দাওয়াত ও জিহাদ

ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যৌবনকালের ভূমিকা

-আব্দুল হালীম বিন ইলিয়াস

ভূমিকা :

মহান আল্লাহ্র এই সুন্দর ভুবনে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির দিক নির্দেশনা সম্বলিত স্বভাব ও শান্তির গ্যারান্টিযুক্ত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম। আল্লাহ পাক বলেন, إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্র নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হ’ল ইসলাম’ (আলে-ইমরান ৩/১৯)। পবিত্র কুরআন, ছহীহ হাদীছ ও ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে যেখা যায় যে, ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। চারিদিকে যখন যুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের জয়জয়কার চলছিল; অজ্ঞতা, মূর্খতা, হঠকারিতা এবং গোঁড়ামীর কারণে তাওহীদ যখন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছিল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ইবাদতখানা বায়তুল্লাহ শরীফে ৩৬০টি মূর্তির সামনে মানুষ মাথা নত করছিল এবং নযর-নেয়াজ পেশ করছিল, তখন যুবকদের হুঙ্কার ও তাকবীর ধ্বনির মাধ্যমে এবং আল্লাহ্র অশেষ রহমতে তাওহীদ ও সুন্নাতের চির অম্লান বাণী উচ্চারিত হয়েছিল এবং প্রকাশ্যে কা‘বা ঘরে আল্লাহ্র ইবাদত করা শুরু হয়েছিল। তাই ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায়  যৌবনকালের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু কথা তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। যাতে মানুষ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের যৌবনের এই সোনালী সময়টাকে অহির বিধান প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করতে পারে।

যৌবনকাল : কিছু কথা

একটু চিন্তাশীল মন নিয়ে একনিষ্ঠভাবে ভাবলে যার প্রতি তৎক্ষণাৎ সিজদায় লুটিয়ে পড়তে হয়, সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র চিরন্তন রীতি অনুযায়ী এ সুন্দর ধূলির ধরণীতে প্রতিনিয়ত মানুষের আগমন ও প্রত্যাগমন ঘটছে। এ আগমন হয় মানুষের অত্যন্ত অসহায়  অবস্থায়। যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই থাকে না। যেমন-মহান আল্লাহ বলেন, هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا- إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا-  ‘মানুষের  উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব। অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’ (দাহর ৭৬/১-৩)। তিনি আরো বলেন, وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (নাহল ১৬/৭৮)

এ পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের ধারাকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য। এই তিনকালের মধ্যে সকল বিবেচনায় যৌবনকাল হ’ল শ্রেষ্ঠ সময়। শৈশবে মানুষ থাকে অসহায় ও পরনির্ভর। পিতা-মাতা ও অন্যের সহযোগিতা ব্যতীত সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং এ সময় তার কোন চিন্তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটেনা। অনুরূপভাবে বার্ধক্যেও সে অসহায় দুর্বল ও পরনির্ভর হয়ে পড়ে। মনের ইচ্ছা থাকলেও সে সবকাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে না। এমনকি চিন্তাশক্তির বিলোপ পর্যন্ত ঘটে থাকে। তাইতো বলা হয়, ‘গাছ পাকলে সার আর মানুষ পাকলে অসাড়’। কিন্তু যৌবনকাল এ দু’য়ের ব্যতিক্রম। যৌবনকালে মানুষ অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। তপ্ত লহু ও বাহুর শক্তিবলে শত ঝড়-ঝাপটা, অসত্যের কালোমেঘ ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্যের, ন্যায়ের  ও অহি-র বিধান প্রতিষ্ঠায় বীর বিক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ইংরেজিতে বলা হয় যে, Youth is called the golden season of life ‘যৌবনকে জীবনের সোনালী কাল বলা হয়’। আল্লাহ প্রদত্ত অফুরন্ত নে‘মতরাজির মধ্যে অন্যতম নে‘মত হচ্ছে এই যৌবনের শক্তিমত্তা। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ ‘তোমরা যেসব নে‘মত ভোগ কর তাতো আল্লাহ্রই নিকট হতে; আবার যখন দুঃখ-দৈন্য তোমাদেরকে স্পর্শ করে তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে আহবান কর’ (নাহল ১৬/৫৩)

যৌবনকালের জবাবদিহিতা :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যৌবনকালকে গণীমাতের মাল তথা মূল্যবান সম্পদ হিসাবে উল্লেখ করে তা মূল্যায়ন করতে তাগিদ দিয়েছেন। কেননা এ সময় সম্পর্কে পরকালে জবাবদিহিতা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ الأَوْدِيِّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِرَجُلٍ وَهُوَ يَعِظُهُ اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ .

‘আমর ইবনু মায়মূন আল-আওদী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশ স্বরূপ বলেন, পাঁচটি বস্ত্তর পূর্বে পাঁচটি বস্ত্তকে গণীমত মনে করো। যথা (১) তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে (২) পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্বাস্থ্যকে (৩) দারিদ্র্যতার পূর্বে সচ্ছলতাকে (৪) ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে (৫) মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে’ (তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৭৪, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯৪৭, ৯/২০৫ পৃঃ)

আল্লাহ প্রদত্ত যৌবনের এই মহা মূল্যবান সময়টাকে আল্লাহ্র অহির বিধান প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যয় না করে হেলায়-দোলায় নষ্ট করলে কিংবা মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত তন্ত্র-মন্ত্র, ইযম-তরীকা ও শিরক-বিদ‘আত এবং মনগড়া ইবাদত প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করলে তার কড়ায় গন্ডায় হিসাব দিতে হবে কিয়ামতের কঠিন দিবসে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ .

‘ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আদম সন্তানকে স্ব স্ব স্থান থেকে এক কদমও নড়াতে দেওয়া হবে না। যথা (১) সে তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে (২) যৌবনকাল কোথায় ব্যয় করেছে (৩) ধন-সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে (৪) কোন পথে তা ব্যয় করেছে (৫) সে দ্বীনের কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করেছে কিনা’ (তিরমিযী হা/২৪১৭; মিশকাত হা/৫১৯৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত  হা/৪৯৭০, ৯/২১৩ পৃঃ)

যৌবনের এই সোনালী সময়ে মানুষের দেহ সাধারণত থাকে সুস্থ, সবল, শক্ত ও উদ্দীপনায় পূর্ণ। এ সময় তার হাতে থাকে উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত সময়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশ মানুষই তা সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করে না। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ .

‘ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, দু’টি নে‘মতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। তাহ’ল সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য’ (বুখারী হা/৬৪১২, ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়; মিশকাত হা/৫১৫৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত  হা/৪৯২৮, ৯/১৯৯ পৃঃ)।

ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, من استعمل فراغه وصحته في طاعة الله فهو المغبوط ومن استعملهما في معصية  الله فهو المغبون- ‘যে ব্যক্তি তার সচ্ছলতা ও সুস্বাস্থ্যকে আল্লাহ্র আনুগত্যের কাজে লাগায়, সে ব্যক্তি হ’ল ঈর্ষণীয়। আর যে ব্যক্তি ঐ দু’টি বস্ত্তকে আল্লাহ্র অবাধ্যতায় কাজে লাগায়, সে ব্যক্তি হ’ল ধোঁকায় পতিত’ (ফাৎহুল বারী হা/৬৪১৪-এর ব্যাখ্যা; আত-তাহরীক, ১৬তম বর্ষ, ২য় সংখা, নভেম্বর ২০১২, পৃঃ ৬)

আরও দেখুন:  শহীদ কারা?

