পাঠকের পাতা

অতঃপর প্রত্যাগমন

শৈশবের সন্ধ্যা অবসরে তারা গুনতে গুনতে আকাশে বিচরণরত নক্ষত্ররাজির দীপ্তশিখা হৃদয়ে বাজায় ছন্দের প্রলয় দোলা। মনের গহীন অরণ্যে উঁকিঝুঁকি দেওয়া কবি হওয়ার বাসনায় গুনগুনিয়ে অগোছালো শব্দগুচ্ছ কিছুটা প্রশান্তি র ভেলায় সুপ্ত হাসিকে জাজ্বল্যমান করে। মন কখন কখনো হারিয়ে যায় দিগন্তরেখার অসীম শূন্যতায়।

সকালের নিস্তব্ধতার অবসানে কোলাহলময়তা ভেঙে দেয় ঘুমের আড়ষ্টতা। ভোরের পাখির কলকাকলিতে শিহরিত মন উড়ে চলে স্নিগ্ধ সমীরণে। পুকুরের জলে ফ্রেশ হতে হতে নিজেরই প্রতিচ্ছবি মোহময় দৃশ্যপটে একে দেয়। মুখাবয়বে তাওয়ালের আলিঙ্গন শেষে দর্পণের সম্মুখে নিজেকে চিত্রগ্রাহী করার দুর্নিবার প্রয়াস। কল্পনার প্রতিবিম্বরে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার এক অদম্য অভিলাষ।

খাবারের মোহময় গন্ধে ডাইনিংয়ে ছুটে গিয়ে পরিশ্রান্ত মায়ের জন্য হৃদয়ে ক্লেশের ঢেউ আসেনা। মায়ের মায়াবী হাতে খাবারের টেবিলে সাজানো স্বর্গীয় মমতায় আবিষ্ট মেনুগুলো ভরাতে পারে না সন্তানের ভোজন পিয়াসী মন।

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্বপ্নময় ক্যারিয়ারের সুউচ্চ সোপানে আরোহণের অভিপ্রায়ে বিদ্যাপীঠে যাত্রা। যেতে যেতে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ বন্ধুদেরকে রাতের স্বপ্নগুলো শেয়ারিং হৃদয়ে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। সুবিস্তৃত বিদ্যায়তনের ক্যাম্পাসে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে রচিত হয় দুরন্তপনার উল্লাসিত গদ্যপদ্য। বাংলা টিচারের অদ্ভুত চিত্তাকর্ষী শব্দশৈলী দোলায়িত মনকে সাঁতার কাটায় কাব্যময় জীবনে। অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি ভাবনার করিডোরে শৈল্পিক অবয়বে ধরা দেয়। ইংরেজি ক্লাসে স্যারের অবারিত ইংরেজি উপস্থাপনা আর দীপ্তিময় ক্যারিয়ারের জন্য ইংরেজি বন্ধনা এই ভাষাটার প্রতি ভালোবাসা উপচে না পরার জো নেই। উন্নতির চরম শিখরে আরোহীত অধুনা বিশ্ব হেতু বিজ্ঞান ক্লাসটিতেও মনোযোগের বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটে না। কিন্তু ধর্মকে সেকেলে ভাবা উসখুস মন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ফিরে আসে নিজ নীড়ে।

দুপুরে মৃদু ঢেউ খেলানো পুকুরের শীতল জলে সাঁতরাতে সাঁতরাতে উপভোগ্য হয়ে ওঠে মাছের ছুটে চলা। স্নিগ্ধ সমীরণে চারদিকের সবুজ পত্র পল্লব যেন অভিনন্দিত করে জীবনকে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিও সঙ্গীতময় কলরবে মুখরিত।

সারাদিনের দুরন্তপনায় কিছুটা ক্লান্ত দেহকে প্রশান্তি দিতে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া। হেডফোন কানে লাগিয়ে শখের মোবাইলে FB পোস্টে চোখ বুলানো নৈমিত্তিক অভ্যাস। জীবন বাস্তবতা এবং আবেগিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফেসবুকের বিপরীতধর্মী পোস্ট এবং কমেন্টের ছোড়াছুড়িতে দোদুল্যমান মন খুঁজে পায় না সত্যি মিথ্যার কিনারা। অযাচিত পোস্ট কমেন্ট এর ভাবার্থ নিজের মনটাকে বিভ্রমাত্মক ভাবনার সাঁতারে নিমজ্জিত করে। গোছালো মনটা সর্পিল গতিতে দোল খেতে খেতে অগোছালো হতে থাকে। হাজারো কল্পরাজ্য বিচরন শেষে হৃদয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত শূন্যতা।

আরও দেখুন:  আমরা কিভাবে রামাদানের প্রস্তুতি নিব?

