আকাইদ

মুহাম্মাদ (ছাঃ)-ই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, আমরা তাঁর রাসূলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না (বাক্বারাহ ২/২৮৫)। মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা রাসূলদের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না। তিনি আরো বলেন, যে বলে আমি ইউনুস বিন মাত্তা চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সে মিথ্যুক- ইত্যাদি হাদীছগুলো দিয়ে অনেকেই আম জনসাধারণের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করছে যে, সকল রাসূল মর্যাদাগতভাবে সমান এবং আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মনে করা একটি ভ্রান্ত আক্বীদা (নাউযুবিল্লাহ)

যেহেতু এই দলীলগুলো আপাতদৃষ্টিতে তাদের মতকে সমর্থন করে, সেহেতু অনেকেই এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। তাই পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী আলোচ্য প্রবন্ধে এই আয়াত ও হাদীছগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়া নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল :

সকল নবীর ফযীলত মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, সকল নবীকে এমন কিছু ফযীলত দেয়া হয়েছে, যা অন্য নবীদেরকেও দেয়া হয়েছে। যেমন মূসা (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। তেমনি মি‘রাজে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথেও তিনি কথা বলেছেন। দ্বিতীয়ত, কতিপয় নবীকে এমন কিছু ফযীলত দেয়া হয়েছে, যা অন্য নবীদেরকে দেয়া হয়নি। কিন্তু এই ফযীলত তাঁর অন্য নবীদের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করেনা। এই রকম ফযীলত আমাদের নবীসহ অন্য অনেক নবীকেই দেয়া হয়েছে। যেমন ঈসা (আঃ)-কে বিনা পিতায় সৃষ্টি করা তার জন্য খাছ ফযীলত, যা অন্য নবীদেরকে দেয়া হয়নি।

এজন্য আমি রাসূল (ছাঃ)-এর এই ধরনের ফযীলত নিয়ে আলোচনা করব না। আজকের আলোচনাতে মূলত রাসূল (ছাঃ)-এর ঐ সমস্ত ফযীলতের আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ, যা তাঁর অন্য নবীদের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

কুরআন থেকে দলীল :

১. মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُوْنَ.

‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত, যাদেরকে মানুষদের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে বাঁধা প্রদান করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করবে। যদি আহলে কিতাবরা ঈমান আনত তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হ’ত। (অর্থাৎ তারা এই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত)। তাদের মধ্যে কিছু মুসলমান এবং অধিকাংশই ফাসেক’ (আলে ইমরান ৩/১১০)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করিনা মর্মে লিখিত একটি বইয়ে বলা হয়েছে যে, এখানে তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত বলে শুধু রাসূল (ছাঃ)-এর উম্মাত উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রত্যেক উম্মাতের মুমিনগণ উদ্দেশ্য।

আসুন আমরা দেখি সালাফে ছালেহীন এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উম্মাত বলতে কোন উম্মাত উদ্দেশ্য নিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এই বইয়ে সম্পূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হয়নি। শুধু আয়াতের প্রথম অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। যদি আমরা সম্পূর্ণ আয়াত পড়ি এবং আয়াতের আগের ও পিছনের আলোচনা- যাকে আরবীতে সিয়াক ও সাবাক বা পূর্বাপর সম্পর্ক বলা হয়- দেখি, তাহলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, আল্লাহ উম্মাত দ্বারা উম্মাতে মুহাম্মাদীকে বুঝিয়েছেন। কেননা আল্লাহ আয়াতের সাথেই এটা বলেছেন যে, যদি আহলে কিতাব ঈমান নিয়ে আসত তাহলে তাদের জন্য কল্যাণ হত। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, তারা এই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই আয়াতের পরেই আল্লাহ ইহুদী সম্প্রদায়কে অভিশপ্ত সম্প্রদায় বলেছেন। এর দ্বারাও বুঝা যায় তারা শ্রেষ্ঠ উম্মাত নয়। এর পরেও আমরা হাদীছ ও সালাফে ছালেহীনের ব্যাখ্যা পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূল (ছাঃ) থেকে একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যেখানে স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করছেন এভাবে- إِنَّكُمْ تُتِمُّوْنَ سَبْعِيْنَ أُمَّةً أَنْتُمْ خَيْرُهَا وَأَكْرَمُهَا عَلَى اللهِ ‘তোমরা উম্মতের সংখ্যা সত্তর পূর্ণ করছ। তোমরাই এই সত্তর উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে সম্মানিত’।[1]

এবার আমরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সালাফে ছালেহীনের কথা দেখব। এই আয়াত পেশ করার পর ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন,يخبر تعالى عن هذه الأمة المحمدية بأنهم خير الأمم فقال : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ ‘আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতে মুহাম্মাদিয়া সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা সকল উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ। তাই তিনি বলেছেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত যাদেরকে মানুষদের জন্য বের করা হয়েছে’।[2] এরপর ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন,

وإنما حازت هذه الأمة قَصَبَ السَّبْق إلى الخيرات بنبيها محمد صلى الله عليه وسلم، فإنه أشرفُ خلق الله أكرم الرسل على الله، وبعثه الله بشرع كامل عظيم لم يُعْطه نبيًّا قبله ولا رسولا من الرسل-

‘এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হচ্ছে, এই উম্মতের রাসূল শ্রেষ্ঠ। কেননা তিনি আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে সম্মানিত এবং নবীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহ তাঁকে এমন পূর্ণ শরী‘আত দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যা তাঁর পূর্বে অন্য কোন নবী-রাসূলকে দেননি।[3] ইবনে কাছীর (রহঃ)-এর এই কথা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এখানে উম্মত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়া উদ্দেশ্য এবং এর শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হচ্ছে, এই উম্মতের নবী (ছাঃ) সকল নবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাসূল।

এরপর ইবনে কাছীর (রহঃ) দলীল হিসাবে একটি হাদীছ পেশ করেন, وَجُعِلَتْ أُمَّتِي خَيْرَ الأمَمِ ‘আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত করা হয়েছে’।[4]

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাওকানী (রহঃ) তাঁর বিশ্বসেরা তাফসীর গ্রন্থে বলেন, يَتَضَمَّنُ بَيَانَ حَالِ هَذِهِ الْأُمَّةِ فِي الْفَضْلِ عَلَى غَيْرِهَا مِنَ الْأُمَمِ ‘এই আয়াত উম্মতে মুহাম্মাদিয়া অন্য উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠ এই বিষয়ের আলোচনাকে শামিল করেছে’।[5]

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী তাঁর তাফসীরে জালালাইনে এই আয়াতে কাকে সম্বোধন করা হয়েছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, كُنْتُمْ يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ فِيْ عِلْمِ الله تَعَالَى خَيْرَ أُمَّةٍ ‘তোমরা হে উম্মতে মুহাম্মাদী! আল্লাহর জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ উম্মত’।

এই আয়াতের তাফসীরে প্রায় সকল সালাফে ছালেহীন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার অনেক কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন, এই উম্মতের সত্তর হাযার মানুষ বিনা হিসাবে জন্নাতে যাবে।[6]

মোদ্দাকথা, উম্মতে মুহাম্মাদী সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। কেননা তাদের নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। এখন কেউ যদি সালাফে ছালেহীন ও রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যাখ্যা থেকে সরে এসে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করে তাহলে তাঁর হিসাব আল্লাহর কাছে।

প্রশ্ন হতে পারে যে, উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠ হওয়া থেকে কিভাবে সাব্যস্ত করা যায়, মুহাম্মাদ (ছাঃ) শ্রেষ্ঠ রাসূল? এর উত্তরে বলা যায়, উম্মতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার সাথে সেই উম্মতের নবীর শ্রেষ্ঠত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জিনিসটা বুঝার জন্য আমরা কয়েকটি হাদীছ পেশ করতে চাই। মি‘রাজের রাত্রে যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ) মূসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মূসা (আঃ) কাঁদছিলেন। তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, أَبْكِىْ لِأَنَّ غُلاَمًا بُعِثَ بَعْدِىْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِهِ أَكْثَرُ مِمَّنْ يَّدْخُلُهَا مِنْ أُمَّتِىْ- ‘আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পরে একজন যুবককে নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছে যার উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে বেশী জান্নাতে যাবে’।[7] এখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের সাথে নবীর শ্রেষ্ঠত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তা না হ’লে ইহুদী সম্প্রদায় জান্নাতে কম যাবে এতে মূসা (আঃ)-এর দুঃখ করার কি আছে?

