জীবনের বাঁকে বাঁকে

আমি কোন পথে যে চলি

হিন্দু পুরাণে একটা কথা আছে – “যত মত তত পথ”। হিন্দু ধর্মের মত স্বেচ্ছাচারিতা অবশ্য ইসলাম ধর্মে চলেনা। আর চলবেই বা কিভাবে? আমাদের তো আর গন্ডায় গন্ডায় দেব-দেবী নেই; আমাদের প্রভু একজন – আল্লাহ, তিনিই সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালনকারী এবং তিনিই আমাদের বিধানদাতা। সুতরাং ইসলামের পথ একটিই এবং সে সরল পথের খোঁজ স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন তার রসুলের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের যাদের ইসলামের জ্ঞান তত গভীর নয়, তাঁরা প্রায়ই প্যাঁচে পড়ে যান যে সঠিক পথ কোনটি? কারণ বর্তমান সময়ে প্রচলিত যেসব দল ইসলামের দিকে ডাকে তারা সবাই ক্বুরআন এবং হাদিসের কথা বলে বলবে আমরাই হচ্ছি একমাত্র সঠিক দল। তাহলে আমরা ঠিক দল চিনবো কিভাবে?

ইসলামিক জ্ঞানঃ

ধরি কেউ বাজারে গেল টমেটো কিনতে। সে দ্বিগুণ দাম দিয়ে দেশি টমেটো কিনে এনে দেখলো টমেটো সিদ্ধ হয়না কিন্তু তাড়াতাড়ি পঁচে যাচ্ছে। এখন সে যদি কখনো গ্রামে গিয়ে দেশি টমেটো দেখতো, সেটা কখন পাকে এবং পেকে কি রঙ হয় তা জানতো তবে কিন্তু সে ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হাইব্রিড আর দেশি টমেটোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারতো, বোকার মত ঠকে আসতোনা। সুতরাং আসল এবং নকলের মধ্যে পার্থক্য করে দেয় জ্ঞান। এখন আমরা যদি সত্যি বিশ্বাস করি এ পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান খুব অল্প সময়ের জন্য এবং এই স্বল্প সময়ে আমরা যা করবো তার ফল আমরা অসীম সময় ধরে ভোগ করবো তবে এই অল্প সময়টুকুকে আসলে আমাদের সেইভাবে খরচ করা উচিত। অসীম সময়ে আমরা ভাল থাকবো কিনা তা নির্ভর করছে আমরা ইসলাম ঠিক ভাবে মানছি কিনা তার উপর। আর ইসলাম ঠিকভাবে মানার জন্য তা জানার কোন বিকল্প নেই এবং আমাদের সেই ঠিকটা জানার জন্য যতটুকু কষ্ট করা দরকার তা করতে হবে। আমি যেমন সাড়ে তিন বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হবার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বের হওয়া – এই বিশ বছর পড়াশোনা করেছি যেন বাকি জীবন যাতে ভাল খেতে পারি, পড়তে পারি সে জন্য। কিন্তু যে ধামে অনন্তকাল থাকতে হবে সেখানের খাওয়া-পড়ার জন্য কতটুকু পড়াশোনা করেছি? আমার মত এই প্রশ্নটা নিজের বিবেকের কাছে সবারই করা উচিত।

জ্ঞানের উৎসঃ

বস্তুত পরকাল এমন একটি ধারণা যা আমরা দেখতে পাইনা। তাই আমরা যদি আমাদের ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতা ও অন্যদের ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা-ভাবনাকে (যেমন মার্ক্সবাদ, গণতন্ত্র) পরকাল চেনার উপায় মনে করি তাহলে খুব বড় ধরণের একটা ভুল হয়ে যাবে। যেমন বর্তমান গণতন্ত্রের তাত্ত্বিকরা বিশ্বাস করতেন মানুষ নিজের নৈতিকবোধের তাগিদেই ভালো হবে (Goodness for the sake of goodness) ।

“কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ নরক মানুষেতে সূরাসূর”

