বিদআত ও কুসংস্কার

সাতক্ষীরা জেলার কিছু মাজার ও খানকা

সাতক্ষীরা জেলার সংক্ষিপ্ত পরিচয় :

এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ও পশ্চিমবঙ্গের সাথে একমাত্র সীমান্তবর্তী যেলা। খুলনা বিভাগের অন্যতম যেলা হ’ল সাতক্ষীরা। এই যেলার আয়তন ৩৮১৭.২৯ কি.মি। এটি বঙ্গোপসাগরের উত্তরে অবস্থিত। ২০১৩ সালের তথ্যানুযায়ী এই যেলার জনসংখ্যা ২০,৭৯,৮৮৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ১০,০৪,৪১৫ জন, আর মহিলা ৯,০৪৫,২৩৪ জন। মোট জনসংখ্যার ৭৮.০৮% মুসলিম, ২১.৪৫% হিন্দু, ০.০২৮% খ্রীষ্টান, ০.০১% বৌদ্ধ এবং ০.১৮% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।[1]

প্রায় ৮০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত যেলা হওয়া সত্ত্বেও কালের আবর্তনে সাতক্ষীরা যেলায় অসংখ্য মাযার, খানকা ও দরগা গড়ে উঠেছে। যেখানে মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণার্থে গমন করে থাকে। এমনকি সেখানে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে হিন্দুরাও যায় পূজা করতে। নিমেণ সাতক্ষীরা যেলায় গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধিক মানুষের যাতায়াত রয়েছে এমন কিছু মাযার, খানকা ও দরগার উপর সরেযমীন প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হল :

১. নলতা মাযার শরীফ:

গত ৩০ সেপ্টেম্বর, রোজ বুধবার সকাল ৮ টায় মোটর সাইকেলযোগে আমরা ‘নলতা মাযার শরীফ’-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। প্রচন্ড দাবদাহের মধ্যে উঁচু-নীচু ভাঙ্গা রাস্তা মাড়িয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা যাত্রার পর আমরা সেখানে পৌঁছাই। তবে পাঠকদের সুবিধার জন্য প্রারম্ভেই ‘নলতা মাযার শরীফ’-এর পরিচয় প্রদান সমীচীন বলে মনে করি।

‘নলতা মাযার শরীফ’-এর পরিচয় :

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ থানা সাতক্ষীরা যেলার কালীগঞ্জ উপযেলার ‘নলতা’ একটি প্রসিদ্ধ এলাকা। সাতক্ষীরা-কালীগঞ্জ সড়কের পার্শ্ববর্তী নলতা বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত ‘নলতা মাযার শরীফ’। দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের সাবেক সহকারী পরিচালক, বহুগ্রন্থ প্রণেতা ও সমাজ সংস্কারক খানবাহাদুর আহছানুল্লাহ-এর মাযার এখানে অবস্থিত। মূলতঃ এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী খানবাহাদুর আহছানুল্লাহ (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর তার কবর কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে ‘নলতা মাযার শরীফ’। অথচ মাযারের সাথে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। তাঁর পথভ্রষ্ট ভক্তদের কল্যাণে তিনি আজ পরিণত হয়েছেন পীরে কেবলা সুলতানুল আওলিয়া কুতুবুল আকত্বাব গওছে যামান আরেফ বিল্লাহ হযরত শাহ সুফী আলহাজ্জ খানবাহাদুর আহছানুল্লা (এম.এ; এম.আর.এস.এ; আই.ই.এস)! নলতা মাযার শরীফে যে সমস্ত কার্যক্রম হয়ে থাকে নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপস্থাপন করা হ’ল :

(ক) ওরস শরীফ : ওরস শরীফ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাযার হাযার ভক্ত, মুরীদ, গুণগ্রাহীগণ সেখানে উপস্থিত হন। বিগত দিনের যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য যদি পীর ছাহেবের একটু সুপারিশ পাওয়া যায়। মনের কাকুতি-মিনতি পেশ করা যায়। উপাসনার নৈবেদ্য উপস্থাপন করা যায়। উক্ত মাযারে প্রতি বছর বাংলা ২৬ শে মাঘ অর্থাৎ ৯ই ফেব্রম্নয়ারী (পীর ছাহেবের মৃত্যুদিনে) তিনদিন ব্যাপী ‘ওরছ শরীফ’ অনুষ্ঠিত হয়। ওরছ শুরু হওয়ার পূর্বের দিন থেকে শেষ হওয়ার পরের দু’দিন পর্যন্ত সর্বদা সেখানে ১২ থেকে ১৫ হাযার মানুষ অবস্থান করে থাকে। ওরছ চলাকালীন সেখানে বিভিন্ন কার্যাবলী সম্পন্ন হয়। সকালে কুরআন খতম করা হয়, মীলাদ, ক্বিয়াম হয়ে থাকে। পর্যায়ক্রমে গযল, পীর ছাহেবের গ্রন্থ পাঠ, বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য, পীর ছাহেবের জীবনী ও কেরামতের উপর আলোচনা, নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর আলোচনা ও সবশেষে মুনাজাত করা হয়। এভাবেই শেষ হয় তিনদিনের ওরছ শরীফ। ওরছ অবস্থায় আগত ভক্তদের জন্য ফ্রি খাবার পরিবেশন করা হয়।

পীর ছাহেবের ভাতিজা জনাব রফীকুল ইসলাম, যিনি প্রায় ২০ বছর যাবৎ সেখানে অবস্থান করছেন এবং তাবীয বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ওরছ শরীফ উপলক্ষে আগত হাযার হাযার মানুষের ফ্রি খাবাবের ব্যবস্থা করা হয়। খাবার জন্য ৩০ মন তেল ব্যবহার করা হয়। ২০-৫০টি গরু এবং ২০০-৫০০ টি ছাগল যবেহ করা হয়। খাবার হিসাবে বিরিয়ানীর তবারক প্রদান করা হয়। যা অত্যন্ত বরকত মনে করে আগত ভক্তবৃন্দ সানন্দে গ্রহণ করে। তবারক গ্রহণের জন্য প্রায় প্রতিযোগিতার মত পর্যায় চলে যায়। উল্লেখ্য যে, উক্ত গরু ও ছাগল সবগুলোই মানুষের বিভিন্ন আশা পূরণার্থে কৃত মানত। নলতা মাযার পরিচালনা কমিটির সাবেক এ্যাকাউন্ট ম্যানেজার ও বর্তমানে জেনারেল কমিটির সদস্য জনাব আবুল কাশেম বলেন, রামাযান মাসে প্রতিদিন এখানে ৪২০০-৪৩০০ জনের ফ্রি ইফতার করানো হয়। যেখানে খাবার হিসাবে থাকে খেজুর, সুজি, কলা, শিংগাড়া, চিঁড়া প্রভৃতি। তাছাড়া এখানে একটি মেহমানখানা রয়েছে। যেখানে যেকোন ধরনের মেহমান তিনদিন ফ্রি থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকে। প্রায় ১২০০ জন মানুষ একত্রে সেখানে অবস্থান করতে পারে।

(খ) সেবামূলক প্রতিষ্ঠান : নলতা মাযার শরীফ কেন্দ্রিক কয়েকটি সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে প্রতি শনি ও সোমবার ২০০-২৫০ জন রোগীর ফ্রি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। সেখানে ৫০ জনের একটি ইয়াতীমখানা রয়েছে। একটি হাফেযী মাদরাসা রয়েছে, যেখানে ১২-১৪ জন ছাত্র, লিল্লাহ বোর্ডিং ৫০ জন ছাত্র, কর্মচারী ৫০ এবং শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১৮ জনের মত। সকলেরই বাসস্থান ও আহারের ব্যবস্থা ‘আহছানিয়া মিশন’ কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকে।

(গ) সাপ্তাহিক কার্যক্রম : নলতা মাযারে সাপ্তাহিক কিছু কার্যক্রম হয়। যেমন দো‘আ, মীলাদ, ক্বিয়াম ইত্যাদি। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার মাযারের মধ্যে বাদ মাগরিব ১৩০০ এর অধিক মীলাদ হয়ে থাকে। আর সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বাদ জুম‘আ মসজিদে ৭০০ মীলাদ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে প্রত্যেক অনুষ্ঠানে মীলাদ-ক্বীয়ামের মত বিদ‘আতী অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

