ছাহাবী চরিত

মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ)

আবু উসাইদ

মক্কার প্রখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুসআব ইবন্ উমাইর। সমস্ত অ্যারাবিয়ান অঞ্চলে যে সকল পরিবার সম্পদ ও বিত্তের দিক থেকে শীর্ষে ছিল, মুআবের পরিবার ছিল তাদেরই একটি। বিপুল প্রচুর্য আর বিলাসিতার মধ্য দিয়ে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল। তিনি ছিলেন ধনী বাবা-মার একমাত্র সন্তান। ভীষন আদর এবং যত্নে তারা তাদের সন্তানকে বড় করছিলেন। আরব্য অঞ্চলের সকলের চেয়ে তিনি দামী জামা পরতেন। সে সময়কার সবচেয়ে স্টাইলিশ জুতা থাকতো তাঁর পায়ে। তখনকার যুগে ইয়ামেনী জুতা ছিল সারা বিশ্বে বিখ্যাত। আর মুসআবের পায়ে থাকত ইয়ামেনী জুতার মধ্যেও সবচেয়ে দামী জোড়াটি।

তিনি দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন ও সুপুরুষ। শুধুমাত্র ফ্যাশন এবং সৌন্দর্যের জন্য নয়, বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষনতার জন্যও তিনি ছিলেন তৎকালীন কুরাইশ সোসাইটির মধ্যে বিখ্যাত একজন। তাঁর এ সকল গুনাবলীর জন্য তিনি মক্কার মানুষদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন, এবং অবিবাহিত পুরুষদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম পছন্দের তালিকায়। বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও কুরাইশদের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সমাবেশে তাঁর প্রবেশাধীকার ছিল। আর সেজন্যেই তিনি ছিলেন এমন একটি অবস্থানে, যে মক্কার মানুষ এবং কুরাইশদের পরিকল্পনা এবং মনোভাব সম্বন্ধে জানতেন।

একদিন হঠাৎ মক্কার মানুষদের মধ্যে একটি বিস্ময়কর খবর রটে গেল যে, মুহাম্মাদ নামের একজন বিশ্বস্ত কুরাইশ, যিনি আল আমিন বা বিশ্বাসী হিসাবে সবার কাছে পরিচিত, নিজেকে আল্লাহ্র নবী হিসাবে বলছে এবং এ কথাও বলছে যে তাঁকে সত্য সহ সতর্ককারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে। তিনি কুরাইশদের ডেকে বলেছেন-আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো সার্বভৌমত্ব মেনে নিলে কঠিন শাস্তি সবার জন্য অপেক্ষা করছে, এবং যারা আল্লাহ কে ইলাহ্ হিসাবে মেনে নিয়ে আর সবকিছুর আনুগত্য ত্যাগ করবে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার। মক্কার সমস্ত মানুষের উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ে পরিনত হলো মুহাম্মাদের এ অদ্ভুত দাবীর খবর। কুরাইশদের মধ্যে দায়িত্বশীলরা জরুরী পরামর্শ সভায় বসে এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করল। যখন তারা দেখল মুখে বলে এবং বিদ্রুপ করে এর কোন বিহিত হচ্ছেনা, তখন তারা অত্যাচার এবং প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

নতুন এই মতবাদ মুসআবের কানেও এসেছিল। তিনি বিষয়টি নিয়ে তলিয়ে দেখবেন বলে ভাবলেন। ইতিমধ্যেই তিনি খবর পেলেন মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গীরা কুরাইশদের অত্যাচার থেকে বেঁচে আলোচনা করার জন্য মক্কার উপকন্ঠে আরকাম নামের একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর বাড়ীতে মিলিত হচ্ছেন। কৌতুহলী মুসআব তাঁর কৌতুহল মেটাবার জন্য এ বাড়ীটিতে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। কুরাইশদের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্য মুসআব অত্যন্ত গোপনে চললেন দারুল আরকামের দিকে। এই হলো সেই বিখ্যাত দারুল আরকাম বা আরকামের গৃহ, যেখান থেকে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) গোপনে ইসলাম প্রচার করছিলেন এবং মিলিত হচ্ছিলেন তাঁর সাহাবীদের সাথে।

ধীর পায়ে, বুকে অজানা এক শঙ্কা নিয়ে মুসআব পৌঁছে গেলেন সেখানে। গিয়ে দেখলেন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর গুটিকয়েক সঙ্গীদের নিয়ে সালাত আদায় করছেন ও তাদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে মুসআব রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সামনে এসে পড়লেন। তিনি মুসআবকে স্বাগত জানালেন এবং তাঁর পবিত্র হাত মুসআবের বুকে স্থাপন করলেন। মুসআবের অন্তর ভীষণ উত্তেজনায় আপ্লুত হল। একটি গভীর অনুভূতি এবং শান্তিতে তাঁর হৃদয় ছেয়ে গেল। যা দেখেছেন এবং শুনেছেন তার আবেশে তিনি আবিষ্ট ছিলেন। কুরআনের বাণী তাঁর মনে ভীষনভাবে দাগ কেটেছিল। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি ইসলামের ঘোষনা দিলেন। এ ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সে থেকে মুসআবের প্রখর মেধা, চমৎকার ব্যবহার এবং একাগ্রতা ইসলামের জন্য নিবেদিত হল যা মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

