হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)

আক্বাবাহর বায়‘আত, ইসরা ও মিরাজ

পূর্বের অংশ পড়ুন: আয়েশা (রাঃ) -এর সাথে রাসূল (ছাঃ) -এর বিবাহ এং ছয় জন পবিত্রাত্মা যুবকের ইসলাম গ্রহণ

আক্বাবাহর ১ম বায়‘আত (দ্বাদশ নববী বর্ষ) :

গত বছরে হজ্জের মওসুমে ইসলাম কবুলকারী ছয়জন যুবকের ব্যাপক প্রচারের ফলে পরবর্তী বছর নতুন সাত জনকে নিয়ে মোট বারো জন ব্যক্তি হজ্জে আসেন। দ্বাদশ নববী বর্ষের যিলহজ্জ মাসের (মোতাবেক জুলাই ৬২১ খৃঃ) এক গভীররাতে মিনার পূর্ব নির্ধারিত আক্বাবাহ নামক স্থানে তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এই স্থানটিকে এখন জামরায়ে আক্বাবাহ বা বড় জামরাহ বলা হয়। মিনার পশ্চিম দিকের এই সংকীর্ণ পাহাড়ী পথ দিয়ে মক্কা থেকে মিনায় যাতায়াত করতে হ’ত। এই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ পথকেই ‘আক্বাবাহ’ বলা হয়। এখানেই আইয়ামে তাশরীক্বের এক গভীর রাতে আলো-অাঁধারীর মধ্যে আক্বাবাহর ১ম বায়‘আত অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল পরবর্তী পর্যায়ে মাদানী জীবনে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের বীজ বপন সমতুল্য।

এই বায়‘আতে জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) ব্যতীত গত বছরের বাকী পাঁচজন ছাড়াও এ বছরের নতুন সাতজন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হ’লেন- (১) মু‘আয ইবনুল হারেছ (معاذ بن الحارث بن عفراء) (২) যাকওয়ান ইবনু আবদিল ক্বায়েস (ذكوان بن عبد القيس) (৩) ওবাদাহ বিন ছামেত (عبادت بن الصامت) (৪) ইয়াযীদ বিন ছা‘লাবাহ (يزيد بن ثعلبة) (৫) আববাস বিন ওবাদাহ বিন নাযলাহ (عباس بن عبادة بن نضلة) (৬) আবুল হায়ছাম বিন তায়হান (أبو الهيثم بن تيهان)   (৭) ‘ওয়ায়েম বিন সা‘এদাহ (عويم بن ساعدة)। শেষোক্ত দু’জন ছিলেন আওস গোত্রের এবং বাকীগণ ছিলেন খাযরাজ গোত্রের। তন্মধ্যে ১ম ব্যক্তি ছিলেন  রাসূলের  দাদার  মাতুল  গোষ্ঠী  বনু  নাজ্জারের অন্তর্ভুক্ত।[1]

বায়‘আত অনুষ্ঠান:

‘আক্বাবায়ে ঊলা :

বায়‘আতে অংশগ্রহণকারী ছাহাবী উবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে,

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : تعالوا بايعونى على أن لاتشركوا بالله شيئا ولاتسرقوا ولا تزنوا ولا تقتلوا أولادكم ولاتأتوا ببهتان تفترونه بين أيديكم وأرجلكم ولا تعصونى فى معروف، فمن وفى منكم فأجره على الله ومن أصاب من ذلك شيئا فعوقب به فى الدنيا فهو له كفارة ومن أصاب من ذلك شيئا فستره الله فأمره إلى الله، إن شاء عاقبه وإن شاء عفا عنه فبايعناه، متفق عليه-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের বললেন যে, তোমরা এসো আমার নিকটে বায়‘আত কর এই মর্মে যে, (১) তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না (২) চুরি করবে না (৩) যেনা করবে না (৪) নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না (৫) কাউকে মনগড়া অপবাদ দিবে না (৬) সঙ্গত বিষয়ে আমার অবাধ্যতা করবে না। তোমাদের মধ্যে যারা এগুলি পূর্ণ করবে, আল্লাহর নিকটে তার জন্য পুরস্কার রয়েছে। আর যদি কেউ এগুলির কোনটি করে বসে এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি হয়ে যায়, তাহ’লে সেটি তার জন্য কাফফারা হবে। পক্ষান্তরে যদি কেউ এগুলির কোনটি করে, অতঃপর আল্লাহ তা ঢেকে রাখেন, তবে তার ব্যাপারটি আল্লাহর উপরেই ন্যস্ত থাকবে। চাইলে তিনি বদলা নিবেন, চাইলে তিনি ক্ষমা করবেন।’ রাবী ওবাদাহ বিন ছামেত বলেন, অতঃপর আমরা উক্ত কথাগুলির উপরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট বায়‘আত করলাম’।[2]

গুরুত্ব : বায়‘আতে বর্ণিত ছয়টি বিষয়ের প্রতিটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলি শুধু সেযুগেই নয়, বরং সর্বযুগেই গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত বিষয়গুলি সমাজে ব্যপ্তি লাভ করলে সমাজে শান্তি ও শৃংখলা বিনষ্ট হয়। জাহেলী আরবে এগুলি বিনষ্ট হয়েছিল বলেই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এগুলি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। আজকালকের কথিত সভ্য দুনিয়ায় এগুলি প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে যা ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে বিশ্বব্যাপী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। অতএব দুনিয়াপূজারী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গতি আখেরাতমুখী করার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ ও রাষ্ট্র নেতাগণ আল্লাহর নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজে ও রাষ্ট্রে কাংখিত শান্তি ও স্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

ইয়াছরিবে মুবাল্লিগ প্রেরণ :

বায়‘আতকারী নওমুসলিমদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) একজন উদ্যমী ও ধীশক্তিসম্পন্ন যুবককে পাঠালেন শিক্ষক ও প্রচারক হিসাবে। যার নাম ছিল মুছ‘আব বিন ওমায়ের (রাঃ)।

মুছ‘আব বিন ওমায়ের (রাঃ)-এর দাওয়াত :

