দাওয়াত ও জিহাদ

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

নির্দিষ্ট নেতৃত্বের অধীনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ একদল মানুষকে জামা‘আত বা সংগঠন বলা হয়। দাওয়াতী জীবনে যার গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে-وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ اُمَّةٌ يَّدْعُوْنَ اِلَى الْخَيْرِ وَ يَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ يَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ اُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ-   ‘তোমাদের  মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান জানাবে, সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করবে, আর তারাই হ’ল সফলকাম’ (আলে ইমরান ১০৪)। আল্লাহ আরো বলেন, كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ   الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মাত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দিবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে’ (আলে ইমরান ১১০)। আলোচ্য আয়াত দু’টিতে জামা‘আতী যিন্দেগীর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পরিস্ফুট হয়ে ওঠেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের নির্দেশ প্রদান করেছেন (আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৬৯৪ ‘ইমারত’ অধ্যায়; মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭৪)। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, لاَ إِسْلاَمَ إِلاَّ بِجَمَاعَةٍ وَلاَ جَمَاعَةَ إِلاَّ بِإِمَارَةٍ وَلاَ إِمَارَةَ إِلاَّ بِطَاعَةٍ  ‘ইসলাম হয় না জামা‘আত ছাড়া, জামা‘আত হয় না আমীর ছাড়া, আর ইমারত হয় না আনুগত্য ছাড়’ (দারেমী ও ইবনু আবদিল বার্র, জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ১/৬২ পৃঃ, গৃহীত : জামা‘আতী যিন্দেগী, পৃ: ৮)। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, দাওয়াতী কাজে সাংগঠনিক জীবনের কোন বিকল্প নেই। আর কোন সংগঠনকে তার কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যেমন যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ত্যাগের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী। যারা নিজেদের মধ্যে হবে পরস্পর রহমদিল এবং শত্রুর মোকাবেলায় হবে রুদ্র-কঠোর। তাদের মধ্যে থাকবে সৌহার্দমূলক সম্পর্কের সুদৃঢ় ভিত্তি। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা পেশ করা হ’ল।- 

১. ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক :

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক বিরাজ করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, اَلْمُسْلِمُ اَخُو الْمُسْلِمِ لاَ يَظْلِمُهُ وَ لاَ يُسْلِمُهُ مَنْ كَانَ فِىْ حَاجَةِ اَخِيْهِ كَانَ اللهُ فِىْ حَاجَتَهِ وَ مَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِّنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَ مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে না তার উপর যুলুম করতে পারে এবং না তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করতে পারে। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয়, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের কোন কষ্ট বা অসুবিধা দূর করে দেয়, এর বিনিময়ে আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার কষ্ট ও বিপদ থেকে অংশবিশেষ দূর করে দিবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন’ (বুখারী, মুসলিম, আলবানী মিশকাত হা/৪৯৫৮; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৪১)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না, তাকে লজ্জিত করবে না, হীন মনে করবে না। ‘তাক্বওয়া’ এখানে, এ কথা বলে তিনি স্বীয় বক্ষের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। (তিনি বলেন) কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। একজন মুসলমানের জান, মাল ও ইযযত অপর মুসলমানের জন্য হারাম’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৯; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৪২)

২. পারস্পরিক ভালবাসার সম্পর্ক :

কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে সৌহার্দপূর্ণ ও ভালবাসানির্ভর। আর তা হবে আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার জন্য। কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় কাউকে ভালবাসার মধ্যেই ঈমানের পরিপূর্ণতা নিহিত আছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَ اَبْغَضَ لِلّهِ وَ اَعْطَى لِلّهِ وَ مَنَعَ لِلّهِ فََقَدِ اسْتَكْمَلَ الْاِيْمَانَ- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসল, আল্লাহর জন্য কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করল, আল্লাহর জন্য দান-খয়রাত করল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান-খয়রাত থেকে বিরত থাকল, সে অবশ্যই ঈমানকে পরিপূর্ণ করল’ (আবূদাঊদ, তিরমিযী, বঙ্গানুবাদ মিশকাত ১/৩৩ হা/২৮)

