হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)

মক্কা বিজয়

To Desired Deals

পূর্বের অংশ পড়ুন: ক্বাযা ওমরাহ ও মায়মূনার সাথে রাসূলের বিবাহ

(৮ম হিজরী ১৭ই রামাযান মঙ্গলবার; ৬৩০ খৃঃ, ১লা জানুয়ারী)

জন্মভূমি মক্কা হ’তে হিজরত করার প্রায় আট বছর পর বিজয়ীর বেশে পুনরায় মক্কায় ফিরে এলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, নবীকুল শিরোমণি শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। বিনা যুদ্ধেই মক্কার নেতারা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণ করলেন। এতদিন যারা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও মুসলমানদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ। বিজয়ী রাসূল (ছাঃ) তাদের কারু প্রতি কোনরূপ প্রতিশোধ নিলেন না। সবাইকে উদারতা ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাদের উপরে কোনরূপ অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত’। কিন্তু কি ছিল এর কারণ? কিভাবে ঘটলো হঠাৎ করে এ ঐতিহাসিক বিজয়? দু’বছর আগেও যে মুসলিম বাহিনীতে তিন হাযার লোক সংগ্রহ করাও দুঃসাধ্য ছিল, তারা কোথা থেকে কিভাবে দশ হাযার লোক নিয়ে ঝড়ের বেগে হঠাৎ ধূমকেতুর মত আবির্ভূত হ’ল মক্কার উপরে? অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল মক্কার নেতারা ফ্যালফ্যাল করে। অথচ টুঁ শব্দটি করার ক্ষমতা কারু হ’ল না? নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল মক্কা-মদীনা সংঘাত। পৌত্তলিক মক্কা দু’দিনের মধ্যেই হয়ে গেল মুসলমান। কা‘বা গৃহ হ’ল মূর্তিশূন্য। উয্যার বদলে শুরু হ’ল আল্লাহর জয়গান। শিরকী সমাজ পরিবর্তিত হ’ল ইসলামী সমাজে।  সমস্ত  আরব উপদ্বীপে বয়ে চলল শান্তির সুবাতাস। কি সে কারণ? কিভাবে সম্ভব হ’ল এই অসম্ভব কান্ড? এক্ষণে আমরা সে বিষয়ে আলোকপাত করব।-

অভিযানের কারণ :

প্রায় দু’বছর পূর্বে ৬ষ্ঠ হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাসে সম্পাদিত হোদায়বিয়াহর চার দফা সন্ধিচুক্তির তৃতীয় দফায় বর্ণিত ছিল যে, ‘যে সকল গোত্র  মুসলমান বা কুরায়েশ যে পক্ষের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে এবং তাদের কারু উপরে অত্যাচার করা হ’লে সংশ্লিষ্ট দলের উপরে অত্যাচার বলে ধরে নেওয়া হবে’। উক্ত শর্তের আওতায় মক্কার নিকটবর্তী গোত্র বনু খোযা‘আহ (بنو خزاعة) মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরায়েশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট দলের মিত্রপক্ষ হিসাবে গণ্য হয়। কিন্তু দু’বছর পুরা না হ’তেই বনু বকর উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করল এবং ৮ম হিজরীর শা‘বান মাসে রাত্রির অন্ধকারে বনু খোযা‘আহর উপরে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বহু লোককে হতাহত করল। ঐসময় বনু খোযা‘আহ গোত্র ‘ওয়াতীর’ (الوتير) নামক প্রস্রবনের ধারে বসবাস করত, যা ছিল মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত (মু‘জামুল বুলদান)। বনু বকরের এই অন্যায় আক্রমনে কুরায়েশদের ইন্ধন ছিল। তারা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এমনকি কুরায়েশ নেতা ইকরিমা বিন আবু জাহ্ল, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং খোদ হোদায়বিয়া সন্ধিচুক্তিতে কুরায়েশ পক্ষের আলোচক ও স্বাক্ষর দানকারী সোহায়েল বিন আমর সশরীরে উক্ত হামলায় অংশগ্রহণ করেন (তারীখে ত্বাবারী)। বনু খোযা‘আহর অসহায় লোকেরা বনু বকরের কাছে করজোড়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেও তারা পরোয়া করেনি। এমনকি তারা পালিয়ে হারাম শরীফে আশ্রয় নিয়ে তাদেরকে إلَهَكَ إلَهَكَ ‘তোমার প্রভুর দোহাই’ ‘তোমার প্রভুর দোহাই’ বলে মিনতি করলে জবাবে তারা তাচ্ছিল্য করে لاَ إلَهَ الْيَوْمَ ‘আজ কোন প্রভু নেই’ বলে নির্দয়ভাবে তাদেরকে হত্যা করেছিল।[1]

বনু খোযা‘আহ গোত্রের এই হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদ নিয়ে আমের ইবনু সালেম আল-খোযাঈ ৪০ জনের একটি দল সহ দ্রুত মদীনায় আসেন। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তখন মসজিদে নববীতে ছাহাবায়ে কেরাম সহ অবস্থান করছিলেন। এমন সময় আমের ইবনু সালেম কবিতা পাঠ করতে করতে রাসূলের সামনে মর্মস্পর্শী ভাষায় তাদের নির্মম হত্যাকান্ড এবং কুরায়েশদের চুক্তি ভঙ্গের কথা বিবৃত করেন। সাড়ে আট লাইনের সেই কবিতার শেষের সাড়ে তিন লাইন ছিল নিম্নরূপ :

إنَّ قُرَيْشًا أَخْـلَفُوْكَ الْمَوْعِدَا * وَنَقَضُوْا مِيْثَـاقَكَ الْمُؤَكَّدَا
وَجَعَلُوْا لِيْ فِيْ كَدَاءٍ رُصَّدَا * وَزَعَمُوْا أَنْ لَسْتُ أَدْعُوْ أَحَدَا
وَهُـمْ أَذَلُّ وَأَقَـلُّ عَـدَدَا * هُمْ بَيَّتُـوْنَا بِالْوَتِيْـرِ هُجَّدًا
وَقَتَلُـوْنَا رُكَّـعًا وَّسُجَّدَا * فانصر هـداك الله نصرًا أَيِّدًا
نحن ولدناك فكنتَ ولدًا-

‘নিশ্চয়ই কুরায়েশগণ আপনার সাথে করেছে এবং আপনাকে দেওয়া পাক্কা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে’। ‘তারা ‘কাদা’ নামক স্থানে আমার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তারা ধারণা করেছে যে আমি সাহায্যের জন্য কাউকে আহবান করবো না’। ‘তারা নিকৃষ্ট ও সংখ্যায় অল্প’। ‘তারা ‘ওয়াতীর’ নামক স্থানে রাত্রি বেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের উপরে হামলা চালিয়েছে’।

‘এবং তারা রুকূ অবস্থায় ও সিজদারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করেছে’। অতএব আপনি আমাদেরকে দৃঢ়হস্তে সাহায্য করুন। ‘আল্লাহ আপনাকে হেদায়াত করুন’। ‘আমরা আপনাকে প্রসব করেছি। অতএব আপনি আমাদের সন্তান’।[2] কবিতার শেষের চরণ দ্বারা বুঝা যায় যে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখন মুসলমান হয়েছিলেন। যদিও জীবনীকারগণ এ বিষয়ে একমত যে, ঐ সময় পর্যন্ত তারা মুসলমান হয়নি।[3]

বনু খোযা‘আহর পরিচয় :

উল্লেখ্য যে, বনু খোযা‘আহ গোত্রের সাথে বনু হাশিমের মৈত্রীচুক্তি আব্দুল মুত্ত্বালিবের যুগ হ’তেই চলে আসছিল। কুরায়েশ বংশের প্রবাদ প্রতীম নেতা কুছাই বিন কেলাবের স্ত্রী অর্থাৎ আবদে মানাফের মা ছিলেন খোযা‘আহ গোত্রের মহিলা। সে হিসাবে বনু হাশিমকে তারা তাদের সন্তান মনে করত। তারও পূর্বের ঘটনা ছিল এই যে, বনু খোযা‘আহ ছিল এক সময় বায়তুল্লাহর তত্ত্বাবধায়ক ও মক্কার শাসনকর্তা। মক্কার সর্দার ‘হুলাইল’ (حليل) তার কন্যা জুবাই (جبيّ) বা হুবাই-কে কুছাই বিন কেলাবের সাথে বিবাহ দেন এবং বিয়ের সময় বায়তুল্লাহ শরীফের মুতাওয়াল্লীর দায়িত্ব কন্যাকে অর্পণ করেন। সাথে সাথে আবু গাবছান (أبو غبثان) -কে কন্যার উকিল নিয়োগ করেন। হুলাইলের মৃত্যুর পর আবু গাবছান এক মশক শরাবের বিনিময়ে তার উকিলের দায়িত্ব কুছাইকে অর্পণ করেন। এভাবে কুছাই বিন কিলাব তার স্ত্রীর উকিল হিসাবে বায়তুল্লাহ শরীফের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। কুছাই তার মেধা ও দূরদর্শিতার বদৌলতে পুরা কুরায়েশ বংশের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে বরিত হন।

উপরোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা করে বনু খোযা‘আহ সর্বদা বনু হাশিমের মিত্র হিসাবে থাকত। মুসলমান না হওয়া সত্ত্বেও কেবল বনু হাশিমের সন্তান হিসাবে তারা সর্বদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পক্ষে অবস্থান নিত।

বনু খোযা‘আহর আবেদনে রাসূলের সাড়া :

আমর ইবনু সালেম-এর মর্মস্পর্শী কবিতা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে ওঠেন- نُصِرْتَ يَا عَمْرَو بْنَ سَالِمٍ ‘তুমি সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছ হে আমর ইবনু সালেম’! এমন সময় আসমানে একটি মেঘখন্ডের আবির্ভাব হয়। তা দেখে রাসূল (ছাঃ) বলেন, إنَّ هَذِهِ السَّحَابَةَ لَتَسْتَهِلَّ بِنَصْرِ بَنِيْ كَعْبٍ ‘এই মেঘমালা বনু কা‘বের সাহায্যের শুভসংবাদে চমকাচ্ছে’।

এরপর বনু খোযা‘আহর আরেকটি প্রতিনিধিদল নিয়ে বুদাইল বিন অরক্বা আল-খোযাঈ (بديل بن ورقاء الخزاعي) আগমন করেন এবং তাদের গোত্রের কারা কারা নিহত হয়েছে ও কুরায়েশরা কিভাবে বনু বকরকে সাহায্য করেছে, তার পূর্ণ বিবরণ পেশ করেন। অতঃপর তারা মক্কায় ফিরে যান।[4]

রাসূলের পরামর্শ বৈঠক :

সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের পর করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। এক সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলে ওঠেন, كَأَنّكُمْ بِأَبِيْ سُفْيَانَ قَدْ جَاءَكُمْ لِيَشُدَّ الْعَقْدَ وَيَزِيْدَ فِي الْمُدَّةِ ‘আমি যেন তোমাদেরকে আবু সুফিয়ানের সাথে দেখছি যে, সে মদীনায় আসছে তোমাদের কাছে চুক্তি পাকাপোক্ত করার জন্য এবং মেয়াদ বাড়ানোর জন্য’।[5]

আবু সুফিয়ানের মদীনা আগমন ও আশ্রয় প্রার্থনা :

