সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

শারদীয় শুভেচ্ছা

আমি যখন শৈশব পার হয়ে কৈশোরে ঢুকছি তখন নিত্য নতুন গালাগালির সাথে পরিচয় হচ্ছে বন্ধু-বান্ধবের সুবাদে। তো সবচেয়ে পাওয়ারফুল গালি হিসেবে প্রথম স্থানে ছিল ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি। আমি বেশ বোকাসোকা ছিলাম (এখনো যে ভারি বুদ্ধি হয়েছে তাও নয়), বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘বাস্টার্ড’ মানে কী? নিতান্ত দায়সারা উত্তর আসলো – ‘যারজ সন্তান’। লেব্বাবা! সেটার মানে কী? ততোধিক দায়সারা উত্তর আসলো – ‘অবৈধ সন্তান’। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতেও ধরল যে ঐ স্থান-কাল এবং পাত্রে এশব্দের অর্থ সংক্রান্ত জ্ঞানচর্চা বৃথা।

বড় হয়ে যখন ‘বাস্টার্ড’ মানে বুঝলাম তখন এর মানের ভয়াবহতা বুঝতে পারলাম। কোন মানুষকে বলা হবে যে “তোমার মা তোমার বাবাকে বাদ দিয়ে অন্য একজন লোকের সাথে শুয়েছিল এবং তাতেই তোমার জন্ম” আর সে মাথা ঠান্ডা রাখবে এটা অসম্ভব। কেউ নিজের বাবার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো তো দূরের কথা, এ ব্যাপারটা কল্পনা করতেও পারেনা।

খুব নিষ্ঠুর শোনালেও এ কথাটা ঠিক যে মানুষের জন্মের রহস্য মানুষের অজানা। একটা মানুষের জন্মের পিছনে বাবার যে ভূমিকা থাকে সে ঘটনাটা ঘটে মানুষটির অস্তিত্বে আসার প্রায় নয় মাস আগে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের জীবনের সবচেয়ে আপন যে দু’জন মানুষ তাদের আমরা চিনি ইনফারেন্স বা অনুসিদ্ধান্তের মাধ্যমে। যে দু’জন নারী-পুরুষ আমাদের অসম্ভব ভালোবাসেন, আমাদের প্রতিপালন করেন, আমাদের কে খেতে দেন, আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটান, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি … করেন তাদেরকেই আমরা বাবা-মা বলে জানি। এ যুগে জিন প্রোফাইলিং করে বাবা বের করা যায় বটে কিন্তু সেটাও ইনফারেন্সিয়াল। জিন প্রোফাইলিং বাবার ডিএনএ-এর সাথে সন্তানের ডিএনএ-এর মিলগুলো মিলিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়, অমিলগুলো উপেক্ষা করে।

কোন মানুষের পিতৃপরিচয়ের ব্যাপারে গাণিতিক অকাট্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সে একাধিক বাবার সম্ভাবনা সহ্য করতে পারেনা। অথচ যে আল্লাহ সত্যিকার অর্থে একজন মানুষকে পৃথিবীতে পাঠান, তাকে সেখানে বাঁচিয়ে রাখেন, তাকে প্রতিপালন করেন সেই আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে নিতে মানুষের যত আপত্তি। মানুষ আল্লাহর সাথে তুলনা করে দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবির, পাথরের, কবরে শুয়ে থাকা মরা মানুষের, খড়-কুটো দিয়ে গড়া মূর্তির যাকে সে নিজে পানিতে ডুবিয়ে দেয়। মানুষ হয়ে মানুষের মনুষ্যত্বের কত বড় অপমান!