অন্য হাদীছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে ভালবাসাকে ‘হালাওয়াতুল ঈমান’ বা ঈমানের স্বাদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلاًثٌ مَّنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاَوَةَ الْاِيْمَانِ مَنْ كَانَ اللهُ وَ رَسُوْ لُهُ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَمَنْ اَحَبَّ عَبْدًا لاَّ يُحِبُّهُ اِلاَّ لِلَّهِ وَمَنْ يَّكْرَهُ اَنْ يَّعُوْدَ فِى الْكُفْرِ بَعْدَ اَنْ اَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ اَنْ يُّلْقَى فِى النَّارِ-

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি জিনিসের সন্নিবেশ ঘটবে, সে যেন ঈমানের স্বাদ পেল। (১) যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) সবকিছুর চাইতে অধিক প্রিয়তম হবে। (২) যে ব্যক্তি কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালবাসে। (৩) আল্লাহ কুফর হতে নাজাত দেওয়ার পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে যে ব্যক্তি এমনভাবে অপসন্দ করে, যেভাবে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে সে অপসন্দ করে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়)।

তাছাড়া কর্মীদের পারস্পরিক ভালবাসা তাদের উপর আল্লাহর ভালবাসাকে ওয়াজিব করে দেয়। এ প্রসঙ্গে হাদীছে কুদসীতে এসেছে-

عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُوْلُ قَالَ اللهُ تَعَالَى: وَجَبَتْ مَحَبَّتِىْ لِلْمُتَحَابِّيْنَ فِىَّ وَالْمُتَجَالِسِيْنَ فِىَّ وَالْمُتَزَاوِرِيْنَ فِىَّ وَالْمُتَبَاذِلِيْنَ فِىَّ-

মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালবাসে, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরে সমাবেশে মিলিত হয় এবং আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে আমার ভালবাসা তাদের জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়’ (মুওয়াত্তা মালেক, সনদ ছহীহ, আলবানী মিশকাত হা/৫০১১ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘আল্লাহর সাথে এবং আল্লাহর জন্য ভালবাসা’ অনুচ্ছেদ)

আল্লাহকে রাজী-খুশী করার নিমিত্তে কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক মুহাববত সুদৃঢ় হলে ক্বিয়ামতের দিন তা বিশেষ মর্যাদার কারণ হবে। সেদিন আল্লাহ তাদেরকে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, اِنَّ اللهَ يَقُوْلُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ اَيْنَ الْمُتَحَابُّوْنَ بِجَلاَلِى اَلْيَوْمَ اُظِلُّهُمْ فِى ظِلِّى يَوْمَ لاَ ظِلَّ اِلاَّ ظِلِّى- ‘ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আমার সুমহান ইয্যতের খাতিরে যারা পরস্পরে ভালবাসা স্থাপন করেছে তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় স্থান দিব। আর আজ আমার ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া নেই’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫০০৬; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৮৭ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘আল্লাহর সাথে এবং আল্লাহর জন্য ভালবাসা’ অনুচ্ছেদ)।

অতএব নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা সৃষ্টির মাধ্যমে মহান আল্লাহর ভালবাসা হাছিলের চেষ্টা করা সকল কর্মীর উপরই অপরিহার্য। অন্যথা সে হবে হতভাগা। দুনিয়ার ন্যায় আসমানেও সে ঘৃণিত হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন তখন জিবরীল (আঃ)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালবাস। অতঃপর জিবরীল তাকে ভালবাসতে থাকেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ তা‘আলা অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, অতএব তোমরাও তাকে ভালবাস। তখন আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালবাসতে থাকে। অতঃপর ঐ ব্যক্তির জন্য দুনিয়াতেও জনপ্রিয়তা দান করা হয়। অপরদিকে আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বান্দাকে ঘৃণা করেন, তখন তিনি জিবরীল (আঃ)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ঘৃণা করি, তুমিও তাকে ঘৃণা কর। তখন জিবরীল তাকে ঘৃণা করেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ তা‘আলা অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, সুতরাং তোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তখন আসমানের অধিবাসীরা তাকে ঘৃণা করতে থাকে। অতঃপর তার জন্য দুনিয়াতেও জনমনে ঘৃণা সৃষ্টি করে দেওয়া হয় (মুসলিম, মিশকাত হা/৫০০৫; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৮৬, ৯/১৪৪ পৃ:)।

৩. পরস্পরে দয়ার্দ্র হৃদয়ের অধিকারী হওয়া :

