জীবনের বাঁকে বাঁকে

আমার শিক্ষক এবং সংগ্রাম

জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া কিছু মানুষের কথা প্রায়ই মনে পরে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মোল্লা স্যার। স্যারের পুরা নাম আজও জানি না, তবে তিনি এই নামেই পরিচিত ছিলেন। ওনার কথা বলার আগে আমাকে বিশাল ইতিহাস বলতে হবে। অবশ্য তা বলার জন্যই আজকে লিখতে বসা।

বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের যাবার সুযোগ হয়েছে। ১৯৯১ সালে বাবার পোস্টিং ব্রাহ্মণবাড়িয়া । ওখানকার একটা প্রাথমিক স্কুলে আমাকে ভর্তি করানো হলো। আর আমার বড় বোন ভর্তি হলো একটি হাই স্কুলে। আমার মা ছোট বোন আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত তাই আমার জন্য আমার স্কুলেরই একজন শিক্ষিকাকে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। আমার স্কুলের প্রথমদিন খারাপ গেলো না।

সহপাঠীদের কথা আজও মনে পড়ে। সাদেকা, বাশুড়ি, বুড়ি এরা আমার বান্ধবী ছিল। না জানি তারা এখন কে কোথায়! স্কুল ভালো লাগলেও আমার গৃহশিক্ষিকা লেখাপড়াকে একরকম বিভীষিকাময় করে তুলতে সমর্থ হলেন। বিশেষ করে তিনি অংক বুঝাতেন না ! অংকগুলো কোষে দিতেন আর বাড়ির কাজ হিসেবে আমার করণীয় ছিল সেই একই অঙ্ক ১০ বার করা। প্রশ্ন করলেই চলতো বেদম প্রহার। খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম বিধায় বাবা মাও ভাবলেন দুষ্টামির জন্য মার্ খাচ্ছি! পড়ালেখা, বিশেষ করে গণিত বিষয়টা রীতিমত দুর্বোধ্য মনে হতো। কিন্তু পরীক্ষায় ১ম থেকে ৩য় এর মধ্যে স্হান অর্জন করতাম! কী করে? খুবই রহস্যজনক মনে হলেও কারণটা ছিল খুবই দুঃখজনক। আমার বিদ্যালয়ের চাকরীরত গৃহশিক্ষিকা পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতেন, প্রশ্নের অঙ্কগুলো কোষে দিয়ে আমাকে বাধ্য করতেন যাতে বিনা বাক্যব্যয়ে সেগুলো গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করি। উত্তম মধ্যমের ভয়ে আমাকে তাই করতে হতো। প্রতিবাদ করার বয়স তখনও হয় নাই। মাত্র ক্লাস ওয়ান। এমন করেই ৩টি বছর কাটিয়ে বাবার পোস্টিং হলো ঢাকায়।