এজন্যই আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেছেন, تَزَوَّجُوا الْوَدُوْدَ الْوَلُوْدَ فَإِنِّىْ مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ ‘তোমরা অধিক সন্তান প্রসবকারী মেয়েকে বিবাহ কর। কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে কিয়ামতের মাঠে গর্ব করব’।[8]

তিনি আরও বলেন, إِنِّىْ مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ فَلاَ تَقْتَتِلُنَّ بَعْدِى ‘তোমরা পরস্পরে মারামারিতে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমি তোমাদের নিয়ে গর্ব করব’।[9] অন্য হাদীছে স্পষ্ট এসেছে যে, তিনি অন্য নবীদের সাথে গর্ব করবেন।[10]

এজন্যই তো মহান প্রতাপশালী আল্লাহ যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলবেন মাথা উঠাও! যা চাওয়ার চাও দেওয়া হবে, তখন তিনি বলবেন, উম্মাতী উম্মাতী।[11] তাঁর উম্মত নিয়ে চিন্তিত হওয়ার এত কি দরকার? এজন্য তিনি উম্মতকে প্রতি আযানের শেষে তাঁর জন্য মাকামে মাহমূদের জন্য দো‘আ করতে বলেন। কেননা মাকামে মাহমূদ পাওয়া যেমন রাসূল (ছাঃ)-এর গর্ব, তেমনি উম্মতের গর্ব। এক কথায় উম্মত ও সেই উম্মতের নবীর শ্রেষ্ঠত্ব পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই যখন কুরআন থেকে এই কথা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, উম্মতে মুহাম্মাদী সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। তখন অবশ্যই এটাও প্রমাণিত হয়ে গেল যে, এই উম্মতের নবীও শ্রেষ্ঠ। আর কেনই বা নয়? যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের নেতা তিনি কেন সর্বশ্রেষ্ঠ হবেন না? যদি সর্বশ্রেষ্ঠ না হন তাহ’লে তো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের নেতা বা নবী হওয়ার যোগ্যতা নেই (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ আমাদের এহেন ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে রক্ষা করুন। এরপরেও যদি কারো বুঝে না আসে এবং সে বলতে চায় যে, সকল উম্মত এবং নবী সমান তাহ’লে আপনি তাকে আল্লাহর কাছে দো‘আ করতে বলেন, আল্লাহ যেন তাকে ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের সাথে কিয়ামতের মাঠে উঠান!

এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ হওয়ার আরেকটি সহজ দলীল হচ্ছে, ঈসা (আঃ) যখন আসমান থেকে নামবেন তখন ইমাম মাহদী তাকে ইমামতি করতে বলবেন। কিন্তু তিনি এই উম্মতের সম্মানে ইমামতি করাবেন না।[12] যেখানে একজন নবী এই উম্মতের সম্মানে এরূপ করবেন, তাহ’লে সেই উম্মতের নবী কত মহান হতে পারেন। অতএব এটাই সত্য যে, সকল উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ উম্মত উম্মতে মুহাম্মাদী এবং সকল নবীর মাঝে শ্রেষ্ঠ মুহাম্মাদ (ছাঃ)।

২. রাসূল (ছাঃ)-এর নামে কসম। মহান আল্লাহ দুনিয়ার কোনও মানুষের নামে কসম খান নি একমাত্র আমাদের রাসূল ব্যতীত। তিনি বলেন لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِيْ سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُوْنَ ‘আপনার জীবনের কসম! নিশ্চয়ই তারা আনন্দ-উল্লাসে মত্ত রয়েছে’ (হিজর ১৫/৭২)

এই আয়াতের পর হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, أقسم تعالى بحياة نبيه، صلوات الله وسلامه عليه، وفي هذا تشريف عظيم، ومقام رفيع وجاه عريض- ‘আল্লাহ তার নবীর জীবনের কসম করেছেন। আর এই কসমের মধ্যে রয়েছে মহান সম্মান, উঁচু স্থান এবং সীমাহীন খ্যাতি’।

এরপর ইবনে কাছীর (রহঃ) ইবনে আববাস (রাঃ)-এর তাফসীর নিয়ে আসেন। আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

مَا خَلَقَ اللهُ وَمَا ذَرَأَ وَمَا بَرَأَ نَفْسًا أَكْرَمَ عَلَيْهِ مِنْ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَا سَمِعْتُ اللهَ أَقْسَمَ بِحَيَاةِ أَحَدٍ غَيْرِهِ، قَالَ اللهُ تَعَالَى: لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ

‘আল্লাহ এমন কিছু সৃষ্টি করেননি যে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর আমি মহান আল্লাহকে আর কারো জীবনকে নিয়ে (কুরআনে) কসম খেতে শুনিনি মুহাম্মাদ (ছাঃ) ব্যতীত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, আপনার জীবনের কসম তারা আনন্দ-উল্লাসে মেতে আছে।[13]

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) এর এই কথা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নামে শপথ করা তার সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল এবং ছাহাবীরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ মাখলূক হিসাবে বিশ্বাস করতেন।

৩. সকল নবীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ :

মহান আল্লাহ বলেন,

إِذْ أَخَذَ اللهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ-

‘আর যখন মহান আল্লাহ সকল নবীর নিকট থেকে শপথ নিলেন এই বলে যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকটে রাসূল আসবে যিনি তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়ন করবেন, তখন অবশ্যই তোমরা তার উপর ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা কি স্বীকৃতি দিলে এবং এই কথা মেনে চলার অঙ্গীকার করলে। তারা বললেন, আমরা স্বীকৃত দিলাম। তখন আল্লাহ বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম’ (আলে ইমরান ৩/৮১)

এই আয়াত পেশ করার পর ইবনু কাছীর (রহঃ) রাঈসুল মুফাসসিরীন আবদুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ)-এর বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেন, ما بعث الله نبيا من الأنبياء إلا أخذ عليه الميثاق، لئن بَعَث محمدًا وهو حَيّ ليؤمنن به ولينصرنه، وأمَرَه أن يأخذ الميثاق على أمته: لئن بعث محمد صلى الله عليه وسلم وهم أحياء ليؤمِنُنَّ به ولينصرُنَّه- ‘আল্লাহ এমন কোনো রাসূল প্রেরণ করেননি যার কাছ থেকে এই শপথ গ্রহণ করেননি। তথা প্রত্যেক রাসূলের কাছে তিনি এই মর্মে শপথ নিয়েছেন যে, যদি আল্লাহ মুহাম্মাদকে প্রেরণ করেন এবং সেই নবী বা রাসূল জীবিত থাকে, তাহলে তারা যেন মুহাম্মাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে ও তাকে সাহায্য করে। তাদেরকে এও নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন তাদের উম্মতের কাছ থেকে এই বলে শপথ নেয় যে, যদি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করা হয় এবং তারা জীবিত থাকে, তাহলে তারা যেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে সহযোগিতা করে’।[14]

এরপর ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন,

فالرسول محمد خاتم الأنبياء صلوات الله وسلامه عليه، دائما إلى يوم الدين، وهو الإمام الأعظم الذي لو وجد في أي عصر وجد لكان هو الواجب الطاعة المقدَّم على الأنبياء كلهم؛ ولهذا كان إمامهم ليلة الإسراء لما اجتمعوا ببيت المقدس، وكذلك هو الشفيع في يوم الحشر في إتيان الرب لِفَصْل القضاء، وهو المقام المحمود الذي لا يليق إلا له-

‘আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) কিয়ামত পর্যন্ত শেষ নবী। তিনিই হচ্ছেন মহান ইমাম যাকে কোনও যুগে পাওয়া গেলে সকল নবীর উপর তার আনুগত্য করা যরূরী। আর এজন্যই মি‘রাজের রাত্রে তিনি তাদের ইমাম ছিলেন যখন তারা বায়তুল মুকাদ্দাসে জমা হয়েছিলেন। অনুরূপই তিনি হাশরের ময়দানে তাদের জন্য আল্লাহকে বিচার শুরু করার সুফারিশ করবেন। আর এটাই মাকামে মাহমূদ, যা তিনি ব্যতীত কারো জন্য শোভা পায় না।[15]

সুতরাং এই আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ করছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর ঈমান নিয়ে আসার জন্য সকল রাসূলের কাছ থেকে শপথ নেয়াটা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল রাসূলের উপর কুল্লী বা সামষ্টিক ফযীলত। এইজন্য রাসূল (ছাঃ) ওমর (রাঃ)-কে বলেছিলেন, যদি আজ মূসা জীবিত থাকত তাহলে তার জন্য আমার আনুগত্য করা ছাড়া তার কোন গত্যন্তর থাকত না।[16]

হাদীছ থেকে দলীল :

১- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَخْرُجُ فِى آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ أَحْدَاثُ الأَسْنَانِ سُفَهَاءُ الأَحْلاَمِ يَقُولُونَ مِنْ خَيْرِ قَوْلِ الْبَرِ يَّهِ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لاَ يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الإِسْلاَمِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ

১. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, শেষ যামানায় কিছু মানুষ বের হবে। যারা হবে অল্প বয়সী ও নির্বোধ। তারা সর্বোত্তম কথা বলবে। তাঁরা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠনালি অতিক্রম করবেনা। তাঁরা দ্বীন থেকে তেমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর শিখার ভেদ করে বের হয়ে যায়।[17] এই হাদীছে স্পষ্টভাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলা হয়েছে।

২. উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ كُنْتُ إِمَامَ النَّبِيِّيْنَ وَخَطِيبَهُمْ وَصَاحِبَ شَفَاعَتِهِمْ غَيْرَ فَخْرٍ ‘আমি কিয়ামতের দিন সকল নবীদের ইমাম বা নেতা হব এবং তাদের মুখপাত্র হব (অর্থাৎ যখন কিয়ামতের মাঠে তারা আল্লাহর সামনে কথা বলতে পারবেন না তখন আমি তাদের পক্ষ থেকে কথা বলব) এবং তাদের জন্য সুপারিশকারী হব।[18] এতে আমার কোন গর্ব নেই। যিনি সকল নবীর ইমাম বা নেতা হবেন তিনি অবশ্যই সকল নবীর মাঝে শ্রেষ্ঠ।

আরও দেখুন:  অলীগণের কারামত

৩. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ ‘আমি কিয়ামতের মাঠে সকল আদম সন্তানের সরদার হব। আমিই প্রথত্র ব্যক্তি যাকে প্রথমে কবর থেকে উঠানো হবে। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে প্রথমে শাফা‘আত করবে এবং যার শাফা‘আত প্রথমে গ্রহণ করা হবে’।[19]