আরও দেখুন:  ধর্মীয় কাজে বাধা দানের পরিণতি

ইসলামী আন্দোলনের সকল স্তরের কর্মীদের এটি অবশ্যম্ভাবী গুণ হওয়া উচিত যে, তারা একে অপরের প্রতি সহমর্মী, সহানুভূতিশীল ও রহমদিল হবে। কোন অবস্থাতেই রুদ্র-কঠোর ও কর্কশভাষী হওয়া সমীচীন হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর সাথীবৃন্দের এটিই ছিল অনুপম বৈশিষ্ট্য, যা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন, مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ وَالَّذِيْنَ مَعَهُ اَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ- ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল’ (ফাতহ ২৯)। মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, اَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِيْنَ يُجَاهِدُوْنَ فِى سَبِيْلِ اللهِ وَ لاَ يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لاَئِمٍ- ‘তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না’ (মায়েদা ৫৪)

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে দেয়াল সদৃশ। এক ইটের মধ্যে অপর ইট ঢুকিয়ে যেভাবে দেয়ালকে মজবুত করা হয়, তদ্রূপ সুদৃঢ় সম্পর্ক থাকবে কর্মীদের মধ্যে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, اَلْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا ثُمَّ شَبَّكَ بَيْنَ اَصَابِعِهِ- ‘এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য গৃহ স্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে সুদৃঢ় রাখে। অতঃপর তিনি তাঁর এক হাতের আঙ্গুল অন্য হাতের আঙ্গুলের মধ্যে প্রবেশ করালেন’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৫; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৩৮)। অন্য হাদীছে এসেছে-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيْرٍ قَالَ قَالَ رَسُوْ لُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ تَرَى الْمُؤْمِنِيْنَ فِىْ تَرَاهُمِهِمْ وَ تَوَادِّهِمْوَ تَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ اِذَ اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهْرِ وَالْحُمَّى-

নো‘মান ইবনে বাশীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘তুমি মুমিনদেরকে পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়া-অনুগ্রহের ক্ষেত্রে একটি দেহের মত দেখবে। যখন দেহের কোন অংশ অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন সমস্ত শরীর তজ্জন্য বিনিদ্র ও জ্বরে আক্রান্ত হয়’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৩; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৩৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেন, ‘সকল মুমিন এক ব্যক্তির ন্যায়। যদি তার চক্ষু অসুস্থ হয় তখন তার সর্বাঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর যদি তার মাথায় ব্যথা হয়, তখন সমস্ত দেহই ব্যথিত হয়ে পড়ে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৪; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৩৭)।

৪. একে অপরের জন্য দর্পণ স্বরূপ :

মানুষ মাত্রেরই কমবেশী ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে, এটিই স্বাভাবিক গতিধারা। তাই বলে সামান্য ত্রুটিকে বড় করে দেখে পরিবেশ ঘোলাটে করা ঠিক নয়। ইসলাম বরং মানুষের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখার প্রতিই তাকীদ প্রদান করেছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমরা সে তাকীদের প্রতি সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ না করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে অধিক তৎপর হয়ে উঠি। ফলে একুল-ওকুল দু’কুলই হারাই। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের চরিত্র হবে এর বিপরীত। তারা পরস্পর ছিদ্রান্বেষণকারী নয়; বরং একে অপরের জন্য হবে দর্পণ স্বরূপ। তারা যার ত্রুটি, সরাসরি তাকে বিনয়ের সাথে জানিয়ে ইছলাহের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْدًا فِى الدُّنْيَا اِلاَّ سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- ‘পার্থিব জগতে (আল্লাহর) যে বান্দা অপর বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন’ (মুসলিম হা/৪৬৯২)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لاَ تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ فَاِنَّهُ مَنْ يَّتَّبِعُ عَوْرَةَ اَخِيْهِ الْمُسْلِمِ يَتَّبِعُ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَّتَّبِعُ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحُهُ وَ لَوْ فِىْ جَوْفِ رِحْلِهِ- ‘তোমরা কোন মুসলমানের গোপন দোষ অন্বেষণ কর না। কারণ যে ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের দোষান্বেষণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার দোষ অন্বেষণ করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ খুঁজবেন তাকে অপমান করবেন, যদিও সে তার গৃহাভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকে’ (তিরমিযী, মিশকাত হা/৫০৪৪; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৮২৩; সনদ হাসান, তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০৩২)।