ইসলাম গ্রহণের পর মুসআবের প্রথম চিন্তা ছিল তাঁর মাকে নিয়ে। তাঁর মায়ের নাম ছিল খুন্নাস্ বিনত্ মালিক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ় মনোবলের অধীকারী, সম্ভ্রান্ত বংশীয় আরব মহিলা। তিনি আরও ছিলেন নির্ভীক এবং অত্যন্ত ক্ষমতাবান। মুসআব যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সম্ভবত তাঁর মা ছাড়া পৃথিবীর কোন কিছুকে তিনি ভয় পাননি, এমনকি ইসলাম গ্রহণের ফলে মক্কার সমস্ত যায়গা থেকে তিনি পদচ্যুত হবেন, অন্যান্য মুসলিমদের মতো কঠিন অত্যাচার নেমে আসবে তাঁর উপর-এ চিন্তাও তাঁর মনে কোন প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু মাকে প্রতিপক্ষ হিসাবে নেয়ার ব্যাপারটা তিনি সহজ মনে করলেন না।

মুসআব দ্রুত চিন্তা করলেন। তিনি সংকল্প করলেন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কোন ফায়সালা না আসা পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি মার কাছ থেকে গোপন রাখবেন।

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে দেখা করার জন্য তিনি নিয়মিত দারুল আরকামে যেতে লাগলেন। ঘরে ফিরে এসে তিনি থাকতেন আগের মতই, যার ফলে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা তাঁর মা জানতে পারলেন না। কিন্তু বেশীদিন সে অবস্থা চলল না। একদিন খুনাইসের কাছে ঠিকই প্রকাশিত হয়ে পড়ল ছেলের ইসলাম গ্রহণের খবর।

সে সময়টা মক্কায় এমন ছিল, যখন কোন খবর মক্কাবাসীদের কাছ থেকে বেশীদিন গোপন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কুরাইশদের চোখ আর কান যেন মক্কার অলিতে গলিতে খোলা থাকত। মক্কার মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাজ করত একদল শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী। ইতিমধ্যে দারুল আরকামে মুসআবের নিভৃত যাতায়াত উসমান ইবন্ তালহা নামের এমনই একজন গোয়েন্দার নজরে পড়ে গিয়েছিল। সে থেকে উসমান ইবন্ তালহা মুসআবকে অনুসরণ করতে শুরু করেন এবং একদিন তিনি লক্ষ্য করেন মুসআব ঠিক সেভাবেই প্রার্থনা করছেন যেভাবে মুহাম্মাদ করে থাকেন। এ ছিল মুসআবের ইসলাম গ্রহণ করার সত্যতার প্রমাণ। মরুঝড় যেভাবে প্রচন্ডগতিতে বয়ে যায়, মুসআবের ইসলাম গ্রহণের খবর তেমনি মক্কায় মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এবং এক সময় এ সাংঘাতিক খবরটি মুসআবের মায়ের কাছেও গিয়ে পৌঁছল।

মক্কার কুরাইশ নেতৃত্ব মুসাইবের খোঁজে বের হল। এক সময় তারা সকলে এসে জমায়েত হল তাঁর বাড়ীতে। তারা জানতে চাইছিল মুসআবের ইসলাম গ্রহণের খবর আদৌ সত্য কিনা এবং কেন সে এমন সমাজবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল।

মুসআব ধীরে ধীরে এদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এবং স্থিরচিত্তে তিনি ঘোষনা করলেন তিনি ইসলাম গ্রহন করেছেন। তিনি কেন ইসলাম গ্রহন করেছেন তাও তিনি ব্যাখ্যা করলেন। এরপর তিনি কুরআন থেকে কিছু আয়াত তাদের শুনালেন, যে আয়াতগুলো কাফিরদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়েছিল এবং যে আয়াত শুনে চিরকালই মুমিনদের বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে। যারা সেখানে এসেছিল, মুসআবের কথা শুনে তাদের হৃদয়গুলো শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং সত্যের প্রতি আপ্লুত হল, যদিও তা সংখ্যায় ছিল স্বল্প।

মুসআবের মা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে ছেলের কথা শুনছিলেন। যে সন্তানকে সারা জীবন তিনি এত আদর-

যত্ন দিয়ে মানুষ করেছেন, যে মুসআব তাঁর জীবনের সবকিছু, আজ তার এহেন কথা শুনে তিনি পাগলপ্রায় হয়ে গেলেন, এমনকি ছেলেকে এক আঘাতে চিরকালের জন্য মুখ বন্ধ করে দেবার ইচ্ছাও তার জেগে উঠল। কিন্তু সন্তানের প্রতি প্রবল ভালোবাসা তাঁকে তা করা থেকে বিরত রাখল, যদিও তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করলেন-ছেলের এমন কাজের একটা উপযুক্ত শাস্তি তিনি দেবেন। আর তার এ প্রতিশ্রুতি মুসআবের জন্য ভয়াবহ পরিণাম নিয়ে এল। তিনি মুসআবকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেন ঘরের এক কোণে এবং তাকে শক্ত করে বেঁধে ফেললেন, দরজা বন্ধ করে সিল করে দেয়া হল। নিজ ঘরেই বন্দী হলেন মুসআব ইবন্ উমাইর।