হৃদয়ে অবারিত স্বপ্নজাল খুঁজে ফেরে জীবনের মানে। ক্লান্ত জীবনের অলস ক্ষণে ভাবনার গহীন থেকে গহীনে অজস্র পংক্তিমালা জড়ো হতে থাকে। বৈচিত্র্যময় ধরায় বিচিত্র মানুষের ছুটে চলার জীবন সঙ্গীতে কারো জীবন বিলাসী, কারো বিষাদময় আবার কারো করুণ আর্তনাদ ডুকরে কাঁদে নীরবে নিভৃতে।

দিনাবসানে চারদিকের ব্যস্ততা সন্ধ্যার আবছা আলোয় ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হতে থাকে। জ্যোৎস্না স্নাত রাতে ধূসর মনটাকে কিছুটা আয়েশে ভরিয়ে দিতে জোস্না বিলাসে বেরিয়ে পরা। সুদূর শুন্যতায় চাঁদের আভা বিষন্ন মনকে আনন্দের হিল্লোলে হিল্লোলিত করে। কল্পলোকের স্বপ্নবাসরে ভাসতে ভাসতে কখনো হারিয়ে যাওয়া বহমান নদীর কলতানে, কখনো ঘন অরণ্যে যেখানে সুর বিহঙ্গেরা ডানা ঝাপটিয়ে নিজেদেরকে মেলে ধরে, কখনোবা মহাশূন্যে অভিযাত্রিক হয়ে তারকারাজির আলোর বিচ্ছুরণকে অবলোকন করতে।

হঠাৎ করেই ঘরের বাতি নিভে যাওয়ায় আনন্দের ভেলায় ভেসে বেড়ানো ভাবনায় ব্রেক কষে। আকস্মিক নিভে যাওয়া বাতির পর্যবেক্ষণে পাওয়া গেল ফিলামেন্ট কেটে গেছে। ছন্দপতনের খেয়ালি মন কিছুটা অন্যমনস্কতায় আবার জোস্নালোকে বসা।

আন্দোলিত এক নতুন ভাবনা হৃদয়ে কম্পনের প্রবাহ জাগায়। শত সহস্র প্রশ্নবানে হৃদয় প্রকোষ্ঠে ঢেউ খেলতে থাকে। বাতির ফিলামেন্ট কেটে যায় কিন্তু লক্ষ কোটি বছর অবিরাম আলোর ফোয়ারা প্রবাহিত করা চন্দ্র-সূর্য তো একটিবারের জন্যও নষ্ট হয় না।ঘূর্ণায়মান গ্রহ-নক্ষত্র যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেকেন্ডের জন্য থেমে যায় না। কি এমন অলৌকিক শক্তি যা এই মহাবিশ্বকে সুশৃংখলতায় আবদ্ধ রেখেছে? নিরন্তর প্রবাহমান এই শক্তির উৎসইবা কোথায়? নিশ্চয়ই এটা এমন এক শক্তি যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক একচ্ছত্র অধিপতির নিয়ন্ত্রণে।

বেলা অবেলা জীবন এবং প্রকৃতি নিয়ে ভাবুক মন খুঁজে ফেরে জীবন এবং প্রকৃতির শাশ্বত নিয়ন্ত্রককে। চপল জীবনে সৌন্দর্যের উদ্দামতায় সুখ অন্বেষী অভিযাত্রী খুঁজে পায়____

“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম অবয়বে।” (সূরা ত্বীন-৪)

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রুপ-লাবণ্যে মুখরিত প্রশান্তি পিয়াসী চোখে ধরা দেয়_____

“দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোন খুত দেখতে পাবেনা, তোমার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, কোন ত্রুটি দেখো কি? আবার দেখো, আবারো। তোমার দৃষ্টি তোমারই দিকে ফিরে আসবে ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে।” (সূরা মূলক: ৩,৪)

আরও দেখুন:  আদম ও হাওয়া (আঃ) -এর তাওবাহ-ইস্তিগফার : আমাদের শিক্ষা

জীবন নামের অন্তহীন পথে ব্যাকুল মন খুঁজে পায় মহা মহিম স্রষ্টাকে____

“দয়াময় আল্লাহ তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।”(আর রহমান ১-৪)

অতঃপর খুঁজে পাওয়া শৃঙ্খলাময় নতুন জীবনে এক হিরণ্ময় প্রত্যাগমন।

লেখক: সাদেকুর রহমান সাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button