হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)

রাসূল (ছাঃ) -কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং মদীনায় হিজরত

পূর্বের অংশ পড়ুন: আক্বাবাহর বায়‘আত, ইসরা ও মিরাজ

ছাহাবীগণের ইয়াছরিবে কষ্টকর হিজরত শুরু :

বায়‘আতে কুবরা সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নির্যাতিত মুসলমানদের ইয়াছরিবে হিজরতের অনুমতি দিলেন। এই হিজরত অর্থ স্রেফ দ্বীন ও প্রাণ রক্ষার্থে সর্বস্ব ছেড়ে দেশত্যাগ করা। কিন্তু এই হিজরত মোটেই সহজ ছিল না। মুশরিক নেতারা উক্ত হিজরতে চরম বাধা হয়ে দাঁড়ালো। ইতিপূর্বে তারা হাবশায় হিজরতে বাধা দিয়েছিল। এখন তারা ইয়াছরিবে হিজরতে বাধা দিতে থাকল। ইসলামের প্রসার বৃদ্ধিতে বাধা দেওয়া ছাড়াও এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক কারণ ছিল এই যে, মক্কা থেকে ইয়াছরিব হয়ে সিরিয়ায় তাদের গ্রীষ্মকালীন ব্যবসা পরিচালিত হ’ত। এ সময় সিরিয়ায় তাদের বার্ষিক ব্যবসার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ দীনার। এছাড়াও ছিল ত্বায়েফ-এর ব্যবসা। উভয় ব্যবসার জন্য যাতায়াতের পথ ছিল ইয়াছরিব। আল্লাহ পাক এমন এক স্থানে নির্যাতিত মুসলমানদের হিজরতের ব্যবস্থা করেন, যা হয়ে ওঠে এক অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ভূমি।

দ্বিতীয়ত: এই হিজরতের  রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল এই যে, ইয়াছরিবে মুহাজিরগণের অবস্থান সুদৃঢ় হ’লে এবং ইয়াছরিববাসীগণ ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিলে তা মক্কার মুশরিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিবে। ফলে তা মক্কাবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। যাতে তাদের জান-মাল ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু হুমকির মধ্যে পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে তারা হিজরত বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে এবং সম্ভাব্য হিজরতকারী নারী-পুরুষের উপরে যুলুম ও অত্যাচার শুরু করে দেয়। যাতে তারা ভীত হয় ও হিজরতের সংকল্প ত্যাগ করে। নিম্নে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হ’ল:

(১) ছুহায়েব রূমী (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লেন। কিছু দূর যেতেই মুশরিকরা তাকে রাস্তায় ঘিরে ফেলে। তিনি সওয়ারী থেকে নেমে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, দেখ তোমরা জানো যে, আমার তীর সাধারণতঃ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। অতএব আমার তূণীরে একটা তীর বাকী থাকতেও তোমরা আমার কাছে ভিড়তে পারবে না। তীর শেষ হয়ে গেলে তলোয়ার চালাব। অতএব তোমরা যদি দুনিয়াবী স্বার্থ চাও, তবে মক্কায় রক্ষিত আমার বিপুল ধন-সম্পদের সন্ধান বলে দিচ্ছি, তোমরা সেগুলি নিয়ে নাও এবং আমার পথ ছাড়। তখন তারা পথ ছেড়ে দিল। মদীনায় পৌঁছে এই ঘটনা বর্ণনা করলে রাসূলুললাহ (ছাঃ) তাকে প্রশংসা করে বলেন, ربح البيع ابا يحي  ‘হে আবু ইয়াহইয়া! তোমার ব্যবসা লাভ জনক হয়েছে’। ছুহায়েব-এর এই আত্মত্যাগের প্রশংসা করে সূরা বাক্বারাহর ২০৭ আয়াতটি নাযিল হয়। وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّشْرِيْ نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللهِ وَاللهُ رَؤُوْفٌ بِالْعِبَادِ ‘লোকদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখে। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অতীব স্নেহশীল’।[1] ছুহায়েব রূমী ৩৮ হিজরীতে  ৭৩ বছর বয়সে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন।

(২) আবু সালামাহ (রাঃ) যিনি ইতিপূর্বে মুসলমান হয়ে সস্ত্রীক হাবশায় হিজরত করেছিলেন। তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে বায়‘আতে কুবরার বছর খানেক পূর্বে কোলের পুত্র সন্তানসহ স্ত্রী উম্মে সালামাকে নিয়ে হিজরত করেন। কিন্তু মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার পর পথিমধ্যে আবু সালামার গোত্রের লোকেরা এসে তাদের বংশধর দাবী করে শিশু পুত্র সালামাকে ছিনিয়ে নেয়। অতঃপর উম্মে সালামার পিতৃপক্ষের লোকেরা এসে তাদের মেয়েকে জোর করে তাদের বাড়ী নিয়ে যায়। ফলে আবু সালামা স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে একাকী ইয়াছরিবে হিজরত করেন। এদিকে বিচ্ছেদকাতর উম্মে সালামা প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বামী ও সন্তান হারানোর সেই স্থানটিতে এসে কান্নাকাটি করতে থাকেন ও আল্লাহর কাছে দো‘আ করতে থাকেন। এভাবে প্রায় একটি বছর অতিবাহিত হয়। অবশেষে তার পরিবারের জনৈক ব্যক্তির মধ্যে দয়ার উদ্রেক হয়। তিনি সবাইকে বলে রাযী করিয়ে তাকে সন্তানসহ মদীনায় চলে যাওয়ার অনুমতি আদায় করেন। অনুমতি পাওয়ায় সাথে সাথে তিনি একাকী মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। মক্কার অদূরে ‘তানঈম’ নামক স্থানে পৌঁছলে কা‘বাগৃহের চাবি রক্ষক উছমান বিন ত্বালহা বিন আবী তালহা তার এই নিঃসঙ্গ যাত্রা দেখে ব্যথিত হন এবং তিনি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গী হ’লেন। তাঁকে তার সন্তানসহ উটে সওয়ার করিয়ে নিজে পায়ে হেঁটে প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে যখন মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছলেন, তখন তাঁকে একাকী ছেড়ে দিয়ে পুনরায় মক্কার পথে প্রত্যাবর্তন করলেন।

উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামী আবু সালামা প্রথম দিকের মুসলমান ছিলেন। একটি বর্ণনা মতে আবু সালামা ছিলেন একাদশতম মুসলমান। তাদের স্বামী-স্ত্রীর আক্বীদা ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তদুপরি আবু সালামা ছিলেন রাসূলের দুধভাই। তিনি বদরের যুদ্ধে শরীক হন এবং ওহোদের যুদ্ধে আহত হয়ে পরে মৃত্যু বরণ করেন। তখন দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে উম্মে সালামা দারুণ কষ্টে নিপতিত হন। ফলে দয়া পরবশে রাসূল (ছাঃ) তাকে নিজ স্ত্রীত্বে বরণ করে নেন।

