সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

পোশাকের ব্যাপারটা মেয়েরা ফের বিবেচনা করতে পারেন কি!

পোশাক নিয়ে কথা বললে একালের লোকজন নেতিবাচক ভাবে দেখে। যার যা ইচ্ছা তা পরবে, তাতে সমস্যা কোথায়? অবশ্য কেউ পুরো শরীর ঢেকে ফেললে একালের লোকেরা আবার মাইন্ড করে। ভাবছি কোথায় যাবো! যে যা ইচ্ছা পরিধান করার যে মত, সে মতের পরের ধাপ হল, যার ইচ্ছা কিছুমিছু পরবে, যার ইচ্ছে কিছুই পরবে না। কিন্তু তাই বলে অনেক কিছু পরে সব ঢেকে ফেলতে পারবে না।

সমাজের মানুষ নতুন কিছু সংকটে পড়েছে। যে সমস্যাগুলো কে সমস্যা বলে স্বীকৃতি দেয় না আধুনিক সমাজ। বিপত্তিটা ঠিক কোথায় জানি না। তবে সংকটের জায়গাটা হল, একই সমস্যা একজনের জন্য বিব্রতকর আবার অন্যের জন্য উপভোগ্য। আমার সামনে অধিকারের দোহাই দিয়ে একজন মানুষ নগ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করলে সেটা হবে আমার জন্য হবে চরম বিব্রতকর। কিন্তু এই একই ব্যাপার একজন নগ্নবাদীর জন্য উপভোগ্য হবে। একজন যৌনবাদীও ব্যাপারটা উপভোগ করবেন। যিনি একই সাথে নগ্নবাদী ও যৌনবাদী, তার জন্য ব্যাপারটায় ডবল মজা! এখানেই সমস্যা, একই ব্যাপার এক জনের কাছে সমস্যা তো অন্যের জন্য “সমাধান”। আর যখন ট্র্যাডিশনাল কিছু সমস্যাকে আধুনিকতা সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতিই দিতে চায় না তখন সমস্যাটা একটা ঘোরতর সংকটে পরিণত হয়।

কারণ আধুনিক সমাজে সবার “অধিকার” থাকে। নগ্নবাদীর অধিকার, সমকামীর অধিকার, শিশু-ভোগীর অধিকার, স্বকন্যাভোগীর অধিকার, যৌনবাদীর অধিকার… এভাবে সবারই অধিকার থাকে কিন্তু যারা এসব এক্সট্রিমের মধ্যে পড়েন না তাদের আবার অধিকার থাকে না। ধরুন একজন ধার্মিকের কোনও অধিকার থাকতে নেই। আধুনিক সমাজ তার আজানের আওয়াজ টুটে ধরবে, বোরখার কাপড় ছিঁড়ে ফেলবে, ধর্মীয় বই ক্রোক করবে, ধর্মীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করবে। একই সময়ে উপরে যে সকল মতবাদ উল্লেখ করা হয়েছে সে সকল গোত্রের আওয়াজ ছড়িয়ে দেবে, তাদের লাগাম ছেড়ে দেবে, তাদের মতবাদের বই উন্মুক্ত করবে এবং তাদের সংগঠনের বৈধতা দেবে। আসলে আধুনিক সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হল সব কিছুকেই অধিকার মনে করা আবার অনেক অধিকারকে অনধিকার হিসেবে চাপিয়ে দেয়া। পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারটা সেই সংকটেরই সন্তান। এটা সমস্যা হয়েই থাকবে।

আমি যেটা মনে করি সেটা হল, যার যা ইচ্ছা তাই পরিধান করুক, কিন্তু সে যা করছে সেটা বুঝে করুক। সত্য ও সুন্দরের পথে যারা এখনও চলতে চান তাদের চিন্তার দুয়ারটা খোলা রাখা উচিত। এবং চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের অলসতা দুর করা উচিৎ। কারণ আধুনিকতার আরেকটা মোহনীয় অস্ত্র হল, তার প্রত্যেকটি অনৈতিক দাবীর পেছনে কিছু মন ভোলানো যুক্তি তৈরি করে ফেলে। শুধু তাই নয়, সে এই দাবীগুলোকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে সম্পূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এপ্রোচ গ্রহণ করে। যেখানে তার অনুকূলে পরিসংখ্যানের সংগ্রহ থাকে। এই মন ভোলানো যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করতে হলে চিন্তার দুয়ারটা খুলতে হবে এবং চিন্তার ক্ষেত্রে অলসতাটা দুর করতে হবে। একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এপ্রোচটাও প্রফেশনালি গ্রহণ করতে হবে।