যৌবন যেমন সুস্থতা ও পূর্ণতার স্বরূপ, তেমনি পরিপূর্ণ জীবন ও প্রাণের স্বরূপ। হক্বের ঝান্ডা হাতে নিয়ে বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকাল। তাইতো ইসলাম শিশু, পঙ্গু, অসুস্থ, বৃদ্ধ ও নারীদের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ফরয করেনি। কবি বলেছেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার’।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই যৌবনের জয়গান গেয়েছেন। প্রসিদ্ধ সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে এই যৌবনের স্তবগান এবং উৎসাহ ও উদ্দীপনাময় বক্তব্যের সমাহার। বর্তমান ঘুণেধরা এই সমাজের অশ্লীলতা, নগ্নতা, বেহায়পনা, নির্লজ্জতা ও যেনা-ব্যভিচার যুবসমাজই পারে দূর করতে। এক্ষেত্রে যুবকদের ছহীহ পদ্ধতিতে বিবাহ করা একান্ত যরূরী। অন্যথা ছিয়াম পালন করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখবে। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, মহানবী (ছাঃ) যুবকদের লক্ষ্য করে বলেন, يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَاِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وأَحْسَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা উহা চক্ষুকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে। আর  যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন ছিয়াম রাখে। কেননা উহা তার প্রবৃত্তিকে দমন করার উপযুক্ত মাধ্যম’ (মুত্তাফাক্ব আলাহই, মিশকাত হা/৩০৮০, ‘বিবাহ’ অধ্যায়; বঙ্গানুবাদ মিশকাত  হা/২৯৪৬, ৬/১৪২ পৃঃ)।

অনুরূপভাবে ছাহাবায়ে কেরামগণও যুবকদেরকে বিভিন্নভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) (মৃত ৭৪ হিঃ) কোন মুসলিম যুবককে দেখলে খুশি হয়ে বলতেন, مَرْحَبًا بِوَصِيَّةِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَانَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُوَسِّعَ لَكُمْ فِي الْمَجْلِسِ، وَأَنْ نُفَهِّمَكُمُ الْحَدِيثَ فَإِنَّكُمْ خُلُوفُنَا، وَأَهْلُ الْحَدِيثِ بَعْدَنَا ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অছিয়ত অনুযায়ী আমি তোমাদেরকে মারহাবা জানাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে তোমাদের জন্য মজলিস প্রশস্ত করার ও তোমাদেরকে হাদীছ বুঝাবার  নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কেননা তোমরাই আমাদের পরবর্তী বংশধর এবং পরবর্তী আহলেহাদীছ’ (ইমাম আবু বকর আহমাদ বিন আলী আল-খত্বীব বাগদাদী (মৃত ৪৬৩ হিঃ), শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃ ১২; আহলেহাদীছ আন্দোলন : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিতসহ (থিসিস) টীকা-৫, পৃঃ ৬৬)

যৌবনের শক্তিমত্তা : কবি সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে

যৌবনকাল হচ্ছে অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার। যা মানুষের জীবনকে করে গতিশীল ও প্রত্যাশাময়। দুর্বার উদ্দীপনা, ক্লান্তিহীন গতি, অপরিসীম ঔদার্য, অফুরন্ত প্রাণ চঞ্চলতা এবং অটল সাধনার প্রতীক যৌবন মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সকল বাধাকে পেরিয়ে সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করে নতুন স্বপ্নময় খেলাফতে রাশেদার সোনালী ইতিহাস কায়েম করতে পারে। যুবসমাজই পারে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়িয়ে সেবাব্রতী ভূমিকা পালন করতে। তাইতো দেখা যায় পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী যেমন সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশ ইত্যাদিতে যুবকদেরকেই নিয়োগ দেওয়া হয় এবং বার্ধক্যে পৌঁছার পূর্বেই তাদেরকে অবসরে পাঠানো হয়। কারণ যেকোন সংকটময় মুহূর্তে তারা যাতে দেশ রক্ষায় প্রবলশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রিঃ) যুবক ও যৌবন ধর্মের গান গেয়েছেন। তিনি তারুণ্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, অনুরাগ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জে মুসলিম যুবসমাজের অভিনন্দনের উত্তরে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি যে প্রাণোচ্ছ্বল ভাষণ প্রদান করেছিলেন তারই পরিমার্জিত ও লিখিতরূপ তাঁর ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধটি। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি যে গান গাই, তাহা যৌবনের গান। তারুণ্যে ভরা ভাদরে যদি আমার গান জোয়ার আনিয়া থাকে, তাহা আমার অগোচরে, যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায় সে হয়ত তাহার শক্তি সম্মন্ধে আজও নাওয়াকিফ’।……