(৩) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) ২০ জনের একটি দল নিয়ে হিজরত করেন। পূর্বের প্রস্তাব আইয়াশ বিন আবী রাবী‘আহ এবং হেশাম বিন ‘আছ বিন ওয়ায়েল প্রত্যুষে একস্থানে হাযির হয়ে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাফেররা হেশাম (রাঃ)-কে বন্দী করে ফেলে। অতঃপর আইয়াশ (রাঃ) ওমর (রাঃ) সহ যখন মদীনায় ‘ক্বোবা’-তে পৌঁছে গেলেন, তখন পিছে পিছে আবু জাহল ও তার ভাই হারেছ গিয়ে উপস্থিত হ’ল এবং বলল যে, হে আইয়াশ! তোমার ও আমার মা মানত করেছেন যে, যতক্ষণ তোমাকে দেখতে না পাবে, ততক্ষণ চুল অাঁচড়াবে না এবং রোদ ছেড়ে ছায়ায় যাবে না’। একথা শুনে আইয়াশের মধ্যে মায়ের দরদ উথলে উঠলো এবং সাথে সাথে মক্কায় ফিরে যাওয়ার মনস্থ করল। ওমর (রাঃ) আবু জাহলের চালাকি অাঁচ করতে পেরে আইয়াশকে নিষেধ করলেন এবং বুঝিয়ে বললেন যে, আল্লাহর কসম! তোমাকে তোমার দ্বীন থেকে সরিয়ে নেবার জন্য এরা কুট-কৌশল করেছে। আল্লাহর কসম! তোমার মাকে যদি উকুনে কষ্ট দেয়, তাহ’লে তিনি অবশ্যই চিরুনী ব্যবহার করবেন। আর যদি রোদে কষ্ট দেয়, তাহ’লে অবশ্যই তিনি ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নিবেন। অতএব তুমি ওদের চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়ো না। কিন্তু আইয়াশ কোন কথাই শুনলেন না। তখন ওমর (রাঃ) তাকে শেষ পরামর্শ দিয়ে বললেন, আমার এই দ্রুতগামী উটনীটা নিয়ে যাও। ওদের সঙ্গে একই উটে সওয়ার হয়ো না। মক্কায় গিয়ে উটটাকে নিজের আয়ত্তে রাখবে এবং কোনরূপ মন্দ আশংকা বুঝলে এতে সওয়ার হয়ে পালিয়ে আসবে। উল্লেখ্য যে, আবু জাহল, হারেছ ও আইয়াশ তিনজন ছিল একই মায়ের সন্তান।
মক্কার অদূরে পৌঁছে আবু জাহল চালাকি করে বলল, হে আইয়াশ! আমার উটটাকে নিয়ে খুব অসুবিধায় পড়েছি। তুমি কি আমাকে তোমার উটে সওয়ার করে নিবে? আইয়াশ সরল মনে রাযী হয়ে গেল এবং উট থামিয়ে মাটিতে নেমে পড়ল। তখন দু’জনে একত্রে আইয়াশের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে ফেলল এবং ঐ অবস্থায় মক্কায় পৌঁছল। এভাবে হেশাম ও আইয়াশ মক্কায় কাফেরদের একটি বন্দীশালায় আটকে পড়ে থাকলেন।
পরবর্তীতে রাসূল (ছাঃ) হিজরত করে মদীনায় গিয়ে একদিন সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  من لى بعياش وهشام ‘কে আছ যে আমার জন্য আইয়াশ ও হেশামকে মুক্ত করে আনবে?’ তখন অলীদ ইবনুল অলীদ বলে উঠলেন انا لك يا رسول الله ‘আমি প্রস্ত্তত আপনার জন্য হে আল্লাহর রাসূল! অতঃপর তিনি গোপনে মক্কায় পৌঁছে ঐ বন্দীশালায় খাবার পরিবেশনকারীণী মহিলার পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং দেওয়াল টপকে ছাদবিহীন উক্ত যিন্দানখানায় লাফিয়ে পড়ে তাদেরকে বাঁধনমুক্ত করে মদীনায় নিয়ে এলেন।

এইভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাহাবায়ে কেরাম মক্কা হ’তে মদীনায় গোপনে পাড়ি জমাতে থাকেন। ফলে বায়‘আতে কুবরার পরে দু’মাসের মধ্যেই প্রায় সকলে মদীনায় হিজরত করে যান। কেবল কিছু দুর্বল মুসলমান মক্কায় অবশিষ্ট থাকেন। যাদেরকে মুশরিকরা বলপূর্বক আটকে রেখেছিল।
হযরত আবুবকর (রাঃ) যেতে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে নিষেধ করে বলেন, على رِسْلِكَ فانى أرجو أن يؤذن لى ‘থেমে যাও! আমি আশা করছি যে, আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে’।[2] এভাবে রাসূল, আবুবকর ও আলী ব্যতীত মক্কায় আর কোন মুসলমান অবশিষ্ট থাকলেন না।
রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র কুরায়েশ নেতারা দেখল যে, এত প্রতিবন্ধকতা ও অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও যারা একবার ইসলাম কবুল করছে, তারা তা আর পরিত্যাগ করছে না এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে তারা মদীনায় গিয়ে অবস্থান নেওয়ায় তা কুরায়েশ নেতাদের জন্য ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সেই সাথে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হুমকিও দেখা দিতে পারে। তারা একজোট হয়ে ইসলামে দীক্ষিত মদীনাবাসীদের নিয়ে মক্কায় হামলা চালাতে পারে। অতএব সবকিছুর মূল উপড়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে বায়‘আতে কুবরা-র প্রায় আড়াই মাস পর চতুর্দশ নববী বর্ষের ২৬শে ছফর মোতাবেক ১২ই সেপ্টেম্বর ৬২২ খৃষ্টাব্দ বৃহস্পতিবার দিনের প্রথম ভাগে তাদের অবিসংবাদিত সাবেক কুরায়েশ নেতা কুছাই বিন কিলাব প্রতিষ্ঠিত বৈঠক ঘর দারুন নাদওয়াতে কুরায়েশ-এর অধিকাংশ গোত্রনেতাদের এক যরূরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে (১) বনু মাখযূম গোত্র থেকে আবু জাহল (২) বনু নওফেল বিন আবদে মানাফ থেকে জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম বিন আদী, তু‘আইমা বিন আদী ও হারেছ বিন আমের (৩) বনু আবদে শাম্স বিন আবদে মানাফ থেকে আবু সুফিয়ান বিন হারব এবং রাবী‘আহর দুই পুত্র উৎবা ও শায়বা (৪) বনু আব্দিদ্দার হ’তে নযর ইবনুল হারিছ (৫) বনু আসাদ বিন আব্দুল উযযা থেকে আবুল বুখতারী বিন হেশাম, যাম‘আহ ইবনুল আসওয়াদ ও হাকীম বিন হেযাম (৬) বনু সাহ্ম থেকে হাজ্জাজ-এর দুই পুত্র নাবীহ ও মুনাবিবহ এবং (৭) বনু জুমাহ (نبو جمح) থেকে উমাইয়া বিন খালাফ। উল্লেখ্য যে, এই বৈঠকে রাসূলের গোত্র বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিবকে ডাকা হয়নি।

উপরোক্ত সাত গোত্রের  ১৪ জন নেতা দারুন নাদওয়াতে পূর্বাহ্নে বসে আলোচনা শুরু করে। আবু জাহল প্রস্তাব দিয়ে বলল, প্রতি গোত্র থেকে একজন করে সুঠামদেহী যুবক বাছাই করে তাদেরকে তরবারি দেওয়া হৌক। অতঃপর তারা এসে একসাথে আঘাত করে তাকে শেষ করে দিক। এতে তিনটা লাভ হবে। এক- আমরা তার হাত থেকে বেঁচে যাব। দুই- তার গোত্র আমাদের সব গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস করবে না। তিন- একজনের রক্তমূল্য বাবদ একশত উট আমরা সব গোত্র ভাগ করে দিয়ে দেব। যা কারু জন্য কষ্টকর হবে না’।

আবু জাহলের এই প্রস্তাবকে সকলে সানন্দে কবুল করল এবং এর উপরেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সবাই নিষ্ক্রান্ত হ’ল।

ষড়যন্ত্রকারী ১৪ জন নেতার পরিণতি :

উপরোক্ত ১৪ জন নেতার মধ্যে ১১ জন মাত্র দু’বছর পরে ২য় হিজরীর ১৭ রামাযানে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে একদিনেই নিহত হয়। বাকী তিনজন জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম, হাকীম বিন হেযাম ও আবু সুফিয়ান ইবনু হারব পরবর্তীতে মুসলমান হয়ে যান। আল্লাহ বলেন, إِنَّهُمْ يَكِيدُوْنَ كَيْداً، وَأَكِيدُ كَيْداً- ‘তারা জোরালো কৌশল করেছিল। আর আমিও কেŠশল করি’। ‘অতএব কাফেরদের … কিছুদিনের জন্য অবকাশ দিন’ (ত্বারেক ৮৬/১৫-১৭)।

রাসূলের গৃহ অবরোধ ও হিজরত :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হত্যার নির্দয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর নেতারা সারা দিন প্রস্ত্ততি নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা অন্ধকার রাতে এসে চারদিক থেকে বাড়ী ঘেরাও করে ফেলে। যাতে মধ্য রাত্রির পরেই হামলা করে নবীকে ঘুমন্ত অবস্থায় শেষ করে দেয়া যায়। এই অবরোধ কার্যে সশরীরে অংশ নেয় মোট ১১ জন। তার মধ্যে দারুন নাদওয়াতে বসে ষড়যন্ত্রকারী নেতাদের মধ্যেকার সাতজন ছিল আবু জাহল, নাযার ইবনুল হারেছ, উমাইয়া বিন খালাফ, যাম‘আহ ইবনুল আসওয়াদ, তু‘আইমা বিন আদী এবং দু’ভাই নাবীহ ও মুনাবিবহ। বাকী চারজন ছিল হাকাম বিন আবুল ‘আছ, ওক্ববা বিন আবু মু‘আইত্ব, আবু লাহাব ও উবাই বিন খালাফ।

আল্লাহর কৌশল :

