নারী অঙ্গন

কর্মজীবী মেয়েদের ৩টি যুক্তি

কর্মজীবী মেয়েদের মুখে আমি কিছু অদ্ভুত লজিক শুনেছি। এই কথাগুলো তারা মূলত নিজেদের ক্যারিয়ারিস্ট লাইফস্টাইলকে সাপোর্ট করতে বলে থাকে। এই পোস্টে তাদের এমন তিনটা উদ্ভট যুক্তি শুনব।

যেমন –

১। গৃহিণী মা যদি নিজের শখ বা বিশ্রামের জন্য দু-চার ঘণ্টা বাচ্চাকে নানী-দাদীর কাছে রাখে, তখন আমরা সবাই বুঝি সেটা একজন মায়ের শারীরিক বা মানসিক বিশ্রামের জন্য দরকার৷ কিন্তু কর্মজীবী নারী যদি বাচ্চাকে দু-চার ঘণ্টা নানী-দাদীর কাছে রেখে বাইরে কাজ করতে যায়, তাহলে যত সমস্যা। কেন?

উত্তরটা হলো – প্রথমত, একজন গৃহিণী মা তার সংসার এবং সন্তানদেরকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দেয়৷ আমি এক বোনকে চিনি, যে তার বহু বছরের ভালো একটা জব ছেড়ে দিয়েছে, কেননা সে বুঝতে পেরেছিল– এই কাজটা করার জন্য তার কোনো শরয়ী প্রয়োজন না, যেহেতু তার হাজবেন্ডই তাকে ফিনান্সিয়াল ভাবে ভালো রেখেছেন। এবং তিনি তার বাচ্চাদের দেখাশোনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন৷ ছোটো বয়সে ওরা যেন মায়ের যত্নআত্তি পায়, মায়ের সঙ্গ পায়, মায়ের থেকে শিখতে পারে – সেই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি মোটা বেতনের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছেন।

এরকম আরও হাজারো নারী আছেন, যারা নিজের সন্তানের জন্য ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দেন। কারণ, তারা বুঝতে পারেন যে সন্তানই হলো একজন মায়ের ফার্স্ট প্রায়োরিটি।

অথচ অনেক কর্মজীবী নারী আছেন, যাদের স্বামী তাদেরকে ফিনানশিয়ালি ভালোভাবে দেখাশোনা করেন, এমনকি তাদের টাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তবুও নিজের বাইরে কাজ করার শখ মেটাতে বা টাকা কামানোকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দেয় বলে তারা ছোটো শিশুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য কারো কাছে ফেলে চাকরি বা ব্যবসার পিছে ছোটে। যে সময়টা একজন শিশুর প্রাপ্য ছিল, সে সময়টা সে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পিছে ব্যয় করে।

দু জন কি এক হলো?

একজন গৃহিণী মা কখনোই “প্রতিদিন” তার বাচ্চাকে পাঁচ-সাত ঘণ্টার জন্য দাদী-নানীর কাছে দিয়ে এসে নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে পারে না। হয়তো মাঝে মাঝে যখন সে হাপিয়ে ওঠে, তখন দু দণ্ড নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য বাচ্চাকে নিজের মা/শাশুড়ী বা স্বামীর কাছে রেখে একটু বিশ্রাম নেয়। এই বিশ্রামের মাধ্যমে সে নিজেকে রিচার্জ করছে যেন আবারও কিছুক্ষণ পর ফুলটাইম মা হিসেবে নিজের দায়িত্ব শুরু করতে পারে।

আর কর্মজীবী মায়েরা কখনোই মাত্র “দু ঘণ্টা”-র জন্য বাইরে যায় না। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে কেউ দু ঘণ্টার জব দেয় না। মাস শেষে মোটা অংকের বেতন কেউ এমনি এমনি দেবে না। একটা বড় সময় আপনাকে অন্যের কোম্পানিতে সময় দিতে হবে, মেধা দিতে হবে, শ্রম দিতে হবে। সাথে যাতায়াত তো আছেই। শুধু যাতায়াতের পিছেই মানুষের দু-তিন ঘণ্টা চলে যায়৷ এরপর সারাদিনের বাইরে খাটাখাটুনির পর সে এসে বাসাতেও খানিকটা বিশ্রাম চায়। তখনও আবার সে তার বাচ্চাকে নানী-দাদী, বুয়া বা ন্যানির কাছে রাখে। মানে এভাবে দিনের সিংহভাগই কিন্তু বাচ্চার দায়িত্বটা সে অন্য কাউকে দিয়েই করিয়ে নেয়। কেন? টাকার প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র নিজের শখ পূরণের জন্য। নিজের ক্যারিয়ার আর টাকা কামানোকে সে এত প্রায়োরিটি দেয় যে ছোট একটা দুধের শিশুর মূল্য তার জীবনে অনেক পরে আসে। কারণ দুধের শিশুকে দেখলে টাকা পাওয়া যায় না৷ আর চাকরি করলে অনেক টাকা পাওয়া যায়..

আরও দেখুন:  মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (১ম কিস্তি)

এই দুজন মা কীভাবে সমান হতে পারে?