ঢাকা মানে বিরাট পরিধি। প্রতিযোগিতার বিরাট ক্ষেত্র। ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রি পর্যন্ত গণিতের বেসিক ধারণা ছাড়া এই আমি এসে যেন অথৈ সমুদ্রে পড়লাম! ভর্তিযুদ্ধে টিকাবার জন্য আমার মা যখন আমার পড়ালেখার হাল ধরলেন , তিনি স্বাভাবিকভাবেই খুবই আহত হলেন। বরাবর মেধাতালিকায় স্হান করা তার “ভালো ছাত্রী” মেয়েটার করুন অবস্থায় অনেকবার কেঁদেছেন , দুঃখ করেছেন কেন তিনি নিজে পড়ালেন না! যাই হোক মায়ের অনেক চেষ্টা আর আমার ভগ্ন আত্মবিশ্বাসেই ঢাকার একটা সাধারণ স্কুলে চান্স পেলাম। ঢাকার সহপাঠীরা কেমন যেন! এরা সবার সাথে মিশে না। আমার নাম নিয়েও অনেক ব্যঙ্গ হলো। আমি অবাক হলাম মফস্বলের স্কুলে আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল রূপকথার কাহিনী আর এখানে সব নায়ক, নায়িকা আর সিনেমার গল্প! আমি পুরাই বেমানান। তাও লুনা, দিনা, মুক্তি, আশার মতো বান্ধবী পেলাম আলহামদুলিল্লাহ। যাই হোক, ক্লাস ফোরে এসে পিছনের ৩ বছরের ম্যাথ বুঝা অনেক কষ্টের ছিল। আমার মনে হতো আমি বুঝি দুনিয়ার বোকা। আমার দ্বারা কিছুই বুঝি সম্ভব নয়। হতাশ থাকতাম সদাসর্বদা। আমার মা আমার পাশে ছিলেন। তিনি কেন যেন আমার প্রতি বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি সবসময় বলতেন আমি পারবো শুধু চেষ্টার অভাব। নিজের ব্যাপারে যখন এরকম হীনমন্যতায় ভুগছি তখন ক্লাস ফোর পার করেছি। ফাইভে একজন গৃহশিক্ষক রাখা হলো, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি অনেকটাই আমার ওই শিক্ষিকার মতো ছিলেন। পার্থক্য ছিল শুধু অঙ্ক মুখস্থ করাতেন না তবে,” বুঝিনাই” বললেই অমানবিক টর্চার চলতো। ২ ভাবে শাস্তি দিতেন। হাত মুঠ করতে বলতেন এর পর স্কেল খাড়া করে আঙুলের হাঁড়ের উপর মারতেন আর দুই আঙুলের মধ্যে পেন্সিল রেখে চাপ দিতেন। আমি ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলে ফিসফিসিয়ে হাসতেন! একবার কাঠের নতুন স্কেলের পাশে লাগানো স্টিলের পাত তুলে ফেলতে ভুলে গিয়েছিলাম। লোকটা ওই স্কেল দিয়ে আমার হাত মুঠ করিয়ে আঙুলের হাঁড়ের উপর বাড়ি মেরে ফেঁড়ে ফেললেন। হাত ফুলে রক্ত দরদর করে পড়লো আর তিনি তার বিখ্যাত হাসি হাসছেন! কী নির্মম! স্যার চলে যাবার পর নিজের ঘরে অন্ধকার করে কাঁদছিলাম। কাউকে নিজের ইমোশন শো করতাম না। লজ্জায় , দুঃখে , কষ্টে মরে যেতে মনে চাইত। আম্মু আমার ঘরের আলো নেভানো দেখে আলো জ্বেলে জিজ্ঞেস করলেন , ” কি ব্যাপার মা তুমি অন্ধকারে কি করো?” আমার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলেন। কেঁদে কেঁদে মুখ ফুলে আছে। আমি হাত লুকাচ্ছিলাম , আম্মু হাত টেনে নিয়ে দেখে একটা চিৎকার দিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করায় আমি সব বললাম আর আমার মা ভীষণ রেগে গেলেন ওই শিক্ষকের উপর। পরের দিন তিনি আসতেই আম্মু বললেন , ” আপনি টিচার? আপনার আমার মেয়ে কে পড়ানোর যোগ্যতাই নাই। শুধু আমার মেয়ে কেন আপনি কাউকে পড়ানোর যোগ্যতা রাখেন না। আপনি আর আসবেন না। আপনি কিভাবে এতটুকু একটা মেয়েকে এভাবে জখম করলেন? আপনার মায়া লাগলো না? “সে চলে যাওয়ার পর আম্মু আমাকে বললো এরপর যদি কোনো টিচার আমাকে মারে তাহলে যেন আমি সহ্য না করি সরাসরি আম্মু কে বলি।

ক্লাস ফাইভে অন্যান্য বিষয়ে মোটামোটি ভালো করলেও অংকে কোনোমতে পাশ করি। আমার মা এবার হলিক্রস , ভিকারুননিসা স্কুলের মতো স্কুলে আমাকে ভর্তি করানোর মিশনে নামলেন। শুরু হলো ভর্তির জন্য কোচিং ও পড়াশোনা। আমার তুলনায় আমার মায়ের চেষ্টা ও দোয়াই ছিল মুখ্য। যথাসময়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। ইচ্ছা ছিল হলি ক্রসে ভর্তি হবার কিন্তু সেখানে ওয়েটিং লিস্টে নাম ছিল।

