বিদআত ও কুসংস্কার

ধর্মের নামে ব্যবসা

পৃথিবীতে কোন ব্যবসা সবচেয়ে বেশী আরামের? – যাতে পরিশ্রম নেই।

পৃথিবীতে কোন ব্যবসা সবচেয়ে বেশী নিরাপদ? – যাতে পুঁজি নেই।

পুঁজিও নাই, পরিশ্রমও নাই এমন কোন ব্যবসা আছে পৃথিবীতে? সৎ ব্যবসা করে পেটের ভাত যোগানো মুশকিল, তাই আল্লাহ সৎ ব্যবসায়ীকে কিয়ামাতের দিন আপন আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। কিন্তু অসৎ ব্যবসা? হেরোইনের ব্যবসাতে লাভ অনেক কিন্তু পরিশ্রম আছে, আবার ধরা পড়লে পুঁজি সব যাবেতো যাবেই, লাল দালানেও থাকা লাগবে। তাহলে কোন সেই ইউটোপিয়ান ব্যবসা যাতে সুখ আর সুখ, লাভ আর লাভ?

ঠিক ধরেছেন – ধর্ম ব্যবসা।

এককালে ক্যাথলিক খ্রীষ্টান পাদ্রীরা স্বর্গে যাবার চাবী বিক্রি করতেন, অত্যাচারী জমিদাররা মানুষকে শোষণ করে টাকা কামিয়ে সেই চাবী কিনতো। এর প্রতিবাদে জন্ম হয় প্রোটেস্টান্টদের। ইহুদি ধর্মেও এমন ব্যবসা বেশ চলে, রাবাইরা দরকার মত ফতোয়া দিয়ে সুদ জায়েজ করেছে, শাস্তি মাফ করেছে পয়সাওয়ালাদের। হিন্দু ধর্মের ব্রাক্ষ্মণরা তো করে খায় পূজা করেই। আমাদের ইসলামে যারা ধর্ম বিক্রি করার সোল এজেন্সী নিয়েছে তারা হল সুফি ঘরানার পীরেরা।

বাংলাদেশে অনেক পীর এভাবে ইসলাম বেঁচে খায়, তাদের কাছে যায় সব দুই নম্বর পয়সার লোকেরা। মানুষ ঠকিয়ে এক লাখ টাকা কামাই করে বাবার কাছে দশ হাজার কমিশন দিয়ে আল্লাহকে কেনার চেষ্টা করে এরা। আজকে এমনই এক ভন্ড পীরের চেহারা দেখিয়ে দেই –

ভদ্দরলোকের নাম জিল্লুহুল আলী, রাজারবাগের পীর। এর ভক্তরা বছর কয়েক আগে পুরো ঢাকার দেয়াল নানান ফতোয়া দিয়ে ছেয়ে ফেলছিল; প্রচারে মাসিক আল বায়িনাত আর দৈনিক আল ইহসান। আমাদের এই পীর বড়ই বিজ্ঞানমনষ্ক, নিজস্ব মাস্তানবাহিনী, দেয়াল চিকা বাহিনী, পত্রিকা-ম্যাগাজিন থাকার পরে তিনি নিজস্ব ওয়েবসাইট খোলেন। শুধু তাই না এরপর তিনি একটি ব্লগসাইটও উদ্বোধন করেন (আমি মনের কানে গর্জন সহকারে সুবহানাল্লাহ শুনতে পাচ্ছি) এই পীরের চামচাদের তিনি ফেসবুক ও অন্যান্য ব্লগে তার মতামত ছড়িয়ে দিতে উৎসাহ দেন।

পীর-মুরিদির ব্যবসাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি মানুষকে হাজ্ব করতে নিষেধ করেন কারণ তাতে পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হয়, ছবি তোলাতো হারাম। তার মতে তার দরবার শরীফে আসলেই হাজ্বের সাওয়াব পাওয়া যাবে। উনার এক প্রাক্তন মুরিদ অবশ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন এই পীরসাহেব ব্যাঙ্কে একাউন্ট ও ট্রেড লাইসেন্স করার সময় ছবি তুলেছিলেন। পীর ব্যবসায় অবশ্য ট্রেড লাইসেন্স লাগেনা, লাগে এই ব্যবসার কামাই অন্য ব্যবসায় চালান করার সময়। ঠিক এ কারণেই ইনার ভক্তরা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ছবি তুলতে পারে, দুবাই গিয়ে ব্যবসা করবে তাও ছবি তুলতে পারে, খালি হাজ্ব ইবাদাতটাই দোষ করে ফেলেছে।

আরও দেখুন:  বিদ‘আতে হাসানার উদাহরণ : একটি পর্যালোচনা (১)

আজকে যে প্রসঙ্গে লেখা তা হল শবে বরাত। এটা ইসলামে পালনীয় কোন অনুষ্ঠান নয়, কেন নয় তা জানতে এই বইটা পড়ুন – http:/www.islamhouse.com/p/53550 বইটির দলিলগুলো খুব স্পষ্ট, যাকে আল্লাহ অহংকার থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তার জন্য শবে বরাত না করার জন্য এটাই যথেষ্ট।

তো পীরসাহেব হলেন বিদ’আতের প্রসারক ও সুন্নাতের হত্যাকারী। শবে বরাতের মত এমন মওকা তো তিনি ছাড়তে পারেননা, তাই তিনি তার ব্লগে যে লেখাটি স্টিকি করেছেন তা হল – প্রসঙ্গঃ শবে বরাত: আক্বীদা, আমল ও সংশ্লিষ্ট আলোচনা (একটি দলীলভিত্তিক আর্টিকেল) http:/www.sabujbanglablog.net/10999.html

এর দু’টো জিনিস নিয়ে আমি আলোকপাত করব।

১. দলিল:

লেখাটায় প্রথম যে দলিল আনা হয়েছে তা হল – “নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে (শবে বরাতে) কুরআন শরীফ নাযিল করেছি অর্থাৎ নাযিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। উক্ত রাত্রিতে আমার পক্ষ থেকে সমস্ত প্রজ্ঞাময় কাজ গুলো ফায়সালা করা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (সূরা দুখান-৩, ৪, ৫)

আমি এবার কয়েকটা অনুবাদ দিলাম, দেখুন এই ভদ্রলোকের করা অনুবাদের সাথে কোন মিল পান কিনা?