দূরদর্শী আবু সুফিয়ান বুঝেছিলেন যে, বনু খোযা‘আহর উপরে এই কাপুরুষোচিত আক্রমণ হোদায়বিয়াহর সন্ধিচুক্তির স্পষ্ট লংঘন এবং এর প্রতিক্রিয়া হ’ল মুসলমানদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ, যা ঠেকানোর ক্ষমতা এখন তাদের নেই। তাই তিনি মোটেই দেরী না করে এবং কোন প্রতিনিধি না পাঠিয়ে কোরায়েশ নেতাদের পরামর্শক্রমে সরাসরি নিজেই মদীনা গমন করলেন। পথিমধ্যে খোযা‘আহ নেতা বুদাইল বিন অরক্বার সঙ্গে আসফান (عسفان) নামক স্থানে সাক্ষাত হ’লে তিনি মুহাম্মাদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু সুচতুর আবু সুফিয়ান বুদাইলের উটের গোবরের মধ্যে খেজুরের অাঁটি পরীক্ষা করে বুঝে নেন যে, বুদাইল মদীনা গিয়েছিল। এতে তিনি আরো ভীত হয়ে পড়েন।

যাইহোক মদীনা পৌঁছে তিনি স্বীয় কন্যা উম্মুল মুমেনীন উম্মে হাবীবাহর সাথে সাক্ষাত করেন। এসময় তিনি খাটে বসতে উদ্যত হ’লে কন্যা দ্রুত বিছানা গুটিয়ে নেন ও বলেন, هَذَا فِرَاشُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنْتَ رَجُلٌ مُشْرِكٌ نَجَسٌ ‘এটি রাসূল (ছাঃ)-এর বিছানা। এখানে আপনার বসার অধিকার নেই। কেননা আপনি অপবিত্র মুশরিক’। অতঃপর আবু সুফিয়ান বেরিয়ে জামাতা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গেলেন ও সব কথা বললেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) কোন কথা বললেন না। নিরাশ হয়ে তিনি আবুবকর (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং তাকে রাসূলের নিকটে কথা বলার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি অপারগতা প্রকাশ করলেন। অতঃপর ওমরের কাছে গিয়ে একইভাবে তোষামোদ করলেন। কিন্তু ওমর কঠোর ভাষায় জবাব দিয়ে বললেন, أَأَنَا أَشْفَعُ لَكُمْ إلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَوَاللهِ لَوْ لَمْ أَجِدْ إلاَّ الذَّرَّ لَجَاهَدْتُكُمْ بِهِ ‘আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের নিকটে সুফারিশ করব? আল্লাহর কসম! যদি আমি কিছুই না পাই ছোট নুড়ি ছাড়া, তাই দিয়ে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করব’।

এবার সবশেষে তিনি আলী (রাঃ)-এর কাছে গেলেন। এ সময় সেখানে ফাতেমা (রাঃ) ছিলেন এবং তাদের সামনে শিশু হাসান লাফালাফি করে খেলছিলেন। আবু সুফিয়ান সেখানে পেঁŠছে আলী (রাঃ)-কে অত্যন্ত বিনয়ের সুরে বললেন, হে আলী! অন্যদের তুলনায় তোমার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক অনেক গভীর। আমি একটি বিশেষ প্রয়োজনে মদীনায় এসেছি। এমনটি যেন না হয় যে, আমাকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। اشْفَعْ لِيْ إلَى محمد ‘তুমি আমার জন্য মুহাম্মাদের নিকটে সুফারিশ কর’। জবাবে আলী (রাঃ) বললেন, وَيْحَك يَا أَبَا سُفْيَانَ وَاللهِ لَقَدْ عَزَمَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أَمْرٍ مَا نَسْتَطِيْعُ أَنْ نُكَلَّمَهُ فِيْهِ ‘তোমাদের জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) একটি বিষয়ে কৃত সংকল্প হয়েছেন, যে বিষয়ে আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি না’। আবু সুফিয়ান তখন ফাতেমা (রাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, هَلْ لَكِ أَنْ تَأْمُرِيْ بُنَيَّكِ هَذَا فَيُجِيرَ بَيْنَ النَّاسِ فَيَكُوْنَ سَيِّدَ الْعَرَبِ إلَى آخِرِ الدَّهْرِ؟ ‘তুমি কি পারো তোমার এই ছেলেকে হুকুম দিতে যে সে লোকদের মধ্যে আমার জন্য আশ্রয়ের ঘোষণা দিবে এবং এর ফলে সে চিরদিনের জন্য আরবের নেতা হয়ে থাকবে’? ফাতেমা বললেন, আল্লাহর কসম! আমার ছেলের এখনো সেই বয়স হয়নি যে, লোকদের মধ্যে কারু জন্য আশ্রয়ের ঘোষণা দিবে। وَمَا يُجِيْرُ أَحَدٌ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপস্থিতিতে অন্য কেউ কারু আশ্রয়ের ঘোষণা দিতে পারে না’।

সবদিকে নিরাশ হয়ে ভীত-শংকিত আবু সুফিয়ান হযরত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, يَا أَبَا الْحَسَنِ إنِّيْ أَرَى الْأُمُوْرَ قَدْ اشْتَدَّتْ عَلَيَّ فَانْصَحْنِيْ ‘হে হাসানের পিতা! আমি বুঝতে পারছি আমার উপরে অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় তুমি আমাকে কিছু ভাল উপদেশ দাও’। তখন আলী (রাঃ) তাকে বললেন, وَاَللهِ مَا أَعْلَمُ لَكَ شَيْئًا يُغْنِيْ عَنْكَ شَيْئًا، وَلَكِنَّكَ سَيِّدُ بَنِيْ كِنَانَةَ فَقُمْ فَأَجِرْ بَيْنَ النَّاسِ ثُمَّ الْحَقْ بِأَرْضِكَ ‘আল্লাহর কসম! তোমার উপকারে আসে, এমন কোন পথ আমি দেখছি না। তবে যেহেতু তুমি বনু কেনানাহর সর্দার। সেহেতু তুমি নিজেই লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আশ্রয় প্রার্থনা কর। অতঃপর নিজ দেশে ফিরে যাও’। আবু সুফিয়ান বললেন, তুমি কি মনে করছ যে, এটা আমার জন্য ফলপ্রসু হবে’? আলী (রাঃ) বললেন, না। আল্লাহর কসম! আমি এমনটি ধারণা করি না। তবে তোমার জন্য এর বিকল্প কিছুই আমি দেখছি না’। তখন আবু সুফিয়ান মসজিদে নববীতে গিয়ে দাঁড়ালেন ও লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, أَيُّهَا النَّاسُ إنِّيْ قَدْ أَجَرْتُ بَيْنَ النَّاسِ ‘হে লোকসকল! আমি সকলের মাঝে আশ্রয় প্রার্থনার ঘোষণা দিচ্ছি’। অতঃপর বেরিয়ে উটে সওয়ার হয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে যান। আবু সুফিয়ান মক্কায় এসে নেতাদের নিকটে সবকথা পেশ করেন এবং তাদের ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়ার জবাবে বলেন, وَاللهِ مَا وَجَدْتُّ غَيْرَ ذَلِكَ ‘আল্লাহর কসম! এছাড়া আমি আর কোন পথ খুঁজে পাইনি’।

রাসূলের গোপন প্রস্ত্ততি :

ত্বাবারাণী হাদীছ গ্রন্থের বর্ণনাসূত্রে জানা যায় যে, কুরায়েশদের চুক্তি ভঙ্গের খবর পৌঁছবার তিন দিন আগেই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) স্ত্রী আয়েশাকে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি গ্রহণের আদেশ দেন- যা কেউ জানত না। পিতা আবুবকর (রাঃ) কন্যা আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলেন, يَابُنَيَّةُ، مَا هَذَا الْجِهَازُ؟ ‘হে কন্যা! এসব কিসের প্রস্ত্ততি? কন্যা জবাব দিলেন وَاللهِ مَا أَدْرِيْ ‘আল্লাহর কসম! আমি জানি না’। আবুবকর (রাঃ) বললেন, এখন তো রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নয়। তাহ’লে রাসূল (ছাঃ) কোন দিকের এরাদা করেছেন? আয়েশা (রাঃ) আবার বললেন, وَاللهِ لاَ عِلْمَ لِيْ ‘আল্লাহর কসম! এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই’। দেখা গেল যে, তৃতীয় দিন আমর ইবনু সালেম আল-খোযাঈ ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে হাযির হ’লেন। তখন লোকেরা চুক্তিভঙ্গের খবর জানতে পারল।[6]

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে মক্কা গমনের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন এবং আল্লাহর নিকটে দো‘আ করলেন- اللّهُمَّ خُذِ الْعُيُوْنَ وَالْأَخْبَارَ عَنْ قُرَيْشٍ حَتَّى نَبْغَتَهَا فِيْ بِلاَدِهَا ‘হে আল্লাহ! তুমি কুরায়েশদের নিকটে গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এই অভিযানের খবর পৌঁছানোর পথ সমূহ বন্ধ করে দাও। যাতে তাদের অজান্তেই আমরা তাদের শহরে হঠাৎ উপস্থিত হ’তে পারি’।[7] অতঃপর বাহ্যিক কৌশল হিসাবে তিনি আবু ক্বাতাদাহ হারেছ বিন রিব্‘ঈ (أبو قتادة الحارث بن رِبْعِي) -এর নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি দলকে ১লা রামাযান তারিখে ‘ইযাম’ (بطن إضم) উপত্যকার দিকে রওয়ানা করে দেন। যাতে শত্রুরা ভাবে যে, অভিযান ঐদিকেই পরিচালিত হবে। পরে তারা গিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে মিলিত হন।[8]

অভিযান পরিকল্পনা ফাঁসের ব্যর্থ চেষ্টা ও চিঠি উদ্ধার :

বদর যুদ্ধের নিবেদিতপ্রাণ ছাহাবী এবং রাসূলের দান্দান মুবারক শহীদকারী উৎবা বিন আবী ওয়াকক্বাছের হত্যাকারী প্রসিদ্ধ বীর হযরত আবু বালতা‘আহ (রাঃ) রাসূলের আসন্ন মক্কা অভিযানের খবর দিয়ে একটি পত্র লিখে এক মহিলার মাধ্যমে গোপনে মক্কায় প্রেরণ করেন। অহি-র মাধ্যমে খবর অবগত হয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আলী ও মিক্বদাদ (রাঃ)-কে দ্রুত পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, তোমরা ‘খাখ’ (رَوْضَةُ خَاخ) নামক বাগিচায় গিয়ে একজন হাওদা নশীন মহিলাকে পাবে, যার কাছে কুরায়েশদের নিকটে লিখিত একটি পত্র রয়েছে’। তারা অতি দ্রুত পিছু নিয়ে ঠিক সেখানে গিয়েই মহিলাকে পেলেন ও তাকে পত্রের কথা জিজ্ঞেস করলেন। মহিলা অস্বীকার করলে তার হাওদা তল্লাশি চালানো হ’ল। কিন্তু না পেয়ে হযরত আলী তাকে বললেন, مَا كَذَبَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، لَتُخْرِجِنَّ الْكِتَابَ أَوْ لَنُجَرِّدَنَّكِ আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মিথ্যা বলেননি, আল্লাহর কসম! অবশ্যই তুমি চিঠিটি বের করে দেবে, নইলে অবশ্যই আমরা তোমাকে উলঙ্গ করব’। তখন মহিলা ভয়ে তার মাথার খোঁপা থেকে চিঠিটা বের করে দিল। পত্রখানা নিয়ে তারা মদীনায় ফিরে এলেন। তখন হাতেবকে ডেকে রাসূল (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে তিনি বললেন, يَا رَسُولَ اللهِ، لاَ تَعْجَلْ عَلَىَّ، مَا بِىْ إِلاَّ أَنْ أَكُوْنَ مُؤْمِنًا بِاللهِ وَرَسُولِهِ، وَمَا غَيَّرْتُ وَلاَ بَدَّلْتُ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপরে বিশ্বাসী। আমি ধর্মত্যাগী হইনি বা আমার মধ্যে কোনরূপ পরিবর্তনও আসেনি’। তবে ব্যাপারটি হ’ল এই যে, আমি কুরায়েশদের সাথে সম্পৃক্ত (ملحق) একজন ব্যক্তি মাত্র। তাদের গোত্রভুক্ত নই। অথচ তাদের মধ্যে রয়েছে আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সন্তান-সন্ততি। তাদের সাথে আমার কোন আত্মীয়তা নেই, যারা তাদের হেফাযত করবে। অথচ আপনার সাথে যেসকল মুহাজির আছেন, তাদের সেখানে আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাদের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারে। এজন্য আমি চেয়েছিলাম যে, তাদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি দেখাই, যাতে তারা আমার পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়’। তখন ওমর (রাঃ) বলে উঠলেন, হে রাসূল! আমাকে ছেড়ে দিন আমি ওর গর্দান উড়িয়ে দিই। কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খেয়ানত করেছে এবং সে অবশ্যই মুনাফেকী করেছে’। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, إنه قد شهد بدراً ‘সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল’। তোমার কি জানা নেই হে ওমর! আহলে বদর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, اِعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ ‘তোমরা যা খুশী করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি’। একথা শুনে ওমরের দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জ্ঞাত’।[9]