ভিকারুন্নিসাতে চান্স পেয়ে গেলাম আল্লাহর দয়ায়। কী যে খুশি , কী যে আনন্দ , সবচেয়ে বেশি খুশি হলাম আম্মুর চেহারা দেখে। আলহামদুলিল্লাহ।
স্কুলের প্রথম দিন খুব আশা নিয়ে গিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে সেদিন খুব দম বন্ধ লাগছিল। সবাই খুব ভালো ছাত্রী। আমি তখনো তেমন মিশতে শিখিনি ঢাকাবাসীদের সাথে এরজন্যই বুঝি খ্যাত ভাবা হলো। এরপর যখন পড়াশোনার ব্যাপার আসলো – আমার অক্ষমতা প্রতি নিয়ত ধরা পড়তে লাগলো। ক্রমেই শিক্ষকদের অপছন্দের পাত্রীতে পরিণত হলাম। আর সহপাঠীরা খারাপ ছাত্রীদের সাথে মিশে না। তারা শুধু খারাপ ছাত্রীদের নিয়ে মজা করতে পছন্দ করে।

অবশ্য এই সময়ে জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেলাম যে কেউ যদি আমার থেকে যেকোনো ব্যাপারে নিচু অবস্থানে থাকে তাকে তাচ্ছিল্ল্য করা তার জন্য খুবই কষ্টদায়ক। অগণিত অপ্রীতিকর ঘটনাবলীর মধ্যে একটির উল্লেখ করছি — একদিন টিফিন টাইমে বসে আছি , একজন সহপাঠী এসে অনুরোধ করলো যাতে আমি ৩ তলা থেকে নেমে ক্যান্টিন থেকে ওর জন্য এক বোতল কোকাকোলা এনে দেই। সে যেতে পারছে না কারণ পরবর্তী পিরিয়ডের হোমওয়ার্কটা তখন করছিলো। আমি হৃষ্টচিত্তে ওর জন্য এনে দিলাম। এরকম পর পর ২ দিন এনে দিলাম। ৩য় দিন টিফিন পিরিয়ডে আমি আমার অসমাপ্ত বাড়ির কাজ শেষ করার কাজে ব্যস্ত তখন ওই একই সহপাঠীকে আমার জন্য কোমল পানীয়ের একটা বোতল এনে দিতে বলে জবাব পেলাম , ” আমি কেন আনবো? আমি কি তোমার পিয়ন?” ওই বয়সে বেশ বড় ধরণের ধাক্কা ছিল এটা। তবে সব সহপাঠীরাই এমন মনমানসিকতার ছিল তা নয়। অনেকেই ছিল যারা কথা বলতো, ভালো ব্যবহার করতো। আলহামদুলিল্লাহ , সবাই তো আর একরকম হয় না।

ক্লাস সিক্স ও সেভেন এভাবেই কাটলো। খারাপ ছাত্রীর ট্যাগ স্হায়ীভাবে বসেই গেছে আমার উপর। ক্লাস এইটে বুঝে গেলাম আমার কোনো বন্ধু এখানে হবার নয়। কিন্তু ফারাহ, মুশিরা, সোনিয়ার মতো বান্ধবী পেয়ে গেলাম আলহামদুলিল্লাহ। ওরা আমার মতো ট্যাগ লাগানো খারাপ ছাত্রী না আমার থেকে অনেক ভালো ছিল মাশাল্লাহ। ক্লাস এইটের একটি ঘটনা আমার পরবর্তী পথ চলা অনেক সহজ করে দিলো। ক্লাস এইটে উঠার পর পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হবো চিন্তা করলাম। ক্লাসের পড়া পড়ে যেতাম, বাড়ির কাজে ফাঁকি মারা বন্ধ করলাম। একবার সাধারণ বিজ্ঞানে একটা পড়া দেয়া হলো , প্রাণীর পর্বের নাম।

