প্রকাশ্যে দান করাই শ্রেয়। (মারিফুল কোরআন)

দান-সাদাকার ফাযায়েল সীমাহীন। দান সাদাকাহ বিপদ-মুসিবতকে দূরিভূত করে গোনাহ সমূহ মাফ করে। প্রিয় নাবী (সা.)বলেন- ‘সদকা দেওয়ার ব্যাপারে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ কর। কেননা মছীবত সদকাকে ফেড়ে অগ্রসর হতে পারে না। (মেশকাত) দানের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি পায়। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন- ‘সদকা সম্পদকে হ্রাস করে না, ক্ষমা করা দ্বারা আল্লাহ বান্দার ইজ্জত বৃদ্ধি করেন; আর কেউ আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে তাওয়াজ্জু বা বিনয় অবলম্বন করলে আল্লাহ তার মর্যাদাকে উঁচু করে দেন। (মুসলিম, তিরমিযি) দান পরকালে আত্ম রক্ষার উপকরণ হবে ও এ দানের প্রক্রিয়ায় অব্যস্থ ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা নিজেও দান করার প্রতিশ্রূতি দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন- হে আদম সন্তান! তুমি দান কর, আমি তোমাকে দান করব।’ (বুখারী, মুসলিম) হযরত আদি ইবনে হাতিম (রাঃ) বলেন যে, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি- তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সম্ভব একটা খেজুরের টুকরা দান করে হলেও জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা করুক। (বুখারী, মুসলিম)

আরও দেখুন:  আবেগ বনাম চিন্তাশক্তি

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সালাত, সাওমের পাশাপাশি অসহায়দের প্রতি মমতা ও অন্যের দুঃখে কাতর হওয়াও ঈমানের একটি অনুসঙ্গ। এর মাধ্যমে গুনাহ মুক্ত হওয়া যায় । যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, ‘নামায, রোযা, সদকা ও সৎ কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ (এ সব আমল) মানুষের পরিবার, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশী সংক্রান্ত গোনাহসমূহ মোচন করে দেয়।’ (বুখারী) তিনি আরো বলেন- (হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন) যে, রাসূল (সা.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি একটা খেজুর বরাবর সদকা করবে পবিত্র উপার্জন থেকে- আর আল্লাহ পবিত্র উপার্জন ব্যতীত কবুল করেন না, তাহলে আল্লাহ তার সদকাকে কবুল করবেন। অনন্তর সেটা বর্দ্ধিত করবেন, যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্বশাবককে লালন-পালন করে বড় বানাতে থাকে ( এভাবে আল্লাহ তার সদকাকে বৃদ্ধি করতে থাকেন) এমনকি তা পাহাড় সমান হয়ে যায়।’ (বুখারী, মুসলিম)

অভাবীদের দানের ক্ষেত্রে নারীদের ও সংযুক্ত করা হয়েছে। তাইতো আমরা দেখি- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, নবী করীম (সা:)  ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিতরের দিন বের হয়ে মহিলাদের কাছে গেলেন এবং (তাদের লক্ষ্য করে) বললেন, হে মহিলা সমাজ! তোমরা সদকা কর। কেননা, আমাকে দেখান হয়েছে যে, জাহান্নামের সিংহভাগ হল নারী। মহিলাগণ জিজ্ঞাসা করল, তার কী কারণ ইয়া রসূলুল্লাহ! তিনি বলেন, তার কারণ হল, তোমরা বেশী বেশী অভিশাপ দাও এবং স্বামীর না-শোকরী কর। (বুখারী)

আমরা যারা বিভিন্নভাবে অর্থ সম্পদ অর্জন করেছি, নিজেরাই জানি কতোটা বৈধভাবে আর কি পরিমাণ অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছি। আজকের কোয়ারাইন্টাইনের এ দিন গুলোতে নীরবে আত্মসমালোচনা করতে পারি নীরবে, ঠাণ্ডা মাথায়। প্রত্যেকটি বিষয়ই মহান আল্লাহর কাছে পরকালে জবাবদিহী করা লাগবে। সুতরাং এ দুর্যোগে নিকট আত্মীয় ও গরীব প্রতিবেশীদের দানের মাধ্যমে কিছুটা পাপমুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এত করে আমাদের মৃত্যু অনেক সহজ হতে পারে । যেমন হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, নবী (সা.) বলেন- দান আল্লাহ তায়ালার রোষ প্রশমিত করে এবং খারাপ মৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিযী) শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে মৃত্যুর পরও সাওয়াব জারি থাকবে কবরে। আর তাইতো হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, নবী করীম (সা:) বলেন- ‘যখন মানুষ মারা যায়, তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল (এর সওয়ব) বন্ধ হয় না। তা হল- সদকায়ে জারিয়া, ইলম-যা দ্বারা অন্যরা উপকৃত হয় এবং তার নেককার সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।’ (মুসলিম, তিরমিযী) এ দান সাদাকাই পরকালে ছায়া হবে। হযরত মারছাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ‘আমাকে নবী (সাঃ) এর জনৈক সাহাবী বলেছেন যে, তিনি নবী (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, কেয়ামতের দিন মুমিনের ছায়া হবে তার দান-সদকা।’ (মুসনাদে আহমদ, সহীহ ইবনে খুযায়মা)

