জীবনের বাঁকে বাঁকে

আশি বছরের বৃদ্ধের নাস্তিকতা…

আমাদের কোম্পানীর এক রেগুলার বৃদ্ধ কাস্টমার, বয়স আশির কাছাকাছি ৷ দেখা হলেই অনেক কথা বলে ৷ বৃদ্ধ হলে মানুষ একা হয়ে যাবার দরুন যাকেই পায় তার সাথে কথায় জড়িয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করে বোধ হয় ৷ ভদ্রলোকও অনেক টা সেই প্রকৃতির ৷ আমাকে খুব পছন্দ করে কারন আমি তার কথা মনযোগ দিয়ে শুনি এবং মতামত দেওয়ার চেষ্টা করি মাঝেমাঝে ৷

একদিন কথা হচ্ছিল রিলিজিয়ন নিয়ে ৷ ভদ্রলোকের ভাষ্যমতে তিনি নাস্তিক ৷ শুধু তিনি একা নয়, তার পুরো পরিবারই নাস্তিক এবং সেটা চলে আসছে জেনারেশন বাই জেনারেশন ৷ আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তার যদি কখনও খুব বেশি মন খারাপ হয় তখন সে কি করে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় ৷ জবাবে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো সে কিছুদিনের জন্য ডিপ্রেশনে চলে যায় ৷ তারপর ভালো ভালো স্মৃতি গুলো হাতড়ে মন ভালো করার চেষ্টা করে, তারপর এমনি তেই মন স্বাভাবিক অবস্হায় চলে আসে ৷

আমি বললাম আমাদের জন্য এটা অনেকটাই সহজ ৷ সে জানতে চাইলো কিভাবে ৷ আমি বললাম আমাদের যখন কোন কারনে খুব বেশি মন খারাপ হয়, হতাশা আমাদের কে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে, চারপাশ থেকে সব অন্ধকার হয়ে আসে ; আমরা তখন সবকিছু প্রচন্ড ভরসা নিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উপর ছেড়ে দেই ৷ আমরা বিশ্বাস করি তাঁর বান্দাদের তিনি ছাড়া আর কেউ নেই ৷ সুখে এবং দুঃখে সর্বাবস্হায় আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী ৷ তাই তিনি অবশ্যই সবরকম পরিস্হিতিতে আমাদের সাথে আছেন ৷ এই বিশ্বাসটাই আমাদের নিমেষে মন ভালো করে দেয় ৷ আমাদের পুরানো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে হয়না, আমরা খুব বেশি ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারিনা ৷ যার সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস আছে, তার ডিকশনারিতে ডিপ্রেশন নামক শব্দের কোন স্হান নেই ৷

আরও দেখুন:  শুধুই নিজের জন্য

ভদ্রলোক এক নাগাড়ে অনেকক্ষণ আমার কথাগুলো শুনে বললো কালকে সে আমাকে কিছু একটা দেখাবে ৷ পরেরদিন সকালে আবার দেখা হলে সে একটা খাম আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললো সময় পেলে খুলে দেখতে, বিকালে সে আবার আসবে ৷ আমি খাম খুলে দেখলাম একটা কবিতা ৷ যার মধ্যে সুর দেওয়া হয়েছে ৷ কবিতার উপরে তার নাম লিখা টিম হপকিনস ৷ বুঝলাম সে নিজেই লিখেছে ৷

বিকালে দেখা হলে জানতে চাইলাম ঘটনা কি ৷ বললো সে যদিও বংশ পরম্পরায় নাস্তিক তবে সে এ পর্যন্ত সাতাশটি কবিতা লিখেছে সৃষ্টিকর্তা নিয়ে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে ৷ এই সাতাশ টা কবিতা সে তখনই লিখেছে যখন সে জীবনে সাতাশ বার সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে ৷ আমাকে দেয়া কবিতাটি তার সাতাশ টি কবিতার একটি!!! তার কয়েকটি কবিতা বিভিন্ন চার্চে সুর বসিয়ে গাওয়া হয়েছে ৷ তার পরিবারের কেউই এ সম্পর্কে কিছুই জানে না ৷ সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে ৷

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কি এখনও মনে করো তুমি নাস্তিক? সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব বোঝার জন্য সাতাশবার নয় একবারই যথেষ্ঠ হওয়া উচিত ৷ জবাবে সে শুধু বললো /আমি নিজেও জানি না ৷ আমি অন্যান্য নাস্তিকদের মতই ৷ তারাও জানে সৃষ্টিকর্তা আছে কিন্তু কোন একটা অজানা কারনে তারা সেটাকে তালাবদ্ধ করে রাখে /

আশি বছরের একজন বৃদ্ধ নাস্তিক হয়ে জীবন কাটানোর দুঃখ নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেলো ৷ আমি কবিতাটি আবার পড়া শুরু করলাম ৷

A Heart to Know

You gave me a soul ; to know my need of you,

You gave me a mind ; to embrace your word so true,

You gave me eyes ; your wonderful works to see,

You gave me a heart ; to know you care for me,

আরও দেখুন:  রামাদানে অত্যাচার!

A heart to know ; you are always there for me ,

A heart to know ; your blessings you share with me,

A heart to know ; you care for me…..

আমি চোখ ভর্তি পানি নিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করলাম

‘ হে রাব্বুল আলামীন, আপনার এই বান্দা জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে ৷ আপনি তাকে ও আমাদের কে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন ৷ আপনি হেদায়াত না করলে আমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট ৷ আপনি কবুল করুন ৷ কবুল করুন ৷ ‘

– নুসরাত জাহান

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

  1. অসাধারণ! গল্পটা সত্য হলো আমারও সুর,

    ‘ হে রাব্বুল আলামীন, আপনার এই বান্দা জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে ৷ আপনি তাকে ও আমাদের কে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন ৷ আপনি হেদায়াত না করলে আমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট ৷ আপনি কবুল করুন ৷ কবুল করুন ৷ ‘

মন্তব্য করুন

Back to top button