– এ কবিতাটি এমনই এক চিন্তাধারা থেকে লেখা। এখন এ কবিতার মর্ম অনুযায়ী চলতে গেলে আমরা দেখবো হাজারো নারী-শিশুর রক্ত মাখা যার হাতে, সেই বুশ টেক্সাসে তার বিশাল খামারবাড়িতে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছে। তাই স্বর্গ-নরক আমরা দেখতে পাইনা বলে যদি পাপ-পূণ্যের পুরষ্কার শুধু মানুষের বিবেকের কাছে সীমাবদ্ধ করে দেই তবে যার বিবেক নেই তার শাস্তি কি হবে? এত সব অন্যায় অপকর্ম করে এই মানুষরূপী জানোয়ারগুলো কোন শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাবে তা কি হয়?

তাই ইসলামের ব্যাপারে কিছু জানতে আমরা ফিরে যাবো আল্লাহ ও তার রসুলের দিকে এবং সবসময় আমরা “আমাদের যা মনে হয়” অথবা “যা ভাবতে ভালো লাগে” – তা থেকে বেঁচে থাকবো। এখন প্রশ্ন ইসলামের দৃষ্টিতে ইলম বা জ্ঞান কি? ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) চমৎকারভাবে সংজ্ঞা দিয়েছেনঃ ইলম হল – যা আল্লাহ বলেছেন; রসুল (সাঃ) বলেছেন এবং যা তাঁর সাহাবিরা বলেছেন।

আল্লাহ ও তার রসুলঃ

আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞানী তাই তার বাণী ক্বুরান অভ্রান্ত হবে এটা প্রশ্নাতীত। আবার যেহেতু মুহম্মদ (সাঃ) এ পৃথিবীর কোন শিক্ষকের কাছে কিছু শিখেননি, তাই তিনি যা শিক্ষা দিয়ে গেছেন সেটা যে কোন মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত দর্শন নয়, সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকেই পাওয়া তা বলাই বাহূল্য। তাঁর শিক্ষা পরিপূর্ণ, তা সকল যুগে, সকল পরিস্থিতিতে সকল মানুষের ইহকাল ও পরকালে মুক্তির জন্য যথেষ্ট। তিনি (সাঃ) বলেন-
“হে লোকসকল! তোমাদেরকে জান্নাতের নিকটবর্তী ও জাহান্নাম থেকে দূরবর্তী করে এমন কোন কিছুই নেই যার আদেশ আমি তোমাদেরকে দেইনি; আর আমি জাহান্নামের নিকটবর্তী ও জান্নাত থেকে দূরবর্তী করে এমন কোন কিছুই নেই যা থেকে তোমাদের আমি নিষেধ করিনি।”

এরপর যদি আমরা রসুল (সাঃ) এর আদেশ-নিষেধ বাদ দিয়ে পরকালে মুক্তির আশায় কোন পির-বুযুর্গ-দরবেশের দরজায় ছুটে বেড়াই তবে তাতে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। যে কেউ যদি দুনিয়ায় কোন লাভের উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রচার করে তবে তার থেকে সাবধান থাকতে হবে। জাকের পার্টি, কুতুববাগী ইত্যাদি যত উরশবাদী আছে এদের লক্ষ্য টাকা-পয়সা – এদের থেকে সাবধান। আবার ইসলামের কথা বলে গণতান্ত্রিক উপায়ে গদিতে বসতে চায় যারা, এদের উদ্দেশ্য – শাসন-ক্ষমতা। এদের থেকেও সাবধান।

আরও দেখুন:  ওদের দেওয়া পরিচয় অনুযায়ী আমি একজন 'জারজ!' - রুম নাম্বার ৫০৬

একথা অনস্বীকার্য যে ইসলাম যেহেতু একটা সম্পূর্ণ জীবন বিধান তাই তাতে কিভাবে রাষ্ট্র চালাতে হয় তা বলা আছে। কিন্তু তার সাথে এও বলা আছে কিভাবে সেই রাষ্ট্রের মানুষগুলোর মধ্যে আগে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হয় এবং তারপর ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ঘোড়া-গাড়ির জন্য আগে ঘোড়া লাগে তারপর গাড়ি। শুধু ঘোড়া যদি থাকে তবে গাড়ি না হলেও দূরের পথ পাড়ি দেয়া যায়। কিন্তু প্রাণহীন গাড়ি দিয়ে কোন লাভ হয়কি? সে তো শুধু বোঝাই বাড়ায়।

