নারী অঙ্গন

নারীর অধিকার ও মর্যাদায় ইসলাম – ২

পূর্বের অংশ পড়ুন: নারীর অধিকার ও মর্যাদায় ইসলাম – ১

(চ) কন্যা হিসাবে অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবের মহিলাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। সেখানে নারীদের বেঁচে থাকারই কোন অধিকার ছিল না। এমনকি কন্যাসন্তান জন্মকে তারা দুর্ভাগ্য মনে করে জীবন্ত কবর দিত। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَّهُوَ كَظِيْمٌ- يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلاَ سَاءَ مَا يَحْكُمُوْنَ-  ‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তান জন্মের সংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে মর্মাহত হয়ে পড়ে। তাকে যে বিষয়ের সংবাদ দেওয়া হ’ল তার লজ্জায় লোক সমাজ হ’তে পালিয়ে বেড়ায়, অপমান সয়ে তাকে রাখবে, নাকি তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে? শুনে রাখ! তাদের এই ব্যবস্থা নিতান্ত জঘন্য’ (নাহল ৫৮-৫৯)

জাহেলী যুগের প্রথাকে নির্মূল করে কন্যাসন্তান জন্মকে কল্যাণময় ও বড় সৌভাগ্যের বিষয় হিসাবে অভিহিত করত, শুভ সংবাদ প্রদান করেছেন মহানবী (ছাঃ)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ، وَضَمَّ أَصَابِعَهُ.

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি প্রাপ্তবয়ষ্কা হওয়া পর্যন্ত দু’টি কন্যার লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করে, তাহ’লে আমি ও সেই ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন এভাবে একত্রে থাকব’। এই বলে তিনি নিজের আঙ্গুলগুলি মিলিয়ে ধরলেন।[1]

(ছ) মাতা হিসাবে অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীদের কোন সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা ছিল না। সে যুগে পিতার ইন্তিকালের পর বিমাতাকে বিবাহ করার মতো ঘৃণ্য প্রথাও প্রচলিত ছিল। ইসলাম এসে নারীকে মাতৃত্বের  গৌরব ও মর্যাদা দিয়েছে এবং সন্তানের উপর মায়ের অধিকার ও সার্বিক কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করেছে। শুধু তাই নয়, সন্তানের উপর মায়ের আদেশ মান্য করা, মায়ের সাথে বিনম্র ও সম্মানজনক আচরণ করাকে ফরয করা হয়েছে। কুরআনে মহান আল্লাহ তা‘আলা নিজ হকের সঙ্গে মা-বাবার হকের কথা উল্লেখ করে বলেছেন,

وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلاَ تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍّ وَّلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيْماً- وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِيْ صَغِيْراً-

‘আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত কর না এবং তুমি মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কর। যদি তোমার সামনে তাঁদের একজন কিংবা উভয় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে উহ্ পর্যন্তও বল না, আর তাদেরকে ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বল এবং তাঁদের সম্মুখে করুণভাবে বিনয়ের সাথে নত থাকবে, আর এইরূপ দো‘আ করতে থাকবে- ‘হে আমার প্রভু! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন- যেরূপ তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন শৈশবকালে’ (বনী ইসরাঈল ২৩-২৪)

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সর্বোত্তম ব্যবহার পাবার অধিকারী কে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমার মাতা। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? আবারো বললেন, তোমার মাতা, আবার জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? আবারো বললেন, তোমার মাতা। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? এবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমার পিতা’।[2]

আরও দেখুন:  বহুবিবাহ ও নারীর ক্যারিয়ার: সমাজের ব‍র্তমান চিত্র

অপর এক হাদীছে এসেছে, ‘মু‘আবিয়া ইবনে জাহিমাহ একদা মহানবী (ছাঃ)-এর নিকট যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যেহেতু তোমার মা আছে যাও তাঁর সেবায় নিয়োজিত হও। কারণ فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلِهَا ‘জান্নাত তাঁর পায়ের নিকটে রয়েছে’।[3]

(জ) সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলাম নারী নির্যাতনমূলক ও নারী মর্যাদার পরিপন্থী সকল প্রকার কুসংস্কার এবং কুপ্রথাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহার ও সদাচরণের আদেশ প্রদান করতঃ মহান আল্লাহ বলেন, وَعَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئاً وَيَجْعَلَ اللهُ فِيْهِ خَيْراً كَثِيْراً- ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচরণের মাধ্যমে ঘর-সংসার করো। অতঃপর যদি তোমরা তাদেরকে কোন কারণে অপসন্দ কর, তবে তোমরা তাদের যে বিষয়টি অপসন্দ কর, আশা করা যায় আল্লাহ তাতে মঙ্গল নিহিত রেখেছেন’ (নিসা ১৯)