ভাবুনতো, অসহায় লোক যাদের কোনো কাজ নেই, কোনো উপার্জনের সুযোগ নেই, ঘরে বন্ধি ঐ সব খেটে-খাওয়া মানুষের পরিবারের সমস্যদের দৈনন্দিনের খাবারের চাহিদা কিভাবে মিটাবে? মানুষ সামাজিক জীব। একা কখনো চলতে পারে না। মানবিক কারণে তাই সকল অবস্থা সম্পন্ন লোকদের সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিৎ। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘যে কোন মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে বস্ত্র দান করবে, আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের সবুজ কাপড় পরিধান করাবেন। যে কোন মুসলমান অন্য কোন ক্ষুধার্ত মুসলমানকে আহার করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল থেকে আহার করাবেন। যে কোন মুসলমান অন্য কোন পিপাসার্ত মুসলমানকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাকে ‘রহীকে মাখতুম’ থেকে পান করাবেন।’ (আবু দাউদ) শুধু তাই নয় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আমি নবী (সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, ‘যে কোন মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে কাপড় পরিধান করাবে, সে আল্লাহর হেফাজতে থাকবে যতক্ষন পর্যন্ত সেই কাপড়ের একটি টুকরাও তার শরীরে থাকবে।’ (তিরমিযী)

দান করলে ন্যাচারালী নিজেরই মনোজাগতিক প্রশান্তি তৈরী হয়, স্বচ্ছন্দবোদের হিমেল হাওয়া বয়ে যায়  দেহ মনে। সুখে থাকার এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরী হয়। আল্লাহর দানের ভাণ্ডারও উম্মুক্ত হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য। এটাই জান্নত লাভের মাধ্যম। হযরত আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘(হে আসমা!) তুমি দান করতে থাকবে এবং হিসাব করবে না। অন্যথায় আল্লাহও তোমাকে দেয়ার ব্যাপারে হিসাব করবেন। আর (সম্পদ) ধরে রাখবে না, অন্যথায় আল্লাহ তোমার ব্যাপারে ধরে রাখবেন। তোমার শক্তি অনুসারে সামান্য হলেও দান করবে।’ (বুখারী, মুসলিম) আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘আল্লাহর ইবাদত কর, (দরিদ্রকে) খাদ্য দান কর এবং উচ্চ শব্দে সালাম কর। নিরাপত্তা সহকারে জান্নাতে প্রবেশ কর।’ ( তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)

আরও দেখুন:  মাস’আলা বর্ণনার ক্ষেত্রে একজন আলেমের কেমন কল্পনাশক্তি থাকা চাই

করোনা ভাইরাসের এ মহামারিতে আমরা সকলে আজ আতঙ্কিত। যে কোনো সময়ে নিজেরা আক্রান্ত হতে পারি।  দান-সাদাকার মাধ্যমেই বিপদ দূরিভূত হওয়ার কথা হাদীসে ঘোষিত হয়েছে। একটি হাদীসে আছে- রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘তোমরা সদকা কর এবং সদকা দ্বারা রোগীর রোগ চিকিৎসা কর। কেননা, সদকা রোগ এবং বালা-মুসিবত দূর করে এবং আয়ু ও নেকী বৃদ্ধি করে।’ (বায়হাকী) এবং হযরত হারেছা ইবনে নোমান (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘মিসকীনকে নিজ হাতে দেয়া খারাপ মৃত্যু হতে রক্ষা করে।’ (তাবারানী, বায়হাকী, জামে সগীর)

