ঈমান/আক্বীদা

অনেকে বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর কোনো ছায়া ছিলো না -এ কথাটি কি সত্য?

রাসূল (ছাঃ) এর ছায়া ছিল না মর্মে যে বক্তব্য দেয়া হয়, তা বিশুদ্ধ নয়। এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছও ছহীহ নয়। বরং জাল ও ভিত্তিহীন।

রাসূল (ছাঃ) আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন। তারও ছায়া ছিল। ছায়া ছিল না বলাটা রাসূল (ছাঃ) এর জীবনী ও সাহাবাদের বক্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।

রাসূল সাঃ এর ছায়া না থাকা সংক্রান্ত একটি জাল বর্ণনা

ﺍﺧﺮﺝ ﺍﻟﺤﺎﻛﻢ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯ ﻣﻦ ﻃﺮﻳﻖ ﻋﺒﺪ ﺑﻦ ﻗﻴﺲ ﺍﻟﺰﻋﻔﺮﺍﻧﻰ ﻋﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﺍﻟﻮﻟﻴﺪ ﻋﻦ ﺫﻛﺮﺍﻥ ﺍﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻟﻢ ﻳﻜﻦ ﻳﺮﻯ ﻟﻪ ﻇﻞ ﻓﻰ ﺷﻤﺲ ﻭﻻ ﻗﻤﺮ، ﺫﻛﺮﻩ ﺍﻟﺴﻴﻮﻃﻰ ﻓﻰ “ ﺍﻟﺨﺼﺎﺋﻞ ﺍﻟﻜﺒﺮﻯ – 1/122 )

অনুবাদ-যাকওয়ান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-সূর্য ও চাঁদের আলোতে রাসূল সাঃ এর ছায়া দেখা যেতো না। {আল খাসায়েলুল কুবরা-১/১২২}

জবাব:

এ বর্ণনাটি জাল ও ভিত্তিহীন। কেননা, প্রথমত তার সূত্রে রয়েছে আব্দুর রহমান বিন কাইস যাফরানী, যার সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনদের কঠোর মন্তব্য রয়েছে।

বিজ্ঞ রিজাল শাস্ত্রবীদ আব্দুর রহমান বিন মাহদী এবং ইমাম আবু যরআ রহঃ তাকে মিথ্যুক বলেছেন।

আবু আলী সালেহ ইবনে মুহাম্মদ রহঃ বলেন-

ﻛﻠﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺑﻦ ﻗﻴﺲ ﺍﻟﺰﻋﻔﺮﺍﻧﻰ ﻳﻀﻊ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ

তথা আব্দুর রহমান বিন কাইস যাফরানী হাদীস জাল করতো।

এছাড়াও তার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ, ইমাম বুখারী রহঃ, ইমাম মুসলিম রহঃ, ইমাম নাসায়ী রহঃ প্রমূখ প্রখ্যাত ইমামদের কঠোর উক্তি রয়েছে। [দ্রষ্টব্য- তারীখে বাগদাদ-১০/২৫১-২৫২, মীযানুল ই’তিদাল-২/৫৮৩, তাহযীবুত তাহযীব-৬/২৫৮]

এছাড়া সত্যিই যদি রাসূল (ছাঃ) এর ছায়া না হতো, তাহলে এটি অতি আশ্চর্যজনক বিষয় হওয়ায় অনেক ছহীহ হাদীছ থাকার কথা। অথচ এমন কোন হাদীছ নেই।

তাছাড়া রাসূল (ছাঃ) এর ছায়া আছে মর্মে একাধিক ছহীহ হাদীছ রয়েছে। তাই ছায়া নেই বলাটা অজ্ঞতাসূলভ মন্তব্য ছাড়া কিছু নয়।

আরও দেখুন:  ‘আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন’ একথার কোন শারঈ ভিত্তি আছে কি?

রাসূর (ছাঃ) এর ছায়া ছিল মর্মে ছহীহ হাদীছ-

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল এক সফরে ছিলেন। সাথে ছিলেন সাফিয়্যাহ ও যায়নব। সাফিয়্যাহ নিজের উট হারিয়ে ফেলেন। যয়নব (রাঃ) এর কাছে ছিল  অতিরিক্ত উট। তাই নবী (সাঃ) যয়নবকে বলেনঃ সাফিয়্যার উট নিখোঁজ হয়ে গেছে, যদি তুমি তাকে তোমার একটি উট দিয়ে সাহায্য করতে তো ভাল হত! উত্তরে যয়নব বলেনঃ হুঁ! আমি ঐ ইহুদির মেয়েকে উট দেব! (অর্থাৎ তিনি দিতে অস্বীকার করেন এবং সাফিয়্যাহ (রাঃ) কে ইহুদী সন্তান বলে কটূক্তি করেন। কারণ তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইহুদী ছিলেন।) এ কটূক্তির কারণে নবী (সাঃ) যয়নবের সাথে মেলামেশা বন্দ করে দেন। জিলহজ্জ এবং মুর্হারম দুই কিংবা তিন মাস ধরে তার সাথে সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত থাকেন। যয়নব (রাঃ) বলেন, আমি নিরাশ হয়ে পড়ি এমনকি শয়নের খাটও সরিয়ে নেই। এমনি এক সময় দিনের শেষার্ধে, নিজেকে রাসূল (সাঃ) এর ছায়ার মধ্যে পাই। তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। [মুসনাদে আহমদ, ৬/১৬৪-১৮২, আত্ ত্বাবাকাত আল্ কুবরা, ৮/১০০) 

হিজরতের লম্বা হাদীসে বর্ণিত, রাবী বলেন: .. .. .. নবী (সাঃ) বানু আমর বিন আউফ গোত্রে রবীউল আউয়াল মাসের সোমবারে  অবতরণ করেন। আবু বকর লোকেদের অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর নবী (সাঃ) চুপ-চাপ বসে থাকেন। ইতোপূর্বে আনসারদের মধ্যে যারা নবী (সাঃ) কে দেখেনি তারা আবু বকর কে সালাম করতে থাকে ( ভুলবশতঃ নবী মনে করে) তারপর যখন আল্লাহর রাসূলের উপর রোদ পড়ে, তখন আবু বকর এসে নিজের চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া করে দেন। এ কারণে মানুষেরা নবী (সাঃ)-কে  চিনতে পারে। [ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার, বাবু হিজরাতিন্নাবী.. হাদীস নং ৩৯০৬]

জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা আল্লাহর রাসূলের সংগী হয়ে নাজদে লড়াই করি। রাস্তার মাঝে নবী (সাঃ) এর “কায়লূলার” (দুপুর বিশ্রামের) প্রয়োজন হয়। জায়গাটিতে ছিল বহু কাঁটাওয়ালা গাছ। তিনি (সাঃ) একটি গাছের নিচে যান এবং সেই গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম করেন। আর তরবারিটি ডালে টেঙ্গে রাখেন। [বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাবু গাযওয়াতি বানিল মুস্তালিক হাদীস নং ৪১৩৯]

আরও দেখুন:  মহসিন হতে কেমন গুণাবলী থাকতে হয়?

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button