শাসক নির্বাচনের ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি হল – যে শাসনভার চাইবে সে শাসন ক্ষমতা পাবার অযোগ্য। রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব নেয়ার প্রথম যোগ্যতা মনের ভিতর থেকে ক্ষমতার মোহ দূর করতে পারা। যে মানুষটা তিন কোটি টাকা খরচ করে সংসদে যায় সে মানুষের কি সেবা করবে? সে এলাকার মানুষের কল্যাণ চাইলে ঐ টাকা দিয়ে রাস্তা বানিয়ে দিত, নদীতে বাঁধ দিয়ে দিত – মিছিল, পোস্টার আর ব্যানার দিয়ে কার কি উপকার হয়? সংসদে গিয়ে গালাগালি করলে দেশের কি উন্নতি হয়?

রসুলের সহচরেরাঃ

আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে যেখানে জন্ম দিয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। আমি যেমন ইচ্ছে করে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেইনি তেমনি কারোরই জন্ম তার নিজের ইচ্ছায় হয়নি বরং আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সময় যে মানুষগুলো জন্ম নিয়েছিলেন তাদের আল্লাহ বেছে নিয়েছিলেন যেন তাদের দিয়ে ইসলামের শিক্ষাগুলো সংহত করা যায়। এই মানুষগুলোর মেধা, বিচক্ষণতা এবং আত্মত্যাগবোধ ছিল অসাধারণ। আমাদের মত গাধা-টাইপের মানুষ যারা সারা রাত ধরে Horse মানে ঘোড়া, Horse মানে ঘোড়া মুখস্থ করে সকালে পরীক্ষার খাতায় গাধা লিখে আসি তাদের পক্ষে “শ্রুতিধর”- এই ধারণাটা আসলে মাথায় আনাই কঠিন। রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহাবিরা ক্বুরান এবং হাদিসের বাণীগুলো শুনে শুনেই মনে গেঁথে রাখতেন এবং অন্যদের তা প্রতিটি শব্দের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে শেখাতেন। তাদের এই অসাধারণ স্মৃতিশক্তির বহু প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। আর এই মানুষগুলো শুধু শুনতেনই না বুঝেও নিতেন। যেমন রসুলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল হারানো উট পাওয়া গেলে কি করবে? তিনি উত্তর দিলেন – তাকে তার মত ছেড়ে দাও। সে তার নিজের মত খেতে থাকবে যতক্ষণ না তার মালিক তাকে খুঁজে পায়। অথচ উমার (রঃ) নিয়ম করেছিলেন হারানো উট পাওয়া গেলে তা যেন রাষ্ট্রীয় উটশালায় জমা দেয়া হয় যেন উটের মালিক সেখান থেকে নিজের হারানো উটের উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে কি উমার (রঃ) রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর বিরোধিতা করেছিলেন? না বরং উলটো। পানি ও খাবারের অভাবে যেন হারানো উটটি মরে না যায় এবং যেন ভালভাবে তার মালিকের কাছে ফেরত যেতে পারে সে জন্যই তিনি সরকারী উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়া উটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন।