‘আমার একমাত্র সম্বল-আপনাদের তরুণদের প্রতি আমার অপরিসীম ভালবাসা; প্রানের টান। তারুণ্যকে, যৌবনকে, আমি যেদিন হইতে গান গাহিতে শিখিয়াছি। সেদিন ইহতে বারে বারে সশ্রদ্ধ সালাম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমস্কার নিবেদন করিয়াছি, জবা কুসুম শঙ্কাশ তরুণ অরুণকে দেখিয়া প্রথম মানব যেমন করিয়া সশদ্ধ নমস্কার করিয়াছিলেন; আমার প্রথম জাগরণ প্রভাতে তেমন সশ্রদ্ধ বিস্ময় লইয়া যৌবনকে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি, তাহার স্তবগান গাহিয়াছি। তরুণ অরুণের মতোই যে তারুণ্য তিমির-বিদারী, সে যে আলোর দেবতা। রঙ্গের খেলা খেলিতে খেলিতে তাহার উদয়, রং ছড়াইতে ছড়াইতে তাহার অস্ত। যৌবন সূর্য যেথায় অস্তমিত, দুঃখের তিমির-কুন্ডলা নিশীথিনীর সেই তো লীলাভূমি’।

তারুণ্য বা বার্ধক্যকে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। কারণ তরুণ ও তারুণ্য এবং যুবক ও যৌবন এক জিনিস নয়। যার মনে শক্তি আছে, যে মিথ্যা, অন্যায় এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস রাখে, যারা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, শিরক, বিদ‘আত, মানব মস্তিষ্ক প্রসূত মতবাদ ইত্যাদি দূর করে অহির বিধান প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর এবং যে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে মৃত্যু ভয়ে ভীত হয় না, সেই যুবক। তার বয়স যদি সত্তর-আশি বছর হয়, বয়সের ভারে তার দেহ যদি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ে তবুও সে যুবক। যৌবন দেহের বিষয় নয়। মনের শক্তিমত্তাই প্রকৃত যৌবন। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি, তাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘমুক্ত সূর্যের মত প্রদীপ্ত যৌবন’। এজন্য যারা ‘পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়ে পড়িয়া থাকে, মায়াচ্ছন্ন নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানেনা, পারে না, যাহারা জীব হইয়াও জড়, যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তূপ আঁকড়িয়ে পড়িয়া আছে, যারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বাররুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে, আলোকপিয়াসী প্রাণচঞ্চল শিশুদের কলকোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে, বয়স তার যাইহোক হোক না কেন সে কখনো তরুণ নয়। তরুণ তারাই ‘যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতিবেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ় মধ্যাহ্নের মার্তন্ডপ্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে’।

পৃথিবীর যেকোন আদর্শ প্রতিষ্ঠার মূল ভূমিকায় ছিল যুবসমাজ। তারাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও জান-মালের কুরবানীর বিনিময়ে ইসলামের আদি যুগ থেকে হক্বের বিজয়ী পতাকা উড্ডীন হয়েছে ও বাতিলের পরাজয় সূচিত হয়েছে। খালেছ তাওহীদে বিশ্বাসী  সুন্নাতের অনুসারী একদল মুসলিম যুবক কর্মী বাহিনীর দ্বারাই নমরূদ ফেরাঊন ও কারূণ এবং যুগে যুগে তাদের উত্তরসূরিরা পরাজিত হয়েছে। তাইতো বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে :

আরও দেখুন:  সমস্ত মুসলমানদেরকে যদি হত্যা করা হয়, তবুও বিজয় ইসলামেরই হবে

আমি যে চির অজেয়

ঝুটা কানূনের নিগড় আমাকে করিতে পারেনি জয়

কত নমরূদ, কত ফেরাঊন, কত শাদ্দাদ ও কারূণ

আসিয়াছে মোর এই চলাপথে হইয়া বাধা দারুণ

পুড়ি নাই আমি নমরূদী হুতাশনে

বিকাইনি আমি বিপুল কারূণী ধনে

শাদ্দাদের ঐ অহংকারী মাথা বালুতে মিশেছে শেষে

ফেরাঊন গেছে নীল দরিয়ায় ভেসে

নমরূদ শিরে পড়েছে পয়যার

আমি মুসলিম

এক আল্লাহ ছাড়া করি না কারো তাসলীম

বল সবাই উচ্চ কণ্ঠে

নারায়ে তাকবীর!!

