নির্বাচিত ফেসবুক স্ট্যাটাস

নিউ ইয়ার্স ডে : খ্রিস্টানদের একটা ধর্মীয় উৎসবের দিন

[এক]
সে রাতে একের পর এক বিকট শব্দে কান চেপে যখন ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম, মোবাইলটা তখন বালিশের পাশে চুপচাপ পড়ে ছিল। ভাবছিলাম ক’বছর আগের এই সময়টাতে মোবাইল আর ফেবু ইনবক্স হ্যাপি নিউ ইয়ার উইশ দিয়ে ফ্লাডেড হয়ে যেত। ছেলেবেলায় নিজের হাতে কার্ড বানিয়ে, জমানো টাকা দিয়ে উপহার কিনে কাছের মানুষদের দিতাম। স্টুডেন্ট লাইফে ক্লাসের ছেলেপেলেরা ধার করা ভাবুক ম্যাসেজ কপি করে ফরওয়ার্ড করতো একটার পর একটা। ফেবু পূর্ববর্তী ই-মেইলের যুগে ই-কার্ড চালাচালি চলতো পরিবারের সদস্যদের মাঝে। রাত ১২ টায় বাসায় থাকিনি কখনো, চার্চে অথবা কাজিনের বাসায় পার্টিতে।

মুসলিম হয়ে যাওয়ার পর দুই একজন অমুসলিম আত্মীয় অথবা নামধারী অবুঝ কোন মুসলিম শুভাকাঙ্ক্ষী যে উইশ করতো না তা না। যেদিন ফেবু স্ট্যাটাস দিয়ে আমার ওয়াল পল্যুট না করতে অনুরোধ করলাম, অনেকেই ভদ্রভাবে উইশ করা বন্ধ করে দিল। বাকিদের এমনভাবে নাসীহা দিলাম যে নেক্সটে আর কাউকে করলেও এই অধমকে উইশ করার সাহস হবে না বলেই মনে হলো।

তো ঐ রাতে এসব ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা হঠাৎ সশব্দে নড়েচড়ে উঠলো! হাতে নিয়ে দেখি দুঃসাহসী কেউ একজন “হ্যাপি নিউ ইয়ার” জানিয়েছেন! পরদিন সকালে আরো একটা ম্যাসেজ পেলাম। দেখলাম, তাদের দুইজনের সাথেই আমার তেমন পরিচয় নেই। কাজেই রাগ হলাম না, বেচারিরা জানে না হয়তো। বিনীতভাবে জানিয়ে দিলাম যে আমি এখন আর অমুসলিম নই, তাই অমুসলিমদের কোন দিবসে যেন আমাকে আর শুভেচ্ছা না জানানো হয় (যদিও তারা দুইজনই মুসলিম ছিল)।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো,
অধিকাংশ মুসলিম এটা জানেই না যে নিউ ইয়ার্স ডে বা খ্রিস্টীয় নববর্ষের প্রথম দিন খ্রিস্টানদের একটা ধর্মীয় উৎসবের দিন হিসেবে পালন করা হয়। থার্টিফার্স্ট নাইটে আমাদের চার্চে স্পেশাল মিসা (mass) হতো। ঈদের দিনের মতো আমরা নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াতাম, আতশবাজি ফাটাতাম। বাসায় বাসায় মজার মজার রান্না হতো; রাতভর আর দিনভর চলতো পানাহার, নাচ, গান আর পার্টি।

আরও দেখুন:  আপনি যদি আপনার রবের পক্ষে থাকেন তাহলে আপনার কোনো ভয় নেই

খ্রিস্টান সমাজে এখনো এসব হয়। তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আগের চেয়ে আনন্দ-ফূর্তির মাত্রাটা ব্যাপক হারে বদলে গেছে। বদলে গেছে থার্স্টি ফার্স্ট নাইটের সংজ্ঞা। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় এই উৎসবে ধর্মের অস্তিত্ব সামান্যই বাকি রয়ে গেছে আজ।

