সচেতনতা

ছোট্টমনে প্রশ্ন জাগে

পাশের বাসার পিচ্চিঃ “আপু, জানো? আমার আম্মুর বেবি হবে। আমার বোন লাগবে।” বললাম, “কেন ভাই হলে ভালো হয় না?” সে বলল, “ওর জন্য তো আমি ভাই আছি-ই। আম্মুর তাহলে ছেলে মেয়ে সব থাকবে।” এইসব নিয়ে ওর সাথে কথা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে সে বলে, “আচ্ছা আপু, বিয়ে হওয়ার পরে কেন বেবি হয়? বিয়ে হওয়ার আগে কেন হয় না?”

একটু ভাবলাম কীভাবে মিথ্যা না বলে ওর উপযোগী করে উত্তরটা দেওয়া যায়।

আমি তাই বললাম, “ভাইয়া, একটা বাবু যেন সুন্দর করে বেড়ে ওঠে তাই বাবা মা দুজনই যে দরকার! বিয়ের আগের বাবা আর মা দুজন অন্য জায়গায় থাকে।তাই তারা একসাথে বাবুটাকে বড় করে তুলবেন কিভাবে বলো? সেজন্য আল্লাহ নিয়ম করে দিয়েছেন যে, বিয়ে হওয়ার পরই বেবি হতে হয়।”

[২]

কিম্ভূত কিম্ভূত উত্তর পায় শিশুরা যখন জিজ্ঞেস করবে কোথা থেকে সে এল। “তোমাকে হাসপাতাল থেকে কিনে এনেছি।” অথবা, “আকাশ থেকে এসেছো।” “তোমাকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি।” রবীন্দ্রনাথ ‘জন্মকথা’য় সবচেয়ে সুন্দর বলেছিলেন, “ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।”

আচ্ছা একটা গল্প বলি,

নুহার ছোট বোন হবে। ও মাকে জিজ্ঞেস করছে, “আম্মু বাবুটা তোমার পেটের ভেতর কিভাবে গেলো?”

আম্মু উত্তর দিলেন, “আল্লাহ দেখলেন যে নুহা খুব একা একা হয়ে গেছে। ওর কোন খেলার সাথী নাই বাসায়। সেজন্য আল্লাহ আরেকটা বাবুকে আম্মুর ভেতর দিয়ে দিলেন যেন তুমি ওর সাথে খেলতে পারো।” “কিন্তু আল্লাহ কিভাবে দিলেন আম্মু? তোমার পেট কেটে তারপর বাবুটাকে রেখে দিয়েছেন?” “না তো নুহা! আল্লাহ বাবুটার আত্মাকে মা-র ভেতর দিয়েছেন। তারপর একটা ছোট্ট শরীর দিয়েছেন। অনেক দিন ধরে বাবুটা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। বাবুর হাত, পা, চোখ, নাক সব হবে । যখন ও দেখতে ঠিক একটা সত্যিকার মানুষের বাচ্চার মত হবে তখন ও আর আম্মুর পেটের ভেতর থাকতে চাইবে না। তখন ও কে ডাক্তাররা পেট থেকে বের করে আনবে।”

[৩] আরেকটা গল্প বলি, হ্যাঁ?

খুবই হিউমিলিয়েটিং সিচুয়েশন তাসনুভাদের বাসায়। প্রবলেম হলো ওর পিচ্চি ভাই খুব পাজি। ও কে রমাদানের মধ্যে একবার নাকি খেতে দেখেছে আর তা বাসার সবার কাছে বলে বেড়িয়েছে। এতে তাসনুভা ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলো। তাই এরপর থেকে আর রমাদানে সে ওইদিনগুলোতেও পারতপক্ষে কিছু খায় না। পর্যাপ্ত পানি আর মিনারেল না পাওয়ার কারণে কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে গেলো সে।

আচ্ছা, আরেকজন বাবার কথা বলি। রমাদান চলছে।

সাত বছরের শিশুকন্যা তার বাবাকে বললো, “বাবা একটা কথা চুপিচুপি শুনো। মামণি না আজ রোজা রাখে নি। আমি মামণিকে দেখেছি একটু আগে পানি খেতে।”

বাবা একটুও বিব্রত না হয়ে বললেন, “মা, তুমি পৃথিবীতে আসার আগে কোথায় ছিলে?”