কাফেররা তাদের কৌশলে পাকাপোক্ত ছিল। ওদিকে আল্লাহর কৌশল ছিল অন্যরূপ। যেমন তিনি বলেন, وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِيُثْبِتُوْكَ أَوْ يَقْتُلُوْكَ أَوْ يُخْرِجُوْكَ وَيَمْكُرُوْنَ وَيَمْكُرُ اللهُ وَاللهُ خَيْرُ الْمَاكِرِيْنَ- ‘স্মরণ কর সেই সময়ের কথা, যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এজন্য যে, তোমাকে বন্দী করবে অথবা হত্যা করবে অথবা বিতাড়িত করবে। এভাবে তারা নিজেদের ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল, আর আল্লাহ স্বীয় কৌশল করছিলেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ হ’লেন শ্রেষ্ঠ কেŠশলী’ (আনফাল ৮/৩০)।

আরও দেখুন:  খন্দক ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দিক ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী

পূর্বাহ্নে যখন দারুন নাদওয়াতে রাসূলকে হত্যার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তখনই জিব্রীল মারফত রাসূলকে তা জানিয়ে দেওয়া হয় এবং রাতে নিজ শয্যায় ঘুমাতে নিষেধ করা হয়। এতেই হিজরতের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দুপুরেই আবুবকর (রাঃ)-এর গৃহে তাশরীফ আনেন এবং হিজরতের সময়-সূচী ও অন্যান্য আলোচনা সম্পন্ন করেন। সেমতে আবুবকর (রাঃ) পূর্ণ প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন।

রাত্রি বেলায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হযরত আলীকে তাঁর বিছানায় শুতে বলেন এবং তাঁর নিকটে রক্ষিত প্রতিবেশীদের আমানত সমূহ যথাস্থানে ফেরত দেবার দায়িত্ব দেন।

হিজরত শুরু :

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মধ্যরাতের সামান্য পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং শত্রুদের মাথার উপরে এক মুঠি কংকরযুক্ত মাটি ছড়িয়ে দিলেন সূরা ইয়াসীনের ৯নং আয়াতটি পাঠ করে (যাদুল মা‘আদ ৩/৪৬)। যেখানে বলা হয়েছে, وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيْهِمْ سَدّاً وَّمِنْ خَلْفِهِمْ سَدّاً فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لاَ يُبْصِرُوْنَ- ‘আর আমরা তাদের সম্মুখে ও পিছনে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করালাম। অতঃপর তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেললাম। ফলে তারা দেখতে পেল না’ (ইয়াসীন ৩৬/৯)।

তিনি নির্বিঘ্নে বেরিয়ে এসে আবু বকরের গৃহে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর তাকে নিয়ে উত্তরমুখী ব্যস্ত পথ ছেড়ে দক্ষিণ মুখী ইয়ামানের পথ ধরে পদব্রজে যাত্রা করলেন। অতঃপর মক্কার দক্ষিণ-পূর্বে ৩ কি:মি: দূরত্ব পাড়ি দিয়ে অন্ধকার থাকতেই ছওর পাহাড়ে পৌছে গেলেন। অতঃপর পাহাড়ের পাদ দেশে পৌঁছে আবুবকর রাসূলকে কাঁধে উঠিয়ে নেন ও ধারালো পর্বতগাত্র বেয়ে উঠে খাড়া পাহাড়টির শীর্ষদেশে একটি গুহা মুখে উপনীত হন। যাতে তার দু’পা ফেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়। আবুবকর প্রথমে একাকী অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করে অতিরিক্ত একটি কাপড় ছিঁড়ে ছোট ছোট ছিদ্র মুখগুলো বন্ধ করে দিলেন। তারপর রাসূলকে ভিতরে  ডেকে নিলেন। এই গুহাটিই ইতিহাসে ‘গারে ছওর’ নামে পরিচিত।

এই সংকটময় রাতের কথা বলতে গিয়ে ওমর (রাঃ) আল্লাহর কসম করে বলেন, والذى نفس بيده لتلك الليلة خير من آل عمر- ‘ঐ এক রাতের আমল গোটা ওমর পরিবারের সারা জীবনের আমল অপেক্ষা উত্তম’।[3] একবার তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি আকাংখা রাখি যেন আমার সারা জীবনের আমল আবু বকরের শুধু একটি রাতের বা একটি দিনের আমলের সমপরিমাণ হিসাবে গণ্য হয়’।

চতুর্দশ নববী বর্ষের ২৭শে ছফর বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে মোতাবেক ৬২২ খৃষ্টাব্দের ১২/১৩ সেপ্টেম্বর তাঁরা মক্কার গৃহ ত্যাগ করে ভোরের দিকে ছওর গিরিগুহায় পৌঁছেন। সেখানে তাঁরা শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার তিনদিন তিন রাত অবস্থান করেন।

গৃহ থেকে গুহা- কিছু ঘটনাবলী :

(১) অবরোধকারীদের প্রতিক্রিয়া : রাসূলের গৃহ অবরোধকারীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় প্রহর গুণছে মধ্যরাত্রি পার হওয়ার। ওদিকে তার আগেই রাসূল (ছাঃ) তাদের সামনে দিয়ে চলে গেছেন। অথচ ওরা টেরই পায়নি। সকাল পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করল। কিন্তু পরে তারা আলীকে দেখে হতাশ হয়ে গেল। রাগে ও ক্ষোভে তারা আলীকে মারতে মারতে কা‘বা গৃহ পর্যন্ত নিয়ে কিছু সময় আটকে রেখে পরে ছেড়ে দেয়। এরপর তারা আসে আবু বকরের গৃহে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে না পেরে নরাধম আবু জাহল ছোট্ট মেয়ে আসমা বিনতে আবুবকরের মুখে এমন জোরে চপেটাঘাত করে যে, তার কানের দুল ছিঁড়ে পড়ে যায় এবং কানের লতি ফেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়।

(২) মক্কা ত্যাগকালে রাসূলের প্রতিক্রিয়া : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মক্কা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন, তখন মক্কার জনবসতি ও বায়তুল্লাহকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন,اللهم انتِ أحبُّ البلاد إلى الله وأنتِ أحبُّ البلاد إلىّ ولولا المشركون أَهْلُكِ أَخْرَجُونِي لَماَ خرجتُ منكِ ‘হে মক্কা নগরী! দুনিয়ার সমস্ত নগরীর চাইতে তুমিই আমার কাছে অধিক প্রিয়। যদি মক্কার লোকেরা আমাকে বের করে না দিত, তবে আমি স্বেচ্ছায় তোমাকে কখনো পরিত্যাগ করতাম না’।

এই সময় যে আয়াতটি নাযিল হয় তা নিম্নরূপ-

وَكَأَيِّنْ مِّنْ قَرْيَةٍ هِيَ أَشَدُّ قُوَّةً مِّنْ قَرْيَتِكَ الَّتِيْ أَخْرَجَتْكَ أَهْلَكْنَاهُمْ فَلاَ نَاصِرَ لَهُمْ-

‘যে জনপদ তোমাকে বহিষ্কার করেছে, তার চাইতে কত শক্তিশালী জনপদকে আমরা ধ্বংস করেছি। অতঃপর তাদেরকে সাহায্য করার কেউ ছিল না’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৩)। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, সূরা মুহাম্মাদ মাদানী সূরা হ’লেও এ আয়াতটি ছিল মাক্কী, কেননা এটি হিজরত কালে মক্কা ছাড়ার সাথে সাথে নাযিল হয়।

(৩) গুহার  মুখে শত্রু দল : রাসূলকে না পেয়ে কোরায়েশ নেতারা  চারিদিকে অনুসন্ধানী দল পাঠায় এবং ঘোষণা করে দেয় যে, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ ও আবুবকরকে বা দু’জনের কাউকে জীবিত বা মৃত ধরে আনবে তাকে একশত উট পুরস্কার দেওয়া হবে। সন্ধানী দল এক সময় ছওর গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছে। এমনকি আবুবকর (রাঃ) তাদের পা দেখতে পান। তাদের কেউ নীচের দিকে তাকালেই তাদের দেখতে পেত। ফলে তিনি রাসূলের জীবন নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েন। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, لاَ تحزن إن الله معنا ‘দুঃখিত হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’। বিষয়টির বর্ণনা আল্লাহ দিয়েছেন এভাবে-

إِلاَّ تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَار إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهِ لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللهُ سَكِيْنَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُوْدٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِيْنَ كَفَرُواْ السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللهُ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌِ-

‘যদি তোমরা তাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল। তিনি ছিলেন দু’জনের একজন। যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় ‘সাকীনাহ’ (প্রশান্তি) নাযিল করলেন এবং তার সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথা সদা সমুন্নত। আল্লাহ হ’লেন পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (তওবা ৯/৪০)।