তবুও, এটা তো তাদেরই উৎসব।

খ্রিস্টপূর্ব রোমে জানুস (Janus) ছিল প্রবেশদ্বার ও শুরুর দেবতা। এই দেবতার নামেই জানুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয়। জানুয়ারির এক তারিখ দেবতা জানুসকে উৎসর্গ করে উৎসব পালন করা হতো। মূর্তিপূজক বা মুশরিকদের মাঝেই সর্বপ্রথম এই দিনে উপহারের আদান-প্রদান শুরু হয়। পরবর্তীতে বর্তমান খ্রিস্টানদের পালন করা অন্যান্য দিবসের মতো এই দিনটাও তাদের দ্বীনে স্থান করে নেয়।

শুধু তাই নয়, Anglican Church আর Lutheran Church এই দিনটিকে এখনো পালন করে Feast of the Circumcision of Christ হিসেবে। হিব্রু রীতি অনুযায়ী তাদের বিশ্বাস ইসা (আলাইহিসসালাম) এর জন্মের অষ্টম দিনে তার নামকরণ ও খৎনা করা হয়েছিল।

[দুই]
অন্যান্য দেশের কথা না হয় বাদ দিলাম। আগে একটা সময় ছিল যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে এই থার্টি ফার্স্ট নাইট বা নিউ ইয়ার্স ঈভ শুধুমাত্র কিছু সেলেব্রিটির আঙিনায় অথবা বড় বড় হোটেলগুলোতেই ঘটা করে পালিত হতো। এদেশের খৃস্টানরা তো ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বহু আগে থেকেই পালন করে আসছে। তথাকথিত মুসলিমদের মাঝে এই দিন পালনের তেমন প্রচলন ছিল না।

অথচ কী হাস্যকর! গত কয়েক বছরে খ্রিস্টানদের আর পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ করতে করতে এই দেশের নির্বোধ প্রজন্ম যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। থার্টি-ফার্স্ট নাইট আজ আর “হ্যাপি নিউ ইয়ার” উইশ করা বা রাতভর আতসবাজি ফোটানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দুনিয়ার যত আকাম-কুকাম-গুনাহের কাজ এই সময়কে কেন্দ্র করে ঘটে যেতে থাকে। আর আমাদের গুণধর বাঙালিদের তো একটা উপলক্ষ হলেই হলো। হারামে ডুবে থাকা নামধারী মুসলিমরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার থোরাই কেয়ার করে। নিজের দ্বীন বাদ দিয়ে অন্যের দ্বীন অনুকরণেই সচেষ্ট থাকে তারা। যেন ময়ুর হয়েও কাক হওয়ার শখ।

আরে বাবা তোমরা থার্টিফার্স্ট করো আর গুইসাপের গর্তে ঢোক – আমার তাতে কিছুই যায় আসে না।

আরও দেখুন:  বাঙালি ইসলামিস্টদের পাঠ-সংকীর্ণতা

আমার তখনই যায় আসে যখন তোমাদের দ্বারা সৃষ্ট অর্থহীন শব্দদুষনে পাশের বাড়ির বিছানায় কাতরাতে থাকা বৃদ্ধার কষ্ট হয় খুব। যখন আমার ছোট্ট ছেলেটা আতংকে কানে হাত দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে চুপচাপ পড়ে থাকে। যখন আমার সন্তানদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারি না – কেন মুসলিম হয়েও এরা এসব করছে?

তোমরা জানো না কত মানুষের অভিশাপ কুড়িয়ে নাও এই রাতে। তোমাদের ধারণা নেই কী পরিমাণ আযাব অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্য। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও হতভাগার দল, তোমরা জানো না অমুসলিমদের অনুকরণের পরিণতি কী।

জানো না কত দুঃখ হয় তোমাদের জন্য, করুণা হয় আমার। কখনো কান্নায় চোখ ভিজে আসে। মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম) উম্মাতের আজ এ কী হাল! লজ্জা হয় আমার।

কবে ফিরবে তোমরা? কবে চিনবে নিজের দ্বীনকে? ক’দিনই বা বাকি আছে জীবনের, কবে সময় হবে আর?

হে আল্লাহ, হিদায়াত দিন!

 

গুইসাপের গর্ত থেকে উঠে এসো
– সিহিন্তা শরীফা

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button