অতএব কোন অবস্থাতেই কর্মীদেরকে ছিদ্রান্বেষণকারী হওয়া যাবে না। বরং কারো মধ্যে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে গঠনমূলক পরামর্শের মাধ্যমে তাকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

৫. সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক :

আল্লাহ বলেন, فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ  ‘তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও’ (বাক্বারাহ ১৪৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَسَارِعُوْا اِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالاَرْضُ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِيْنَ ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত, যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাক্বীদের জন্য’ (আলে ইমরান ১৩৩)। আলোচ্য আয়াতে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে ক্ষমা অর্থ সৎকর্ম, যা আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা লাভ করার কারণ হয় (বঙ্গানুবাদ মাআরেফুল কুরআন, সঊদী আরব: বাদশাহ ফাহদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩হি: পৃঃ ২০৪)। অন্য আয়াতে জান্নাতীদের বিভিন্ন নে‘মতের বিবরণ দানের পর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَفِىْ ذلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ ‘এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত’ (তাতফীফ ২৬)। অর্থাৎ উক্ত নে‘মত প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নেকীর প্রতিযোগিতা করা উচিত।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,بَادِرُوْا بِالْاَعْمَالِ فَسَتَكُوْنُ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَّ يُمْسِىْ كَافِرًا وَّ يُمْسِىْ مُؤْمِنًا وَّ يُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيْعُ دِيْنَهُ بِعَرَضٍ مِّنَ الدُّنْيَا- ‘তোমরা অনতিবিলম্বে সৎকাজের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যাও। কেননা শীঘ্রই অন্ধকার রাতের অংশের মত বিপদ-বিশৃংখলার বিস্তার ঘটবে। তখন মানুষ সকাল বেলা মুমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে, আবার সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সকালে কাফের হয়ে যাবে। সে তার দ্বীনকে পার্থিব স্বার্থের বদলে বিক্রয় করবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩৮৩ ‘ফিতান’ অধ্যায়; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৫১৫০)।

৬. সর্বোচ্চ ত্যাগের সম্পর্ক :

আরও দেখুন:  জিহাদ কী?

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ পরস্পরের মধ্যে সর্বোচ্চ ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। যে দৃষ্টান্ত ছিল ছাহাবীদের মধ্যে, আনছার ও মুহাজিরদের মধ্যে। নিজেদের সহায়-সম্পদ ও বাস্ত্তভিটা সহ সর্বস্ব খুইয়ে মহান আল্লাহর বিধান মানার নিমিত্তে এবং পরকালীন অনন্ত জীবনের চিরস্থায়ী মুক্তির স্বার্থে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে আসা মুসলমানদের প্রতি মদীনার আনছার ছাহাবীদের হৃদয় নিংড়ানো মুহাববত ও সার্বিক সহযোগিতা  বিশ্ব ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِيْنَ الَّذِيْنَ اُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ وَ اَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُوْنَ فَضْلاً مِّنَ اللهِ وَ رِضْوَانًا وَّ يَنْصُرُوْنَ اللهَ وَ رَسُوْلَهُ اُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ- وَالَّذِيْنَ تَبَوَّئُو الدَّارَ وَالْاِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَيْهِمْ وَ لاَ يَجِدُوْنَ فِىْ صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا اُوْتُوْا وَ يُؤْثِرُوْنَ عَلَى اَنْفُسِهِمْ وَ لَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَاُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ-

‘এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্য, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্ত্তভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারাই সত্যবাদী। যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্য তার অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম’ (হাশর ৮-৯)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, শপথ সেই সত্তার, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন! আমার নিকট পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালে তিনিও একই জওয়াব দিলেন। এমনকি একে একে প্রত্যেক স্ত্রীই এরকম জওয়াব দিলেন যে, শপথ সেই সত্তার, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন! আমার নিকট পানি ব্যতীত আর কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীদের বললেন, আজ রাতে কে এই লোকের মেহমানদারী করবে? জনৈক আনছারী বলল, আমি করব হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)। তিনি তাকে সাথে নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মেহমানের যথাযথ খাতির-যত্ন কর। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আনছারী তার স্ত্রীকে বলল, তোমার কাছে কিছু (খাবার) আছে কি? সে বলল, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আর কিছু নেই। আনছারী বললেন, বাচ্চাদের কিছু একটা দিয়ে ভুলিয়ে রাখ এবং ওরা সন্ধ্যার খানা চাইলে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ো। আর আমাদের মেহমান যখন এসে যাবে তখন বাতি নিভিয়ে দিয়ো। আর তাকে এটাই বুঝাবে যে, আমরাও খানা খাচ্ছি। তারা সবাই বসে গেলেন। এদিকে মেহমান খাবার খেলেন এবং তারা উভয়ে সারারাত উপোস কাটিয়ে দিলেন। পরদিন প্রত্যুষে তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গেলে তিনি বললেন, এ রাতে মেহমানের সাথে তোমরা যে আচরণ করেছ, তাতে আল্লাহ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন’ (বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৫৬৪)।

সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে একটি হাতে বোনা চাদর নিয়ে এসে বলল, আমি নিজ হাতে এই চাদর বুনেছি আপনাকে পরানোর জন্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চাদরটি গ্রহণ করলেন। তিনি সেটিকে তহবন্দ হিসাবে পরিধান করে আমাদের নিকট আসলেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, এটি আমাকে দিয়ে দিন, কতইনা সুন্দর এই চাদরটি। তিনি বললেন, আচ্ছা। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিছু সময় মজলিসে বসা ছিলেন, তারপর ফিরে গিয়ে চাদরটি ভাঁজ করে ঐ লোকটির জন্য পাঠিয়ে দিলেন। লোকেরা তাকে বলল, তুমি কাজটি ভাল করনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর প্রয়োজনের তাকিদে চাদরটি পরেছিলেন, আর তুমি তা চেয়ে বসলে? অথচ তুমি জান যে, তিনি কোন প্রার্থীকে বঞ্চিত করেন না। সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমি এটি পরিধান করার জন্য চাইনি, বরং মৃত্যুর পর আমার কাফন দেয়ার জন্য চেয়েছি। সাহাল বলেন, সেটি তার কাফন হিসাবেই ব্যবহৃত হয়েছিল’(বুখারী, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৫৬৭)।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে হুযায়ফা (রাঃ) সামান্য পানি হাতে স্বীয় আহত রক্তাক্ত চাচাত ভাইকে বললেন, তুমি কি পানি পান করবে? মৃত্যুযন্ত্রণায় বাকরুদ্ধ চাচাত ভাই হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত করল। অতঃপর পানি হাতে নিতেই অনতিদূরে আরেক আহত সৈনিকের পানি পানি চিৎকার শুনতে পেয়ে নিজে পানি পান না করে হুযায়ফাকে ইশারায় সেদিকে পাঠিয়ে দিলেন। হুযায়ফা এবার তার নিকটে গিয়ে পানি হাতে তুলে দিতেই পাশে আরেকজন তৃষ্ণার্ত সৈনিকের পানির আর্তনাদ শুনতে পেলেন। অতঃপর নিজে পানি পান না করে হুযায়ফাকে বললেন, তার দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো। হুযায়ফা আহত সৈনিকটির কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। অতঃপর দ্বিতীয় জনের কাছে ফিরে এসে দেখলেন তিনিও শাহাদত বরণ করেছেন। অতঃপর স্বীয় চাচাত ভাইয়ের নিকটে এসে দেখেন যে, তিনিও শাহাদতের অমীয় সুধা পান করেছেন। পানির পাত্রটি তখন হুযায়ফার হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মত আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিল তারা আরেকজনের পানির পিপাসা মেটাবার জন্য এতই পাগলপরা ছিলেন যে, অবশেষে কেউ সে পানি পান করতে পারেননি (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (কায়রো: ১৯৮৮), ৭/৮-১১ দ্র:)।

কি অপূর্ব ভ্রাতৃত্ব! কি অসামান্য ত্যাগ! নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজনকে তারা কেমন অগ্রাধিকার দিতেন, এ ঘটনাই তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। যা বিশ্বইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা কি পারবেন ত্যাগের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে?