এছাড়া কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহকে এক বলে হয়ত বিশ্বাস করেন কিন্তু মেনে নেননা। কারণ মেনে নিয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ এ কথার বলার শর্ত হল আল্লাহ ছাড়া বাকি যত যা কিছুর উপাসনা অথবা দাসত্ব মানুষ করে তার সবকিছুকে অস্বীকার করা। অস্বীকার করা মানে বুক ফুলিয়ে বলা যে ঐ যীশুর ছবি, ঐ কাঠের ক্রুশ, ঐ পাথরের লিঙ্গ, ঐ খড়-কুটোর দেবীমূর্তি, ঐ মাজার, ঐ পীর এই সব কিছুই ভুয়া উপাস্য, মিথ্যা ইলাহ। কারণ এর সবই সৃষ্ট বস্তু, আর মুসলিম সৃষ্ট বস্তুর ইবাদাত করেনা, ঐসব সৃষ্ট বস্তুর স্রষ্টার ইবাদাত করে। যে মুসলিম আধুনিক হতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব ইলাহ্কে অস্বীকার করতে চায়না সে হয় ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ এর মানেই বোঝেনি নয়ত সে মুনাফিক।

আজকের মুসলিমরা এতই হতভাগা যে ‘বাস্টার্ড’ গালি শুনে যে মুসলিম তেড়ে আসে, সেই আল্লাহর জায়গায় মাটির একটা মূর্তি বসিয়ে করা পূজা দেখে শুভেচ্ছা জানায় – শারদীয় শুভেচ্ছা। পিতৃত্বে শরিক করলে আমাদের আঁতে আণবিক বোমা পড়ে অথচ যে আল্লাহ আমাদের অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনলেন, প্রতি মুহূর্ত অক্সিজেন দিচ্ছেন ফ্রি, আহার-পানীয়-পোশাকের ব্যবস্থা করে দিলেন সেই আল্লাহর সাথে প্রতিনিয়ত শরিক করা হলেও আমাদের ভ্রুটাও অবধি কুচকে উঠেনা। যে আল্লাহ বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে আমাদেরকে বেছে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মুখ দেখালেন সেই আমরা আল্লাহর দেয়া বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করে বের করলাম যে সব ধর্মই ঠিক, যেকোন একটা মানলেই চলে। আরে সব ধর্ম মানলেই যদি চলে তাহলে খামোকা কেন মুসলিম থাকা, হিন্দু-খ্রীষ্টান কিছু একটা হয়ে গেলেই হয় – এত বিধিনিষেধের বালাই থাকেনা। মেয়েদের মাথায়-শরীরে কাপড় দেয়া লাগবেনা, মদ-ঘুষ-সুদ সবই খাওয়া যাবে, বিয়ে না করেও চারজনের চার বিছানায় যাওয়া যাবে – দুনিয়ার যাবতীয় সুখ অনলি ইন মাই ডিজুস!

কোন হিন্দুকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা-সম্ভাষণ জানানো অর্থ তার এই পূজো করাতে আপনার সায় আছে। এরচে হিটলারকে এরকম বলা ভালো ছিল – “হের হিটলার, ১ কোটি মানুষ মারায় আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। চমৎকার কাজ করেছেন, চালিয়ে যান”। বাংলাদেশে অবশ্য শততম মেয়েটির সম্ভ্রমহানি উপলক্ষ্যে কেক কেটে পার্টি দেয়া হয়। যারা ঐ কেক খেতে পারে তারা কালীপূজায় গিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসবে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধুঁয়া তুলে কপালে তিলক এঁকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় নাচবে এ আর আশ্চর্য কি?