মুছ‘আব ছিলেন মক্কার একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির আদরের দুলাল। তিনি যখন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বের হতেন, তখন আগে-পিছে গোলামের দল থাকত। দু’শো দিরহামের কম মূল্যের কোন পোষাক তিনি পরতেন না। তিনি ইসলাম গ্রহণ করায় তার মা তার খানাপিনা বন্ধ করে দেন এবং তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। ফলে খাদ্যাভাবে তিনি এমন শুকিয়ে যান যে, অস্থি-কংকালসার হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি ওহোদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণধী এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত যুবক। বিষয়বস্ত্ত উপস্থাপন ও অন্যকে আকৃষ্ট করার অনন্য গুণাবলী তার মধ্যে ছিল। ১ম আক্বাবাহর বায়‘আত সম্পাদিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুছ‘আবকে তাদের সাথে ইয়াছরিবে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে তরুণ দলনেতা আবু উমামাহ আস‘আদ বিন যুরারাহ (রাঃ)-এর বাড়ীতে অবস্থান করেন এবং উভয়ে মিলে ইয়াছরিবের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন। তাঁকে মুক্বরি (المقرئ) অর্থাৎ পাঠদানকারী বা শিক্ষক বলে সবাই ডাকত। তাঁর দাওয়াতের ফল এই হয়েছিল যে, পরবর্তী হজ্জ মৌসুম আসার সময়কালের মধ্যেই ইয়াছরিবের আনছারদের এমন কোন বাড়ী ছিল না যার পুরুষ ও মহিলাদের কিছু সংখ্যক মুসলমান হননি। তাঁর প্রচারকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:-

একদিন আস‘আদ বিন যুরারাহ তাঁকে সাথে নিয়ে বনু আব্দুল আশহাল ও বনু যাফরের (بنو ظفر) মহল্লায় গমন করেন ও সেখানে একটি কূয়ার পাশে কয়েকজন মুসলমানকে নিয়ে বসলেন। তখনো পর্যন্ত বনু আব্দুল আশহাল গোত্রের দুই নেতা সা‘দ বিন মু‘আয ও উসায়েদ বিন হুযায়ের ইসলাম কবুল করেননি। মুবাল্লিগদের আগমনের খবর জানতে পেয়ে সা‘দ উসায়েদকে বললেন, আপনি যেয়ে ওদের নিষেধ করুন যেন আমাদের সরল- সিধা মানুষগুলিকে বোকা না বানায়। আস‘আদ আমার খালাতো ভাই না হ’লে আমি নিজেই যেতাম’।

উসায়েদ বর্শা উঁচিয়ে সদর্পে সেখানে গিয়ে বললেন, যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, তবে এক্ষুণি পালাও। তোমরা আমাদের বোকাগুলোকে মুসলমান বানাচ্ছো’। মুছ‘আব শান্তভাবে বললেন, আপনি কিছুক্ষণের জন্য বসুন ও কথা শুনুন। যদি পসন্দ না হয়, তখন দেখা যাবে’। উসায়েদ তখন মাটিতে বর্শা গেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন। অতঃপর মুছ‘আব তাকে কুরআন থেকে কিছুটা পাঠ করে শুনালেন। তারপর তিনি আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ব ও তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। ইতিমথ্যে উসায়েদ চমকিত হয়ে বলে উঠলেন, ما أحسن هذا وأجمله ‘কতই না সুন্দর কথা এগুলি ও কতই না মনোহর।’ এরপর তিনি সেখানেই ইসলাম কবুল করলেন।

অতঃপর তিনি সা‘দ বিন মু‘আয-এর নিকটে এসে বললেন, والله ما رأيت بهما بأساً ‘আল্লাহর কসম! আমি তাদের মধ্যে অন্যায় কিছু দেখিনি’। তবে আমি তাদের নিষেধ করে দিয়েছি এবং তারাও বলেছে, আপনারা যা চান তাই করা হবে’। এ সময় উসায়েদ চাচ্ছিলেন যে, সা‘দ সেখানে যাক। তাই তাকে রাগানোর জন্যে বললেন, আমি জানতে পারলাম যে, বনু হারেছাহর লোকজন আস‘আদ বিন যুরারাহকে হত্যা করার জন্য বের হয়েছে এজন্য যে, সে আপনার খালাতো ভাই। সা‘দ ক্রুদ্ধ হয়ে তখনই বর্শা হাতে ছুটে গেলেন। যেয়ে দেখেন যে, আস‘আদ ও মুছ‘আব নিশ্চিন্তে বসে আছে। বনু হারেছাহর হামলাকারীদের কোন খবর নেই। তখন তিনি বুঝলেন যে, উসায়েদ তার সঙ্গে চালাকি করেছে তাকে এদের কাছে পাঠানোর জন্য। তখন সা‘দ ক্রুদ্ধ স্বরে উভয়কে ধমকাতে থাকলেন এবং আস‘আদকে বললেন, তুমি আমার আত্মীয় না হ’লে তোমাদের কোনই ক্ষমতা ছিল না আমার মহল্লায় এসে লোকদের বাজে কথা শুনাবার’। আস‘আদ পূর্বেই সা‘দ ও উসায়েদ-এর বিষয়ে মুছ‘আবকে অবহিত করেছিলেন যে, এরা দু’জন মুসলমান হ’লে এদের গোত্রের সবাই মুসলমান হয়ে যাবে। আস‘আদের ইঙ্গিতে মুছ‘আব অত্যন্ত ধীর ও নম্র ভাষায় সা‘দকে বললেন, আপনি বসুন এবং আমাদের কথা শুনুন! অতঃপর পসন্দ হলে কবুল করবেন, নইলে প্রত্যাখ্যান করবেন’।

অতঃপর তিনি বসলেন এবং মুছ‘আব তাকে কুরআন থেকে শুনালেন ও তাওহীদের মর্ম বুঝালেন। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সা‘দ বিন মু‘আয ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হ’লেন। অতঃপর সেখানেই দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করে নিজ গোত্রে এলেন ও সবাইকে ডেকে বললেন, হে বনু আব্দুল আশহাল! كيف تعلمون أمرى فيكم তোমরা আমাকে তোমাদের মধ্যে কেমন মনে কর? তারা বলল, أنة سيدنا وأفضلنا رأيا وأيمننا نقيبة ‘আপনি আমাদের নেতা, সর্বোত্তম সিদ্ধান্তের অধিকারী ও নিশ্চিন্ততম কান্ডারী’। তখন তিনি বললেন, إن كلام رجالكم ونسائكم عليّ حرام حتي تؤمنوا بالله وبرسوله তোমাদের নারী ও পুরুষ সকলের সঙ্গে আমার কথা বলা হারাম, যে পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপরে ঈমান আনবে’। এ কথার প্রতিক্রিয়া এমন হ’ল যে, সন্ধ্যার মধ্যে সবাই ইসলাম কবুল করল। মাত্র একজন ব্যতীত। যার নাম ছিল উছাইরাম (الأصيرم)। ইনি পরে ওহোদ যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন ও শাহাদত বরণ করেন। কলেমায়ে শাহাদত পাঠ করা ব্যতীত আল্লাহর জন্য একটা সিজদা করারও সুযোগ তিনি পাননি। রাসূল (ছাঃ) তার সম্পর্কে বলেন, عمل فليلا وأجر كثيرا ‘অল্প আমল করল ও পুরস্কার অধিক পেল’।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ) -এর হাবশায় হিজরত এবং আবু তালিবের নিকটে কুরায়েশ নেতাদের আগমন