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম যুবকই তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে জ্ঞানার্জন ছেড়ে কুচক্রীদের পাতানো ফাঁদে পড়ে ঈমান আমল উভয়ই হারাচ্ছে। আবার কেউ কেউ কালের দোহাই দিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে।

যুবকদের প্রতি আহবান :

তরুণ ও যুবকরাই পারে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ভীরুতা ও বাতিলের কালো থাবা থেকে জাতিকে মুক্ত করে অন্ধকারের বদ্ধ দুয়ার খুলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে আলোকিত দিন গড়তে। তাইতো আধুনিক যুগের আরবী সাহিত্যের কবি সম্রা্ট, তারুণ্য উদ্দীপনার ঝান্ডাবাহী কবি আহমাদ শাওক্বী (১৮৭০-১৯৩২ খ্রিঃ) যুবকদের পশ্চাদপদতা, অলসতা ও অজ্ঞতা পরিত্যাগের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার জন্য সোনালী প্রভাতের সূচনার আহবান জানিয়েছেন তাঁর إلي الشباب ‘যুবকদের উদ্দেশ্যে’ নামক কবিতার মাধ্যমে। সেখানে তিনি বলেন

1. عصركم حر مستقبلكم *  في يمين الله خير الامناء

2. لا تقولوا حطنا الدهر فما * هو الا من خيال الشعراء

3. هل علمتم امة في جهلها * ظهرت في المجد حسناء الرداء؟

4. فخذوا العلم علي أعلامه * واطلبوا الحكمة عند الحكماء

5. واقرءوا تايخكم واحتفظوا * بفصيح جاءكم من فصحاء

6. واحكموا الدنيا بسلطان فما * خلقت نصرتها للضعفاء

7. واطلبوا المجد علي الارض فان * هي ضاقت فاطلبوه في السماء.

১. (হে যুবসমাজ!) তোমাদের যুগ স্বাধীন, আর তোমাদের ভবিষ্যৎ আল্লাহ্র ডান হাতে নিরাপদ।

২. তোমরা বলো না যে, কাল আমাদেরকে অধোমুখি করে রেখেছে। কেননা এটা কবিদের কল্পনা বৈ কিছুই নয়।

৩. তোমরা কি সেই জাতি সম্পর্কে জানতে পেরেছ, যারা অজ্ঞতার মাঝে ডুবে আছে, অথচ তাদের মর্যাদায় উত্তম ও স্থায়ী সভ্যতা আত্মপ্রকাশ করছে?

৪. সুতরাং তোমরা আলিমদের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ কর এবং প্রজ্ঞাবানদের নিকট থেকে প্রজ্ঞা অন্বেষণ কর।

৫. তোমরা তোমাদের ইতিহাস পড় এবং তা প্রাঞ্জল ভাষার মাধ্যমে সংরক্ষণ কর এমনভাবে যেন ভাষা তোমাদের নিকট প্রাঞ্জল ভাষীদের নিকট থেকে এসেছে।

৬. তোমরা ক্ষমতার সাথে পৃথিবীকে শাসন কর। কেননা দুর্বলদের জন্য কোন প্রকার বিজয় সৃষ্টি করা হয়নি।

৭. তোমরা পৃথিবীতে মর্যাদা অন্বেষণ কর। আর তা (অন্বেষণের নেশায়) পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়লে, আকাশে তা অন্বেষণ কর।

অন্যদিকে যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে উন্নত দেশ গঠন এবং তার উন্নতি ও অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে যুবসমাজই এগিয়ে আসতে পারে। এজন্য তাদেরকে উপযুক্ত জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের ও দেশের যাবতীয় ত্রুটি, দুর্বলতা ও আলস্য তন্দ্রা দূর করতে হবে। নৈরাশ্য ও হতাশাকে পদদলিত করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীনতার সোনালী আশায় বুক বেঁধে দৃঢ়তার সাথে সত্যের পথে এগিয়ে আসতে হবে। এ দিকেই ইঙ্গিত করে ‘শায়েরুন নীল’ বা নীল নদের কবি নামে পরিচিত বিপ্লবী মিসরীয় আরবী কবি হাফিয ইবরাহীম (১৮৭২-১৯৩২ খ্রিঃ) তাঁর تحية العام الهجري ‘হিজরী সনের অভিবাদন’ কবিতায় বলেন,

(1) رجال الغد المأمول انا بحاجة * الي قادة تبني و شعب يعمر

(2) رجال الغد المأمول انا بحاجة * الي عالم يدري وداع يذكر

………………………………………………….