মক্কার পথে রওয়ানা :

৮ম হিজরীর ১০ই রামাযান মঙ্গলবার ১০,০০০ সাথী নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। এই সময় মদীনার দায়িত্বশীল নিযুক্ত করে যান আবু রুহম কুলছূম আল-গেফারী (রাঃ) (أبو رُهم كلثوم الغفاري) -কে।[10]

পথিমধ্যের ঘটনাবলী :

(১) জুহফা (الجحفة) বা তার কিছু পরে পৌঁছে রাসূলের প্রিয় চাচা আববাস ইবনু আব্দিল মুত্ত্বালিবের সাথে সাক্ষাৎ হয়। যিনি পরিবার-পরিজনসহ মুসলমান হয়ে মদীনার পথে হিজরতে বের হয়েছিলেন।

(২) আবওয়া (الأبواء) : যেখানে রাসূলের মা আমেনার কবর রয়েছে- সেখানে পৌঁছলে রাসূলের চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান মুগীরাহ ইবনুল হারেছ এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবী উমাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তাদের দেখে রাসূল (ছাঃ) মুখ ফিরিয়ে নেন। কারণ তারা কঠিন নির্যাতন ও কুৎসা রটনার মাধ্যমে (من شدة الأذى والهجو) রাসূলকে খুবই কষ্ট দিয়েছিল। এ অবস্থা দেখে উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এমনটি হওয়া উচিত নয় যে আপনার চাচাতো ভাই ও ফুফাতো ভাই আপনার কাছে সবচেয়ে বেশী হতভাগ্য হবে (اشقى الناس بك)। কিন্তু তাতে রাসূল (ছাঃ) রাযী না হওয়ার খবর জানতে পেরে তারা বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম! হয় আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দিবেন, না হয় আমরা আমাদের সন্তানাদি নিয়ে একদিকে চলে যাব। অতঃপর ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় মারা যাব’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অন্তর নরম হ’ল এবং তাদেরকে অনুমতি দিলেন’।[11] অন্যদিকে হযরত আলী (রাঃ) আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেছকে শিখিয়ে দিলেন যে, তুমি রাসূলের সম্মুখে গিয়ে সেই কথাগুলি বল, যা ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁকে বলেছিলেন- تَاللهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَخَاطِئِيْنَ (يوسف91) ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে আমাদের উপরে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং আমরা অবশ্যই অপরাধী ছিলাম’ (ইউসুফ ১২/৯১)। কারণ এর চাইতে কারু কোন উত্তম কথা তিনি পসন্দ করবেন না। অতএব আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেছ তাই করলেন। আর সাথে সাথে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সেই জবাবই দিলেন, যা ইউসুফ (আঃ) তার ভাইদের দিয়েছিলেন- لاَ تَثْرَيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِيْنَ (يوسف92) ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি হ’লেন দয়ালুদের সেরা দয়ালু’ (ইউসুফ ১২/৯২)। আবু সুফিয়ান ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং রাসূলের বড় চাচা হারেছ-এর পুত্র। তিনিও হালীমা সা‘দিয়াহর দুধ পান করেছিলেন। সেকারণে রাসূল (ছাঃ) ছিলেন তার দুধ ভাই। রাসূল (ছাঃ) তাকে ক্ষমা করে দিলে খুশীতে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নয় লাইনের একটি কবিতা পাঠ করেন। তার মধ্যে ৩য় লাইনে তিনি বলেন,

هَدَاني هادٍ غيرُ نفسي ودَلَّني * على الله مَنْ طَرَّدتُ كُلَّ مُطَرَّدٍ

‘আমার নফস ব্যতীত অন্য একজন পথপ্রদর্শক আমাকে পথ দেখিয়েছেন এবং আমাকে আল্লাহর পথের সন্ধান দিয়েছেন, যাকে সকল প্রকারের তিরষ্কারের মাধ্যমে আমি তাড়িয়ে দিতাম’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার বুকে থাবা মেরে বললেন,أَنْتَ طَرَّدْتَنِيْ كُلَّ مُطَرَّدٍ ‘তুমিই তো আমাকে সর্বদা তাড়িয়ে দিতে’।[12]

উল্লেখ্য যে, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি কখনো লজ্জায় রাসূলের সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলতেন না। মক্কা বিজয়ের মাত্র ১৯ দিন পরে হোনায়েনের যুদ্ধে যে কয়জন ছাহাবী রাসূলের সাথে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি কোনমতেই রাসূলের উটের লাগাম ছাড়েননি। তাঁর ছেলে জাফর হোনায়েন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দুই ছেলে জাফর ও আব্দুল্লাহ ছাহাবী ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে খুবই ভালবাসতেন এবং বলতেন, أَرْجُو أَنْ يَكُوْنَ خَلَفًا مِنْ حَمْزَةَ ‘আশা করি তিনি হামযাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন’। তিনি তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। রাসূলের ওফাতের পর তিনি যে ১০ লাইনের শোকগাথা পাঠ করেন, তা ছিল  অতীব মর্মস্পর্শী ও হৃদয় বিদারক। ২০ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি বলেন,لاَ تَبْكُوْا عَلَيَّ فَوَاللهِ مَا نَطَقْتُ بِخَطِيئَةٍ مُنْذُ أَسْلَمْتُ ‘তোমরা আমার জন্য কেঁদো না। আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহণের পর হ’তে আমি কোন গোনাহের কথা বলিনি’।[13]

ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবী উমাইয়া যিনি রাসূলের ফুফু আতেকার পুত্র ছিলেন। প্রথম দিকে ইসলামের ঘোর দুশমন থাকলেও ইসলাম গ্রহণের পর সর্বক্ষণ রাসূলের সহযোগী ছিলেন। তিনি রাসূলের সাথে মক্কা বিজয়, হোনায়েন যুদ্ধ ও তায়েফ যুদ্ধে যোগদান করেন এবং তায়েফে শত্রুপক্ষের তীরের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন।

(৩) মার্রুয যাহরানে অবতরণ : মক্কায় প্রবেশের আগের রাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিকটবর্তী মার্রুয যাহরান উপত্যকায় অবতরণ করেন এবং প্রত্যেককে পৃথক পৃথকভাবে আগুন জ্বালাতে বলেন। তাতে সমগ্র উপত্যকা দশ হাযার অগ্নিপিন্ডের এক বিশাল আলোক নগরীতে পরিণত হয়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবকে পাহারাদার বাহিনীর প্রধান নিয়োগ করা হয়।

মক্কাবাসীদের উপরে আসন্ন বিপদ অাঁচ করে হযরত আববাস (রাঃ) অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি মনেপ্রাণে চাচ্ছিলেন যে, উপযুক্ত কোন লোক পেলে তিনি তাকে দিয়ে খবর পাঠাবেন যে, রাসূলের মক্কায় প্রবেশের পূর্বেই কুরায়েশ নেতারা অনতিবিলম্বে এসে যেন রাসূলের নিকটে আত্মসমর্পণ করে। তিনি রাসূলের সাদা খচ্চরের (البيضاء) উপরে সওয়ার হয়ে রাতের অাঁধারে বেরিয়ে পড়েন।

আবু সুফিয়ান গ্রেফতার : ওদিকে ভীত ও শংকিত কুরায়েশ নেতা আবু সুফিয়ান, হাকীম বিন হেযাম ও খোযা‘আহ নেতা বুদাইল বিন ওয়ারক্বা মুসলমানদের খবর জানার জন্য রাত্রিতে ময়দানে বের হয়ে এসেছিলেন। তারা হঠাৎ গভীর রাতে দিগন্তব্যাপী আগুনের মিছিল দেখে হতচকিত হয়ে পড়েন ও একে অপরে নানারূপ আশংকার কথা বলাবলি করতে থাকেন। এমন সময় হযরত আববাস (রাঃ) তাদের কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন ও কাছে এসে বলেন, কি দেখছ, এগুলি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সেনাবাহিনীর জ্বালানো আগুন। ভীত চকিত আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন, فَمَا الْحِيْلَةُ فِدَاك أَبِيْ وَأُمِّيْ ‘তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হৌক- এখন উপায় কি? আববাস (রাঃ) বললেন, وَاللهِ لَئِنْ ظَفِرَ بِكَ لَيَضْرِبَنَّ عُنُقَكَ ‘আল্লাহর কসম! তোমাকে পেয়ে গেলে তিনি অবশ্যই তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন’। অতএব এখুনি আমার খচ্চরের পিছনে উঠে বস এবং চলো রাসূলের কাছে গিয়ে আমি তোমার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি’। কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করে আবু সুফিয়ান খচ্চরের পিছনে বসলেন এবং তার সাথী দু’জন ফিরে গেলেন।

রাসূলের তাঁবুতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সকলে রাসূলের সাদা খচ্চর ও তাঁর চাচা আববাসকে দেখে সসম্মানে পথ ছেড়ে দিয়েছে। ওমরের নিকটে পৌঁছলে তিনি উঠে কাছে এলেন এবং পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখেই বলে উঠলেন, أَبُو سُفْيَانَ عَدُوُّ اللهِ ‘আবু সুফিয়ান, আল্লাহর দুশমন! আলহামদুলিল্লাহ কোনরূপ চুক্তি ও অঙ্গীকার ছাড়াই আল্লাহ তোমাকে আমাদের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছেন’। বলেই তিনি রাসূলের তাঁবুর দিকে চললেন। আববাস (রাঃ) বলেন, আমিও দ্রুত খচ্চর হাঁকিয়ে দিলাম এবং তার আগেই রাসূলের নিকটে পৌঁছে গেলাম ও তাঁর সম্মুখে উপবিষ্ট হ’লাম। ইতিমধ্যে ওমর এসে পৌঁছলেন এবং বললেন, يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذَا أَبُوْ سُفْيَانَ فَدَعْنِيْ أَضْرِبْ عُنُقَهُ ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই সেই আবু সুফিয়ান! আমাকে হুকুম দিন ওর গর্দান উড়িয়ে দিই’। আববাস (রাঃ) তখন রাসূলকে বললেন, يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إنِّيْ قَدْ أَجَرْتُهُ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি’। অতঃপর আমি রাসূলের কাছে উঠে গিয়ে কানে কানে বললাম, وَاللهِ لاَ يُنَاجِيْهِ اللَّيْلَةَ أَحَدٌ دُوْنِيْ ‘আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া অন্য কেউ আজ রাতে আপনার সাথে গোপনে কথা বলবে না’। এরপর ওমর ও আববাসের মধ্যে কিছু বাক্য বিনিময় হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হে আববাস! এঁকে আপনার তাঁবুতে নিয়ে যান। সকালে ওঁকে নিয়ে আমার কাছে আসুন’।

আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ :  সকালে তাঁর নিকটে গেলে তিনি আবু সুফিয়ানকে বললেন, وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنْ لَا إلَهَ إلاَّ اللهُ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, بِأَبِيْ أَنْتَ وَأُمّيْ مَا أَحْلَمَك وَأَكْرَمَك وَأَوْصَلَك لَقَدْ ظَنَنْتُ أَنْ لَوْ كَانَ مَعَ اللهِ إلَهٌ غَيْرُهُ لَقَدْ أَغْنَى شَيْئًا بَعْدُ ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীত হউন। আপনি কতইনা সহনশীল, কতই না সম্মানিত ও কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী! আমি বুঝতে পেরেছি যে, যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহ’লে এতদিন তা আমার কাজে আসত’। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنّيْ رَسُوْلُ اللهِ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আমি যে আল্লাহর রাসূল একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গীত হৌন! আপনি কতই না সহনশীল, কতই না সম্মানিত এবং কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী, أَمَّا هَذِهِ فَإِنَّ فِي النَّفْسِ حَتَّى الْآنَ مِنْهَا شَيْئًا-  ‘কেবল এই ব্যাপারটিতে মনের মধ্যে এখনো কিছু সংশয় রয়েছে’। সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে আববাস (রাঃ) তাকে বলে উঠলেন, وَيْحَكَ أَسْلِمْ وَاشْهَدْ أَنْ لآ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ قَبْلَ أَنْ تُضْرَبَ عُنُقُكَ-  ‘তোমার ধ্বংস হৌক! গর্দান যাওয়ার পূর্বে ইসলাম কবুল কর এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’। সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করলেন ও কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন।

অতঃপর হযরত আববাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! إنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ يُحِبُّ الْفَخْرَ فَاجْعَلْ لَهُ شَيْئًا ‘আবু সুফিয়ান গৌরব প্রিয় ব্যক্তি। অতএব এ ব্যাপারে তাকে কিছু প্রদান করুন’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, نَعَم مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِيْ سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَهُ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ  أَلْقَى السَّلاَحَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ فَهُوَ آمِنٌ ‘হ্যাঁ যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে দেবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে’।[14]

মুসলিম বাহিনী মক্কার উপকণ্ঠে :

১৭ই রামাযান মঙ্গলবার সকালে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মার্রুয যাহরান ত্যাগ করে মক্কায় প্রবেশের জন্য যাত্রা শুরু করলেন। তিনি আববাসকে বললেন যে, আপনি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে উপত্যকা থেকে বের হওয়ার মুখে সংকীর্ণ পথের পার্শ্বে পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। যাতে সে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ও শক্তি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে। আববাস (রাঃ) তাই-ই করলেন। এরপর যখনই স্ব স্ব গোত্রের পতাকা সহ এক একটি গোত্র ঐ পথ অতিক্রম করে, তখনই আবু সুফিয়ান আববাসের নিকটে ঐ গোত্রের পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। যেমন আসলাম, গেফার, জোহায়না, মুযায়না, বনু সোলায়েম ও অন্যান্য গোত্র সমূহ। কিন্তু আবু সুফিয়ান ঐসব লোকদের তেমন মূল্যায়ন না করে বলেন, এদের সাথে আমার কি সম্পর্ক? এরপরে যখন আনছার ও মুহাজির পরিবেষ্টিত হয়ে লোহার বর্ম পরিহিত অবস্থায় জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে একটি বিরাট দলকে আসতে দেখলেন তখন আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ হে আববাস এরা কারা? আববাস (রাঃ) বললেন, মুহাজির ও আনছার বেষ্টিত হয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আসছেন’। আবু সুফিয়ান বললেন, مَا لِأَحَدٍ بِهَؤُلاَءِ قِبَلٌ وَلاَ طَاقَةٌ ‘কারু পক্ষে এদের সাথে মুক্বাবিলার শক্তি হবে না’। অতঃপর বললেন, হে আবুল ফযল! لَقَدْ أَصْبَحَ مُلْكُ ابْنِ أَخِيْكَ الْيَوْمَ عَظِيْمًا ‘তোমার ভাতিজার সাম্রাজ্য তো আজকে অনেক বড় হয়ে গেছে’। আববাস (রাঃ) বললেন, يَا أَبَا سُفْيَانَ إنَّهَا النَّبُوَّةُ ‘হে আবু সুফিয়ান, এটা (রাজত্ব নয় বরং) নবুঅত’। আবু সুফিয়ান বললেন, نَعَمْ إِذَنْ ‘হাঁ, তাহ’লে তাই’।[15]

সা‘দের পতাকা হস্তান্তর : এ সময় একটি ঘটনা ঘটে যায়। আনছারদের পতাকা ছিল খাযরাজ নেতা সা‘দ বিন ওবাদাহ (রাঃ)-এর হাতে। তিনি ইতিপূর্বে ঐ স্থান অতিক্রম করার সময় আবু সুফিয়ানকে শুনিয়ে বলেন, الْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ، الْيَوْمَ تُسْتَحَلَّ الْحُرْمَةُ، الْيَوْمَ أَذَلَّ اللهُ قُرَيْشًا ‘আজ হ’ল মারপিটের দিন। আজ হারামকে হালাল করা হবে। আজ আল্লাহ কুরায়েশকে অপদস্থ করবেন’। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) ঐ স্থান অতিক্রম করার সময় আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি শুনেছেন সা‘দ কি বলেছে? জিজ্ঞেস করলেন কি বলেছে? তখন তাকে সব বলা হ’ল। সেকথা শুনে হযরত ওছমান ও আব্দুর রহমান ইবনু ‘আওফ রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন, আমরা সা‘দের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নই। হয়ত সে কুরায়েশদের মারপিট শুরু করে দেবে’। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, بَلِ الْيَوْمَ يَوْمٌ تُعَظَّمُ فِيْهِ الْكَعْبَةُ، الْيَوْمَ يَوْمٌ أَعَزَّ اللهُ فِيْهِ قُرَيْشًا ‘বরং আজকের দিনটি হবে কা‘বা গৃহের প্রতি যথার্থ মর্যাদা প্রদর্শনের দিন। আজকের দিনটি হবে সেই দিন, যেদিন আল্লাহ কুরায়েশ বংশের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবেন’।[16] অতঃপর তিনি একজনকে পাঠিয়ে সা‘দের নিকট থেকে পতাকা নিয়ে তার পুত্র ক্বায়েমকে দিলেন। যাতে সে বুঝতে পারে যে, পতাকা তার হাত থেকে বাইরে যায়নি। তবে কেউ কেউ বলেন, পতাকাটি যুবায়ের (রাঃ)-কে প্রদান করা হয়।

মুসলিম বাহিনী কুরায়েশদের মাথার উপরে :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অতিক্রম করে যাওয়ার পর হযরত আববাস (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে বললেন, النَّجََاءُ إلَى قَوْمِك ‘তোমার কওমের দিকে দৌঁড়াও’। আবু সুফিয়ান অতি দ্রুত মক্কায় গিয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ هَذَا مُحَمَّدٌ قَدْ جَاءَكُمْ فِيْمَا لَا قِبَلَ لَكُمْ بِهِ فَمَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِيْ سُفْيَان َ فَهُوَ آمِنٌ ‘হে কুরায়েশগণ! মুহাম্মাদ এসে গেছেন, যার মুকাবিলা করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। অতএব যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে’। এ ঘোষণা শুনে তার স্ত্রী হিন্দা এসে তার মোচ ধরে বলে ওঠেন, এই চর্বিওয়ালা শক্ত মাংসধারী মশকটাকে তোমরা মেরে ফেল। এরূপ দুঃসংবাদ দানকারীর মন্দ হৌক’! আবু সুফিয়ান বললেন, তোমরা সাবধান হও! এই মহিলা যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে। লোকেরা বলল, হে আবু সুফিয়ান! তোমার ঘরে কয়জনের স্থান হবে? তিনি বললেন, مَنْ أَغْلَقَ بَابَهُ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَهُوَ آمِنٌ ‘যে ব্যক্তি তার নিজের ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ থাকবে’। একথা শোনার পর লোকেরা স্ব স্ব ঘর ও বায়তুল্লাহর দিকে দৌঁড়াতে শুরু করল।[17] কিন্তু কিছু সংখ্যক নির্বোধ লোক ইকরিমা বিন আবু জাহল, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া, সোহায়েল বিন আমর প্রমুখের নেতৃত্বে মক্কার ‘খান্দামা’ (الخندمة) পাহাড়ের কাছে গিয়ে জমা হ’ল মুসলিম বাহিনীকে বাধা দেওয়ার জন্য। এদের মধ্যে কুরায়েশ মিত্র বনু বকরের জনৈক বীর পুঙ্গব হামাস বিন ক্বায়েস (حماس بن قيس) ছিল। যে ব্যক্তি মুসলমানদের মুকাবিলার জন্য ধারালো অস্ত্র শান দিয়েছিল এবং মুসলমানদের ধরে এনে তার স্ত্রীর গোলাম বানাবার অহংকার প্রদর্শন করে স্ত্রীর সামনে কবিতা পাঠ করেছিল।[18]

খান্দামায় মুকাবিলা ও হতাহতের ঘটনা :

মুসলিম বাহিনী খান্দামায় পৌঁছানোর পর ডান বাহুর সেনাপতি খালেদ ইবনে ওয়ালীদের সাথে তাদের মুকাবিলা হয়। তাতে ১২ জন নিহত হওয়ার পর তাদের মধ্যে পালানোর হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু এই সময় খালেদ বাহিনীর দু’জন শহীদ হন, যারা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তারা হ’লেন কুরয বিন জাবের আল-ফিহরী এবং খুনায়েস বিন খালেদ বিন রাবী‘আহ। মানছূরপুরী এই ব্যক্তির নাম হুবায়েশ (حبيش) বলেছেন এবং এ দু’জনকে قتيل البطحاء বলে অভিহিত করেছেন। হুবায়েশ বিন খালেদ খ্যাতনামা মহিলা উম্মে মা‘বাদের ভাই ছিলেন। এসময় বনু বকরের সেই মহাবীর হামাস ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়ে এসে স্ত্রীকে বলে ‘শীঘ্র দরজা বন্ধ কর’। স্ত্রী ঠাট্টা করে বলেন, কোথায় গেল তোমার সেই বীরত্ব? ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে কবিতাকারে (সাড়ে তিন লাইন) বলল, যদি তুমি ছাফওয়ান ও ইকরিমার পালানোর দৃশ্য এবং মাথার খুলি সমূহ উড়ে যাবার সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো দেখতে, তাহ’লে আমাকে তুমি মোটেই তিরষ্কার করতে পারতে না’।[19]

অতঃপর খালেদ মক্কার গলিপথ সমূহ অতিক্রম করে ছাফা পাহাড়ে উপনীত হ’লেন। অন্যদিকে বামবাহুর সেনাপতি যোবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ) মক্কার উপরিভাগ দিয়ে প্রবেশ করে হাজূন (الحجون) নামক স্থানে অবতরণ করলেন। একইভাবে আবু ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ পদাতিক বাহিনী নিয়ে বাত্বনে ওয়াদীর পথ ধরে মক্কায় পৌঁছে যান।

বিজয়ীর বেশে রাসূলের মক্কায় প্রবেশ :

অতঃপর আনছার ও মুহাজির পরিবেষ্টিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। অতঃপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। এই সময় কা‘বা গৃহের ভিতরে ও বাইরে  ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাতের ধনুক দ্বারা এগুলি ভাঙতে শুরু করেন এবং কুরআনের এ আয়াত পড়তে থাকেন- وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا ‘তুমি বল, হক এসে গিয়েছে, বাতিল অপসৃত হয়েছে’। নিশ্চয়ই বাতিল অপসৃত হয়েই থাকে’ (বনু ইসরাঈল ১৭/৮১)। তিনি আরও পড়েন, قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ ‘তুমি বল হক এসে গেছে এবং বাতিল না শুরু হবে, না আর ফিরে আসবে’ (সাবা ৩৪/৪৯)। অর্থাৎ সত্যের মুকাবিলায় মিথ্যা এমনভাবে পর্যুদস্ত হয় যে, তা কোন বিষয়ের সূচনা বা পুনরাবৃত্তির যোগ্য থাকে না।