(ঘ) প্রাত্যহিক কার্যক্রম : প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও পূর্বগগনে সূর্যের আলো ঝলমলিয়ে উঠেছিল। ভোরের শীতল আবহাওয়ায় পাখিরা কিচির মিচির শব্দ ডেকেছিল। সকলের মাঝে কর্মচঞ্চলতা ছিল স্বাভাবিক। এরই মধ্যে আমরা যেভাবে ‘নলতা মাযার’ পরিদর্শনে বাড়ী থেকে বের হয়েছিলাম, ঠিক এমনি করে অনেকেই বের হয়েছিল। তবে উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ এসেছিল বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য, কেউবা অসুস্থ থেকে সুস্থ হওয়ার আশায়, কেউবা স্বপ্ন পূরণের কাঙিক্ষত বাসনা নিয়ে। পীর ছাহেবের ভাতিজা রফীকুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, দৈনিক কত যে তাবীয বিক্রয় হয় তার সঠিক হিসাব তিনি দিতে পারবেন না। তবে তাবীযের মূল্য সাইজ মত ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু বখশীশ গ্রাহকের ইচ্ছামত। উল্লেখ্য, তাবীয ক্রয়ের টাকা রসিদের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়, কিন্তু বখশীশের টাকার কথা কিছু বলেননি।

জেনারেল কমিটির সদস্য জনাব আবুল কশেম ছাহেব তিনি আমাদের পীর ছাহেব খানবাহাদুর আহছানুল্লাহ স্মৃতি জাদুঘর প্রদর্শন করান। যেটা ‘অন্তরে অমস্নান’ নামে পরিচিত। সেখানে ঢুকে তো রীতিমত চক্ষু চড়কগাছ। পীর ছাহেবের ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসন-কোসন, আসবাবপত্র, ব্যক্তিগত লাইব্রেরী, তার ব্যবহৃত খাট-পালঙ্ক, লেপ-তোষক, গস্নাস-মগ প্রভৃতি। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হ’ল, ১২-১৩ ফিটের রুমটিতে পীর ছাহেবের ছবিতে ভরপুর। এছাড়া তার স্ত্রী, সমত্মান-সন্ততি, ভাই-বোন, পিতা-মাতাসহ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়ের ছবি টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। মনে হয় যে সমস্ত ভক্তবৃন্দ মাযারে মনের চাওয়া নিবেদন করে মনের খায়েশ মিটাতে পারে না, তারা চলে যায় টাটকা ছবির সম্মুখে। যেখানে পীর কেবলার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি রয়েছে। ফলে ভক্তির আতিশয্যে পীরের অন্তলীন হয়ে যায়। উল্লেখ্য, উক্ত রুমেই পীর ছাহেব খানবাহাদুর আহাছানুল্লাহ জীবন-যাপন করতেন।

পীর পরিবারের কারামত : পীর পরিবারের কারামত সম্পর্কে বলতে গিয়ে জনাব আবুল কাশেম বলেন,

(ক) পীর ছাহেবের দাদা ছিলেন গ্রামের মধ্যে অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তি। নাম তাঁর মুন্সী দানেশ। তিনি জমিদারী সংক্রান্ত কার্যে ও সামাজিক বিষয়ে সুদক্ষ ছিলন। তাঁর উপর জনৈক দরবেশ (যিনি কাছেম শাহ নামে পরিচিত ছিলেন) ছাহেবের নেকদৃষ্টি পতিত হয়। বাল্যকালে তিনি একদিন কঠিন রোগে শয্যাগত হন, তখন এক শুভ মুহূর্তে শাহ ছাহেবের পদার্পণ হয়। তিনি মুমূর্ষ বালককে ঘাড়ের উপর নিয়ে ছুটে যান ও পথিমধ্যে তাঁকে নামিয়ে দিয়ে তাঁরই পশ্চাতে পশ্চাতে দৌড়িয়ে আসতে আদেশ দেন। বালক রোগমুক্ত হয়ে ছুটে স্বগৃহে দরবেশ ছাহেবের সাথে ফিরে আসেন। তদবধি তিনি সুস্থ শরীরে অশীতিবর্ষ পর্যন্ত অতিবাহিত করেন। এছাড়া তার পরিবারের মধ্যে কোন আপদ-বিপদ দেখা দিলে অমনি কাছেমশাহের হাজির দেখা যেত।

(খ) পীর ছাহেব বলেন, একদা মুন্সী দানেশ আমাদের বাড়ীতে জনৈক বুযুর্গ মেহমানকে দুপুরের খাবার পরিবেশন করছিলেন। হঠাৎ তিনি চোখের অন্তরালে চলে যান, পুনরায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসেন এবং খাবারে অংশগ্রহণ করেন। হঠাৎ অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নিকটবর্তী গ্রাম পারুলিয়ার কোন এক ব্যক্তি ব্রীজ পার হ’তে গিয়ে নীচে পানির মধ্যে পড়ে যায়। তাকে উদ্ধার করতে তিনি ছুটে যান। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, আমার দাদার মৃত্যুকালে জনৈক কামেল ব্যক্তি উপস্থিত হবেন। সত্যি যখন আমার দাদা ইমেত্মকাল করেন তখন ইরান হতে মাওলানা ছুফী মুহাম্মাদ আলী শাহ অপ্রত্যাশিতভাবে ইরানী একটি গ্রীন বোটে আমাদের বাড়ীর নিকট দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীর শাখা নদীর আমাদেরই ঘাটে উপস্থিত হন। অতঃপর তার জানাযার ছালাত পড়েন। পরবর্তীতে যশোর যেলার নওয়াপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন এবং সমাহিত হন। উল্লেখ্য যে, তিনি সেখানে ‘ইরানী পীর’ ছাহেব নামে পরিচিত।

(গ) পীর ছাহেব বলেন, আমার দাদার মৃত্যুর বহু পূর্বে তিনি একদা স্বপ্নে আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ইঙ্গিত পেয়েছিলেন এবং আমাকে মুবারকবাদ জানিয়েছিলেন। আমি অল্প বয়স্ক বালক ছিলাম, স্বপ্নের পূর্ণ মর্ম উপলব্ধি করতে পারিনি। কিন্তু এখনও আমার অন্তরে তা জাজ্বল্যমানরূপে ভাসমান আছে। যা সত্য, তা চিরদিন পরিস্ফুট থাকে-সমভাবে সত্যিকার রূপে!

(ঘ) জনাব আবুল কাশেম বলেন, নলতা মাযার শরীফ, যা ‘পাক রওজা শরীফ’ নামে আখ্যায়িত। উক্ত মাযারের উত্তর দিকে মাযার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সেই মসজিদের সামনে তথা উত্তর দিকে একটি বৃহৎ পুকুর রয়েছে। একদিন পীর ছাহেব সকলের সাথে গোসলের জন্য ঐ পুকুরে নামেন। সেখানে তিনি আনন্দ করে বললেন, কে কতক্ষণ পানির নীচে ডুব দিয়ে থাকতে পারে। অতঃপর সবাই ডুব দিল। যার যা ক্ষমতা ছিল সেটা প্রয়োগ করে সবাই পানির নীচ থেকে উঠল। কিন্তু পীর ছাহেব উঠলেন না। সবাই মনে মনে ভাবছেন এই বুঝি পীর ছাহেব উঠবেন। কিন্তু ওঠেনই না। সবাই তখন চিমত্মায় পড়ে গেল। অতঃপর সকলেই পুনরায় পানিতে নামল তাকে খুঁজার জন্য। কিন্তু সারা পুকুর তন্নতন্ন করে খুঁজে তার কোন সন্ধান পেল না। সবার মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। হঠাৎ করে তিনি যেখানে ডুব দিয়েছিলেন সেখান থেকেই ১৮ কেজি ওযনের বিরাট একটি কাতলা মাছ নিয়ে ওঠে আসেন। আশ্চর্য বিষয় হ’ল, তখন ঐ পুকুরে কোন মাছ ছিল না। এটিই পীরে কেবলা খানবাহাদুর আহছানুল্লাহ-এর অন্যতম কেরামতি।

শিরক-বিদ‘আতের আড্ডাখানা :

ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ হ’ল শিরক। যার মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাকে অপমান করা হয়। আর ইসলামের সবচেয়ে বড় শয়তানী কাজ হ’ল বিদ‘আত। যার মাধ্যমে স্বয়ং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে অপমান করা হয়। অথচ ইসলামের নামে সহজ-সরল মুসলিম জনসাধারণকে ঐ জঘন্য পাপকর্ম শিরক-বিদ‘আতের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া দেখে মনটা বিষিয়ে ওঠে। শিরকের কারখানা খুলে মানুষকে ঈমানের দিকে আহবান করা যায় না। অথচ এই কাজটিই করে যাচ্ছে বাংলাদেশের যেলায় যেলায় গড়ে ওঠা মাযার-খানকা-দরবার ভিত্তিক কিছু মূর্খ, ভ- ও প্রতারকরা। নিমেণ স্বচক্ষি দেখা কিছু অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা হ’ল :