সালাফে ছালেহীন এই হাদীছ দ্বারা সকল আদম সন্তানের উপর রাসূল (ছাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। অবশ্য আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করিনা মর্মে লিখিত বইয়ে এই হাদীছের এই বলে জবাব দেয়া হয়েছে যে, কেউ নেতা হলেই তাঁর শ্রেষ্ঠ হওয়া যরূরী নয়। এই অভিযোগের জবাব দু’ভাবে দেওয়া যায়। প্রথম জবাব তো সালাফে ছালেহীন এই হাদীছ থেকে রাসূল (ছাঃ)-এর সকল আদম সন্তানের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, এরূপই অন্য এক হাদীছে এসেছে, যেখানে রাসূল (ছাঃ)-এর অন্য নবীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

৪. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَبِيَدِى لِوَاءُ الْحَمْدِ وَلاَ فَخْرَ وَمَا مِنْ نَبِىٍّ يَوْمَئِذٍ آدَمُ فَمَنْ سِوَاهُ إِلاَّ تَحْتَ لِوَائِى ‘কিয়ামতের মাঠে সকল আদম সন্তানের সরদার আমি হব এবং আমি এটা গর্ব করে বলছিনা ঐ দিন আমার হাতে হবে প্রশংসার ঝান্ডা বা পতাকা। আর ঐ দিন এমন কোনও নবী থাকবে না, যিনি আমার এই ঝান্ডার নিচে সমবেত হবেন না।[20]

এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, আদম (আঃ) থেকে শুরু করে সকল নবী সেই দিন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ঝান্ডার নিচে সমবেত হবেন। এটা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অন্য নবীদের উপর কুল্লী বা সমষ্টিগত ফযীলত। অতএব তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল এবং রাসূলদের সরদার।

৫. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُوْنِ بَنِى آدَمَ ‘আমি প্রেরিত হয়েছি আদম সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে’।[21]

৬. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

إنَّ اللهَ اتَّخَذَ إبْرَاهِيْمَ خَلِيْلاً، وَإِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيْلُ اللهِ، إِنَّ مُحَمَّدًا أَكْرَمُ الْخَلْقِ عَلَى اللهِ، ثُمَّ قَرَأَ : عَسَى أَنْ يَبْعَثَك رَبُّك مَقَامًا مَحْمُودًا-

‘আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদের সাথী তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও আল্লাহর বন্ধু। নিশ্চয় মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন- আশা করা যায় যে আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমূদ বা সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন স্থান দান করবেন’।[22]

৭- عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: فُضِّلْتُ عَلَى الأَنْبِيَاءِ بِسِتٍّ أُعْطِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَأُحِلَّتْ لِىَ الْغَنَائِمُ وَجُعِلَتْ لِىَ الأَرْضُ طَهُورًا وَمَسْجِدًا وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِىَ النَّبِيُّونَ

৭. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ৬টি বিষয় দ্বারা আমাকে সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। ১. আমাকে অল্প ভাষায় অধিক ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ২. আমাকে সাহায্য করা হয়েছে শত্রুদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে ৩. আমার জন্য গণীমত হালাল করা হয়েছে। [উল্লেখ্য, গণীমত পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য হালাল ছিলনা]। ৪. পুরো পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র ও মসজিদ করে দেয়া হয়েছে। [যা অন্য উম্মতের জন্য ছিলনা] ৫. আমাকে পুরো সৃষ্টির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। [আগের সকল নবীকে নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তাদের রিসালাত ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য] ৬. আমার দ্বারা নবুঅতের ধারাবাহিকতাকে সমাপ্ত করা হয়েছে।[23]

8- عَن ابْن عبَّاس قَالَ: إنَّ الله تَعَالَى فضل مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْأَنْبِيَاءِ وَعَلَى أَهْلِ السَّمَاءِ فَقَالُوْا يَا أَبَا عَبَّاسٍ بِمَ فَضَّله الله عَلَى أَهْلِ السَّمَاءِ؟ قَالَ: إِنَّ اللهَ تَعَالَى قَالَ لِأَهْلِ السَّمَاءِ [وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهٌ مِنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نجزي الظَّالِميْن] وَقَالَ اللهُ تَعَالَى لِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: [إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تأخَّر] قَالُوا: وَمَا فَضْلُهُ عَلَى الْأَنْبِيَاءِ؟ قَالَ: قَالَ اللهُ تَعَالَى: [وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللهُ مَنْ يَّشَاء] الْآيَةَ وَقَالَ اللهُ تَعَالَى لِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسلم: [وَمَا أَرْسَلْنَاك إِلَّا كَافَّة للنَّاس] فَأرْسلهُ إِلَى الْجِنّ وَالْإِنْس

৮. ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নিশ্চয় মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবীগণ ও আসমানবাসী তথা ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তখন তারা তথা তাঁর ছাত্ররা বলল, হে ইবনে আববাস! কিসের দ্বারা আল্লাহ তাকে আসমানবাসী তথা ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিলেন? জবাবে তিনি বললেন, আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেছেন, ‘যদি তাদের মধ্যে কেউ বলে যে আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নাই তাহলে আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি দিব। আর এভাবে আমি অত্যাচারীদের শাস্তি দিয়ে থাকি (আম্বিয়া ২১/২৯)। কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমি আপনাকে মহান বিজয় দান করেছি যাতে করে আল্লাহ আপনার আগের ও পরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন’ (ফাৎহ ৪৮/১-২)

তখন তাকে বলা হল, সকল নবীর উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কি? তিনি বলেন, আল্লাহ অন্য রাসূলদের জন্য বলেছেন, ‘আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি যাতে করে তারা তাদের জন্য আমার বাণী বর্ণনা করতে পারে। আর আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন’ (ইবরাহীম ১৪/৪)। তথা প্রত্যেক রাসূল ছিলেন তাঁর নিজ জাতির জন্য। আর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আপনাকে সকল মানুষের কাছে প্রেরণ করেছি’ (সাবা ৩৪/২৮)। অতএব তিনি তাকে মানুষ ও জ্বিনের কাছে প্রেরণ করেছেন।[24]

৯- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ إِنَّ اللهَ نَظَرَ فِى قُلُوبِ الْعِبَادِ فَوَجَدَ قَلْبَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ فَاصْطَفَاهُ لِنَفْسِهِ فَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ

৯. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তরের দিকে দেখলেন এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অন্তরকে সর্বশ্রেষ্ঠ অন্তর হিসাবে পেলেন। এই  জন্য  তাকে  নির্বাচন  করলেন  এবং  রাসূল  হিসাবে

দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন’।[25]

১০. মি‘রাজের রাত্রে যখন মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্য বুরাক নিয়ে আসা হল তখন বুরাক লাফালাফি শুরু করে এবং জিবরীল (আঃ) তাকে বলেন, فَمَا رَكِبَكَ أَحَدٌ أَكْرَمُ عَلَى اللهِ مِنْهُ ‘তুমি মুহাম্মাদের সাথে এরূপ করছ! অথচ ইতিপূর্বে তোমার পিঠে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ আরোহণ করেনি’।[26]

এই হাদীছের ব্যাখ্যায় প্রায় সকল মুহাদ্দিছ একমত পোষণ করেছেন যে, এখানে আমাদের নবীকে অন্য নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। কেননা বুরাক নবীদের বাহন ছিল। যেমন হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) তাঁর ‘ফাতহুল বারী’তে এই বিষয়ে অনেক বর্ণনা জমা করেছেন। এর মধ্যে ঐ বর্ণনাও আছে যেখানে রাসূল (ছাঃ) বললেন, অতঃপর আমি বোরাককে বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐ খুঁটির সাথে বাঁধলাম যার সাথে অন্য নবীরা বাঁধতেন। তথা বোরাক এর আগে অন্য নবীরাও ব্যবহার করেছেন। এছাড়া আরো অনেক বর্ণনা জমা করে বোরাক যে নবীদের আরোহী তিনি তা প্রমাণ করেছেন।[27]

সুতরাং জিবরীল (আঃ)-এর এই কথা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) অন্য নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। ফালিল্লাহিল হামদ।

১১. মূলত জান্নাত হচ্ছে মানব জাতির মধ্যে কে আল্লাহর কত প্রিয় বান্দা এবং কত ভাল ও শ্রেষ্ঠ বান্দা তা প্রমাণ হওয়ার অন্যতম জায়গা। এই জান্নাতে আমাদের রাসূলের স্থান সম্পর্কে স্বয়ং মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেন, سَلُوا اللهَ لِىَ الْوَسِيلَةَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا الْوَسِيلَةُ؟ قَالَ : أَعْلَى دَرَجَةٍ فِى الْجَنَّةِ لاَ يَنَالُهَا إِلاَّ رَجُلٌ وَاحِدٌ أَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ ‘তোমরা আমার জন্য অসীলা চাও। ছাহাবীরা বললেন, অসীলা কি হে আল্লাহর নবী? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন জায়গা। একজন ব্যক্তি ব্যতীত তা কেউ অর্জন করতে পারবে না। আশা রাখি আমিই হব সেই ব্যক্তিটি’।[28]

রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে প্রতিদিন আযানের শেষে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্য এই জায়গা চাইতে বলেছেন এবং এও বলেছেন যে, আমার জন্য আযানের শেষে এই জায়গা চাইবে তাঁর জন্য কিয়ামতে মাঠে শাফা‘আত করা আমার উপর ওয়াজিব।[29]

এই হাদীছ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, এই জায়গার অধিকারী ব্যক্তি সকল আদম সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানী হবেন এবং তিনি হবেন আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)।

১২. শাফা‘আতে কুবরা : আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল নবীর উপর যে সমস্ত কুল্লী বা সমষ্টিগত ফযীলত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শাফা‘আতে কুবরা।