(3) رجال الغد المأمول انا بحاجة * اليكم فسدوا النقص و شمروا

(4) رجال الغد المأمول لا تتركوا غدا* يمر مرور الامس والعيش اغبر

(5) رجال الغد المأمول ان بلادكم * تناشدكم بالله ان تتذكروا

(6) عليكم حقوق للبلاد اجلها * تعهد روض العلم فالروض مقفر

(7) قصاري مني اوطانكم ان تري لكم * يدا تبتني مجدا ورأسا يفكر

(8) فكونوا رجالا عاملين اعزة * وصونوا حمي اوطانكم وتحرروا

(১) হে আগামী দিনের প্রত্যাশিত পুরুষরা (যুবসমাজ)! আমাদের এমন কিছু (যুবক ও উদ্দমী) নেতার প্রয়োজন, যারা (দেশ) গড়বে এবং এমন জাতির যারা (দেশে) আবাদ করবে।

(২) হে আগামী দিনের প্রত্যাশিত পুরুষরা (যুবসমাজ)! আমাদের প্রয়োজন এমন একজন আলেমের যিনি সঠিক বিষয় জানবেন (এবং জানাবেন)। আর এমন একজন দাঈর যিনি (জনগণকে) উপদেশ দিবেন।

(৩) হে আগামী দিনের প্রত্যাশিত পুরুষরা (যুবসমাজ)! তোমাদের নিকট আমাদের (আশা ও) প্রয়োজন রয়েছে। তাই তোমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি দূর কর এবং প্রস্ত্তত হও।

(৪) হে আগামী দিনের প্রত্যাশিত পুরুষরা (যুবসমাজ)! তোমরা আগামীকালকে গতকালের মত অতিবাহিত হতে দিও না, যাতে জীবন ছিল ধুলায় ধূসরিত।

(৫) হে আগামী দিনের প্রত্যাশিত পুরুষরা (যুবসমাজ)! তোমাদের দেশ তোমাদেরকে আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছে যে, তোমরা (দেশের) কথা স্মরণ করবে।

(৬) তোমাদের উপর দেশের কতকগুলো অধিকার রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বপ্রথম হ’ল, জ্ঞানের বাগিচার পরিচর্যা কর। কেননা উহা উজাড় হয়েছে।

(৭) তোমাদের মাতৃভূমির একান্ত আশা যে, উহা তোমাদের জন্য এমন একটি (কর্মঠ) হাত দেখবে, যা উহার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং এমন একটি মাথা দেখবে যা (গঠনমূলক) চিন্তা করবে।

(৮) অতএব নিজেদেরকে সম্মানিত করতে তোমরা সকলে কর্মী হয়ে যাও এবং তোমাদের মাতৃভূমির সংরক্ষণ কর এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখ।

ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আধুনিক কবি আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫ খ্রিঃ)-এর ‘আহবান’ কবিতার প্রতি ছত্রে ছত্রে তারই প্রতিধ্বনি হয়েছে। কবি বলেন,

আয় অন্ধকারের বদ্ধ দুয়ার খুলে,

বুনো হাওয়ার মতো আয়রে দুলে দুলে

গেয়ে নতুন গান,

আজ মরা গাঙ্গের প্রান্তে নতুন সুরে

ছড়িয়ে দেবে প্রাণ।

যাক বান ডেকে যাক বাইরে এবং ঘরে

আসুক ঝড়ো হাওয়া

এই আকাশ মাটি উঠুক কেঁপে কেঁপে

শুধু ঝড় বয়ে যাক মরা জীবন ছেড়ে

বিজলী দিয়ে হাওয়া

আয় ভাই বোনেরা ভয়-ভাবনাহীন

সেই বিজলী দিয়ে গড়ি নতুন দিন।

পৃথিবী তাকিয়ে আছে তরুণদের জাগরণ কামনায়। অধিকার বঞ্চিতদের তারাই সচেতন করে তুলতে পারে। অসত্য, অন্যায়কে বিদূরিত করে সকল বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাওহীদের বাণী প্রতিষ্ঠায় তাদের জয়যাত্রা চলবে ভবিষ্যতের দিকে। যেমন কবি আব্দুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪ খ্রিঃ) তার ‘জয়যাত্রা’ কবিতায় তুলে ধরেছেন,

আরও দেখুন:  জিহাদ কী?

