পরিবার ও দাম্পত্য

প্রশংসা

সুযোগ হলেই যে কাজগুলো আমি করতে পছন্দ করি তার একটি হোল স্বামীর কাছে স্ত্রীর এবং স্ত্রীর কাছে স্বামীর প্রশংসা, বিশেষ করে যখন তারা পরস্পরের প্রতি রাগান্বিত থাকে। প্রাত্যহিক জীবনের একঘেঁয়েমি এবং টানাপোড়েনের ঘর্ষনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক প্রায় সময়ই ক্ষয় হতে হতে এমন স্তরে পৌঁছে যায় যে তারা পরস্পরের ব্যপারে অনেকখানি নির্লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন দেখা যায়, এক সময় পরস্পরের যে উত্তম গুণাবলী তাদের মোহিত করত সেগুলো তখন তারা আর দেখেও দেখেনা। অথচ একই গুণাবলী অপর কোন ব্যক্তির মাঝে খুঁজে পেলে তারা আন্দোলিত হয়। অর্থাৎ, ঐ গুণাবলীর প্রতি আকর্ষনের সমাপ্তি নয়, বরং পরস্পরের ব্যপারে অভ্যস্ততাই স্বামী/স্ত্রীর মাঝে এগুলোর উপস্থিতি লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হবার কারণ। আবার অনেক সময় দেখা যায় একে অপরের যে ত্রুটিবিচ্যুতি একসময় তারা খেয়ালই করতনা তাতে চরমভাবে বিরক্ত বোধ করছে। সেক্ষেত্রে বিরক্তির সূত্রপাত হয়ত অন্য জায়গায় – অফিসে সহকর্মীর ওপর, ঘরে কাজের লোকের ওপর, অভাবের প্রতি, নিজের ব্যর্থতার প্রতি, শারীরিক অসুস্থতার প্রতি – কিন্তু সেটা প্রতিফলিত হয় এই বিষয়ে একেবারেই অনবহিত স্বামী বা স্ত্রীর ওপর, যে বেচারা বুঝে পায়না সে কি অন্যায় করে বসল!
এসব ক্ষেত্রে কেউ যদি তাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় তাদের সঙ্গীটি কতখানি উত্তম তবে তা পুরনো পাঁচিলে নতুন করে সিমেন্ট দেয়ার মত করে কাজ করতে পারে। এটি তাদের মনে করিয়ে দিতে পারে সঙ্গী/সঙ্গীনীর কোন গুনগুলো একসময় তাদের মুগ্ধ করত যা তাদের একত্রে পথ চলাকে সাবলীল করেছিল। হয়ত তাদের স্মরণ হতে পারে সেই সময়ের কথা যখন তাদের সঙ্গীটি তাদের কোন সীমাবদ্ধতাকে সহজভাবে মেনে নিয়েছিল। অথবা সঙ্গীটির দীর্ঘকালীন কোন ত্যাগ স্বীকার যা অভ্যস্ততার কারণে তাদের দৃষ্টির অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছিল। একটি গুনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন হয়ত তাদের একটি ত্রুটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে। সর্বোপরি তাদের পুণর্বার অনুধাবন হতে পারে তারা প্রকৃতপক্ষে একে অপরকে পেয়ে কতখানি ভাগ্যবান। যে সংসার তাদের কাছে মনে হচ্ছিল এক কন্টকাকীর্ণ অরণ্য সেটা যে আসলে এক পুষ্পোদ্যান, এই উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারা এক অপার আনন্দের উৎস হতে পারে সুদীর্ঘ সময়ের জন্য যা থেকে থেকে পুলকিত করে অন্তরকে। সুতরাং, এই কাজের পেছনে আমার উদ্দেশ্য একেবারে নিঃস্বার্থ নয়।
তবে দুটো পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি কার্যকর করা মুশকিল। এর একটি আপনার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করে, আরেকটি ব্যর্থ।
মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। মানুষকে দেয়া হয়েছে আবেগ এবং বিবেক। আবেগ মানুষকে বিশ্বাস করতে এবং ভালবাসতে শেখায়; বিবেক মানুষকে সাবধান হতে। কিন্তু আবেগের আধিক্য এবং বিবেকের স্বল্পতা অনেক সময় মানুষের মাঝে এমন এক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে যেখানে এই দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর পরিবর্তিত হয়ে বিপরীত ভূমিকা গ্রহণ করে। যার যা কাজ তা সে ভালই করে যেতে পারে। কিন্তু একে অপরের কাজ করতে গেলেই