ইসরা ও মি‘রাজ (১৩ নববী বর্ষ) :

মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তীনের বায়তুল মুক্বাদ্দাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বুরাক্বের সাহায্যে স্বল্পকালীন নৈশ ভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয় এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদ থেকে ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়ির মাধ্যমে  মহাকাশের সীমানা পেরিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে মে‘রাজ বলা হয়। নববী জীবনে এটি একটি অলৌকিক ও শিক্ষাপ্রদ ঘটনা। যার মাধ্যমে শেষনবীকে পরকালীন জীবনের সবকিছু চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করানো হয়। এর ফলে তাঁর মধ্যে যেমন বিশ্বাস ও প্রতীতি দৃঢ়তর হয় এবং হৃদয়ে প্রশান্তি জন্মে, তেমনি মুমিন হৃদয়ে পরকালীন মুক্তির জন্য উদগ্র বাসনা জাগ্রত হয়। ভবিষ্যত মাদানী জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতসংকুল জিহাদী যিন্দেগীতে যে দৃঢ় বিশ্বাস-এর প্রয়োজন হবে অত্যন্ত বেশী। সেকারণ অদূর ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য হিজরতের পূর্বেই আল্লাহ তাঁর নবীকে মে‘রাজের মাধ্যমে মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করে নেন। যাতে তা মাদানী জীবনে ইসলামী বিজয়ে সহায়ক হয়। পবিত্র কুরআনে সূরা বনু ইসরাঈলের ১ম আয়াতে ‘ইসরা’ এবং সূরা নজমের ১৩ থেকে ১৮ আয়াতে মি‘রাজ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। বাকী বিশদ ঘটনাবলী ছহীহ হাদীছ সমূহে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, سُبْحَانَ الَّذِيْ أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِيْ بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيْعُ البَصِيْرُ- ‘পরম পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রির একাংশে ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মসজিদুল হারাম থেকে (ফিলিস্তীনের) মসজিদুল আক্বছা পর্যন্ত। যার চতুস্পার্শ্বকে আমরা বরকতময় করেছি, যাতে আমরা তাকে আমাদের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা’ (ইসরা ১৭/১)

উক্ত আয়াতে চারটি বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে।

এক- ইসরা ও মিরা‘জের পুরা ঘটনাটি রাতের শেষাংশে স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হয়েছিল, যা ليلاً শব্দের মধ্যে বলা হয়েছে।

দুই-  ঘটনাটি সশরীরে ঘটেছিল, যা بعبده শব্দের মাধ্যমে বলা হয়েছে। কেননা রূহ ও দেহের সমন্বিত সত্তাকে ‘আব্দ’ বা দাস বলা হয়। স্বপ্নযোগে বা রূহানী ব্যাপার হ’লে কেউ একে অবিশ্বাস করত না এবং কুরআনে তাঁকে ‘আব্দ’ না বলে হয়ত ‘রূহ’ (بروح عبده) বলা হ’ত। এখানে عبده ‘তাঁর দাস’ বলে রাসূলকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কেননা আল্লাহর দাস হওয়ার মধ্যেই মানুষের সর্বোচ্চ সম্মান নিহিত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, মক্কা থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাস পর্যন্ত ঘোড়া বা উটে যাতায়াতে দু’মাসের পথ এক রাতেই ভ্রমণ করে মি‘রাজ থেকে ফিরে এসে সকাল বেলা যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) লোকদের কাছে ঘটনা বর্ণনা করলেন, তখন সবাই একে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিল এবং তাঁকে নানাবিধ ভাষায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে থাকল। অবশেষে যারা ইতিপূর্বে বায়তুল মুক্বাদ্দাস ভ্রমণ করেছেন এমন কিছু অভিজ্ঞ লোক তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষা করল। সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে তারা চুপ হ’ল বটে। কিন্তু তাদের হঠকারী অন্তর প্রশান্ত হয়নি। পক্ষান্তরে হযরত আবুবকর (রাঃ) একথা শোনামাত্র বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং বলেন, আমরা তো তাঁর কাছ থেকে দৈনিক আসমানের খবর শুনি। এক্ষণে যদি তিনি আসমান ভ্রমণের খবর দেন, সেটাও আমি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি। অতঃপর তিনি জোরগলায় মে‘রাজের সত্যতার ঘোষণা দিতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুশী হয়ে তাকে ‘ছিদ্দীক্ব’ (صديق) বা সর্বাধিক সত্যবাদী উপাধি দেন। এটি অত্যন্ত বড় বিষ্ময়কর ঘটনা ছিল। সেকারণ শুরুতে سبحان বিষ্ময়সূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাপ্নিক ব্যাপার হ’লে এটা মোটেই বিষ্ময়কর হ’ত না এবং একদল দুর্বল ঈমানদার ইসলাম ত্যাগ করে চলে যেত না। এজন্যই আল্লাহ এটাকে ফিৎনা (فةنة للناس) অর্থাৎ মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ’ বলেছেন (ইসরা ১৭/৬০)। অর্থাৎ উক্ত ঘটনায় নও মুসলিমদের মুরতাদ হয়ে যাবার ফিৎনা। যেমন অনেকে হয়েছিল।

তিন- বায়তুল মুক্বাদ্দাস-এর আশপাশ ভূমি অর্থাৎ ফিলিস্তীন সহ পুরা সিরিয়া অঞ্চল বরকতময় এলাকা, যা باركنا حوله বাক্যাংশের মাধ্যমে বলা হয়েছে। আধ্যাত্মিক বরকত হ’ল এই যে, হযরত ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকূব, মূসা, দাঊদ, সুলায়মান, ইলিয়াস, যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা (আঃ) সহ বনু ইস্রাঈলের হাযার হাযার নবীর আবাস ভূমি হ’ল এই এলাকা। দুনিয়াবী বরকত এই যে, শাম এলাকার মাটি মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে উর্বর ও সুজলা-সুফলা। এতদ্ব্যতীত এ অঞ্চলের অন্যান্য বরকত সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।