তাঁর মা তাঁর ঘর পাহারা দেবার জন্য চতুর এবং শক্তিশালী কয়েকজন লোককে নিয়োগ করলেন। তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশ দেয়া হলো যাতে মুসআব আর কোনভাবেই মুহাম্মাদের সাথে কোন যোগাযোগ না রাখতে পারে এবং নতুন বিশ্বাস সম্বন্ধে আর কোন কিছু জানতে না পারে। দীর্ঘদিন ধরে মুসআব এদের তীক্ষè পাহারায় বন্দী অবস্থায় থাকলেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এবং অন্যান্য মুসলিমদের খবর জানার জন্য তিনি উদগ্রীব হয়ে উঠে উঠলেন। যেভাবেই হোক তার এ খবর জোগাড় করতেই হবে। অবশেষে আল্লাহর ইচ্ছায় গার্ড বাহিনীর তীক্ষ্ম চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাঁর কাছে খবর পৌঁছালো যে, অমানুষিক অত্যাচার মুসলিমদের জর্জরিত করে ফেলছে এবং অত্যন্ত গোপনে একদল মুসলিম এ অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর নির্দেশে আবিসিনিয়ার (বর্তমানের ইথিওপিয়া) দিকে পাড়ি দেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুসাইব সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এ বন্দীদশা থেকে পালিয়ে মুসলিমদের সে দলটির সাথে আবিসিনিয়া চলে যাবেন। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগলেন। মন তাঁর পড়ে আছে মুসলিম ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী দলটির কাছে। অবশেষে একদিন আল্লাহ্র ইচ্ছায় সুযোগ এল। দীর্ঘদিন বেঁধে রাখার পর একদিন তাঁর মা গার্ডদের বললেন কিছু সময়ের জন্য বাঁধন খুলে দিতে। কিছু সময় পর তাদের অমনোযোগিতার সুযোগে অত্যন্ত সন্তর্পণে তিনি বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। আর দেরী করলেন না। দ্রুত তিনি মিলিত হলেন মুসলিম দটির সাথে।

আরও দেখুন:  আকীল ইবন আবী তালিব রা:

কতদিন পর আবার সে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে দেখা হওয়া, যাকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবেসে ফেলেছেন। আনন্দে আর আবেগে তিনি কাঁদছেন। হাতে সময় ছিল খুব কম। আল্লাহ্র জন্য পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ত্যাগ করে হিজরতের জন্য প্রস্তুত একদল মুসলিমের সাথে তিনি চললেন লোহিত সাগরের দিকে। সেখানে অপেক্ষা করছিল নৌযান। দলটি আল্লাহর নাম নিয়ে চড়ে বসল সেটিতে। নাবিক দ্রুত পাল তুলল। পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়া সে দলটির সঙ্গী হয়ে মুসআব ভেসে চললেন লোহিত সাগরের বুক চিরে আফ্রিকার পথে।

উত্তাল সমূদ্রপথ পাড়ী দিয়ে দীর্ঘদিনের পথ পেরিয়ে এ দলটি একদিন পৌঁছে গেল আবিসিনিয়া। সেখানকার খৃস্টান রাজা নাজ্জাশী ছিলেন খুব সহানুভূতিশীল মানুষ। তিনি মুসলিমদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘনে ইবাদত করার ব্যবস্থা করলেন। নিজ ভূমি ছেড়ে আসা দলটি আল্লাহর জন্য অপরিচিত প্রবাসে শান্তিতেই দিন কাটাতে লাগল। তবে এত কিছুর পরও তাদের অন্তরটা মক্কায় ফেরার জন্য হু হু করে উঠত। তাদের এ আকুলতার কারণ ধন-সম্পদ এবং ভিটেমাটির জন্য ছিল না, বরং তা ছিল প্রাণপ্রিয় রাসুল (সাঃ) এর জন্য। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর আদেশে তারা দেশ ত্যাগ করেছিলেন, তবে সবাই উদগ্রীব ছিলেন তাঁর কাছে ফিরে যাবার জন্য, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহচর্যের জন্য।

একদিন সে দলটির কাছে একটি খবর পৌঁছালো যে, মক্কার সকল মানুষ মুহাম্মাদের নতুন বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছে এবং বিশ্বাসীরা সেখানে নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করতে পারছে। এ খবর শুনেই মুসআব রওযানা হলেন মক্কার পথে। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মুসআব যখন মক্কায় পৌঁছলেন, গিয়ে শুনলেন সে খবর পুরোপুরি মিথ্যা, বরং কুরাইশ বাহিনীর আত্যাচার ও নির্যাতন আরো বেড়েছে। আবার তিনি ফিরে গেলেন আবিসিনিয়া। মুসলিম দলকে তিনি সতর্ক করে মক্কায় ফিরে আসা ঠেকালেন এবং ধৈর্য ধরে অপেক্ষাই শ্রেয় মনে করে আবিসিনিয়ায় আগের মতই দিন কাটাতে লাগলেন।

এদিকে মুসআবের মা খুনাইস ছেলের জন্য শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ছিলেন। তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন তাঁর ছেলেকে, যদিও তার ধর্মবিশ্বাস ছিল তাঁর জন্য সহ্যের অতীত। ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়ছিলেন। তিনি জানতেন মুসআবও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসে এবং তাঁর বিশ্বাস ছিল মুসআব একদিন ভুল বুঝে ফিরে আসবেই।

আবিসিনিয়া থেকে মুসআব আবার একদিন মক্কা ফিরে এলেন। খুনাইসও খবর পেলেন ছেলে ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর মা আর ছেলের দেখা হল। দুজনেই আবেগাপ্লুত ছিলেন। খুনাইস আশা করেছিলেন ছেলে মুহাম্মাদের প্রচার করা অদ্ভুত বিশ্বাস ত্যাগ করে ফিরে এসেছে, কিন্তু অল্পক্ষনের মধ্যেই তিনি বুঝলেন তাঁর এই ধারণা ভুল। ক্রোধে তিনি ফেটে পড়লেন। মুসআবকে নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য তিনি শেষ চেষ্টা করবেন বলে স্থির করলেন, এবং এটা কোন সহজ কায়দায় ছিল না, তিনি ছেলেকে আবার বন্দী করে বেঁধে ফেলার জন্য ভৃত্যদের ডেকে আদেশ করলেন।