সাহাবিদের আত্মত্যাগের কথা উঠলে আমাদের কাছে তা গালগল্প মনে হয়। আমরা আসলে সেই ধরণের মানুষ যারা নিজেদের সুখের জন্য এসি চালিয়ে আর দশ জন মানুষকে অন্ধকারে রাখি অথচ পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র অনুতাপবোধ থাকেনা। আর সাহাবিরা ইসলামের জন্যে নিজেদের সম্পদ, মাতৃভূমি, সমাজ, পরিবার এমনকি নিজেদের জীবনকেও খুশিমনে উৎসর্গ করতেন। অবশ্য ইন্টারনেটের কল্যাণে আমার সাথে অনেক “জিহাদি” ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে যারা ফজরের নামায জামাতে পড়ার জন্য ঘুম ত্যাগ করতে পারেনা কিন্তু নিজের জীবন ত্যাগ করার জন্য মুখিয়ে থাকে। অথচ সাহাবিরা সব ভালোবাসা, সব বিলাসিতা, সব সুখ উৎসর্গ করে দেয়ার পর যখন আর কিছু দেয়ার থাকতোনা তখন প্রাণ দিয়ে ইসলামকে রক্ষা করে যেতেন। সাহাবিদের এই অবদান তাই ক্বুরান এবং হাদিস উভয় দ্বারাই স্বীকৃতি পেয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন –
আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম আমার প্রজন্ম। এরপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম (তাবেয়ীদের প্রজন্ম)। তারপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম (তাবে-তাবেয়ীদের প্রজন্ম)। (বুখারী ও মুসলিম)

আরও দেখুন:  শূন্যস্থান পূরণ

ইবনে মাসুদ (রঃ) বলেছেন –

আল্লাহ তার বান্দাদের অন্তরসমূহের দিকে তাকালেন। তিনি দেখলেন মুহাম্মাদের (সাঃ) অন্তর সর্বোত্তম তাই তিনি নিজের জন্য তাকে বেছে নিলেন এবং তাকে রসুল করে পাঠালেন। অতঃপর তিনি অন্য বান্দাদের অন্তরসমূহের দিকে তাকালেন এবং দেখলেন সাহাবিদের অন্তরগুলো অন্য সবার চেয়ে ভালো। তাই তিনি তাদের নিজের রসুলের সমর্থকরূপে পাঠালেন যারা আল্লাহর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করলো। সুতরাং মুসলিমরা (সাহাবিরা) যা ভাল মনে করে, আল্লাহর কাছে তা ভাল এবং তারা যা মন্দ মনে করে আল্লাহর কাছে তা মন্দ। [মুসনাদে আহমদ ১/৩৭৯, হাদিসটি হাসান]

এ ব্যাপারটি আমাদের পরিষ্কার করে বুঝে নেয়া উচিত। যে মানুষগুলো ক্বুরান নাজিল হতে দেখেছিলেন, রসুলের সাহচর্যে ছিলেন তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাটি নিজেদের বুকের ভিতর ধারণ করতেন এবং নিজেদের জীবনে তা বাস্তবায়ন করে দেখাতেন। সুতরাং ইসলামের স্বরূপ বুঝতে হলে তাদের আচরণ ও জীবনধারণের দিকে লক্ষ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আর আল্লাহ স্বয়ং তাই বলেছেন –

“যে ব্যক্তি তার কাছে প্রকৃত সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধচারণ করবে এবং বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেই দিকেই পরিচালিত করব যেদিকে সে ধাবিত হয়েছে, তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো, আর তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল” (সূরা নিসাঃ ১১৫)

আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতে, সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধচারণ করবে – বলে থেমে যাননি, “বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ” অর্থ্যাৎ সাহাবিদের পথে থাকার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সেই হাদিস – “আমার উম্মত ৭৩ ভাগে বিভক্ত হবে, যাদের মধ্যে একটি ব্যতীত সবগুলোই জাহান্নামে যাবে”। তার সহচরেরা সেই দলের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেনঃ এটি হচ্ছে সেই দল, যে দলে আমি এবং আমার সাহাবিরা রয়েছি। এই সাহাবিরাই হচ্ছেন প্রকৃত বিশ্বাসীদের পূর্বপুরুষ যাকে আরবিতে সালাফ বলা হয়। এখন কেউ যদি এই সাহাবিদের অনুসৃত পথ ছেড়ে নিজের আবিস্কৃত কোন পথ, মতের অনুসারী হয় তাহলে তার গন্তব্যস্থল যে জাহান্নাম সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আজকে আমাদের মাঝে যতগুলো ইসলামি দল আছে তারা কি এই বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ মেনে চলেন? তারা কি তাদের দাওয়াতে, জীবন ধারণে, ইসলামের ব্যাখ্যা প্রদানে এই বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথে চলেন? উত্তরটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হবে – না! কারণ, অধিকাংশ মানুষই নিজস্ব প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, নিজে যা বুঝে তাই দিয়ে দল, মত গঠন করে আর তাদের সেই নিজস্ব মতবাদ ইসলামের নামে প্রচার করে বেড়ায়। ফলে আজ অমুক ইসলাম, তমুক জামাত, অমুক জোট, তমুক শাসনতন্ত্র প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। এদের সবাই দাবী করে তারা কোরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী কিন্তু আসলে তারা বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথের বাইরে চলছে। এক্ষেত্রে নিজেদের ভুলপথকে “হালালাইজ” করার জন্য তারা ক্বুরানের কিছু আয়াত এবং কিছু হাদিসকে নিজ মতাদর্শের আলোকে ব্যাখ্যা করে নেন অথচ এমন ব্যাখ্যার খোঁজ সাহাবি, তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈনদের পক্ষ থেকে পাওয়া যায়না।

ছোট একটা উদাহরণ দেয়া যাক। নু’মান ইবনে বশীর (রঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সাঃ) বলেছেনঃ তোমরা অবশ্যই কাতার সোজা করে নিবে, তা না হলে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দিবেন। জামাতে নামাজে কাতার সোজা করে দাড়ানোর নিয়ম কি? সাধারণত মজজিদগুলোতে কাতার বরাবর সোজা দাগটানা থাকে আর সেগুলো বরাবর দাড়ানোকেই কাতার সোজা বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু সাহাবিরা কি এভাবে দাড়াতেন? আনাস (রঃ) বলেন, আমাদের প্রত্যেকেই তার পাশ্ববর্তী ব্যক্তির কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলাতাম। (সহীহ বুখারি)

আরও দেখুন:  আমেরিকায় পড়ি

ইসলামের কথা বলা দলগুলোর কতজন জামাতে নামাজে এভাবে দাড়ায়? কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলানো তো দূরের কথা, দু’জনের মাঝে আরেকটা মানুষের জায়গা থাকে। গরম কাল আসলে তো কথাই নেই। আবার একটু মলিন কাপড়, গরীবি ভাব হলে নাক সিটকানো মনোভাব চলে আসে। যারা বলে খিলাফাহ চাই, যারা বলে বেড়ায় আমরা ইসলাম কায়েম করবো, যারা বলে বয়ান হবে বহুত ফায়দা হবে তাদের কেউই জামাতের নামাযে আল্লাহর সামনেই ভেদাভেদ ভুলে, বিশ্বাসীদের অনুসৃত পথ অনুসরণ করতে পারে না। এই লোকগুলোকে দিয়ে মসজিদের বাইরে এসে কিভাবে ইসলাম কায়েম হবে? রসুল (সাঃ)সত্যই বলেছেন, তোমরা অবশ্যই কাতার সোজা করে নিবে, তা না হলে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দিবেন। দেওয়ানবাগী পিরের ভক্তরা বলে চরমোনাইরা কাফের আর চরমোনাই পিরের ভক্তরা বলে দেওয়ানবাগীরা কাফের। জামাতিরা তাবলিগিদের দেখতে পারেনা, তাবলিগিরা জামাতিদের সহ্য করতে পারেনা। দেওয়ানবাগি নামে একটা দল আছে এদের কাজই দেয়ালে চিকা মারা আর সব কাজকে হারাম ঘোষণা করা। একই ইসলামের নামে যে কত দল আছে আল্লাহই জানেন। সবাই নাকি ইসলাম চায় কিন্তু কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেনা! অথচ আল্লাহ ক্বুরানে মুসলিমদের দলে দলে বিভক্ত হওয়াকে হারাম করেছেন!