একটা সময় সন্তানেরাও বড় হবে। মা-বাবা বৃদ্ধ হবে৷ চিন্তা করুন সেই সন্তানের কথা যে তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে কখনোই সঙ্গ দিতে চায় না। এর ওর ঘাড়ে ফেলে রাখে, আর প্রতি মাসে শুধু কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠিয়ে দেয়। এভাবে কি তারা কি খুশি হবে? এটুকুই কি সন্তানের দায়িত্ব? একই ভাবে এবার ভাবুন, একটা দুধের শিশুকে শুধু দামি দামি জামাকাপড় পরানোই কি বাবা-মায়ের দায়িত্ব? নাকি তাদের জন্য আমাদের সময় আর সঙ্গটা বেশি প্রয়োজন?

২। কর্মজীবী নারীরা বাচ্চাকে নানী-দাদীর কাছে রেখে যায়, তো কী হয়েছে? নানী-দাদীর সাথে মিশতে দেয়া ভালো ব্যাপার। গৃহিণী মায়েরা সারাদিন নিজেরা বাচ্চা পালে, কারো সাথে মিশতে দেয় না। এটা মোটেও স্বাস্থ্যকর না।

প্রথম কথাই হলো, একজন গৃহিণী মা নিজের সন্তানকে নিজে লালন-পালন করে, তার অর্থ এই না যে সে অন্য কারো সাথে বাচ্চাদেরকে মিশতে দেয় না। গৃহিণী মায়ের সন্তানরাও স্বাভাবিক ভাবে নিজেদের নানু-দাদুর কাছে যায়। তাদের থেকে আদর পায়৷ তাদের সাথে সুন্দর সময় কাটায়।

কিন্তু তফাত হলো…

একজন গৃহিণী মা তার সন্তানের সিংহভাগ দায়িত্ব অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেয় না।

নিজে ক্যারিয়ারের পিছে ছুটবে বলে মা-শাশুড়ি বা বুয়ার কাছে সারাদিন বাচ্চাকে ফেলে রাখে না। এই যে, আমরা কত্ত ভিডিও দেখি, যেখানে সিসিটিভিতে ধরা পড়ে, বাচ্চারা কাজের লোক কিংবা বুয়ার কাছে কতটা অত্যাচারিত হয়েছে! কেন? কারণ বাবা-মা দুজনেই বিশাল বড়লোক হওয়া সত্ত্বেও কেউ-ই নিজেদের ক্যারিয়ারে একটু কম্প্রোমাইজ করতে রাজি হয় নি। দুজনের কাছেই ক্যারিয়ার ফার্স্ট প্রায়োরিটি! আর দুধের বাচ্চাটা সেকেন্ড প্রায়োরিটি।

তাই ফিডারের দুধ দিতে বলে মা চলে গেছে বাইরে। আর বুয়া ইচ্ছামতন বাচ্চাটাকে কষ্ট দিয়েছে। একটা সত্য ঘটনা বলি, একটা বাচ্চার কথা জানি, যাকে ছোটোবেলায় কাজের লোক এত অত্যাচার করেছে যে সে এখনও পর্যন্ত মানসিকভাবে অসুস্থ। বড় হয়ে যাওয়ার পরেও সেই ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। আমি জানিনা সেই মা কীভাবে নিজেকে প্রবোধ দেয়..।

আরও দেখুন:  কাছে আসার সাহসী গল্প : যুবসমাজকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র

অনেক মায়েরা আছে, যাদের মা বা শাশুড়ির যথেষ্ট বয়স হয়েছে। সারাদিন বাচ্চা সামলানোর দায়িত্বটা তাদের জন্য বেশ কষ্টকর। কিন্তু আধুনিক ক্যারিয়ারিস্ট মেয়ের দাবি, তার বাচ্চাকে দেখাশোনা করতেই হবে। তাই নানু-দাদুর ইচ্ছা বা শরীরে শক্তি না থাকলেও বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে দেখাশোনা করা লাগে। এটাকেই কি নানী-দাদীর সঙ্গ পাওয়া বলে? এভাবে একজন বুড়ো মানুষকে বাধ্য করে?

নানু-দাদুদের বয়সটা এমন তারা বাচ্চাদের সাথে খানিক খেলবেন, সময় কাটাবেন, আবার তাদের নিজেদেরও একটু বিশ্রাম দরকার। আল্লাহ তা’আলা মা-বাবার দায়িত্ব পুরোটা অন্যের কাঁধে তুলে দিতে বলেন নি। সম্ভব হলে অবশ্যই নিজেদেরকেই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

