সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

ড্রোন এবং বাইয়াতে রিদওয়ান

১.

আচ্ছা আপনার কি ছোট কোন সন্তান আছে? অথবা চোট ভাই বা বোন?

যদি থাকে তাহলে তার কাজগুলো চিন্তা করুনতো। সারা ঘরময় সে আদুরে পায়ে হাঁটছে, খেলছে, পাকামো করে বেড়াচ্ছে। কখনও কখনও আহ্লাদী করে আপনার গলা জড়িয়ে ধরে বায়না করছে। “বাবা আজ তোমাকে যেতে দেবনা” কিংবা “মা আজ আজকে একটু পুডিং বানিয়ে দিও” ধরণের কত আবদার তার, অথবা “ভাইয়া আজ যদি আমাকে চকলেট কিনে না দিস তাহলে তোর সাথে আড়ি” এ জাতীয় কত কথা তার ভাইটির সাথে।

এবার চিন্তা করুন একটি সকালের কথা। আপনি ঘর থেকে বের হচ্ছেন। আপনার সেই সন্তানটি বা আপনার ছোট্ট বোনটি আপনার গলা জড়িয়ে ধরেছে আপনার সাথে যাবার জন্য। অনেক কষ্টে আপনি এই বলে যেতে পারলেন যে, “ঠিক আছে যা, তোর জন্য একটা চিপস নিয়ে আসব”। সারাদিন আপনি কাজ করলেন তবু মনটা যেন পড়ে রইলো ঘরের সেই ছোট্ট সদস্যটির কাছে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যায় যখন আপনি বাড়ী ফিরলেন তখন দেখলেন বাড়ীর যায়গায় বিশাল একটি কালো গর্ত, সমস্ত বাড়ী জ্বলে কয়লা হয়ে গেছে আর ছোট্ট সন্তান বা বোনটির নিথর দেহ পুড়ে কাঠ হয়ে গেছে। ক্ষত বিক্ষত হয়ে মরে পড়ে আছে বাড়ির বাকী সবাইও।

আল্লাহু আকবার, আপনার কি গা শিউরে উঠেনি?

এ রকম পরিস্থিতি নিছক কল্পনা নয়, বরং তা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ইরাক সহ মুসলিম জনপদগুলোয়। ড্রোন নামের এক বিধ্বংসী মানুষ বিহীন বিমান থেকে প্রাণঘাতী মিসাইল চালিয়ে ইয়াহুদী-নাসারা চক্র নির্বিচারে মেরে চলেছে মুসলিম জনপদের অসহায় মানুষগুলোকে। আজ যখন আপনি এ লেখাটি পড়ছেন তখন আপনারই কোন মুসলিম ভাই বা বোন এরকম অসহায় পরিস্থিতির শিকার হয়ে আল্লাহর কাছে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।

২.

হিজরী ৬ষ্ঠ সাল। ১৪০০ সাহাবা সাথে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাঃ মদীনা থেকে হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে চলেছেন। কারো কাছেই যুদ্ধাস্ত্র তেমন কিছু নেই। একসময় মক্কার কাছে হুদাইবিয়া নামের যায়গায় তিনি তাঁবু ফেললেন। ইতিমধ্যে মক্কার মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর আগমনের খবর পেয়ে তৎপর হয়ে উঠলো। আল্লাহর রাসুল সাঃ মক্কার খবর জানা এবং মুসলিমদের উদ্দেশ্য জানানোর জন্য উসমান (রাঃ) কে মক্কায় পাঠালেন। উসমান যখন মক্কায়, তখন একটি উড়ো খবর হুদাইবিয়ায় রাসুলের কাছে এলো যে মক্কায় উসমানকে হত্যা করা হয়েছে।

আরও দেখুন:  তারুণ্যের উদ্ভাবনীশক্তি ধ্বংসে পৌত্তলিক কু-সংস্কৃতি ও নারী!

খবরটি পাবার পর রাসুলুল্লাহ সাঃ ১৪০০ সাহাবীকে ডাকলেন। তিনি তাদের বললেন, “আল্লাহর শপথ, উসমানের হত্যার বদলা না নিয়ে আমরা কেউ ফিরে যাবনা। এসো তোমরা সবাই আমার হাতে বাইয়াত করো”। একে একে ১৪০০ সাহাবা রাসুলের হাতে বাইয়াত করলেন। সহীহ বুখারীতে জাবির বিন আবদুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো “আপনারা হুদাইবিয়াতে রাসুলুল্লাহর হাতে কিসের উপর বাইয়াত করেছিলেন”? তিনি বললেন “মৃত্যুর উপর”। একজন মাত্র মুসলিম হত্যার বদলা নিতে এমনকি রাসুলুল্লাহ সাঃ নিজে সহ ১৪০০ উপস্থিত সাহাবী নিজেদের জীবন দেবার শপথ করেছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজে এই বাইয়াত বা শপথের ব্যাপারে অসাধারণ ভাষায় নিজের সন্তুষ্টির কথা বলেছেন-

“যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে তারা আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে”। – (সুরা ফাতাহ-১০)

ইতিহাসে এ শপথ বাইয়াতে রিদওয়ান নামে পরিচিত।

৩.

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন “মুমিনরা হলো একটি দেহের মতো, এর একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হলে পুরো শরীর জ্বর অনুভব করে” (মুসলিম)।

আজ আমরা পার করছি সেসব দিন, যখন ড্রোনের তীব্র আঘাতে আমাদের মুসলিম ভাইদেরকে মারার পরও আমাদের কোন ভাবান্তর হয়না। অসহায় পিতা যখন তার পোড়া শিশুটির লাশকে বুকে চেপে ধরে, তখন আমরা বলি “এটা তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার”।

এদেশে একটি বাল্য বিবাহ ‘ভিক্টিম’ ধরতে পারলে অনেকের কলমে যেন রক্তের ধারা ছুটে, কারো আবার মুখের ভাষায় বজ্রপাত হয়, কিন্তু হাজার হাজার মুসলিম বিনা বিচারে মেরে ফেললে এদের কলম আর মুখ থাকে বন্ধ বরং এরা গোপনে নিজেরা বেঁচে থাকার জন্য উৎফুল্ল হয়।

আমাদের জেনে রাখা উচিৎ হবে যে- এ ইসলাম ইসলাম নয় এবং বড় ভয়ংকর সময় হয়ত সামনে অপেক্ষা করছে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, যাঁর অনন্ত ক্ষমা ছাড়া আমাদের মুক্তির কোন পথ নেই।

আরও দেখুন:  হিংসা ও প্রতিহিংসা

৩০/৪/১২

– আবু উসাইদ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button