জীবনের বাঁকে বাঁকে

শিক্ষা

অভিজ্ঞতার ঝুলিটা আজ আরেকটু সম্বৃদ্ধ করে দিলেন আমার প্রভু। ভারতে বসবাসকালীন সময় একবার এক পাকিস্তানী হিন্দুর সাথে পরিচয় হয়, তা প্রায় পঁচিশ বছর আগে। আজ পরিচয় হল এক পাকিস্তানী ইহুদির সাথে। মুসলিমপ্রধান দেশটিতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের দেখা পাওয়া খুব একটা সচরাচর ব্যপার নয়। কিন্তু এই মোলাকাতটি মনে লাগার আরো কারণ রয়েছে।

প্রিন্টিং ও ফটোকপিয়িংয়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিলাম। দাঁড়িয়ে ছিল আরো অনেকে। মালয়রা এমনিতেই গা-ছাড়া স্বভাবের। ঈদের মৌসুমে ওরা আরো ঢিল দিয়েছে। আমার পাশে দাঁড়ানো এক মহিলা অন্তত পনেরোবার ডাকলেন, ‘ব্রাদার, আমার পেনড্রাইভটা দিন, আমি চলে যাই’। কে শোনে কার কথা? পরিমাণে প্রচুর হলেও আমার প্রিন্টিং এবং ফটোকপির কাজগুলো ভালই এগোচ্ছিল। বাগড়া লাগল কয়েকটা রঙ্গিন ছবি প্রিন্ট করতে গিয়ে। বাংলাদেশে আমাদের এই কাজগুলো করে দিত পিয়নরা, ক্যানাডায় করতাম আমরা নিজেরা। মালয়শিয়াতে আপনি কম্পিউটারে প্রিন্ট অর্ডার দেবেন, কিন্তু প্রিন্ট হবার পর এনে দেবে দোকানের লোকজন। রঙ্গিন প্রিন্টার যেটা সেটাতে কিছুতেই প্রিন্ট অর্ডার নিচ্ছেনা। দোকানের লোকজনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার পেছনে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক এসে কিছুক্ষণ সাহায্য করার চেষ্টা করলেন। কাজ হলনা। তবু তাকে ধন্যবাদ জানালাম। এতগুলো কাজ নিয়ে এসেছি বলে দুঃখপ্রকাশ করলাম। এমন সময় আরেকটা কম্পিউটার খালি হতে দেখে তাঁকে সেদিকে নির্দেশ করে কম্পিউটার দখল করে রাখার ব্যপারে কিছুটা হাল্কা বোধ করলাম। দোকানদারের দয়ার অপেক্ষায় তাঁর সাথে ভদ্রতাসূচক কিছু বাক্যবিনিময় হল।

ভদ্রলোক মাঝবয়সী, দীঘলদেহী, মাঝারীরকম লম্বা কাঁচাপাকা দাঁড়ি। স্ত্রী সালোয়ার কামিজ হিজাব পরিহিতা, একটু দুরে আরেকটা কম্পিউটারে প্রিন্ট নিচ্ছিলেন। বাচ্চা ছেলেটা এই গরমেও ফুলপ্যন্ট পরা। জিজ্ঞেস করলাম বাড়ি ভারতে কিনা। বললেন, ‘না আমি পাকিস্তানী। ইহুদী। আমার বাবামায়ের বাড়ি ছিল প্যালেস্টাইন। কিন্তু তাঁরা হিজরত করে পাকিস্তান চলে আসেন। এখন তাঁরা পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাস করেন। প্রয়োজন ব্যতীত লোকালয়ে আসেন না। আমি এবং আমার স্ত্রী উভয়ে লাহোরে একটি টেকনিকাল ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতা করি। বয়স হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর পাল্লায় পড়ে এখন আমরা উভয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়শিয়াতে পি এইচ ডি করছি’।