অতঃপর ওছমান বিন ত্বালহাকে ডেকে তার কাছ থেকে কা‘বা ঘরের চাবি নিয়ে দরজা খুলে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ভিতরে প্রবেশ করেন। তিনি সেখানে বহু মূর্তি ও ছবি দেখতে পান। যার মধ্যে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর দু’টি ছবি বা প্রতিকৃতি ছিল- যাদের হাতে ভাগ্য নির্ধারণী তীর ছিল (يستقسمان بالأزلام)। এ দৃশ্য দেখে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলে ওঠেন, قَاتَلَهُمُ اللهُ لَقَدْ عَلِمُوا مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطُّ ‘মুশরিকদের আল্লাহ ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! তারা জানে যে, তাঁরা কখনোই এ ধরনের তীর ব্যবহার করেননি’।[20] তিনি সেখানে একটা কাঠের তৈরী কবুতরী দেখেন। যেটাকে নিজ হাতে ভেঙ্গে ফেলেন। অতঃপর তিনি সমস্ত ছবি-মূর্তি নিশ্চিহ্ন করে ফেলার নির্দেশ দেন এবং সাথে সাথে তা পালিত হয়।

অতঃপর তিনি কা‘বা গৃহের দরজা বন্ধ করে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে কেবল উসামা ও বেলাল ছিলেন। এরপর তিনি দরজা বরাবর সম্মুখ দেওয়ালের তিন হাত পিছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করেন।

মানছূরপুরী এই ছালাতকে শুকরিয়ার ছালাত বলেছেন।[21] কোন কোন বিদ্বান একে ‘তাহিইয়াতুল মসজিদ’ দু’রাক‘আত ছালাত বলেছেন।[22] তবে ঐদিন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কা‘বা গৃহের মধ্যে ছালাত আদায় করেছিলেন কি-না, এ নিয়ে বেলাল ও উসামাহর দু’ধরনের বক্তব্য থাকায় বিদ্বানগণ একমত হ’তে পারেননি। এটা নিশ্চিত যে, ঐ সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ‘মুহরিম’ ছিলেন না এবং পরবর্তীতে বিদায় হজ্জের সময় তিনি কা‘বার মধ্যে ছালাত আদায় করেননি। কেননা মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে কা‘বাকে সামনে রেখে ছালাত আদায়ের নির্দেশ রয়েছে কুরআনে। কিন্তু কা‘বার ভিতরে গিয়ে ছালাত আদায়ের কথা নেই।[23] এ সময় তাঁর ডান পাশে একটি ও বাম পাশে দু’টি স্তম্ভ এবং পিছনে তিনটি স্তম্ভ ছিল। ঐ সময় কা‘বা গৃহে মোট ৬টি স্তম্ভ ছিল। অতঃপর তিনি ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখেন ও সর্বত্র আল্লাহু আকবরলা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে থাকেন। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দেন। এ সময় হাযার হাযার লোক কা‘বা গৃহের সম্মুখে দন্ডায়মান ছিল।

রাসূলের ১ম দিনের ভাষণ :

অতঃপর তিনি দরজার দুই পাশ ধরে নীচে দন্ডায়মান কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। যেখানে তিনি বলেন, لآ إلَه إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ ‘আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তাঁর কোন শরীক নেই, তিনি তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন। তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং সেনাদলকে একাই পরাভূত করেছেন’। শুনে রাখ, সম্মান ও সম্পদের সকল অহংকার এবং রক্তারক্তি আমার পদতলে নিষ্পেষিত হ’ল। কেবলমাত্র বায়তুল্লাহর চাবি সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর (سِدَانَةُ البيت وسِقايةُ الحاج) সম্মানটুকু ছাড়া (অর্থাৎ এ দু’টি দায়িত্ব তোমাদের জন্য বহাল রইল)। ভুলবশত হত্যা যা লাঠিসোটা দ্বারা হয়ে থাকে, তা ইচ্ছাকৃত হত্যার সমতুল্য (إِنَّ دِيَةَ الْخَطَأِ شِبْهُ الْعَمَدِ) , তাকে পূর্ণ রক্তমূল্য (دية مغلظة) দিতে হবে একশ’টি উট। যার মধ্যে ৪০টি হবে গর্ভবতী।[24]

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، فَالنَّاسُ رَجُلاَنِ : مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُوْ آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ-

‘হে জনগণ! আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের অংশ ও পূর্ব পুরুষের অহংকার দূরীভূত করে দিয়েছেন। মানুষ দু’প্রকারের : মুমিন আল্লাহভীরু অথবা পাপাচারী হতভাগ্য। তোমরা আদম সন্তান। আর আদম ছিলেন মাটির তৈরী’। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ- ‘হে মানবজাতি! আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী হ’তে সৃজন করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হ’তে পার। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যিনি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বকিছু খবর রাখেন’ (হুজুরাত ৪৯/১৩)[25] অতঃপর বললেন, يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ مَا تَرَوْنَ أَنّي فَاعِلٌ بِكُمْ؟ ‘হে কুরায়েশগণ! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করব বলে তোমরা আশা কর’? সবাই বলে উঠল, خَيْرًا أَخٌ كَرِيمٌ وَابْنُ أَخٍ كَرِيمٍ ‘উত্তম আচরণ। আপনি দয়ালু ভাই ও দয়ালু ভাইয়ের পুত্র’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, فَإِنّي أَقُولُ لَكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ اذْهَبُوا فَأَنْتُمْ الطّلَقَاءُ ‘শোন! আমি তোমাদের সেকথাই বলছি, যেকথা ইউসুফ তার ভাইদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ আর কোন অভিযোগ নেই’ (ইউসুফ ১২/৯২)। যাও তোমরা সবাই মুক্ত’।[26] বর্ণনাটির সনদ যঈফ হ’লেও মর্ম (Meaning) ছহীহ। কেননা ঐ দিন কাউকে বন্দী করা হয়নি বা গণীমত সংগ্রহ করা হয়নি। বরং সবাই মুক্ত ছিল এবং উপস্থিত সবাই বায়‘আত নিয়ে ইসলাম কবুল করেছিল। তাছাড়া বর্ণনাটি খুবই প্রসিদ্ধ এবং প্রায় সকল জীবনীকার এটি বর্ণনা করেছেন।

কা‘বা গৃহের চাবি :

ভাষণ শেষে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মসজিদুল হারামে বসে পড়লেন। এমন সময় চাবি হাতে নিয়ে হযরত আলী (রাঃ) এসে বললেন, হে রাসূল! اجْمَعْ لَنَا الْحِجَابَةَ مَعَ السّقَايَةِ ‘আমাদেরকে হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্বের সাথে সাথে কা‘বার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্বটাও অর্পণ করুন’। صَلّى اللّهُ عَلَيْكَ ‘আল্লাহ আপনার উপরে রহম করুন’। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, এই দাবীটি চাচা হযরত আববাস (রাঃ) করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, أَيْنَ عُثْمَانُ بْنُ طَلْحَةَ ؟ ‘ওছমান বিন তালহা কোথায়? অতঃপর তিনি এলে তাকে বললেন, هَاكَ مِفْتَاحَكَ يَا عُثْمَانُ الْيَوْمَ يَوْمُ بِرّ وَوَفَاءٍ ‘এই নাও তোমার চাবি হে ওছমান! আজ হ’ল সদাচরণ ও ওয়াদা পূরণের দিন’।[27] অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) একথাও বলেন, خُذُوهَا خَالِدَةً تَالِدَةً لاَ يَنْزِعُهَا مِنْكُمْ إلاَّ ظَالِمٌ ‘তোমরা এটা গ্রহণ কর চিরদিনের জন্য। তোমাদের কাছ থেকে কেউ এটা ছিনিয়ে নেবে না যালেম ব্যতীত। হে ওছমান! আল্লাহ তাঁর গৃহের জন্য তোমাদেরকে আমানতদার করেছেন فَكُلُوا مِمّا يَصِلُ إلَيْكُمْ مِنْ هَذَا الْبَيْتِ بِالْمَعْرُوفِ ‘অতএব এই গৃহ থেকে ন্যায়সঙ্গত ভাবে যা তোমাদের কাছে আসবে, তা তোমরা ভক্ষণ করবে’।[28]

উল্লেখ্য যে, জাহেলী যুগ থেকেই বনু হাশিমের উপরে এবং সে হিসাবে ইসলামী যুগের প্রাক্কালে হযরত আববাস-এর উপরে হাজীদের পানি পান করানোর এবং ওছমান বিন তালহার উপরে কা‘বার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল। ওছমান বিন তালহা ৭ম হিজরীর ১ম দিকে মদীনায় গিয়ে ইসলাম কবুল করেন।

কা‘বার ছাদে আযানের ধ্বনি :

যোহরের ওয়াক্ত সমাগত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বেলালকে নির্দেশ দিলেন কা‘বার ছাদে দাঁড়িয়ে আযান দিতে। শুরু হ’ল বেলালের মনোহারিণী কণ্ঠের গুরুগম্ভীর আযান। শিরকী জাহেলিয়াত খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়লো তাওহীদ ও রিসালাতের গগনভেদী আওয়াযে। মক্কার পাহাড়ে ও উপত্যকায় সে আওয়ায ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চলে গেল দূরে বহু দূরে। ছবি ও মূর্তিহীন কা‘বা পুনরায় ইবরাহিমী যুগের আসল চেহারা ফিরে পেল। বেলালী কণ্ঠের এ আযান ধ্বনি যেন তাই খোদ কা‘বারই কণ্ঠস্বর। মুমিনের হৃদয়ে তা এনে দিল এক অনাবিল আনন্দের মূর্চ্ছনা, এক অনুপম আবেগময় অনুভূতি। আড়াই হাযার বছর পূর্বে নির্মিত ইবরাহীম ও ইসমাঈলের স্মৃতিধন্য কা‘বার পাদদেশে মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে ছালাতের ইমামতি করবেন ইসমাঈল- সন্তান মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। মক্কার অলিতে-গলিতে শুরু হ’ল এক অনির্বচনীয় আনন্দের ঢেউ। দলে দলে মুমিন নর-নারী ছুটলো কা‘বার পানে। সে দৃশ্য কেবল মনের চোখেই দেখা যায়। লিখে প্রকাশ করা যায় না। কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়, মুখে বলা যায় না। কিন্তু শয়তান তখনও আশা ছাড়েনি।

সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী কুরায়েশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব এবং তার সাথী মুশরিক নেতা আত্তাব বিন আসীদ ও হারেছ বিন হেশাম- যারা এসময় কা‘বার চত্বরে বসেছিলেন, এ আযান তাদের হৃদয়ে কোন রেখাপাত করেনি। জাহেলী যুগের কৌলিন্যের অহংকার তখনও তাদেরকে তাড়া করে ফিরছিল। তাদের অন্যতম নেতা উমাইয়া বিন খালাফের সাবেক ক্রীতদাস ও তার হাতে সে সময় মর্মান্তিকভাবে নির্যাতিত নিগ্রো যুবক বেলাল আজ মহাপবিত্র কা‘বার ছাদে ওঠে দাঁড়িয়েছে, এটা তাদের কাছে ছিল নিতান্ত অসহনীয় বিষয়। কথায় কথায় আল্লাহর নাম নিলেও লাত ও ওয্যার এই সেবকদের নিকটে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর আযান ধ্বনি অত্যন্ত অপসন্দনীয় ঠেকলো। তাই আত্তাব বলে উঠলেন, (পিতা) আসীদকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন যে, তিনি এটা শুনেননি, যা তাঁকে ক্রুদ্ধ করত’। হারেছ বললেন, আল্লাহর কসম! যদি আমি জানতে পারি যে, ইনি সত্য, তাহ’লে অবশ্যই আমি তাঁর অনুসারী হয়ে যাব’। আবু সুফিয়ান বললেন, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই বলব না। কেননা যদি আমি কিছু বলি তাহ’লে এই কংকরগুলিও আমার সম্পর্কে খবর দিয়ে দেবে’। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেখানে উপস্থিত হ’লেন এবং বললেন, এইমাত্র তোমরা যেসব আলাপ করছিলে, তা আমাকে জানানো হয়েছে। অতঃপর তিনি সব বলে দিলেন। তখন হারেছ ও আত্তাব বলে উঠলেন,نَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ- ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল’! আল্লাহর কসম! আমাদের নিকটে এমন কেউ ছিল না যে, সে গিয়ে আপনাকে বলে দিবে’।[29]

