দাওয়াত ও জিহাদ

সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রকৃতি

(ক) মুসলিম হৌক অমুসলিম হৌক প্রতিষ্ঠিত কোন সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইসলামের নীতি নয়। তবে ইসলাম বিরোধী হুকুম মানতে কোন মুসলিম নাগরিক বাধ্য নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির প্রতি কোন আনুগত্য নেই।[1]  অতএব সর্বাবস্থায় তাওহীদের কালেমাকে সমুন্নত রাখা ও ইসলামী স্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা মুসলমানের উপর ফরয দায়িত্ব। এমতক্ষেত্রে সরকারের নিকটে কুরআন ও হাদীছের বক্তব্য তুলে ধরাই হ’ল বড় জিহাদ। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ জিহাদ হ’ল অত্যাচারী শাসকের নিকটে হক কথা বলা।[2]

সরকারের নিকট বক্তব্য তুলে ধরার সর্বোত্তম পন্থা হ’ল, সরকার প্রধান বা তাঁর প্রতিনিধির সাথে নিরিবিলি সাক্ষাতে কথা বলা ও উপদেশ দেওয়া। এজন্য সরকারকে উদার ও সহনশীল হ’তে হবে। অহংকারী ও হঠকারী হওয়া চলবে না। হরতাল-ধর্মঘট, মারদাঙ্গা মিছিল ইত্যাদি গণতন্ত্রে সমর্থনযোগ্য হ’লেও ইসলাম এগুলি সমর্থন করে না। অতএব এগুলি কখনোই কোন উত্তম প্র।।য়া নয়। এতে সরকার ও জনগণ মুখোমুখি হয়। যাতে হিতে বিপরীত হবে এবং অহেতুক নির্যাতন ও রক্তপাত হবে। যা এখন গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারী ও বিরোধী দল অর্থই হ’ল পরস্পর সহিংস দু’টো দল। যা সমাজকে বিভক্ত করে ও রাষ্ট্রকে পঙ্গু ও গতিহীন করে দেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শাসককে উপদেশ দিতে চায়, সে যেন তা প্রকাশ্যে না দেয়। বরং তার কাছে নির্জন স্থানে দেয়। এক্ষণে তিনি সেটি গ্রহণ করলে তো ভালই। না করলে ঐ ব্যক্তি তার দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করল’।[3] সরকারের কাছে বক্তব্য পেশ করার এই ভদ্র পন্থাই হ’ল ইসলামী পন্থা। এতে উভয়পক্ষ পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও সহানুভূতিশীল থাকে। দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। এর বাইরে প্রচলিত হরতাল-ধর্মঘটের পন্থা একটা জংলী পন্থা বৈ কিছুই নয়।

অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণের সকল প্রকার ইসলামী প্রচেষ্টাই হ’ল ‘জিহাদ’। যখন তা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য হয় এবং তাওহীদের ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যে হয়। কিন্তু যদি বিনা প্রচেষ্টায় অনৈসলামী আইন মেনে নেওয়া হয় এবং তার উপর কোন মুসলমান সন্তুষ্ট থাকে, তাহ’লে সে অবশ্যই কবীরা গোনাহগার হবে। সাধ্যমত চেষ্টা সত্ত্বেও বাধ্য হ’লে আল্লাহ্র নিকটে ক্ষমা চাইতে হবে এবং শাসকের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করতে হবে।

(খ) শাসক মুসলিম ফাসেক হলে সে অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের উপর অনেক শাসক নিযুক্ত হবে। যাদের কোন কাজ তোমরা পসন্দ করবে এবং কোন কাজ অপসন্দ করবে। এক্ষণে যে ব্যক্তি উক্ত অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি তা অপসন্দ করবে, সে (মুনাফেকী থেকে) নিরাপদ থাকবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাতে সন্তুষ্ট থাকবে ও তার অনুসরণ করবে। এ সময় ছাহাবীগণ বললেন, আমরা কি ঐ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? রাসূল (ছাঃ) বললেন, না। যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে। না, যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে’।[4]

অন্য হাদীছে এসেছে, ‘আল্লাহ্র পক্ষ হ’তে প্রমাণ ভিত্তিক সুস্পষ্ট কুফরী না দেখা পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের আনুগত্যমুক্ত হওয়া যাবে না’।[5]

‘প্রকাশ্য কুফরী’ -এর ব্যাখ্যা :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, সুস্পষ্ট কুফরী না দেখা পর্যন্ত শাসকের আনুগত্যমুক্ত হয়ো না। সেটা কিভাবে?

তোমরা যাচাই করে দেখবে। কেবল ধারণা ও প্রচারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে না। কেবল ফাসেকী বা কোন কবীরা গোনাহ যথেষ্ট নয়। বরং ইসলামকে পুরোপুরি অস্বীকার করা বুঝাবে। প্রকাশ্য। যাতে কোনরূপ অস্পষ্টতা বা গোপনীয়তা থাকে না। তোমাদের জ্ঞানীদের নিকট। তার কুফরীর ব্যাপারে আল্লাহ্র পক্ষ হতে প্রেরিত কুরআন ও সুন্নাহ্র মযবুত দলীল থাকতে হবে। কোন দুর্বল প্রমাণ বা সন্দেহের ভিত্তিতে নয় কিংবা কোন দল বা ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে নয়। বরং কাউকে কাফের ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার থাকবে রাষ্ট্রীয় ইসলামী আদালতের শরী‘আত অভিজ্ঞ বিচারকমন্ডলীর অথবা দেশের হাদীছপন্থী বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে। অন্য কারু সিদ্ধান্তে নয়। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যদি কেউ তার ভাইকে বলে হে কাফের! তাহলে সেটা তাদের যেকোন একজনের উপর বর্তাবে’।[6]

এর দ্বারা ছোট কুফরী বুঝানো হয়েছে। কেননা কেউ কাউকে কাফের বললেই সে কাফের হয়ে যায় না। বরং কুরআন ও সুন্নাহ্র সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে যাচাই সাপেক্ষে কুফরী সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে এবং বারবার বুঝানো সত্ত্বেও স্বীয় অবিশ্বাসে অটল থাকলে তাকে ‘প্রকাশ্য কুফরী’ হিসাবে গণ্য করা যাবে। কোন মুসলিম সরকারের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

তবে কাফের সাব্যস্ত হ’লেই উক্ত শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরয, তা নয়। কারণ যুদ্ধ করার বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ। আর তা হ’ল বৈধ কর্তৃপক্ষ, অনুকূল পরিবেশ এবং যথার্থ শক্তি ও পর্যাপ্ত সামর্থ্য থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ৬৪/১৬)। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে বাধ্য করেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। অন্যথায় তা আত্মহননের শামিল হবে। যা করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’ (বাক্বারাহ ২/১৯৫)।

কাফের গণ্য করার ফল :

উল্লেখ্য যে, কাফির ঘোষণা করা কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়, যেকোন  মুসলিমের বিরুদ্ধেও হতে পারে। আর কাফির গণ্য করে তাদের রক্ত ও ধন-সম্পদ যদি হালাল করা হয়, তাহলে মুসলিম উম্মাহ্র ঘরে-ঘরে বিপর্যয় নেমে আসবে। যেমন বাপকে ‘কাফের’ গণ্য করা হ’লে মায়ের সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হবে। সন্তান পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এমনকি তার জন্য পিতার রক্ত হালাল হবে। একই অবস্থা হবে ভাই ভাইয়ের ক্ষেত্রে, স্বামী ও স্ত্রীর ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ক্ষেত্রে। আর যদি এটা কোন সরকারের বিরুদ্ধে হয়, তাহ’লে সেটা আরও কঠিন হবে এবং সারা দেশে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে। নিরপরাধ নারী-শিশু ও সাধারণ নির্দোষ মানুষ সরকারী জেল-যুলুম ও নির্যাতনের অসহায় শিকারে পরিণত হবে, যা আজকাল বিভিন্ন দেশে হচ্ছে।

কিছু লোক বোমা মেরে দ্বীন কায়েম করতে চায়। তারা অমুসলিমের চাইতে মুসলিম নেতাদের হত্যা করাকে বেশী অগ্রাধিকার দেয়। তাদের যুক্তি ‘রাহেগী মাক্ষী উসতক, যাবতাক রাহেগী নাজাসাত’ (‘মাছি অতক্ষণ থাকবে, যতক্ষণ দুর্গন্ধ থাকবে’)। অথচ শয়তান যেহেতু আছে, দুর্গন্ধ থাকবেই, মাছিও থাকবে। তবে মুমিন-কাফির যেই-ই হৌক নিরস্ত্র ও নিরপরাধ কোন মানুষকে হত্যা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলামী আদালত বা দায়িত্বশীল বৈধ কর্তৃপক্ষ ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যাযোগ্য আসামী সাব্যস্ত করতে পারে না। অথচ স্বেচ্ছাচারী কিছু চরমপন্থীর জন্য আজ নির্দোষ মুসলিম নর-নারী নিজ দেশে ও প্রবাসে ধিকৃত ও লাঞ্ছিত হচ্ছেন।

মানুষ হত্যার পরিণাম :

আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারু জীবন রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করে’ (মায়েদাহ ৫/৩২)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যাঁর হাতে আমার জীবন নিহিত তাঁর কসম করে বলছি, একজন মুমিনকে হত্যা করা অবশ্যই আল্লাহ্র নিকটে দুনিয়া লয় হয়ে যাওয়ার চাইতে অধিক ভয়ংকর’।[7] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘একজন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করার চাইতে দুনিয়া লয় হয়ে যাওয়া আল্লাহ্র নিকট অধিক হালকা বিষয়’।[8] এর অর্থ এটা নয় যে, কাফেরকে হত্যা করায় নেকী আছে। সেটা হ’লে রাসূল (ছাঃ) শীর্ষ কাফের নেতা আবু সুফিয়ানকে মক্কা বিজয়ের আগের রাতে নিরস্ত্র অবস্থায় ধরা পড়ার পরেও তাকে কেন হত্যা করেননি? বরং তিনি তাকে মুসলিম হওয়ার সুযোগ দেন। পরদিন মক্কা বিজয়ের পর প্রদত্ত ভাষণে তিনি সকল কাফির-মুশরিককে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং রক্তপাতকে স্থায়ীভাবে হারাম করে দেন।[9] ফলে সবাই ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়।

মুসলিম-এর নিদর্শন :

এক্ষণে ‘মুসলিম’ কে? সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল। আর যে ব্যক্তি আমাদের ক্বিবলাকে ক্বিবলা মানে, আমাদের ন্যায় ছালাত আদায় করে, আমাদের যবহকৃত প্রাণীর গোশত খায়, সে ব্যক্তি ‘মুসলিম’। তার জন্য সেই পুরস্কার, যা অন্য মুসলমানদের জন্য রয়েছে এবং তার উপরে সেই শাস্তি, যা অন্য মুসলমানদের উপরে প্রযোজ্য’।[10]  অতএব উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ যার মধ্যে থাকবে, তিনিই ‘মুসলিম’। যদিও তিনি কবীরা গোনাহগার হন।

কবীরা গোনাহগার কাফের নয় :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘মুমিন থাকা অবস্থায় কোন ব্যভিচারী ব্যভিচার করতে পারে না, কোন চোর চুরি করতে পারে না, কোন মদ্যপ মদ্যপান করতে পারে না, কোন ডাকাত ডাকাতি করতে পারে না, কেউ গণীমতের মালে খেয়ানত করতে পারে না। অতএব তোমরা সাবধান হও! তোমরা সাবধান হও’! ইবনু আববাস-এর বর্ণনায় আরও এসেছে, ‘মুমিন থাকা অবস্থায় হত্যাকারী কাউকে হত্যা করতে পারে না’। এর ব্যাখ্যায় ইবনু আববাস (রাঃ) দুই হাতের আঙ্গুলগুলি পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে অতঃপর বের করে নিয়ে বলেন, যখন সে তওবা করে, তখন ঈমান তার মধ্যে আবার প্রবেশ করে। ইমাম বুখারী (রহঃ) অত্র হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে ‘মুমিন’ অর্থ ‘পূর্ণ মুমিন’। পাপ কাজের সময় ঈমানের নূর তার অন্তর থেকে বেরিয়ে যায়’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩)।

আর মুসলমান পরস্পরে যুদ্ধ করলেও তারা যে কাফের ও মুরতাদ হয় না, তার বড় প্রমাণ হ’ল সূরা হুজুরাত ৯ আয়াতটি। যেখানে আল্লাহ পরস্পরে যুদ্ধরত উভয়পক্ষকে ‘মুমিন’ বলে অভিহিত করেছেন।

উত্তরণের পথ :