৭. পারস্পরিক কল্যাণকামী হওয়া :

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ পরস্পরে কল্যাণকামী হবেন। কখনো ঈর্ষাপরায়ণ হবেন না। এক ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে অপর ভাই এগিয়ে আসবেন। পারস্পরিক পরামর্শ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দাওয়াতী ময়দানে নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন। দাওয়াত ও ইছলাহের ভিত্তিতে ব্যক্তি সংশোধন অতঃপর সর্বাত্মক সমাজ সংস্কারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন এবং এর মাধ্যমে সকল মুসলমানের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, اَلدِّيْنُ اَلنَّصِيْحَةُ قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلّهِ وَ لِكِتَابِهِ وَ لِرَسُوْلِهِ وَ لِاَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ وَ عَامَّتِهِمْ- ‘দ্বীন হচ্ছে উপদেশ বা কল্যাণ কামনা। (রাবী বলেন) আমরা বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলমানদের ইমাম বা নেতা এবং সমস্ত মুসলমানের জন্য’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬৬ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির প্রতি দয়া’ অনুচ্ছেদ; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৪৯)।

পারস্পরিক কল্যাণ কামনা ও হকের উপদেশ দেয়া ইসলামের মূল ভিত্তির সাথে তুলনীয়। এখানে আল্লাহর জন্য কল্যাণ কামনা বা নছীহত অর্থ হল : তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধকে মেনে নেয়া। কিতাবের জন্য নছীহত অর্থ হল : কিতাব থেকে জ্ঞানার্জন ও সেই অনুযায়ী কাজ করা। রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য নছীহত অর্থ হল : তাঁর আনুগত্য, দীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা চালানো। মুসলিম নেতাদের নছীহত অর্থ হল : তাদেরকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া ও ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং সার্বিক পর্যায়ে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো (রিয়াদুস সালেহীন, অনুবাদ: মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী ও অন্যান, ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, এপ্রিল ২০০২, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৪ হা/১৮১ -এর টীকা দ্রষ্টব্য)।

জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে ছালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা এবং সমস্ত মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা ও সঠিক উপদেশ দেয়ার বায়‘আত গ্রহণ করেছি’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৭৫০)।

৮. পরস্পর ক্ষমাপরায়ণ হওয়া :

আরও দেখুন:  দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজের ভূমিকা

প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে বরং পরস্পরে ক্ষমাপরায়ণ হওয়াই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হওয়া উচিত। সামান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে, আবার ছোট্ট বিষয়টিও শয়তানের ধোঁকার কারণে বিরাট আকার ধারণ করতে পারে। দাওয়াতী ময়দানে এ রকম ছোটখাট বিষয়কে মূল ধরলে দাওয়াতী কাজ বাধাগ্রস্থ হবে- এতে কোন সন্দেহ নেই। এমতাবস্থায় উচিত হবে বিষয়টিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। যার পক্ষ থেকে ক্ষমা বিঘোষিত হবে তিনি নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা‘আলার নিকট থেকে মহাপুরস্কার প্রাপ্ত হবেন। আর এজন্যই পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে ক্ষমাপরায়ণ হওয়ার জন্য জোর তাকীদ প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, خُذِ الْعَفُوَ وَاْمُرْ بِالْعُرْفِ وَاَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِيْنَ-   ‘ক্ষমাশীলতা অবলম্বন কর, সৎ কাজের আদেশ দাও এবং মূর্খ লোকদের এড়িয়ে চলো’ (আ‘রাফ ১৯৯)وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّوْنَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ ‘তারা যেন ওদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (নূর ২২)اَلَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ فِي السَّرَّاء وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِيْنَ الْغَيْظَ وَالْعَافِيْنَ عَنِ النَّاسِ وَاللّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ‘যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, নিজেদের ক্রোধকে সংবরণ করে এবং লোকদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্ত্তত আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (আলে ইমরান ১৩৪)

উক্ত আয়াত সমূহ হতে এটি সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যে, যারা পরস্পরের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হবে, আল্লাহও তাদেরকে ক্ষমা করবেন।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ব্যতীত কখনো কাউকে মারেননি, না কোন স্ত্রীলোককে, না কোন খাদেমকে। তাঁকে কষ্ট দেয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অবশ্য আল্লাহ নির্ধারিত কোন হারামকে লংঘন করা হলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন’ (মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৬৪৪)।

আনাস (রাঃ) বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) -এর সাথে হাটছিলাম। তাঁর গায়ে ছিল মোটা পাড়বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর। এক বেদুইন তাঁর নিকট এসে তাঁর চাদরটি ধরে ভীষণ জোরে টান দিল। আমি লক্ষ্য করলাম, সজোরে চাদর টানার কারণে রাসূল (ছাঃ)-এর ঘাড়ের পার্শ্বদেশে দাগ পড়ে গেছে। বেদুইন বলল, হে মুহাম্মাদ! আপনার নিকট আল্লাহর দেয়া যে মাল-সম্পদ রয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু দেয়ার ব্যবস্থা করুন। তিনি লোকটির প্রতি তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন’ (বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৬৪৫)।