উম্মে হানীর গৃহে ৮ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় :

মক্কা বিজয়ের দিন দুপুরের কিছু পূর্বে বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হযরত আলীর বোন উম্মে হানীর গৃহে গমন করেন ও গোসল সেরে ৮ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করেন। এই ছালাত সূর্য গরম হওয়ার সময় আদায়ের কারণে অনেকে একে ‘ছালাতুয যুহা’ বলেছেন। তবে ছফিউর রহমান মুবারকপুরী বলেন, وَإِنَّمَا هَذِهِ صَلاَةُ الْفَتْحِ، ‘বস্ত্ততঃ এটি ছিল বিজয়োত্তর শুকরিয়ার ছালাত’। ইবনু কাছীর বলেন, এটি ছিল বিজয়োত্তর শুকরিয়ার ছালাত যা তিনি দুই দুই রাক‘আত করে পড়েছিলেন। পরে এটিই রীতি হয়ে যায়, যেমন সা‘দ ইবনু আবী ওয়াকক্বাছ মাদায়েন বিজয়ের দিন এটা পড়েন।[30] এই সময় উম্মে হানীর ঘরে তার দু’জন দেবর আশ্রিত ছিল। হযরত আলী তাদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন। উম্মে হানী তাদের জন্য রাসূলের নিকটে আশ্রয় চাইলে তিনি তাদের আশ্রয় দেন।

বড় বড় পাপীদের রক্ত অনর্থক ঘোষণা (إهدار دم رجال من أكابر المجرمين) :

মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বড় বড় পাপীদের মধ্যে নয় ব্যক্তির রক্ত অনর্থক সাব্যস্ত করেন এবং কঠোর নির্দেশ জারি করেন যে, এরা যদি কা‘বার গেলাফের নীচেও আশ্রয় নেয়, তথাপি তাদের হত্যা করা হবে। (وأمر بقتلهم وإن وجدوا تحت أستار الكعبة) এই নয় জন ছিল- (১) আব্দুল উযযা বিন খাত্বাল (২-৩) তার দুই দাসী, যারা রাসূলকে ব্যঙ্গ করে গান গাইত (৪) সারাহ- যে আব্দুল মুত্ত্বালিবের সন্তানদের কারু দাসী ছিল। এই দাসীই মদীনা থেকে গোপনে হাতেব বিন আবী বালতা‘আহর পত্র বহন করেছিল। (৫) ইকরিমা বিন আবু জাহল (৬) আব্দুল্লাহ বিন সা‘দ বিন আবী সারাহ (৭) হারেছ বিন নুফাইল বিন ওয়াহাব (৮) মিক্বইয়াস বিন হুবাবাহ (مقيس بن حبابة) (৯) হোবার ইবনুল আসওয়াদ (هبار بن الأسود)। পরে এদের মধ্যে চারজনকে হত্যা করা হয় এবং পাঁচ জনকে ক্ষমা করা হয়। তারা সবাই ইসলাম কবুল করেন।

যাদেরকে হত্যা করা হয়, তারা হ’ল- (১) আব্দুল উযযা ইবনু খাত্বাল। সে কা‘বা গৃহের গেলাফ ধরে ঝুলছিল। জনৈক ছাহাবী এখবর দিলে রাসূল (ছাঃ) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। (২) মিক্বয়াস বিন হুবাবাহ। এ ব্যক্তি ইতিপূর্বে মুসলমান হয়ে জনৈক আনছার ছাহাবীকে হত্যা করে মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। নুমায়লা বিন আব্দুল্লাহ তাকে হত্যা করেন। (৩) হুওয়াইরিছ বিন নুক্বাইয বিন ওয়াহাব। এ ব্যক্তি মক্কায় রাসূলকে কঠিনভাবে কষ্ট দিত। এ ব্যক্তি মক্কা থেকে মদীনায় প্রেরণের সময় রাসূল-কন্যা হযরত ফাতেমা ও উম্মে কুলছূমকে তীর মেরে উটের পিঠ থেকে ফেলে দিয়েছিল।[31] হযরত আলী তাকে হত্যা করেন। (৪) ইবনু খাত্বালের দুই দাসীর মধ্যে একজন।

অতঃপর ক্ষমাপ্রাপ্ত পাঁচজন হ’লেন : (১) আব্দুল্লাহ ইবনু আবী সারাহ সে ইতিপূর্বে একবার ইসলাম কবুল করে মুরতাদ হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত ওছমান তাকে সাথে নিয়ে রাসূলের দরবারে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরে তার ইসলাম খুবই ভাল ছিল। (২) ইকরিমা বিন আবু জাহল। তার স্ত্রী এসে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়। পরে ইয়ামনের পথে পলায়নরত ইকরিমাকে স্ত্রী গিয়ে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তার ইসলাম খুবই ভাল ছিল। (৩) হোবার ইবনুল আসওয়াদ। এ ব্যক্তি রাসূলের গর্ভবতী কন্যা যয়নবকে হিজরতের সময় তীক্ষ্ণ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিল। যাতে তিনি আহত হয়ে উটের পিঠের হাওদা থেকে নীচে পাথরের উপরে পতিত হন এবং তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের দিন এই ব্যক্তি পালিয়ে যায়। পরে মুসলমান হয় এবং তার ইসলাম সুন্দর ছিল। (৪) ইবনু খাত্বালের দুই গায়িকা দাসীর মধ্যে একজনের জন্য আশ্রয় চাওয়া হয়। অতঃপর সে ইসলাম কবুল করে। (৫) সারাহর জন্যও আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় এবং সেও ইসলাম কবুল করে।[32]

এদিকে মক্কার অন্যতম নেতা ছাফওয়ান বিন উমাইয়ার রক্ত বৃথা সাব্যস্ত করা না হ’লেও তিনি পালিয়ে যান। ওমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জামহী তার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করলে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তা মঞ্জুর করেন এবং তাকে আশ্রয় দানের প্রতীক স্বরূপ নিজের পাগড়ী প্রদান করেন, যে পাগড়ী পরে তিনি বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। অতঃপর ওমায়ের যখন ছাফওয়ানের নিকটে পৌঁছেন, তখন তিনি জেদ্দা হ’তে ইয়ামন যাওয়ার জন্য জাহাযে ওঠার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। ওমায়ের তাকে ফিরিয়ে আনেন। তিনি এসে রাসূলের নিকট দু’মাস সময়ের আবেদন করেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে চার মাস সময় দেন। অতঃপর ছাফওয়ান ইসলাম কবুল করেন। তার স্ত্রী পূর্বেই ইসলাম কবুল করেছিলেন। ফলে তাদের মধ্যে বিবাহ বহাল রাখা হয়।[33]

উল্লেখ্য যে, বর্ণিত ৯ জনের তালিকা ছাড়াও অন্য কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। ফলে সর্বমোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ জন। যার মধ্যে ৮ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী।[34] যাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়জনের অন্যতম ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে ওৎবা। যিনি মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমান হন। অন্যজন হ’লেন হামযাহ (রাঃ)-এর হত্যাকারী ওয়াহশী বিন হারব, যিনি পরে মদীনায় গিয়ে ইসলাম কবুল করেন। অন্যজন হ’লেন বিখ্যাত কবি কা‘ব বিন যুহায়ের, যিনি পরে রাসূলের নামে প্রশংসা মূলক কবিতা লিখে মদীনায় গিয়ে ইসলাম কবুল করেন। রাসূল (ছাঃ) খুশী হয়ে তাকে নিজের চাদর উপহার দেন বলে উক্ত কবিতাটি ‘ক্বাছীদা বুরদাহ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যার অপচেষ্টা :

এই ভূমিধ্বস বিজয়ের মধ্যেও শয়তান তার কুমন্ত্রণা অব্যাহত রাখে। মক্কার একজন দুঃসাহসী পুরুষ ‘ফাযালাহ বিন ওমায়ের’ (فضالة بن عمير) রাসূলকে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকে। ত্বাওয়াফ কালীন সময়কেই সে উত্তম সুযোগ বলে ধরে নেয়। সেমতে সে নিজেও ত্বাওয়াফকারী হয়ে রাসূলের কাছাকাছি হয় এবং হত্যার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখনই তার কুমতলবের কথা ফাঁস করে দেন। এতে বিস্মিত ও ভীত হয়ে সে দ্রুত ইসলাম কবুল করে নেয়। এ সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার বুকে হাত রেখে বলেন, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও। এতে তার হৃদয় শীতল হয়ে যায়। ফাযালাহ বলেন, এটি আমার নিকটে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয়তর ছিল।[35]

মক্কা বিজয়ের ২য় দিন : রাসূল (ছাঃ)-এর ভাষণ :

২য় দিন সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ভাষণ দেবার  জন্য  দন্ডায়মান  হন।  যথারীতি  হাম্দ ও ছানার পরে তিনি বলেন,إِنَّ اللهَ حَبَسَ عَنْ مَكَّةَ الْفِيْلَ وَسَلَّطَ عَلَيْهَا رَسُوْلَهُ وَالْمُؤْمِنِيْنَ، وَإنَّهُ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالأَمْسِ فَلْيُبْلِغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ  ‘নিশ্চয়ই  আল্লাহ  মক্কা  থেকে হস্তীওয়ালাদের প্রতিরোধ করেছিলেন এবং তার উপরে তিনি তাঁর রাসূল ও মুমিনদের বিজয়ী করেছেন। আজ তার হুরমত ফিরে এসেছে, যেমন গতকাল ছিল। অতএব উপস্থিত ব্যক্তিগণ অনুপস্থিতগণের নিকটে এ খবর পৌঁছে দাও’। তিনি আরও বলেন, হে জনগণ! আল্লাহ এই মক্কাকে ‘হারাম’ সাব্যস্ত করেছেন সেদিন, যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেন। এটি ক্বিয়ামত পর্যন্ত ‘হারাম’ থাকবে। অতএব আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির জন্য এখানে রক্ত প্রবাহিত করা হালাল নয়। এখানকার বৃক্ষ কর্তন করাও হালাল নয়। আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য যুদ্ধের কারণে (বিজয়) দিবসের একটি বিশেষ সময়ের জন্য রক্ত প্রবাহিত করার অনুমতি দিয়েছিলেন। আজ থেকে তার হুরমত ও পবিত্রতা পূর্বের ন্যায় ফিরে এসেছে। অতএব যারা উপস্থিত আছ, তারা অনুপস্থিত লোকদের নিকটে আমার এ ঘোষণাটি পৌঁছে দাও’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি একথাও বলেন যে, হারাম এলাকার কোন কাঁটা কেউ উঠাবে না, কোন শিকার কেউ তাড়াবে না, কোন হারানো বস্ত্ত কেউ কুড়াবে না। তবে উক্ত বিষয়ে প্রচার করা যাবে। কোন ঘাস কেউ কাটবে না’। এ সময় হযরত আববাস (রাঃ)-এর অনুরোধে নিত্য ব্যবহার্য ‘ইযখির’ (الإذخر) ঘাস কাটার ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া হয়।