মুসআব মায়ের সকল অত্যাচার কোন প্রতিবাদ ছাড়াই মেনে নিয়েছিলেন সবসময়। কিন্তু এবার তিনি মাকে শপথ করে বললেন, কেউ যদি তাকে বন্দী করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের সবাইকে তিনি হত্যা করবেন। খুনাইস জানতেন তাঁর ছেলে কখনও অনর্থক কথা বলে না। তার উপর তার ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তাও তাঁকে অবাক করেছিল।

মা আর সন্তানের বিচ্ছেদ ধীরে ধীরে অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল যদিও দুজন দুজনকে ভীষণ ভালোবাসতো। মা-পুত্র দুজনই এহেন পরিণতি মেনে নিতে পারছিলেন না, কিন্তু এর মাধ্যমে ঈমানের উপর মুসআবের এবং কুফরের উপর খুনাইসের অটল দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। খুনাইস মুসআবের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মুসআব পরিবারের বিশাল ঐশ্বর্য আর বিত্তের উত্তরাধিকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত হল। দুজনের শেষ কথোপকথনে খুনাইস বললেন,

”যে পথে তুমি পা বাড়িয়েছ, তুমি তোমার সে পথেই চলে যাও। জেনে রেখো, আজ থেকে আমি আর তোমার মা নই।” মুসআব ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। মার খুব কাছে এসে বসলেন।

”মা, আপনাকে আমি জানি আর আমি ভালোবাসি আপনাকে। আমি আপনাকে আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল-এ সাক্ষ্য দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।”

”আকাশের ছুটন্ত তারার শপথ, আমার অন্তর চিন্তাশক্তি যদি লোপও পেয়ে যায় তবুও আমি তোমার এ দীন গ্রহণ করব না।”

মুসআব ঘর ছাড়লেন। পেছনে ফেলে এলেন বিপুল ঐশ্বর্য আর বিলাসিতার জীবন। আরব্য অঞ্চলের যেই তার এ অবস্থার কথা শুনত, ভীষণ অবাক হয়ে ভাবত এও কিভাবে সম্ভব!

মুসআব এবার সমস্ত বন্ধনমুক্ত। তিনি এবার সমস্ত চিন্তা চেতনা ও মেধা ইসলামের জন্য নিবেদন করলেন। অসম্ভব মেধাবী এ ছেলেটি ইসলামের জ্ঞানে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিপূর্ণ বিকশিত করতে লাগলেন।

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মুসআবকে অত্যন্ত ভলোবাসতেন। এর কয়েক বছর পরের কথা। একদিন মুসআব রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে এলেন যেখানে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে ঘিরে মুসলিমদের একটি দল বসে ছিল। দূর থেকে মুসআবকে আসতে দেখে উপস্থিত লোকদের মাথা নীচ ুহয়ে গেল। দলের অনেকেই কেঁদে ফেললেন। কারণ মুসআবের পরণে ছিল একটি তালি দেয়া জীর্ণ জোব্বা। একদিন এ মুসআবের গায়েই থাকত বিশ্বের সবচেয়ে দামী পোষাক, আরবের বিলাসিতা আর সৌন্দর্যের মডেল ছিল সে। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মুসআবের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল হলেন। তার দিকে চেয়ে স্মিত হেসে বললেন,

”এ মুসআবকে আমি মক্কায় তার বাবা-মার সাথে দেখেছি। তাঁরা ওকে খুব যতœ করতেন এবং তার সাচ্ছন্দের জন্য সবকিছুই করেছেন। কুরাইশদের মধ্যে কোন যুবকই তার মত ছিল না। এরপর এ সমস্ত কিছু সে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করে এসেছে এবং নিজেকে সে রাসুলের কাজে নিবেদিত করেছে।” রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলে চললেন,

”একদিন সে সময় আসছে যখন আল্লাহ্ তোমাদের পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের উপর বিজয় দান করবেন। তোমাদের গায়ে তখন সকালে থাকবে একটি পোষাক আর বিকেলে আরেকটি। তোমরা সকালে খাবে একরকম খাবার আর বিকেলে খাবে আরেকরকম।”

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) প্রকারান্তরে অচিরেই মুসলিমদের ক্ষমতা আর সম্পদের প্রাচুর্যের আভাস দিলেন। তখনকার যুগে আরবদের যে অবস্থা ছিল, সে অবস্থা বিবেচনায় রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর এ কথা ছিল অলীক কল্পনার মত। কিন্তু আল্লাহ্র রাসুল তো মিথ্যা বলতে পারেন না। সঙ্গী সাহাবীরা তাই ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-

”ইয়া রাসুলুল্লাহ্, আমাদের জন্য কোন সময়টা মঙ্গলজনক হবে, এখনকার সময়টা নাকি তখনকার ?” রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন,

“তোমাদের জন্য বরং এখনকার সময়টিই মঙ্গলজনক। যে বিশ্বের কথা আমি জানি, সে বিশ্বের কথা যদি তোমরা জানতে তাহলে অবশ্যই তোমরা সে বিশ্বের সাথে নিজেদেরকে জড়ানো পছন্দ করতে না।”