মুহিউদ্দিন খান:

শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। (2) আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। (3) এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (4) আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। (5)

মুহাম্মদ আসাদঃ

CONSIDER this divine writ, clear in itself and clearly showing the truth! (2) Behold, from on high have We bestowed it on a blessed night: for, verily, We have always been warning [man]. (3) On that [night] was made clear, in wisdom, the distinction between all things [good and evil] (4) at a behest from Ourselves: for, verily, We have always been sending [Our messages of guidance] (5)

আরও দেখুন:  মহামারী থেকে আত্মরক্ষায় বিদ‘আতী আমলের পরিণতি

ইউসুফ আলিঃ

We sent it down during a Blessed Night: for We (ever) wish to warn (against Evil). (3) In the (Night) is made distinct every affair of wisdom, (4) By command, from Our Presence. For We (ever) send (revelations), (5)

ড. মুহসিন খান ও ড. তাকিউদ্দিন হিলালিঃ

By the manifest Book (this Quran) that makes things clear, (2) We sent it (this Quran) down on a blessed night [(i.e. night of Qadr, Surah No: 97) in the month of Ramadan,, the 9th month of the Islamic calendar]. Verily, We are ever warning [mankind that Our Torment will reach those who disbelieve in Our Oneness of Lordship and in Our Oneness of worship]. (3) Therein (that night) is decreed every matter of ordainments. (4)Amran (i.e. a Command or this Quran or the Decree of every matter) from Us. Verily, We are ever sending (the Messengers), (5)

সহিহ ইন্টারন্যাশনালঃ

By the clear Book, (2) Indeed, We sent it down during a blessed night. Indeed, We were to warn [mankind]. (3) On that night is made distinct every precise matter – (4) [Every] matter [proceeding] from Us. Indeed, We were to send [a messenger] (5)

আমাদের পীর ভক্ত মুরিদ অনুবাদ করেছেন – “বরকতময় রজনীতে (শবে বরাতে) কুরআন শরীফ নাযিল করেছি অর্থাৎ নাযিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

এখানে ব্র্যাকেটের মধ্যে শবে বরাত ঢুকানো আর আল্লাহ যেখানে বললেন নাযিল করেছি সেখানে নাযিলের ইচ্ছা বলে আল্লাহর ভুল(!) শুধরে দিয়ে লেখক শবে বরাত প্রমাণ করে ছেড়েছেন। ইয়াযুবিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বললেন রামাযান মাসে কুর’আন নাযিল হয়েছে। তার আগের মাসের ১৫ তারিখে আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন, তারপর পনের দিন কাজ করলেন তারপর রমযান মাসে নাযিল করলেন। এ ধরণের একটা ফাযলামো তাফসির দেয়ার পর লেখাটার আর অংশে দঈফ বা দুর্বল হাদিস যা মানার অযোগ্য এবং জাল বা মাওদু হাদিস দিয়ে শবে বরাত প্রমাণ করা হয়েছে। যেসব সহিহ হাদিস আছে তা কি যুক্তিতে এসেছে এবং কি প্রমাণ করেছে তা আল্লাহই জানেন।

আরও দেখুন:  শী‘আদের তা‘যিয়া মিছিলের সূচনা যেভাবে

২. মূল বিষয়ঃ

লেখা শেষে মানুষকে বুদ্ধি দেয়া হয়েছে-

মহিমান্বিত, পবিত্র বরাতের রাত কোথায় উদযাপন করবেন?

দোয়া কবুলের মহিমান্বিত, সম্মানিত রাত, পবিত্র শবে বরাত। যামানার লক্ষ্যস্থল ওলীআল্লাহ, যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, ইমামুল আইম্মাহ, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদে আ’যম, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা ইমাম রাজারবাগ শরীফ-এর মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী- উনার সাথে দোয়া, মুনাজাত ও সারারাত্রব্যাপী ইবাদতে সামিল হতে আসুন, রাজারবাগ দরবার শরীফ, ৫, আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ, ঢাকা-১২১৭।

এটাই হল আসল কথা: আমার দরগায় আসো -নজরানা দাও, মানত কর, দান কর।

যারা হালাল-হারামের বিবেচনা করতে চাননা, দুনিয়ার বিনিময়ে পরকালে জাহান্নাম কিনতে চান তাদের জন্য এটা খুব ভালো একটা বিজনেস প্ল্যান। এখনই পীর হয়ে যান। যারা পীরের কাছে যান তাদের কাছে অনুরোধ – মাথায় কাঠাল ভাংতে চাইলে পরের কাছে কেন যাবেন, আপনার বাবা-মার কাছে যান, বন্ধুদের কাছে যান। মোটা মোটা শয়তানদের যে টাকা দিচ্ছেন তা কাছের লোকদের দিয়ে একটি নতুন ফ্যামিলি বিজনেস শুরু করুন।

আল্লাহ মানুষকে সত্যটা বোঝার তৌফিক দাও।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button