এই দিন রাসূলের মিত্র বনু খোযা‘আহ গোত্রের লোকেরা বনু লাইছ (بنو ليث) গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করে জাহেলিয়াতের সময় তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যার বদলা নেয়। একথা জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের ডেকে বলেন, يَا مَعْشَرَ خُزَاعَةَ وَارْفَعُو أَيْدِيَكُمْ عَنِ الْقَتْلِ فَقَدْ كَثُرَ إِنْ يَّقَعَ ‘হে বনু খোযা‘আহ! হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত হও। কেননা হত্যাকান্ড সংঘটিত হ’লে এর সংখ্যা বেড়ে যাবে’। فَمَنْ قُتِلَ بَعْدَ مَقَامِيْ هَذَا فَأَهْلُهُ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ إِنْ شَاءُوْا فَدَمُ قَاتِلِهِ وَإِنْ شَاءُوْا فَعَقْلُهُ ‘অতএব এর পরে যদি কেউ  হত্যা করে, তবে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য দু’টি এখতিয়ার থাকবে। যদি তারা চায় তবে হত্যার বদলে হত্যা করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণ করবে’।

অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, এ সময় ‘আবু শাহ’ নামক জনৈক ইয়ামনবাসী উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, اُكْتُبْ لِى يَا رَسُوْلَ اللهِ ‘কথাগুলি আমাকে লিখে দিন হে আল্লাহর রাসূল’! তখন রাসূল (ছাঃ) হুকুম দিলেন, اُكْتُبُوْا لأَبِىْ شَاهٍ ‘তোমরা আবু শাহকে কথাগুলি লিখে দাও’।[36] রাসূল (ছাঃ)-এর এ নির্দেশের মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় হাদীছ সংকলনের দলীল পাওয়া যায়।

ছাফা পাহাড়ের শীর্ষে দাঁড়িয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর দো :

মক্কা বিজয় সমাপ্ত হওয়ায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) দ্বিতীয় দিন ছাফা পাহাড়ের শীর্ষে ওঠেন এবং দু’হাত তুলে আল্লাহর নিকটে প্রাণভরে দো‘আ করতে থাকেন।

আনছারদের সন্দেহ :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন দু’হাত উঠিয়ে প্রার্থনায় রত ছিলেন, তখন আনছারগণ আপোষে বলাবলি করতে থাকেন, হয়তবা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মক্কাতেই থেকে যাবেন। আর মদীনায় ফিরে যাবেন না। কেননা মক্কা তাঁর শহর, তাঁর দেশ ও তাঁর জন্মভূমি (بَلَدُهُ وَوَطَنُهُ وَمَوْلِدُهُ)। দো‘আ থেকে ফারেগ হয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আনছারদের ডেকে বললেন, তোমরা কি বলছিলে? তারা বললেন, তেমন কিছু নয়। কিন্তু রাসূলের পীড়াপীড়িতে অবশেষে তারা সব বললেন। তখন জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, مَعَاذَ اللهِ الْمَحْيَا مَحْيَاكُمْ وَالْمَمَاتُ مَمَاتُكُمْ ‘আল্লাহর আশ্রয় চাই। আমার জীবন তোমাদের সাথে ও আমার মরণ তোমাদের সাথে’।[37]

জনগণের নিকট থেকে বায়আত গ্রহণ :

মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিন হাযার হযার লোক ছাফা পাহাড়ের পাদদেশে জমা হ’তে থাকে আল্লাহর রাসূলের হাতে ইসলামের দীক্ষা নেবার জন্য এবং আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণের জন্য। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ছাফা পাহাড়ের শীর্ষে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা শেষে উপবেশন করলেন এবং ওমর (রাঃ) তাঁর নীচে বসলেন জনগণের বায়‘আত নেবার জন্য (يأخذ على الناس) । সকলে বায়‘আত নেন সাধ্যমত শ্রবণ ও আনুগত্যের উপরে (فبايعوه على السمع والطاعة فيما استطاعوا)।

মহিলাদের বায়আত :

এভাবে পুরুষের বায়‘আত শেষ হ’লে মহিলাদের বায়‘আত শুরু হয়। একই স্থানে একইভাবে রাসূলের নির্দেশ ক্রমে ওমর (রাঃ) তাদের বায়‘আত গ্রহণ করেন (يبايعهن بأمره) এবং রাসূলের কথাগুলি তাদের নিকটে পৌঁছে দেন। উল্লেখ্য যে, মহিলাদের বায়‘আত কেবল মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে হয়ে থাকে, হাতে হাত লাগাতে হয় না।

হিন্দার বায়আত :

বায়‘আত গ্রহণের এক পর্যায়ে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উৎবাহ ছদ্মবেশে উপস্থিত হন। যাতে রাসূল (ছাঃ) তাকে চিনতে না পারেন। কারণ হামযার লাশের সঙ্গে তিনি যে নির্মম আচরণ করেছিলেন সেজন্য তিনি লজ্জিত ছিলেন। অতঃপর বায়‘আতের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মহিলাদের উদ্দেশ্যে বললেন, لاَ تُشْرِكْنَ بِاللهِ شَيْئًا ‘তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। ওমর (রাঃ) একথার উপরে মহিলাদের অঙ্গীকার নিলেন।
(২) এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, وَلاَ تَسْرِقْنَ ‘তোমরা চুরি করবে না’। একথা শুনে হিন্দা বলে উঠলেন, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক। আমি যদি তার মাল থেকে কিছু নেই, তাহ’লে? সেখানে উপস্থিত আবু সুফিয়ান বললেন, তুমি যা নেবে, সব তোমার জন্য হালাল হবে’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে চিনতে পেরে হেসে উঠে বললেন, وإنك لهند؟ ‘তাহ’লে তুমি হিন্দা’? তিনি বললেন, نعم، فاعف عما سلف يا نبي الله، ‘হাঁ! হে আল্লাহর নবী পিছনে যা কিছু ঘটে গেছে সেজন্য আমাকে মাফ করে দিন’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে মাফ করে দিলেন।
(৩) অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, وَلاَ يَزْنِيْنَ ‘তারা যেন ব্যভিচার না করে’। হিন্দা বলে উঠলেন, أَوَ تَزْنِي الْحُرَّةُ؟ ‘কোন স্বাধীনা নারী কি যেনা করে’?
(৪) রাসূলুললাহ (ছাঃ) বললেন, وَلاَ يَقْتُلْنَ أَوْلاَدَهُنَّ ‘তারা যেন নিজ সন্তানদের হত্যা না করে’। হিন্দা বললেন, رَبَّيْنَاهُمْ صِغَارًا، وَقَتَلْتُمُوْهُمْ كِبَارًا، فَأَنْتُمْ وَهُمْ أَعْلَمُ ‘আমরা শৈশবে তাদের লালন করেছি, আপনারা যৌবনে তাদের হত্যা করেছেন। এখন এ বিষয়ে আপনারা ও তারাই ভাল জানেন’। উল্লেখ্য যে, তার পুত্র হানযালা বিন আবু সুফিয়ান বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছিল। হিন্দার একথা শুনে ওমর (রাঃ) হেসে চিৎ হয়ে পড়লেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃদু হাসলেন।
(৫) আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বললেন, وَلاَ يَأْتِيْنَ بِبُهْتَانٍ ‘তারা যেন কাউকে মিথ্যা অপবাদ না দেয়’। হিন্দা বললেন, আল্লাহর কসম! অপবাদ অত্যন্ত জঘন্য কাজ (لأمر قبيح)। আপনি আমাদেরকে বাস্তবিকই সুপথ ও উত্তম চরিত্রের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
(৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, وَلاَ يَعْصِيْنَكَ فِيْ مَعْرُوْفٍ   ‘কোন সদুপদেশে রাসূলের অবাধ্য হবে না’। হিন্দা বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার অবাধ্য হব এরূপ মনোভাব নিয়ে আমরা মজলিসে বসিনি’। অতঃপর হিন্দা বাড়ী ফিরে গিয়ে নিজ হাতে বাড়ীতে রক্ষিত মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলেন আর বলেন, كُنَّا مِنْكَ فِيْ غُرُوْرٍ ‘আমরা তোর ব্যাপারে এতদিন ধোঁকার মধ্যে ছিলাম’।[38]

রাসূল (ছাঃ)-এর মক্কায় অবস্থান কার্যসমূহ :

মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেখানে ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি সর্বদা মানুষকে তাক্বওয়ার উপদেশ দেন এবং হেদায়াতের রাস্তাসমূহ বাৎলিয়ে দিতে থাকেন। আবু উসায়েদ আল-খোযাঈকে দিয়ে হারাম শরীফের নতুন সীমানা স্তম্ভসমূহ খাড়া করেন। ইসলামের প্রচারের জন্য এবং মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার জন্য চারদিকে ছোট ছোট সেনাদল প্রেরণ করেন। এছাড়া ঘোষকের মাধ্যমে মক্কার অলি-গলিতে ঘোষণা প্রচার করে দেন যে,مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلاَ يَدَعْ فِيْ بَيْتِهِ صَنَمًا إِلاَّ كَسَرَهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপরে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার বাড়ীতে রক্ষিত মূর্তি ভেঙ্গে ফেলে’।[39]

বিভিন্ন এলাকায় প্রেরিত সেনাদল :

(১) উযযা (العزى) মূর্তি চূর্ণ : মক্কা বিজয়ের এক সপ্তাহ পরে ২৫শে রামাযান তারিখে খালেদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে ৩০ জনের একটি অশ্বারোহী দল নাখলায় প্রেরিত হয় ‘উযযা’ মূর্তি চূর্ণ করার জন্য। এই মূর্তিটি ছিল কুরায়েশ ও সমস্ত বনু কেনানাহ গোত্রের পূজিত সবচেয়ে বড় মূর্তি। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) মূর্তিটি ভেঙ্গে দিয়ে চলে এলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, هَلْ رَأَيْتَ شَيْئًا؟ ‘কিছু দেখেছ কি’? বললেন, না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাহ’লে তুমি ভাঙ্গোনি। আবার যাও ওটা ভেঙ্গে এসো’। এবার খালেদ উত্তেজিত হয়ে কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে ছুটলেন এবং সেখানে যেতেই এক কৃষ্ণাঙ্গ ও বিস্রস্ত চুল বিশিষ্ট নগ্ন মহিলাকে তাদের দিকে বেরিয়ে আসতে দেখেন। একে দেখে মন্দির প্রহরী চিৎকার দিয়ে উঠলো। কিন্তু খালেদ তাকে এক কোপে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাসূলের কাছে ফিরে এসে রিপোর্ট করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হাঁ। এটাই হ’ল উযযা। এখন সে তোমাদের দেশে পূজা পাবার ব্যাপারে চিরদিনের জন্য নিরাশ হয়ে গেল’।

(২) সুওয়া‘ (سواع) মূর্তি চূর্ণ : আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-কে একদল সৈন্যসহ রামাযান মাসেই পাঠানো হয় হুযায়েল (بنو هذيل) গোত্রের পূজিত সুওয়া‘ নামক বড় দেবমূর্তিটি ভাঙ্গার জন্য। যা ছিল মক্কা হ’তে তিন মাইল দূরে রেহাত্ব (رهاط) অঞ্চলে। আমর সেখানে পৌঁছলে মন্দির প্রহরী বলল, কি চাও তোমরা? আমর বললেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এটাকে ভাঙ্গার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন’। সে বলল, তোমরা সক্ষম হবে না’। আমর বললেন, কেন? সে বলল, তোমরা (স্বাভাবিক নিয়মে) বাধাপ্রাপ্ত হবে’। আমর বললেন,حَتَّى الآن أَنْتَ عَلَى الْبَاطِلِ؟ فَهَلْ يَسْمَعُ أَوْ يَبْصِرُ؟  ‘তুমি এখনো বাতিলের উপরে রয়েছ? সে কি শুনতে পায় না দেখতে পায়?’ বলেই তিনি ওটাকে গুঁড়িয়ে দিলেন। প্রহরীকে বললেন, এবার তোমার মত কি? সে বলে উঠলো, أسلمت لله ‘আমি আল্লাহর জন্য ইসলাম কবুল করলাম’।