ইসলাম আবির্ভবের প্রায় দশটি বছর কেটে গেল। কিন্তু মক্কার মানুষরা ইসলাম এবং রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর উপর আগের মতই অত্যাচার এবং মন চালিয়ে যেতে লাগল। অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল রাসুল (সাঃ) নতুন ঠিকানা খোঁজার জন্য মক্কার অদূরে তাইফে গেলেন সত্যের বার্তা নিয়ে। কিন্তু সেখানকার মানুষ তাঁকে ভীষন অত্যাচারে জর্জরিত করে ফেলল। এমনকি তাইফ শহর থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হল। ইসলামের আকাশ যেন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। কোথাও কোন আশ্রয় এবং বন্ধু নেই। গুটিকয়েক অবিচল সাহাবী রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে আল্লাহ্র দীন আঁকড়ে ধরে ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল ইসলামের অগ্রযাত্রা এ প্রজন্মটির পরেই স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। মুসলিমদের এই চরম দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় তৎকালীন ইয়াসরিব আর আজকের মদীনা থেকে বেশ কয়েকজনের একটি দল রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করল এবং আল্লাহ্র রাসুলকে তাদের ভূমিতে এসে বসবাসের আনুরোধ জানালো। তাঁরা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে তাঁকে এবং অন্য মুসলিমদের পূর্ণ নিরপত্তা দেবার জন্য ওয়াদা করলেন।

আরও দেখুন:  আবু মাস’উদ আল-বদরী (রা)

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। মদিনা থেকে আগত নতুন মুসলিমরা তাঁর কাছে অনুরোধ করলো সেখানে একজন দা’য়ী (যিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকবেন) এবং ইসলামিক কালচার এবং আল্লাহ্র বিধান শিক্ষা দেবার জন্য একজন শিক্ষক পাঠাতে। এ ছিল এক কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ কাজের জন্য দরকার হলো একজন নির্ভীক এবং জ্ঞানী মুসলিমের। এ কাজটি করার জন্য তখনকার প্রতিটি মুসলিম উদগ্রীব ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত উন্নত ও দৃঢ় চরিত্র, উত্তম ব্যবহার কুরআনের উপর অগাধ জ্ঞান এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার জন্য রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এ কাজের জন্য নির্বাচিত করলেন মুসাইব ইবন্ উমাইরকে। আল্লাহর নাম নিয়ে মুসআব বেরিয়ে পড়লেন মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে। বিশাল মরুভূমির বুক চিরে, শত্র“দের ভয়কে তুচ্ছ করে মুসআব একাকী এগিয়ে চললেন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর নিয়োগকৃত ইসলামের প্রথম দা’য়ী হয়ে।

এই মিশন সম্বন্ধে মুসআব খুব ভালোভাবে জানতেন। তিনি জানতেন এ মিশনের মাধ্যমে একইসাথে তাঁকে মানুষকে আল্লাহ্ এবং ইসলামের সরল পথের দিকে ডাকতে হবে এবং নির্যাতিত মুসলিমদের ভবিষ্যতের জন্য একটি ক্ষেত্র তৈরী করতে হবে।

মদীনায় মুসআব প্রবেশ করলেন সেখানকার বিখ্যাত খাজরাজ গোত্রের সা’দ ইবন্ জুরারাহ্ এর মেহমান হিসাবে। তাঁরা দুজন মিলে এরপর শুরু করলেন মানুষকে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ। তারা মানুষের ঘরে ঘরে এবং যে কোন মজলিশে গিয়ে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কথা বলতে লাগলেন, ইসলামের কথা ব্যাখ্যা করে বুঝাতেন এবং কুরআন থেকে আল্লাহর কথা তাদেরকে শুনাতেন। আল্লাহর কৃপায় মদীনার আনেকেই তখন ইসলাম গ্রহণ করলেন। এ ছিল মুসআবের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক কিন্তু মদীনার তখনকার অনেক নেতাদের জন্য এক অশনী সংকেত।

একবার মুসআব এবং সা’দ বনু জাফর এর একটি বাগানে বসে ছিলেন। তাঁদের সাথে ছিলেন আরো কয়েকজন মুসলিম এবং ইসলামের প্রতি উৎসাহী লোকজন। মদীনার তখনকার বিখ্যাত ও প্রভাবশালী নেতা উসাইদ ইবন্ হুদাইর এ খবর পেলেন যে মক্কা থেকে আগত সে যুবক কিছু স্বধর্মত্যাগী লোকজনসহ সেখানে অবস্থান করছে। ভীষণ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি ছুটে আসতে থাকলেন সে দলটির দিকে। সা’দ ইবন্ জুরারাহ্ তাঁকে দেখতে পেলেন এবং মুসআবকে সতর্ক করে বললেন-

”উসাইদ ইবন্ হুদাইর আমাদের দিকে ছুটে আসছে। সে হল তার গোত্র এবং এ শহরের অনেক বড় নেতা। আল্লাহ্ তাঁর অন্তরকে সত্য গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত করে দিন।” একজন আদর্শ দা’য়ীর মত শান্তভাবে মুসআব বললেন,

”তিনি যদি এসে বামাদের কাছে বসেন তাহলে আমি তাঁর সাথে কথা বলব।”

রাগে উত্তেজিত উসাইদ ধারালো বর্শা হাতে দলটির কাছে এসে চীৎকার করে মুসআব এবং তাঁর আশ্রয়দাতা সা’দকে হুমকি দিয়ে বললেন, ”তোমরা দুজন কেন এখানে এসেছো এবং আমাদের দুর্বল লোকদের বিভ্রান্ত করে ফেলছো? যদি তোমরা বেঁচে থাকতে চাও তাহলে এখনি এখান থেকে চলে যাও।” মুসআব উঠে স্মিত হেসে শান্তভাবে উসাইদকে বললেন, ”আপনি দয়া করে একটু বসে আমাদের কথা শুনুন। যদি আমাদের মিশন আপনার কাছে ভালোলাগে এবং গ্রহনযোগ্য মনে হয় তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন, আর যদি তা আপনার কাছে অপছন্দনীয় হয় তাহলে আমরা আপনাকে আর বলব না, বরং আপনার এলাকা ছেড়ে চলে যাব।”