চার- আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে পরজগতের অলৌকিক নিদর্শন সমূহের কিছু অংশ স্বচক্ষে দেখিয়ে দেন। যা لنريه من آياتنا বাক্যাংশের মাধ্যমে বলা হয়েছে। উক্ত নিদর্শন সমূহের মধ্যে ছিল মক্কা থেকে বুরাকে সওয়ার হওয়ার পূর্বে সীনা চাক করা এবং তা যমযম পানি দিয়ে ধৌতকরণ, অতঃপর বায়তুল মুক্বাদ্দাস থেকে ঊর্ধারোহণের পূর্বে তাঁকে দুধ ও মদ পরিবেশন। কিন্তু রাসূলের দুধ গ্রহণ, অতঃপর জিব্রীলের সাথে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ, বিগত নবীদের সাথে মুলাক্বাত, জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন, সিদরাতুল মুনতাহায় একাকী আল্লাহর নিকটতম সান্নিধ্যে উপনীত হওয়া এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথন। অতঃপর উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের উপঢৌকন নিয়ে পৃথিবীতে প্রত্যাগমন এবং বিদায় কালে বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদে ফজরের ছালাতে নবীগণের ইমামতি করণ ও তাদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে পুনরায় বোরাক অশ্বে সওয়ার হয়ে রাত্রি কিছুটা বাকী থাকতেই মক্কায় প্রত্যাবর্তন। পুরা ঘটনাটিই মানবীয় জ্ঞানের বহির্ভূত অথচ বাস্তব সত্য। যা মক্কার মুশরিক ও শত্রু নেতাদের দ্বারা সত্যায়িত।

উল্লেখ্য যে, অন্যান্য নবীদেরকেও আল্লাহ তাঁর কিছু কিছু নিদর্শন দেখিয়েছেন। তবে সেগুলি সব দুনিয়াতেই দেখানো হয়েছিল। যেমন ইবরাহীম (আঃ) চারটি পাখি যবহ ও টুকরা টুকরা করে মিশ্রিত অংশগুলি চারটি পাহাড়ে রেখে এসে বিসমিল্লাহ বলে ডাক দিতেই তাদের স্ব স্ব দেহে জীবিত হয়ে তাঁর কাছে চলে আসা, অগ্নিকুন্ড শান্তিময় স্থানে পরিণত হওয়া, স্ত্রী সারাহ-এর উপরে যালেম বাদশাহর হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি অলৌকিক ঘটনাবলী। অন্য দিকে মূসা (আঃ)-এর আল্লাহর সাথে তুবা উপত্যকায় কথোপকথন ও তূর পাহাড়ে তাঁর তাজাল্লী প্রদর্শন, অলৌকিক লাঠির মাধ্যমে নদী বিভক্ত হওয়া ও ফেরাঊন বাহিনী ডুবে মরা, নিজ গোত্রের ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির এলাহী গযবে মৃত্যুবরণ ও পরক্ষণেই মূসার দো‘আর বরকতে পুনরায় জীবিত হওয়া ইত্যাদি ঘটনাবলী। ইবরাহীম (আঃ)-কে দেখানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَكَذَلِكَ نُرِيْ إِبْرَاهِيْمَ مَلَكُوْتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُوْنَ مِنَ الْمُوْقِنِيْنَ- ‘আর এভাবেই আমি ইবরাহীমকে আসমান ও যমীনের রাজত্ব প্রদর্শন করেছি। যাতে সে দৃঢ়বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’ (আন‘আম ৬/৭৫)। অনুরূপ মূসা (আঃ)-কে দেখানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, لِنُرِيَكَ مِنْ آيَاتِنَا الْكُبْرَى- ‘যাতে আমরা তোমাকে আমাদের বড় বড় কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি’ (ত্বোয়াহা ২০/২৩)। সব শেষে শেষনবীকে সপ্তাকাশের উপরে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে আল্লাহ তাকে পরজগতের সবকিছু প্রত্যক্ষ করালেন এবং বললেন, لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ‘এটা এজন্য যে, আমরা তাকে আমাদের কিছু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করাব’ (ইসরা ১৭/১)। এর মাধ্যমে শেষনবীর মধ্যে ‘আয়নুল ইয়াক্বীন’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষ দর্শন লব্ধ দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। যা অন্য কোন নবীকে আল্লাহ দেখাননি। নিঃসন্দেহে এটি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম দলীল। ফালিল্লাহিল হাম্দ।

মে‘রাজের তারিখ :  এ সম্পর্কে বিদ্বানগণের মধ্যে ছয় প্রকার মতভেদ পরিদৃষ্ট হয়। যথা- (১) ১ম নববী বর্ষেই মে‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল (২) ৫ম নববী বর্ষে হয়েছিল (৩) ১০ম নববী বর্ষের ২৭শে রজব তারিখে হয়েছিল (৪) দ্বাদশ বর্ষের রামাযান মাসে (৫) ত্রয়োদশ বর্ষের মুহাররম মাসে (৬) ত্রয়োদশ বর্ষের রবীউল আউয়াল মাসে।

উপরোক্ত ছয়টি মতামতের মধ্যে প্রথম তিনটি গ্রহণযোগ্য নয় একারণে যে, এ ব্যাপারে সকল বিদ্বান একমত যে, উম্মুল মুমেনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এটাও সর্বজন স্বীকৃত যে, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল দশম নববী বর্ষের রামাযান মাসে। অতএব মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পরে একথা একপ্রকার নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। এক্ষণে শেষের তিনটি মতামতের মধ্যে কোনটিতেই নিশ্চিত হবার উপায় নেই। তবে সূরা ইসরার শুরুতে মে‘রাজ সম্পর্কিত বর্ণনার পরপরই বনু ইস্রাঈলের অধঃপতন সম্পর্কিত বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, ঈমানী বিশ্বে বনু ইস্রাঈলের দীর্ঘ নেতৃত্বের অবসান এবং মুহাম্মাদী নেতৃত্বের উত্থান অর্থাৎ হিজরতের প্রাক্কালে মাক্কী জীবনের শেষপ্রান্তে মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল।

মে‘রাজের সঠিক তারিখ উম্মতের নিকটে অস্পষ্ট রাখার তাৎপর্য সম্ভবতঃ এই যে, তারা যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত উম্মতগুলির ন্যায় অনুষ্ঠানসর্বস্ব না হয়ে পড়ে। বরং মে‘রাজের তাৎপর্য অনুধাবন করে আখেরাতে জবাবদিহিতার ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে এবং মে‘রাজের অমূল্য তোহ্ফা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের  মাধ্যমে গভীর অধ্যাত্ম চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে দুনিয়াবী জীবন পরিচালনা করে।