একটা হচ্ছে প্রত্যেক নবীকে আলাদা আলাদা ফযীলত দেয়া। যেমন ঈসা (আঃ)-কে বিনা পিতায় সৃষ্টি করা। কিন্তু এটা তার সকল নবীর উপর সমষ্টিগত ফযীলত নয়। কেননা এই রকম ফযীলত অনেক নবীকেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু একজন নবীর পতাকার নিচে সকল নবী (আঃ)-কে সমবেত করা, তার কর্তৃক সকল নবীর ইমামতি করা এবং তাকে সকল নবীর সরদার বা ইমাম বানানো ইত্যাদি। সকল নবীর উপর তাঁর কুল্লী বা সমষ্টিগত ফযীলত। এই ধরনের ফযীলত শুধু আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আছে। এই রকমই একটি ফযীলত হচ্ছে শাফা‘আতে কুবরা। এই শাফা‘আত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া’ (বাক্বারা ২/২৫৫)

মহান আল্লাহ এই শাফা‘আত বা সুপারিশ করার অনুমতি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে দিবেন এবং সকল নবীর অপারগতা প্রকাশ করার পর দিবেন। যা তার সকল নবীর উপর সমষ্টিগত ফযীলত। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হল।-

হাশরের মাঠে মহান প্রতাপশালী আল্লাহ যখন আসমানকে এক হাতে ও যমীনকে এক হাত নিয়ে হুংকার দিবেন, কোথায় সেই অত্যাচারী রাজা-বাদশাহরা? আর তার একচ্ছত্র মালিকানা ও রাজত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবেন, ঠিক তেমনি মানুষ যখন আল্লাহর আযাবের ভয়ে ভীত হয়ে যাবে এবং অসহনীয় আযাবে গ্রেপ্তার হবে, কিন্তু কিয়ামতের মাঠ থেকে বাঁচার কোনও পথ খুঁজে পাবেনা। এদিকে আবার বিচার শুরু হচ্ছে না। তখন প্রত্যেক উম্মতের মুমিনগণ একত্রিত হয়ে একজন সুপারিশকারী খুঁজে ফিরবে। যাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারে। প্রথমে তারা আদম (আঃ)-এর কাছে গমন করবে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাবে। প্রত্যেক নবী নিজেদের ত্রুটি উল্লেখ করে তাদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবেন। অবশেষে তারা নবী (ছাঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি মানুষকে এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহর আরশের নীচে সিজদাবনত হবেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবেন। তখন আল্লাহ তাঁকে মাথা উঠিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দিবেন। তিনি তখন সমগ্র মানুষের হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তাঁর দো‘আ এবং শাফা‘আত কবুল করবেন। এটিই হল মাক্বামে মাহমূদ বা সুমহান মর্যাদা, যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন।[30]

১৩. সকল নবীর ইমামতি : সকল নবীর উপর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আরেকটি সমষ্টিগত ফযীলত হচ্ছে মহান আল্লাহ তাঁকে দিয়ে মি‘রাজের রাত্রে সকল নবীর ইমামতি করিয়েছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে,وَقَدْ رَأَيْتُنِيْ فِيْ جَمَاعَةٍ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ … فَحَانَتِ الصَّلاَةُ فَأَمَّمْتُهُمْ ‘আমি আমাকে রাসূলদের জামা‘আতের মধ্যে পেলাম… ইতিমধ্যে ছালাতের সময় হয়ে গেলে আমি তাদের ইমামতি করলাম’।[31]

১৪. ওয়াসিলা বিন আসকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ اصْطَفَى بَنِى كِنَانَةَ مِنْ بَنِى إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى مِنْ بَنِى كِنَانَةَ قُرَيْشاً وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِى هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِى مِنْ بَنِى هَاشِمٍ ‘মহান আল্লাহ ইসমাঈলের সন্তানদের মধ্যে থেকে বনী কিনানাকে নির্বাচন করেছেন এবং বনী কিনানার মধ্যে থেকে কুরাইশকে নির্বাচন করেছেন এবং কুরাইশের মধ্যে থেকে বনী হাশেমকে নির্বাচন করেছেন আর আমাকে নির্বাচন করেছেন বনী হাশেম থেকে।[32]

কিন্তু অনেকেই বলতে পারে, এই হাদীছে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ইবারাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়া প্রমাণিত হয় কীভাবে। কিন্তু এই রকম আরো অনেক হাদীছ আছে যেগুলোতে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল বনী আদমের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়া প্রমাণ করে। যেমন,

وعن العباس … فَقَامَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ مَنْ أَنَا؟ قَالُوا أَنْتَ رَسُولُ اللهِ عَلَيْكَ السَّلاَمُ- قَالَ أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ إِنَّ اللهَ خَلَقَ الْخَلْقَ فَجَعَلَنِى فِى خَيْرِهِمْ ثُمَّ جَعَلَهُمْ فِرْقَتَيْنِ فَجَعَلَنِى فِى خَيْرِهِمْ فِرْقَةً ثُمَّ جَعَلَهُمْ قَبَائِلَ فَجَعَلَنِى فِى خَيْرِهِمْ قَبِيلَةً ثُمَّ جَعَلَهُمْ بُيُوتًا فَجَعَلَنِى فِى خَيْرِهِمْ بَيْتًا فَأَنَا خَيْرُكُمْ بَيْتاً وَخَيْرُكُمْ نَفْساً

‘আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) মিম্বারে উঠে বললেন, আমি কে? তখন ছাহাবীগণ বললেন, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব। আল্লাহ সৃষ্টি জীব সৃষ্টি করত আমাকে তাদের ভালোদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন [তথা আরব ও আজম] এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ ভাগের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ গোত্রে স্থান দিয়েছেন। অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন বাড়িতে পৃথক করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ বাড়িতে স্থান দিয়েছেন। অতএব আমি তাদের মধ্যে বাড়ির দিক দিয়েও শ্রেষ্ঠ এবং ব্যক্তির দিক দিয়েও শ্রেষ্ঠ।[33]

বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল :

১. কুরআন সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। এই কিতাব যেই মাসে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ মাস। যেই রাতে অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ রাত। যেই জায়গায় অবতীর্ণ হয়েছে তা সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা। যেই ফেরেশতা নিয়ে এসেছেন তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা। যেই নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তিনি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।

২. মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅত অন্যান্য রাসূলদের নবুঅতের চেয়ে বৈশিষ্ট্যগতভাবে অনেক মহান। কেননা, মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅতের দ্বারা অন্য সকল নবীর নবুঅত ও দ্বীনকে মানসূখ বা রহিত করে দিয়েছেন। অন্য দিকে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅত অন্য কোনও নবীর নবুঅত দ্বারা মানসুখ হবেনা। অন্য নবীদের নবুঅত ছিল নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য এবং রাসূল (ছাঃ)-এর নবুঅত সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য। আর যিনি এই নবুঅতের অধিকারী তিনি অবশ্যই অন্য সকল নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল নন মর্মে পেশকৃত দলীল সমূহের সঠিক ব্যাখ্যা

১. মহান আল্লাহ বলেন, لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ ‘আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না’ (বাক্বারাহ ২/১৩৬)। যারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল বলতে চান না তাদের সবচেয়ে বড় দলীল এই আয়াতটি।

মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে এই আয়াতটি নিয়ে এসেছেন দুই জায়গায়। সূরা বাক্বারাহ ১৩৬,  সূরা আলে ইমরান ৮৪। সব জায়গাতে আগে রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর এই আয়াত নিয়ে এসেছেন। আমরা সূরা বাক্বারার সম্পূর্ণ আয়াত পেশ করছি। কারণ অনেকেই শুধু আয়াতের এই অংশকে পেশ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। মহান আল্লাহ বলেন,

قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوْسَى وَعِيْسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّوْنَ مِنْ رَبِّهِمْ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُوْنَ-

‘তোমরা বল আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তাদের বংশধরদের প্রতি। আরও যা দেয়া হয়েছে মূসা ও ঈসাকে  এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য নবীদেরকে যা দেয়া হয়েছে তাঁর প্রতি। বস্ত্তত আমরা তাদের কারো মাঝে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণকারী’ (বাক্বারাহ ২/১৩৬)

আরও দেখুন:  কুফরীর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

এই আয়াত পড়ার পর একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারবে যে, এখানে পার্থক্য করি না অর্থ কুফরী করি না বরং ঈমান আনি। কেননা আয়াতের আগের আলোচনাতে আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান আনতে বলেছেন এবং শেষে ঈমানের বিপরীত কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। এজন্যই মহান আল্লাহ হরফে আতফ বা সংযোজক অব্যয় নিয়ে আসেননি। সালাফে ছালেহীনও এই আয়াতের এমন তাফসীরই করেছেন। যেমন হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন,وأن لا يفرقوا بين أحد منهم، بل يؤمنوا بهم كلّهم، ولا يكونوا كمن قال الله فيهم- ‘এবং তারা যেন রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য না করে বরং তাদের সকলের প্রতি ঈমান আনে। আর আল্লাহ যাদের সম্পর্কে এমনটি বলেছেন তারা যেন তাদের মতো না হয়’।[34]

এরপর হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) কুরআনের তাফসীর কুরআনের আয়াত দিয়ে করেছেন।