”তা করা যেতে পারে।” উসাইদ বললেন এবং বর্শাটা মাটিতে গেঁথে বসে পড়লেন।

মুসআব শান্তভাবে উসাইদকে ইসলামের কথা এবং কুরআন শোনাতে লাগলেন। উসাইদ ভীষণ অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর চেহারা সত্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিল। অন্তরে তোলপাড় করে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল মুসআবের মুখে শোনা কুরআনের বাণীগুলো। তিনি বললেন, ”কী অসাধারণ আপনার কথাগুলো আর কী সত্য। কেউ যদি এ দীন গ্রহণ করতে চায় তাহলে তাকে কি করতে হয়?” মুসআব বললেন-

”আপনি গোসল করে পরিস্কার কাপড় পরে আসুন। এরপর সত্যের সাক্ষ্য দিন এবং সালাত আদায় করুন।”

উসাইদ উঠে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরে এলেন। তিনি সত্যের সাক্ষ্য দিলেন এবং ঘোষনা করলেন যে- আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসুল। এরপর তিনি দু রাকাত সালাত আদায় করলেন। তারপর বললেন,

”আমার পর এখানে এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি এ গোত্রের বড় নেতা এবং তিনি যদি আপনার কথা মেনে ইসলামে প্রবেশ করেন তাহলে এ গোত্রের সকলেই ইসলামে প্রবেশ করবে। তিনি সাদ ইবন্ মুয়াজ। আমিএখন তাঁকেই আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

উসাইদ এরপর সাদ ইবন্ মুয়াজকে কৌশলে মুসআবের কাছে পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনিও মুসআবের কথা শুনে আল্লাহর ইচ্ছায় ইসলামে প্রবেশ করলেন। মদীনা তখন ছিল দুটি বিখ্যাত গোত্র এবং এ দুটি গোত্রের নেতৃত্বে ছিল দুজন সাদ। আউস গোত্রের নেতৃত্বে ছিল এই সা’দ ইবন্ মুয়াজ এবং খাজরাজ গোত্রের নেতৃত্বে ছিল সা’দ ইবন্ উবাদা। মুসআবের দাওয়াতে সা’দ ইবন্ মুয়াজ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, এরপর একদিন অন্য সা’দ অর্থাৎ সা’দ ইবন্ উবাদাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। মদীনার লোকরা তখন অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল চির বৈরী আউস আর খাজরাজ গোত্রের দুই প্রধান নেতা মক্কা থেকে আসু এক সাধারণ কিন্তু সুদর্শন যুবকের হাত ধরে সকল বৈরীতার অবসান ঘটিয়ে ফেলেছে, যেটা সুদীর্ঘ শতাব্দী ধরেই অসম্ভব বলেই সবাই মনে করত। লোকজন বলল-

”যদি সা’দ ইবন্ মুয়াজ, সা’দ ইবন্ উবাদা আর উসাইদ ইবন্ হুদাইর এর মত লোক নতুন এ দ্বীনটি গ্রহণ করে থাকে, তবে আমরা কেন নয়? এসো সবাই সত্যবাদী মুসআবের কাছে যাই আর ইসলামে প্রবেশ করি।”

আর এভাবেই মুসআব, রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এবং ইসলামের প্রথম দূত আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াতে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করলেন। সত্যিই আল্লাহ্র রাসুলের দূত নির্বাচন ছিল অনন্য সাধারণ, যার হাতে পুরুষ ও নারী, যুবা ও বৃদ্ধ, ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন নির্বিশেষে সবাই ইসলাম গ্রহন করেছিল। এভাবেই এ যুবকটি আজকের মদীনা এবং তৎকালীন ইয়াসরিবের সুদীর্ঘ ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আল্লাহ্ কর্তৃক ঘোষিত মর্যাদাপূর্ণ আনসার হবার জন্য ইয়াসরিব বাসী তৈরী হয়েছিল এবং বিশ্ব ইতিহাসে মুসলিমদের হিজরত এবং প্রথম সেন্টার হবার মর্যাদা লাভের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল ইয়াসরিব।

ইয়াসরিবে মুসআবের আগমনের এক বছরের কিছু কম সময়ের মধ্যেই হজ্ব মৌসুমে মুসআব আবার মক্কা ফিরে এলেন। এবার তাঁর সাথে এল মদীনার পঁচাত্তর জন মুসলিমের এক বিশাল দল। মুসআবের কথায় এরা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে না দেখেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাই দলটির সবাই প্রিয় রাসুলকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। মক্কার কাছে সেই বিখ্যাত আকাবা উপত্যকাতেই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে তাদের দেখা হল। তাঁকে দেখে সবাই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছিলএবং তাঁদের প্রতিপালকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল। দলটির সবাই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করল এবং প্রতিজ্ঞা করল যে ইসলাম এবং রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর নিরাপত্তার জন্য সব কিছুই তারা করবে। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বললেন যে, যদি তারা তাদের বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে তাহলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে জান্নাত। ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনাটি আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত নামে পরিচিত, যার অসম্ভব মর্য়াদার কথা বর্ণিত হয়েছে।

এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মক্কার মুসলিমদের ইয়াসরিবে হিজরতের নির্দেশ দিলেন। যে প্রতিশ্র“তি আকাবায় মদীনার মুসলিমরা দিয়েছিল, তা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল এবং আনসার বা সাহায্যকারী হিসাবে হিজরতকারী মুহাজিরদের ভাতৃত্ব ও ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। হিজরতকারী মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম ছিল মুসআব এবং আবদুল্লাহ্ ইবন্ উম্ম মাখতুম নামের প্রসিদ্ধ অন্ধ সাহাবী, যিনি ছিলেন আকর্ষনীয় কন্ঠ্যস্বরের অধীকারী। তিনি এবং মুসআব ইয়াসরিবের মানুষকে কুরআন থেকে পড়ে শুনাতেন এবং শিক্ষা দিতেন।

আরও দেখুন:  সাহল ইবন সা’দ (রা)

হিজরত পরবর্তি মদীনার সমাজ গঠনেও মুসআব ছিলেন অত্যন্ত কর্মতৎপর। হিজরতের কিছুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হয় ইসলাম এবং কুফর এর মধ্যে প্রথম যুদ্ধ, যা বদরের যুদ্ধ বলে খ্যাত। বদরের যুদ্ধে মুসআব অসামান্য বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিলেন। তবে বদরের যুদ্ধ পরবর্তি মুসআবের একটি ঘটনা ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

যুদ্ধ শেষ হবার পর মুসলিমদের হাতে কুরাইশ বাহিনীর অনেকেই যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক হয়। সব বন্দীকে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি তাদেরকে আলাদা আলাদাভাবে মুসলিম হেফাজতে দিয়ে দেন এবং বলে দেন-”তাদের সাথে ভাল আচরণ করো।”

বন্দীদের মধ্যে একজন বন্দীর নাম ছিল আবু আজিজ ইবন্ উমাইর। এ আবু আজিজ ছিল মুসআব ইবন্ উমাইর এর ভাই। যুদ্ধবন্দী থাকাকালীন সময়কার কথা আবু আজিজ পরে বর্ণনা করেন-”বন্দী থাকা অবস্থায় আমি একদল আনসারের দায়িত্বে ছিলাম। তারা যখনই খেতে বসছিল তখনই আমাকেও রুটি এবং খেজুর খেতে দিচ্ছিল, এ ছিল রাসুলের নির্দেশ পালন, যে নির্দেশে তিনি তাদেরকে আমাদের সাথে ভাল আচরণ করতে বলেছিলেন।

আমার ভাই মুসআব একসময় আমার পাশ দিয়ে গেলেন এবং আনসারদের যে ব্যক্তিটি আমার বন্দীত্বের দায়িত্বে ছিল তাকে বললেন, একে শক্ত করে বাঁধ, এর মা হলেন একজন অত্যন্ত সম্পদশালী মহিলা, এবং তিনি এর বিনিময়ে প্রচুর মুক্তিপণ দিতে সক্ষম।”

আবু আজিজ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে মুসআবের দিকে ফিরে তিনি বললেন ”আপনি আমার ভাই, আমার ব্যাপারে কি এই আপনার নির্দেশনা?”

”তিনি হলেন আমার ভাই, তুমি নও”, সাথের আনসার সাহাবীকে দেখিয়ে বললেন মুসআব।

এভাবেই মুসআব ঈমান এবং কুফর এর পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তুলেছিলেন এবং কুরআনের ঘোষনা অনুযায়ী মুৃমিনকে ভাই হিসাবে নিয়ে নিজের মুশরিক ভাইকে বর্জন করার অনন্য উদাহরণ রেখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন ঈমানের বাঁধন পৃথিবীর আর সব বাঁধনের চেয়ে দৃঢ়।

উহুদ যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মুসআবকে ডেকে পাঠালেন। ইতিমধ্যে সাহাবীগন তাঁকে মুসআব আল খাইর (সৎলোক মুসআব) উপাধীতে ভূষিত করেছেন। উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পতাকা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তুলে দিলেন মুসআবের হাতে। এ ছিল সমগ্র সাহাবী সমাজে অত্যন্ত বিরল সম্মান এবং গর্বের বিষয়। সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব ও কাজের জন্য নির্বচিত করার যে বিস্ময়কর ক্ষমতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর রাসুল (তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক) দিয়েছিলেন, তার আরেকটি প্রয়োগ তিনি করলেন মুসআবের হাতে মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে দিয়ে।

যুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের অবস্থা দর্শনে মনে হল মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করতে চলেছে। তখনই একদল মুসলিম রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে গনিমতের মাল লাভ করার জন্য স্থান ত্যাগ করল। মুশরিক বাহিনীর একটি দল এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমন করে বসল, ফলশ্র“তিতে ভীষন আক্রমনের মুখে মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলো। মুশরিক বাহিনীর সদস্যরা একটি লক্ষ্যের উপরই দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল আর তা হল রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে খুঁজে বের করা এবং হত্যা করা।