এখানে শুধু ছোট একটি উদাহরণ দিলাম, এরকম রসুল ও তাঁর সাহাবিদের অনেক কাজ রয়েছে যা বর্তমান প্রচলিত ইসলামি দলগুলো শুধু অবহেলাই না বরং অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বহীন মনে করে। তারা আসলে তাদের ইসলাম প্রতিষ্ঠার ভিত্তিহীন পদ্ধতিকে সাহাবিদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। কিন্তু সত্য এই যে এদের হাত ধরে কোনদিন ইসলাম আসবেনা। কারণ কোরআন ও হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে, ভুল বিশ্বাস নিয়ে, ভুল পদ্ধতিতে সঠিক ইসলাম আনা যায়না। অনেকে ইরানের কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু সেখানে যা আছে তা ইসলাম নয়। ইরানের শাসকদের ধর্মবিশ্বাস মুসলিমদের ধর্মবিশ্বাস নয়। আর এদের শাসনের ধরণ ফ্যাসিবাদীদের মত চরম স্বেচ্ছাচারে ভরা, প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধের ধারেকাছেও তা নেই।

ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ (রঃ)কর্তৃক বর্ণিত, আল-ইরবাদ বলেনঃ একদিন আল্লাহর রসুল (সাঃ)আমাদের জামাতে নামাজে ইমামতি করলেন, এরপর আমাদের দিকে ঘুরে বসলেন এবং দীর্ঘক্ষণ আমাদের উপদেশ দান করলেন এবং এক সময় তার চোখ দিয়ে অশ্রু পতিত হচ্ছিল এবং তার হৃদয় সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল।

একজন লোক বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল, এটি বিদায়ী ভাষণ বলে মনে হচ্ছে, কাজেই আপনি আমাদেরকে কি করতে হবে বলে আদেশ করেন?
তিনি বললেনঃ আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে নির্দেশ দিচ্ছি, একজন আবিসিনিয়ান দাসও যদি তোমাদের নেতা হয় তার কথা শুনবে এবং মান্য করবে। যারা আমার পর জীবিত থাকবে তারা অনেক অনৈক্য দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহকে এবং আমার পর সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের অনুসরণ করবে। একে আকড়ে ধরে রাখবে। নতুন উদ্ভাবন পরিত্যাগ করবে, দ্বীন ইসলামে প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবনই বিদআত আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা।

রসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ এবং সাহাবিদের ব্যাখ্যার বাইরে আর যত মত-পথ-ব্যাখ্যা-পদ্ধতি আছে তা যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন সেগুলো ভুলে ভরা। মুসলিমদের প্রথম তিন প্রজন্ম হচ্ছে আমাদের সামনে ইসলামের মডেল। একনিষ্ঠ অনুসরণ করতে হবে তাদের। তারা যেভাবে ইসলামকে বুঝেছিলেন যেভাবে বুঝতে হবে, যেভাবে পালন করেছিল সেভাবেই পালন করতে হবে। বিষয়টি এমন নয় যে, আমার যা ভাল লাগল তাই শুধু মানলাম আর বাকীগুলো ভাল লাগলো না বলে অমান্য করলাম। এমন যদি হয় তাহলে সে প্রকৃত মুসলিম নয়। সঠিক সরল পথ – “সিরাতাল মুস্তাকিম” একটাই। সে পথ পাবার জন্য আমাদের চেষ্টা তো করতেই হবে কিন্তু সাথে এও মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে মাথা নিচু করে না চাইলে সে পথ পাওয়া যাবেনা। তাই নামাযে সুরা ফাতিহা পড়ার সময় আমরা যখন “ইহ্দিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম” (আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন) পড়বো, সেটা যেন কেবল পড়াই না হয়, অন্তরের আকুতিও যেন তার সাথে মিশে থাকে।

আল্লাহ আমাদের ম্যান-মেড ইসলাম ছেড়ে আল্লাহর ইসলাম মানার সুযোগ দিন। আমিন।

– শরীফ আবু হায়াত অপু

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button