মুসলিম সমাজে কারু মধ্যে ‘প্রকাশ্য কুফরী’ দেখা গেলে প্রথমে তাকে উপদেশের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। অতঃপর বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও না পারলে ঐ ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলবে এবং তার হেদায়াতের জন্য আল্লাহ্র নিকট দো‘আ করবে। যদি সরকার অমুসলিম হয় ও ইসলামে বাধা সৃষ্টি করে অথবা মুসলিম সরকারের মধ্যে ‘প্রকাশ্য কুফরী’ দেখা দেয় এবং ইসলামের সাথে দুশমনী করে, তাহলে সরকার পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকলে বৈধ পন্থায় সেটা করবে। নইলে ছবর করবে এবং আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকারের মূলনীতি অনুসরণে ইসলামের পক্ষে জনমত গঠন করবে। এটাই নবীগণের তরীকা।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আত্মশুদ্ধি ও পরিচর্যার মাধ্যমে সমাজশুদ্ধির কাজ করেছেন। আমাদেরকেও সেপথে এগোতে হবে। বাধা এলে তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। পরে সক্ষমতা অর্জন করলে এবং আ।ান্ত হ’লে জিহাদ করেছেন কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে, কোন মুসলিম বা মুনাফিকের বিরুদ্ধে নয়। আমরা যদি ইসলামের অগ্রগতি ও মুসলিম উম্মাহ্র কল্যাণ চাই, তাহ’লে আমাদেরকে রাসূল (ছাঃ)-এর পথে চলতে হবে, অন্য পথে নয়। কবি আবু ওছমান সাঈদ বিন ইসমাঈল (২৩০-২৯৮ হিঃ) বলেন, ‘তোমার দ্বীনের অবস্থা কি যে তুমি তাকে ময়লাযুক্ত করার উপর খুশী হয়ে গেছ? আর তোমার পোষাক ময়লা দিয়ে ধৌত করা হয়েছে’? ‘তুমি নাজাত চাও, অথচ সে পথে তুমি চলোনা। নিশ্চয়ই নেŠকা কখনো শুকনা মাটিতে চলে না’।[11]

কাফির গণ্য করার মূলনীতি সমূহ :

কাউকে কাফের বলতে গেলে যেসব মূলনীতি জানা আবশ্যক তার মধ্যে প্রধান কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হ’ল।-

(১) এটি একটি শারঈ হুকুম। যা কুরআন ও সুন্নাহ্র ভিত্তিতেই সাব্যস্ত হবে। অন্য কোন ভিত্তিতে নয়।

(২) কাফের সাব্যস্ত হবে ব্যক্তির অবস্থা ভেদে। কেননা অনেকে ঈমান ও কুফরের পার্থক্য বুঝে না। ফলে প্রত্যেক বিদ‘আতী ও পাপী এমনকি একজন কবরপূজারীকেও কাফের সাব্যস্ত করা যায় না তার অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে।

(৩) কারু কথা, কাজ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই কেবল তাকে কাফের  বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার কাছে দলীল স্পষ্ট করা হবে এবং সন্দেহ দূর করা হবে। এমনকি যদি কেউ অজ্ঞতাবশে কাউকে সিজদা করে, তবে তাকে কাফের বলা যাবে না। যেমন হযরত মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) শাম (সিরিয়া) থেকে ফিরে এসে রাসূল (ছাঃ)-কে সিজদা করেন। কেননা তিনি সেখানে নেতাদের সিজদা করতে দেখেছেন, তাই এসে রাসূলকে সিজদা করেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে নিষেধ করে দেন।[12] অতএব অজ্ঞতাবশে ইসলামের কোন বিধানকে অস্বীকার করলে তাকে ‘কাফের’ বলা যাবে না। যতক্ষণ না তাকে ভালভাবে বুঝানো হয়।

(৪) মুমিন কোন ক্ষেত্রে ঈমান বিরোধী কাজ করলেই তিনি ঈমানের গন্ডী থেকে বের হয়ে যান না বা ‘মুরতাদ’ হয়ে যান না। যেমন মক্কা অভিযানের গোপন তথ্য ফাঁস করে জনৈক মহিলার মাধ্যমে মক্কার নেতাদের কাছে পত্র প্রেরণ করা ও তা হাতেনাতে ধরা পড়ার মত হত্যাযোগ্য পাপ করা সত্ত্বেও রাসূল (ছাঃ) বদরী ছাহাবী হাতেব বিন আবী বালতা‘আহ (রাঃ)-কে ‘কাফের’ সাব্যস্ত করেননি ও তাকে হত্যা করেননি। বরং তাকে ক্ষমা করে দেন তার কৈফিয়ত শ্রবণ করার পর।[13]

(৫) ইসলামের মূল বিষয়গুলি অস্বীকার করলে কাফের হবে, আর শাখাগুলি অস্বীকার করলে কাফের হবে না, এমনটি নয়। বরং শরী‘আতের প্রতিটি বিষয়ই পালনীয়। ছাহাবায়ে কেরাম আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর কোন নির্দেশকেই অগ্রাহ্য করতেন না বরং প্রতিটি নির্দেশকেই সমভাবে গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতেন।

(৬) একই ব্যক্তির মধ্যে ঈমান ও কুফর, তাওহীদ ও শিরক, তাক্বওয়া ও পাপাচার, সরলতা ও কপটতা দু’টিই একত্রিত হতে পারে।

আর এটাই হ’ল বাস্তব। তা না হ’লে তওবা ও ইস্তিগফারের কোন প্রয়োজন থাকত না। আর আহলে সুন্নাতের নিকট এটি একটি বড় মূলনীতি। যা খারেজী, মুরজিয়া, মু‘তাযিলা, ক্বাদারিয়া ও অন্যান্য ভ্রান্ত ফের্কা সমূহের বিপরীত।

বস্ত্ততঃ তাদের পথভ্রষ্টতার বড় কারণ এখানেই যে, তারা ঈমানকে এক ও অবিভাজ্য মনে করে। মুরজিয়ারা মনে করে যখন ঈমানের একাংশ থাকবে, তখন তার সবটাই থাকবে। পক্ষান্তরে খারেজীরা মনে করে যখন ঈমানের একাংশ চলে যাবে, তখন সবটাই চলে যাবে। আর একারণেই তারা কবীরা গোনাহগার মুমিনকে ‘কাফের’ ও ‘চিরস্থায়ী জাহান্নামী’ বলে এবং তার রক্তকে হালাল জ্ঞান করে। যেমন আজকাল চরমপন্থীরা মনে করে থাকে।

অথচ ‘কুরআন সৃষ্ট’ এই কুফরী মতবাদের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিঃ) তাঁর উপর নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতনকারী খলীফা মু‘তাছিম বিল্লাহ (২১৮-২২৭ হিঃ)-কে ‘কাফের’ বলেননি। বরং তার ইস্তিগফারের জন্য দো‘আ করেছেন একারণে যে, খলীফা ও তাঁর সাথীদের নিকট প্রকৃত বিষয়ের স্পষ্ট জ্ঞান ছিল না।[14]

সে যুগে খলীফা মু‘তাছিমের ইসলাম সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল, আজকের যুগে মুসলিম সরকার ও রাজনীতিকদের মধ্যে তার শতভাগের একভাগও আছে কি? অথচ তাদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় যারা, তারা আল্লাহ্র কাছে কি কৈফিয়ত দিবে?

মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে পরস্পরে কাফের গণ্য করার ধারাবাহিক ইতিহাস :

উম্মতের মধ্যে প্রথম বিদ‘আতের সূচনা হয় পরস্পরকে ‘কাফির’ বলার মাধ্যমে। ৩৭ হিজরী সনে ছিফফীন যুদ্ধের সময় খারেজীদের মাধ্যমে যার উদ্ভব ঘটে। তারা হযরত আলী, ওছমান, তালহা, যুবায়ের, আবু মূসা আশ‘আরী, আমর ইবনুল ‘আছ ও মু‘আবিয়া (রাঃ) সহ উটের যুদ্ধে, ছিফফীন যুদ্ধে এবং উক্ত যুদ্ধ বন্ধে উভয় পক্ষের শালিশীতে সম্মত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের ধারণা মতে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে উত্থান করা সিদ্ধ মনে করে। ফলে খারেজীরা হ’ল উম্মতের প্রথম ভ্রান্ত ফের্কা, যারা কবীরা গোনাহগার মুসলিমকে ‘কাফের’ বলে এবং তাকে হত্যা করা সিদ্ধ বলে। এদের সাথে সাথেই সৃষ্টি হয় আরেকটি চরমপন্থী ভ্রান্ত ফের্কা শী‘আ দল। যারা বলে যে, রাসূল (ছাঃ)-এর পরে মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ, আবু যর গেফারী ও সালমান ফারেসী (রাঃ) ব্যতীত সকল ছাহাবী ধর্মত্যাগী ‘মুরতাদ’।[15] তাদের ধারণা মতে হযরত আবুবকর, ওমর, ওছমান এবং সকল মুহাজির ও আনছার ছাহাবী ও তৎপরবর্তী যুগে তাদের অনুসারীবৃন্দ যারা তাদের মতের বিরোধী, সবাই কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী। তাদের নিকটে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকদের কুফরী ইহূদী-নাছারাদের কুফরীর চাইতে নিকৃষ্ট। কেননা তারা হ’ল আসল কাফের এবং এরা হ’ল ধর্মত্যাগী কাফের। আর জন্মগত কাফিরের চাইতে ইসলামত্যাগী ‘মুরতাদ’ কাফির অধিক ঘৃণিত। এদের পরপরই একে একে ক্বাদারিয়া, জাবরিয়া, মুরজিয়া, মু‘তাযিলা প্রভৃতি ভ্রান্ত ফের্কাসমূহের উদ্ভব হ’তে থাকে। এরা সবাই একে অপরকে কাফির বলতে থাকে। এভাবেই শান্তিপ্রিয় মুসলিম উম্মাহ একটি পরস্পরে বিদ্বেষী উম্মতে পরিণত হয়। আল্লাহ রহম করেন আহলেহাদীছগণের উপরে, যারা রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সকল প্রকার বাড়াবাড়ি হ’তে মুক্ত হয়ে মধ্যপন্থী থাকেন এবং সর্বদা ছিরাতে মুস্তাক্বীমের উপর দৃঢ় থাকেন। ক্বিয়ামত পর্যন্ত তারা এভাবেই থাকবেন আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহে। যদিও সকল যুগে বিদ‘আতীরা তাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করবে। যেমন এ যুগেও করছে।

আধুনিক যুগের চরমপন্থী নেতৃবৃন্দের কয়েকজন :

১. সাইয়িদ আবুল আ‘লা মওদূদী (ভারত ও পরে পাকিস্তান : ১৯০৩-১৯৭৯) : প্রথম যুগের চরমপন্থী খারেজী ও শী‘আদের অনুকরণে আধুনিক যুগে কয়েকজন চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে। যাদের যুক্তিবাদী লেখনীতে প্রলুব্ধ হয়ে বিভিন্ন দেশে ইসলামের নামে চরমপন্থী দলসমূহের উদ্ভব ঘটে। বিংশ শতাব্দীতে এ দলের শীর্ষস্থানীয় হ’লেন মাওলানা মওদূদী। তাঁর পুরো লেখনীই পরিচালিত হয়েছে যেকোন উপায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল ‘জামায়াতে ইসলামী’ও একই উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তিনি বলেছেন, ‘দ্বীন আসলে হুকূমতের নাম। শরী‘আত ঐ হুকূমতের কানূন। আর ইবাদত হ’ল ঐ কানূন ও বিধানের আনুগত্য করার নাম’ (খুৎবাত ৩২০ পৃঃ)। তাঁর ধারণা মতে ‘ছালাত-ছিয়াম, হজ্জ-যাকাত, যিকর ও তাসবীহ সবকিছু উক্ত বড় ইবাদতের জন্য প্রস্ত্ততকারী অনুশীলনী বা ট্রেনিং কোর্স মাত্র’ (তাফহীমাত ১/৬৯)। তাঁর মতে ইসলাম কোন বণিকের দোকান নয় যে, ইচ্ছামত কিছু মাল কিনবে ও কিছু ছাড়বে। বরং ইসলামের হয় সবটুকু মানতে হবে, নয় সবটুকু ছাড়তে হবে’।[16] তাঁর মতে ‘আল্লাহ্র ইবাদত ও সরকারের আনুগত্য দু’টিই সমান। যদি ছালাত-ছিয়াম ইত্যাদি ইবাদত হুকূমত কায়েমের লক্ষ্য হতে বিচ্যুত হয়, তাহ’লে আল্লাহ্র নিকট এ সবের কোন ছওয়াব মিলবে না’ (তাফহীমাত ১/৪৯-৬৩ পৃঃ)। তিনি বলেন, তার এই দাওয়াত যারা কবুল করবে না, তাদের অবস্থা হবে নবীযুগে ইসলামী দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারী ইহূদীদের মত’ (রোয়েদাদ ২/১৯ পৃঃ)।