সূরা বাক্বারার আয়াতে আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করতে নিষেধ করলেন। এখন এই পার্থক্য করা দ্বারা আল্লাহর কি উদ্দেশ্য তা আমরা তখনই জানতে পারব, যখন জানতে পারব যে, মহান আল্লাহ এই পার্থক্য করাকে অন্য জায়গায় কি অর্থে ব্যবহার করেছেন। হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) এখানে সূরা নিসার ১৫০-১৫১ নং আয়াত নিয়ে এসেছেন, যেখানে এই পার্থক্য করার কথা রয়েছে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, وَيُرِيْدُوْنَ أَنْ يُفَرِّقُوْا بَيْنَ اللهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُوْلُوْنَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيْدُوْنَ أَنْ يَتَّخِذُوْا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيْلاً، أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ حَقًّا-  ‘আর তারা চায় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করবে এবং বলবে, আমরা কারো উপর ঈমান আনি এবং কারো কুফরী করি এবং তারা এর মাঝে একটা রাস্তা গ্রহণ করতে চায়। বস্ত্তত তারাই সত্যিকারের কাফের’ (নিসা ৪/১৫০-১৫১)

এখানে মহান আল্লাহ পার্থক্য করার কথা স্পষ্টভাবে বলছেন যে, কারো উপর ঈমান আনা এবং কারো সাথে কুফরী করা হ’ল রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করা।

ইমাম ইবনু জারীর তাবারী (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, ‘আমরা কতিপয় নবীর প্রতি ঈমান আনি এবং কতিপয় নবীর সাথে কুফুরী করি এরূপ করি না। আমরা কতিপয় নবীর সাথে সম্পর্ক করি আবার কতিপয় নবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি এরূপ করি না। যেমনটা ইহুদীরা ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং এ দু’জন ব্যতীত সকলের প্রতি ঈমান এনেছে। অনুরূপভাবে নাছারারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি। তিনি ব্যতীত সকলের প্রতি তারা ঈমান এনেছে। কিন্তু আমরা সকল নবী ও রাসূলগণের জন্য সাক্ষ্য দেই যে, তাঁরা সকলেই মহান আল্লাহর নবী ও রাসূল ছিলেন। তাঁরা সত্য ও হেদায়াতসহ প্রেরিত হয়েছিলেন’।[35]

অতএব এই কথা এখন দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, আমরা রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করি না আয়াতের অর্থ যদি করা হয় যে, আমরা রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করি না তাহ’লে কুরআনের আয়াতের অর্থের বিকৃতি ঘটানো হবে। কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তিনি নিজেও কুরআনে রাসূলগণের একজনকে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ বলেন, فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ ‘হে নবী! তুমি রাসূলগণের মধ্যে থেকে যারা উলুল আযম বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী রাসূল তাদের মত ধৈর্যধারণ কর’ (আহকাফ ৩৫/৩৫)

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে শুরু করে সকল মুফাসসিরে কুরআন এই বিষয়ে একমত যে, এই উলুল আযম রাসূল হচ্ছেন ৫ জন- মুহাম্মাদ (ছাঃ), ইবরাহীম, নূহ, মূসা ও ঈসা (আঃ)। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, خِيَارُ وَلَدِ آدَمَ خَمْسَةٌ نُوْحٌ وإبْراهِيْمُ ومُوْسَى وَعِيْسَى ومُحَمَّدٌ وَخَيْرُهُمْ مُحَمَّد ‘আদম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান হচ্ছেন পাঁচ জন, নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)। আর তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)।[36]

এখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাঝে পাঁচজনকে এই মহান গুণে গুণান্বিত করে অন্যদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ বলেন, تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَآتَيْنَا عِيْسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوْحِ الْقُدُسِ- ‘এই যে রাসূলগণ, এদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। এদের মধ্যে এমনও আছে যাদের সাথে মহান আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাদের কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। ঈসা ইবনু মারিয়ামকে স্পষ্ট প্রমাণ দান করেছি এবং তাকে রুহুল কুদুস (জিব্রীল) দ্বারা সহযোগিতা করেছি’ (বাক্বারাহ ২/২৫৩)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মহান আল্লাহ রাসূলগণের মাঝে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাইতো ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে ঐ সমস্ত হাদীছের পাঁচভাবে জবাব দিয়েছেন যেখানে রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এই আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, রাসূলগণ শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে সমান নন।[37]

যদি এই আয়াতের অন্য উদ্দেশ্য হ’ত তাহ’লে তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না মর্মে বর্ণিত হাদীছকে তিনি এই আয়াতের বিরোধী মনে করতেন না এবং এই হাদীছের পাঁচভাবে জবাব দিতেন না।

অতএব উপরে উল্লিখিত দু’টি আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

২. তোমরা নবীদের মাঝে প্রাধান্য দিও না :

রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لاَ تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللهِ ‘তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না’।[38] আলোচ্য হাদীছের নিম্নোক্ত তিনভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

১. শাব্দিক বিশ্লেষণ :

মূলত এই হাদীছটি তিনটি শব্দে বর্ণিত হয়েছে,

১. لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللهِ ‘তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না’। উক্ত হাদীছটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ এবং তাঁর থেকে আব্দুল্লাহ বিন ফযল বর্ণনা করেছেন।

২. لَا تُخَيِّرُونِيْ عَلَى مُوسَى ‘তোমরা মূসাকে বাদ দিয়ে আমাকে বেছে নিও না’।[39]

৩. لَا تُخَيِّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ ‘তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে বেছে নিও না’।[40]

এখানে لَا تُخَيِّرُوْا শব্দটি প্রাধান্য পাবে। কেননা لَا تُفَضِّلُوا এই শব্দে শুধুমাত্র আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ থেকে আবদুল্লাহ বিন ফযল বর্ণনা করছেন। অথচ এই হাদীছই ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ থেকে বর্ণনা করছেন لَا تُخَيِّرُوْنِي শব্দ দিয়ে। শুধু আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ থেকেই তিনি এভাবে বর্ণনা করেননি; বরং আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ ব্যতীত আরো দু’জন রাবী থেকেও তিনি এই শব্দে বর্ণনা করছেন। তাঁর মধ্যে একজন হচ্ছেন বিখ্যাত তাবেঈ সাঈদ বিন মুসাইয়িব (রহঃ)।

অতএব তিনটি কারণে لَا تُخَيِّرُوا ‘তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না’ এই শব্দটি প্রাধান্য পাবে।

(১) সংখ্যাধিক্য। কেননা তিন জন রাবী এভাবে বর্ণনা করছেন এবং এই তিন জনের মধ্যে সাঈদ বিন মুসাইয়িব-এর মত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর খাছ ছাত্র আছেন।

(২) যে আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ থেকে আবদুল্লাহ বিন ফযল বর্ণনা করছেন, সে আব্দুর রহমান আল-আ‘রাজ   থেকে ইবনু শিহাব যুহরীও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি আব্দুল্লাহ বিন ফযল থেকে ভিন্ন শব্দে বর্ণনা করছেন। আর মুহাদ্দিছ মাত্রই ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ)-এর দৃঢ়তা ও শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি অবগত।

(৩) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত সকল সনদে এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

অতএব যখন প্রমাণিত হ’ল যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) মূলত لاَ تُخَيِّرُوْا বা ‘তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে বেছে নিও না’ শব্দ বলেছেন। এখন এবার আমরা এই শব্দের কি অর্থ হতে পারে তা বিশ্লেষণ করব।

মি‘রাজের রাত্রে যখন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সামনে দুধ ও মদ দিয়ে যে কোন একটি গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি দুধ বেছে নিয়েছিলেন (فَاخْتَرْتُ اللَّبَنَ)[41]

এখান থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, ‘তাখয়ীর’ হচ্ছে একটাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটাকে গ্রহণ করা। যারা আরবী ভাষায় পারদর্শী তাঁরা ভালভাবেই জানেন যে, ‘তাখয়ীর’ মাছদার এর অর্থ হচ্ছে, একটিকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটিকে গ্রহণ করা বা একটির মধ্যে কোন দুর্বলতা থাকার কারণে তার উপর আরেকটিকে প্রাধান্য দেয়া।

সুতরাং এই হাদীছের কেউ যদি এই অর্থ করে যে, তোমরা রাসূলগণের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ো না তাহ’লে সে অর্থের বিকৃতি ঘটাবে। বরং সঠিক অর্থ হবে তোমরা অন্য রাসূলকে ছেড়ে আমাকে প্রাধান্য দিয়ো না। আর এই ধরনের কাজ মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েয। যে করবে সে কাফের।

আর যদি ‘লা তুফায্যিলূ’ শব্দ তথা শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া অর্থ মেনে নেওয়া হয় তাহ’লে শানে উরূদ বা হাদীছের প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

২. শানে উরূদ : কুরআনের তাফসীরে যেমন শানে নুযূলের গুরুত্ব থাকে, তেমনি হাদীছের ব্যাখ্যায় শানে উরূদের গুরুত্ব থাকে। অর্থাৎ এই হাদীছ বলার পিছনের কাহিনী বা প্রেক্ষাপট কি?