আল্লাহ ইচ্ছা করলে মক্কা থেকেই সরাসরি মে‘রাজ করাতে পারতেন। কিন্তু মক্কা থেকে বায়তুল আক্বছায় নিয়ে এসে সেখান থেকে মে‘রাজ করানোর মধ্যে এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইবরাহীমী দাওয়াতের দু’টি কেন্দ্র কা‘বা ও বায়তুল মুক্বাদ্দাস দুই স্থানের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব এখন থেকে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর উম্মতের উপরেই ন্যস্ত করা হবে। যা ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে ১৫ হিজরী সনে সম্পন্ন হয় এবং যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। যদিও পাশ্চাত্য বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহারের জন্য বাহির থেকে ইহুদীদের এনে ফিলিস্তীনের একাংশ থেকে সেখানকার স্থায়ী অধিবাসী মুসলমানদের বের করে দিয়ে সেখানে তাদেরকে যবরদস্তি বসিয়ে দিয়ে তাকে ‘ইস্রাঈল রাষ্ট্র’ নাম দিয়েছে ১৯৪৮ সালে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অস্থায়ী বিষয়। যার সত্বর অবসান হবে ইনশাআল্লাহ।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ) -এর উপর বিভিন্নমুখী অত্যাচার

অতএব ইসলামী দাওয়াতের প্রথম পর্যায় মাক্কী জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ইয়াছরিবে হিজরতের সূচনা পর্ব হিসাবে দ্বাদশ নববী বর্ষের যিলহাজ্জ মাসে অনুষ্ঠিত আক্বাবাহর প্রথম বায়‘আতের পরের বছর ত্রয়োদশ নববী বর্ষের যিলহাজ্জ মাসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বায়‘আত অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তী কোন এক রজনীতে মে‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তবে আল্লাহ সর্বাধিক অবগত। উল্লেখ্য যে, ২য় বায়‘আতের অর্থাৎ বায়‘আতে কুবরার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় চতুর্দশ নববী বর্ষের ২৭শে ছফর থেকে রাসূলের হিজরত শুরু হয়। অতএব মে‘রাজ ছিল ইসলামী বিজয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত এবং মাদানী জীবনের সূচক ঘটনা।

বায়‘আতে কুবরা (ত্রয়োদশ নববী বর্ষ) :

দ্বাদশ নববী বর্ষের যিলহাজ্জ মাসে অনুষ্ঠিত আক্বাবাহর ১ম বায়‘আতে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের সাথে রাসূলের প্রেরিত দাঈ মুছ‘আব বিন উমায়ের (রাঃ)-এর দিন-রাত প্রচারের ফলে পরের বছর ত্রয়োদশ নববী বর্ষের যিলহাজ্জ মাসে (জুন ৬২২ খৃঃ) অনুষ্ঠিত আক্বাবাহর ২য় বায়‘আতে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা সহ মোট ৭৫ জন ইয়াছরিববাসী ইসলামের উপর বায়‘আত করেন। এটিই ইতিহাসে বায়‘আতে কুবরা বা বড় বায়‘আত নামে খ্যাত। যা ছিল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মাদানী যিন্দেগীর ভিত্তি স্বরূপ এবং আগামীতে ঘটিতব্য ইসলামী সমাজ বিপ্লবের সূচনাকারী। এই সময় মুছ‘আব বিন ওমায়ের (রাঃ) মক্কায় ফিরে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে ইয়াছরিবে দাওয়াতের অবস্থা এবং গোত্র সমূহের ইসলাম কবুলের সুসংবাদ প্রদান করেন। যা রাসূলকে হিজরতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।

মূলতঃ আক্বাবাহর বায়‘আত তিন বছরে তিনবার অনুষ্ঠিত হয়। একাদশ নববী বর্ষে আস‘আদ বিন যুরারাহর নেতৃত্বে ৬ জন ইয়াছরিববাসীর ১ম বায়‘আত। দ্বাদশ বর্ষে ১২ জনের দ্বিতীয় বায়‘আত এবং ত্রয়োদশ নববী বর্ষে ৭৩+২=৭৫ জনের তৃতীয় ও সর্ববৃহৎ বায়‘আত- যার মাত্র ৭৫ দিনের মাথায় মক্কা হ’তে ইয়াছরিবের উদ্দেশ্যে রাসূলের হিজরতের সূত্রপাত হয়।

ঘটনা : ১২ই যিলহজ্জ দিবাগত রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হ’লে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় পূর্বোক্ত ৭৫ জন ইয়াছরেবী হাজী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাক্ষাতের জন্য বের হন এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্বাবাহর সুড়ঙ্গ পথে অতি সঙ্গোপনে হাযির হন। অল্পক্ষণের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় চাচা আববাসকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হন, যিনি তখনও প্রকাশ্যে মুসলমান হননি।

কুশলাদি বিনিময়ের পর প্রথমে আববাস কথা শুরু করেন। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ আমাদের মাঝে কিভাবে আছেন তোমরা জানো। তাকে আমরা আমাদের কওমের শত্রুতা থেকে হেফাযতে রেখেছি এবং তিনি ইযযতের সাথে তার শহরে বসবাস করছেন। এক্ষণে তিনি তোমাদের ওখানে হিজরত করতে ইচ্ছুক। এ অবস্থায় তোমরা তার পূর্ণ যিম্মাদারীর অঙ্গীকার করলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু যদি এমনটি হয় যে, তোমরা তাকে নিয়ে গেলে, অতঃপর বিপদ মুহূর্তে তাকে পরিত্যাগ করলে, তাহ’লে তোমরা তাকে নিয়ে যেয়ো না। তিনি আমাদের মধ্যে সসম্মানেই আছেন’।