হ্যাঁ, কখনও আপনি অসুস্থ কিংবা গর্ভবতী, কিংবা খানিকটা বিশ্রামের জন্য আত্মীয়-স্বজনের থেকে সাহায্য নেবেন, এটা পুরোই ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু নিজে সারাদিন বাচ্চাকে না দেখে, বাচ্চাকে বুকের দুধটুকু পর্যন্ত না দিয়ে বেশিরভাগ সময় অন্যের কাছে বাচ্চা ফেলে রাখাকে অবশ্যই দায়িত্ব পালন বলে না। এটাকে বলে স্বার্থপরের মতো আবদার। নিজের ক্যারিয়ারের জন্য আশেপাশের মানুষকে বাধ্য করা। যেহেতু তাদের আপনার মতো কোনো ক্যারিয়ারের পিছে ছুটোছুটি নেই, তাই তাদের বিশ্রামের সময়টুকুকে নিজের কাজে ব্যবহার করা। আচ্ছা, একটা প্রশ্ন, যখন আপনি একটু বুড়ো হবেন, আপনার নিজেরও একটা ক্যারিয়ার থাকবে। সেই সময় আপনার নাতিকে কে দেখবে? আপনার মেয়ে/বউ কি তার চাকরিটা ছেড়ে দেবে নাকি আপনি?

৩। কর্মজীবী মায়েরা সমাজে কন্ট্রিবিউট করছে। গৃহিণী মায়েরা সমাজসেবামূলক কোনো কাজই করে না। সারাদিন ঘরে বসে থাকে। সমাজে তাদের কোনো বিচরণ নেই।

সত্যি কি তাই?

প্রতিটা কোম্পানির একটা প্রডাক্ট থাকে। আইসক্রিম কোম্পনি আইসক্রিম বিক্রি করছে, বাচ্চারা খেয়ে আনন্দ পাচ্ছে। ঝালমুড়ি বিক্রেতা ঝালমুড়ি বানাচ্ছে। ক্লোথস ব্র‍্যান্ড নিত্যনতুন কাপড় আনছে। প্রত্যেক কোম্পানি বা ব্র‍্যান্ড তার প্রোডাক্টটা দিয়ে সমাজে কন্ট্রিবিউট করছে।

একটা মুসলিম দম্পতিরও এমন একটা কোম্পানি আছে, আর তা হলো তার পরিবার। আমাদের পরিবারটাই আমাদের কোম্পানি। আমাদের সন্তানসন্ততিরা কোম্পানির প্রডাক্ট। যদি আমরা সন্তানদের মনে আল্লাহর ভয় তৈরি করতে পারি, তাহলেই সমাজে ভালো কিছু মানুষ গড়ে উঠবে। এই যে, আমাদের চারদিকে এত দুর্নীতি, জোচ্চুরি, বাটপারি। এর কারণ সমাজের মানুষগুলোর মনে আল্লাহর ভয় নেয়, আখিরাতে হিসাব নিকাষের ভয় নেই। তাই ওরা সমানে মানুষ ঠকায়, মানুষের টাকা মেরে দেয়। আমাদের সন্তানকে যদি উত্তম মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলি, তাহলে ওরা নিজেরাই এক একটা দূর্গের চেয়েও শক্তশালী হয়ে সমাজে কন্ট্রিবিউট করবে। দায়িত্ববান সদস্য হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখবে।

আরও দেখুন:  ছিয়ামের ফাযায়েল ও মাসায়েল

এই যে একটা মানুষ বানানোর কারিগর হিসেবে একজন মা কাজ করছে, এটা যদি সমাজে ভূমিকা রাখা না হয়, তাহলে ভূমিকা রাখা কাকে বলে? শুধুই অন্যের কোম্পানির প্রফিট বাড়ানোকে?

আমাদের সমস্যা হলো আমরা এখন টাকা দিয়ে সবকিছুর গুরুত্ব মাপি। তাই বাইরে গিয়ে চাকরি করা বা উদ্যোক্তা হওয়া মানেই যেন সমাজে ভূমিকা রাখা হলো। আর নিজের সন্তানকে দেখাশোনা করা, তিল তিল করে মানুষ করার অর্থ হলো “জাস্ট ঘরে বসে থাকা”।

একটা কথা মনে রাখবেন, আল্লাহ তা’আলা মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত রেখেছেন, সেটা শুধু শুধু রাখেন নি। মায়ের কাজটা অনেক কঠিন, এজন্যই তার মর্যাদাও অনেক বেশি৷ এত মর্যাদাকে পায়ে ঠেলে দিয়ে আমরা খালি টাকার পিছে ছুটছি, কীসের আশায়? আমরা মা হিসেবে যদি নিজেদের দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক হই, তাহলে এই বিশাল মর্যাদার হক্বদার আমরা কীভাবে হব?

[বি.দ্র. – সিংগেল মাদার বা এমন নারী যাদের ফিনানশিয়াল দেখাশোনা করার কেউ নেই, কিংবা স্বামী/বাবা তাদেরকে পুরোপুরি সাপোর্ট দেয় না বা দিতে পারছে না, তাদের জন্য বাইরে কাজ করাটা একটা প্রয়োজন। যারা বাধ্য হয়ে বাইরে কাজ করছে, তাদের জন্য সহমর্মিতা জানাই। এই লেখায় শুধুমাত্র সে সব ক্যারিয়ারিস্ট কর্মজীবী নারীর কথা বলা হয়েছে, যারা প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নিজের ক্যারিয়ারকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দেয় আর দুধের শিশুকে অবহেলা করে।]

– আনিকা তুবা

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button