যাত্রা সবে শুরু হোক হে নবীন, করো হানি দ্বারে

নবযুগ ডাকিছে তোমারে

তোমার উত্থান মাগি, ভবিষ্যৎ রয়ে প্রতীক্ষায়,

রুদ্ধ বাতায়ন পাশে শঙ্কিত আলোক শিহরায়।

সুপ্ত তাজি বরি লও তারে, লুপ্ত হোক অপমান

দেখা দিক শ্বাশত কল্যাণ

…………………………….

অজস্র মৃত্যু লঙ্গি, চলো অনায়াসে

মৃতুঞ্জয়ী জীবন উল্লাসে।

যৌবন শক্তির অপব্যবহার : একটি বিশ্লেষণ

সৃষ্টি জগতের আদি থেকে অধ্যাবধি যুবসমাজের দ্বারাই সবধরনের অন্যায় কাজ সংঘঠিত হয়েছে। আবার সমাজের কল্যাণ ও গঠনমূলক কাজের নেতৃত্ব যুবসমাজই দিয়েছে। ভাল-মন্দ, ভাঙ্গা-গড়া ইত্যাদি ব্যাপারে বয়স্কদের তুলনায় যুবকরাই অগ্রগামী। সুতরাং তারা যদি কোন ভাল কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে জীবন দিয়ে হলেও তা সম্পাদন করে। আবার এই যুবকরাই খারাপ পথে পা বাড়ালে জাতির ভাগ্যাকাশে অমানিশার ঘোর অন্ধকার নেমে আসে এবং ধ্বংস সুনিশ্চিত হয়। নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতি উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে, কিন্তু ভরা বর্ষায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদীর দু’ধারে উঁচু বাঁধ না দিলে বন্যার পানি নদীর দু’কূল প্লাবিত করে ফল-ফসল, ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যৌবনকালকে অনুরূপভাবে সুপথে নিয়ন্ত্রণ না করলে যেকোন মুহূর্তে বিপদগামী হয়ে ধ্বংসের পথে পা বাড়াতে বাধ্য।

পৃথিবীর প্রথম হত্যাকান্ড যুবক কাবীলের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়েছিল স্রেফ হিংসাবশত ভাই হাবীলকে হত্যা করে (মায়েদা ৫/২৭-২৮)। ফলে অন্যায়ভাবে সকল হত্যাকান্ডের পাপের একটা অংশ আদম (আঃ)-এর প্রথম পুত্র কাবীলের আমলনামায় যুক্ত হয়ে থাকে (বুখারী হা/৩০৩৫; মুসলিম, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২১১, ‘ইলম’ অধ্যায়; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/২০১, ২/১০ পৃঃ)

হযরত লূত (আঃ)-এর ক্বওমের যুবক সম্প্রদায় শিরক-বিদ‘আত ও কুফরীতে লিপ্ত হওয়া ছাড়া সমকামিতার মত নোংরামিতে লিপ্ত হয়েছিল। ফলে আল্লাহ তাদের শহরকে উল্টিয়ে প্রস্তর বর্ষণে সমূলে ধ্বংস করেন (আনকাবূত ২৯/২৮-৩০; আ‘রাফ ৭/৮০; হূদ ১১/৮২-৮৩; নবীদের কাহিনী ১/১৫৮ পৃঃ)

সমাজ সংস্কার ও যৌবনকাল :