(ঝ) সম্পদে উত্তরাধিকার করার মাধ্যমে মর্যাদা দান :

ইসলাম মীরাছ বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদে অংশ নির্ধারণ করে দিয়ে নারীদেরকে প্রবঞ্চনা হ’তে মুক্ত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يُوْصِيْكُمُ اللهُ فِيْ أَوْلاَدِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ- ‘আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তোমাদের সন্তানদের সম্বন্ধে, পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান হবে, আর যদি শুধু কন্যা দুই-এর অধিকও হয়, তবে তারা মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে, আর যদি একটি মাত্র কন্যা হয়, তবে সে অর্ধাংশ পাবে’ (নিসা ১১)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِنْ لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ فَإِنْ كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوْصِيْنَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِنْ لَّمْ يَكُنْ لَّكُمْ وَلَدٌ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ-

‘আর তোমরা অর্ধেক পাবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমাদের পত্নীগণ ত্যাগ করে যায়, যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি ঐ স্ত্রীগণের কোন সন্তান থাকে, তবে তাদের ত্যাজ্য সম্পত্তি হ’তে তোমরা এক-চতুর্থাংশ পাবে, অছিয়ত পৃথক করে নেওয়ার পর যা তারা অছিয়ত করে যায় অথবা ঋণ পরিশোধের পর; আর তোমাদের পত্নীগণ তোমাদের ত্যাজ্য সম্পত্তি হ’তে এক-চতুর্থাংশ পাবে, যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের কোন সন্তান থাকে, তবে তারা তোমাদের ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ পাবে’ (নিসা ১২)

(ঞ) শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় নারীর অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলাম নারীদেরকে পুরুষের ন্যায় ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অধিকার দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ‘প্রত্যেক মুসলমানের (নর-নারী) জন্য বিদ্যা অর্জন করা ফরয’।[4] অন্য বর্ণনায় এসেছে, قَالَتْ عَائِشَةُ نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ لَمْ يَمْنَعْهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّيْنِ আয়েশা (রাঃ) বলেন, আনছারী মহিলারা কতই উত্তম! দ্বীনী ইলম অর্জনে লজ্জা তাদেরকে আটকে রাখতে পারে না।[5]

আরও দেখুন:  নারী অধিকার : দাবী ও বাস্তবতা

(ট) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকার ও মর্যাদা দান :

ইসলাম নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও অধিকার দিয়েছে। জীবিকা অর্জনের অধিকারও দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لِلرِّجَالِ نَصِيْبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُواْ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيْبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ- ‘তোমাদের পুরুষেরা যা উপার্জন করবে তা তোমাদের থাকবে, আর নারী যা উপার্জন করবে তা তাদের জন্য থাকবে’ (নিসা ৩২)

(ঠ) ইসলামের বিধান পালনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলামের বিধান পালনেও নারীদেরকে পুরুষদের মত অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ প্রভৃতি ইবাদতে সে অংশগ্রহণ করবে পুরুষের ন্যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهُ أُوْلَـئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ إِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ-

‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে, ছালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে; তাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়’ (তওবা ৭১)

ইসলামের বিধান পালনের ব্যাপারে ছওয়াবের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে কোন পার্থক্য করা হয়নি। বরং পুরুষ হোক আর নারীই হোক উভয়েই তাদের নিজ নিজ আমলের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَّعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَـئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلاَ يُظْلَمُوْنَ نَقِيْراً- ‘পুরুষ অথবা নারীর কেউ সৎ কাজ করলে ও মুমিন হলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না’ (নিসা ১২৪)

(ড) কর্মক্ষেত্রে নারীকে অধিকার ও মর্যাদা দান :

নারী যদি আশ্রয়হীন কিংবা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তাহ’লে সে তার জীবন-জীবিকার তাকীদে এবং স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে যে কোন হালাল উপায়ে পর্দা রক্ষা করে আয়-রোযগার করার পূর্ণ অধিকার রাখে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلاَةُ فَانْتَشِرُوْا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوْا مِنْ فَضْلِ اللهِ  ‘অতঃপর ছালাত শেষ হ’লে তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর’ (জুম‘আ ১০)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, পুরুষেরা যা উপার্জন করবে তা তাদের অংশ, আর নারী যা উপার্জন করবে তা তাদের প্রাপ্য অংশ’ (নিসা ৩২)

(ঢ) বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা রমণীর অধিকার ও মর্যাদা :

ইসলাম বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা রমণীর অধিকার নিশ্চিত করেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর অথবা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে স্ত্রীদের পুনরায় বিবাহের অনুমতি প্রদান করতঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلاَ جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيْمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنتُمْ فِيْ أَنْفُسِكُمْ ‘আর নারীদের নিকট তোমরা ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব করলে অথবা তোমাদের অন্তরে গোপন রাখলে তোমাদের কোন পাপ নেই’ (বাক্বারাহ ২৩৫)