প্রোটোজোয়া , পরিফেরা, সিলেন্টারেটা, অর্থোপোডা ইত্যাদি। রাতে খুব ভালো করে নাম আর উদাহরণ মুখস্থ করলাম। পরের দিন ক্লাসে গেলাম। ম্যাডাম পড়া ধরছেন, ক্লাসের অনেকেই পারছে না। যারা যারা পারে নাই তারা দাঁড়িয়ে। উল্লেখ্য তিনি সবাই কে শুধু পর্বের নাম জিজ্ঞেস করেছেন। যখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি তরতর করে উত্তর দিয়ে বসে পড়লাম। আমাকে ধমক দিয়ে বললেন , ” এই মেয়ে তুমি বসলে কেন? তোমাকে কী বসতে বলেছি ?” আমি দাঁড়ালাম। “নাম বলেছ উদাহরণ দাও। ” আমি উদাহরণ দিলাম এবং বসে পড়লাম। উল্লেখ্য যারা পড়া পারছিলো তারা পড়া বলেই বসে পড়ছিলো, তাদের কিছু বলা হয় নাই ! কিন্তু তিনি আবার ধমকে আমাকে দাঁড়াতে বললেন! আমি দাঁড়ালাম। ” বৈশিষ্ট্য বলো। ”

আমি বললাম , ” ম্যাডাম , বৈশিষ্ট্য তো পড়ি নাই। ” আমি ভেবেছিলাম অন্য সবাই যারা পড়া বলতে পারে নাই তারা নামও বলতে পারে নাই আর আমি শুধু বৈশিষ্ট্য পারি নাই , নাম, উদাহরণ বলেছি! আমি যে এতটুকু পেরেছি এরজন্য তিনি আমাকে এপ্রিসিয়েট করবেন ! কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি ক্লাসে ঘোষণা করলেন , ” এই মেয়ে কিভাবে পাশ করে আমি দেখবো। এবার বিজ্ঞানের প্রশ্ন এমন কঠিন করব পাশ করতে পারবা না! ” তিনি আমার নাম উল্লেখ করে কথা গুলো বললেন। জীবনে কোনোদিন এভাবে কেউ কখনো আমাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। আল্লাহরই হুকুম মনে হয়। প্রচন্ড জেদ চেপে গেলো। মাথায় শুধু ঘুরছিলো , ” আমিও দেখবো কে আমাকে আটকায় !” বাসায় এসে আম্মুকে বললাম , ” মা , আমাকে দুইটা গাইড বই কিনে দিবা?” আম্মু জিজ্ঞেস করলো , ” পড়ার বই?” বললাম , “হ্যা , বিজ্ঞানের গাইড বই” মনে আছে আম্মু খুব খুশি হলেন কারণ পড়ার বই থেকে বাইরের বই বেশি পছন্দ ছিল তখন। ওই দিনই এনে দিলেন। আমি দিন রাত শুধু বিজ্ঞান পড়ি। পাঠ্য বই ঠোঁটস্থ , গাইড বই মুখস্থ। অন্যান্য বিষয় মোটামোটি আর গণিত বরাবরই শুধু পাশের চেষ্টার প্রস্তুতি নিলাম। পরীক্ষা হলো। জীবনে প্রথম ক্লাস এইটে বিজ্ঞান পরীক্ষা দেয়ার সময় মনে হলো ভালো করে পড়লে পরীক্ষা দিতে এতো মজা ! তাহলে আমি পড়ি না কেন!!

