দাওয়াত ও জিহাদ

দাওয়াতের অফুরান উপকার

সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ তথা দাওয়াত ও দ্বীন প্রচার মোমিনের জীবনে একটি বড় ইবাদত। এ ইবাদত পালন করলে মোমিন নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত পালনের ন্যায় সওয়াব ও পুরস্কার লাভ করবেন। অবহেলা করলে অনুরূপ ইবাদতে অবহেলার শাস্তি তার প্রাপ্য হবে। কোরআন-হাদিসে দাওয়াত বা আদেশ-নিষেধের এ ইবাদতের তিন ধরনের পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে। ১. সর্বোচ্চ পুরস্কার, ২. অন্যান্য অনেক মানুষের কর্মের সমপরিমাণ সওয়াব ও ৩. জাগতিক গজব ও শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া।

সফলতা ও সর্বোচ্চ পুরস্কার

আমরা দেখেছি যে, দাওয়াত ও আদেশ-নিষেধের দায়িত্ব পালনকারীরাই সফলকাম বলে কোরআনে সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে। সূরা নিসার ১১৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এই দায়িত্ব পালনকারীর জন্য রয়েছে মহাউত্তম পুরস্কার, তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোনো কল্যাণ নেই। তবে (কল্যাণ আছে) যে নির্দেশ দেয় সদকা কিংবা ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে তবে অচিরেই আমি তাকে মহাপুরস্কার দান করব।’ (সূরা নিসা : ১১৪)

দায়ীর সর্বোচ্চ পুরস্কার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে যদি একজন মানুষকেও আল্লাহ সুপথ দেখান তাহলে তা তোমার জন্য (সর্বোচ্চ সম্পদ) লাল উটের মালিক হওয়ার চেয়েও উত্তম বলে গণ্য হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘ভালো কাজে নির্দেশ করা সদকা বলে গণ্য এবং খারাপ থেকে নিষেধ করা সদকা বলে গণ্য।’ (মুসলিম)।

আমরা যারা সহজে মুখ খুলতে চাই না তাদের একটু চিন্তা করা দরকার। প্রতিদিন অগণিতবার আমরা সুযোগ পাই মুখ দিয়ে মানুষকে একটি ভালো কথা বলার। লোকটি কথা শুনবে কিনা তা বিবেচ্য বিষয়ই নয়। আমি শুধু বলার সুযোগটা ব্যবহার করে সওয়াব অর্জন করতে পারলেই তো হলো। একটু ভালোবেসে একটি ভালো উপদেশমূলক কথা আমার জন্য আল্লাহর দরবারে অগণিত পুরস্কার জমা করবে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটিরও উপকার হতে পারে। যদি হয়, তবে আমরা দ্বিতীয় পর্যায়ের বিশেষ পুরস্কার লাভ করব।

অগণিত মানুষের সমপরিমাণ সওয়াব

আরও দেখুন:  সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রকৃতি

দায়ী, মুবাল্লিগ বা দাওয়াত ও তাবলিগে রত ব্যক্তির বিশেষ পুরস্কারের দ্বিতীয় দিক হলো তার এই কর্মের ফলে যত মানুষ ভালো পথে আসবেন সবার সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াব তিনি একা লাভ করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ভালো পথে আহ্বান করে, তবে যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের সবার পুরস্কারের সমপরিমাণ পুরস্কার সে ব্যক্তি লাভ করবে, তবে এতে অনুসরণকারীদের পুরস্কারের কোনো ঘাটতি হবে না। আর যদি কোনো ব্যক্তি বিভ্রান্তির দিকে আহ্বান করে তবে যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের সবার পাপের সমপরিমাণ পাপ সে ব্যক্তি লাভ করবে, তবে এতে অনুসরণকারীদের পাপের কোনো ঘাটতি হবে না।’ (মুসলিম)।

মোমিন যদি কোনো একটি ভালো কর্ম করতে সক্ষম নাও হন, কিন্তু তার নির্দেশনা-পরামর্শে কেউ তা করে, তবে তিনি কর্ম সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পান। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যদি কেউ কোনো ভালো কাজের দিকে নির্দেশনা প্রদান করে তবে তিনি কাজটি পালনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবেন। (মুসলিম)।

আজাব-গজব থেকে রক্ষা

দাওয়াত ও আদেশ-নিষেধের দায়িত্ব পালন করার অন্যতম পুরস্কার হলো জাগতিক গজব থেকে রক্ষা পাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে তা বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধিবিধান সংরক্ষণের জন্য সচেষ্ট এবং যে লঙ্ঘন করছে উভয়ের উদাহরণ হলোÑ একদল মানুষের মতো। তারা সমুদ্রে একটি জাহাজ বা বজরা ভাড়া করে।

লটারির মাধ্যমে কেউ উপরে এবং কেউ নিচের তলায় স্থান পায়। যারা নিচে অবস্থান গ্রহণ করল তাদের পানির জন্য উপরে আসতে হয়। এতে উপরের মানুষদের গায়ে পানি পড়তে লাগল। তখন উপরের মানুষ বলল, আমাদের এভাবে কষ্ট দিয়ে তোমাদের উপরে উঠতে দেব না। তখন নিচের মানুষগুলো বলল, আমরা আমাদের অংশে বা জাহাজের নিচে একটি গর্ত করি, তাহলে আমরা সহজে পানি নিতে পারব এবং উপরের মানুষদের কষ্ট দিতে হবে না।
এ অবস্থায় যদি উপরের মানুষগুলো তাদের এ কাজে বাধা দেয় এবং নিষেধ করে তাহলে তারা সবাই বেঁচে যাবে। আর যদি তারা তাদের এ কাজ করতে সুযোগ দেয় তাহলে তারা সবাই ডুবে মরবে।’ (বোখারি, তিরমিজি)।

আরও দেখুন:  বাংলাদেশের সংবিধান হৌক ইসলাম

নবুওয়তের নূর থেকে উৎসারিত এ উদাহরণটি ভালো করে চিন্তা করুন। সমাজের অনেক ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালী মানুষ অনেক ধরনের অন্যায় বা গর্হিত কাজ দেখেও প্রতিবাদ করেন না। তারা জানেন যে, তারা প্রতিবাদ করলে তা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা নীরবতা বা তাৎক্ষণিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। তারা ভাবেন, এতে আমার তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। কষ্ট করছে অন্য মানুষ। নষ্ট হচ্ছে অন্য মানুষের সন্তান। তাদের বোঝা উচিত, সমাজের এ অবক্ষয় কোনো না কোনোভাবে তাদের ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্পর্শ করবেই। এজন্য আমাদের সবাইকে আদেশ-নিষেধের এ দায়িত্ব পালনে সজাগ থাকতে হবে।

– ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন
Close
Back to top button