আরও দেখুন:  চাই প্রসূতি মায়ের নিবিড় যত্ন

সমাপনী :

নারী কখনো মাতা, কখনো কন্যা, কখনো বোন আবার কখনো স্ত্রী। আর সর্বস্তরেই মহান আল্লাহ নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। ঠিক মহানবী (ছাঃ)ও নারী জাতিকে মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে তুলে ধরে বলেন, الدُّنْيَا كُلَّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ ‘দুনিয়া একটি সম্পদ। আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হ’ল পুণ্যবতী স্ত্রী’।[6] একজন আদর্শ নারী হ’ল মূল্যবান মণিমুক্তার মতো। আর মণিমুক্তাকে জহুরীরা এমনভাবে সংরক্ষণ করে রাখে যাতে মেকি বা কৃত্রিম পাথরের মতো অতি সহজেই যার তার হাতে ঘোরাফেরা করতে না পারে। একথা সকলেরই জানা আছে যে, ঝিনুকের চেয়ে মুক্তাই বেশী মূল্যবান। আর পবিত্র কুরআনে এই আদর্শ মুসলিম নারীদের মুক্তার সাথেই তুলনা করে বলা হয়েছে, كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُوْنِ ‘সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ’ (ওয়াকি‘আহ ২৩)। তবে নারীদের এ মর্যাদা তাদেরকেই রক্ষা করতে হবে।

নারীদের মর্যাদা দানে ইসলামের এসব সুমহান আদর্শ দেখে খোদ বৃটিশ মহিলাদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের যথেষ্ট সাড়া পড়েছে। পত্র-পত্রিকার খবর অনুসারে মার্কিন নও মুসলিমদের মধ্যেও পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা চারগুণ বেশী। পত্রিকার মতে It is even more ironic that most British converts should be women, given the widespread view in the west that Islam treats women poorly. অর্থাৎ ‘এটা আরও দুঃখজনক বিষয় যে, অধিকাংশ বৃটিশ নওমুসলিমই মহিলা। অথচ এ মতবাদ গোটা পাশ্চাত্যে বিস্তৃত যে, ইসলাম মহিলাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে’।[7]

আসলে অমুসলিম মহিলাগণ দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে ছুটে এসেছেন ইসলামের সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে। ইসলামে নারীদের মর্যাদা ও অধিকারের নযীরবিহীন দৃষ্টান্ত দেখে। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে আমরা নারীরা নিজেদের কারণেই সেই সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুইয়ে নিঃস্ব পথিকের ন্যায় পথে বসতে চলেছি। আধুনিক সভ্যতার দোহাই পেড়ে বস্তাপঁচা পাশ্চাত্যের নোংরা সভ্যতায় আটকে পড়েছি। প্রগতির চোরাবালিতে নিজেদের সম্ভ্রম হারিয়ে নগ্ন দেহে জনাকীর্ণ রাস্তায় নামার দুঃসাহস দেখাতে চলেছি। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হিজাব তথা নারীদের রক্ষাকবচ পর্দার বিধানকে পদদলিত করে অনুসরণ করছি বিদেশ থেকে আমদানীকৃত নগ্ন সভ্যতাকে। ফলশ্রুতিতে নারী জাতি প্রতিনিয়ত বখাটে লোলুপ ইভটিজারদের শিকারে পরিণত হচ্ছে।

তাই মুসলিম নারীদের উদাত্ত আহবান জানাই, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মোতাবেক জীবন গড়ে নিজেদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনার। স্বীয় মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার। মহান আল্লাহর নিকট আকুতি জানাই, তিনি যেন আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে পূর্ববর্তী মহীয়সী রমণী মরিয়ম, হাযেরা, আয়েশা, খাদীজা, আছিয়া ও ফাতিমাদের শ্রেণীভুক্ত করেন। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!

– জেসমিন বিনতে জামীল


[1]. মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৩।
[2]. বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১১।
[3]. আহমাদ, নাসাঈ, বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/৪৯৩৯ সনদ জাইয়েদ।
[4]. ইবনে মাজাহ, হা/২২৪, সনদ ছহীহ।
[5]. বুখারী, ‘ইলম শিক্ষা করতে লজ্জাবোধ করা’ অধ্যায়। অধ্যায় নং ৫০।
[6]. মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮৩।
[7]. কেন মুসলমান হলাম, সংকলনে: মাওলানা আবুল বাশার জিহাদী, ২য় খন্ড (ঢাকাঃ ইশাআতে ইসলাম কুতুবখানা, ১৯৯৬ইং), পৃঃ ৪।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button