(৩) মানাত (مناة) মূর্তি চূর্ণ : একই মাসের মধ্যে ২০ জন অশ্বারোহী সহ সা‘দ বিন যায়েদ আশহালীকে পাঠানো হয় আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি মানাত-কে চূর্ণ করার জন্য। =( মূর্তি ভাঙ্গার জন্য আবু সুফিয়ান অথবা আলীকে পাঠানো হয়েছিল। নবীদের দাওয়াতী নীতি, রবী মাদখালী পৃঃ ১২২)। যা ছিল ক্বাদীদের (قديد) নিকটবর্তী মুশাল্লাল (مشلل) নামক স্থানে অবস্থিত এবং যা ছিল আউস, খাযরাজ, গাসসান ও অন্যান্য গোত্রের পূজিত দেবমূর্তি। সা‘দ মূর্তিটির দিকে অগ্রসর হ’তেই একটি নগ্ন, কৃষ্ণাঙ্গ ও বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট নারীকে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বেরিয়ে আসতে দেখেন। এই সময় সে কেবল হায় হায় (تدعو بالويل) করছিল। সা‘দ তাকে এক আঘাতে খতম করে দিলেন। অতঃপর মূর্তি ও ভান্ডার গৃহ ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিলেন।

(৪) বনু জাযীমাহ (بنو جذيمة) গোত্রে তাবলীগী কাফেলা প্রেরণ : ৮ম হিজরীর শাওয়াল মাসে খালেদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে মুহাজির, আনছার ও বনু সুলায়েম গোত্রের সমন্বয়ে ৩৫০ জনের একটি দলকে বনু জাযীমা গোত্রে পাঠানো হয় তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেবার জন্য, লড়াই করার জন্য নয়। কিন্তু যখন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হল, তখন তারা أسلمنا ‘আমরা ইসলাম কবুল করলাম’ না বলে صبأنا، صبأنا ‘আমরা ধর্মত্যাগী হয়েছি’ ‘আমরা ধর্মত্যাগী হয়েছি’ বলল। এতে খালেদ তাদেরকে হত্যা করতে থাকেন ও বন্দী করতে থাকেন এবং পরে প্রত্যেকের নিকটে ধৃত ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বনু সুলায়েম ব্যতীত মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণ কেউ এই নির্দেশ মান্য করেননি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) ও তাঁর সাথীগণ ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সব ঘটনা খুলে বললে তিনি খুবই মর্মাহত হন এবং আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দু’বার বলেন, اللَّهُمَّ إِنٍّيْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدٌ ‘হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে আমি তা থেকে তোমার নিকটে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি’।[40]

মক্কা বিজয়ের গুরুত্ব :

৬ষ্ঠ হিজরীতে হোদায়বিয়াহর সন্ধিকে আল্লাহ ‘ফাতহুম মুবীন’ বা স্পষ্ট বিজয় অভিহিত করে যে আয়াত নাযিল করেছিলেন (ফাৎহ ৪৮/), ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয় ছিল তার বাস্তব রূপ। প্রকৃত অর্থে মক্কা বিজয় ছিল কুফর ও ইসলামের মধ্যে ফায়ছালাকারী বিজয়, যা মুশরিক নেতাদের অহংকার চূর্ণ করে দেয় এবং মক্কা ও আরব উপদ্বীপ থেকে শিরক নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যা অদ্যাবধি সেখানে আর ফিরে আসেনি। ইনশাআল্লাহ ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর ফিরে আসবে না।
(২) মক্কা বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তিমত্তা এবং সেই সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। যা সকলকে মাথা নত করতে বাধ্য করে।
(৩) মক্কা বিজয়ের ফলে ইসলাম কবুলকারীর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যায়। ফলে মাত্র ১৯ দিন পরে হোনায়েন যুদ্ধে গমনের সময় মক্কা থেকেই নতুন দু’হাযার সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যুক্ত হয়। যাদের মধ্যে মক্কার বড় বড় নেতারা শামিল ছিলেন, যারা কিছুদিন আগেও ইসলামের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেছেন।
(৪) মক্কা বিজয়ের ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুসলমানদের হাতে এসে যায়, যা এতদিন কুরায়েশদের একচ্ছত্র অধিকারে ছিল।
(৫) মক্কা বিজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপে মদীনার ইসলামী খেলাফত অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ফলে বাইরের পরাশক্তি ক্বায়ছার ও কিসরা তথা রোমক ও পারসিক শক্তি ব্যতীত তৎকালীন বিশ্বে মদীনার তুলনীয় কোন শক্তি আর অবশিষ্ট রইল না। রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী উক্ত দুই পরাশক্তি খেলাফতে রাশেদাহর যুগে মুসলিম শক্তির  নিকটে পর্যুদস্ত হয় এবং মদীনার ইসলামী খেলাফত একমাত্র বিশ্বশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ফালিল্লাহিল হাম্দ

শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ

১। সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। কিন্তু অবশেষে মিথ্যা পরাজিত হয়।
২। সত্যসেবীগণের সাথে আল্লাহ থাকেন। যখন তিনি তাদের দুনিয়াবী বিজয় দান করতে ইচ্ছা করেন, তখন তার জন্য তিনি কারণ সৃষ্টি করে দেন। যেমন দশ বছরের সন্ধিচুক্তি দু’বছরের মধ্যে ভঙ্গ হয় মিথ্যার পূজারীদের হাতেই এবং তার ফলে সহজে মক্কা বিজয় ত্বরান্বিত হয়।
৩। ইসলাম তার অন্তর্নিহিত ঈমানী শক্তির জোরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, অস্ত্রশক্তির জোরে নয়। সেকারণ বাহ্যিকভাবে হীনতা স্বীকার করেও আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) হোদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি করেছিলেন। যাতে শান্তির পরিবেশে ইসলাম প্রচার করা সম্ভব হয়। দেখা গেল তাতে ইসলাম কবুলকারীর সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেল যে, হোদায়বিয়ার সাথীদের সংখ্যা যেখানে ১৪০০ ছিল, মাত্র দু’বছরের মাথায় মক্কা বিজয়ের সফরে সেখানে ১০,০০০ হ’ল।
৪। প্রতিশোধ গ্রহণের মাধ্যমে নয়, উদারতার মাধ্যমেই শত্রুকে স্থায়ীভাবে পরাভূত করা সম্ভব। মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কায়েম করেন। এজন্যেই বলা চলে যে, মক্কা বিজয় অস্ত্রের মাধ্যমে হয়নি। বরং উদারতার মাধ্যমে হয়েছিল।
৫। সামাজিক শান্তি ও শৃংখলার স্বার্থেই কেবল ইসলাম হত্যার বদলে হত্যা সমর্থন করে। নইলে ইসলামের মূলনীতি হ’ল সাধ্যপক্ষে রক্তপাত ও হত্যাকান্ডকে এড়িয়ে চলা। যেমন মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বনু খোযা‘আহকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, হত্যাকান্ডের মাধ্যমে কোন উপকার সাধিত হয় না। অনুরূপভাবে বানু জাযীমাহর প্রতি হত্যাকান্ডের নির্দেশ দেওয়ায় খালেদের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকটে অনুযোগ করে বলেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে, আমি তা থেকে তোমার নিকটে নিজকে মুক্ত ঘোষণা করছি।

পরবর্তী অংশ পড়ুন: হোনায়েন ও ত্বায়েফ যুদ্ধ


[1] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২০৯।

[2] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩৯৪-৯৫।

[3] যাদুল মা‘আদ ৩/৩৪৯।

[4] বায়হাক্বী, যাদুল মা‘আদ৩/৩৪৯।

[5] বায়হাক্বী, দালায়েলুন নবুঅত হা/১৭৫৭, ‘সনদ মুরসাল।

[6] ত্বাবারাণী কাবীর হা/১০৫২; ঐ, ছগীর হা/৯৬৮; সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩৯৭; যাদুল মা‘আদ ৩/৩৫১।

[7] ফিক্বহুস সীরাহ ১/৩৭৫, সনদ যঈফ।

[8] ওয়াক্বেদী, কিতাবুল মাগাযী, ‘মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ’ অনুচ্ছেদ, ২/৩২৩; আর-রাহীক্ব ৩৯৭ পৃঃ।

[9] বুখারী হা/৩৬৮৪ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ফযীলত’ অনুচ্ছেদ।

[10] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩৯৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪১।

[11] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪০০; আর-রাহীক্ব ৩৯৯ পৃঃ।

[12] হাকেম, ফিক্বহুস সীরাহ ১/৩৭৬, সনদ হাসান।

[13] যাদুল মা‘আদ ৩/৩৫২-৩৫৩।

[14] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪০৩; মুসলিম, মিশকাত হা/৬২১০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪১।

[15] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪০৪; ছহীহাহ হা/৩৩৪১।

[16] বুখারী হা/৪২৮০।

[17] ছহীহাহ হা/৩৩৪১।

[18] যাদুল মা‘আদ ৩/৩৫৬-৫৭।

[19] যাদুল মা‘আদ ৩/৩৫৭।

[20] বুখারী হা/৪২৮৮।

[21] রহমাতুল্লিল আলামীন ১/১১৯।

[22] ফাৎহুল বারী ৩/৫৪৪, ‘হজ্জ’ অধ্যায়-২৫, অনুচ্ছেদ-৫১।

[23] দ্রঃ ফাৎহুল বারী হা/১৫৯৮ ও ১৬০১ নং হাদীছ দ্বয়ের ব্যাখ্যা, ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ৫১ ও ৫৪ অনুচ্ছেদ।

[24] আবুদাঊদ হা/৪৫৪৭ সনদ হাসান।

[25] তিরমিযী হা/৩২৭০ সনদ ছহীহ; আবু দাউদ হা/৫১১৬; ঐ, মিশকাত হা/৪৮৯৯।

[26] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১২; ফিক্বহুস সীরাহ ১/৩৮২; যঈফাহ হা/১১৬৩, সনদ যঈফ।

[27] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১২; যঈফাহ হা/১১৬৩ যঈফ মুরসাল।

[28] যাদুল মা‘আদ ৩/৩৬০।

[29] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১৩।

[30] তাফসীর সূরা নছর ৮/৪৮২।

[31] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১০।

[32] এ সম্পর্কে বিস্তরিত আলোচনা নাসাঈ হা/৪০৬৭, সনদ ছহীহ; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/৩১৮০; মুওয়াত্ত্বা মুরসাল সনদে।

[33] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১৮; আর-রাহীক্ব ৪০৭; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/৩১৮০।

[34] আর-রাহীক্ব ৪০৭।

[35] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১৭; যাদুল মা‘আদ ৩/৩৬৩; দিফা‘ ‘আনিল হাদীছ, পৃঃ ১/৩৩, আলবানী, সনদ যঈফ।

[36] বুখারী ২৪৩৪, ৬৮৮০; মুসলিম হা/১৩৫৫; আবুদাঊদ হা/২০১৭; আহমাদ হা/৭২৪১; ইবনে হিশাম ২/৪১৫ প্রভৃতি।

[37] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১৬; ফিক্বহুস সীরাহ, ১/৩৯৯ সনদ ছহীহ।

[38] আর-রাহীক্ব ৪০৯ পৃঃ।

[39] আর-রাহীক্ব পৃঃ ৪০৯; যাদুল মা‘আদ ৩/৩৬৪।

[40] বুখারী হা/৪৩৩৯; ঐ, মিশকাত হা/৩৯৭৬ ‘জিহাদ’ অধ্যায়-১৯, ‘বন্দীদের হুকুম’ অনুচ্ছেদ-৫।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button