রক্তপিপাসু শত্রুকে সামনে রেখে ঐ সময়ের ঐ নাযুক অবস্থায় لاتحزن إن الله معنا এই ছোট্ট কথাটি মুখ দিয়ে বের হওয়া কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন একজন মানুষ সম্পূর্ণ রূপে কায়মনোচিত্তে আল্লাহর উপরে নিজেকে সোপর্দ করে দেন। দুনিয়াবী কোন উপায়-উপকরণের উপরে নির্ভরশীল ব্যক্তির পক্ষে এরূপ কথা বলা আদৌ সম্ভব নয়। বস্ত্ততঃ একথা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিভিন্ন সংকটকালে আরও কয়েকবার বলেছেন। এখানে ‘অদৃশ্য বাহিনী’ বলতে ফেরেশতাগণ হ’তে পারে কিংবা অন্য কোন অদৃশ্য শক্তি হ’তে পারে, যা মানুষের কল্পনার বাইরে। মূলতঃ সবই আল্লাহর বাহিনী। সবচেয়ে বড় কথা, সারা পাহাড় তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর গুহা মুখে পৌঁছেও তারা গুহার মধ্যে খুঁজল না, এমনকি তাকিয়েও দেখল না, তাদের এই মনের পরিবর্তনটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল সরাসরি গায়েবী মদদ এবং রাসূলের অন্যতম মো‘জেযা। আল্লাহ বলেন, وَمَا يَعْلَمُ جُنُوْدَ رَبِّكَ إِلاَّ هُوَ- ‘তোমার প্রভুর সেনাবাহিনীর খবর তোমার প্রভু ব্যতীত কেউ জানে না’ (মুদ্দাছছির ৭৪/৩১)। আর একারণেই হাযারো প্রস্ত্ততি নিয়েও অবশেষে কুফরীর ঝান্ডা অবনমিত হয় ও কালেমার ঝান্ডা সর্বদা উন্নীত হয়।

আবুবকর কন্যা আসমার ঈমানী তেজ :

(ক) বাসায় রক্ষিত পাঁচ/ছয় হাযার মুদ্রার সবই পিতা আবুবকর যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে যান। তাঁরা চলে যাবার পর আসমার বৃদ্ধ ও অন্ধ দাদা আবু কোহাফা এসে আসমাকে বললেন, বেটি! আমি মনে করি, আবুবকর তোমাদের দ্বিগুণ কষ্টে ফেলে গেল। এক- সে নিজে চলে গেল। দুই- নগদ মুদ্রা সব নিয়ে গেল। একথা শুনে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে আসমা একটা পাথর কাপড়ে জড়িয়ে টাকা রাখার গর্তে রেখে এসে দাদাকে সেখানে নিয়ে গেল এবং দাদার হাত উক্ত গর্তের মধ্যে কাপড়ের গায়ে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই দেখ দাদু! আববা সব মুদ্রা রেখে গেছেন’। বুড়া তাতে মহা খুশী হয়ে বলল, যাক! এখন আবুবকর যাওয়াতে আমার কোন দুঃখ নেই। উল্লেখ্য যে, আবুবকর (রাঃ)-এর পিতা আবু ক্বোহাফা ঐ সময় কাফের ছিলেন। পরে তিনি মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমান হন।

জানা আবশ্যক যে, ছাহাবীগণের মধ্যে একমাত্র আবুবকর (রাঃ) এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন যে, তার চার পুরুষ মুসলমান ও ছাহাবী ছিলেন। অর্থাৎ তিনি, তাঁর পিতা, তাঁর সন্তানগণ এবং তাদের সন্তানগণ। তন্মধ্যে খ্যাতনামা ছিলেন তাঁর দৌহিত্র আসমার পুত্র ও আয়েশার পালিত পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রাঃ)। যিনি ছিলেন ১ম হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুহাজির সন্তান।

(খ) হিজরতের প্রাক্কালে আসমা সফরের মাল-সামান ও খাদ্য-সামগ্রী বাঁধার জন্য রশিতে কম পড়ায় নিজের কোমরবন্দ খুলে তা ছিঁড়ে দু’টুকরা করে এক অংশ দিয়ে থলির মুখ বাঁধেন ও বাকী অংশ দিয়ে নিজের কোমরবন্ধনীর কাজ সারেন। এ কারণে তিনি ذات النطاقين বা দুই কোমর বন্ধনীর অধিকারিণী উপাধিতে ভূষিত হন।

(গ) তাছাড়া আয়েশা (রাঃ) আসমার সাথে সকল কাজে সাহায্য করেন (ঘ) তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ পিতার সাথে রাতে গুহায় কাটাতেন ও ভোর রাতে বাড়ি ফিরে আসতেন। অত:পর শত্রুপক্ষের খবরাখবর নিয়ে রাতের বেলা পুনরায় গুহায় চলে যেতেন।[4]

(ঙ) আবুবকরের গোলাম আমের বিন ফুহাইরা ছওর পর্বতের পার্শ্ববর্তী ময়দানে দিনের বেলা ছাগল চরাতো। তারপর রাতের একাংশ অতিবাহিত হ’লে সে ছাগল পাল নিয়ে ছওর পাহাড়ের পাদদেশে চলে আসত এবং গোপনে রাসূল ও আবুবকরকে দুধ পান করাত। তারপর ভোর হবার আগেই ছাগলপাল পুনরায় দূরে নিয়ে যেত। এইভাবে দেখা যায় যে, আবুবকর (রাঃ)-এর পুরো পরিবার হিজরতের প্রস্ত্ততিতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

গুহা থেকে মদীনা :

তিনদিন ধরে খোঁজাখুজির পর ব্যর্থ মনোরথ হয়ে কাফেররা একপ্রকার রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। আব্দুল্লাহর মাধ্যমে সব খবর জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এবার ইয়াছরিব যাত্রার নির্দেশ দিলেন। এজন্য আবুবকর (রাঃ) পূর্বেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। দু’টি হৃষ্ট-পুষ্ট উট তিনি ঠিক করেছিলেন। তাছাড়া রাস্তা দেখানোর জন্য দক্ষ পথ প্রদর্শক আব্দুল্লাহ বিন আরীক্বত লায়ছীকে عبد الله بن اريقط الليثى  উপযুক্ত মজুরীর মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। যদিও সে তখন কাফেরদের দলভুক্ত ছিল। চুক্তি মতে সে চতুর্থ রাত্রিতে দু’টি উট নিয়ে যথাসময়ে উপস্থিত হ’ল। একটি উটে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও আবুবকর (রাঃ) এবং অন্যটিতে গোলাম আমের বিন ফুহায়রা ও পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ বিন আরীক্বত সওয়ার হ’লেন।

১লা রবীউল আউয়াল সোমবার মোতাবেক ৬২২ খৃষ্টাব্দের ১৬ই সেপ্টেম্বর রাতে তাঁরা ছওর গিরি গুহা ছেড়ে ইয়াছরিব অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন।
পথ প্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইয়াছরিব যাওয়ার পরিচিত পথ ছেড়ে লোহিত সাগরের উপকূলের দিকে ইয়ামনের পথ ধরে চললেন। অতঃপর এমন এক পথে গেলেন, যে পথের সন্ধান সাধারণভাবে কেউ জানত না।

ছওর গুহা থেকে মদীনা : পথিমধ্যের কিছু ঘটনা

(১) যাত্রাবস্থায় আবুবকর (রাঃ) সর্বদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পিছনে বসেন। কেননা আবুবকরের মধ্যে বার্ধক্যের চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু রাসূলের চেহারা-ছূরতে তখনো ছিল যৌবনের চাকচিক্য। তাই রাস্তায় লোকেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে মুরববী ভেবে আবু বকরকেই করতো। সামনের লোকটির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলতেন, هذا الرجل يهدينى السبيل এ ব্যক্তি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন’।[5] এর দ্বারা তিনি হেদায়াতের পথ বুঝাতেন। কিন্তু লোকেরা ভাবত রাস্তা দেখানো কোন লোক হবে। এর দ্বারা তিনি রাসূলের পরিচয় গোপন করতেন। আরবী অলংকার শাস্ত্রে এই দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যকে ‘তাওরিয়া’ বলা হয়। যাতে একদিকে সত্য বলা হয়। অন্যদিকে শ্রোতাকেও বুঝানো যায়।