আল্লাহর সন্তান গ্রহণের ধারণাকে তীব্র নিন্দা করে আল্লাহ কুর’আনে বললেন এ কথা এতই ভয়াবহ যে এ কথা আকাশের উপরে বলা হলে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যেত, মাটির উপরে বলা হলে মাটি দু’ভাগ হয়ে যেত, পাহাড়ের উপরে বলা হলে পাহাড় চূর্ণ হয়ে যেত। আজ আমরা দূর ডেনমার্কে এক ভন্ড রসুল(সাঃ) কে নিয়ে একটা ক্যারিকেচার আঁকলে পাগলের মত লাফাতে থাকি অথচ ঘরের পাশে যে উৎসবটিতে স্বয়ং আল্লাহকে এমন চরমভাবে অপমান করা হয় সে দিন আমরা সবাইকে ‘মেরি ক্রিসমাস’ জানাই! আল্লাহর অপমান আমাদের গায়ে তো লাগেইনা বরং সেটাতে আনন্দের তকমা দেই।

একজন মুসলিম কি তবে একজন হিন্দু প্রতিবেশীর শুভ কামনা করবেনা? তার খ্রীষ্টান সহপাঠীর ভালো চাইবেনা? নিশ্চয়ই চাইবে। ভাল চাওয়ার প্রথম কাজটাই হবে তাকে আল্লাহর একত্ববাদ বোঝানো, তাকে সে দিকে আহবান জানানো। একজন মানুষকে অনন্তকালের জন্য আগুনে পোড়া থেকে বাচানোর চেয়ে আর ভাল কাজ কি হতে পারে? আমার স্ত্রী খ্রীষ্টান ধর্মান্তরিত মুসলিম। সে যখন নিজে নিজে পড়াশোনা করে ইসলাম গ্রহণ করল তখন চারপাশের মুসলিমদের উপর খুব বিরক্ত ছিল। ইসলামের কথাগুলো কেন কেউ তাকে আগে বলেনি, সত্য পথের দিকে কেন কেউ তাকে আগে ডাকেনি এটা নিয়ে সে খুব ক্ষুব্ধ ছিল। আমাদের যদি আল্লাহ কিয়ামাত দিবসে প্রশ্ন করেন কেন আমরা দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে হিন্দুদের দুর্গাপূজার অন্তসারহীনতা তাদের সামনে তুলে না ধরে কেন তাদের জঘন্যতম পাপকাজ উপলক্ষ্যে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম তবে আমরা কি জবাব দেব? তবে কি আমাদের মনে আমাদের ধর্মের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে?

ইমাম হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহমাতুল্লাহ) তার আহকাম আহ্ল আল-দিম্মা গ্রন্থে বলেন কাফিরদের তাদের উৎসবে সম্ভাষণ জানানো মুসলিম ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ। এটা কাউকে মদ খাওয়া বা খুন করা বা ব্যভিচার করায় সাধুবাদ জানানোর মত। যাদের নিজের দ্বীনের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই তারা এ ধরণের ভুল করতে পারে। যে অন্যকে আল্লাহর অবাধ্যতা, বিদয়াত অথবা কুফরিতে জড়ানোর কারণে শুভেচ্ছা জানাবে সে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিল।

আমার পরিচিত কেউ যদি একটা মদের দোকান বা একটা পতিতালয় খুলে বসে তবে একজন মুসলিম হিসেবে আমি কখনই তাকে ‘শুভ কামনা’ জানিয়ে আসবোনা। ঠিক তেমনি দুর্গা পূজার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে শিরক করার উপলক্ষ্যে কখনোই ‘শারদীয় শুভেচ্ছা’ জানানো একজন মুসলিমের কাজ নয়। আমার বরং উচিত হবে কাজটা কেন ভুল সেটা সুন্দর করে বুঝিয়ে বলা। যদি সেটা করতে না পারি তবে অন্তত মনে মনে কাজটাকে ঘৃণা করতে হবে যদিও সেটা দুর্বলতম ঈমান। খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে যদি আমরা এপ্রেশিয়েট করা শুরু করি তাহলে আমাদের মধ্যে কতটুকু ঈমান আছে সেটা নিজেদেরই হিসাব করে বের করে ফেলা দরকার।

আল্লাহ আমাদের ইসলাম জানার, বোঝার এবং বুঝে মানার সামর্থ্য দিন। আমিন।

 

– শরীফ আবু হায়াত অপু


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Back to top button