রেজাল্ট বের হলো, গণিতে ৪০ আর বিজ্ঞানে ৮১। সর্বোচ্চ নম্বর আসলো বিজ্ঞানে ৮৩। আলহামদুলিল্লাহ। বিজ্ঞানের নম্বর দেখে মনে হয়েছিল আমিই প্রথম হয়েছি। হাসনাত স্যার আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন , ” সামান্থা তুমি তো বিজ্ঞানে ভালো করেছো , সাইন্স পড়বা ?” আমি বললাম , ” না স্যার। আমি ম্যাথ এ ভালো না। আমি আর্টস পড়বো। ” তিনি বললেন , ” কমার্স পড়ো। ” আমি বললাম , ” না স্যার আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টিতে পড়বো ইনশা আল্লাহ। ” স্যার কিছু বললেন না।

ক্লাস নাইনে উঠেছি তখন আমার মা মোল্লা স্যার এর সন্ধান পেলেন। তিনি বাংলাদেশ রাইফেলসের গণিতের শিক্ষক ছিলেন। স্যার প্রথম দিন এসে কিছু অঙ্ক করতে বললেন , আমি পারলাম। তারপর একই অঙ্ক গুলো দিয়ে তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরী করে আমার পরীক্ষা নিলেন। আমি পারলাম না। স্যার আম্মুকে ডেকে বললেন , ” ওকে যখন অঙ্ক গুলো করতে দেই ও পারে। যখনি বললাম পরীক্ষা ও আর পারলোনা। এর অর্থ ওর মধ্যে পরীক্ষা ভীতি কাজ করে। ”

আর আমাকে বললেন , ” মা , তুমি চিন্তা করো না আগামী কাল এই প্রশ্নে আবারো পরীক্ষা দাও দেখবে অবশ্যই পারবে। ” সংক্ষেপে বলে ফেলি , মোল্লা স্যার প্রায় প্রতিদিন আমার পরীক্ষা নিতেন। যখন ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া শুরু করলেন প্রথম পরীক্ষায় পেয়েছিলাম ২৯। আর এস.এস.সি. পরীক্ষার আগে শেষ পরীক্ষাতে পেয়েছি ৯৭ ! আলহামদুলিল্লাহ। তিনি ছিলেন প্রথম শিক্ষক যিনি বলেছিলেন আমি পারি , ভুল করলেও উৎসাহ দিতেন। টেস্ট পেপার থেকে প্রতিদিন একটা প্রশ্নে ৩ ঘন্টা ঘড়ি ধরে পরীক্ষা দিয়ে রাখতে বলতেন বাসায়।

আর বলতেন আমার পরীক্ষার গার্ড আল্লাহ , উনি দেখছেন আম্মু কে বলে যাবেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন আমি খাতা উল্টে দেখবো না ! তিনি বিশ্বাস করতেন আমি আল্লাহকে ভয় করি। আলহামদুলিল্লাহ। এরকম করে আমার উপর আস্থা কোনো শিক্ষক কোনোদিন রাখেন নি। তাঁর ঐ কথা গুলো ক্লাস টেনে পড়া আমার উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিলো।
অংকে ভালো হবার সাথে সাথে স্কুলে অন্যান্য বিষয়গুলোতে ভালো করা শুরু করি। আরেকটা কোচিং সেন্টারে যেতাম সেখানে অন্যান্য স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের সাথে প্রতিযোগিতায় মানবিক বিভাগে প্রথম হতাম আলহামদুলিল্লাহ। স্কুলে আমার যে শিক্ষিকা আমাকে বিজ্ঞানের জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ওনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

কারণ সেইদিন উনি সেটা না করলে আমি হয়তো কোনো দিনও বুঝতাম না পড়াশোনা করতে ভালো লাগতে পারে! আরেকজন শিক্ষিকা নাহিদ আনজুম আপা আমাদের মানবিক বিভাগের মাত্র ৫ জন ছাত্রীরই জন্য মেধাতালিকা করার প্রস্তাব দেন। এটা যে আমার জন্য কত বড় উৎসাহ ছিল ম্যাডাম কে কখনো বলাই হয় নাই। ক্লাস টেনে প্রিপারেশন টেস্টের রেজাল্টের পর আমার মা কে অন্যান্য অভিভাবক সহ ডেকে বলা হয়েছিল , ” আমাদের এই কয়জন ছাত্রীদের আমরা মনে করছি প্লেস করবে। তাদের খাবারের যত্ন নিবেন ওদের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নাই। ” আমার মা বাসায় ফিরে কেঁদেছিলেন। আমার জীবনে আলহামদুলিল্লাহ অনেক দুর্লভ মুহূর্ত গুলোর মধ্যে ঐ মুহূর্তটা সবচেয়ে প্রিয়। আমাদের সময় জি.পি.এ. সিস্টেম প্রথম চালু হয় তাই ঐ সোনার হরিণ “স্ট্যান্ড” আর করা হয় নাই।

