নারী অঙ্গন

নারী সুরতহাল রিপোর্ট এবং লজ্জা!

ধর্ষিত নারীর সুরতহাল রিপোর্ট করছেন পুরুষ ডাক্তার। আর কখনো সাথে থাকেন পুরুষ পুলিশ অফিসারও। এর আগে উচ্চ আদালত নারী পুলিশ এবং নারাী ডাক্তার দিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট করতে রায় দিয়েছেন। সে রায় কতটা কার্যকর হয়েছে? এটা একজন নারীর জন্য অপমানের। রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একজন নারীর শ্লীলতাহানি করার? নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার যৌন নির্যাতনের শামিল। নির্যাতনে শিকার নারী এর ফলে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

বাধ্য হয়েই একজন ধর্ষিত নারী পুরুষ ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাচ্ছেন। একজন ধর্ষিতাকে বাধ্য হয়ে পুরুষ পুলিশ অফিসারের কাছে তার লজ্জার কথা অকপটে বলতে হচ্ছে। বিপদে না পড়লে বোধ করি কখনোই একজন নারী পুরুষ ডাক্তারের সামনে পোশাক খুলে বিবস্ত্র হতেন না। ধর্ষণের সেই নির্মম কাহিনীর ধারা বর্ণনা দিতেন না। চিকিৎসক একজন নারীকে পোশাক খুলে ফেলতে বলেন। বিষয়টি কি আবারো ধর্ষণ নয়?

মহিলা পুলিশ অফিসার অভিযোগ নিলে ধর্ষিতা স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন। তার ডাক্তারি পরীক্ষা যদি কোনো মহিলা ডাক্তার করেন তবে তার সহমর্মিতা পেতে পারেন। এতে তদন্তের কাজও দ্রুত শেষ হতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ, ইভটিজিং, যৌন হয়রানিসহ নারী ভিকটিমদের সাপোর্ট দিতে নারী পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তার সাথে নারী ভিকটিমরা সব বিষয় শেয়ার করতে পারেন না। এ ছাড়া কোনো নারী খুন হলে তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্ঘটনার মামলা অথবা ছেলে বা মেয়ের বয়স নির্ধারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সনদ নিতে হয়। আইনের চোখে এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অনেকে মনে করেন, এ দলিল পেতে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হন নারী। অবাক করার বিষয় যে, দেশের কোনো হাসপাতালেই নারীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য পৃথক কক্ষ নেই। চিকিৎসকদের বসার কক্ষে পুরুষ চিকিৎসক পুরুষ ওয়ার্ডবয়ের সহযোগিতায় সেই টেবিলের ওপর ধর্ষণের শিকার নারীকে রেখে তার পরিধেয় কাপড় খুলে শারীরিক পরীক্ষা করেন। সম্প্রতি সবুজবাগ থানার সহকারী পুলিশ পরিদর্শক বিকাশ কুমার ঘোষ আদালতের নির্দেশে বয়স নির্ধারণের জন্য একটি মেয়েকে ফরেনসিক বিভাগে আনেন। খোলা বারান্দার টেবিলের ওপর পুরুষ ওয়ার্ডবয় কাপড় খুলতে শুরু করলেই চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মেয়েটি। জ্ঞান ফেরার পর বয়স নির্ধারণে আর রাজি হননি তিনি। পত্রিকার খবরে দেখেছি, টাকা দিতে রাজি হলে হাসপাতালের অন্য বিভাগ থেকে নারী চিকিৎসক এনে পরীক্ষা করানো হয়। টাকা বেশি দিলে ওইদিনই পরীক্ষা সনদও পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয় অভিভাবকদের কাছ থেকে। টাকা খরচ না করলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় ধর্ষণ কিংবা বয়স নির্ধারণের প্রতিবেদনের জন্য।

আরও দেখুন:  মাতৃভাবনা

কোনো কোনো পুলিশ কর্তাদের বলতে শুনি, এসব মামলা তদন্ত সম্পন্ন করতে গিয়ে তারাও বিব্রত হচ্ছেন। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার অশ্লীল প্রশ্নবাণে পড়েন নারী। সেই পীড়নকে আমরা কেন যৌননিপীড়ন বলব না?

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এজাতীয় অমানবিক ও নোংরা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ধর্ষিতা হওয়ার পর অন্য একদল পুরুষ ডাক্তারের কাছে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় পুরো শরীর পরীক্ষা করে অপরাধ প্রমাণের সনদ গ্রহণের পক্ষে কিছুতেই মত দেয়া যায় না। আর দশজন সচেতন মানুষের মতো আমারও ভাবনা, ধর্ষণকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তবে আমার আপত্তি হলো, ধর্ষিতাকে পরীক্ষা করাতে হবে একজন মেয়েডাক্তার দিয়ে। এজাতীয় মানসিকতা আমাদের অবশ্যই পরিহার করতে হবে। আপনার আমার সবারই মা, বোন ও স্ত্রী রয়েছে। ওই ধর্ষিতাদের কথা ভাবুন। ভেবে দেখুন আমাদের মা, বোন ও স্ত্রী এ ক্ষেত্রে কতটা নিরাপদ? যদি কখনো তারাও এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তবে কি আপনি একজন ছেলেডাক্তার হিসেবে মায়ের, ভাই হিসেবে বোনের এবং স্বামী হিসেবে স্ত্রীর পরীক্ষা একজন পুরুষ ডাক্তারের কাছে করাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। এটা আপনার জন্য কতটা স্বস্তিকর? জানি একদমই নয়, তা হলে কী করতে হবে? জবাব হলো, প্রতিবাদ করতে হবে।

এ দেশের ধর্ষিতারা বছরের পর বছর ধরে বিচার চাইতে গিয়ে ফের শ্লীলতাহানির শিকার হলেও দেশের বিবেকবান মানুষ কেন প্রতিবাদী হচ্ছেন না? মানুষের অন্তরচক্ষুতে কেন উপরি উক্ত ঘটনা ধরা পড়ে না? তাদের বিবেক কেন জাগ্রত হয় না?

 

নয়া দিগন্ত

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

  1. মহিলা ডাঃ এর ব্যবস্তা না থাকলে এই দেশে বেচে লাভ কি
    তার চেয়ে ভাল যে টাকা দিয়ে সনদ নিব সেই টাকা দিয়ে যে এই রকম কাজ করে তাকে লাশ বানিয়ে দেন
    আর যদি না পারেন তাহলে এই আমার সাথে যোগাযোগ করেন ….

মন্তব্য করুন

Back to top button