(২) উম্মে মা‘বাদের তাঁবুতে : খোযা‘আহ গোত্রের খ্যাতনাম্নী অতিথিপরায়ণ মহিলা উম্মে মা‘বাদের খীমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, পানাহারের কিছু আছে কি-না? ঐ মহিলার অভ্যাস ছিল তাঁবুর বাইরে বসে থাকতেন মেহমানের অপেক্ষায়। মেহমান পেলে তাকে কিছু না খাইয়ে ছাড়তেন না। কিন্তু এইদিন এমন হয়েছিল যে, বাড়ীতে পানাহারের মত কিছুই ছিল না। ঐ সময়টা ছিল ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সময়। বকরীগুলো সব মাঠে নিয়ে গেছে স্বামী আবু মা‘বাদ। একটা কৃশ দুর্বল বকরী যে মাঠে যাওয়ার মত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল, সেটা তাঁবুর এক কোনে বাঁধা ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেটাকে দোহন করার অনুমতি চাইলেন। উম্মে মা‘বাদ বললেন, ওর পালানে কিছু থাকলে আমিই আপনাদের দোহন করে দিতাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বকরীটির বাঁটে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে হাত রাখলেন ও বরকতের দো‘আ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর ইচ্ছায় বকরীটির পালান দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। তারপর তিনি দোহন করতে থাকলেন। তাতে দ্রুত পাত্র পূর্ণ হয়ে গেল। প্রথমে বাড়ীওয়ালী উম্মে মা‘বাদকে পান করালেন। তারপর সাথীদের এবং সবশেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পান করলেন। এরপরে এক পাত্র পূর্ণ করে উম্মে মা‘বাদের কাছে রেখে তারা পুনরায় যাত্রা করলেন।
অল্পক্ষণ পরেই আবু মা‘বাদ বাড়ীতে ফিরে সব ঘটনা শুনে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলো- والله هذا صاحب قريش… لقد هممت أن أصحبه ولأفعلن إن وجدت إلى ذلك سبيلا- ‘আল্লাহর কসম! ইনিতো কুরায়েশদের সেই মহান ব্যক্তি। যাঁর সম্পর্কে লোকেরা বিভিন্ন কথা বলে থাকে। আমার দৃঢ় ইচ্ছা আমি তার সাহচর্য বরণ করি এবং সুযোগ পেলে আমি তা অবশ্যই করব’।

আরও দেখুন:  খন্দকের যুদ্ধ

আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) বলেন, আমরা জানতাম না রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোন পথে মদীনা গমন করেছেন। কিন্তু দেখা গেল যে, হঠাৎ মক্কার নিম্নভূমি থেকে জনৈক অদৃশ্য ব্যক্তি একটি কবিতা পাঠ করতে করতে এল এবং মানুষ তার পিছে পিছে চলছিল। তারা সবাই তার কবিতা শুনছিল। কিন্তু তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। এভাবে কবিতা বলতে বলতে মক্কার উচ্চভূমি দিয়ে আওয়াযটি বেরিয়ে চলে গেল। আর বারবার শোনা যাচ্ছিল لاتحزن إن الله معنا ‘চিন্তিত হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’। সেই সাথে পঠিত পাঁচ লাইন কবিতা শুনে আমরা বুঝেছিলাম যে, তিনি বিখ্যাত অতিথিপরায়ণ মহিলা উম্মে মা‘বাদের তাঁবুতে অবতরণ করে ঐ পথ ধরে মদীনা  গিয়েছেন।[6] মূলতঃ আবুবকর পরিবারকে দুশ্চিন্তামুক্ত করার জন্য এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এলাহী বেতার বার্তা স্বরূপ। উক্ত বার্তায় পাঁচ লাইন বিশিষ্ট কবিতার প্রথম দু’টি লাইন ছিল নিম্নরূপ-

جزى الله رب العرش خيرجزاءه * رفيقين حلاّ خيمتى ام معبد

‘আরশের মালিক আল্লাহ তার সর্বোত্তম বদলা দান করেছেন তাঁর দুই বন্ধুকে, যারা উম্মে মা‘বাদের দুই তাঁবুতে অবতরণ করেছেন’।

هما نزلا بالبر وارتحلا به * وافلح من امسى رفيق محمد

‘তারা কল্যাণের সাথে অবতরণ করেছেন এবং কল্যাণের সাথে গমন করেছেন। তিনি সফলকাম হয়েছেন যিনি মুহাম্মাদের বন্ধু হয়েছেন’।[7]

উম্মে মা‘বাদের তাঁবুতে অবতরণের ঘটনাটি ছিল সফরের দ্বিতীয় দিনের। (আর-রাহীক্ব ১৭০)

(৩) সুরাক্বা বিন মালেকের পশ্চাদ্ধাবন : বনু মুদলিজ গোত্রের নেতা সুরাকা বিন মালেক বিন জু‘শুম জনৈক ব্যক্তির কাছে রাসূল গমনের সংবাদ শুনে পুরস্কারের লোভে দ্রুতগামী ঘোড়া ও তীর-ধনুক নিয়ে রাসূলের পিছে ধাওয়া করল। কিন্তু কাছে যেতেই ঘোড়ার পা দেবে গিয়ে সে চলন্ত ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। তখন তীর ছুঁড়তে গিয়ে তার পসন্দনীয় তীরটি খুঁজে পেল না। ইতিমধ্যে মুহাম্মাদী কাফেলা অনেক দূরে চলে গেল। সে পুনরায় ঘোড়া ছুটালো। কিন্তু এবারও একই অবস্থা হ’ল। কাছে পৌঁছতেই  ঘোড়ার পা এমনভাবে দেবে গেল যে, তা আর উঠাতে পারে না। আবার সে তীর বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু আগের মতই ব্যর্থ হ’ল। তার পসন্দনীয় তীরটি খুঁজে পেল না। তখনই তার মনে ভয় উপস্থিত হ’ল এবং এ বিশ্বাস দৃঢ় হ’ল যে, মুহাম্মাদকে নাগালে পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।  সে তখন রাসূলের নিকটে নিরাপত্তা প্রার্থনা করল। এ আহবান শুনে মুহাম্মাদী কাফেলা থেমে গেল। সে কাছে গিয়ে রাসূলকে কিছু খাদ্য-সামগ্রী ও আসবাবপত্র দিতে চাইল। রাসূল (ছাঃ) কিছুই গ্রহণ করলেন না। সুরাকা বলল, আমাকে একটি ‘নিরাপত্তা নামা’ (كتاب أمن) লিখে দিন। তখন রাসূলের হুকুমে আমের বিন ফুহায়রা একটি চামড়ার উপরে তা লিখে দিলেন। অতঃপর রওয়ানা হ’লেন।[8] লাভ হ’ল এই যে, ফেরার পথে সুরাকা অন্যান্যদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল, যারা রাসূলের পিছু নিয়েছিল। এভাবে দিনের প্রথম ভাগে যে ছিল রক্ত পিপাসু দুশমন, দিনের শেষভাগে সেই হ’ল দেহরক্ষী বন্ধু।

সুরাক্বা বিন মালেক বিন জু‘শুম আল-কেনানী যখন তার রাবেগ এলাকায় ফিরে যাচ্ছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমার অবস্থা তখন কেমন হবে, যখন তোমার হাতে কিসরার মূল্যবান কংকন পরানো হবে?[9] স্ত্ততঃ ওহোদ যুদ্ধের পরে সুরাক্বাহ মুসলমান হন। অতঃপর ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে যখন মাদায়েন বিজিত হয় এবং পারস্য সম্রাট কিসরার রাজমুকুট ও অমূল্য রত্নাদি তাঁর সম্মুখে আনা হয়, তখন তিনি সুরাকাকে আহবান করেন। অতঃপর তার হাতে কিসরার কংকন পরিয়ে দেন। এ সময় তার যবান থেকে বেরিয়ে যায়- الحمد لله، سوارى بن هرمز فى يدى سراقة بن مالك بن جعشم أعرابى من بنى مدلج- আল্লাহু আকবর! আল্লাহর কি মহত্তব যে, সম্রাট কিসরার কংকন আজ বেদুইন সুরাকার হাতে শোভা পাচ্ছে’।[10]

সুরাক্বা বিন মালেক যখন পিছু পিছু আসছিল, তখন আবুবকর ব্যস্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, لاتحزن إن الله معنا ‘চিন্তিত হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’।[11] এতে বুঝা যায় যে, উক্ত সান্ত্বনা বাক্যটি কেবল ছওর গিরিগুহায় নয়, অন্যত্র সংকটকালেও তিনি বলেছিলেন। ছওর গুহা থেকে রওয়ানা হওয়ার তৃতীয় দিনে ঘটনাটি ঘটেছিল।

(৪) বুরাইদা আসলামীর ইসলাম গ্রহণ : এরপর পথিমধ্যে বুরাইদা আসলামীর কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। বুরাইদা ছিলেন একজন বীরপুরুষ ও নিজ সম্প্রদায়ের নেতা। তিনি মক্কাবাসীদের ঘোষিত পুরস্কারের লোভে মুহাম্মাদের মাথা নেওয়ার জন্য অনুসন্ধানে ছিলেন। কিন্তু শিকার হাতে পেয়ে তিনিই ফের শিকারে পরিণত হ’লেন। রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে কিছু কথাবার্তাতেই তার মনে দারুণ রেখাপাত করে এবং সেখানেই তার সত্তর জন সাথী সহ ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর মাথার পাগড়ী খুলে বর্শার মাথায় বেঁধে তাকে ঝান্ডা বানিয়ে ঘোষণা বাণী প্রচার করতে করতে চললেন, قدجاء ملك الأمن والسلام، ليملأ الدنيا عدلاً وقسطًا-  ‘শান্তি ও নিরাপত্তার বাদশাহ আগমন করেছেন। দুনিয়া এখন ইনছাফ ও ন্যায়বিচারে পূর্ণ হয়ে যাবে’।