দৃশ্য-১ : মোটর সাইকেল থেকে নামা মাত্রই এক জাহেলী ও শিরকী প্রথার অবতারনা। প্যান্ট, শার্ট, সু পায়ে অত্যন্ত পরিপাটি জনৈক এক পীর ভক্তের আগমন ঘটল। তথাকথিত ‘পাক রওযা শরীফ’ মূলত সমতল থেকে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। যেখানে উঠার জন্য দু’পার্শ্বে সুদৃশ্য মূল্যবান মার্বেল পাথরের সিড়ি করা আছে। ভক্ত লোকটি উপরে ওঠার সময় তার দু’পায়ের জুতা খুলে ফেললেন। পরমুহূর্তে দু’তিনটা সিড়ি পার হয়ে সিড়িতেই ডান হাত মেরে সেই হাত মুখে ও কপালে এবং হিন্দুদের ন্যায় চোয়ালের দুই দিকে ঘুরিয়ে নিলেন এবং মুখে কি যেন বিড়বিড় করলেন। অতঃপর ওপরে উঠে গেলেন। হয়তো বেচারী অফিসে যাওয়ার পূর্বে হিন্দুদের ঠাকুরের প্রসাদ নেওয়ার মত তিনিও পীরে কেবলার মাযারের বরকত হাছিল করে নিতে চান। যাতে কাজে বরকত হয় এবং কোন সমস্যায় পতিত না হতে হয়। সাথে সাথে সঙ্গীকে বললাম, দেখুন! নলতা মাযারের শিরকের প্রথম দৃশ্য। হয়তো এরচেয়ে আরো খোলাখুলি দৃশ্য সামনে অপেক্ষমান।

দৃশ্য-২ : সিড়ি মাড়িয়ে যখন আমরা উপরে উঠলাম, তখন নিজেদেরকে আবিষ্কার করলাম এক সুদৃশ্য স্থাপনার মাঝে। মনে হচ্ছিল বাংলার প্রাচীন শৈল্পিক স্থাপত্যে সুশোভিত কোন জমিদার বাড়ীর খাস কামরা। সুসজ্জিত বিল্ডিং, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও রূচিশীল টাইলস দিয়ে সমস্ত মেঝে সজ্জায়ন করা। মূল্যবান মখমল কাপড় দিয়ে মাযারটি আচ্ছাদিত। তার উপর বিভিন্ন নামিদামী তাজা ও শুকনা ফুলের পাপড়ি চতুর্দিকে সুন্দর করে সাজানো। গোলাপ জল ও আগরবাতীর ঝাঁঝালো গন্ধতো আছেই। মাযারের উপর থেকে তাবীয বিক্রেতা ফুলের পাপড়ি নিচ্ছে আর তাবীযের মধ্যে ঢুকিয়ে খাদেমের নিকট পাঠাচ্ছে। সেগুলোকে খুবই বরকতম–ত মনে করা হয়ে থাকে। পীর ছাহেবের মাযারের উপরে রাখা ফুলের পাপড়ি বলে কথা! মাযারের চতুর্দিকে এক বিঘত পরিমাণ স্থান উঁচু করে টাইলস বসানো আছে। যেখানে মানুষ প্রথমে ছালাতের কায়দায় বসে সম্মানের সাথে দু’হাত রেখে চুমু খেয়ে মনের আশা ব্যক্ত করে থাকে।

মাযারে প্রবেশের মোট চারটি দরজা। তিনটি পুরুষের জন্য, একটি মহিলাদের জন্য। মহিলাদের জন্য সেখানে পর্দার ব্যবস্থাও রয়েছে। যাইহোক, দেখলাম দু’জন যুবক ছেলে। দু’জনের মাথায় মাযারের ময়লাযুক্ত টুপি পরিধান করা। একজন দু’হাত সেই বিঘত পরিমাণ স্থানে রেখে মাথা নীচু করে বসে আছে। অপরজন দু’হাত সম্মানের সাথে রেখে চুম্বন করে মুনাজাত করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর দু’জনের চোখ দিয়ে অশ্রম্নধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস যে, আমার সমস্ত পাপ হয়তো ক্ষমা হয়ে যাচ্ছে। পীর আমাকে পাপগুলোকে ধুয়ে মুছে ছাপ করে দিচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে মুনাজাত ও কান্নাকাটি করে অবশেষে পীরের আদবের শানে পিঠ পিছনে রেখে সালাম দিয়ে চলে গেল। ঐ রুমের এক কোনায় দেখলাম এক নোংরা পোশাকধারী বাবরীওয়ালা খুব ভদ্রোচিত ভঙ্গিতে কুরআন তেলাওয়াত করছে। বয়স আনুমানিক ২৪-২৫ হবে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, তার পরিধেয় পাজামাটি টাখনুর নীচে মাটির সাথে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হায়রে অবুঝ মানুষ! আক্বীদা ও আমলের সংশোধনের কোন বালাই নেই অথচ তথাকথিত কল্পিত যিকির, মুনাজাত, মীলাদ-ক্বিয়াম, হুযুরের শানে আদব ও কুরআন তেলাওয়াত করে আখেরাতে পীরের সুফারিশ পেতে চাই!

দৃশ্য-৩ : জনৈক স্বামী ও তার স্ত্রীর ঘটনা। পশ্চিম গেট দিয়ে প্রবেশ করে মাযারে ঢোকার সময় দরজার ঠিক পূর্বে স্ত্রী লোকটির স্বামী সিজদা করল অতঃপর দরজার পর্দা নিয়ে একবার ডান চোখে একবার বাম চোখে স্পর্শ করল। তারপর ভক্তির সাথে মাথা প্রায় কোমর পর্যন্ত বাঁকা করে গম্বুজাকৃতি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। আমরা সেটা অবাক নেত্রে তাকিয়ে দেখলাম আর যতটুকু সম্ভব মোবাইলের মাধ্যমে ভিডিও করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ভিডিওতে ঠিকমত ঐ দৃশ্যটি আসেনি। আফসোস! ইট-মাটি-সিমেন্ট দিয়ে তৈরী কবরকে কি কখনো সিজদা করা যায়। তাছাড়া পীর ছাহেবের কবর তো ঐ স্থান থেকে প্রায় ২৫ ফুট মাটির নীচে। হায়রে মূর্খ মুসলিম! কবে ফিরবে তোমাদের চেতনা।

দৃশ্য-৪ : দক্ষিণ গেট দিয়ে মাযারের দিকে হঠাৎ নযর পড়ল।  দেখি এক অভাবনীয় দৃশ্য! দৃশ্য অবলোকন করে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করল। কখনো এরকম অচিন্তনীয় দৃশ্য স্বচক্ষি দেখিনি। কিন্তু পরমুহূর্তেই সম্বিত ফিরে পেয়ে আল্লাহ্র প্রশংসা করলাম। প্রথমতঃ আমাদের প্রতিবেদনটি তৈরীর জন্য যে সব তথ্য দরকার, সেগুলো একের পর এক সবই আমাদের সামনে ঘটছে। দ্বিতীয়তঃ এরকম শিরকী পরিবেশে ও পরিবারে আল্লাহ আমাদের জন্মগ্রহণ করাননি। যাইহোক, আড়াই অথবা তিন বছরের ছোট্ট সোনামণিকে তার পীর ভক্ত পিতা কিভাবে শিরক করতে হয় তা তাকে হাতে-কলম প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। পিতা তার দু’হাত বিঘত পরিমাণ জায়গায় রেখে তার শিশু পুত্রকে বলছে এভাবে রাখতে হয়। সেখানে চুম্বন করে ছেলেটিকে চুম্বন করতে বলছে। আগে পিতা সবই করে দেখাচ্ছে, যাতে বাচ্চাটি সহজেই তা করে। কিন্তু আনন্দের বিষয় হ’ল সে কিছুতেই সেখানে হাত রাখা বা চুম্বন দেওয়া কোনটাই করছে না। সে সময় মূর্খ পিতা জোর করে বাচ্চাটির ঐ স্থানে হাত রেখে চুম্বন করিয়ে দিল। তারপরের দৃশ্য তো আরো শোচনীয়। সেটা হ’ল, পিতা সমত্মানকে সেখানে সিজদা করার জন্য বলে নিজে আগে সিজদা দিল। কিন্তু বাচ্চা সোনামণিটি কোনরকম সিজদা দিতে নারাজ। এবারও তার পিতা ঘাড় ধরে তাকে সিজদা করাল। দৃশ্য দেখে তো রীতিমত হতবাক হলাম আর মনে মনে আওড়াতে লাগলাম রূহ জগতে মহান আল্লাহ্র নিকট দেওয়া সেই প্রতশ্রম্নতির কথা। ছোট্ট সোনামণি, সে কবরে সিজদা দেওয়ার জন্য তো পৃথিবীতে আগমন করেনি। নির্ভেজাল তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তো দুনিয়ায় তার আগমন। কিন্তু রাসূলের হাদীছ তো আর মিথ্যা হতে পারে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক সমত্মান ফিৎরাত তথা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তাদের পিতা-মাতার কারণে সে হয় ইহূদী, খ্রীষ্টান এবং অগ্নি উপাসক’ (বুখারী হা/১৩৫৮; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০)। উল্লেখ্য যে, পূর্বে শিশুটির পিতাকে এককভাবে সিজদা করতে দেখেছিলাম।