ঘটনাটি হচ্ছে, রাসূল (ছাঃ)-কে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে আরেকজনের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে অন্য নবীর শানে গুস্তাখী বা অসমীচীন আচরণ করলে তিনি এই হাদীছ বর্ণনা করেন। অর্থাৎ তোমরা রাসূলগণের মাঝে এভাবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাদের শানে গুস্তাখী কর না। কেননা অন্য নবীগণও অনেক সম্মানী, তারাও আল্লাহর রাসূল।

৩. সালাফে ছালেহীন-এর ব্যাখ্যা :

১. ইমাম বাগাভী (রহঃ) তাঁর ‘শারহুস সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘রাসূলগণের মাঝে একজনকে আরেকজনের উপর প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এটা নয় যে, আমরা বিশ্বাস করব তাঁরা সকলেই মর্যাদাগতভাবে সমান। কেননা স্বয়ং আল্লাহই আমাদেরকে  অবগত করেছেন যে, তিনি কোন রাসূলকে অন্য রাসূলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘এই যে নবীগণ, তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি’ (বাক্বারাহ ২/২৫৩)। বরং এর অর্থ হচ্ছে কোন নবীর শানে অসমীচিন কথা বলে এবং তাদের অমর্যাদা করে অন্য নবীকে প্রাধান্য দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এতে তাদের কারো ব্যাপারে আক্বীদায় ফাসাদ সৃষ্টি হয়। আর এটা কুফুরী’।[42]

২. অত্র হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)ও একই কথা বলেছেন। অর্থাৎ এখানে এটা উদ্দেশ্য যে, ফযীলত দিতে গিয়ে যেন অন্য নবীদের অপমান না করা হয়।[43]

৩. ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) তাঁর দালায়েলুন নবুঅতে বলেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, আমি রাসূলগণের কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিয়েছি। এই আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে পার্থক্য করেছেন। আর রাসূলগণের মাঝে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া নিষেধ মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলো মূলতঃ আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্কের সময়ে তাদের নবীর উপর আমাদের নবীকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে। কেননা যখন দুই ধর্মের অনুসারীর মাঝে নবীগণকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে ঝগড়া হবে, তখন তাঁরা নবীগণের শানে বেয়াদবী করবে এবং তাদের মানহানি করে ফেলবে। ফলে এর দ্বারা তাঁরা কাফের হয়ে যাবে’।[44]  মোটকথা হচ্ছে- প্রাধান্য দিতে গিয়ে যেন কোন নবী ও রাসূলের মানহানি না হয়।

৩. ‘যে বলবে, আমি ইউনুস বিন মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ সে মিথ্যুক’।

আমরা এই হাদীছেরও তিনভাবে ব্যাখ্যা করব।

হাদীছের অর্থ :

এখানে আমি দ্বারা কে উদ্দেশ্য? যদি বলি মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাহ’লে এই হাদীছের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কিন্তু এই হাদীছের আরেকভাবেও অর্থ করা যায়। আমি দ্বারা প্রত্যেক কথক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) বলতে চেয়েছেন, কেউ যদি বলে যে, আমি তথা ঐ কথক ইউনুস বিন মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তাহ’লে সে মিথ্যুক। আর এটা স্পষ্ট যে, আম জনসাধারণ যদি নিজেকে ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে তাহ’লে সে মিথ্যুক হবে। নিম্নে এ প্রসঙ্গে দু’টি দলীল পেশ করা হ’ল-

১. হাদীছটি ছহীহ বুখারীতে এভাবে এসেছে-  وَلاَ أَقُولُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلاَمُ ‘আমি বলি না যে, কেউ ইউনুস বিন মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’।[45]

এখানে রাসূল (ছাঃ) আমি ব্যবহার করেননি; বরং বলেছেন, কেউ। সুতরাং এখান থেকে রাসূল (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য নেয়ার যে সম্ভাবনা ছিল তা শেষ হয়ে যায়। বরং আম জনসাধারণের কেউ যদি দাবী করে যে, সে ইউনুস বিন মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তাহ’লে সে মিথ্যুক হবে।

২. একটি হাদীছে কুদসী এই অর্থকে নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, لاَ يَنْبَغِى لِعَبْدٍ لِى أَنْ يَقُولَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى عَلَيْهِ السَّلاَمُ ‘আমার কোন বান্দার উচিত নয় যে, সে বলবে আমি ইউনুস বিন মাত্তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’।[46] সুতরাং একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখানে আল্লাহর প্রত্যেক বান্দা উদ্দেশ্য; মুহাম্মাদ (ছাঃ) নয়।

প্রশ্ন হ’তে পারে, আম জনসাধারণ কিভাবে নিজেকে একজন নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতে পারে? আরেকটি প্রশ্ন হ’তে পারে, শুধু ইউনুস (আঃ)-এর সাথে কেন খাছ করলেন? অন্য নবীদের কথা কেন বললেন না? এ বিষয়ে জানার জন্য আমাদেরকে শানে উরূদ বা হাদীছের প্রেক্ষাপট জানতে হবে।

শানে উরূদ :

মূলতঃ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আমাদের রাসূলকে বলেছিলেন যে, فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُنْ كَصَاحِبِ الْحُوتِ ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের উপর ধৈর্য ধারণ কর,  ইউনুস এর মত হয়ো না’ (ক্বালাম ৪৮)

আর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণে ধৈর্য ধারণ না করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলছেন, তুমি ইউনুস (আঃ)-এর মত ধৈর্যহীন হয়ো না; বরং উলুল আযমদের মত ধৈর্যশীল হও!

এর দ্বারা অনেকের মনে হ’তে পারে যে, এই আয়াতে ইউনুস (আঃ)-এর মত হ’তে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব তিনি খারাপ (নাউযুবিল্লাহ)

এখন এই দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ যদি আমাদের রাসূলকে ভাল এবং ইউনুস (আঃ)-কে খারাপ বলে বা নিজেকেই ভাল বলে তাহ’লে সে মিথ্যুক হবে। সেকারণ রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের অন্তর থেকে এই আয়াতের কারণে সৃষ্টি হওয়া খারাপ ধারণা দূর করার উদ্দেশ্যে এই হাদীছ বলেছেন।

তাই আজও যদি কুরআন পড়ার সময় এই আয়াত পাঠে কারো অন্তরে ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয় তাহ’লে তাঁর আক্বীদাকে সংশোধন করার জন্য তাঁর সামনে এই হাদীছ পেশ করা হবে।

সালাফে ছালেহীনের ব্যাখ্যা :

আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন,

‘রাসূল (ছাঃ) এই কথা তখনই বলেছিলেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যে, ইউনুস (আঃ) তাঁর জাতির আচরণ সহ্য না করে রাগান্বিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং এর ফলে তাঁর যা হবার তাই হ’ল। কেননা আল্লাহর রাসূলগণের সম্মান করা, তাদেরকে ভালবাসা এবং তাদের প্রশংসা করা ওয়াজিব’।[47]

একই ব্যাখ্যা করেছেন ইমাম নববী (রহঃ) ও ইমাম সৈয়ূতী (রহঃ)। তাঁরা বলেন, ‘আলেমগণ বলেছেন, এটা ঐ সমস্ত জাহেলদের প্রতি সতর্কীকরণ, যারা ইউনুস (আঃ)-এর সম্মানে বিন্দুমাত্রও কমতি করে। এজন্য যে, কুরআনে তাঁর কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে এবং এজন্যই এখানে শুধুমাত্র ইউনুস (আঃ)-এর নাম নেয়া হয়েছে, অন্য নবীদের নাম নেয়া হয়নি’।[48]

অতএব কেউ যদি এই হাদীছ দ্বারা সালাফে ছালেহীনের বুঝের বিপরীত বলতে চায় যে, এই হাদীছে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন। তাহ’লে হাদীছের অর্থের ও উদ্দেশ্যের বিকৃতি ঘটবে।

কেউ যদি এই হাদীছ দ্বারা বলতে চায় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইউনুস (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন। তাহ’লে তাঁর জন্য যরূরী হবে সে যেন কুরআনের ঐ আয়াতের জবাব দেয় যেখানে আল্লাহ ইউনুস (আঃ)-এর মত হ’তে নিষেধ করেছেন এবং উলুল আযম-এর মত হ’তে বলেছেন এবং আমাদের রাসূল উলুল আযম-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।

আরও দেখুন:  নারী-পুরুষের নির্জনবাস, তৃতীয় ব্যক্তি শয়তান

কেননা তখন এই আয়াত এবং হাদীছ পরস্পর বিরোধী হবে। কেননা আয়াত আমাদের রাসূলকে শ্রেষ্ঠ বলছে এবং হাদীছ তা অস্বীকার করছে।

আর ফযীলতের বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদীছের আরেকটা ব্যাখ্যা নিম্নরূপ- কেউ যদি এক রাসূলকে আরেক রাসূলের উপর এই মনে করে প্রাধান্য দেয় যে, অন্য রাসূলগণ তাদের নবুঅতের হক আদায় করতে পারেননি অর্থাৎ মূসা, ইউনুস (আঃ) তাদের নবুঅতের হক আদায় করতে পারেননি, আমাদের রাসূল পেরেছেন; তাহ’লে সে মিথ্যুক এবং পাপী এমনকি কাফেরও হয়ে যেতে পারে। সকল নবী তাদের নবুঅতের দায়িত্ব পালনে সমান। কিন্তু এটা মহান আল্লাহর রহমত যে তিনি কাউকে কারও উপর ফযীলত দিয়েছেন। তদ্রূপ আমাদের রাসূলকে অন্য সকল রাসূলের উপর ফযীলত দিয়েছেন।

ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ :

একদা এক লোক মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে বলল, হে সৃষ্টির সেরা মানুষ! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, সে তো ইবরাহীম। অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা মানুষ ইবরাহীম (আঃ)।[49]

যারা রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে তাদেরকে আগে এই হাদীছের জবাব দিতে হবে। কেননা এই হাদীছে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর উপর এবং সকল নবীর উপর ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রাধান্যকে মেনে নিচ্ছেন। এই হাদীছ একটা বড় দলীল যে, রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে কমবেশী আছে।

আমরা এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ঐ হাদীছ পেশ করতে চাই, যেখানে মুহাম্মাদ (ছাঃ) স্বয়ং নিজেকে খায়রুল বারিইয়াহ বলেছেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

يَخْرُجُ فِى آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ أَحْدَاثُ الأَسْنَانِ سُفَهَاءُ الأَحْلاَمِ يَقُولُونَ مِنْ خَيْرِ قَوْلِ الْبَرِيَّةِ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لاَ يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ

‘শেষ যামানায় কিছু মানুষ বের হবে যারা হবে অল্প বয়সী বোকা। তাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কথা থেকে কথা বলবে তথা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর হাদীছ শুনাবে। তাঁরা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তাঁরা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর বের হয়ে যায় শিকার ভেদ করে’।[50]

এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) খায়রুল বারিয়্যাহ বা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এছাড়া আরও অনেক দলীল রয়েছে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার। কিন্তু এই হাদীছ বলছে ইবরাহীম (আঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ।

সালাফে ছালেহীন এই হাদীছের দু’ভাবে জবাব দিয়েছেন। ১. মানসূখ ২. ভদ্রতা ও সম্মানের জন্য।

মানসূখ :  রাসূল (ছাঃ) আগে জানতেন না যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন, তাকেও সেভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এটাও জানতেন না যে, তিনি সকল আদম সন্তানের সরদার এবং ইবরাহীম (আঃ) ক্বিয়ামতের মাঠে তাঁর ঝান্ডার নীচে হবেন। এও জানতেন না যে, মহান আল্লাহ তাঁর আগের ও পিছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তিনি এই কথা বলেছিলেন। যখন জানতে পারলেন যে, তিনিই শ্রেষ্ঠ তখন আবার ঐ সমস্ত হাদীছ বলেন, যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন

করে। যেমন নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন,

وأجاب العلماء عن هذا بأن النبي صلى الله عليه وسلم قال ذلك تواضعاً وهضماً لنفسه، أو أنه قال ذلك قبل أن يوحى إليه بأن الله تعالى اتخذه خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً، وأنه سيد الناس يوم القيامة، آدم فمن دونه تحت لوائه صلى الله عليه وسلم- كما جاء في الأحاديث الصحيحة

‘আলেমগণ এই হাদীছের দু’ভাবে জবাব দিয়েছেন। হয় তিনি এটা সম্মান ও ভদ্রতার খাতিরে বলেছেন বা তিনি এই খবর জানার আগে বলেছেন যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে যেভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাকেও সেভাবে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি ক্বিয়ামতের মাঠে আদম সন্তানের সরদার হবেন এবং আদম (আঃ) সহ সকলেই তাঁর ঝান্ডার নীচে হবেন। যেমন এই কথাগুলো ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।[51]

মানসূখ হওয়ার দলীল হ’তে পারে এই যে, এই হাদীছ আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন এবং আদম সন্তানের সরদার হওয়ার হাদীছ আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আর আবু হুরায়রা (রাঃ) অনেক পরে অর্থাৎ ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই তাঁর বর্ণিত হাদীছগুলো শেষের দিকের হাদীছ।

রাসূল (ছাঃ) আসলে ভদ্রতার কারণে অন্য কাউকে তাঁর সামনে তাঁর প্রশংসা করতে দিতেন না। এজন্যই তিনি যখনই তাঁর সম্মানের কথা জনগণের সামনে জানিয়েছেন তখনই বলেছেন, وَلاَ فَخَرَ ‘আমি এই কথা গর্ব করত বলছি না’। বরং তোমাদেরকে দ্বীনের একটা বিষয় জানানোর জন্য বলছি, যেন তোমরা তার উপর ঈমান আন।[52]

অবশ্য এই হাদীছ মানসূখ হ’লেও সম্পূর্ণরূপে মানসূখ নয়। কেননা এই হাদীছই দলীল যে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও মানব হচ্ছেন ইবরাহীম (আঃ)। যেমন শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, فَإِبْرَاهِيمُ أَفْضَلُ الْخَلْقِ بَعْدَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘ইবরাহীম (আঃ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পর সৃষ্টির সেরা’।[53]

সালাফে ছালেহীনের ঐক্যমত :

যুগ যুগ থেকে লালন করে আসা আক্বীদা যদি এমন হয়, তাহ’লে যারা আম জনসাধারণ তাদের আক্বীদার কোনও ভরসা নেই। কিন্তু সেই আক্বীদা যদি হয়  কুরআন ও হাদীছ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সালাফে ছালেহীন দ্বারা প্রচারিত যুগ যুগ থেকে লালন করে আসা ছাহাবায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিছীনে ইযামের আক্বীদা, তাহ’লে তাতে ভুলের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। বিশেষ করে যখন তা আক্বীদা সম্পর্কিত মাসাআলা হয়। কেননা একমাত্র আক্বীদার মাসআলাই এমন যাতে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীন-এর কোন মতভেদ নেই।

মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ এটা আক্বীদা সম্পর্কিত মাসাআলা। আর আক্বীদার অন্য মাসআলাগুলোর মত এই মাসআলাতেও সালাফে ছালেহীনের কোনও মতভেদ নেই। যেমন :

১. শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন,  قوله صلى الله عليه وسلم: أنا سيد ولد آدم صريح في تفضيله صلى الله عليه وسلم على جميع ولد آدم ‘রাসূল (ছাঃ)-এর এই কথা যে, ‘তিনি আদম সন্তানের সরদার’ স্পষ্ট দলীল যে তিনি সকল আদম সন্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’।[54]

২. ইমাম শাফেঈ (রহঃ) স্বীয় ‘রিসালাহ’ গ্রন্থে বলেন,

فكان خيرته المصطفى لوحيه المنتخب لرسالته المفضل على جميع خلقه بفتح رحمته وختم نبوته وأعم ما أرسل به مرسل قبله المرفوع ذكره مع ذكره في الاولى والشافع المشفع في الأخرى

‘মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ মুছত্বফা (ছাঃ) তাঁর অহি-র জন্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে এবং এমন রিসালাতের জন্য যা সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ আল্লাহর রহমতের কারণে ও খতমে নবুঅতের কারণে এবং তাঁর রিসালাতের বিশ্বব্যপ্তির কারণে, যা ইতিপূর্বে প্রেরিত কোনও নবীর ক্ষেত্রে ছিল না এবং দুনিয়াতে মুহাম্মাদের যিকর বা স্মরণকে স্বয়ং মহান আল্লাহর স্মরণের সাথে সম্পর্কিত করার কারণে এবং আখিরাতে তাঁকে প্রথম শাফা‘আত ও প্রথম যার শাফা‘আত গৃহীত হবে এই মর্যাদা দানের কারণে’।[55]

ইমাম ইবনে হাজার আল-হায়ছামী (রহঃ) বলেন, ‘ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এখানে স্পষ্ট আকারে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে যা উল্লেখ করেছেন সেটার উপরই রয়েছেন সমস্ত ওলামায়ে কেরাম’।[56]

৩. শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, وَقَدِ اتَّفَقَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْظَمُ الْخَلْقِ جَاهًا عِنْدَ اللَّهِ ‘মুসলমানগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর নিকটে মর্যাদাগতভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি’।[57] তিনি الفرقانُ بينَ أولياءِ الرَّحمَنِ وأولياءِ الشَّيْطان গ্রন্থে বলেন,

 أَفْضَلُ أَوْلِيَاءِ اللَّهِ هُمْ أَنْبِيَاؤُهُ، وَأَفْضَلُ أَنْبِيَائِهِ هُمُ الْمُرْسَلُونَ مِنْهُمْ، وَأَفْضَلُ الْمُرْسَلِينَ أُولُو الْعَزْمِ : نُوحٌ وَإِبْرَاهِيمُ وَمُوسَى وَعِيسَى وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ-

‘আল্লাহর ওলী বা বন্ধুগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন নবীগণ। নবীগণের মাঝে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন রাসূলগণ। রাসূলগণের মাঝে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন উলুল আযম বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী পাঁচজন রাসূল। তারা হ’লেন নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)। এরপর ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, وَأَفْضَلُ أُولِي الْعَزْمِ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাহসী পাঁচ জন রাসূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)’। এই কথা বলার পর ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উচ্চ মর্যাদার বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেছেন, যা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে।[58]

৪. শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) স্বীয় আক্বীদাতু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বইয়ে উল্লেখ করেছেন, রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তারপর ইবরাহীম (আঃ), তারপর মূসা (আঃ), তারপর নূহ (আঃ), তারপর ঈসা (আঃ)।

৫. শায়খ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ বলেন, ‘মুহাম্মাদ (ছাঃ) যে তাঁর অন্য নবী ভাইদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে কোনও মতভেদ নেই’।

৬. ইমাম নববী (রহঃ) তাঁর শরহে মুসলিম-এ ‘আমি আদম সন্তানের সরদার’ মর্মে বর্ণিত হাদীছের উপর এই নামে অধ্যায় রচনা করেছেন,باب تَفْضِيلِ نَبِيِّنَا صلى الله عليه وسلم عَلَى جَمِيعِ الْخَلاَئِقِ ‘রাসূল (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব’ অধ্যায়।

এরপর এই হাদীছের ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেন,وَهَذَا الْحَدِيثُ دَلِيْلٌ لِتَفْضِيْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْخَلْقِ كُلِّهِمْ لِأَنَّ مَذْهَبَ أَهْلِ السُّنَّةِ أَنَّ الْآدَمِيِّيْنَ أَفْضَلُ مِنَ الْمَلَائِكَةِ وَهُوَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْضَلُ الْآدَمِيِّيْنَ وَغَيْرِهِمْ   ‘এই হাদীছ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার দলীল। কেননা আহলুস সুন্নাহ-এর মাযহাব হচ্ছে, মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) সকল মানুষ ও অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’।[59]