এতে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের আক্বীদা বিগত যুগের চরমপন্থী খারেজী, শী‘আ, মু‘তাযিলা প্রভৃতি ভ্রান্ত দলসমূহের অনুরূপ। সে যুগে তারা ছাহাবীদের ‘কাফের’ বলেছিল ও তাদের রক্ত হালাল করেছিল। এ যুগে এরা অন্য মুসলমানদের ‘ইহূদী’ অর্থাৎ কাফের ভাবছে ও তাদের রক্ত হালাল গণ্য করছে। সে যুগে যেমন যেভাবে হৌক ক্ষমতা দখলই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, এ যুগেও তেমনি ব্যালট বা বুলেট যেভাবেই হৌক ক্ষমতা দখলই তাদের মূল লক্ষ্য এবং এটাই হ’ল তাদের দৃষ্টিতে বড় ইবাদত।

বস্ত্ততঃ মাওলানা মওদূদীর রাজনৈতিক চিন্তাধারায় সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তিনটি : (১) সর্বাত্মক দ্বীন -এর ধারণা। ফলে তাঁর মতে দ্বীনের কোন একটি অংশ ছাড়লেই সব দ্বীন চলে যাবে। (২) তাঁর নিকটে দ্বীন ও দুনিয়ার পার্থক্য পরিষ্কার না হওয়া এবং (৩) আল্লাহ্র ইবাদত ও সরকারের প্রতি আনুগত্যকে এক করে দেখা। এই দর্শনের ফলে ইসলামী সরকারের বিরোধিতা করা এবং অনৈসলামী বা অমুসলিম সরকারের আনুগত্য করা দু’টিই শিরকে পরিণত হয়। যাতে সরকার ও জনগণের মধ্যে গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হবে। যেমন বর্তমানে হচ্ছে।

আরও দেখুন:  দাঈদের প্রতি নাসিহা

২. সাইয়িদ কুতুব (মিসর : ১৯০৬-১৯৬৬) : মাওলানা মওদূদীর লেখনীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে একই ভাবধারায় তিনি লেখনী পরিচালনা করেছেন। সাথে সাথে তাঁর অনুসারী দল ‘ইখওয়ানুল মুসলেমীন’কে পরিচালিত করেছেন। তিনিও খারেজীদের ন্যায় মুসলিম উম্মাহকে হয় কাফের নয় মুমিন, এভাবে ভাগ করে বলেছেন, ‘লোকেরা আসলে মুসলমান নয় যেমন তারা দাবী করে থাকে। তারা জাহেলিয়াতের জীবন যাপন করছে। … তারা ধারণা করে যে, ইসলাম এই জাহেলিয়াতকে নিয়েই চলতে পারে। কিন্তু তাদের এই ধোঁকা খাওয়া ও অন্যকে ধোঁকা দেওয়ায় প্রকৃত অবস্থার কোনই পরিবর্তন হবে না। না এটি ইসলাম এবং না তারা মুসলমান’ (মা‘আলিম ফিত-তারীক্ব পৃঃ ১৫৮)। তিনি বলেন, ‘কালচ।। দ্বীন এখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহতে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। … মানুষ প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে সর্বত্র মসজিদের মিনার সমূহে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্র ধ্বনি বারবার উচ্চারণ করে কোনরূপ বুঝ ও বাস্তবতা ছাড়াই। এরাই হ’ল সবচেয়ে বড় পাপী ও ক্বিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তির অধিকারী। কেননা তাদের কাছে হেদায়াত স্পষ্ট হওয়ার পরেও এবং তারা আল্লাহ্র দ্বীনের মধ্যে থাকার পরেও তারা মানুষপূজার দিকে ফিরে গেছে’।[17] তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে কোন মুসলিম রাষ্ট্র নেই বা কোন মুসলিম সমাজ নেই’।[18] তিনি মুসলমানদের সমাজকে জাহেলী সমাজ এবং তাদের মসজিদগুলিকে ‘জাহেলিয়াতের ইবাদতখানা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[19] তিনি মাওলানা মওদূদীর ন্যায় আল্লাহ্র ইবাদত ও সরকারের আনুগত্যকে সমান মনে করেছেন এবং অনৈসলামী সরকারের আনুগত্য করাকে ‘ঈমানহীনতা’ গণ্য করেছেন।[20] ‘একটি বিষয়েও অন্যের অনুসরণ করলে সে ব্যক্তি আল্লাহ্র দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে’ বলে তিনি ধারণা করেছেন।[21] তিনি বলেন, ইসলামে জিহাদের উদ্দেশ্য হ’ল, ইসলাম বিরোধী শাসনের বুনিয়াদ সমূহ ধ্বংস করে দেয়া এবং সে স্থলে ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম করা।[22] এভাবে বিদ্বানগণ তাঁর অন্যান্য বই ছাড়াও কেবল তাফসীর ‘ফী যিলালিল কুরআনে’ আক্বীদাগত ও অন্যান্য বিষয়ে ১৮১টি ভুল চিহ্নিত করেছেন।[23]

মাওলানা মওদূদী ও সাইয়িদ কুতুবের চিন্তাধারায় কোন পার্থক্য নেই। কবীরা গোনাহগার মুসলমানদের তারা মুসলমান হিসাবে মেনে নিতে চাননি। বরং তাদেরকে মুসলিম উম্মাহ থেকে খারিজ বলে ধারণা করেছেন। এর ফলে তাঁরা ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। সাথে সাথে পথচ্যুত করেছেন তাদের অনুসারী অসংখ্য মুসলিমকে। অথচ এর কোন বাস্তবতা এমনকি রাসূল (ছাঃ)-এর যুগেও ছিল না। তখনও মুসলমানদের মধ্যে ভাল-মন্দ, ফাসিক-মুনাফিক সবই ছিল। কিন্তু কাউকে তাঁরা কাফির এবং মুসলিম উম্মাহ থেকে খারিজ বলতেন না। সেকারণ আধুনিক বিদ্বানগণ এসব দল ও এদের অনুসারী দলসমূহকে এক কথায় ‘জামা‘আতুত তাকফীর’ অর্থাৎ ‘অন্যকে কাফের ধারণাকারী দল’ বলে অভিহিত করে থাকেন। অথচ এইসব চরমপন্থী আক্বীদার ফলে যিনি মারছেন ও যিনি মরছেন, উভয়ে মুসলমান। আর এটাই তো শয়তানের পাতানো ফাঁদ, যেখানে তারা পা দিয়েছেন।

অতএব সকলের কর্তব্য হবে সর্বাবস্থায় আমর বিন মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকারের মৌলিক দায়িত্ব পালন করা এবং মুসলিম-অমুসলিম সকলের নিকট ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা।

সরকারের আনুগত্যমুক্ত হওয়া :

সরকারের সুস্পষ্ট কুফরী প্রমাণিত হলে তার আনুগত্যমুক্ত হওয়া যাবে।[24] তবে সেটা কল্যাণকর হবে কি-না, সে বিষয়ে অবশ্যই দেশের বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিবেন এবং মুসলিম নাগরিকগণ তাদের অনুসরণ করবেন। শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বেশী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিদ্রোহ করা যাবে না। বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কোন ফায়ছালা নাযিল হয়। বস্ত্ততঃ আল্লাহ সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী’ (বাক্বারাহ ২/১০৯, তওবা ৯/২৪)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নেতা তারাই, যাদেরকে তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদেরকে ভালবাসে। তোমরা তাদের জন্য দো‘আ কর এবং তারাও তোমাদের জন্য দো‘আ করে। আর তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট নেতা তারাই, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। তোমরা তাদের উপর লা‘নত কর, তারাও তোমাদের উপর লা‘নত করে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সে সময় তাদের আনুগত্যমুক্ত হব না? তিনি বললেন, না। যতক্ষণ না তারা তোমাদের মধ্যে ছালাত কায়েম করে। না যতক্ষণ না তারা তোমাদের মধ্যে ছালাত কায়েম করে। ‘সাবধান! যখন কাউকে তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়, অতঃপর তার মধ্যে আল্লাহ্র নাফরমানীর কোন কিছু পরিলক্ষিত হয়। তখন তোমরা সেই নাফরমানীর কাজটিকে অপসন্দ কর (অর্থাৎ সেটা করো না)। কিন্তু তার আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ো না’।  একই রাবী হতে অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন তোমরা তোমাদের শাসকদের কাছ থেকে এমন কিছু দেখবে যা তোমরা অপসন্দ কর, তখন তোমরা তার কাজটিকে অপসন্দ কর। কিন্তু আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিয়ো না’।[25] তিনি বলেন, ‘কেউ তার শাসকের নিকট থেকে অপসন্দনীয় কিছু দেখলে সে যেন তাতে ধৈর্যধারণ করে’।[26] তিনি বলেন, এমতাবস্থায় তাদের হক তাদের দাও এবং তোমাদের হক আল্লাহ্র কাছে চাও’।[27] ‘কেননা তাদের পাপ তাদের উপর এবং তোমাদের পাপ তোমাদের উপর বর্তাবে’।[28] তিনি বলেন, ‘তোমরা তাদের হক দিয়ে দাও। কেননা আল্লাহ শাসকদেরকেই জিজ্ঞেস করবেন তাদের শাসন সম্পর্কে’।[29]

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষেত্রে দু’টি পথ রয়েছে।-

১- যদি শাসক পরিবর্তনের সহজ পথ থাকে, তাহ’লে সেটা করা যাবে।

২- যদি এর ফলে সমাজে অধিক অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থাকে, তাহ’লে ছবর করতে হবে ও সকল প্রকার ন্যায়সঙ্গত পন্থায় সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করতে হবে, যতদিন না তার চাইতে উত্তম কোন বিকল্প সামনে আসে। এর দ্বারাই একজন মুমিন আল্লাহ্র নিকটে দায়মুক্ত হ’তে পারবেন।

কিন্তু যদি তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ না করেন, সরকারকে সুপরামর্শ ও উপদেশ না দেন, বরং অন্যায়ে খুশী হন ও তা মেনে নেন, তাহ’লে তিনি গোনাহগার হবেন ও আল্লাহ্র নিকটে নিশ্চিতভাবে দায়বদ্ধ থাকবেন। মূলতঃ এটাই হ’ল ‘নাহী ‘আনিল মুনকার’-এর দায়িত্ব পালন। যদি কেউ ঝামেলা ও ঝগড়ার অজুহাত দেখিয়ে একাজ থেকে দূরে থাকেন, তবে তিনি কুরআনী নির্দেশের বিরোধিতা করার দায়ে আল্লাহ্র নিকটে দায়ী হবেন।

শাসক বা সরকারকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার সাথে সাথে তার কল্যাণের জন্য সর্বদা আল্লাহ্র নিকটে দো‘আ করতে হবে। কেননা শাসকের জন্য হেদায়াতের দো‘আ করা সর্বোত্তম ইবাদত ও নেকীর কাজ সমূহের অন্তর্ভুক্ত।

জিহাদ ঘোষণা :

শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার অধিকার হ’ল মুসলমানদের সর্বসম্মত আমীরের (নিসা ৪/৫৯)। অন্য কারু নয়। ‘সর্বসম্মত’ বলতে ঐ শাসক যার প্রতি ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সকলে অনুগত থাকে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল। আর তারা ছালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। যখন তারা এরূপ করবে, তখন আমার পক্ষ হ’তে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে, ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের (অন্তরের) হিসাব আল্লাহ্র উপর ন্যস্ত থাকবে’।[30]

এখানে রাসূল (ছাঃ) আদিষ্ট হয়েছেন, কেননা তিনি ছিলেন উম্মতের নেতা। তিনি মাদানী জীবনে আল্লাহ্র হুদূদ বা দন্ডবিধিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখতেন। পরবর্তী সময়ে এই ক্ষমতা খলীফাগণ ও ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকগণ সংরক্ষণ করেন। কোন মুসলিম ব্যক্তি বা দল যে কোন সময়ে যে কারু উপরে উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না।

যেমন উসামা বিন যায়েদ (রাঃ)-এর প্রসিদ্ধ হাদীছে এসেছে যে, সপ্তম হিজরীর রামাযান মাসে জুহায়না গোত্রের বিরুদ্ধে তিনি একটি ক্ষুদ্র সেনাদলের সাথে প্রেরিত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল অনধিক ১৬ বছর। শত্রুপক্ষ পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের এক ব্যক্তি তার সামনে পড়ে যায় ও দ্রুত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে। এটা তার চালাকি ভেবে তিনি তাকে হত্যা করে ফেলেন। পরে এ খবর শুনে রাসূল (ছাঃ) ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বলেন, ‘সে সত্যভাবে বলেছে কি-না তা জানার জন্য তুমি কেন তার হৃদয় ফেঁড়ে দেখলে না? ক্বিয়ামতের দিন যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এসে তোমার সামনে দাঁড়াবে, তখন তুমি কি করবে? একথা তিনি বারবার বলতে থাকেন (কঠিন পরিণতি বুঝানোর জন্য)’।[31] এই ঘটনার পর উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) কসম করেন যে, তিনি কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে কখনোই যুদ্ধ করবেন না। সেকারণ তিনি আলী (রাঃ)-এর সময় উটের যুদ্ধে বা ছিফফীন যুদ্ধে যোগদান করেননি। হযরত সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)ও একই নীতির উপর ছিলেন। ইমাম কুরতুবী বলেন, এতে দলীল রয়েছে যে, বিধান প্রযোজ্য হবে বাহ্যিক বিষয়ের উপর, অন্তরের বিষয়ের উপর নয়’।[32]