দৃশ্য-৫ : মাযারের চতুর্দিকে সুদৃশ্য টাইলস বসানো বারান্দা রয়েছে। সেই বারান্দা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মাযারের ভিতরে গিয়ে ভিডিও করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম পীর ছাহেবের ভাতিজা রফীকুল ইসলাম একটি কাগজ এনে মাযারের উত্তর-দক্ষিণের উপর থাকা সেই বিভিন্ন নামী-দামী শুকনা ফুলের পাপড়ি নিয়ে গেল, যা দিয়ে তিনি আগত বিভিন্ন মুরীদ, ভক্ত ও অসুস্থ মানুষের মাঝে টাকার বিনিময়ে বিতরণ করছেন। হায়রে বিবেকসম্পন্ন মানুষ! বিবেক কী জাগ্রত আছে না-কি মৃত। মাযারের উপরে রাখা ফুলের পাপড়ির কি অলৌকিক কোন ক্ষমতা আছে, যে তাকে আরোগ্য দান করবে?

দৃশ্য-৬ : উত্তর গেটের সামনে দিয়ে হাঁটছি। একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম জনৈকা এক মধ্যবয়সী মহিলা মাযারের পার্শ্বে ছালাত আদায় করছে, এক মহিলা ১০-১১ বছরের একটি বালিকাকে সঙ্গে নিয়ে দু’হাত তুলে মুনাজাত করছে, একজন মহিলা মাযারের দিকে ফিরে কুরআন তেলাওয়াত করছে। সময় যত যাচ্ছে দেখলাম মানুষের ভীড় ততই বাড়ছে। বিশেষ করে মহিলারা। শিশু-কিশোর, তরুণী, মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধা মহিলার আগমন সবচেয় বেশী। তাদের কারো হাতে তাবীয, কারো হাতে পানি ভর্তি বোতল, কারো হাতে বোটা সহ বড় বড় বাতাবী লেবু শোভা পাচ্ছে। যেগুলো তারা পীরের রেযামন্দী প্রাপ্ত ও নিয়োগকৃত খাদেমের নিকট থেকে ঝাঁড়-ফুক করার জন্য যাচ্ছে আবার কেউ সেগুলো নিয়ে বিদায় হচ্ছে।

দৃশ্য-৭ : মাযারে আগত জনৈক এক মধ্য বয়সী পুরুষ মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি এখানে কেন এসেছেন? তিনি বললেন, তাবীয কিনতে। বললাম, আপনার কি সমস্যা? বললেন, হার্ট দুর্বল ও কোমরে ব্যাথা। আবার বললাম, এর আগে কি কখনো এখানে এসেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘না; এই প্রথম। বিভিন্ন ডাক্তার, কবিরাজ দেখিয়েছি, কিন্তু কোন কাজ হয়নি। এক ভাই আমাকে বলল নলতা পীরের মাযারের তাবীয নিলে আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তাই এখানে আসা’। লোকটি শ্যামনগর উপযেলার সুন্দরবনের নিটকবর্তী কোন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসেছিলেন।

‘কবরে সেজদা করবেন না, এখানে সেজদা করা নিষেধ’ : ‘নলতা মাযার শরীফ’-এর দেওয়ালে লেখা আছে উপরোক্ত কথাটি। বিষয়টি হাস্যকর বৈকি। খোসা তুলে মৌমাছিকে যদি বলা হয় আমের উপর বস না, তাহলে মৌমাছি কি শুনবে? অনুরূপভাবে বিষয়টি পাগলকে সাঁকো নাড়া দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মত নয় কি? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে, শিরক-বিদ‘আতের উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করে বলা হচ্ছে ওখানে শিরক-বিদ‘আত কর না। হায়রে হতভাগা মুসলিম!

২. খানপুর দরগা শরীফ

সাতক্ষীরা সদর থানাধীন খানপুর এলাকায় ‘খানপুর দরগা শরীফ’ টি অবস্থিত। পীরের নাম মুহাম্মাদ মহসিন আল-মঞ্জুর আবুল হাসান খানপুরী। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা তিনি কামেল পাশ। তার মৃত্যুর পর প্রতি বছর ১৯ শে ভাদ্র সেখানে ‘ওরস’ হয়ে থাকে। যেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাযার হাযার মানুষ আগমন করে।

আমরা যোহরের আযানের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে গিয়েছিলাম। ফলে দরগার কোন দায়িত্বশীলের সাথে কোন কথা হয়নি। তবে সেখানে কয়েকজন ভক্ত ও মুরীদ উপস্থিত ছিলেন। তারাই বললেন, খানপুরী পীর ছাহেব ফুরফুরা ও ছারছিনা তরীকার অনুসারী। প্রতি বছর সেখানে তারা যাতায়াত করে থাকে। সেখানে কয়েকজন মহিলা ও কয়েকজন পুরুষ ছাড়া কেউ ছিল না। তাদের নিকট থেকে জানা যায় যে, সেখানে তারা তাবীয নেওয়ার জন্য এসেছেন, কেউ এসেছেন অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রভৃতি। উল্লেখ্য যে, খানপুর মাযারে হিন্দু-মুসলিম সহ সকল শ্রেণীর মানুষের আগমন ঘটে থাকে।

পীর হয়ে উঠার কাহিনী :

কথিত আছে যে, পীর ছাহেব জনাব আবুল হাসান একজন বক্তা ছিলেন। সাধারণ জনগণের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। একদিন তাঁর পার্শ্ববর্তী গ্রামে ইসলামী সম্মেলন হচ্ছিল। সেখানে যাওয়ার আগে বাড়ীর সদস্যদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খড়ের সত্মূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বলে গেলেন। তিনি বক্তব্য দেওয়ার জন্য উঠলেন। নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হলেই তিনি বললেন, ‘আমার বাড়ীর খড়ের সত্মূপে আগুন ধরে গেছে’। বলা মাত্রই সকলেই ছুটে গিয়ে দেখল, সত্যি তো খড়ের সত্মূপে আগুন ধরেছে। মূলত তিনি ভেবেছিলেন মানুষের নিকট যদি পীর ছাহেবের কেরামতী ধরা পড়ে তাহলে সহজেই পীর হওয়া যাবে। এই জন্যই তিনি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। ফলে মানুষরা ভাবল, যদি তিনি পীর নাই হবেন, তাহলে আগুন ধরার কথা কিভাবে বললেন। শুরু হল তার বিনা পূঁজির লাভবান ব্যবসার অগ্রযাত্রা এবং শিরক-বিদ‘আতের উৎপাদন কারখানা। কতদিন তা বজায় থাকবে আল্লাহই ভাল জানেন।

৩. গুনাকরকাটি মাযার শরীফ :

সাতক্ষীরা আশাশুনি উপযেলার অন্তর্গত গুনাকরকাটি এলাকায় এই মাযার অবস্থিত। গুনাকরকাটি এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এর একটা ইতিহাস রয়েছে। যেটি আলো থেকে অন্ধকারের দিকে গমনের ইতিহাস। আগে ইতিহাসটি উল্লেখ করা যাক-

সাতক্ষীরার স্বনামধন্য ও প্রথ্যাত আলেমে দ্বীন গাযী মাখদূম হোসাইন ওরফে ‘মার্জ্জুম হোসেন’। তিনি সাতক্ষীরা যেলার সদর উপযেলাধীন ভালুকা চাঁদপুরের অধিবাসী ছিলেন। বৃটিশ ফরমানের মাধমে ব্যাপকভাবে ওয়াহ্হাবী ধরপাকড়ের হিড়িকের মধ্যেও গাযী মাখদূম হোসাইন দুর্বার সাহস নিয়ে শিয়ালকোটের এক মসজিদে রাফঊল ইয়াদায়েন করে ছালাত আদায় করেছিলেন। ফলে সাথে সাথেই তিন গ্রেফতার হয়ে যান। উল্লেখ্য যে, সেযুগে ছালাতে রাফঊল ইয়াদায়েন ছিল ‘ওয়াহ্হাবী’ ধরার জন্য একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ। অতঃপর যথারীতি বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে ফাঁসির দড়ি তিন তিনবার ছিড়ে গেলে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ভয় পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন। গাযী মাখদূম হোসাইন তাঁর একমাত্র সম্বল ১২০০ গ্রাম ওযনের তামার বদনাটি নিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে একসময় সাতক্ষীরার নিজ গ্রাম ভালুকা চাঁদপুর এসে পৌঁছেন ও পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহে আহলেহাদীছ আন্দোলনের দাওয়াত দিতে থাকেন। আজ সাতক্ষীরার গুনাকরকাটিতে পীরের যে আস্তানা হয়েছে, ওখানকার সমস্ত লোক এক সময় এই গাযী মাখদূম হোসাইনের ওয়ায শুনে ও কেরামতে মুগ্ধ হয়ে তাঁরই নিকটে ‘আহলেহাদীছ’ হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাতক্ষীরার আলীপুর গ্রামের মক্তবের শিক্ষক ‘পীর’ নামধারী জনৈক আব্দুল আযীযের প্ররোচনায় তারা পুনরায় ‘হানাফী’ হয়ে যায়। তবে যে বাড়ীতে ওয়ায হয়েছিল তারা সহ এখনো সেখানে মুষ্টিমেয় সংখ্যক আহলেহাদীছ আছেন ও তাদের একটি জামে মসজিদও রয়েছে (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪২১; দাওয়াত ও জিহাদ, পৃঃ ২০-২১)।