আরও দেখুন:  সন্তানের কাছে লেখা একজন পর্নস্টারের চিঠি

ইদানীং আমার মাথায় একটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। একালের মেয়েদের পোশাক দেখে এই চিন্তাটা মাথায় এসেছে। সত্য পন্থি মেয়েদেরও উচিৎ ছেলেদের পোশাক নিয়ে ভাবা। যেমনটা আমরা ছেলেরা ভাবছি। বিশেষ করে মেয়েদের বডি-ফিট জামাকাপড় পরার ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ বিব্রতকর মনে হয়। অনেকের কাছে হয়তো উপভোগ্য মনে হবে। টাইস কিংবা লেগিংস যেটাই বলেন, আমি এটাকে চরম অশালীন পোশাকই বলবো। অথবা শরীরের ভাঁজ উগরে দেয়া জামা, আমার কাছে এটাও অশালীন মনে হয়। অনেকে অবশ্য এসবকে অনেক উপভোগ করে থাকবেন। আমি বিব্রত হই, কারণ আমি প্রকৃতিগত ভাবে পুরুষ। যৌন আবেদনময় সাজসজ্জাকে আমি প্রাইভেট ম্যাটার মনে করি। এটা পাবলিকলি আসা উচিত না। যৌন আবেদনময় সাজসজ্জা দর্শনেই পুরুষকে উত্তেজিত করে ফেলে, যাকে উত্তেজিত করে না সে পুরুষ নন । মেয়েদের ক্ষেত্রে অবশ্য যৌন আবেদনময় সাজসজ্জার সাথে অন্তরঙ্গতা ও শরীরী স্পর্শের দরকার হয়। বিষয়টা খুবই প্রাকৃতিক। সেজন্য নারী পুরুষ উভয়েরই উচিৎ পাবলিকলি যৌন আবেদন সৃষ্টি থেকে বিরত থাকা। তো অবৈধ যৌন আবেদন আমার কাছে বিব্রতকর। আর যৌন আবেদন বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, যখন সেটা পাবলিকলি প্রকাশ্যে চলে আসে তখন সেটাও আমার কাছে বিব্রতকর। কারণ যৌন আবেদন পাবলিকলি প্রকাশ্যে এলে একাধিক পক্ষকে সে আকৃষ্ট করবে। এর মধ্যে কেউ নিজেকে নিভৃত রাখবে আবার কেউ রাখবে না।

এমনকি কেউ কেউ ব্যাপারটা পুষে রেখে অন্যভাবে তা চরিতার্থ করবে। ব্যাপারটা খুবই র্যান্ডম, কে কি করবে তা আপনি জানেন না, আমিও না। কিন্তু আপনি এতটুকু নিশ্চিত থাকতে পারেন যে সমাজের সবাই ইউসুফ (আ) নন যে জুলেখার অনৈতিক দাবী উপেক্ষা করে উলটো দৌড়ে দূরে সরে যাবেন। কেউ না কেউ যৌন আবেদনময় সাজসজ্জা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দেবেন। সুতরাং একজন নারী যৌন আবেদন সৃষ্টি করে পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করে বেড়াবেন, এটা নারীর কাজ নয়, নারীদের মধ্যে একটা বিশেষ গোত্রের কাজ, যারা একাজের মাধ্যমে কাস্টমার কালেক্ট করে ও পারিশ্রমিক গ্রহণ করে। সুতরাং একজন নারী যৌন আবেদন সৃষ্টি করে যাবেন, কিন্তু আবেদনে সাড়া পেলে লাঞ্ছিত বোধ করবেন, এটা যুক্তির মধ্যে পড়ে না। ছেলেদের জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য।

আরও দেখুন:  বৃদ্ধাশ্রম : মানবতার কলঙ্কিত কারাগার (১)

আমার মাথায় যে চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হল, একসময় রাজা বাদশাগন প্রমোদ ঘরে আনন্দ ফুর্তি করতেন। তারা প্রমোদবালাদেরকে ভাড়া করে নিয়ে আসতেন। প্রমোদবালারা আঁট-সাঁট পোষাকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে নাচন-কুদনে রাজা-বাদশাদের আনন্দ দিতেন। প্রমোদবালাদের হৃষ্ট-পুষ্ট শরীরের ধেই ধেই নাচন তাদের মাতাল করে তুলতো। যৌবনে টইটুম্বুর প্রমোদবালাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সময় সময় তাদেরকে রাজা-বাদশারা বিছানায়ও নিয়ে যেতেন। বিনিময়ে দিতেন মোটা অংকের মাইনে।