তবে নিজের স্কুলের মানবিক বিভাগের সর্বোচ্চ ফলাফলটি করতে পেরেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ। মোল্লা স্যার রেজাল্টের পর এসেছিলেন অনেক দুআ করেছেন। এই লোকটা এস.এস.সি. পরীক্ষার আগে আমাকে ডেইলি রুটিন করে দিয়েছিলেন। রুটিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজের জন্য সময় ছিল। স্যার মাশাআল্লাহ নামাজী লোক। ওনাকে দেখেই নামাজী মানুষদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিলো। আর নাহিদ আনজুম আপাকে দেখে মনে হতো পর্দা যারা করেন তারা অনেক ভালো মানুষ হন। পড়া না পাড়াতে কতবার ম্যাডামের বকুনি খেয়েছি তাও ওনার উপর রাগ হয় নি কখনো। কারণ বকার মধ্যে শাসন ছিল, অপমান নয়।

আজকাল জি.পি.এ. ৫ নিয়ে বাবা মা ও শিক্ষকদের আচরণ দেখলে ঐ সব দুর্বল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। আমার মনে হয় তাদের উপর অন্যায় আচরণের মাধ্যমে অনেক সম্ভাবনাকে গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই তাদের অহংকারী ছাড়া আর কিছুই বানাচ্ছে না। শিক্ষা জীবনে যারা দুর্বলদের সাথে বন্ধুত্ব করতে শিখছে না তারাই পরবর্তীতে টাকা, প্রতিপত্তি ও স্টেটাস দেখে বন্ধু বাছাই করবে। বন্ধুত্বের জন্য কী ভালো ছাত্র হওয়া বাঞ্চনীয় না কি ভালো মানুষ? দুর্বলদের নিয়ে সবলের পরিহাসের শুরুই হয় বুঝি এভাবে! আমি শুনেছি মায়েরা তাদের সন্তানদের বন্ধু বাছাই করতে বলেন রেজাল্ট দেখে ! এসব মায়েরা কি স্বার্থপর জাতি তৈরিতে সহায়তা করছেন না?

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এটাও বুঝি প্রশ্নপত্র ফাঁস কত বড় ধরণের অপরাধ। আমার জীবনের ঐ অধ্যায়ের জন্য কতগুলো বছর যুদ্ধ করতে হয়েছে যদিও রেজাল্ট ভালোই হতো ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে কিন্তু শিক্ষার খাতা ছিল শূন্য। অতএব , সকল বাবা মা কে বিনীত অনুরোধ সন্তানদের উৎসাহ দিন, তাদের উপর আস্থা রাখুন। বাড়ি থেকে শিক্ষা পায় সন্তান। আপনারা তাকে শ্রেণীভেদ শেখালে সে তাই শিখবে। ভালো মানুষ, স্রোষ্টাভিরু মানুষ গড়ার জন্য সময় দিন। আর শিক্ষকবৃন্দকে বলছি , অপমান করে নয় উৎসাহ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করুন।

অসদুপায় অবলম্বনে আপনার সাময়িক সাফল্য আসবে ঠিকই কিন্তু আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে দুর্বিষহ কষ্ট বয়ে নিয়ে আসবে। আর তারা আপনাকে শ্রদ্ধার বদলে ঘৃণার সাথে স্মরণ করবে যা শিক্ষক হিসেবে আপনার বিরাট ব্যর্থতা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার চেষ্টা করুন। ভালো ফলাফল নয় , ভালো মানুষ গড়ুন।

আমার শিক্ষক এবং সংগ্রাম
-সামান্থা সাবেরীন মাহী


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button