সুধী পাঠক! গুনাকরকাটি পীরের নাম- শাহ মুহাম্মাদ আব্দুল আযীয খুলনাভী। তিনি নকশাবন্দীয়া তরীকার অনুসারী ছিলেন। তার জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তবে তিনি স্ত্রী, ৬ ছেলে ও ২ জন মেয়ে সহ অসংখ্য ভক্ত, মুরীদান ও গুণগ্রাহী রেখে ১১ই রবীঊল আওয়াল মোতাবেক ২৯ আশ্বিন তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। সাতক্ষীরা যেলার দ্বিতীয় বৃহৎ মাযার হ’ল গুনাকরকাটি মাযার। সেখানে পীর ও পীরের স্ত্রী, সমত্মান-সন্ততি সহ তার গোষ্ঠী মিলে মোট ২৯টি মাযার রয়েছে। প্রতি বছর ৩রা ফাল্গুন ১৫ই ফেব্রম্নয়ারী মাযারে ওরছ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেখানে দেশী-বিদেশী বিশেষ করে ভারত, সঊদী আরব, লন্ডন সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮০০০ থেকে ১০০০০ ভক্ত ও মুরীদান উপস্থিত হয়। দেশ থেকে রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, চট্টগ্রাম সহ অধিকাংশ যেলা থেকে হাযার হাযার লোক উপস্থিত হয়। ওরছ উপলক্ষি্য সেখানে প্রায় ৪০-৫০টি গরু, ২০০-২৫০টি ছাগল যবেহ করা হয়। ২০০ মন চাউলের বিরানী রান্না করা হয়। যা ভক্ত ও মুরীদানদের মাঝে তবারক আকারে বিতরণ করা হয়। এখানেও ওরছের দিনে মীলাদ, ক্বিয়াম, পীরের জীবনী, যিকির, বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য ও কুরআন খতম হয়ে থাকে। এখানে সর্বদা দু’টি দান বাক্স রয়েছে। যেখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০-৪০ হাযার টাকা আয় হয়ে থাকে।

গুনাকরকাটি মাযারের বর্তমান পীর শাহ মুহাম্মাদ মিন্নাতুল্লাহ। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ গদীনশীল পীরের দায়িত্ব পালন করছেন। গুনাকরকাটি পীরের খলীফা ছিলেন ৪ জন। যথা : (১) হাজী মাহবুবুর রহমান, ইনি নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর বংশধর (২) মুখলেছুর রহমান (বর্মী) (৩) মুহাম্মাদ আলীমুদ্দীন (মুর্শিদাবাদী (৪) মাওলানা ইসলাম ছাহেব (চট্টগ্রাম)। উক্ত তথ্যগুলো মাযারের খাদেম জনাব খায়রুল ইসলামের নিকট থেকে গৃহীত। পূর্ণাঙ্গ মাযারটি তিনিই আমাদেরকে ঘুরে দেখান।

উল্লেখ্য, মাযার কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেখানে রয়েছে হাফেযী খানা, খায়েরিয়া আযিযিয়া কামিল মাদরাসা, খায়রিয়া আযিযিয়া ফাউন্ডেশন, জামে মসজিদ প্রভৃতি।

দৃশ্যাবলী :

দৃশ্য-১ : গুনাকরকাটি মাযারে প্রবেশ করা মাত্রই একটি দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। ২০-২২ বছর বয়সের একটি তরুণী ফুলের কিছু পাপড়ি নিয়ে মাথা নীচু করে বসে আছে। হাত দু’টি সামনে প্রসারিত, মাথাটি মাযার সংলগ্ন উঁচু করা বারান্দার সাথে লাগানো। মেয়েটি দীর্ঘক্ষণ সেখানে কান্না-কাটি করে ও মনের আশা-নিবেদন করে চলে যায়।

দৃশ্য-২ : মাযার সংলগ্ন সম্মুখ দিকে ২০-২৫ বর্গফুটের একটি জায়গা পাকা করে রাখা হয়েছে। সেখানে কেউ জুতা পায়ে উঠতে পারে না। আমরা গিয়ে সেখানে জুতা পায়ে উঠতেই কোথায় খাদেম লোকটি এসে আমাদেরকে বললেন যে, ‘ভাই আমরা ওখানে কেউ জুতা পায়ে উঠি না। আপনারাও উঠেন না’। ফলে তার জোরাজুরিতে মাটিতে জুতা রেখেই আবার উপরে উটলাম।

দৃশ্য-৩ : গুনাকরকাটি মাযার পরিদর্শন করে যখন ফিরে আসি, তখন মূল মাযার থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে আরেকটি একক মাযার দেখলাম। যেটা সবেমাত্র শুরু হচ্ছে। আশেপাশে বনজঙ্গল। তবে একটি বাড়ী রয়েছে। সেখানে দেখলাম জনৈক এক ভক্ত দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্দিরে যেমন হিন্দুরা দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের যেতে দেখে পার্শ্বের বাড়ী থেকে একজন লোক বেরিয়ে আসল। তাকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, এটি মূল পীরের চাচাতো ভাইয়ের মাযার। কিছুক্ষণ পর একটা অন্যরকম দৃশ্য দেখলাম। ৩০-৩২ বছরের জনৈক ব্যক্তি মাযারের নিকটে ঝোপঝাঁড় দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে গেল। ভালভাবে তাকাতে দিয়ে দেখি, তিনি সেদিকে পেশাব করছেন…।

৪. খানকায়ে খাস মুজাদ্দেদিয়া :

সাতক্ষীরা সদর উপযেলাধীন পৌরসভার অন্তর্গত মুনজিতপুর এলাকায় ‘খানকায়ে খাস মুজাদ্দেদিয়া’ অবস্থিত। যা ১৯৭৮ সালে স্থাপিত হয়। এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। কেননা এখানে স্বয়ং পীরে কেবলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। নেওয়া হয় তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। উল্লেখ্য যে, এখানে কোন মাযার নেই। সেকারণ মাযার কেন্দ্রীক যে শিরকী কার্যক্রমগুলো হয়ে থাকে সেগুলো থেকে এটা মুক্ত। যদিও মাটির নীচে প্রাণহীন মৃত পীরের চেয়ে জীবন্ত মানুষ পীরের ভক্তি-শ্রদ্ধা বহুলাংশে বেশী হয়ে থাকে। দৃশ্যতঃ হয় নানাবিধ শিরকী কর্মকা-। এখানে প্রতিবছর ২৭ শে সফর ওরছ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ৩০০০-৪০০০ পীরের ভক্ত, মুরীদান ও সালেকগণ উপস্থিত হন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার খানকার পক্ষ থেকেই করা হয়।

পীর ছাহেবের নাম মুহাম্মাদ আলী। জন্ম ১৯৪১ সালে। ১৯৫৭ সালে এস.এস.সি. পাশ করেন। কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬০ সালে। তিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী দফতরের গোয়েন্দা বিভাগ ‘ডিজিএফআই’-এর অধীনে চাকুরী করতেন। তিনি সাতক্ষীরা পৌরসভার সাবেক মেম্বার ছিলেন।  দীর্ঘ ৩৫ বছর চাকুরী জীবন শেষ করে বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। অত্র অঞ্চলে তিনি প্রায় ৩৭ বছর যাবত খানকা পরিচালনা করে আসছেন। সেখানে কোন মাযার নেই। তিনি নিজেই একজন স্বঘোষিত পীর। কথা হয়েছিল তার সাথে।

প্রশ্ন-১ : আপনার মৌলিক কাজ কি?