উপরোক্ত হাদীছদ্বয়ে প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ব্যতীত কোন দল বা ব্যক্তি এককভাবে কারু বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ঘোঘণা করতে পারে না। আর বাহ্যিক বিষয়ের উপরেই সিদ্ধান্ত হবে, কারু অন্তরের বিষয়ের উপর নয়।

দন্ডবিধি প্রয়োগ :

ইসলামী হুদূদ বা দন্ডবিধি সমূহ যে কেউ প্রয়োগ করতে পারে না। বরং এজন্য সর্বোচ্চ বৈধ কর্তৃপক্ষ থাকতে হবে। আর তা হ’ল শারঈ আদালতের অভিজ্ঞ ও আল্লাহভীরু মুসলিম বিচারপতিগণ। যারা ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী ফায়ছালা দিবেন এবং দেশের শাসক তা কার্যকর করবেন। যদি কোন দেশে মুসলমানদের এরূপ কোন বৈধ শাসক না থাকে, তাহ’লে স্রেফ আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার-এর দাওয়াতই যথেষ্ট হবে। কেননা এটাই মুসলিম উম্মাহ্র প্রধান দায়িত্ব (আলে ইমরান ৩/১১০)। এতদ্ব্যতীত অন্যভাবে একে অপরের উপর উক্ত দন্ডবিধি প্রয়োগের কোন অবকাশ নেই। তাতে সমাজে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বেশী হবে। সর্বোপরি ইসলাম থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিবে।

ইবনুল ‘আরাবী বলেন, মাল-সম্পদ ও অন্যান্য দাবী-দাওয়ার বিচার-ফায়ছালা অন্যেরা করতে পারে। কিন্তু দন্ডবিধি কার্যকর করার অধিকার কেবল শাসনকর্তার।[33]

অমুসলিম বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশসমূহে মুসলিমদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী শাসন ও বিচার ব্যবস্থার জন্য পৃথক ইসলামী শারী‘আহ কাউন্সিল ও শারঈ আদালত থাকা আবশ্যক। যাতে মুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে এবং তাদের মধ্যে বঞ্চনার ক্ষোভ ধূমায়িত না হয়।

চরমপন্থী উদ্ভবের কারণ ও প্রতিকার :

বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ইসলামের নামে চরমপন্থী দলসমূহ উদ্ভবের অন্যতম প্রধান কারণ হ’ল সেইসব সরকারের চরমপন্থী আচরণসমূহ। গণতন্ত্রের নামে ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলি সচেতন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনসমূহের উপর সর্বত্র নিষ্ঠুর দমননীতি চালাচ্ছে এবং ধার্মিক মুসলমানদেরকে তারা নিজেদের মনগড়া আইনে নির্যাতিত হতে বাধ্য করছে। যেমন প্রায় সকল মুসলিম দেশে সূদী অর্থনীতি চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের মুসলিম নাগরিকদের হারাম খেতে বাধ্য করা হচ্ছে। দেশের আদালতগুলিতে ইহূদী-নাছারাদের তৈরী করা আইনে অথবা তাদের অনুকরণে সরকারের মনগড়া আইনে বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে। এতে অধিকাংশেরই অন্যায় বিচারে জেল-ফাঁস হচ্ছে। ইসলামী বিচার ব্যবস্থা ও দন্ডবিধিসমূহকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। ফলে সমাজবিরোধী ও দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। অন্যদিকে দলবাজি রাজনীতির তিক্ত ফল হিসাবে যে যাকে প্রতিপক্ষ ভাবছে, তাকেই গুম, খুন, অপহরণ, পুলিশী নির্যাতন, মিথ্যা মামলা প্রভৃতি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও হাজতের নামে বছরের পর বছর ধরে নিরীহ নির্দোষ মানুষকে কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হচ্ছে। ক্ষমতায়নের নামে নারীকে পুরুষের পাশাপাশি বসানো হচ্ছে। সাথে সাথে স্বনির্ভরতার নামে তাদেরকে নির্মাণ শ্রমিক, শিল্প শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক প্রভৃতি অমানবিক ও ক্লেশকর কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। মুসলিম মেয়েদের পর্দা করা ফরয। অথচ তাদেরকে পর্দাহীনতায় উসকে দেওয়া হচ্ছে এবং ছেলেদের সঙ্গে সহশিক্ষায় ও সহকর্মকান্ডে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে মুসলমানদেরকে তাদের ধর্মীয় অধিকার থেকে যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। অথচ ইসলামের বাইরে সবকিছুই হ’ল ‘জাহেলিয়াত’। যেসবের অনুসরণ করতে তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে মুসলমানদের মৌলিক অধিকারের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধান কামনা করে? অথচ দৃঢ় বিশ্বাসীদের নিকটে আল্লাহ্র চাইতে বিধান দানে উত্তম আর কে আছে? (মায়েদাহ ৫/৫০)। অতএব ইসলামপন্থীদের চরমপন্থী বলার আগে গণতন্ত্রীদের আল্লাহদ্রোহিতা ও চরমপন্থী আচরণ বন্ধ করা আবশ্যক। সাথে সাথে নামধারী মুসলিম শাসকদের তওবা করে খাঁটি মুসলমান হওয়া প্রয়োজন। নইলে তারা আল্লাহ্র গযবের শিকার হবেন। যেখান থেকে বাঁচার কোন উপায় তাদের থাকবে না। তারা ইহকাল ও পরকাল দু’টিই হারাবেন।

মুমিনের করণীয় :

এক্ষণে অমুসলিম বা ফাসেক মুসলিম উভয় সরকারের বিরুদ্ধে মুমিনের  কর্তব্য হ’ল- (১) উত্তম পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।[34] (২) দেশে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গঠন করা এবং বৈধপন্থায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। কেননা আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ঐ জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (রা‘দ ১৩/১১)। (৩) বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করা।[35] (৪) সরকারের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করা।[36] (৫) সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র নিকটে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করা।[37]

এভাবে সকল প্রকার বৈধ পন্থায় দেশে ইসলামী আইন ও বিধান প্রতিষ্ঠায় সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। যাতে সরকার ইসলামী দাবীর প্রতি নমনীয় হয়। কিন্তু কোন অবস্থাতেই আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা যাবে না।

উল্লেখ্য যে, প্রতিষ্ঠিত কোন মুসলিম সরকারকে উৎখাতের কোন বৈধতা ইসলাম দেয়নি। এজন্য জিহাদ ও ক্বিতালের নামে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা চরমপন্থী তৎপরতার কোন অনুমতি ইসলামে নেই। সাথে সাথে ব্যালটের নামে যে দলাদলির নির্বাচন ব্যবস্থা বর্তমানে চলছে, তা স্রেফ প্রতারণামূলক ও যবরদস্তিমূলক। এতে সমাজে বিভক্তি ও হিংসা-হানাহানি ।মেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গণপ্রত্যাশা ও মানবাধিকার প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে। এজন্য আল্লাহভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা এবং দল ও প্রার্থীবিহীন ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে জনমত গঠন করা সবচেয়ে যরূরী।

সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াতের ব্যাখ্যা :

যেসব মুসলিম সরকার ইসলামী বিধান অনুযায়ী দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করেনা বা যেসব আদালত তদনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করেনা, তাদেরকে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করে তাদের হত্যা করার পক্ষে নিম্নের আয়াতটিকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার বা শাসন করেনা, তারা কাফের’ (মায়েদাহ ৫/৪৪)। এর পরে ৪৫ আয়াতে রয়েছে ‘তারা যালেম’ এবং ৪৭ আয়াতে রয়েছে, ‘তারা ফাসেক’। একই অপরাধের তিন রকম পরিণতি : কাফের, যালেম ও ফাসেক।

এখানে ‘কাফের’ অর্থ ইসলাম থেকে খারিজ প্রকৃত ‘কাফের’ বা ‘মুরতাদ’ নয়। বরং এর অর্থ আল্লাহ্র বিধানের অবাধ্যতাকারী কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি। কিন্তু চরমপন্থীরা এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে মুসলিম সরকারকে প্রকৃত ‘কাফের’ আখ্যায়িত করে এবং তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নামতে তরুণদের প্ররোচিত করে।

বিগত যুগে এই আয়াতের অপব্যাখ্যা করে চরমপন্থী ভ্রান্ত ফের্কা খারেজীরা চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ)-কে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করে তাঁকে হত্যা করেছিল। আজও ঐ ভ্রান্ত আক্বীদার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশের মুসলিম বা অমুসলিম সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যা বিশ্বব্যাপী ইসলামের শান্তিময় ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করছে। সম্ভবতঃ একারণেই রাসূল (ছাঃ) খারেজীদেরকে ‘জাহান্নামের কুকুর’ বলেছেন।[38] মানাবী বলেন, এর কারণ হ’ল তারা ইবাদতে অগ্রগামী। কিন্তু অন্তরসমূহ ব।তায় পূর্ণ। এরা মুসলমানদের কোন বড় পাপ করতে দেখলে তাকে ‘কাফের’ বলে ও তার রক্ত হালাল জ্ঞান করে। যেহেতু এরা আল্লাহ্র বান্দাদের প্রতি কুকুরের মত আগ্রাসী হয়, তাই তাদের কৃতকর্মের দরুণ জাহান্নামে প্রবেশকালে তারা কুকুরের মত আকৃতি লাভ করবে’।[39] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) এদেরকে ‘আল্লাহ্র নিকৃষ্টতম সৃষ্টি’ মনে করতেন। কেননা তারা কাফিরদের উদ্দেশ্যে বর্ণিত আয়াতগুলিকে মুসলিমদের উপরে প্রয়োগ করে থাকে’।[40] বস্ত্ততঃ উক্ত আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা সেটাই, যা ছাহাবায়ে কেরাম করেছেন। যেমন-

(১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে অস্বীকার করল সে কুফরী করল। আর যে ব্যক্তি তা স্বীকার করল, কিন্তু সে অনুযায়ী বিচার করল না সে যালিম ও ফাসিক।[41] অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘তোমরা এ কুফরী দ্বারা যে অর্থ বুঝাতে চাচ্ছ, সেটা নয়। কেননা এটি ঐ কুফরী নয়, যা কোন মুসলমানকে ইসলামের গন্ডী থেকে বের করে দেয়। বরং এর দ্বারা বড় কুফরের নিম্নের কুফর, বড় যুলুমের নিম্নের যুলুম ও বড় ফিসকের নিম্নের ফিসক বুঝানো হয়েছে।[42]

(২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) ও হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, এটা মুসলিম, ইহূদী, কাফের সকল প্রকার লোকের জন্য সাধারণ হুকুম যারা আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করে না। অর্থাৎ যারা বিশ্বাসগতভাবে (আল্লাহ্র বিধানকে) প্রত্যাখ্যান করে এবং অন্য বিধান দ্বারা বিচার ও শাসন করাকে হালাল বা বৈধ মনে করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি উক্ত কাজ করে, অথচ বিশ্বাস করে যে সে হারাম কাজ করছে, সে ব্যক্তি মুসলিম ফাসেকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তার বিষয়টি আল্লাহ্র উপর ন্যস্ত। তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন, চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন’ (কুরতুবী, মায়েদাহ ৪৪/আয়াতের তাফসীর)।

(৩) তাবেঈ বিদ্বান ইকরিমা, মুজাহিদ, আত্বা ও তাঊসসহ বিগত ও পরবর্তী যুগের আহলে সুনণাত বিদ্বানগণের সকলে কাছাকাছি একই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।[43] এটাই হল ছাহাবী ও তাবেঈগণের ব্যাখ্যা। যারা হলেন আল্লাহ্র কিতাব এবং ইসলাম ও কুফর সম্পর্কে উম্মতের সেরা বিদ্বান ও সেরা বিজ্ঞ ব্যক্তি।

পরবর্তীরা এ ব্যাপারে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদল চরমপন্থী। যারা কবীরা গোনাহগার মুমিনকে কাফের বলে ও তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী গণ্য করে এবং তার রক্ত হালাল মনে করে। এরা হ’ল প্রথম যুগের ভ্রান্ত ফের্কা ‘খারেজী’ ও পরবর্তী যুগে তাদের অনুসারী হঠকারী লোকেরা। আরেক দল এ ব্যাপারে চরম শৈথিল্যবাদ প্রদর্শন করে এবং কেবল হৃদয়ে বিশ্বাস অথবা মুখে স্বীকৃতিকেই পূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য যথেষ্ট মনে করে। বস্ত্ততঃ এই দলের লোকসংখ্যাই সর্বদা বেশী। এরা পূর্ববর্তী ভ্রান্ত ফের্কা ‘মুর্জিয়া’ দলের অনুসারী। দু’টি দলই বাড়াবাড়ির দুই প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে।