আরও দেখুন:  নিজের পথ নিজে গড়ি

ক্যানাডায় বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম এবং সংবাদ দেখেছিলাম। ইসরাইলে ইহুদীদের দুটি শ্রেণী রয়েছে। এদের একাংশ ধার্মিক এবং একাংশ রাজনৈতিক। যারা ধার্মিক তাঁরা বিবেকবান এবং ইসরাইলের রাজনৈতিক সম্প্রসারণবাদের বিরোধী। তাঁরা শুধু মৌখিকভাবে বিরোধিতা করেই কর্মসম্পাদন করেন না বরং এই বিষয়ে সোচ্চার। এদের সন্তানদের মধ্য থেকে এক হাজার পাইলট সরকারের নির্দেশ সত্ত্বেও কোনপ্রকার ফিলিস্তিনি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবেনা ঘোষনা করে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। তাদের অভিভাবকরা তাদের সমর্থনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইসরাইলের ফিলিস্তিন বিষয়ক নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে। এসব খবর দেখেছি আর ভেবেছি আমরা তো প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও রাখিনা! জেনেছি অনেক ইহুদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের স্বপ্নপূরণ হয়নি এই দুঃখে ঐ ভূখন্ড ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন অন্যত্র। তাঁরা এই অন্যায়ের কোন ভাগ চাননা। তাদের একজনের দেখা পেয়ে যাব ভাবিনি কোনদিন। ক্যানাডায় দেখেছি ইহুদী সহকর্মীদের মাঝে যারা ধার্মিক ছিলেন তাঁরা কখনো মহিলাদের সাথে হ্যান্ডশেক করতেন না, হালালের ব্যপারে আমাদের অনেক মুসলিম কলিগদের চেয়ে ছিলেন অনেক বেশি সাবধান। এরা কাজের ব্যপারে অত্যন্ত আন্তরিক হতেন এবং লেখাপড়ার ব্যপারে অগ্রসর। অবশ্য যারা অধার্মিক ছিলেন তাদের কাহিনী পুরোই আলাদা।

কথাপ্রসঙ্গে বললাম বাবা ছোটবেলায় পাকিস্তানে পড়াশোনা করেছে, তারপর তো দেশবিভাগ হয়ে গেল। তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে যা করেছে সেজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। এমনটা হওয়া কিছুতেই কাম্য ছিলোনা। পাকিস্তানে আজও যারা ১৯৭১ এ সঙ্ঘটিত যুদ্ধ বিষয়ে হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের ব্যপারে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে আমি তাদের একজন’। বাকহারা হয়ে গেলাম। শুধু বলতে পারলাম, ‘আপনার তো তখনোও জন্ম হয়নি, হলেও হয়ত মায়ের কোলে দোল খাচ্ছিলেন। আপনি কেন নিজেকে দায়ী করছেন?’ কিন্তু আসলে আমি অনেক বেশি আপ্লুত বোধ করছিলাম। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তী প্রজন্ম, আমাদের দাদাদাদী নানানানীরা আমাদের রূপকথার পরিবর্তে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতেন। আমাদের আত্মীয়স্বজন মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের জন্য প্রশংসিত হতেন, অহংকার করে নিজেদের আহত হবার কাহিনী বলতেন, নিহত বন্ধুজনের গল্প করতেন। আজ ৪৭ বছর পর এই নিয়ে অনেক আলোচনা গবেষণা তর্ক বিতর্ক অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় গণমানুষের মনের অনুভূতিগুলোকে আমাদের মত করে আর কেউ উপলব্ধি করার সুযোগ পায়নি। আমার ছোট ভাইরাও নয়। মনে হল, আমার দাদা দাদী নানা নানী উপস্থিত থাকলে মনে প্রশান্তি অনুভব করতেন। মনে হল, সৎ চিন্তার ধারণকারী বাবামা সৎ চিন্তার বাহক সন্তান গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা যেমন ইসরাইলের অন্যায়ের বিরোধিতা করেছেন, তাদের সন্তান পাকিস্তানের অন্যায়ের বিরোধিতা করেছেন। আমরা কি আমাদের সন্তানদের এভাবে গড়ে তুলতে পারব?

সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যপার হল, আরব ক্রিশ্চানরা যেমন সালাম বিনিময় করে; ‘ইনশা আল্লাহ’, ‘মাশা আল্লাহ’ ইত্যাদি শব্দাবলী স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করে; তিনিও দেখলাম স্বাভাবিকভাবেই সালাম দিলেন, ‘আবার দেখা হবে ইনশা আল্লাহ’ বলে বিদায় নিলেন। দুঃখ হল তাঁরা সত্যের এতটা কাছাকাছি থেকে কেবলমাত্র আভিজাত্যের অহমিকাবোধের কারণে সত্যকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। তিনি নিজের নামটি পর্যন্ত বলেননি, কিন্তু তাঁর পরিচিতির দ্বিতীয় অংশটিই ছিল তাঁর ধর্মীয় পরিচয়। অথচ ক্যনাডায় প্রচুর বাংলাদেশীদের দেখেছি বাঙ্গালীত্ব এবং ইসলামের সকল চিহ্ন মিলিয়ে দেয়ার জন্য সে কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা!

আরও দেখুন:  কিছু চাওয়া কিছু পাওয়া

এজন্যই পশ্চিমে অবস্থানরত ইসলামিক স্কলাররা বলেন, ‘যারা এসব দেশে থাকতে আগ্রহী, সেসব মুসলিমদের উচিত এসব দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। তাদেরই এসকল দেশে থাকা উচিত যারা এসকল দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়’। কারণ প্রথম শ্রেণীর লোকজন দুই এক প্রজন্মের পর ইসলাম থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমার এক ঈজিপশিয়ান-ক্যানাডিয়ান সহকর্মী ছিল। আপনারা হয়ত জানেন এদের অনেকেই দেখতে পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গদের মত। শুভ্র ত্বক, সোনালী চুল। সে বিয়ে করেছিল এক শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে। সুখে সংসার করছে দুই বাচ্চা নিয়ে। বসের সাথে, বন্ধুদের সাথে নিয়মিত পানশালায় যাতায়াত, মদ্যপান। একদিন কথাটা এক মিটিংয়ে আমার সামনে প্রকাশ হয়ে গেলে সে কেন যেন প্রচণ্ড লজ্জা পেল, লজ্জায় গাল গলা লাল হয়ে গেল। পরে কিচেনে কফি বানাতে গিয়ে দেখা হলে সে হঠাত অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলল, ‘আমার মা কিন্তু জুমায় যায়’। আমি বললাম, ‘বেশ, ভাল কথা। তুমি নামাজ পড় কিনা’। সে বেশ লজ্জা লজ্জা চেহারা করে বলল, ‘আমি নামাজ পড়তে জানিনা’। তারপর আর কথা খুঁজে না পেয়ে বলল, ‘তোমাদের তো কদিন আগে ঈদ গেল, হ্যাপি ঈদ’। কোনক্রমে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল কিচেন থেকে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, ‘আহা, ছেলেটা ঈদে কি বলতে হয় সেটাও শেখেনি। এই দায় কার?’

– Rehnuma Bint Anis

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

২টি মন্তব্য

  1. Is the writer is a girl or a boy? If it is writing from a female writer than please don’t brainwash Muslims girls to work with man in the same place in a non-Muslim country with non-muslims men by provoking Islam. Boys and girls cant work together according to the sunnah. If the writer is a boy than would like to request him to find a Halal place for him to work where boys and girls don’t work togather. This site should stop publish his all absurd stories. Sorry can’t accept this site publish this type of stories that can misguide thousands of innocent Islamic minded boys and girls.

মন্তব্য করুন

Back to top button