তাক্বওয়াবান যুবকদের দ্বারাই পৃথিবী  উপকৃত হয়েছে এবং পৃথিবীতে উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার পথভ্রষ্ট যুবকদের দ্বারাই পৃথিবীর বহু সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। কেননা মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) জান্নাতপিয়াসী তাক্বওয়াশীল যুবকদের নিয়েই বদর, ওহুদ, খন্দক, তাবুকসহ অন্যান্য যুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন। চীন বিপ্লব, ফরাসী বিপ্লব এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধেও লক্ষ লক্ষ যুবকদের ভূমিকা স্মরণীয়। ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, চেচনিয়া, বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, ফিলিস্তীন প্রভৃতি দেশে এক শ্রেণির যুবকদের জানমাল, তপ্ত লহু এবং রাঙা খুনের বিনিময়ে ইসলামের পতাকা ও তাওহীদ-রিসালাতের বাণী রক্ষার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। জাহান্নামের তীব্র অনলের ভয়ে ভীত এবং জান্নাতের মোহরাঙ্কিত সুধা পানে উদগ্রীব এক শ্রেণির যুবসমাজ ক্ষণস্থায়ী পার্থিব মোহ ডাষ্টবিনে নিক্ষেপ করে অহির বিধান প্রতিষ্ঠার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। কেননা তাদের হৃদয়ে সদা জাগ্রত আছে পরম করুণাময় আল্লাহর বাণী-إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহ্র রাস্তায়। অতঃপর তারা মরে ও মারে। উপরিউক্ত সত্য ওয়াদা মওজুদ রয়েছে তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে। আল্লাহ্র চেয়ে ওয়াদা পূর্ণকারী আর কে আছে? অতএব তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর তোমাদের ক্রয়-বিক্রয়ের উপরে, যা তোমরা সম্পাদন করেছ তাঁর সাথে। আর সেটিই হল মহান সফলতা’ (তাওবা ৯/১১১)। অপরদিকে গোটা মুসলিম তথা ইসলামকে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে দেওয়ার জন্যও এক শ্রেণির রক্তপিপাসু বেঈমান যুবক তাদের সর্বশক্তি মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে নিয়োগ করেছে। ফলে মুসলিম বিশ্বের মানচিত্র আজ রক্তে রঞ্জিত। সুশিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবতা শূন্য অমুসলিমদের সংঘবদ্ধতার ফলেই আজ চারদিকে মানবতা কেঁদে মরছে এবং অনৈতিকতার বিজয় হচ্ছে। অশ্লীল গান, নগ্ন ছবি, মদ-জুয়া ইত্যাদি কার্যকলাপে যুবসমাজের প্রভাবই বেশি। মোটকথা, পৃথিবীর প্রতিটি বিভাগেই যুবসমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাই আল্লাহ্র দেওয়া পবিত্র আমানত যৌবনের প্রতিটি ধাপ, মেধা, শ্রম ও প্রতি ফোটা রক্ত মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করলেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র শান্তি ও কল্যাণে ভরে যাবে এবং পরকালের ভয়াবহ দিনে আল্লাহ্র আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভের সৌভাগ্য অর্জন করবে। যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। অন্যথায় জাহান্নামের লেলিহান শিখায় অগ্নিদগ্ধ হতে হবে। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِى ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ الإِمَامُ الْعَادِلُ وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ رَبِّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسَاجِدِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّى أَخَافُ اللَّهَ. وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ .

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, সাত শ্রেণির লোকদের আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ার নিচে স্থান দিবেন। সেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক ২. ঐ যুবক যে তার প্রভুর আনুগত্যে যৌবনকে অতিবাহিত করেছে ৩. সেই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে লটকানো থাকে ৪. সেই দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ভালবাসে এবং তারা সেকারণে পরস্পরে মিলিত হয় এবং পরস্পর পৃথকও হয় ৫. সেই ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী নারী আহবান করে আর সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি ৬. সেই ব্যক্তি যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে তা বাম হাত জানে না ৭. সেই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দুই চক্ষু অশ্রু বিসর্জন দেয় (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭০১, ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘মসজিদ ও ছালাতের স্থান সমূহ’ অনুচ্ছেদ-৭, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৬৪৯, ২/২১৬ পৃঃ)

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায়, আসুন আমরা আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আল্লাহ প্রদত্ত অমূল্য সম্পদ যৌবনকালের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তার যথাযথ সদ্ব্যবহার করে জান্নাতী যুবকদের কাতারে শামিল হতে সর্বাত্মক চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন-আমীন!

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button