(৫) যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়ামের সাথে সাক্ষাত : পরবর্তী পর্যায়ে ছাহাবী যোবায়ের ইবনুল ‘আওয়ামের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যিনি মুসলমানদের একটি বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া থেকে মদীনায় ফিরে আসছিলেন। ইনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও আবুবকর (রাঃ)-কে এক সেট করে সাদা কাপড় প্রদান করেন। যোবায়ের ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর জামাতা এবং আসমা (রাঃ)-এর স্বামী এবং আশারায়ে মুবাশ্শারাহর অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মহাবীর ছাহাবী ও মা আয়েশার পালিতপুত্র আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের স্বনামধন্য পিতা।

ক্বোবায় অবতরণ:

একটানা আটদিন চলার পর ১৪ নববী বর্ষের ৮ই রবীউল আউয়াল মোতাবেক ৬২২ খৃষ্টাব্দের ২৩শে সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে ক্বোবা। উপশহরে শ্বেত-শুভ্র বসন পরিহিত অবস্থায় তাঁরা অবতরণ করেন। এইদিন রাসূলের বয়স ৫৩ বছর পূর্ণ হয়। কোবায় মানুষের ঢল নামে। হাযারো মানুষের অভ্যর্থনার মধ্যেও রাসূল (ছাঃ) ছিলেন চুপচাপ। তাঁর উপরে হযরত আবুবকর চাদর দিয়ে ছায়া করলে লোকেরা রাসূলকে চিনতে পারে। এ সময় তাঁর উপরে ‘অহি’ নাযিল হয়- فَإِنَّ اللهَ هُوَ مَوْلاَهُ وَجِبْرِيْلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمَلاَئِكَةُ بَعْدَ ذَلِكَ ظَهِيْرٌ- জেনে রেখ, আল্লাহ, জিব্রীল ও সৎকর্মশীল মুমিনগণ তার সহায়। উপরন্তু ফেরেশতাগণও তার সাহায্যকারী’।[12]

কোবায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বনু আমর বিন আওফ গোত্রের কুলছূম বিন হাদামের (كلثوم بن الهدم) বাড়ীতে  অবস্থান করেন। এদিকে হযরত আলীও মক্কায় তিনদিন অবস্থান করে গচ্ছিত আমানত সমূহ স্ব স্ব মালিককে ফেরত দানের পর মদীনায় চলে আসেন এবং রাসূলের সাথে কুলছূম বিন হাদামের বাড়ীতেই অবস্থান করতে থাকেন। কোবাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সোম, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতি ৪ দিন অবস্থান করেন। এতে মতভেদ থাকলেও এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, তিনি সোমবারে কোবায় অবতরণ করেন এবং শুক্রবারে সেখান থেকে ইয়াছবিরের উদ্দেশ্যে  রওয়ানা হ’ন। এ সময়ে তিনি সেখানে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন ও সেখানে ছালাত আদায় করেন। এই মসজিদ সম্পর্কেই সূরা তওবা ১০৮ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
অতঃপর তিনি ইয়াছরিবে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিবের মাতুল গোষ্ঠী বনু নাজ্জারকে সংবাদ দেন। বনু নাজ্জার ছিল খাযরাজ গোত্রভুক্ত। তারা সশস্ত্র প্রহরায় তাঁকে সাথে নিয়ে ইয়াছরিবের পথে যাত্রা করেন। বনু নাজ্জারকে রাসূলের মাতৃকুল বলার কারণ এই যে, রাসূলের প্রপিতামহ হাশেম বিন আবদে মানাফ ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম যাওয়ার পথে মদীনায় যাত্রা বিরতি করেন এবং সেখানে বনু নাজ্জার গোত্রের সালমা বিনতে আমর (سلمى بنت عمرو) নাম্মী এক মহিলাকে বিবাহ করেন। তিনি কিছুকাল সেখানে অবস্থান করেন। অতঃপর স্ত্রীকে গর্ভবতী অবস্থায় রেখে শাম চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ফিলিস্তীনের গাযায় মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাটি ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর জন্মের ৭৩ বছর পূর্বে ৪৯৭ খৃষ্টাব্দে। এ দিকে যথাসময়ে সন্তান ভূমিষ্ট হয়। কিন্তু সন্তানের মাথার চুল সাদা হওয়ায় তার নাম রাখা হয় ‘শায়বা’। শায়বার বয়স ১০ বছর হওয়া পর্যন্ত তার জন্মের খবর তার পিতৃগোষ্ঠী জানতে পারেনি। পরে তার চাচা মুত্ত্বালিব খবর জানতে পেরে মদীনায় যান ও ভ্রাতুষ্পুত্রকে মক্কায় নিয়ে আসেন। মক্কার লোকেরা তাকে মুত্ত্বালিবের ক্রীতদাস ভেবে ‘আব্দুল মুত্ত্বালিব’ বলে ডাকে। সেই থেকে রাসূলের এই দাদা আসল নামের বদলে ‘আব্দুল মুত্ত্বালিব’ উপনামেই পরিচিত হন। এভাবে হাশেম-এর বিবাহের সূত্রে মদীনার বনু নাজ্জার হ’ল আব্দুল মুত্ত্বালিবের সরাসরি মাতুল গোষ্ঠী এবং একই কারণে মদীনা বাসীগণ মক্কার বনু হাশেমকে তাদের ভাগিনার গোষ্ঠী বলে গণ্য করে থাকে।

১ম জুম‘আ আদায়:

ইয়াছরিবের উপকণ্ঠে পৌঁছে বনু সালেম বিন ‘আওফ গোত্রের ‘রানূনা’ (رَانُونَاء) উপত্যকায় ইসলামের ইতিহাসের ১ম জুম‘আ আদায় করেন।[13] যাতে একশত জন মুছল্লী শরীক ছিলেন। জুম‘আ পড়ে পুনরায় যাত্রা করে দক্ষিণ দিক থেকে তিনি ইয়াছরিবে প্রবেশ করেন। এদিন ছিল ১২ই রবীউল আওয়াল শুক্রবার। ইয়াছরিবের শত শত মানুষ তাকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়। হযরত বারা বিন আযেব (রাঃ) বলেন, রাসূলের আগমনে আমি মদীনাবাসীকে যত খুশী হ’তে দেখেছি, এত খুশী তাদের কখনো হ’তে দেখিনি। এমনকি ছোট্ট শিশু-কিশোররা বলতে থাকে, هذا رسول الله قد جاء ‘এই যে, আল্লাহর রাসূল এসে গেছেন’।[14] উচ্ছ্বসিত মানুষ ঐদিন থেকে তাদের শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘মদীনাতুর রাসূল’ বা সংক্ষেপে মদীনা। এই সময় মদীনার ছোট ছোট মেয়েরা  রাসূলকে স্বাগত জানিয়ে যে কবিতা পাঠ করে, তা ছিল  নিম্নরূপ:

طلع البدر علينا + من ثنيات الوداع

ছানিয়াতুল বিদা টিলা সমূহ হ’তে আমাদের উপরে পূর্ণচন্দ্র উদিত হয়েছে।

وجب الشكرعلينا + مادعا لله داع

আমাদের উপরে শুকরিয়া ওয়াজিব হয়েছে, এজন্য যে, আহবানকারী (রাসূল) আল্লাহর জন্য (আমাদেরকে) আহবান করেছেন।

ايها المبعوث فبنا + جئت با لأمرالمطاع

হে আমাদের মধ্যে (আল্লাহর) প্রেরিত পুরুষ! আপনি এসেছেন অনুসরণীয় বিষয়বস্ত্ত (ইসলাম) নিয়ে।[15] ‘ছানিয়াহ’ অর্থ টিলা। মদীনায় লোকেরা তাদের মেহমানদেরকে নিকটবর্তী এই টিলা সমূহ পর্যন্ত এসে বিদায় জানাতো। এজন্য এই টিলা ‘ছানিয়াতুল বিদা’ বা বিদায়া দানের টিলা নামে পরিচিত হয়।