(৪) আববাসীয় খলীফা মামূন (১৯৮-২১৮ হিঃ)-এর দরবারে জনৈক ‘খারেজী’ এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, কোন্ বস্ত্ত তোমাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে? জবাবে সে বলল, আল্লাহ্র কিতাবের একটি আয়াত। তিনি বললেন, সেটি কোন আয়াত? সে বলল, সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াত। খলীফা বললেন, তুমি কি জানো এটি আল্লাহ্র নাযিলকৃত? সে বলল, জানি। খলীফা বললেন, এ বিষয়ে তোমার প্রমাণ কি? সে বলল, উম্মতের ঐক্যমত (ইজমা)। তখন খলীফা তাকে বললেন, তুমি যেমন আয়াত নাযিলের ব্যাপারে ইজমার উপরে খুশী হয়েছ, তেমনি উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়ও উম্মতের ইজমার উপরে সন্তুষ্ট হও’। সে বলল, আপনি সঠিক কথা বলেছেন। অতঃপর সে খলীফাকে সালাম দিয়ে বিদায় হ’ল’।[44]

আরও দেখুন:  ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবকদের অবদান

(৫) সঊদী আরবের সাবেক প্রধান মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী শাসন বা বিচার করেনা, সে ব্যক্তি চারটি বিষয় থেকে মুক্ত নয় : (১) তার বিশ্বাস মতে মানুষের মনগড়া আইন আল্লাহ্র আইনের চাইতে উত্তম। অথবা (২) সেটি শারঈ বিধানের ন্যায়। অথবা (৩) শারঈ বিধান উত্তম, তবে এটাও জায়েয। এরূপ বিশ্বাস থাকলে সে কাফির এবং মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কিন্তু (৪) যদি সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্র বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান বৈধ নয়। তবে সে অলসতা বা উদাসীনতা বশে বা পরিস্থিতির চাপে এটা করে, তাহ’লে সেটা ছোট কুফরী হবে ও সে কবীরা গোনাহগার হবে। কিন্তু মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হবে না’।[45]

যেমন হাবশার (ইথিওপিয়া) বাদশাহ নাজাশী ইসলাম কবুল করেছিলেন এবং সে মর্মে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রেরিত দূতের নিকট তিনি বায়‘আত নিয়েছিলেন ও পত্র প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু দেশের নাগরিকগণ খ্রিষ্টান হওয়ায় তিনি নিজ দেশে ইসলামী বিধান চালু করতে পারেননি। এজন্য তিনি দায়ী ছিলেন না। বরং পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল। সেকারণ ৯ম হিজরীতে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীগণকে নিয়ে তার গায়েবানা জানাযা পড়েন।[46] কারণ অমুসলিম দেশে তাঁর জানাযা হয়নি।[47]

(৬) শায়খ নাছেরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, কুফর, যুলুম, ফিসক সবগুলিই বড় ও ছোট দু’প্রকারের। যদি কেউ আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা না করে, সূদী লেন-দেন, যেনা-ব্যভিচার বা অনুরূপ স্পষ্ট হারামগুলিকে হালাল জ্ঞান করে, সে বড় কাফের, যালেম ও ফাসেক হবে। আর বৈধ জ্ঞান না করে পাপ করলে সে ছোট কাফের, যালেম ও ফাসেক হবে ও মহাপাপী হবে’।[48] যা তওবা ব্যতীত মাফ হবে না।

কাফের বলার দলীল হিসাবে আরও কয়েকটি আয়াত :

সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াতটি ছাড়াও আরও কয়েকটি আয়াতকে মুসলমানকে ‘কাফের’ বলার পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। যেমন- সূরা নিসা ৬৫, তওবা ৩১, শূরা ২১ ও আন‘আম ১২১ প্রভৃতি।

(১) নিসা ৬৫। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদীয় বিষয়ে তোমাকে ফায়ছালা দানকারী হিসাবে মেনে নিবে। অতঃপর তোমার দেওয়া ফায়ছালার ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ না রাখবে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নিবে’।

সাইয়িদ কুতুব অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন ‘তাগূতের অনুসারী ঐসব লোকেরা ‘ঈমানের গন্ডী থেকে বেরিয়ে যাবে। মুখে তারা যতই দাবী করুক না কেন’।[49] অথচ ‘তারা মুমিন হতে পারবে না’ এর প্রকৃত অর্থ হবে, ‘তারা পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না’। কারণ উক্ত আয়াত নাযিল হয়েছিল দু’জন মুহাজির ও আনছার ছাহাবীর পরস্পরের জমিতে পানি সেচ নিয়ে ঝগড়া মিমাংসার উদ্দেশ্যে।[50] দু’জনই ছিলেন বদরী ছাহাবী এবং দু’জনই ছিলেন স্ব স্ব জীবদ্দশায় ক্ষমাপ্রাপ্ত ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত। অতএব তাদের কাউকে মুনাফিক বা কাফির বলার উপায় নেই। কিন্তু চরমপন্থী খারেজী ও শী‘আপন্থী মুফাসসিরগণ তাদের ‘কাফের’ বলায় প্রশান্তি বোধ করে থাকেন। তারা আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ নিয়েছেন ও সকল কবীরা গোনাহগারকে ‘কাফের’ সাব্যস্ত করেছেন। অথচ তারা আরবীয় বাকরীতি এবং হাদীছের প্রতি লক্ষ্য করেননি। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ্র কসম! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয় (৩ বার), যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টকারিতা হতে নিরাপদ নয়’।[51] তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটা ভালবাসবে যা সে তার নিজের জন্য ভালবাসে’।[52] এসব হাদীছের অর্থ ঐ ব্যক্তি ঈমানহীন কাফের নয়, বরং পূর্ণ মুমিন নয়। একইভাবে কবীরা গোনাহগার মুমিন ‘কাফের’ হবে না বরং সে ‘পূর্ণ মুমিন’ হবে না।

(২) তওবা ৩১। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম-ওলামা ও পোপ-পাদ্রীদের এবং মারিয়াম পুত্র মসীহ ঈসাকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করেছে। অথচ তাদের প্রতি কেবল এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র এক উপাস্যের ইবাদত করবে। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আর তারা যাদেরকে শরীক সাব্যস্ত করে, তিনি সে সব থেকে পবিত্র’।

অত্র আয়াতের তাফসীরে সাইয়িদ কুতুব বলেছেন, ‘এরা মুশরিক এবং তা ঐ শিরক, যা তাদেরকে মুমিনদের গন্ডী থেকে বের করে কাফিরদের গন্ডীতে প্রবেশ করাবে’।[53] অথচ এর ব্যাখ্যায় প্রায় সকল মুফাসসির বলেছেন যে, তারা তাদেরকে প্রকৃত ‘রব’ ভাবত না। বরং তাদের অন্যায় আদেশ-নিষেধসমূহ মান্য করত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) ও যাহহাক বলেন, ‘ইহূদী-নাছারাদের সমাজ ও ধর্মনেতাগণ তাদেরকে সিজদা করার জন্য বলেননি। বরং তারা আল্লাহ্র অবাধ্যতামূলক কাজে লোকদের হুকুম দিতেন এবং তারা তা মান্য করত। আর সেজন্যই আল্লাহ পাক ঐসব আলেম, সমাজনেতা ও দরবেশগণকে ‘রব’ হিসাবে অভিহিত করেছেন’।[54] হযরত হুযায়ফা (রাঃ)ও অনুরূপ বলেন (কুরতুবী)।

ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, যদি কেউ আক্বীদাগত ভাবে হারামকে হালাল করায় বিশ্বাসী হয়, তবে সে কাফের হবে। কিন্তু যদি আক্বীদাগতভাবে এতে বিশ্বাসী না হয়। কিন্তু গোনাহের আনুগত্য করে, তবে সে কবীরা গোনাহগার হবে। এমনকি হারামকে হালালকারী ব্যক্তি যদি মুজতাহিদ হয় এবং তার কাছে উক্ত বিষয়ে সত্য অস্পষ্ট থাকে এবং সে আল্লাহকে সাধ্যমত ভয় করে, তবে সে ব্যক্তি তার গোনাহের জন্য আল্লাহ্র নিকট পাকড়াও হবে না’। তিনি বলেন, কুরআন ও হাদীছে বহু গোনাহের ক্ষেত্রে এরূপ কুফর ও শিরকের শব্দ বর্ণিত হয়েছে’।[55] বস্ত্ততঃ এটাই হল সঠিক ব্যাখ্যা। যা আহলেসুন্নাত বিদ্বানগণের নিকটে গৃহীত।

(৩) শূরা ২১। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কি এমন কিছু শরীক আছে যারা তাদের জন্য দ্বীনের কিছু বিধান প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? ক্বিয়ামতের দিন তাদের বিষয়ে ফায়ছালার সিদ্ধান্ত না থাকলে এখুনি তাদের নিষ্পত্তি হয়ে যেত। নিশ্চয়ই যালেমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (শূরা ৪২/২১)।

উক্ত আয়াতে একথা বর্ণিত হয়েছে যে, আইন প্রণয়নের অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহ্র জন্য নির্দিষ্ট। যার কোন শরীক নেই। এক্ষণে যদি কেউ তাতে ভাগ বসায় এবং নিজেরা আইন রচনা করে, তাহ’লে সে মুশরিক হবে। শিরকের উক্ত প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করেছেন খারেজী আক্বীদার অনুসারী মুফাসসিরগণ। ফলে যেসব মুসলিম সরকার কোন একটি আইনও রচনা করেছে, যা আল্লাহ্র আইনের অনুকূলে নয়, তাদেরকে তারা মুশরিক ও মুরতাদ ধারণা করেছেন এবং তাদেরকে হত্যা করা সিদ্ধ মনে করেছেন। অথচ পূর্বের আয়াতগুলির ন্যায় এ আয়াতের অর্থ তারা প্রকৃত মুশরিক নয়, বরং কবীরা গোনাহগার। কেননা এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ্র ইবাদতে শরীক করা নয়। বরং জিন ও ইনসানরূপী শয়তানরা হালাল ও হারামের যেসব বিধান রচনা করে, সে সবের অনুসরণ করা। কোন সরকার এগুলি করলে এবং আল্লাহ্র আইনের বিরুদ্ধে সেটাকে উত্তম, সমান অথবা সিদ্ধ মনে করলে ঐ সরকার স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হবে। কিন্তু তা মনে না করলে সে কবীরা গোনাহগার হবে। ইবনু জারীর, ইবনু কাছীরসহ আহলে সুন্নাতের সকল বিদ্বান এরূপ তাফসীর করেছেন।

(৪) আন‘আম ১২১। আল্লাহ বলেন, ‘যে সব পশু যবেহকালে আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা তোমরা ভক্ষণ করো না। নিশ্চয়ই সেটি ফাসেকী কাজ। শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের মনে কুমন্ত্রণা প্রবেশ করিয়ে দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিতর্ক করে। এক্ষণে যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তাহ’লে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে’ (আন‘আম ৬/১২১)।

এখানেও পূর্বের ন্যায় প্রকাশ্য অর্থে মুশরিক ও কাফির অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন সাইয়েদ কুতুব বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ছোট একটি প্রশাখাগত বিষয়েও মানুষের রচিত আইনের অনুসরণ করবে, ঐ ব্যক্তি নিঃসন্দেহে ‘মুশরিক’ হবে। যদিও সে আসলে ‘মুসলমান’। অতঃপর তার কাজ তাকে ইসলাম থেকে শিরকের দিকে বের করে নিয়ে গেছে। যদিও সে মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দান অব্যাহত রাখে। কেননা ইতিমধ্যেই সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সাথে মিলিত হয়েছে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যের আনুগত্য করেছে’।[56]

নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য :

মুসলিম সরকারকে ‘কাফির’ বলা ছাড়াও এইসব মুফাসসিরগণ নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল ‘রাষ্ট্র কায়েম করা ও শাসনক্ষমতা দখল করা’ বলে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের অপব্যাখ্যা করেছেন। যেমন,

(ক) শূরা ১৩। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন সেই দ্বীন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমরা প্রত্যাদেশ করেছি তোমার প্রতি ও যার আদেশ দিয়েছিলাম আমরা ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর ও তার মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। তুমি মুশরিকদের যে বিষয়ের দিকে আহবান কর, তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং তিনি পথ প্রদর্শন করেন ঐ ব্যক্তিকে, যে তাঁর দিকে প্রণত হয়’ (শূরা ৪২/১৩)।

অত্র আয়াতে বর্ণিত ‘আক্বীমুদ্দীন’ অর্থ ‘তোমরা তাওহীদ কায়েম কর’। নূহ (আঃ) থেকে মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলকে আল্লাহ একই নির্দেশ দিয়েছিলেন। সকল মুফাসসির এই অর্থই করেছেন। যেমন আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত করো এবং ত্বাগূতকে বর্জন করো’ (নাহল ১৬/৩৬)। যার দ্বারা ‘তাওহীদে ইবাদত’ বুঝানো হয়েছে।