উত্তর : ক্বলব বা আত্মাকে যিন্দা করা। কেননা পবিত্র কুরআনে ১২৪টি আয়াত রয়েছে, যেখানে ক্বলবের ইছলাহ করার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন-২ : বর্তমান যারা গদীনশীল পীর রয়েছে তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কেমন?

উত্তর : আমার অভিমত হ’ল, তারা সকলেই ভ-, প্রতারক। কারণ তাদের মৌলিক কোন শিক্ষা নেই। তিনি বলেন, আমার অনেক প্রবন্ধ ইন্টারনেটে ছাড়া হয়েছে। যেখানে এই চ্যালেঞ্জ করেছি যে, ‘যে পীর ৪০ দিনের মধ্যে ক্বলবের ইছলাহ করে দিতে পারবেন, তিনিই প্রকৃত পীর। অতএব তোমরা তার কাছে গমন কর। আর যদি তা না পারে তাহ’লে সে প্রকৃত পীর নয়। বরং ভ- ও প্রতারক’। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৩৭-৩৮ বছর সমাজের মানুষের ক্বলবের ইছলাহ করে যাচ্ছি।

প্রশ্ন-৩ : আপনার খানকায়ে ভক্ত, মুরীদান ও সালেকরা এসে কি করে থাকেন?

উত্তর : ক্বলবের ইছলাহ করে। প্রতিদিন বাদ মাগরিব এখানে অত্যন্ত ভদ্র ও সহনশীলতার সাথে তারা মুরাকাবা মুশাহাদা করে থাকে। যিকির-আযকার বেশী বেশী করে। তবে কোন ওয়ায-নছীহত হয় না। তিনি আরো বলেন, আমার এই খানকায়ে যিকির উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা হয় না। বরং অনুচ্চ স্বরে করা হয়। তবে তারা নিজেদের বাড়ীতে উচ্চৈঃস্বরে যিকির-আযকার করে থাকে। আমার এখানে এসে তারা ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলে যিকির করে থাকে। কেননা অত্যন্ত ধ্যানমগ্ন হয়ে এই যিকির ৪০ দিন করলে তার ক্বলবের ইছলাহ হ’তেই হবে। তিনি আরো বলেন, ইসলামের দলীল চারটি। কুরআন, হাদীছ, ইজমা ও ক্বিয়াস। কিন্তু আমি বলি, ইসলামের দলীল পাঁচটি। উপরোক্ত চারটি সহ পঞ্চমটি হ’ল প্রাকটিক্যাল। যেমন বিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্রদের ব্যাঙ বা অন্যান্য প্রাণী কেটে প্রাকটিক্যাল শেখানো হয়ে থাকে। তেমনি ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাতের পরে ক্বলবের ইছলাহ হ’ল প্রাকটিক্যাল। যা সকলের জন্য আবশ্যক।

প্রশ্ন-৪ : ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলে যিকির করে ক্বলবের ইছলাহ হওয়ার ব্যাপারে ফলাফল পেয়েছেন কি?

উত্তর : হ্যাঁ, অবশ্যই। যারা আছেন তাদের নিকট থেকে শুনে দেখুন। উল্লেখ্য যে, যশোর যেলার মনিরামপুর থেকে ৬৫ বছর বয়সী নওশের আলী নামের একজন সালেক উপস্থিত ছিলেন। তিনিও তার পীর ছাহেবের ব্যাপারে ভাল ধারণা রাখেন। যিনি এসছেন তার ক্বলবের ইছলাহ করার জন্য।

প্রশ্ন-৫ : আপনি ক্বলবের ইছলাহের যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তো কতজনের মত মুরীদ বা সালেক রয়েছে আপনার?

উত্তর : হাযার হাযার, অসংখ্য। তবে আগে খাতায় তাদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখতাম। কিন্তু পর্যায়ক্রমে ভক্তের সংখ্যা এতবেশী হ’তে লাগল যে, তথ্য সংগ্রহ করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে ফুরফুরা তরীকা থেকে অনেক ভক্ত আমার কাছে আছে। এইতো আগামী ১০ তারিখে বিমানযোগে দিলস্নী যাব। সেখানে কিছু ভক্ত, মুরীদ ও সালেক রয়েছে। যদিও গুজরাট থেকে আহবান এসেছিল। কিন্তু আমি সেখানে যাব না। এভাবেই চলছে আমার ক্বলবের ইছলাহের কার্যক্রম।

প্রশ্ন-৬ : অন্যান্য পীরের মাযার, খানকা বা দরগায় দেখা যায় যে, সেখানে অনেক খাদেম, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি রয়েছে। এরকম কোন কিছু আপনার এখানে আছে কি-না?

উত্তর : আমার কোন নির্দিষ্ট খাদেম ও প্রতিষ্ঠান নেই। তবে  প্রতিষ্ঠান করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পারিনি।

প্রশ্ন-৭ : বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত খানকা, মাযার ও দরগা রয়েছে সেখানে মানুষ নিজের মনের আশা পূরণের জন্য মানত করে, সেজদা করে, পীরের হাত-পায়ে চুম্বন দেয় এই সমস্ত কার্যক্রমগুলো কিংবা মাযার কেন্দ্রীক যে সমস্ত শিরক-বিদ‘আত হয়ে থাকে সেগুলো আপনার এখানে হয় কি-না?

উত্তর : এক কথায় না। কেননা এখানে কোন মাযার নেই। সুতরাং মাযার কেন্দ্রীক কোন শিরক-বিদ‘আত এখানে সংঘটিত হয় না।

প্রশ্ন-৮ : আপনার যারা মুরীদ হয়েছে তারা কি অন্য কোন পীরের কাছে চলে যায়?

উত্তর : যায়। তবে এখানে যা পায় অন্যস্থানে তা না পেলে আবার চলে আসে কিংবা ছেড়ে দেয়। ফলে সে বিপদগামী হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমার এখানে অনেক কষ্ট আছে। কেননা অন্য পীরেরা যেমন খানবাহাদুর আহছানুল্লাহ, গুনাকরকাটি সহ অন্যান্য পীরেরা তাদের মুরীদকে বলেন যে, তোমরা বায়‘আত কর, তাহ’লে পীর ছাহেব তোমাদের মৃত্যুর পর তোমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমি আমার মুরীদানদের বলেছি যে, আমি তোমাদের পথ বলে দিবে। কোন্ পথে গেলে তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে। সেই পথে তোমাদের আসতে হবে। তাহ’লেই জান্নাত পাওয়া যাবে। ফলে অনেক কষ্ট হয়। তাই যারা কষ্ট করতে পারে তারা থাকে, না হয় চলে যায়।

প্রশ্ন-৯ : এই যে দেখলাম, জনৈক এক ভক্ত এসে আপনার পায়ের সামনে দুই হাঁটু গেড়ে বসে গেল। অতঃপর অতি ভক্তির সাথে দু’হাত দিয়ে আপনার পা ও পায়ের উপর-নীচ ঘষে ঘষে সেই হাত তার সমস্ত মুখে মুছল। আর আপনাকে নিয়ে বিভিন্ন রকম আধ্যাত্মিক সব কথাবার্তা বলল। এগুলো কি শিরক-বিদ‘আত নয়, না-কি আপনার দৃষ্টিতে এগুলো সঠিক?

উত্তর : যেটা বৈধ সেটা করলে তো সমস্যা নেই। এটা ইসলাম স্বীকৃত পদ্ধতি। কদমবুচী করা তো জায়েয। তাছাড়া দেখার বিষয় হ’ল, সে নিজেকে স্যালেন্ডার করতে পারল কি-না? কেননা সে নিজে একজন বড় অফিসার। অতএব সে বিনয়ী ও আত্মসমর্পিত কি-না এটাই মূল দেখার বিষয়। উল্লেখ যে, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় যে, এই পীরের ভক্তরা তার হাত-পায়ে চুম্বন দেয়। এমনকি জিহবা দিয়ে পীরের হাত-পা চেটে চেটে ফয়েয নিয়ে থাকে। নাঊযুবিল্লাহ।

৫. চম্পা মায়ের দরগা :

সাতক্ষীরা যেলার সদর থানাধীন লাবসা ইউনিয়নের কদমতলা ব্রীজের উত্তর-পশ্চিম কোণায় সাতক্ষীরা-যশোর রোডের পার্শ্বে মহিলা পীর ‘চম্পা মায়ের দরগা’ অবস্থিত। এটি ঠিক কত সালে অবস্থিত তা কেউ বলতে পারে না। দরগার একজন ভক্ত, স্থানীয় কবিরাজী চিকিৎসক এবং চম্পা মায়ের দরগা পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারী জনাব কাযী যাকির হোসেন বলেন, ‘উক্ত মহিলা একজন সৎ এবং ইবাদত গুজার মহিলা ছিলেন। তবে তিনি যে খাছ আল্লাহ্র ওলীনি ছিলেন এটার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই’। তিনি বলেন, ‘আমি বলছি তো আমার গায়ে পশম ঠা-া হয়ে আসছে। আসলে এ সমস্ত আল্লাহ্র ওলীদের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে বেয়াদবী হয়ে যায়’।