লেগে যায় বাগড়া। তাই আবেগ যখন বিবেকের কাজ করতে যায়, তখন গণ্ডগোল লাগবে এটাই তো স্বাভাবিক! কার্যত হয়ও তাই। উল্টোপাল্টা লাগছে? ব্যপারটা উল্টোই বটে! চলুন, একটা উদাহরণ দেয়া যাক। তাহলে হয়ত বুঝতে সুবিধা হবে। ধরুন, আপনি আপনার আবেগী বন্ধুকে বুঝাতে গেলেন এবারের ঝগড়ায় তার স্ত্রীর কোন দোষ নেই। কিন্তু আবেগের আধিক্যে তিনি বিবেকের গলা কেটে দিলেন। আবেগ বিবেকের স্থান দখল করে নিলো বটে কিন্তু বিবেকের কার্যপ্রণালী ভালভাবে বুঝতে না পেরে বিশ্বাসের পরিবর্তে অহেতুক সন্দেহ উৎপাদন করতে শুরু করে দিল। বন্ধু আপনার সুপরামর্শ গ্রহণ করার পরিবর্তে সন্দেহ করতে শুরু করলেন, আপনি আসলে কার পক্ষে। এই আবেগ আপনার পক্ষে ছিল যতদিন আপনি তার সমস্ত দোষত্রুটি, অন্যায়, আবদার মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি যখন তার সংসার বাঁচানোর তাগিদে তাকে সংশোধিত হতে বললেন সাথে সাথে সেই আবেগ চলে গেল আপনার বিপক্ষে। আপনার এত বছরের বন্ধুত্ব, সাহচর্য, বিশ্বাস, ভালবাসা সব শূন্যে পর্যবসিত হোল। আবেগ বিবেকের স্থান দখল করে নিয়ে তাকে বিশ্বাসীর পরিবর্তে সাবধানী না বানিয়ে বরং বানিয়ে দিল সন্দেহবাদী!
এই ধরণের মানুষগুলো ভাবে বেশি, বুঝে কম। এদের নিয়ে মুশকিল হোল, এরা নিজেরাই নিজেদের সুখের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একই বিষয় নিয়ে পুণঃ পুণঃ পুঙ্খানুপুঙ্খ চিন্তা গবেষণা বিশ্লেষণ করতে করতে তারা বুঝে উঠতে পারেনা, আপনি এপক্ষ বা ওপক্ষ হতে যাবেন কেন? স্বামী স্ত্রী মিলে একই তো পক্ষ! তার সুখের জন্য, তার সংসার রক্ষা করার তাগিদেই তো নিজের সময় ব্যয় করে তাকে পরামর্শ দেয়া! নিজের কিছু অহম বিসর্জন দিয়ে যদি উভয়ের সুখ নিশ্চিত করা যায়, সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা যায় তবে উভয়ের মাঝে বাঁধার প্রাচীর গড়ে তোলার প্রয়োজনটা কি? কিন্তু সন্দেহ বড় জটিল রোগ। এই রোগ কোন ওষুধে সারেনা। এই রোগের চিকিৎসার জন্য বিশ্বাসের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু আবেগ যখন বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তাণ্ডব চালায় তখন আর সেই বিশ্বাস নিজের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই আবেগের কাছে পরাজিত মানুষগুলোর অধিকাংশই নারী। অনেকের কাছেই এটা স্বাভাবিক ব্যপার। অনেকের কাছেই এটা হাসির খোরাক। কিন্তু বিশদভাবে চিন্তা করলে এটা একটা ভয়াবহ দুর্বলতা এবং যেকোন দুর্বলতাই অতিক্রম করার চেষ্টা করা উচিত। কারণ এর প্রভাবে যে শুধু মানুষের পার্থিব জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাই নয় বরং আখিরাত বিনষ্ট হয়। কিভাবে? মানুষ যদি স্বয়ংসম্পূর্ন হত তাহলে সমাজবদ্ধ জীবনের প্রয়োজন হতনা। সেক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, আদানপ্রদান আমাদের পার্থিব পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতনা। অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। এর ফলে মানুষ বন্ধু এবং শত্রু চিনতে ভুল করে, নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ক্ষতিটা হয় নিজেরই। কারণ সকলকে অবিশ্বাস করতে করতে সে সকলের সাথে দূরত্ব রচনা করে একসময় একা হয়ে যায়। ক্ষতিটা আখিরাতে আরও মারাত্মক। কারণ নারী পুরুষের পুরস্কার নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেমন বিভেদ করা হবেনা, তাদের শাস্তি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেও তারতম্য করা হবেনা। প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের কথা, কাজ ও সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। আমাদের কথা, কাজ ও সিদ্ধান্ত যাতে ন্যায় ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে সেটা নিশ্চিত করার জন্যই মানুষকে বিবেক দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিবেকের স্থান আবেগ দখল করে নিলে মস্তিষ্কের সঠিক কার্যপরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটে। ফলে কথা, কাজ ও সিদ্ধান্তে ভুল হয়ে যায়। সুতরাং, এটাই স্বাভাবিক নারীপ্রকৃতি বলে নিজেদের জাহান্নামের খোরাক না বানিয়ে এর থেকে উত্তরণ করার চেষ্টার মাঝেই প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে।
নানাবিধ ঘটনা, দুর্ঘটনা, অভিজ্ঞতা কিংবা জ্ঞানের রাজ্যে আলোড়ন সঞ্চারের ফলে একজন মানুষ এতখানি পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে যার ফলে তাঁর সাথীর মনে হতে পারে এই মানুষটিকে তিনি আর চেনেন না। দীর্ঘ সহযাত্রার মাঝপথে কোথাও তাঁর পরিচিত মানুষটি অন্য কারো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি কি প্রশংসা দিয়ে তাঁর সঙ্গীটির মনের শঙ্কা দূর করবেন? বরং কিছু বলতে গেলে আপনার নিজের কাছেই নিজেকে ভণ্ড মনে হবে। এই পরিবর্তন যে সবসময় নেগেটিভ হয় তা নয়, পজিটিভ পরিবর্তনও অনেক সময় নেগেটিভ রূপ ধারণ করতে পারে। আমার পরিচিতা একজন বলেছিলেন তাদের বাবা অত্যন্ত ধার্মিক (তাঁর ভাষায়) ছিলেন। কিন্তু তিনি ধর্ম নিয়ে এতখানি মগ্ন হয়ে যান যে ধীরে ধীরে তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়েন। তিনি যাদের নিজের পর্যায়ে ধার্মিক গণ্য করতেন না তাদের প্রতি তাঁর আচরণ এতখানি রূঢ় ছিল যে এমনকি তাঁর সন্তানদের মন কেবল তাঁর প্রতিই নয়, ইসলামের প্রতিও বিরূপ হয়ে যায়। এসকল ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে সম্পর্কোন্নয় প্রচেষ্টায় ব্যর্থতা স্বীকার করে নেয়া ব্যতীত খুব একটা কোন উপায় থাকেনা।
আল্লাহ জানিয়েছেন তাঁর সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজগুলোর একটি হোল স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিভেদ তৈরী করা। এটা শাইত্বানের কাজ। কিন্তু এই কাজটি আমরা অনেকেই করে থাকি, হয়ত না বুঝেই। সরল মনেই হয়ত আমরা পরিচিতজনদের সম্পর্কে এমন অনেক মন্তব্য করি যাতে তাদের সঙ্গীদের হৃদয়ে চারাগাছ আকারে বিদ্যমান সন্দেহ সংশয়গুলো সার পানি পেয়ে বটবৃক্ষের আকার ধারণ করে। আমরা কেউ জানিনা অপরের মনে কি আছে। সুতরাং, আমাদের কথাবার্তা সর্বাবস্থায় নেগেটিভের পরিবর্তে পজিটিভ হওয়া সবদিক থেকে নিরাপদ। সুতরাং, অপরের উপকারার্থে না হোক, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হলেও আমার পদ্ধতিটি আমার কাছে শ্রেয় মনে হয়। আপনি কি বলেন?
– Rehnuma Bint Anis

আরও দেখুন:  পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া মেয়ের বিয়ে

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

  1. আসসালামুয়ালাইকুম। আলহামদুলিল্লাহ। আপনার লিখাটা আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। আমার মতে আমাদের অনেকেই অনেক পারিবারিক সমস্যায় ভুগছি, কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। কেউ আর কারো জন্য সময় দেয় না। আল্লাহ আপনাকে অনেক কল্যান দান করুক।আমীন।

মন্তব্য করুন

Back to top button