ইয়াছরিবে প্রবেশের পর প্রত্যেক বাড়ীওয়ালা তার বাড়ীতে রাসূলকে মেহমান হিসাবে পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকে উটের লাগাম ধরে টানতে থাকে। কিন্তু উট নিজের গতিতে চলে বর্তমানের মসজিদে নববীর স্থানে গিয়ে বসে পড়ে। কিন্তু রাসূল নামেননি। পরে উট পুনরায় উঠে কিছু দূর গিয়ে আবার সেখানেই ফিরে এসে বসে পড়ে। এটি ছিল রাসূলের মাতুল গোষ্ঠী বনু নাজ্জারের মহল্লা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চেয়েছিলেন এখানে অবতরণ করে তার মামুদের বংশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে। আল্লাহ তার সে আশা পূরণ করে দেন। এখন বনু  নাজ্জার  গোত্রের লোকদের মধ্যে হিড়িক পড়ে গেল সবাই নিজ বাড়ীতে রাসূলকে নিতে চায়। আবু আইয়ূব আনছারী উটের পিঠ থেকে পালান উঠিয়ে নিজ বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ওদিকে আক্বাবাহর প্রথম বায়‘আতকারী আস‘আদ বিন যুরারাহ (রাঃ) উটের লাগাম ধরে রইলেন। কেউ দাবী ছাড়তে চান না।

আরও দেখুন:  ক্বাযা ওমরাহ ও মায়মূনার সাথে রাসূলের বিবাহ

আবু আইয়ূবের বাড়ীতে অবতরণ :

অবশেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, কার বাড়ী নিকটে? আবু আইয়ূব বললেন, هذا دارى هذا بابى ‘এই তো আমার বাড়ী, এইতো আমার দরজা।’ তখন রাসূল (ছাঃ) তার বাড়ীতে গেলেন। আবুবকরও তাঁর সাথে গেলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দো‘আ করেন, قوما على بركة تعالي الله ‘আল্লাহর বরকতের উপরে তোমরা দু’জন (রাসূল ও আবুবকর) দাঁড়িয়ে যাও’।[16] এর মাধ্যমে তিনি সেখানে অবস্থান করার কথা ঘোষণা দেন।

নবী পরিবারের আগমন :

কয়েক দিনের মধ্যেই নবীপত্নী হযরত সওদা বিনতে যাম‘আহ এবং নবীকন্যা উম্মে কুলছূম ও ফাতেমা এবং উসামা বিন যায়েদ ও উম্মে আয়মন (উসামার আম্মা) মদীনায় পৌঁছে যান। এদের সকলকে আব্দুল্লাহ বিন আবুবকর তার পারিবারিক কাফেলার সাথে নিয়ে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে হযরত আয়েশাও ছিলেন। কেবল নবী কন্যা যয়নব তার স্বামী আবুল ‘আছের সঙ্গে রয়ে গেলেন। যারা বদর যুদ্ধের পরে চলে আসেন।

মদীনার আবহাওয়ার পরিবর্তন :

মদীনায় এসে মুহাজিরগণের অনেকে অসুখে পড়েন। হযরত আবু বকর (রাঃ) কঠিন জ্বরে কাতর হয়ে কবিতা পাঠ করেন,

كل امرء مصبّح فى أهله + والموت أدنى من شراك نعله

‘প্রত্যেক মানুষকে তার পরিবারে ‘সুপ্রভাত’ বলে সম্ভাষণ জানানো হয়। অথচ মৃত্যু সর্বদা জুতার ফিতার চাইতে নিকটবর্তী’। বেলালও অনুরূপ বিলাপ ধ্বনি করে কবিতা পাঠ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এসব কথা রাসূলের কাছে তুলে ধরেন। তখন তিনি আল্লাহর নিকটে দো‘আ করেন-

اللهم حبب إلينا المدينة كحبنا مكة أو أشد حبًا وصححها وبارك فى صاعها ومدها وانقل حماها فاجعلها فى الجحفة-

‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের নিকটে মদীনাকে প্রিয় করে দাও, যেমন মক্কা আমাদের প্রিয় ছিল। বরং তার চাইতে বেশী প্রিয়। তুমি মদীনাকে স্বাস্থ্যকর করে দাও, তার খাদ্য-শস্যে বরকত দাও এবং তার অসুখকে (রোগ-ব্যাধিকে) সরিয়ে দাও! বরং (দূরে) জোহফায় পৌঁছে দাও’।[17] ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় মদীনার অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যায় এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরী হয়ে যায়।

আনছারগণের অপূর্ব ত্যাগ :

আল্লাহ পাক ঈমানের বরকতে আনছারগণের মধ্যে এমন মহববত সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন যে, মুহাজিরগণকে ভাই হিসাবে পাওয়ার জন্য প্রত্যেকে লালায়িত ছিল। যদিও তাদের মধ্যে সচ্ছলতা ছিল না। কিন্তু তারা ছিল প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা। সবাই মুহাজিরগণকে স্ব স্ব পরিবারে পেতে চায়। অবশেষে লটারীর ব্যবস্থা করা হয় এবং মুহাজিরগণকে আনছারদের সাথে ভাই ভাই হিসাবে ঈমানী বন্ধনে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়। তারা তাদের জমি, ব্যবসা ও বাড়ীতে তাদেরকে অংশীদার করে নেন। এমনকি যাদের দুই স্ত্রী ছিল, তারা এক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে স্ত্রীহারা মুহাজির ভাইকে দিয়ে দেন। আনছারগণের এই ত্যাগ ও কুরবানীর প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, وَيُؤْثِرُوْنَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ- ‘তারা নিজেদের উপরে মুহাজিরগণকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা ছিল অভাবগ্রস্ত। বস্ত্ততঃ যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই হ’ল সফলকাম’ (হাশর ৫৯/৯)।

মাক্কী জীবন থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :

(১) পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্র এবং পবিত্রতম স্থান কা‘বা গৃহ ও মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসাবে সমগ্র আরব বিশ্বে মহা সম্মানিত এবং ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী কুরায়েশ নেতার গৃহে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বনবীকে তার বংশের লোকেরা নবী হিসাবে মেনে নেয়নি। কারণ তারা এর মধ্যে তাদের দুনিয়াবী স্বার্থের ক্ষতি বুঝতে পেরেছিল। আর তারা আখেরাতের চাইতে দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ফলে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয়েও তারা মুমিন হ’তে পারেনি। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُوْلُ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِيْنَ- ‘লোকদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপরে এবং শেষ দিবসের উপরে ঈমান এনেছি। অথচ তারা মুমিন নয়’ (বাক্বারাহ ২/৮)।

(২) নবী বংশের লোক হওয়া, আল্লাহর ঘর তৈরী করা ও তার সেবক হওয়া পরকালীন মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। বরং  সার্বিক জীবনে আল্লাহর দাসত্ব করা ও তার বিধান মেনে চলা এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোই হ’ল আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পূর্বশর্ত। যেমন আল্লাহ বলেন,

أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَجَاهَدَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ لاَ يَسْتَوُوْنَ عِنْدَ اللهِ وَاللهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِيْنَ- الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَهَاجَرُواْ وَجَاهَدُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُوْنَ-

‘তোমরা কি হাজীদের জন্য পানি সরবরাহ করা ও মসজিদুল হারামের আবাদ করাকে সেই ব্যক্তির সমান মনে কর, যে ব্যক্তি বিশ্বাস স্থাপন করেছে আল্লাহর উপরে ও শেষ দিবসের উপরে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে? এরা আল্লাহর নিকটে সমান নয়। আর আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদের হেদায়াত করেন না’। ‘যারা ঈমান এনেছে ও হিজরত করেছে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, আল্লাহর নিকটে তাদের উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। আর তারাই হ’ল সফলকাম’ (তওবাহ ৯/১৯-২০)।

(৩) আক্বীদায় পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত সমাজের কোন মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। যেমন আল্লাহর রাসূল নবী হওয়ার পূর্বে তরুণ বয়সে ‘হিলফুল ফুযূল’  নামক কল্যাণ সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ও তাঁর সমাজ কল্যাণমূলক কার্যক্রমের জন্য সকলের প্রশংসা ভাজন হন এবং ‘আল-আমীন’ লকবে ভূষিত হন। কিন্তু তাতে সার্বিকভাবে সমাজের ও নেতৃত্বের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি।

(৪) সমাজের  সত্যিকারের  কল্যাণকামী ব্যক্তি  নিজের চিন্তায় ও প্রচেষ্টায় যখন কোন কুল-কিনারা করতে পারেন না, তখন তিনি আল্লাহর নিকটে হেদায়াত প্রার্থনা করেন ও নিজেকে সম্পূর্ণরূপে তাঁর উপরে সমর্পণ করে দেন। অতঃপর আল্লাহর দেখানো পথেই তিনি অগ্রসর হন। যেমন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ স্বীয় জীবনের প্রথম চল্লিশটি বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে জীবন যাপন করলেও সমাজের বিপর্যয়কর অবস্থা পরিবর্তনের কোন পথ-পন্থা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেন ও হেরা গুহায় দিন-রাত আল্লাহর সাহায্য কামনায় রত থাকেন। ফলে লায়লাতুল কদরের মহিমাময় মুহূর্তে আল্লাহর ‘অহি’ নেমে আসে হেদায়াতের দীপশিখা নিয়ে। শুরু হয় নবুঅতের শুভযাত্রা। বর্তমান যুগে আর ‘অহি’ নাযিল হবে না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহ রয়েছে এবং এছাড়াও ইলহাম অব্যাহত থাকবে। যা আল্লাহগত প্রাণ বান্দাদের নিকটে আল্লাহ প্রেরণ করে থাকেন।