আববাসের বক্তব্যের পর প্রতিনিধি দলের মধ্য থেকে কা‘ব বললেন, হে রাসূল (ছাঃ)! আমরা আববাসের কথা শুনেছি। এক্ষণে تكلم يا رسول الله وخذ لنفسك ولربك ما أحببت- আপনি কথা বলুন এবং আপনার নিজের জন্য ও নিজ প্রভুর জন্য যে চুক্তি আপনি ইচ্ছা করেন, তা করে নিন’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রথমে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করেন। অতঃপর তাদেরকে ইসলাম কবুলের আহবান জানান। অতঃপর তিনি বললেন, أبايعكم علي أن تمنعوني مما تمنعون من نسائكم وأبنائكم- ‘আমি তোমাদের বায়‘আত নেব এ বিষয়ের উপরে যে, তোমরা আমাকে হেফাযত করবে ঐসব বিষয় থেকে, যেসব বিষয় থেকে তোমরা তোমাদের মহিলা ও সন্তানদেরকে হেফাযত করে থাক’। সাথে সাথে বারা বিন মা‘রূর রাসূলের হাত ধরে বললেন, نعم والذي بعثك بالحق لنمنعنك مما نمنع أُزُرَنا منه- ‘হাঁ! ঐ সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, অবশ্যই আমরা আপনাকে হেফাযত করব ঐসব বিষয় থেকে, যা থেকে আমরা আমাদের মা-বোনদের হেফাযত করে থাকি’।[3] এ সময় আবুল হায়ছাম বিন তায়হাম বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সঙ্গে ইহুদীদের সন্ধিচুক্তি রয়েছে। আমরা তা ছিন্ন করছি। কিন্তু এমন তো হবে না যে, আমরা এরূপ করে ফেলি। তারপর আল্লাহ যখন আপনাকে জয়যুক্ত করবেন তখন আপনি আবার আপনার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসবেন ও আমাদের পরিত্যাগ করবেন।

জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুচকি হেসে বললেন, بل الدم بالدم والهدم بالهدم أنا منكم وأنتم منى، أحارب من حاربتم وأسالم من سالمتم- ‘না! বরং তোমাদের রক্ত আমার রক্ত, তোমাদের ধ্বংস আমার ধ্বংস। আমি তোমাদের এবং তোমরা আমাদের। তোমরা যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, আমিও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। তোমরা যাদের সঙ্গে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সঙ্গে সন্ধি করব’। এরপর লোকজন যখন বায়‘আত গ্রহণের জন্য এগিয়ে এলো, তখন আববাস বিন ওবাদাহ বিন নাযলাহ সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, هل تدرون علام تبايعون তোমরা কি জানো কোন কথার উপরে তোমরা এই মানুষটির নিকটে বায়‘আত করছ? সবাই বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তোমরা লাল ও কালো (আযাদ ও গোলাম) মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে তার নিকটে বায়‘আত করতে যাচ্ছ। যদি তোমাদের এরূপ ধারণা থাকে যে, যখন তোমাদের সকল সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং তোমাদের সম্ভ্রান্ত লোকদের হত্যা করা হবে, তখন তোমরা তার সঙ্গ ছেড়ে যাবে, তাহ’লে এখনই ছেড়ে যাও। কেননা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পরে যদি তোমরা তাকে পরিত্যাগ কর, তাহ’লে ইহকাল ও পরকালে চরম লজ্জার বিষয় হবে। আর যদি তোমাদের ইচ্ছা থাকে যে, তোমাদের মাল-সম্পদ ধ্বংসের ও সম্ভ্রান্ত লোকদের হত্যা সত্ত্বেও এ চুক্তি অক্ষুণ্ণ রাখবে, যার প্রতি তোমরা তাঁকে আহবান করছ, তাহ’লে অবশ্যই তা সম্পাদন করবে। কেননা আল্লাহর কসম! এতেই তোমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের জন্য মঙ্গল নিহিত রয়েছে।’

আববাস বিন ওবাদাহর এই ওজস্বিনী ভাষণ শোনার পর সকলে সমবেত কণ্ঠে বলে উঠল, إنا نأخذه علي مصيبة الأموال وفةل الأشراف، فما لنا بذلك يا رسول الله؟ قال: الجنة- قالوا: أبسط يدك- ‘আমরা তাকে গ্রহণ করছি আমাদের মাল-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের হত্যার বিনিময়ে। কিন্তু এর বদলায় আমাদের কি রয়েছে হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, জান্নাত। তারা বলল, হাত বাড়িয়ে দিন হে রাসূল! رَبِحَ الْبَيْعُ لانُقِيلُ ولانَسْتقيلُ- ‘ব্যবসা লাভজনক হয়েছে। আমরা কখনো তা রহিত করব না বা রহিত করার আবেদন করব না’।[4] মুসনাদে আহমাদে জাবের (রাঃ) বর্ণিত অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে যে, লোকেরা বলে উঠল فوالله لانذر هذه البيعة ولانستقيلها- ‘আল্লাহর কসম! আমরা এই বায়‘আত পরিত্যাগ করব না বা রহিত করব না’।[5]

এ সময় দলনেতা এবং কাফেলার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আস‘আদ বিন যুরারাহ পূর্বের বক্তার ন্যায় কথা বললেন এবং পূর্বের ন্যায় সকলে পুনরায় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করলেন, অতঃপর তিনিই প্রথম বায়‘আত করলেন। এরপর একের পর এক সকলে রাসূলের হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ বায়‘আত অনুষ্ঠিত হয়। মহিলা দু’জনের বায়‘আত হয় মৌখিক অঙ্গীকার গ্রহণের মাধ্যমে। সৌভাগ্যবতী এই মহিলা দু’জন হ’লেন উম্মে ‘উমারাহ নুসাইবা বিনতে কা‘ব (أم عمارة نسيبة بنت كعب) এবং উম্মে মানী‘ আসমা বিনতে আমর (أم منيع أسماء بنت عمرو) । প্রথম জন ছিলেন বনু মাঝেন গোত্রের এবং দ্বিতীয়জন ছিলেন বনু সালামা গোত্রের।[6]

বায়‘আতনামা :

ইমাম আহমাদ কর্তৃক হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে,

عن جابر قال: قلنا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم على ما نبايعك؟ قال: (১) على السمع والطاعة فى النشاط والكسل (২) وعلى النفقة فى العسر واليسر (৩) وعلى الامر بالمعروف والنهى عن المنكر (৪) وعلى ان تقولوا فى الله، لاتخافون فى الله لومة لائم (৫) وعلى أن تنصرونى اذا قدمت اليكم وتمنعونى مما تمنعون منه انفسكم وأزواجكم وابناءكم ولكم الجنة، (৬) وفى رواية عن عبادة بن الصامت رضى الله عنه: وعلى أن لاننازع الأمر أهله-