সে সময়ের প্রমোদবালাদের ইউনিক পোশাক ছিল শরীরের ভাঁজ উগরে দেয়া জামাকাপড়। সেই সাথে তাদের পরনে থাকতো চামড়ার সাথে লেগে থাকা ফিনফিনে কাপড়ের পাজামা। কোনও ভদ্র ঘরের মেয়েরা এসব পোশাক পরতেন না। বলা যায় এ পোশাকগুলো ছিল প্রমোদবালাদের ইউনিফর্ম। এই ইউনিফর্মগুলো এখন আমাদের সমাজের মেয়েরা অহরহ পরে থাকেন। তারা কি এসব বুঝে করেন? এই মেয়েদের অভিভাবকরা কি কখনও চিন্তা করেন যে তাদের একেকটি ঘর প্রমোদবালা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে?

একসময় প্রেম-ভালবাসা হতো হৃদয় ঘটিত কারণে। একটা মেয়ে একটা ছেলের কাছে কতোটা সুন্দর এটাই ছিল মুখ্য বিষয়। তখনকার ছেলেরা মেয়েদের নিতম্ব, কটি ও বক্ষ পরিমাপ করে বেড়াতো না। চোখে যাকে ভাল লেগেছে, মনে যাকে ধরে গেছে তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখত তারা। মেয়েরাও বোধ করি তাই করতো। এদের অধিকাংশই সমাজ কে এড়িয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাত। তখন যখন আমরা বলতাম, এ হল নষ্টামির শুরু, তখন অনেকেই আমাদের রক্ষণশীল বলে গালি দিতেন। তারা বলতেন “প্রেম করা কি অপরাধ!”। তারা আমাদেরকে বিজ্ঞ ঢঙ্গে উক্তি শোনাতেন “প্রেম স্বর্গ থেকে আসে, স্বর্গে চলে যায়”। কিন্তু এখন প্রেম-ভালবাসা হৃদয় ঘটিত কারণে হয় না। এখন প্রেম-ভালবাসা হয় যৌন আকাঙ্ক্ষা জনিত কারণে। যার কারণে মেয়েটা কতো সুন্দর তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মেয়েটা কতটা সেক্সি। ফলে এখনকার ছেলেরা মেয়েদের নিতম্ব, কটি ও বক্ষ পরিমাপ করে বেড়ায়। সেই চাহিদা মেটাতে, একটু দৃষ্টি কাড়তে মেয়েরাও সেক্সি লুক পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যৌনতার বহুমাত্রিক ফাঁদে পা দিয়ে যৌনতায় চুর হয়ে থাকা কেউ কেউ যখন যেখানে সেখানে মেয়েদের ইজ্জত লুটে নেয় তখন তারা বলেন নষ্ট হয়ে গেছে সমাজ! অথচ তারা ভুলে যান, সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং সমাজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েই তারা যুব সমাজকে প্রেম শিখিয়েছিলেন, প্রেমের আদলে যৌনতা শিখিয়েছিলেন।

আরও দেখুন:  সর্বনাশের সিঁড়ি

একটা যৌক্তিক প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, একটা মেয়ে যৌন আবেদনময় পোশাক পরলেই কি তার ইজ্জত লুট করা যাবে? উত্তর টা খুব সোজা, একজন সন্ত্রাসীকেও তার সন্ত্রাসী কাজের জন্য কেউ হত্যা করতে পারেন না। সবার নৈতিক দায়িত্ব হল তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা, যাতে সে সঠিক বিচারের মুখোমুখি হয়। তেমনি একটা মেয়ে যৌন আবেদনময় পোশাক পরলেই তার ইজ্জত লুট করা বৈধ হয় না। কিন্তু তাই বলে মেয়েটার যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পেছনে যৌন আবেদনময় পোশাকের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাদের অন্তরে নগ্নবাদিতা ও যৌনবাদিতার মানসিকতা নেই তাদের মধ্যে যারা সত্যিকারের সমাধান চান তারা এটা অস্বীকার করতে পারেন না। সমাধানের পথে আসতে হলে যৌন সন্ত্রাসীদের যেমন দুষতে হবে, তেমনি যৌন উত্তেজক বিষয়গুলোকেও দুষতে হবে। এবং দুটো ব্যাপারেই কার্যকরী সিধ্যান্তে আসতে হবে। অধিকারের বুলি আওড়িয়ে নিজেদের ভোগের ব্যাপারটা নিশ্চিত করার মতলব আঁটলে সমাধান অধরাই থেকে যাবে চিরকাল। পোশাকের ব্যাপারে একটু শালীন হওয়া মেয়েদের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজন।

 

– তারিকুর রহমান শামীম

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button