আব্দুল্লাহ  ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে আছি, তিনি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মধ্যকার একজন সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। তাঁকে তাঁর জাতি আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। তিনি নিজের চেহারা থেকে রক্ত মুছছিলেন আর বলছিলেন, হে আল্লাহ! আমার কওমকে ক্ষমা করুন। কারণ এরা তো অবুঝ’ (বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৬৪৬)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রকৃত বীরের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, لَيْسَ الشَّدِيْدُ بِالصُّرْعَةِ اِنَّمَا الشَّدِيْدُ الَّذِىْ يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ- ‘কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করাতে বীরত্ব নেই; রবং ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করতে পারাই প্রকৃত বীরত্বের পরিচায়ক’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১০৫; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৮৭৮ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘ক্রোধ ও অহংকার’ অনুচ্ছেদ)।

৯. পারস্পরিক সন্দেহমুক্ত সম্পর্ক হওয়া :

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝে সন্দেহমুক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠা আবশ্যক। ধারণা থেকে তারা থাকবে সম্পূর্ণ মুক্ত। তবেই পারস্পরিক দ্বীনী মুহাববত সুদৃঢ় হবে। কেননা ধারণানির্ভর কথাবার্তা ও ক্রিয়া-কলাপই পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং পর্যায়ক্রমে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটায়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে ধারণা করাকে চূড়ান্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,  يَاَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اِجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ اِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ اِثْمٌ- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কতেক ধারণা পাপ’ (হুজুরাত ১২)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেনে, اِيَّاكُمْ وَالظَّنِّ فَاِنَّ الظَّنَّ اَكْذَبُ الْحَدِيْثِ-  ‘তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই ধারণা মহাপাপ’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫০২৮; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৪৮০৮ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘সম্পর্ক ত্যাগ, বিচ্ছিন্নতা ও দোষান্বেষণের নিষেধাজ্ঞা’ অনুচ্ছেদ)।

১০. নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া :

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা নেতৃত্বের প্রতি হবে পরম শ্রদ্ধাশীল। তারা কখনো নেতৃত্ব নিয়েও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না। কেননা ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার কোন বিধান নেই। তাক্বওয়া ও যোগ্যতার বিবেচনায় নেতা মনোনীত হয়ে থাকেন মাত্র। এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেওয়া সকলের জন্য আবশ্যক। উবাদা ইবনে ছামেত (রাঃ) বলেন, بَايَعْنَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِى الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ َالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَ عَلَى اَثَرَةٍ عَلَيْنَا وَ عَلَى اَنْ لاَ نُنَازِعَ الْأَمْرَ اَهْلَهُ وَ عَلَى اَنْ نَقُوْلَ بِالْحَقِّ اَيْنَمَا كُنَّا لاَ نَخَافُ فِى اللهِ لَوْمَةَ لاَئِمٍ- ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এই মর্মে বায়‘আত করেছিলাম যে, আমরা আমীরের আদেশ শুনব ও মেনে চলব কষ্টে হৌক স্বাচ্ছন্দ্যে হৌক, আনন্দে হৌক অপসন্দে হৌক বা আমাদের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে হৌক এবং বায়‘আত করেছিলাম এই মর্মে যে, নেতৃত্ব নিয়ে আমরা কখনো ঝগড়া করব না। যেখানেই থাকি সর্বদা সত্য কথা বলব এবং আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদকে ভয় করব না’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত ‘ইমারত’ অধ্যায় হা/৩৬৬৬)।

উপসংহার :

সম্পর্ক সুন্দর ও নিঃস্বার্থ হলে কাজ সুন্দর ও স্বচ্ছ হয়। আর সম্পর্কে ফাটল ধরলে কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। সাংগঠনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। আর এ সম্পর্কের সাথে স্বার্থ জড়িত হলে মূল উদ্দেশ্য হবে ব্যাহত। অতএব ইসলামী আন্দোলনের সকল স্তরের কর্মীকেই উপরোক্ত গুণাবলী হাছিলে সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। তবেই কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন-আমীন!!

লেখক: ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন

উৎস: মাসিক আত-তাহরীক

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button