কিন্তু তারা অর্থ করেছেন ‘তোমরা হুকূমত কায়েম করো’। এর পক্ষে তারা একটি হাদীছেরও অপব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই বনু ইস্রাঈলকে পরিচালনা করতেন নবীগণ। যখন একজন নবী মারা যেতেন, তখন তার স্থলে আরেকজন নবী আসতেন’।[57]

এখানে এর অর্থ তারা করেছেন ‘নবীগণ বনু ইস্রাঈলদের মধ্যে রাজনীতি করতেন’। অর্থাৎ নবীগণ সবাই তাদের মত ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করেছেন। অতএব আমাদেরও সেটা করতে হবে। অথচ নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘আমরা নবীগণকে স্রেফ এজন্যই প্রেরণ করে থাকি যে, তারা (ঈমানদারগণকে জান্নাতের) সুসংবাদ দিবে ও (মুশরিকদের জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শন করবে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না’ (আন‘আম ৬/৪৮)। অতঃপর শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তাকে বলতে বলেছেন, ‘তুমি বল, যা আল্লাহ ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমি আমার নিজের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক নই। যদি আমি অদৃশ্যের খবর রাখতাম, তাহ’লে আমি অধিক কল্যাণ অর্জন করতাম এবং কোনরূপ অমঙ্গল আমাকে স্পর্শ করত না। আমি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদ দানকারী মাত্র’ (আ‘রাফ ৭/১৮৮)। আর মুসলিম উম্মাহ্র দায়িত্ব হ’ল ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার’। অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা (আলে ইমরান ৩/১১০)। যা সর্বাবস্থায় মুমিন করবে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। এজন্য তাকে ইসলামী রাজনীতির নামে পৃথকভাবে কোন রাজনীতি করার প্রয়োজন হবে না বা ক্ষমতা দখল করতে হবে না। আর আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার-এর উদ্দেশ্য হবে মানুষকে শিরকের কলুষ-কালিমা থেকে পবিত্র করে আল্লাহ্র অনুগত বানানোর চেষ্টা করা। যেমন আল্লাহ শেষনবীকে প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘বিশ্বাসীদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনান ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত (কুরআন ও সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল’ (আলে ইমরান ৩/১৬৪; জুমু‘আহ ৬২/২)।

এতে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, যুগে যুগে নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল আখেরাতভোলা মানুষকে আখেরাতে সাফল্য লাভের পথ দেখানো। তাদেরকে নেকীর কাজে উৎসাহিত করা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা। রাসূলগণ ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করতে দুনিয়ায় আসেননি। বরং তাদের কাজই ছিল ‘তাবশীর ও ইনযার’ তথা জান্নাতের সুসংবাদ শুনানো ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করা। আর এজন্য তাঁদের কর্মপদ্ধতি ছিল ‘তারবিয়াহ ও তাযকিয়াহ’ অর্থাৎ পরিচর্যা করা ও পাপ থেকে পরিশুদ্ধ করা। আজও মুমিনের কর্মপদ্ধতি সেটাই থাকবে। আর এটাই হ’ল সর্বোত্তম পদ্ধতি। যা রাসূল (ছাঃ) প্রতি খুৎবাতে বলতেন, ‘শ্রেষ্ঠ হেদায়াত হ’ল মুহাম্মাদের হেদায়াত’।[58]

অথচ প্রতি খুৎবায় ও ভাষণে ইসলামী নেতারা এ হাদীছ পাঠ করা সত্ত্বেও তাঁরা রাসূল (ছাঃ)-এর শ্রেষ্ঠ হেদায়াত বাদ দিয়ে ইহূদী-নাছারাদের প্রতারণাপূর্ণ তন্ত্র-মন্ত্রের অনুসারী হয়েছেন। আর তাকেই তাঁরা বলছেন ‘ইসলামী রাজনীতি’। এভাবে তাঁরা হারামকে হালাল করেছেন পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে। অথচ উচিৎ ছিল প্রচলিত বাতিল মতবাদসমূহের বিরুদ্ধে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া হেদায়াতকে প্রতিষ্ঠা দানের জন্য জান-মাল বাজি রেখে প্রচেষ্টা চালানো ও জনগণকে সেদিকে পথ দেখানো। নবীগণ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে দ্বীন কায়েম করেননি। বরং আল্লাহ্র পথে দাওয়াতের মাধ্যমেই দ্বীন কায়েমের কাজ শুরু করেছিলেন। আমাদেরকেও সেইভাবে কাজ করতে হবে। জনৈক দাঈ-র ভাষায়, ‘তোমরা তোমাদের হৃদয়ে ইসলাম কায়েম করো, তাহ’লে তোমাদের মাটিতে ইসলাম কায়েম হবে’। কেননা আক্বীদা পরিচ্ছন্ন না হ’লে কখনো আমল পরিচ্ছন্ন হবে না।

(খ) হাদীদ ২৫। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদি সহকারে এবং তাদের সঙ্গে নাযিল করেছি কিতাব ও ন্যায়দন্ড। যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমরা লৌহ নাযিল করেছি যার মধ্যে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন কে তাকে ও তার রাসূলদেরকে না দেখেও সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা শক্তিমান ও পরা।মশালী’ (হাদীদ ৫৭/২৫)।

খারেজীপন্থী মুফাসসিরগণ এখানে ‘লৌহ’ অর্থ করেছেন ‘অঁঃযড়ৎরঃু’ বা ‘শাসনশক্তি’। কেননা তাদের মতে ‘শাসনক্ষমতা প্রয়োগ ছাড়া মানবাধিকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়’। অথচ রাসূলগণ কেউই শাসনক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেননি। বরং তাঁরা হিকমত ও নছীহতের মাধ্যমেই সমাজ সংশোধন করেছেন। আবুবকর, ওমর, ওছমান, আলী, হামযা কেউই অস্ত্রের ভয়ে বা শাসনশক্তির ভয়ে মুসলমান হননি।

কুরআনের এইরূপ অপব্যাখ্যার কারণেই দেখা যায় এইসব চরমপন্থী ও ক্ষমতালোভী দলের লোকেরা সর্বত্র ক্ষমতা পাবার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। এমনকি মসজিদ-মাদরাসার কমিটি দখল এবং ইমাম-মুওয়াযযিন ও শিক্ষক নিয়োগেও তাদের অপতৎপরতা সকলের চোখে পড়ে। ছালাত-ছিয়ামের ফরয ইবাদতকেও এরা ‘মুবাহ’ বলে থাকে। যা আদায় করলে নেকী আছে, না করলে গোনাহ নেই। কারণ তাদের মতে ‘সব ফরযের বড় ফরয’ হ’ল শাসনক্ষমতা দখল করা। সেটা কায়েম না থাকায় তাদের মতে ‘কোন ফরযই বাস্তবে ফরযের পজিশনে নেই। বরং ‘মুবাহ’ অবস্থায় আছে’। তারা তাদের দলের বাইরে কাউকে উদারভাবে ভালবাসতে পারে না। এমনকি কারু সাথে সরল মনে সালাম-মুছাফাহা করতে পারে না। কারণ অন্যেরা তাদের দৃষ্টিতে হয় কাফির নয় ইহূদী। হা-শা ওয়া কাল্লা।

বস্ত্ততঃ এই ধরনের খারেজী তাফসীর বহু যুবকের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়েছে। তারা অবলীলা।মে মুসলিম সরকার ও সমাজকে কাফের ভাবছে ও তাদেরকে বোমা মেরে ধ্বংস করে দেওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ইবনুল ‘আরাবী বলেন, মুশরিকের আনুগত্য করলে মুমিন তখনই মুশরিক হবে, যখন বিশ্বাসগতভাবে সেটা করবে। কিন্তু যখন কর্মগতভাবে করবে, অথচ তার হৃদয় ঈমানে স্বচ্ছ থাকবে, তখন সে মুশরিক বা কাফির হবে না। বরং গোনাহগার হবে’।[59]  বস্ত্ততঃ অন্তর থেকে কালেমা শাহাদাত পাঠকারী কোন মুমিন কবীরা গোনাহের কারণে কাফের হয় না। এটিই হ’ল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আহলেহাদীছের সর্বসম্মত আক্বীদা।

কুফরের প্রকারভেদ:

উপরোক্ত আলোচনায় বুঝা গেল যে, কুফর দু’প্রকার : (১) বিশ্বাসগত কুফরী, যা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। (২) কর্মগত কুফরী, যা খারিজ করে দেয় না। তবে সে মহাপাপী হয়, যা তওবা ব্যতীত মাফ হয় না। প্রথমটি বড় কুফর এবং দ্বিতীয়টি ছোট কুফর।

বড় কুফরের উদাহরণ :

আল্লাহ বলেন, (১) ‘তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় ‘কাফির’ ও কেউ হয় ‘মুমিন’। আর তোমরা যা কর, সবই আল্লাহ দেখেন’ (তাগাবুন ৬৪/২)। (২) ‘তুমি বল, হে কাফিরগণ! আমি ইবাদত করি না যাদের তোমরা ইবাদত কর’ (কাফিরূন ১০৯/১-২)। (৩) ‘নিশ্চয়ই তারা কুফরী করেছে, যারা বলে, আল্লাহ তিন উপাস্যের অন্যতম। অথচ এক উপাস্য ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই’… (মায়েদাহ ৫/৭৩)। (৪) ‘যে ব্যক্তি ঈমানের বদলে কুফরীকে অবলম্বন করে, সে ব্যক্তি সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়’ (বাক্বারাহ ২/১০৮)। (৫) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তিনটি বস্ত্ত যার মধ্যে রয়েছে, সে তার মাধ্যমে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে। (ক) যার নিকটে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সকল কিছু হ’তে প্রিয়তর (খ) যে ব্যক্তি কাউকে স্রেফ আল্লাহ্র জন্য ভালোবাসে এবং (গ) যে ব্যক্তি কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপসন্দ করে, যা থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দিয়েছেন, যেমন সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হ’তে অপসন্দ করে।[60]

(৬) তিনি বলেন, কাফের যখন কোন সৎকর্ম করে, তার বিনিময়ে আল্লাহ তাকে দুনিয়ায় খাদ্য দান করেন। পক্ষান্তরে আল্লাহ মুমিনের নেকীসমূহ আখেরাতের জন্য জমা রাখেন’।[61] (৭) বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি বলেন, ‘যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, তাঁর কসম করে বলছি, ইহূদী হৌক বা নাছারা হৌক এই উম্মতের যে কেউ আমার আগমনের খবর শুনেছে, অতঃপর মৃত্যুবরণ করেছে, অথচ আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার উপরে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে’।[62]

বড় কুফর ৬ প্রকার : (১) ইসলামে মিথ্যারোপ করা (নমল ২৭/৮৩-৮৪) (২) তাকে অস্বীকার করা (নমল ২৭/১৪; বাক্বারাহ ২/৮৯) (৩) ইসলামের বিরুদ্ধে হঠকারিতা করা (বাক্বারাহ ২/৩৪) (৪) এড়িয়ে চলা (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩-৫) (৫) সন্দেহ পোষণ করা (ইবরাহীম ১৪/৯) (৬) অন্তরে অবিশ্বাস রাখা ও মুখে স্বীকার করা (নিসা ৪/৬১)।

এগুলি তিনভাবে হয়ে থাকে : (১) বিশ্বাসগতভাবে। যেমন কাউকে আল্লাহ বা তাঁর গুণাবলীতে শরীক সাব্যস্ত করা বা অসীলা নির্ধারণ করা। আল্লাহ্র ইবাদতের ন্যায় অন্যকে সম্মান প্রদর্শন করা। আল্লাহ্র ন্যায় অন্যকে মঙ্গলামঙ্গলের অধিকারী মনে করা। আল্লাহ্র স্ত্রী-পুত্র নির্ধারণ করা। তাঁর কৃত হারামকে যেমন সূদ-ব্যভিচার, মদ্যপান প্রভৃতিকে হালাল জ্ঞান করা ইত্যাদি। (২) কথার মাধ্যমে। যেমন আল্লাহ বা তাঁর রাসূলকে বা ইসলামকে গালি দেওয়া, হেয় করা, উপহাস ও ব্যঙ্গ করা। কুরআন বা তার কোন আয়াতকে অস্বীকার বা তাচ্ছিল্য করা (তওবাহ ৯/৬৫)। (৩) কাজের মাধ্যমে। যেমন কবরে বা ছবি-মূর্তি ও প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করা, সূর্য বা চন্দ্রকে সিজদা করা (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৭)। পবিত্র কুরআনকে তাচ্ছিল্যভরে ছুঁড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি।

যদি কেউ এগুলি জেনে-বুঝে করে এবং বারবার বুঝানো সত্ত্বেও তার ভ্রান্ত বিশ্বাসে অটল থাকে এবং তওবা না করে, তাহ’লে সে স্পষ্ট কাফির এবং ইসলাম থেকে খারিজ ও ‘মুরতাদ’ বলে গণ্য হবে।

আরও দেখুন:  জিহাদ কোন ধরনের ফরয? কাদের উপর এবং কখন ফরয?