অতঃপর তিনি বলেন, ‘হযরত চম্পা মা এমন দ্বীনদার ও পরহেযগার মহিলা ছিলেন যে, তিনি যখন ছালাত আদায় করতেন, তখন সুন্দরবনের বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এসে তাকে পাহাড়া দিত। তাছাড়া যার ব্যাপারে প্রফেসর মুহাম্মাদ আলী ‘ব্যাঘ্রতট’ শিরোনামে ৭৭৮ পৃষ্ঠা ব্যাপী একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন’। তিনি বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার এখানে ভক্তরা এসে নফল ছালাত আদায় করে, দো‘আ করে, মুনাজাত করে। হাঁস, মুরগী, ছাগল ও ছাগলের দুধ সহ প্রভৃতি মানত করে থাকে। কান্না-কাটি করে। দান করে’।

সুধী পাঠক! চম্পা মায়ের দরগাটি মূলত একটি মাটির ঘর। তার দক্ষিণ ও পশ্চিম  দিকে একটি করে মাটির বারান্দা রয়েছে। ছাউনি রয়েছে টালি বা খোলা দিয়ে। ঐ ঘরের ঠিক মাঝখান বরাবর মাযারটি অবস্থিত। ঘরটি সর্বদা বন্ধই থাকে। পাশেই একটি বিরাট বটগাছ। তার নীচে ভক্তরা এসে রান্না-বান্না করে খায়। দরগা কেন্দ্রীক একটি মসজিদ রয়েছে এবং দরগাকে সামনে রেখে স্থানীয় মুসলিমরা সেখানে প্রতিবছর ঈদের জামা‘আতের ছালাত আদায় করে থাকে। মহিলা পীরের মর্যাদা ও সম্মান বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব সেক্রেটারী বলেন, ‘প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা আছে, কোন একদিন জনৈক ব্যক্তি স্যান্ডেল পায় দিয়ে উক্ত ঘরের বারান্দায় ওঠে। ফলে কিছুদিন পর সে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সে পূর্ণাঙ্গ পঙ্গুতে পরিণত হয়ে যায়। মুখ একদিকে বেঁকে যায়। কথা বলতে পারত না। এটাই আসলে আল্লাহ্র ওলীদের কেরামতী’।

যাইহোক, জনাব সেক্রেটারীর সাথে সাক্ষাতের পর বাইরে এসে সঙ্গী হাফীযুর রহমান ভাই বললেন, ‘চলেন আজ স্যান্ডেল পায় দিয়েই ওখানে ওঠব। দেখি কার কথা বন্ধ হয়ে যায়, কে পঙ্গু হয় আর কার মুখ বেঁকে যায়’?। অতঃপর আমরা দু’জনে স্যান্ডেল পায়ে দুই বারান্দা ঘুরে আসি। যদি ঘরের দরজা খুলা থাকত তবে ভিতরেও প্রবেশ করতাম। মূলত এটা ছিল নীরব প্রতিবাদ ও জঘন্যতম ঘৃণা প্রকাশ মাত্র।

জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র : 

দেশে বিরাজমান মাযার, খানকা ও দরগাগুলো সবই মূলত জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র। এটা বিনা পূঁজির ব্যবসা। প্রচুর রোজগার। ভক্ত জনসাধারণের প্রদত্ত মানত, বখশীশ, দান-ছাদাক্বা সবই দায়িত্বপ্রাপ্ত পীর, খাদেম ও অন্যান্যদের মাঝে বণ্টন হয়ে থাকে। যদিও কোন কোন মাযারে কিছু সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে অধিকাংশ মাযার ও খানকায় প্রদত্ত টাকা-পয়সা, মানত করা হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল প্রভৃতি সবই মাযারের অন্তর্ভুক্ত পীর, খাদেম, মুরীদ ও সালেকদের মাঝে বণ্টন হয়। এই বণ্টন নিয়েও কোন কোন ক্ষিত্রে সহিংসতা হ’তে দেখা যায়। মাযার কেন্দ্রীক ব্যবসা খুব লাভজনক ব্যবসা। যেমন নলতা মাযারে সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মীলাদ থেকে হাযার হাযার টাকা আয় হয়। শুধু তাবীয বিক্রয় করা হয় হাযার হাযার টাকার। তাছাড়া ঝাঁড়-ফুঁক, বরকত, ফয়েয, তবারক তো রয়েছেই। ফলে মূর্খ, অশিক্ষিত দেশের সাধারণ মুসলিম জনগণের টাকা নিয়ে গদীনশীল পীরেরা রূপকথার এক আশ্চর্যজনক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। পীর বা খাদেমরা নামিদামী অত্যন্ত বিলাসবহুল এসি প্রাইভেট গাড়ীতে ঘুরে বেড়াই। ঢাকায় কয়েকটা করে বাড়ী, কয়েক বিঘা জমি কিনে তারা অধিকাংশ সময় মাযারে অবস্থান না করে তাদের বিলাসবহুল বাড়ীতে সময় কাটান। অন্যদিকে পীরের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে বিদেশের মাটিতে। কেউ আমেরিকায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ জাপান প্রভৃতি দেশে। এই তো ধর্মের লেবাসধারী তথাকথিত বুযর্গানে দ্বীন, মুক্তির কা-ারী, সুফারীশের ধারক-বাহক, জান্নাতের অছীলা নামক পরিচিত পীর ও খাদেমদের আসল চেহারা, উন্মোচিত ভয়ঙ্কর রূপ, ইবলীসি প্রতারণা ও শয়তানী কুমন্ত্রণার ছলনার মুখোশ। অতএব সাবধান!

পর্যালোচনা :

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। অথচ পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও সর্বোত্তম আদর্শ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মুসলিমগণ বিভিন্ন অন্যায় কাজের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করে থাকে। যেমন মৃত মানুষ, গরু, সূর্য, চন্দ্র, মূর্তি, দেবতা, লাশহীন পাকা কবর, খাম্বা, শিখা অনির্বাণ, শিখা চিরন্তন, শহীদ মিনার, রাশিফল, গণক, জ্যোতিষী সহ নানাবিধ শিরকী মাধ্যম। অথচ তারা তাদের নিজের জন্য যেমন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না, অনুরূপ অন্যের জন্য তো অসম্ভব। যেমন-

নূহ (আঃ)-এর যুগে তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের হাতে গড়া পাঁচজন সম্মানিত মৃত ব্যক্তির মূর্তি তৈরি করেছিল এবং আল্লাহ্র রাযী-খুশি করার জন্য তাদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি তিনি তাঁর উম্মতদেরকে রাত-দিন প্রায় দুইশ’ বছর দাওয়াত দেন। কিন্তু কোন কাজে আসেনি। অবশেষে মহাপস্নাবন দিয়ে নূহের হঠকারী উম্মতকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

ইবরাহীম (আঃ)-এর উম্মত সূর্য, চন্দ্র, তারকা, নক্ষত্র ও মূর্তিকে পূজা করত। শিরকের শিখ-ীরা ছিল সদা জাগ্রত। নিজেদের হাতে গড়া মূর্তির নিকট তারা তাদের আশা-আকাংখা ও নযর-নেয়ায পেশ করত। জীবনের সকল ক্ষেত্রে সবটুকু আকুতি-মিনতি ও ইবাদত মূতিূর নিকট পেশ করত। অথচ ইবরাহীম (আঃ) তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনটাই অতিবাহিত করেছেন শিরকের বিরুদ্ধে আপোসহী তাঁকে। নিজের প্রাণাধিক সমত্মানকে জনমানবশূন্য বিরামহীন এক মরুভূমির নিকট রেখে আসতে কুণ্ঠাবোধ করেননি আল্লাহ্র নির্দেশের সামনে।

মূসা (আঃ)-এর গোত্র বানী ইসরাঈল নামে পরিচিত। তাদের মাঝে তিনি দীর্ঘদিন দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ্র রহমতে ফেরআঊনের কবল থেকে রক্ষাও করেছেন। কিন্তু তারাই আবার আল্লাহকে বাদ দিয়ে গরুকে তাদের প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছিল। এমনকি অসংখ্য নবীকে নির্মমভাবে হত্যাও করেছিল। কুসংস্কারে ভর্তি ছিল তৎকালীন সমাজ। তারা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে হঠকারী, অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট জাতি।