(৫) রক্ত, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল প্রভৃতি জাতি গঠনের অন্যতম উপাদান হ’লেও মূল উপাদান নয়। বরং ধর্মবিশ্বাস হ’ল জাতি গঠনের মূল উপাদান। আর সেকারণেই একই বংশের হওয়া সত্ত্বেও আবু লাহাব ও আবু জাহল হয়েছিল রাসূলের রক্তপিপাসু শত্রু। অথচ ভিনদেশী ও ভিন রক্ত-বর্ণ ও অঞ্চলের লোক হওয়া সত্ত্বেও বেলাল হয়েছিল রাসূলের বন্ধু। নিজ বংশের লোকেরা শত্রুতা করলেও ইয়াছরিবের লোকেরা হয়েছিল নবীর সাহায্যকারী। এ প্রক্রিয়া আজও বাস্তব হয়ে রয়েছে। যদিও ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্ত্তবাদীরা একে অস্বীকার করতে চায় ও মানুষকে খাদ্য-পানীয় সর্বস্ব সাধারণ পশু শ্রেণীভুক্ত বলে দাবী করতে চায়।

(৬) বিশ্বাসগত পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোন বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। সেকারণ মাক্কী জীবনের তের বছরে অবতীর্ণ আয়াত সমূহ মূলতঃ তাওহীদ ও আখেরাত ভিত্তিক ছিল। সার্বিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যখন সফলতা আসেনি এবং ইতিমধ্যে ইয়াছরিবের কিছু লোক ইসলাম কবুল করে ও রাসূলকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দানের অঙ্গীকার করে বায়‘আত গ্রহণ করে, তখনই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে হিজরতের নির্দেশ দেন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সমাজ পরিবর্তনের প্রতিজ্ঞা গ্রহণকারী লোকদের জন্য প্রয়োজনবোধে স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জন্মস্থান থেকে হিজরত করা আবশ্যক। যেখানে গিয়ে তারা দ্বীনের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারবেন।

(৭) আল্লাহর পথের পথিকগণ শত নির্যাতনেও আল্লাহর পথ হ’তে বিচ্যুত হন না। জান্নাতের বিনিময়ে তারা দুনিয়াবী কষ্ট ও দুঃখকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন। মক্কার নির্যাতিত অসহায় মুসলমানদের অবস্থা বিশেষ করে বেলাল, খাববাব ও ইয়াসির পরিবারের লোমহর্ষক নির্যাতনের কাহিনী যেকোন মানুষকে তাড়িত করতে বাধ্য।

(৮) ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ নেতৃবৃন্দ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ কর্তৃক পরিচালিত হন এবং ইসলামের স্বার্থে প্রয়োজন বোধ করলে আল্লাহ তাদের রক্ষা করেন। যেমন হিজরতের রাতে ঘেরাওকারীদের হাত থেকে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন। অতঃপর পথিমধ্যে ছওর গিরিগুহায় আগত শত্রুদের প্রস্থান, উম্মে মা‘বাদের জীর্ণ-শীর্ণ দুর্বল বকরীর পালান হ’তে দুগ্ধস্রোত নির্গমন, সুরাকা বিন মালেকের পশ্চাদ্ধাবন ও ব্যর্থতা বরণ, ৭০ জন সাথী সহ রক্তপিয়াসী বুরাইদা আসলামীর ইসলাম গ্রহণ, ‘দুঃখ করো না নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’ বলে গায়েবী আওয়ায ও কবিতার ধ্বনি মক্কার নিম্নভূমি থেকে উচ্চভূমি দিয়ে পার হয়ে যাওয়া ও আবুবকর পরিবারকে সান্ত্বনা প্রদান, মক্কার কাফের আব্দুল্লাহ বিন আরীক্বত হিজরতকালে রাসূলের জন্য বিশ্বস্ত পথ প্রদর্শক নিযুক্ত হওয়া- এসবই ছিল আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য আল্লাহর অদৃশ্য ব্যবস্থাপনার অংশ বিশেষ। সর্বযুগেই আল্লাহর এ ব্যবস্থাপনা জারী থাকবে। যেমন তিনি বলেন, وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِيْنَ ‘আমাদের দায়িত্ব হ’ল মুমিনদের সাহায্য করা’ (রূম ৩০/৪৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, حَقّاً عَلَيْنَا نُنجِ الْمُؤْمِنِينَ ‘আমাদের কর্তব্য হ’ল মুমিনদের নাজাত দেওয়া’ (ইউনুস ১০/১০৩)।

(৯) কায়েমী স্বার্থবাদী নেতৃত্ব কখনোই সংস্কারের বাণীকে  সহ্য করতে পারে না। তারা অহংকারে ফেটে পড়ে এবং নিজেদের চালু করা মনগড়া রীতি-পদ্ধতিকে সঠিক মনে করে ও তার উপরে হঠকারিতা করে। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا قِيْلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَاد

ُ- ‘যখন তাকে বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার পাপ তাকে অহংকারে স্ফীত করে। সুতরাং তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর তা অবশ্যই মন্দতর ঠিকানা’ (বাক্বারাহ ২/২০৬)। ইতিপূর্বে মূসার বিরুদ্ধে ফেরাঊন তার লোকদের একইরূপ বলেছিল, وَمَا أَهْدِيْكُمْ إِلاَّ سَبِيْلَ الرَّشَادِ ‘আমি তোমাদেরকে কেবল কল্যাণের পথই দেখিয়ে থাকি’ (মুমিন/গাফের ৪০/২৯)। অথচ তা ছিল জাহান্নামের পথ এবং মূসার পথ ছিল জান্নাতের পথ।

(১০) ঈমানী বন্ধন দুনিয়াবী বন্ধনের চাইতে অনেক বেশী শক্তিশালী। যেমন রক্তের বন্ধন হিসাবে চাচা আবু তালেব-এর নেতৃত্বে বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সার্বিক সহযোগিতা করলেও তা টেকসই হয়নি। অবশেষে ঈমানী বন্ধনের আকর্ষণে রাসূলকে সুদূর ইয়াছরিবে হিজরত করতে হয় এবং সেখানে গিয়ে তিনি নতুন ঈমানী সমাজের গোড়াপত্তন করেন।

(১১) জনমত সংগঠন হ’ল ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার আবশ্যিক পূর্বশর্ত। এজন্য কোন চরমপন্থা বেছে নেওয়া রোগী মেরে রোগ চিকিৎসার শামিল। তাই মক্কার জনমত বিরুদ্ধে থাকায় আল্লাহর রাসূলকে মদীনায় হিজরত করতে হয়। অতঃপর অনুকূল জনমতের কারণে শত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও মুনাফেকীর মধ্য দিয়েও তিনি সেখানে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা কায়েমে সক্ষম হন।

পরবর্তী অংশ পড়ুন: রাসূল (ছাঃ) -এর মাদানী জীবন


[1] সৈয়ূতী, আসবাবুল নুযূল; হাকেম ৩/৪৪৮, হা/৫৭৬৮; হাকেম ছহীহ বলেছেন, যাহাবী চুপ থেকেছেন।

[2] বুখারী হা/২২৯৭; ৩৯০৫।

[3] হাকেম ৩/৭; যাহাবী ছহীহ মুরসাল বলেছেন।

[4] বুখারী হা/৩৯০৫।

[5] বুখারী হা/৩৯১১।

[6] যাদুল মা‘আদ ২/৫৩-৫৪।

[7] হাকেম ৩/৯-১০; ফিক্বহুস সীরাহ পৃ: ১৩১, আলবানী ছহীহ বলেছেন।

[8] বুখারী হা/৩৯০৬ ‘আনছারদের মর্যাদা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৫।

[9] আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৬৯ ‘মাদায়েন বিজয়ের কাহিনী’।

[10] আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৬৯ ‘মাদায়েন বিজয়ের কাহিনী’।

[11] বুখারী হা/৩৬৫২।

[12] তাহরীম ৬৬/৪, যাদুল মা‘আদ ৩/৫২; আর-রাহীক্ব পৃ: ১৭১।

[13] আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ২/২১১।

[14] বুখারী হা/৪৯৪১ ‘তাফসীর’ অধ্যায়।

[15] আর-রাহীক্ব পৃ: ১৭২; যঈফাহ হা/৫৯৮।

[16] বুখারী হা/৩৯১১।

[17] বুখারী হা/৫৬৭৭।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button