সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

বিকৃত ধর্ম থেকে নাস্তিকতা

রোমান ক্যাথলিক চার্চের ছত্রছায়ায় সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদী রাজা বাদশারা বিকৃত খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে গোটা ইউরোপ জুড়ে।  ইউরোপের ‘রেনেসাঁ’ বা ‘পুনর্জাগরণ’ মূলত ক্যাথলিক চার্চের এই অন্ধ বিশ্বাসের শেকল ছিঁড়ে মুক্তচিন্তা, সংস্কার এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞান-গবেষণার জগতে তাদের প্রবেশের ইতিহাস নির্দেশ করে।

ইতোপূর্বে চার্চগুলো এই ধরণের যে কোনো বিজ্ঞানমনস্ক  স্বাধীন চিন্তাকে গলা টিপে হত্যা করতো। ক্যাথলিক চার্চের স্বীকৃত বিশ্বাসগুলোর যে কোনো দিক নিয়ে প্রশ্ন করলে তাকে “গোমরাহ” ও “পথভ্রষ্ট” হিসেবে অপবাদ দেওয়া হত এবং প্রায়ই খুঁটিতে বেধে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হত। চার্চের এই শাসনামলই পরবর্তীতে “অন্ধকার যুগ” (Dark Age) নামে কুখ্যাত হয়। এই রেনেসাঁ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নতুন দুটি ধারার সূত্রপাত ঘটে।

১. প্রথমটি হলো মার্টিন লুথার কিং (১৪৮৩-১৫৪৬), ক্যালভিন (১৫০৯-১৫৬৪) প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গের নেতৃত্বে ধর্মের সংস্কার আন্দোলন।
২. দ্বিতীয়টি ছিল ধর্মকে সম্পূর্ণ বর্জন করার আন্দোলন, যার কর্ণধার ছিলেন ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬) এর মতো ব্যক্তিবর্গ।

সংস্কার আন্দোলনটি পরবর্তীতে “প্রোটেস্টান্ট আন্দোলন” হিসেবে পরিচিত লাভ করে। এরা রোমান ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন আচার-প্রথা, কৃত্যানুষ্ঠান এবং চার্চের পুরোহিতবাদকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করে এবং বিশুদ্ধ খ্রিষ্টধর্মে ফিরে যাবার প্রয়াস চালায়। চার্চের নেতৃবৃন্দের সাথে তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় অনেক সংস্কারপন্থীকে চার্চ থেকে বহিষ্কার করা হয়, যার পথ ধরে ইউরোপজুড়ে এরা অনেক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং তারা নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এসব চার্চে যিশু খ্রিষ্টের মা মেরিকে আর উপাসনা করা হত না, কিংবা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার জন্য সাধু-সন্তদের মধ্যস্থতা গ্রহণ করা হত না। সংশোধিত এ ধর্মে চার্চের পুরোহিতরা বিয়ে করার অনুমতি লাভ করে। পোপের কর্তৃত্বকে এখানে আগের মতো ভুলের উর্ধ্বে বিবেচনা করা হত না।

অন্যদিকে, ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করার যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং ধর্মে বিশ্বাসের যৌক্তিকতা ও ধর্মের বৈধতা নিয়ে সন্দেহের তীর ছুড়তে শুরু করে। তৎকালীন সময়ে দর্শনের পাঠচক্রগুলোতে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার ব্যাপারটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো ইতিহাসে নাস্তিকতার ধারণাটি ব্যাপকমাত্রায় বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। প্রথমদিকে চুপিসারে এর প্রচার প্রসার শুরু হলেও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক তর্ক-বিতর্কে নাস্তিকতার আলোচনা স্থান পেতে থাকে।

ঘোষিত কিংবা অঘোষিত নাস্তিকতার যে ব্যপক ছয়লাব আজ আমরা বিশ্বব্যপি দেখতে পাই, এটাই হলো তার প্রসব বেদনার সময়কাল, এবং যার গর্ভধারিনী হলো ইউরোপ।

————–
সভ্যতার সংকট, ড. বিলাল ফিলিপস।
(SEAN Publication ফেসবুক পেজ)


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Back to top button