‘জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কোন কথার উপরে আপনার নিকটে বায়‘আত করব? তিনি বললেন, (১) সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আমার কথা শুনবে ও মেনে চলবে (২) অভাবে ও স্বচ্ছলতায় সর্বাবস্থায় (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করবে (৩) সর্বদা ন্যায়ের আদেশ দিবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে (৪) আল্লাহর জন্য কথা বলবে এভাবে যে, আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদকে পরোয়া করবে না (৫) যখন আমি তোমাদের কাছে হিজরত করে যাব, তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এবং যেভাবে তোমরা নিজেদের ও নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের হেফাযত করে থাক, সেভাবে আমাকে হেফাযত করবে। বিনিময়ে তোমরা ‘জান্নাত’ লাভ করবে’ (৬) ওবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বর্ণিত অপর রেওয়ায়াতে এসেছে যে, ‘এবং তোমরা নেতৃত্বের জন্য ঝগড়া করবে না’।[7]

আরও দেখুন:  দুঃখের বছর (১০ম নববী বর্ষ)

বস্ত্ততঃ প্রায় দেড় হাযার বছর পূর্বে নেওয়া বায়‘আতের শর্তগুলির প্রতিটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এ যুগেও পুরোপুরিভাবে মওজুদ রয়েছে। সেদিনেও যেমন জান্নাতের বিনিময়ে নেওয়া বায়‘আত সর্বাত্মক সমাজবিপ্লবের কারণ ঘটিয়েছিল, আজও তেমনি তা একই পন্থায় সম্ভব, যদি আমরা আন্তরিক হই।

১২ জন নেতা মনোনয়ন :

৭৫ জনের বায়‘আত সম্পন্ন হওয়ার পর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাদের মধ্য হ’তে ১২ জনকে প্রতিনিধি (নাক্বীব) নির্বাচন করে দিলেন। তার মধ্যে ৯ জন খাযরাজ ও ৩ জন আউস গোত্র হ’তে। খাযরাজ গোত্রের নয়জন হ’লেন- (১) আবু উমামাহ আস‘আদ বিন যুরারাহ (২) সা‘দ বিন রাবী‘ (৩) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (৪) রাফে‘ বিন মালেক (৫) বারা বিন মা‘রূর (৬) আব্দুল্লাহ বিন আমর (৭) উবাদাহ বিন ছামেত (৮) সা‘দ বিন ওবাদাহ (৯) মুনযির বিন আমর।

আউস গোত্রের তিনজন হ’লেন, (১০) উসায়েদ বিন হুযায়ের (১১) সা‘দ বিন খায়ছামা (১২) রেফা‘আহ বিন আব্দুল মুনযির।

অতঃপর তিনি তাদের নিকট থেকে পুনরায় প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের বায়‘আত গ্রহণ করলেন এবং বললেন, أنتم على قومكم بما فيهم كفلاء ككفالة الحواريين لعيسي بن مريم وأنا كفيل على قومي- ‘তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের উপরে তাদের ভাল-মন্দের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, ঈসা (আঃ)-এর হাওয়ারীগণের দায়িত্বের ন্যায়। আর আমি আমার কওমের উপরে (মুসলমানদের উপরে) দায়িত্বশীল’। তারা সকলে একযোগে বলে উঠল- জী হাঁ।

বায়‘আতের কথা শয়তান ফাঁস করে দিল :

ইবলীস শয়তান এই বায়‘আতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল বুঝতে পেরে দ্রুত পাহাড়ের উপরে উঠে তার স্বরে আওয়ায দিল يا أهل الأخاشب هل لكم فى محمد والصباة معه؟ قد اجتمعوا على حربكم- হে তাঁবুওয়ালারা! মুহাম্মাদ ও তার সাথী বিধর্মীদের ব্যাপারে তোমাদের কিছু করার আছে কি? তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হয়েছে’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, هذا أزب العقبة أما والله يا عدو الله لأتفرغن لك- এটা সুড়ঙ্গের শয়তান। হে আল্লাহর দুশমন। অতি সতবর আমি তোর জন্য বেরিয়ে পড়ছি’। একথা শুনে আববাস বিন উবাদাহ বিন ওবাদাহ বিন নাযলাহ (রাঃ) বলে উঠলেন, والذى بعثك بالحق إن شئت لنميلن على أهل منى غدا بأسيافنا- ‘হে রাসূল! সেই সত্তার কসম করে বলছি যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আপনি চাইলে আগামী কালই আমরা মিনাবাসীদের উপরে তরবারি নিয়ে হামলা চালাব’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, لم نؤمر بذلك ‘আমরা সেজন্য আদিষ্ট হইনি’। তোমরা স্ব স্ব তাঁবুতে ফিরে যাও (আর-রাহীক্ব)

শয়তানের এই তির্যক কণ্ঠ কুরায়েশ নেতাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করার সাথে সাথে তারা ছুটে এল এবং ইয়াছরেবী কাফেলার লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা খুব গোপনে রাতের অন্ধকারে ঘটেছে, তাই খাযরাজ নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাইসহ সকলে অজ্ঞতা প্রকাশ করল। এতে নেতারা আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গেল। কিন্তু তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হ’তে না পেরে পুনরায় এলো। কিন্তু তখন কাফেলা মদীনার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সা‘দ বিন ওবাদাহ ও মুনযির বিন আমর পিছনে পড়েন। পরে মুনযির দ্রুত এগিয়ে গেলে সা‘দ ধরা পড়ে যান। কুরায়েশরা তাকে পিছনে শক্ত করে হাঁত বেধে মক্কায় নিয়ে আসে। কিন্তু মুত্ব‘ইম বিন আদী ও হারেছ বিন হারব বিন উমাইয়া এসে তাঁকে ছাড়িয়ে নেন। কেননা তাদের বাণিজ্য কাফেলা মদীনার পথে সা‘দের আশ্রয়ে থেকে যাতায়াত করত। এদিকে যখন ইয়াছরেবী কাফেলা তার মুক্তির ব্যাপারে পরামর্শ করছিল, ওদিকে তখন সা‘দ নিরাপদে তাদের নিকটে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর তারা সকলেই নির্বিঘ্নে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।

বায়‘আতের ফলাফল :

আক্বাবাহর এই দ্বিতীয় বায়‘আত এক যুগান্তকারী ফলাফল আনয়ন করে। যেমন-

(১) গোত্রীয় হানাহানিতে বিপর্যস্ত ও যুদ্ধক্লান্ত ইয়াছরিববাসী, আউস ও খাযরাজ দুই পরস্পরবিরোধী যুদ্ধমান গোত্র পুনরায় ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ হ’ল। যা কোন দুনিয়াবী স্বার্থের ভিত্তিতে ছিল না। ছিল কেবলমাত্র জান্নাতের স্বার্থে নিবেদিত। বহিরাগত কুসিদজীবী ইহুদী-নাছারাগণ আউস ও খাযরাজ দুই বড় গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে এতদিন ধরে যে ফায়েদা লুটে যাচ্ছিল, তার অবসান হ’ল।