দূরদর্শী মুসআব তাদের এ ভয়ংকর দূরভিসন্ধির ব্যপারটি ধরে ফেললেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সমূহ বিপদে তিনি কি করবেন তা তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলেন। মুহূর্তেই তিনি তাঁর হাতে ধরা মুসলিম বাহিনীর পতাকাটি উঁচুতে তুলে ধরলেন এবং উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে লাগলেন। তাঁর চীৎকারে মুসলিম ট্রুপের পতাকাবাহীর দিকে মুশরিকদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হল এবং তারা প্রথমে এ পতাকাকে ভূলন্ঠিত করে পরবর্তি লক্ষ্যে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিল। একজন মুশরিক সেনা তার কাছে পৌঁছে তাঁর একটি হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়ল যে মুহাম্মাদ (সাঃ) নিহত হয়েছেন। একথা শুনে মুসআব বলে উঠলেন, ”মুহাম্মাদ কেবলমাত্র আল্লাহ্র একজন রাসুল, তাঁর পূর্বেও রাসুলদের মৃত্যু হয়েছে।” তিনি জানতেন মুহাম্মাদের মৃত্যু হতে পারে কিন্তু আল্লাহ্ হলেন চিরঞ্জিব এবং আল্লাহর দীন কখনও ধ্বংস হবার নয়। তিনি যখন চীৎকার করে একথা বলছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর মৃত্যু হয়েছে শুনে যে সকল মুসলিম একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন, তারা সবাই যেন জেগে উঠলেন। ইতিমধ্যে মুশরিক সে সেনাটি তাঁর বাঁ হাতটি বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তিনি এবার বাহু দুটির অবশিষ্টাংশ দিয়ে ইসলামের পতাকা আঁকড়ে ধরে রাখলেন এবং চীৎকার করে বলতে লাগলেন- ”মুহাম্মাদ কেবলমাত্র আল্লাহ্র একজন রাসুল, তাঁর পূর্বেও রাসুলদের মৃত্যু হয়েছে।” এবার একটি তীক্ষ্ম বর্শা এসে তাঁর দেহে বিদ্ধ হল এবং তাঁর দেহটাকে এফোঁর ওফোঁর করে ফেলল। এবার মুসলিম বাহিনীর পতাকা মাটিতে পড়ে গেল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তিনি যে কথাটি বলে গেছেন, পরবর্তিতে সে কথা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে আল্লাহ্ কুরআনের একটি আয়াত হিসাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এ কথাটি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সংরক্ষিত থাকবে।

যুদ্ধ শেষ হল। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধময়দান ঘুরে ঘুরে শহীদ মুসলিমদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন এবং তাদের জানাজার আয়োজন করছিলেন। এক সময় ঘুরতে ঘুরতে তিনি প্রিয় মুসআবের কাছে এলেন। তাঁর চোখ বেয়ে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ছিল। মুসআবের দেহকে ঢেকে দেবার জন্য একখন্ড কাপড় চাওয়া হলেও একমাত্র তার পোশাকটি ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। যে জামাটি তাঁর ছিল সেটি দিয়ে তাঁর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে পড়ছিল এবং মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে পড়ছিল। অবশেষে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন-”জামাটি দিয়ে ওর মাথা ঢেকে দাও এবং পা ইখজির (এক প্রকার ঘাস) দিয়ে ঢেকে দাও।”

উহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর প্রিয় অনেক মানুষকে হারিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন তাঁর চাচা হামযা, যার দেহকে কাফিররা পৈশাচিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছিল। কিন্তু মুসআবের দেহের সামনে এসে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) ভীষন আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন তখনকার কথা যখন তিনি মুসআবকে প্রথম দেখেছিলেন মক্কায়। তখন সে ছিল মক্কার সবচেয়ে স্টাইলিশ যুবক, তার গায়ে ছিল সময়ের সেরা এবং দামী পোষাক, অথচ আজ তার মৃতদেহটিকে ঢেকে দেবার জন্য একটি পূর্ণ কাপড় পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কুরআনের সে অনন্যসাধারণ সে আয়াতগুলো পড়লেন মুসআবের জন্য-

”বিশ্বাসীদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।”

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এরপর এরপর অশ্রুশিকত চোখে যুদ্ধক্ষেত্রের চারদিকে মুসআব এবং তার অন্য শহীদ সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন, ”আল্লাহ্র রাসুল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তোমরা হলে শহীদ এবং কিয়ামাতের দিন এ মর্যদা নিয়েই তোমরা উত্থিত হবে।”

সত্যিই, রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এ স্বীকৃতি একজন মুমিনের জন্য পৃথিবীর সেরা প্রাপ্তি, যা মুসআব অর্জন করে আল্লাহর কাছে পৌঁছেছিলেন।

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এরপর তাঁর সঙ্গী অন্য সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন-”লোকেরা, তোমরা তাদের এখানে এসো, তাদের উপর সালাম পৌঁছে দিও, যাঁর হাতে আমার প্রাণ সে মহান সত্ত্বার শপথ, কিয়ামাতের আগ পর্যন্ত যে সকল মুসলিম তাদের কাছে সালাম পৌঁছাবে, তারা তাদের সে সালামের জবাব দেবে।”

আল্লাহ্র রাসুলের সে কথার পর পৃথিবীর অগণিত নাম না জানা বিশ্বাসী মুসলিম তাঁদের সেখানে গিয়েছে, তাঁদের উপর সালাম পৌঁছে দিয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরা এর জবাব দিয়েছেন। আসুন আজ আমরা, যে যেখানে বসে আছি, তাদের কাছে সালাম পৌঁছে দিই-

আস্সালামু আলাইকুম ইয়া মুসআব…………….

আস্সালামু আলাইকুম মা’শার আশ্-শুহাদা…….

আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্ ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক মুসআব……..

সকল শহীদদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক……..

আপনাদের উপর বর্ষিত হোক আল্লাহ্র শান্তি, করুণা ও রহমত।

আপনি নিশ্চিত থাকুন, যদি আপনি মুমিন হয়ে থাকেন, তাঁরা আপনার এ কথার জবাবে আপনার উপরও সালাম পাঠিয়েছেন।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button