অতঃপর বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আবির্ভাব এমন সময় হয়েছিল, তখনকার অবস্থা ছিল আরো ভয়ঙ্কর ও বিপদসঙ্কুল। বর্বরতা, বন্যতা ও কুংস্কার এত পরিমাণ ছিল যে, উক্ত যুগকে ‘জাহেলিয়াতের যুগ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। সে যুগে মানুষ আল্লাহকে প্রভু, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, মৃত্যুদাতা, জন্মদাতা, রিযিক্বদাতা প্রভৃতিতে আকুণ্ঠ বিশ্বাসী ছিল। তারা তাদের নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুল মুত্তালিব, আব্দুর রহমান ইত্যাদি রাখত। কিন্তু এরপরেও তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কারণ তাওহীদে উলূহিয়্যাত বা আল্লাহ্র ইবাদত করতে তারা রাযী ছিল না। তারা নেকী অর্জন করতে চাইতো কিন্তু পাপ বর্জন করত না। অথচ নেকী অর্জন করার পূর্বশর্ত হ’ল পাপ বর্জন করা। তারা তাদের যাবতীয় আশা-আকাংখা, নযর-নেয়ায পেশ করত তাদের হাতে গড়া মূর্তির নিকটে। তারা মূর্তিপূজা ও তারকাপূজায় লিপ্ত ছিল। জীবনের সকল ক্ষেত্রে সবটুকু আকুতি-মিনতি ও ইবাদত শুধুমাত্র একক মহান আল্লাহ তা‘য়ালার জন্য নিবেদিত করতে হবে এই বিশ্বাসে তারা মোটেও বিশ্বাসী ছিল না। তাই তারা পৃথিবীর ইতিহাসে মুশরিক ও কাফির নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

সুধী পাঠক! বর্তমান যুগও জাহেলিয়াতের সেই কঠিন ও দুর্দশাগ্রস্ত সমাজ থেকে কোন অংশে কম দুর্দশাগ্রস্ত নয়। তারা তাদের যাবতীয় মনের কামনা-বাসনা মূর্তির নিকট পেশ করত। আর আমরা খানকাহ, মাযার, দরগাহ ইত্যাদি স্থানে পীর বাবার নিকটে গিয়ে তার কাছ আমাদের যাবতীয় নযর-নেওয়াজ পেশ করছি। তাদের থেকে একধাপ এগিয়ে আমরা পীরের দরগাহে গিয়ে তাদের সামনে সিজদায় লুটে পড়ছি। তাদের হাতে ও পায়ে মহববতের চুমু দিচ্ছি। তাদের নিকট কুরবানী পর্যন্ত প্রদান করছি। জীবনের সকল ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, উন্নতি-অবনতি সহ সব ক্ষিত্রে তাদের দো‘আ ও আশীর্বাদের উপর অন্ধভাবে নির্ভর করছি। সেখানে গিয়ে পাপ মোচনের আশায় কান্না-কাটি করছি, সেজদায় মাথা নওয়াচ্ছি। অথচ ইসলামে এটা পরিষ্কার শিরক। শিরকের গুনাহ আল্লাহ কখনও ক্ষমা করেন না এবং তার চিরস্থায়ী ঠিকানা হয় জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন।

‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সঙ্গে শরীক করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। তবে তিনি চাইলে ইহা ব্যতীত অন্য পাপ ক্ষমা করতে পারেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সঙ্গে শরীক করবে, সে দূরতম পথভ্রষ্ট হবে’ (নিসা ৪/১১৬ ও ৪৮)।

‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সঙ্গে শরীক স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার স্থান হবে জাহান্নামে। আর এরূপ অত্যাচারীর জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না’ (মায়েদাহ ৫/৭২)।

জাবের (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) একদা বলেন, দু’টি বিষয় অপরিহার্য। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! উক্ত দু’টি বিষয় কী? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শরীক করে মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[2]

জাবের (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[3]

উদাত্ত আহবান :

হে মুসলিম উম্মাহ! শিরক পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ। যার বিরুদ্ধে প্রাণপন সংগ্রাম করেছেন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) সহ সকল নবী ও রাসূল। তাঁরা শিরক ও কুসংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত করে গণবিপস্নব তৈরি করেছিলেন। ফলে যাবতীয় শিরক ও শিরকের শিখ-ীদেরকে নসাৎ করে নির্ভেজাল তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অতএব শিরক প্রতিরোধ করতে ঐক্যবোধ্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

হে তরুণ ছাত্র সমাজ! তুমি তো বিশ্ব বিজয়ী ইসলামের অনুসারী মুসলিম। উন্নত, প্রশংসিত ও দিগ্বীজয়ী আদর্শের অনুসারী তো তুমিই। তাহ’লে তোমার শরীরে কেন আজ শিরক-বিদ‘আতের দুর্গন্ধ? তুমি কেন মাযার-খানকা-দরবারের প্রতি অনুরক্ত? তুমি না ইবরাহীমের উত্তরসূরী, আলীর মত তারুণ্যদীপ্ত,  হামযার মত সাহসি, মুছ‘আবের মত সত্যনিষ্ঠ ও নিবেদিত প্রাণ, খালিদের মত বীরসেনানী, ওমরের মত দৃঢ়চিত্ত, খোবায়েবের মত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, বেলালের মত মযবুত ঈমানের অধিকারী, হানযালার মত আত্মনিবেদিত, তারেক বিন যিয়াদ ও মূসা বিন নুসায়েরের ন্যায় বীরযুদ্ধা। তুমি তো ক্লান্ত নয়, তুমি নীরব দর্শকও নয়! তাহ’লে কি তুমি ভীরু-কাপুরুষ! না-কি ইহুদী-খ্রীষ্টানদের পক্ষির শক্তি! না-কি দুনিয়াদার নেতৃবৃন্দের খোরাক!

হে আহেলহাদীছ সমাজ! অভ্রান্ত সত্যের চূড়ান্ত উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিঃশর্ত অনুসারী তো তোমরাই। তোমরাই তো শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধে আপোসহীন ভূমিকা পালন করে থাক। তোমরাই তো বিশ্ব মানবতার নিকটে হক্বপন্থী বলে স্বীকৃত। নির্ভেজাল তাওহীদ ও বিশুদ্ধ সুন্নাত তো তোমারই বক্ষি। শিরকের শিখ-ী ও বিদ‘আতী শয়তানদের শিকড় উপড়ে ফেলা তো তোমারই দায়িত্ব। তাহ’লে আজ কেন তোমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছ? তোমরা কি ভীতু, সন্ত্রস্ত; না-কি শক্তি ও বিবেকহীন জড় পদার্থ! অতএব আর বসে থাকার সময় নেই। সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় একক নেতৃত্বের অধীনে সংঘবদ্ধ শক্তিতে জাগ্রত হও। আসুন! সমস্ত মত-পথ-ষড়যন্ত্র-সংঘাত-হিংসা-ঈর্ষা নির্বিশেষে ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’-এর পতাকাতলে সমবেত হয়ে শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামে নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্ত করি। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!

– বযলুর রহমান ও হাফীযুর রহমান


[1] উইকিপিডিয়া/সাতক্ষীরা।

[2] ছহীহ মুসলিম হা/২৭৯, ১/৬৬ পৃঃ, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪২; মিশকাত হা/৩৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৩৪, ১ম খ-, পৃঃ ৩৪, ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[3] ছহীহ মুসলিম হা/২৮০, ১/৬৬ পৃঃ, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪২।


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

১টি মন্তব্য

  1. সূরা নেসার 18 নম্বর আয়াত অনুসারে উপরের যত আলোচনা হয়েছে সবগুলোই কোরআন বিরোধী।মৃত্যুর আগে যেহেতু কোন দোয়া কবুল হয় না তওবা কবুল হয় না, অতএব মৃত্যুর পর কারোর জন্য কোন দোয়া কবুল হয় না। কে ভালো কে মন্দ কে আল্লাহর পথে আছে কেউ উদার পথে আছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না ১৭(৮৪) আল্লাহ মানুষের মনের খবর রাখেন। কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে জীবিত থাকাকালীন খারাপ কাজ করলো বা করেছে কিনা সেটা আল্লাহই ভাল জানেন তার মনের খবর আল্লাহ রাখেন আড়ালের খবর আল্লাহ রাখেন এবং সেই অনুযায়ী তার আমলনামায় তৈরি হয়েছে, শেষ বিচারের দিনে তার আমলনামা।
    আমলনামা বা কাজের রেকর্ড অনুসারে বিচার করা হবে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আমলনামা
    জমা পড়ে যায়, ওই আমলনামায় আর নতুন করে কিছু যোগ হয় না তাই ইল্লিন সিজিনে জমা হয়ে যায়। এটাই কোরআন বলে, অতএব এই সংক্রান্ত যত হাদিস আছে সবগুলো কোরআন সমর্থিত নয়।

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন
Close
Back to top button