(২) তাদের মধ্যে গোত্রীয় জাতীয়তার উপরে নতুন ঈমানী জাতীয়তার বীজ বপিত হ’ল। যা তাদেরকে নতুন জীবনবোধে উদ্দীপিত করে তুলল।

(৩) এর ফলে হিজরতের ক্ষেত্র প্রস্ত্তত হ’ল এবং হিজরতের পূর্বেই ইয়াছরিববাসীগণ রাসূলকে বরণ করে নেবার জন্য সার্বিক প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে থাকল।

(৪) নতুন ঈমানী জাতীয়তার অনুভূতিতে আপ্লুত হয়ে ইয়াছরিববাসীগণ মক্কার নির্যাতিত মুহাজিরগণকে নিজেদের ভাই হিসাবে গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো। এমনকি নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা পরবর্তীতে মুহাজিরগণকে স্ব স্ব পরিবারে শরীক করে নিল। তাদেরকে জমি, ব্যবসা ও গবাদিপশুতে অংশীদার করল। এমনকি যার দু’টি স্ত্রী ছিল, সে একজনকে তালাক দিয়ে তার মুহাজির ভাইয়ের সাথে বিবাহ দিল। ঈমানী ভ্রাতৃত্বের এই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল আক্বাবাহর এই মহান বায়‘আতের মাধ্যমে। এরপরেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নির্যাতিত মুসলমানদের ইয়াছরিবে হিজরতের নির্দেশ দেন।

আয়াত নাযিল :

এই ঐতিহাসিক বায়‘আতকে স্বাগত জানিয়ে আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলের নিকটে আয়াত নাযিল করে বলেন,

إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ فَيَقْتُلُوْنَ وَيُقْتَلُوْنَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقّاً فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنجِيْلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللهِ فَاسْتَبْشِرُوْا بِبَيْعِكُمُ الَّذِيْ بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ খরিদ করে নিয়েছেন মুসলমানদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়। অতঃপর মারে ও মরে। এই সত্য প্রতিশ্রুতি রয়েছে তওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে। আর আল্লাহর চাইতে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? অতএব তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর সেই লেন-দেনের উপরে যা তোমারা করেছ তার সাথে। আর এ হ’ল এক মহান সাফল্য’।[8]

শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ (১৭):

(১) ইসলামের প্রসার ও তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার ব্যাপক প্রচারের মধ্যে। সংস্কারককে তাই প্রচারের ছোট-খাট সুযোগকেও কাজে লাগাতে হয়। ত্বায়েফ থেকে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসার পর মক্কার কঠোর বৈরী পরিবেশের মধ্যে হজ্জের মওসুমে গভীর রাতে বেরিয়ে তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে গোপনে তাওহীদের দাওয়াত দেবার মধ্যে এবং তার নিকটে আগত বাহিরের লোকদের নিকটে দাওয়াত দেবার মধ্যে রাসূলের উক্ত নীতি ফুটে উঠেছে।

(২) দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোনরূপ দুনিয়াবী স্বার্থ প্রদর্শন করা যাবে না। কেবলমাত্র পরকালীন মুক্তি ও কল্যাণের দাওয়াত দিতে হবে।

(৩) নিজ দেশে অসহায় ভাবলে অন্য দেশের সম আদর্শের অনুসারীদের আন্তরিক আহবানে সাড়া দিয়ে সেদেশে স্থায়ীভাবে হিজরত করা আদর্শবাদী নেতার জন্য সিদ্ধ। এজন্য ক্ষেত্র প্রস্ত্ততির চেষ্টা করা বৈধ।

(৪) তাওহীদের দাওয়াত প্রসারের জন্য চাই দূরদর্শী, উদ্যমী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল যুবক। আস‘আদ বিন যুরারাহর নেতৃত্বে ইসলাম কবুলকারী ছয় জন ইয়াছরেবী যুবক ও রাসূলের প্রেরিত তরুণ দাঈ মুছ‘আব বিন ওমায়ের এর তারুণ্যোদ্দীপ্ত দাওয়াতী কার্যক্রম আমাদেরকে সেকথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

(৫) ইমারত ও বায়‘আতের মাধ্যমেই ইসলামী সমাজ বিপ্লব সফলতা লাভ করে থাকে। ১১, ১২, ১৩ নববী বর্ষে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি বায়‘আত অনুষ্ঠান এ দিকেই দিক নির্দেশনা দান করে।

(৬) দাওয়াতে সফলতা লাভের জন্য নেতা ও কর্মীদের মধ্যে আদর্শনিষ্ঠা এবং বিশ্বাসের দৃঢ়তা অপরিহার্য। হিজরতের পূর্বেই মি‘রাজ ও পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হওয়ার বিষয়টি সেদিকেই নির্দেশনা দেয়।

পরবর্তী অংশ পড়ুন: রাসূল (ছাঃ) -কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং মদীনায় হিজরত


 

[1] মনছূরপুরী ১ম ব্যক্তির নাম বলেছেন, মু‘আয বিন হারছ (معاذ بن حرث) , ৪র্থ ব্যক্তির নাম ইয়াযীদের পরিবর্তে বলেছেন, খালেদ বিন মাখলাদ (خالد بن مخلد) এবং ৬ষ্ঠ ব্যক্তির নাম আবুল হায়ছাম-এর স্থলে বলেছেন, আবুল হুশায়েম (ابوا لهشيم) – রহমাতুল লিল আলামীন ১/৭৭ পৃঃ টীকা দ্রষ্টব্য।

[2] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৮; সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৩৪।

[3] আরবরা মহিলাদের উপনাম إزار অর্থাৎ তহবন্দ বলে থাকে। إزار এর বহুবচন হ’ল أُزُر ।

[4] ইবনু কাছীর, তাফসীর তওবা ১১১।

[5] আহমাদ হা/১৪৬৯৪ সনদ ছহীহ; আর-রাহীক্ব ১৫০ পৃঃ।

[6] সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৬৬-৬৭; আর-রাহীক্ব ১৪৮।

[7] আহমাদ হা/১৪৪৯৬; সিলসিলা ছাহীহাহ হা/৬৩; সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৫৪; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৬।

[8] তওবাহ ৯/১১১; ঐ, তাফসীর কুরতুবী, ইবনে কাছীর।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button