৭. ইমাম রাযী এই বিষয়ে সালাফে ছালেহীনের ঐক্যমতের কথা উদ্ধৃত করেছেন।[60] সেখানে তিনি বলছেন, وَقَدْ حَكَى الرَّازِيّ الْإِجْمَاعَ عَلَى أَنَّهُ مُفَضَّلٌ عَلَى جَمِيعِ الْعَالَمِيْنَ ‘রাযী এই বিষয়ে ইজমা নকল করেছেন যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ’।

৮. ইমাম কুরতুবী বলেন, لأن النبي صلى الله عليه وسلم أفضل الأنبياء عليهم السلام ‘কেননা মুহাম্মাদ (ছাঃ) হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী’।[61]

৯. শায়খ আবদুল্লাহ বিন বায (রহঃ) বলেন, أن نبينا صلى الله عليه وسلم هو أفضل الأنبياء ‘নিশ্চয়ই আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী’।[62]

১০. ফাতাওয়া লাজনা দায়েমার ফৎওয়া নং ২০৯৭২-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।

অতএব যারা দলীল জানার পরেও রাসূল (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল স্বীকার করবে না এবং সালাফে ছালেহীন-এর বিশ্বাস ও আক্বীদা পরিপন্থী বিশ্বাস ও আক্বীদা পোষণ করবে তাঁরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত থেকে বের হয়ে যাবে।

রাসূল (ছাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ কিন্তু তিনি মানবতার উপরে নন। তিনি নূরের তৈরী নন এবং তিনি গায়েবের খবর জানতেন না। আর তাঁর কাছে প্রার্থনা করা শিরক।

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল স্বীকার না করা নতুন ফিৎনা। যারা একই দিনে ঈদ করার পক্ষে তারাই এই ফিৎনার উদ্ভাবক। এই ফিৎনা মুসলিম উম্মাহর রাসূল (ছাঃ)-এর উপর যে সীমাহীন ভালবাসা আছে সেই ভালবাসাকে হরাস করে ইত্তিবায়ে সুন্নাহ-এর জাযবাকে খতম করার এক নতুন ষড়যন্ত্র। কেননা ইসলাম ধর্মের সম্পূর্ণ ভিত্তি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর। তাঁর প্রতি উম্মতে মুসলিমার ভালবাসা ও সম্মান যত বাড়বে তত তাঁরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অনুসরণ করবে। তাই ইহুদী-খ্রিস্টানরা সর্বদা চায় মুসলিম উম্মাহর অন্তর থেকে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ভালাবাসা দূরীভূত করে ফেলতে। বিশেষ করে তারা বলে, তাদের নবী ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) একই। সকলেই আল্লাহর নবী যেকোন  একজনের আনুগত্য করলেই যথেষ্ট। এজন্য তাঁরা বলে থাকে যে, পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নামের চেয়ে ঈসা (আঃ)-এর নাম অধিকবার উল্লিখিত হয়েছে। বর্তমানে অনেক মুসলিম ভাইও তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে প্রকারান্তরে তাদেরই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছেন ।

সালাফে ছালেহীন-এর বুঝ অনুযায়ী কুরআন ও হাদীছ না বুঝলে যে মানুষ পথভ্রষ্ট হ’তে বাধ্য তাঁর একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এই মাসআলা। অতএব আসুন, আমরা শুধুমাত্র কুরআন অনুসরণ করব না। বরং কুরআন ও হাদীছ উভয়কেই মুক্তির দিশা হিসাবে গ্রহণ করব এবং সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপর আমল করব। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!

-আব্দুল্লাহ বিন আবদুর রাযযাক

[1]. তিরমিযী, মিশকাত হা/৬২৮৫, সনদ হাসান।

[2]. ইবনু কাছীর ২/৯৩, আলে ইমরান ১১০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[3]. ঐ।

[4]. আহমাদ হা/১৩৬১, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৯৩৯।

[5]. ফাৎহুল কাদীর ১/৪২৫, আলে ইমরান ১১০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[6]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৯৫।

[7]. বুখারী, মিশকাত হা/ ৫৮৬২।

[8]. আবুদাউদ হা/২০৫০, মিশকাত হা/৩০৯১।

[9]. তিরমিযী হা/২, ইবনু মাজাহ হা/৩৯৪০, ইবনে হিববান হা/৫৯৮৫।

[10]. মুসনাদে আহমাদ হা/১৩৫৯৪।

[11]. বুখারী হা/৪৭১২।

[12]. মুসলিম হা/১৫৬, মিশকাত হা/৫৫০৭, ছহীহাহ হা/২২৩৬।

[13]. তাফসীর ইবনে কাছীর, হিজর ৭২ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[14]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, আলে ইমরান ৮১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[15]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, আলে ইমরান ৮১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[16]. আহমাদ, মিশকাত হা/১৭৭, ইরওয়াউল গালীল হা/১৫৮৯।

[17]. বুখারী হা/৬৯৩০, মুসলিম হা/১০৬৬।

[18]. আহমাদ হা/২১২৮৩; ইবনে মাজাহ হা/৪৩১৪, মিশকাত হা/৫৭৬৮।

[19]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪১।

[20]. তিরমিযী হা/৩৬১৫, মিশকাত হা/৫৭৬১।

[21]. বুখারী হা/৩৫৫৭, মিশকাত হা/৫৭৩৯।

[22]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হা/৩২৩৪৩; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৮১।

[23]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪৮ ‘নবীগণের সরদারের ফযীলত’ অধ্যায়।

[24]. হাকেম হা/৩৩৩৫, মিশকাত হা/৫৭৭৩।

[25]. আহমাদ হা/৩৬০০, সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৩৩, সনদ হাসান।

[26]. তিরমিযী হা/৩১৩১, মিশকাত হা/৫৯২০ সনদ ছহীহ।

[27]. ফাতহুল বারী ‘মি‘রাজ’ অধ্যায়, ২/২০৭।

[28]. তিরমিযী হা/৩৬১২, ‘রাসূল (ছাঃ)-এর ফযীলত’ অধ্যায়, মিশকাত হা/৬৫৭, সনদ ছহীহ।

[29]. বুখারী হা/৬১৪, মিশকাত হা/৬৫৯।

[30]. বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫৭২, ‘হাওয ও শাফা‘আত’ অধ্যায়।

[31]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬৬, ‘ফাযায়েলে সাইয়েদুল মুরসালীন’ অধ্যায়।

[32]. আহমাদ হা/১৭০২৭, তিরমিযী হা/৩৬০৫।

[33]. মিশকাত হা/৫৭৫৭; তিরমিযী হা/৩৫৩২।

[34]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ঐ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ

[35]. তাফসীরে তাবারী, ৩/১১০, সূরা বাকারার ১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।

[36]. মুসনাদে বাযযার, সিলসিলাতুল আছার আছ-ছাহীহাহ হা/৪৬৪, সনদ হাসান, মাজমাঊয যাওয়ায়েদ হা/১৩৯২৯, যঈফুল জামে‘ হা/২৮৭৬

[37]. তাফসীর ইবনে কাছীর-এর এই আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর দ্রঃ।

[38]. বুখারী হা/৩৪১৪, মুসলিম হা/২৩৭৩, মিশকাত হা/৫৭০৯

[39]. বুখারী হা/২৪১১

[40]. বুখারী হা/২৪১২

[41]. মুসলিম হা/১৬২, মিশকাত হা/৫৮৬৩

[42]. শারহুস সুন্নাহ, ১৩/২০৪।

[43]. ফাতহুল বারী, হা/৩১৫৬, ১০/২০৫।

[44]. বায়হাক্বী, দালায়েলুন নবুঅত ৫/৪৯১।

[45]. বুখারী হা/৩৪১৫; মুসলিম হা/২৩৭৩ ‘মুসা (আঃ)-এর ফযীলত’ অধ্যায়।

[46]. বুখারী হা/৩৩৯৫, মুসলিম হা/২৩৭৬।

[47]. শরহে আবু দাউদ, ২৬/৪৫২, ‘নবীদের মধ্যে প্রাধান্য দেয়া’ অনুচ্ছেদ দ্রঃ।

[48]. ইমাম নববী, শরহে মুসলিম, ১৫/১৩২, ইমাম সৈয়ূতী, শরহে মুসলিম ৫/৩৬০, হা/২৩৭৬-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ।

[49]. মুসলিম, ‘ইবরাহীম (আঃ)-এর ফযীলত’ অধ্যায়।

[50]. বুখারী ‘নবুঅতের আলামত’ অধ্যায়, হা/৩৪১৫, তিরমিযী হা/২১৮৮।

[51]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪৪।

[52]. ইবনু মাজাহ হা/৪৩০৮, তিরমিযী হা/৩৬১৫।

[53]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ১৭/৪৮৩।

[54]. সিলসিলা যইফাহ হা/৫৬৭৮।

[55]. ইমাম শাফেঈ, কিতাবুর রিসালাহ ১/১৩।

[56]. আল-ফাতাওয়া আল-হাদীছিয়াহ ১/১৩৬, দারুল ফিকর।

[57]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ, দারুল ওয়াফা, ১/১৪৫।

[58]. ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ, আল-ফুরকান বায়না আওলিয়াইর রহমান ও আওলিইয়াইশ শায়তান, তাহক্বীক ও টীকা : আলী বিন নায়িফ আশ-শুহুদ, ‘উলুল আযমদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাম্মাদ (ছাঃ)’ অধ্যায়, ১/৮৩।

[59]. শরহে নববী, ১৫/৩৭, ‘আমাদের রাসূল (ছাঃ)-এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব’ অধ্যায়।

[60]. ইমাম নববীর, মিনহাজুত তালেবীল-এর শারহ তুহফাতুল মুহতাজ-এর ভূমিকা, ১/১০০।

[61]. সূরা নাহল ১২৩ নং আয়াতের তাফসীর।

[62]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১/১৭৯।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button