“কেন আল্লাহর কাছে!”

“হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই! আল্লাহর কাছ থেকে পৃথিবীতে আসার মাঝখানে কোথায় ছিলে?”

মেয়ে এবার বুঝেছে। মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “মামণির ভেতরে।”

“আচ্ছা, তাহলে শুনো মামণি! মানুষের বাবু খুব দামী জিনিস না? যেমন আমাদের কাছে তুমি। তেমন বাবুটা পৃথিবীতে আসার আগে যেখানটায় থাকবে সে জায়গাটাও খুব পরিষ্কার হতে হয় না? না হলে তো ও অসুস্থ হয়ে পড়বে।” মেয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

“আর মা কারা হয় তা তো জানো। মেয়েরাই। সেজন্য প্রতি মাসেই মেয়েরা- যারা বড় হয়েছে- তাদের ভেতর বাবু রাখার যে থলেটা আছে সেটা ফেরেশতারা পরিষ্কার করে দেন। আর ময়লাগুলো যতক্ষণ না পরিষ্কার হচ্ছে ততক্ষণ তাদের নামাজ পড়তে হয় না, রোজা রাখতে হয় না।”

শিশুরা খুব বুদ্ধিমান, কৌতূহলী হয়। আমাদের দেশে শিশুদের সাথে এই বিষয়গুলোতে মিথ্যাচার পুরোপুরি জায়েজ করে রাখা আছে। যেন এটা একধরনের ‘হোয়াইট লাই’। কিন্তু কেন এমন হবে? কেন এই বিষয়গুলো সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়া হয় না শিশুদের? আমরা চাই বাচ্চারা সত্য কথা বলা শিখুক অথচ নিজেরাই মিথ্যা বলছি। আমাদের এই দ্বৈততা মোটেই কাম্য নয়। স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে ওরা প্রশ্ন করতেই পারে। আমাদের দরকার দায়িত্বশীলতার সাথে উত্তর দেওয়া।

উপরোক্ত বিষয়ে এক সচেতন মায়ের চিন্তা, “বাচ্চাদের আসলে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব বেশি বিস্তারিত দেয়া লাগে না। মোটামোটি একটা উত্তর দেয়া লাগে, যেই উত্তরগুলো অর্থবহ। বাকিটুকু ওরা নিজেরাই ভেবে বের করে, ক্রিয়েটিভ এক্সারসাইজ হয়। উত্তরগুলোতে কোন মিথ্যা থাকে না বলে নিজেদের মধ্যে কনফ্লিক্টে থাকে না, তাই যার তার কাছে উত্তরও খুঁজতে যায় না। আস্তে আস্তে যখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উত্তরগুলো জানে তখন সেগুলো নিয়ে ওভার অবসেশন তৈরি হয় না।”

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারেই এখন ইন্টারনেট অ্যাভেইলেবল। এই মুক্ত বিশ্বে আমরা ওদের বাধ দেবো কি দিয়ে? আপনার উপর বিশ্বাস না থাকলে আর কদিন পর শিশুটা আপনার কাছেও জানতে চাইবে না, সোজা গুগল সার্চ করবে। সে যে খালি দরকারী তথ্যটাই পাবে??? আপনি ভাবনা চিন্তা ছাড়া দায়সারা গোছের একটা উত্তর না দিয়ে একটু ভাবুন- আপনার শিশুর বয়স, মানস, পরিবেশ চিন্তা করে ওভারঅল একটা সত্য উত্তর দিন আর কিছুটা শিশুর ইমাজিনেশনের উপর ছেড়ে দিন!

বাবামায়েদের সচেতনতা কাম্য!

বিঃদ্রঃ সচেতন পাঠকের আলোচনা, সমালোচনা আশা করি। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করলে শেয়ার করবেন।

 

– রাহনুমা সিদ্দিকা


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button