আত্মীয়কে সদকা করার সওয়াব অনেক। করোনার এ দুর্যোগে নিজের গরীব আত্মীয়দের দানের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। কেননা হযরত সালমান ইবনে আমের (রাঃ) বলেন যে, রাসুল (সাঃ) বলেন- ‘সাধারণ অভাবীকে সদকা করা দ্বারা শুধু সদকার সওয়াব পাওয়া যায়, আর আত্মীয়-স্বজনকে সদকা করা দ্বারা দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়- সদকার সওয়াব ও আত্মীয়তা সুরক্ষার সওয়াব।’ (তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ) এভাবে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেনঃ ‘যখন কোন মুসলমান সওয়াবের নিয়তে তার আল-আওলাদের প্রয়োজনে ব্যয় করে, তখন তা (আল্লাহর নিকট) সদকা হিসাবে গণ্য হয়।’  (বুখারী, মুসলিম) রাসূল (সা.)  আরো বলেছেন- হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘মানুষের ব্যয়কৃত দীনারের মধ্যে সর্বোত্তম দীনার হল তা, যা সে তার পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করে, আর জিহাদের উদ্দেশ্যে রক্ষিত পশুর জন্যে ব্যয় করে এবং জিহাদরত তার সঙ্গীদের জন্যে ব্যয় করে।‘ (মুসলিম) নিজের পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়কে দানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ। হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেনঃ ‘কোন পুরুষ নিজের উপর, নিজের সন্তান-সন্তুতির উপর, নিজ পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের উপর যা ব্যয় করে সেসব তার জন্য সদকা।’ (তাবরানী, মাআরিফুল হাদীস)

যে যেখানে আছি, যার যা আছে সাধ্যমতো অসহায় প্রতিবেশীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো দরকার। অল্প হউক, বেশী হউক। ইচ্ছা ও পরিশুদ্ধ আন্তরিকতাই গুরুত্বপূর্ণ ও আল্লাহর দরবারে কবুলের অন্যতম শর্ত । কেননা কোন সাদাকাহ উত্তম তা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, তিনি রাসূল (সা.) এর নিকট আরজ করেন, ইয়া রসূলুল্লাহ (সাঃ)! কোন সদকা উত্তম? তিনি বললেন, সে সদকা উৎকৃষ্টতম সদকা, যা গরীব ব্যক্তি আপন উপার্জন থেকে করে। আর প্রথমে তাদের উপর ব্যয় করে সে যাদের জিম্মাদার (অর্থাৎ আপন স্ত্রী ও সন্তানাদির উপর) (সুনানে আবু দাউদ, মাআরিফুল হাদীস) এ ছাড়াও দানের গুরুত্ব ও কোন অবস্থার দান উত্তম এ সম্পর্কে রাসূলের আরো অনেক নির্দেশনা রয়েছে।  হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)  এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! কোন অবস্থায় দান ফলাফলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম? রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমার সুস্থ ও উপার্জনক্ষম অবস্থার দান। যখন তোমার দরিদ্র হওয়ারও ভয় থাকে এবং ধনী হওয়ারও আশা থাকে। তুমি নিয়তই দান-খয়রাত করতে থাকবে। এমনকি তোমার প্রাণ গ্রীবাদেশে পৌঁছা পর্যন্ত বলতে থাকবে অমুকের জন্যে এটা, অমুকের জন্যে এটা; আর তোমার বিশ্বাস আছে যে, তা পৌঁছান হবে। (বুখারী, মুসলিম)

এ বিপদেও যারা সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়াবে না তাদের উদ্দেশ্যে শুধু এ টুকু বলতে চাই, আসলে দাতা ও কৃপণ ব্যক্তি সম্পর্কে হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আপনি ভাবলে অবাক হবেন। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘যখনই আল্লাহর বান্দারা প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে, তখনই দুজন ফিরিশতা অবতীর্ণ হন। তন্মধ্যে একজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! তুমি দাতা ব্যক্তিকে প্রতিদান দাও। আর অন্যজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! তুমি কৃপণ ব্যক্তিকে লোকসান দাও ‘ (বুখারী, মুসলিম) অন্য হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘দাতা ব্যক্তি আল্লাহরও নিকটে, জান্নাতেরও নিকটে, মানুষেরও নিকটে; অথচ জাহান্নাম থেকে দূরে। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ থেকেও দূরে, জান্নাত থেকেও দূরে, মানুষ থেকেও দূরে; অথচ জাহান্নামের নিকটে। নিশ্চয়ই মূর্খ দাতা, কৃপণ ইবাদাতকারীর চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’ (তিরমিযী)

করোনা মহামারির এ সময়ে গরীব-দুঃস্থদের মাঝে আর্থিক ও খাদ্য সামগ্রি দেওয়া অধিক প্রয়োজন ও যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা কখনও নেকীর মধ্যে পূর্ণতা হাসিল করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা নিজেদের প্রিয় জিনিস হতে কিছু খরচ না করবে।’ (৩:১৯২) তাই আসুন সাধ্যমতো প্রাণ খুলে হাত প্রশস্থ করে গভীর মমতা দিয়ে নিরন্নের পাশে দাড়াই। এ দানেই পরকালে নাজাতের যারিয়াহ হবে।

মহান আল্লাহ বিশ্বকে, আমাদের দেশকে  এবং আমাদের সকলকে করোনার এ ভয়াবহ মহাবিপদ থেকে রক্ষা করুন এবং করোনা মহামারির ক্রান্তিকালে বেশী থেকে বেশী দান-সদকা করার তৌফিক দিন! আমিন।

 

– মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ।

পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button