উল্লেখ্য যে, মুনাফিকরা বড় কাফের হ’লেও তারা ‘মুরতাদ’ হবে না এবং তাদের উপর দন্ডবিধি জারি হবে না। কেননা তারা বাহ্যিকভাবে ইসলামকে স্বীকার করে। তবে আখেরাতে তারা কাফেরদের সাথেই একত্রে জাহান্নামে থাকবে (নিসা ৪/১৪০)। বরং তারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে (নিসা ৪/১৪৫)।

বড় কুফরীর পরিণতি :

(ক) আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাসী হয়েছে এবং অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কারু কাছ থেকে যমীন ভর্তি স্বর্ণও গ্রহণ করা হবে না। যদি নাকি তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিনিময়ে তা দিতে চায়’ (আলে ইমরান ৩/৯১)।

(খ) তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, তার থেকে সেটি কবুল করা হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (আলে ইমরান ৩/৮৫)। (গ) তিনি আরও বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় যালেম আর কে আছে, যাকে তার প্রতিপালকের আয়াত সমূহ দ্বারা উপদেশ দেওয়া হয়েছে। অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয়ই আমরা পাপীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী’ (সাজদাহ ৩২/২২)।

(ঘ) আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ্র দ্বীন থেকে ফিরে যায় এবং কাফের অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তার ইহকালে ও পরকালে সকল কর্মই নিস্ফল হয়ে যায়। তারা জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে’ (বাক্বারাহ ২/২১৭)। (ঙ) তার দুনিয়াবী শাস্তি হ’ল মৃত্যুদন্ড। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে মুসলমান তার দ্বীন পরিবর্তন করল, তাকে হত্যা কর’।[63] যা আদালতের মাধ্যমে সরকার কার্যকর করবে। না করলে ঐ সরকার কবীরা গোনাহগার হবে এবং আখেরাতে তাকে আল্লাহ্র নিকটে জওয়াবদিহি করতে হবে।

ছোট কুফর:

যারা ঈমানের ছয়টি রুকন ও ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, ইসলামের সকল বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ বিশ্বাস পোষণ করে, হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম মনে করে। এতদসত্ত্বেও অজ্ঞতা, উদাসীনতা ও অলসতাবশে কিংবা পরিস্থিতির চাপে কোন কবীরা গোনাহ করে, সে ব্যক্তি কর্মগত কাফের বা ছোট কাফের হবে। সে মুসলিম উম্মাহ থেকে বহিষ্কৃত হবে না। যেমন-

(১) আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহ’লে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহ্র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনছাফের সাথে মীমাংসা কর এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন’ (হুজুরাত ৪৯/৯)।

আয়াতটি নাযিল হয়েছিল মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার দলের সাথে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর সাথী খাঁটি মুসলমানদের মধ্যে উভয়ের উপস্থিতিতে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া একটি লড়াইকে কেন্দ্র করে। যা রাসূল (ছাঃ)-এর দ্রুত হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়।[64] অত্র আয়াতে মুমিনদের মধ্যকার দু’দলের মধ্যে যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাউকে আল্লাহ ‘কাফের’ আখ্যায়িত করেন নি। যেমন খারেজী, শী‘আ, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুসারীরা সুন্নীদের প্রতি করে থাকে।

(২) বেদুঈনরা বলে, আমরা ঈমান আনলাম। বল, তোমরা ঈমান আনোনি। বরং তোমরা বল, আমরা ইসলাম কবুল করলাম। এখনো পর্যন্ত তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তাহ’লে তিনি তোমাদের আমলসমূহের কোন কিছুই হ্রাস করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (হুজুরাত ৪৯/১৪)। অত্র আয়াতে বেদুঈনদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি বলা হলেও তাদেরকে ইসলামের গন্ডি থেকে বহিষ্কৃত বলা হয় নি। কারণ আল্লাহ ও রাসূলের যথাযথ আনুগত্য না করাটা ছিল তাদের কর্মগত কুফরী; বিশ্বাসগত কুফরী নয়।

(৩) একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। এসময় তাঁর নাতি হাসান বিন আলী মিম্বরের উপরে ছিলেন। তিনি এসময় একবার ঐ বাচ্চার দিকে ও একবার উপস্থিত মুছল্লীদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার এ বেটা হ’ল নেতা। ভবিষ্যতে আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করে দিবেন’।[65]

উল্লেখ্য যে, হযরত আলী (রাঃ) খারেজীদের হাতে নিহত হওয়ার পর পুত্র হাসান (রাঃ) খলীফা হন। অতঃপর যুদ্ধ পরিহার করে পাঁচ মাসের মধ্যে তিনি আমীর মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর অনুকূলে খেলাফত ত্যাগ করেন এবং ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যেকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নিরসন করেন। অত্র হাদীছে রাসূল (ছাঃ) আলী ও মু‘আবিয়া উভয়ের সমর্থক দু’টি বড় দলকে ‘মুসলিম’ বলে অভিহিত করেছেন। কাউকে কাফের বলেননি। উল্লেখ্য যে, এ ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে তাঁর সত্যনবী হওয়ার অকাট্য প্রমাণ লুকিয়ে রয়েছে।

(৪) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকী এবং পরস্পরে যুদ্ধ করা কুফরী’।[66]

(৫) তিনি বলেন, ‘দু’জন মানুষের মধ্যে কুফরী রয়েছে : অন্যের বংশ সম্পর্কে তাচ্ছিল্য করা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা’।[67]

(৬) ‘যে ব্যক্তি গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে এলো এবং সে যা বলল তা বিশ্বাস করল, ঐ ব্যক্তি মুহাম্মাদ-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার সাথে কুফরী করল’।[68]

(৭) ‘তোমরা তোমাদের বাপ-দাদা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। কেননা যে ব্যক্তি তার পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে কুফরী করল’।[69]

(৮) ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে শপথ করল, সে কুফরী করল’।[70]

(৯) তিনি বলেন, ‘(মে‘রাজের সময়) আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। সেখানে অধিকাংশকে আমি নারীদের মধ্য থেকে দেখেছি। জিজ্ঞেস করা হ’ল, তারা কি আল্লাহ্র সঙ্গে কুফরী করেছে? জবাবে তিনি বললেন, তারা তাদের স্বামীদের সাথে কুফরী করেছে। তারা স্বামীদের অনুগ্রহকে অস্বীকার করে। তুমি তার সাথে বহুদিন যাবৎ ভাল ব্যবহার করলেও যখনই তোমার মধ্যে কিছু ত্রুটি দেখে তখনই তারা বলে, কখনো তোমার মধ্যে আমি ভাল কিছু দেখিনি।[71]

(১০) বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পরে  তোমরা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দিয়ে পুনরায় কাফের হয়ে যেয়ো না’।[72]

উপরের আয়াত ও হাদীছগুলি সব কর্মগত কুফরীর উদাহরণ। অতএব যদি কোন সরকার আক্বীদাগতভাবে ইসলামে বিশ্বাসী হয়, কিন্তু কর্মগতভাবে ইসলামের কোন বিধান লংঘন করে, তাহ’লে উক্ত সরকার কবীরা গোনাহগার হবে, কিন্তু কাফের হবে না। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, যদি সরকার ইসলামবিরোধী আইনে খুশী থাকে ও তাতে বিশ্বাসী হয়, তাহ’লে উক্ত কর্মগত কুফরী বিশ্বাসগত কুফরীতে পরিণত হয়ে যাবে এবং তারা তখন প্রকৃত কাফের হবে’।[73] একই হুকুম ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ত্বাগূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ :

‘ত্বাগূত’ অর্থ শয়তান, মূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে, ‘কুরআন ও সুন্নাহ বাদ দিয়ে অন্য কোন বাতিলের কাছে ফায়ছালা তলব করা’। মূলতঃ এটি হ’ল মুনাফিকদের স্বভাব। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি তাদের দেখোনি যারা ধারণা করে যে, তারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে যা তোমার উপর নাযিল হয়েছে তার উপর এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল হয়েছে তার উপর। তারা ত্বাগূতের নিকট ফায়ছালা পেশ করতে চায়। অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাকে অস্বীকার করার জন্য। বস্ত্ততঃ শয়তান তাদেরকে দূরতম ভ্রষ্টতায় নিক্ষেপ করতে চায়’। ‘যখন তাদেরকে বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে, তখন তুমি কপট বিশ্বাসীদের দেখবে তোমার থেকে একেবারেই মুখ ফিরিয়ে নিবে’ (নিসা ৪/৬০-৬১)।

এক্ষণে কোন মুসলিম সরকার যদি কুরআন ও সুন্নাহ্র বিধান বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া বিধান অনুযায়ী দেশ শাসন করে, তবে সে সরকার মুনাফিক ও কবীরা গোনাহগার হবে। কিন্তু যদি সেটাকে আল্লাহ্র বিধানের চাইতে উত্তম বা সমান বা দু’টিই সিদ্ধ মনে করে ও তাতে খুশী থাকে, তাহ’লে উক্ত সরকার প্রকৃত ‘কাফের’ হিসাবে গণ্য হবে। ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে কোন মুসলিম ব্যক্তি বা সরকার কাফের সাব্যস্ত হলেই তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা ফরয নয়। যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে (পৃঃ ৪৫)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন তারা লড়াই করে আল্লাহ্র পথে এবং যারা কাফের তারা লড়াই করে ত্বাগূতের পথে। অতএব তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ কর। নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল সর্বদা দুর্বল হয়ে থাকে’ (নিসা ৪/৭৬)।

এ আয়াত থেকে দলীল নিয়ে অনেকে কবীরা গোনাহগার সরকার ও অন্যান্যদের হত্যা করা সিদ্ধ মনে করেন। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কেননা মুসলমানদের মধ্যে যারা ত্বাগূতের বন্ধু, তারা হ’ল মুনাফিক। যা উপরের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আর কাফেরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ হ’লেও মুনাফিকের বিরুদ্ধে তা হবে নিরস্ত্র। যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে (পৃঃ ৪১)।

আত্মঘাতী হামলা :

জিহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ কিছু ব্যক্তি আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে জান্নাত কামনা করে। অথচ ইসলামে আত্মহত্যা করা মহাপাপ। যতবড় মহৎ উদ্দেশ্যেই তা হৌক না কেন। কেননা জীবন যিনি দিয়েছেন, তা হরণ করার অধিকার কেবল তাঁরই, অন্য কারু নয়। জিহাদের ময়দানে আহত হয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর জনৈক মুসলিম সৈনিক আত্মহত্যা করলে রাসূল (ছাঃ) তাকে ‘জাহান্নামী’ বলে আখ্যায়িত করেন। কেননা তার শেষ আমলটি ছিল জাহান্নামীদের আমল। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ ফাসেক-ফাজেরদের মাধ্যমেও এই দ্বীনকে সাহায্য করে থাকেন’।[74] আল্লাহ বলেন, ‘ তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতীব দয়াশীল’ (নিসা ৪/২৯)।

দ্বীন ধ্বংস করে তিনজন :

(ক) যিয়াদ বিন হুদায়ের (রাঃ) বলেন, আমাকে একদিন হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) বললেন, তুমি কি জানো কোন্ বস্ত্ত ইসলামকে ধ্বংস করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ইসলামকে ধ্বংস করে তিনটি বস্ত্ত : (১) আলেমের পদস্খলন (২) আল্লাহ্র কিতাব নিয়ে মুনাফিকদের ঝগড়া এবং (৩) পথভ্রষ্ট নেতাদের শাসন’।[75]

(খ) খ্যাতনামা তাবেঈ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) বলেন, ‘দ্বীনকে ধ্বংস করে মাত্র তিনজন : অত্যাচারী শাসকবর্গ, দুষ্টমতি আলেমরা ও ছূফী পীর-মাশায়েখরা’।

প্রথমোক্ত লোকদের সামনে ইসলামী শরী‘আত ও রাজনীতি সাংঘর্ষিক হলে তারা রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেয় ও শরী‘আতকে দূরে ঠেলে দেয়।

দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা তাদের রায়-ক্বিয়াস ও যুক্তির সঙ্গে শরী‘আত সাংঘর্ষিক হলে নিজেদের রায়কে অগ্রাধিকার দেয় এবং হারামকে হালাল করে।

তৃতীয় শ্রেণীর লোকেরা তাদের কথিত কাশ্ফ ও রুচির বিরোধী হ’লে শরী‘আতের প্রকাশ্য হুকুম ত্যাগ করে ও কাশফকে অগ্রাধিকার দেয়।[76]

হকপন্থী দল : 

(ক) হযরত ছওবান (রাঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘চিরদিন আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল হক-এর উপরে বিজয়ী থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না এমতাবস্থায় ক্বিয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা ঐভাবে থাকবে’।[77] খানে ‘বিজয়ী’ অর্থ আখেরাতে বিজয়ী।

(খ) হযরত ইমরান বিন হুছায়েন (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে সর্বদা একটি দল থাকবে যারা হক-এর উপর লড়াই করবে। তারা শত্রুপক্ষের উপর বিজয়ী থাকবে। তাদের সর্বশেষ দলটি দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে’।[78]

(গ) জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল ক্বিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা হক-এর উপর লড়াই করবে বিজয়ী অবস্থায়’।[79]

(ঘ) মু‘আবিয়া বিন কুররাহ স্বীয় পিতা হ’তে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন যে, ‘চিরকাল আমার উম্মতের মধ্যে বিজয়ী একটি দল থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবে ক্বিয়ামত এসে যাবে’। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, (আমার উস্তাদ) আলী ইবনুল মাদীনী বলেছেন, তারা হ’ল ‘আহলুল হাদীছ’।[80]

বস্ত্ততঃ পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে চিরকাল আহলুল হাদীছের উক্ত দল থাকবে এবং পথভোলা মানুষকে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের পথে ডাকবে। তারাই হ’ল হাদীছে বর্ণিত ফিরক্বা নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল’।[81] যারা সর্বাবস্থায় পবিত্র কুরআন, ছহীহ হাদীছ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের উপর আমল করে থাকে।[82] আল্লাহ আমাদেরকে আহলুল হাদীছের দলভুক্ত করুন এবং আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সার্বক্ষণিক পাহারাদার মুজাহিদ হিসাবে কবুল করে নিন- আমীন!

– ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব


[1] শারহুস সুন্নাহ, মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৯৬, ৩৬৬৪ ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়।

[2] আবুদাঊদ হা/৪৩৪৪, তিরমিযী; মিশকাত হা/৩৭০৫।

[3] আহমাদ হা/১৫৩৬৯; হাকেম; আলবানী, যিলালুল জানড়বাহ হা/১০৯৮, সনদ ছহীহ।

[4] মুসলিম হা/১৮৫৪, শারহুস সুন্নাহ হা/২৪৫৯, মিশকাত হা/৩৬৭১।

[5] বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৬৬৬।

[6] বুখারী হা/৬১০৪; মুসলিম হা/৬০; মিশকাত হা/৪৮১৫।

[7] নাসাঈ হা/৩৯৮৬; আলবানী, ছহীহুল জামে‘ হা/৪৩৬১।

[8] নাসাঈ হা/৩৯৮৭; তিরমিযী হা/১৩৯৫; মিশকাত হা/৩৪৬২ ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়।

[9] সীরাতে ইবনে হিশাম (মিসর : বাবী হালবী, ২য় সংস্করণ ১৩৭৫/১৯৫৫) ২/৪০৩, ৪১৫; ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীক্বুল মাখতূম (কুয়েত : ২য় সংস্করণ ১৪১৬/১৯৯৬) ৪০৫, ৪০৭ পৃঃ; বুখারী হা/১০৪; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৭২৬।

[10] নাসাঈ হা/৩৯৬৮; বুখারী, মিশকাত হা/১৩।

[11] বায়হাক্বী শু‘আব, ১২ অধ্যায় ২/৩২৯ পৃঃ।

[12] ইবনু মাজাহ হা/১৮৫৩; ছহীহাহ হা/১২০৩।

[13] বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৬২১৬।

[14] ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (রিয়াদ : ১৪০৪ হিঃ) ২৩/৩৪৮-৪৯; আবু ইয়া‘লা, তাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, তাবি) ১/১৬৩-৬৭, ২৪০ পৃঃ।

[15] ইবরাহীম আর-রুহাইলী, আত-তাকফীর ওয়া যাওয়াবিতুহু (কায়রো : দার আহমাদ, ২য় সংস্করণ ১৪২৯/২০০৮) পৃঃ ৩৫।

[16] হাকীম আবুল হাসান ওবায়দুল্লাহ খান, ইসলামী সিয়াসাত (শ্রীনগর, কাষ্মীর : ১৯৭৮) পৃঃ ২৩; রোয়েদাদে জামা‘আতে ইসলামী (দিল্লী : জুন ১৯৮২) ১/৬ পৃঃ।

[17] সাইয়িদ কুতুব, তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন (বৈরূত : দারুশ শুরূক্ব  ১৭তম সংস্করণ ১৪১২ হিঃ) সূরা আন‘আম ১৯ আয়াতের ব্যাখ্যা, ২/১০৫৭ পৃঃ।

[18] ঐ, সূরা হিজরের ভূমিকা, ৪/২১২২ পৃঃ।

[19] ঐ, ইউনুস ৮৭ আয়াতের ব্যাখ্যা ৩/১৮১৬ পৃঃ।

[20] ঐ, নিসা ৬০ আয়াতের ব্যাখ্যা, ২/৬৯৩ পৃঃ।

[21] ঐ, ২/৯৭২ পৃঃ।

[22] ঐ, ৩/১৪৫১।

[23] মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-হুসাইন, ফিৎনাতুত তাকফীর ওয়াল হাকেমিয়াহ (রিয়াদ : ১৪১৬ হিঃ) পৃঃ ৯৮;

[24] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৬৬ ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়।

[25] মুসলিম হা/১৮৫৪-৫৫; মিশকাত হা/৩৬৭১ ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়।

[26] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৮।

[27] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭২।

[28] মুসলিম হা/১৮৪৬, মিশকাত হা/৩৬৭৩।

[29] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭৫।

[30] বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১২, ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[31] আর-রাহীক্ব ৩৮৩ পৃঃ; মুসলিম হা/৯৬; আবুদাঊদ হা/২৬৪৩; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৪৫০।

[32] বুখারী হা/৬৮৭২; ফাৎহুল বারী ১২/২০৪।

[33] কুরতুবী, মায়েদাহ ৪১ আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য, ৬/১৭১ পৃঃ।

[34] মুসলিম হা/৪৯, মিশকাত হা/৫১৩৭।

[35] মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬৬।

[36] যেমন রাসূল (ছাঃ)-কে দাউস গোত্রের বিরুদ্ধে বদদো‘আ করতে বলা হ’লে তিনি তাদের জন্য হেদায়াতের দো‘আ করে বলেন, ‘হে আল্লাহ তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়াত কর এবং তাদেরকে ফিরিয়ে আনো’। ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকার ক্বাস্তালানী বলেন, পরে দেখা গেল যে, অভিযোগকারী তুফায়েল বিন আমর ফিরে গিয়ে নিজ কওমকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তাতে তাদের শাসকসহ ৭০-৮০টি পরিবার মুসলমান হন ও ৭ম হিজরীতে খায়বরে এসে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হন। যার মধ্যে ছিলেন খ্যাতনামা ছাহাবী হযরত আবু হুরায়রা দাওসী (রাঃ)। =(বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৫৯৯৬; বুখারী (দিল্লী ছাপা) ২/৬৩০ টীকা-১১)।

[37] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৮৯। যেমন ৪র্থ হিজরীর ছফর মাসে সংঘটিত রাজী‘ ও বি’রে মাঊনার হৃদয়বিদারক দু’টি ঘটনা, যেখানে যথা।মে ১০ জন ও ৭০ জন ছাহাবীকে শঠতার মাধ্যমে হত্যাকারী আযল ও ক্বারাহ এবং রে‘ল ও যাকওয়ান গোত্রগুলির বিরুদ্ধে রাসূল (ছাঃ) মাসব্যাপী কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ করেননি। এর জন্য কেউ কোন অনুযোগ করেনি বা রাসূল (ছাঃ)-কে ছেড়ে যায়নি।

[38] ইবনু মাজাহ হা/১৭৩, সনদ ছহীহ।

[39] মানাবী, ফায়যুল ক্বাদীর শরহ ছহীহুল জামে‘ আছ-ছাগীর (বৈরূত : ১ম সংস্করণ ১৪১৫/১৯৯৪) ৩/৫০৯ পৃঃ।

[40] ফাৎহুল বারী ৮৮ অধ্যায় ৬ অনুচ্ছেদ-এর তরজুমাতুল বাব, হা/৬৯৩০-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[41] ইবনু জারীর, কুরতুবী, ইবনু কাছীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; তাহকীক দ্রষ্টব্য : খালেদ আল-আম্বারী, উছূলুত তাকফীর পৃঃ ৬৪; ৭৫-৭৬ টীকাসমূহ।

[42] হাকেম হা/৩২১৯, ২/৩১৩, সনদ ছহীহ; তিরমিযী হা/২৬৩৫।

[43] সালাফ ও খালাফের ৩৯ জন বিদ্বানের ফৎওয়া দ্রষ্টব্য; উছূলুত তাকফীর ৬৪-৭৪ পৃঃ।

[44] খত্বীব, তারীখু বাগদাদ ১০/১৮৬; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১০/২৮০।

[45] খালেদ আল-আম্বারী, উছূলুত তাকফীর (রিয়াদ : ৩য় সংস্করণ, ১৪১৭ হিঃ) ৭১-৭২।

[46] আর-রাহীকুল মাখতূম ৩৫২ পৃঃ; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৬৫২ ‘জানায়েয’ অধ্যায়।

[47] আবুদাঊদ হা/৩২০৪ ‘জানায়েয’ অধ্যায় ৬২ অনুচ্ছেদ।

[48] উছূলুত তাকফীর, ৭৪ পৃঃ।

[49] তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, ২/৮৯৫।

[50] বুখারী হা/২৩৫৯; মুসলিম হা/২৩৫৭ ও অন্যান্য।

[51] বুখারী হা/৬০১৬; মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬২ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ১৫ অনুচ্ছেদ।

[52] বুখারী, মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।

[53] তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন ৩/১৬৪২।

[54] তাফসীর ইবনু জারীর (বৈরূত ছাপা : ১৯৮৬), ১০/৮০-৮১ পৃঃ।

[55] ইবনু তায়মিয়াহ, আল-ঈমান (বৈরূত : আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় সংস্করণ ১৪০৮/১৯৮৮) পৃঃ ৬৭, ৬৯।

[56] তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, আন‘আম ১২১ আয়াতের তাফসীর, ৩/১১৯৮ পৃঃ।

[57] বুখারী হা/৩৪৫৫ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, ৫০ অনুচ্ছেদ।

[58] মুসলিম হা/৮৬৭; মিশকাত হা/১৪১।

[59] কুরতুবী, আন‘আম ১২১ আয়াতের তাফসীর।

[60] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৮।

[61] মুসলিম হা/২৮০৮; মিশকাত হা/৫১৫৯।

[62] মুসলিম হা/১৫৩; মিশকাত হা/১০।

[63] বুখারী হা/৬৯২২, তিরমিযী হা/২১৫৮; মিশকাত হা/৩৫৩৩, ৩৪৬৬।

[64] আহমাদ হা/১২৬২৮, বুখারী হা/২৬৯১, মুসলিম হা/১৭৯৯।

[65] বুখারী হা/২৭০৪; মিশকাত হা/৬১৩৫।

[66] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮১৪।

[67] মুসলিম হা/৬৭।

[68] আহমাদ, ছহীহাহ হা/৩৩৮৭; মিশকাত হা/৫৫১।

[69] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩১৫।

[70] তিরমিযী হা/১৫৩৫, মিশকাত হা/৩৪১৯।

[71] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৮২, ‘চন্দ্র গ্রহণের ছালাত’ অনুচ্ছেদ।

[72] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫৩৭ ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়, ৪ অনুচ্ছেদ।

[73] মুহাম্মাদ বিন হুসায়েন আল-ক্বাহত্বানী, ফাতাওয়াল আয়েম্মাহ (রিয়াদ : ১৪২৪ হিঃ) ১৫৩ পৃঃ; ফিৎনাতুত তাকফীর ওয়াল হাকেমিয়াহ, পৃঃ ৩৫।

[74] বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৪২০২-০৩।

[75] দারেমী হা/২১৪, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/২৬৯; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/২৫১।

[76] শরহ আক্বীদা ত্বাহাভিয়া (বৈরূত ছাপা : ১৪০৪/১৯৮৪) ২০৪ পৃঃ।

[77] ছহীহ মুসলিম ‘ইমারত’ অধ্যায় ৩৩, অনুচ্ছেদ ৫৩, হা/১৯২০; অত্র হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ ঐ, দেউবন্দ ছাপা শরহ নববী ২/১৪৩ পৃঃ; বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৭১ ‘ইল্ম’ অধ্যায় ও হা/৭৩১১-এর ভাষ্য ‘কিতাব ও সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরা’ অধ্যায়।

[78] আবুদাউদ হা/২৪৮৪, মিশকাত হা/৩৮১৯।

[79] মুসলিম হা/১৯২৩; মিশকাত হা/৫৫০৭ ‘ফিৎনা সমূহ’ অধ্যায়, ‘ঈসার অবতরণ’ অনুচ্ছেদ।

[80] তিরমিযী হা/২১৯২, মিশকাত হা/৬২৮৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৭০২; আলবানী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭০-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[81] তিরমিযী হা/২৬৪১; ছহীহাহ হা/১৩৪৮; মিশকাত হা/১৭১।

[82] আবুদাঊদ হা/৪৬০৭, তিরমিযী হা/২৬৭৬, ইবনু মাজাহ হা/৪২; মিশকাত হা/১৬৫।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button