আকাইদ

আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করা

মানব জাতির সাফল্য লাভের অন্যতম উপায় হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে কেবল কুরআন-হাদীছকে মেনে নেওয়া।

মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيعُوْهُ تَهْتَدُوْا وَمَا عَلَى الرَّسُوْلِ إِلَّا الْبَلاَغُ الْمُبِيْنُ ‘বল! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। আর তোমরা তাঁর আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, রাসূলের কর্তব্য হচ্ছে শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া’ (নূর ২৪/৫৪)

রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করা এবং তাঁর অনুসরণে ছালাত প্রতিষ্ঠা করা ও যাকাত দেওয়ার মধ্যেই মানব জীবনে শান্তি ফিরে আসবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَأَقِيْمُوا الصَّلاَةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ- ‘তোমরা ছালাত ক্বায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার’ (নূর ২৪/৫৬)

রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করলে, আল্লাহরই আনুগত্য করা হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, مَنْ يُّطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ  ‘যে কেউ রাসূলের আনুগত্য করে থাকে, নিশ্চয়ই সে আল্লাহরই আনুগত্য করে থাকে’ (নিসা ৪/৮০)

মানব জাতির জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলেরই আনুগত্য করা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرُدُّوْهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُوْلِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيْلاً- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো ও রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের অন্তর্গত ‘ঊলুল আমর’ তথা আদেশ দাতাগণের। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে ম­তবিরোধ দেখা দেয়, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাক। এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর সমাধান’ (নিসা ৪/৫৯)

মানব জীবনের সকল প্রকার আমল কুরআন-হাদীছ মোতাবেক হ’তে হবে। এর মাঝেই মানবতার সার্বিক সফলতা নিহিত আছে। আর আমল কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণে না হ’লে তা নিঃসন্দেহে বাতিল বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَلاَ تُبْطِلُوْا أَعْمَالَكُمْ- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য কর, আর (তা না করে) তোমাদের আমল সমূহ বিনষ্ট করো না’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)। রাসূল (ছাঃ) যা করতে আদেশ দিয়েছেন তা গ্রহণ করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা হ’তে তোমাদের নিষেধ করেন তা হ’তে বিরত থাকো’ (হাশর ৫৯/৭)

মানুষকে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ফায়ছালা গ্রহণ করতে হবে, তাহ’লে তারা সফলকাম হবে। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করলে পথভ্রষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاَ مُبِيْنًا ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফায়ছালা করলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর নিজেদের ব্যাপারে অন্য কোন সিদ্ধান্তের ইখতিয়ার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে’ (আহযাব ৩৩/৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ وَلاَ تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ-  ‘আর এটাই আমার সরল পথ, সুতরাং তোমরা এ পথেরই অনুসরণ। এ পথ ছাড়া অন্য কোন পথের অনুসরণ করো না। অন্যথা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দিবে। আল্লাহ তোমাদেরকে এই নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা বেঁচে থাকতে পার’ (আন‘আম ৬/১৫৩)

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (ছাঃ)-এর অমিয় বাণী গ্রহণ করলে বিশ্বের পথহারা মানুষ সঠিক পথ পাবে। মহান আল্লাহ বলেন, فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوْا فِيْ أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা কখনও মুমিন হ’তে পারবে না, যে পর্যন্ত তোমাকে তাদের আভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক হিসাবে মেনে না নিবে, তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করবে এবং ওটা শান্তভাবে পরিগ্রহণ না করবে’ (নিসা ৪/৬৫)

আল্লাহ এবং রাসূল (ছাঃ)-কে অনুসরণের মাধ্যমেই মানব জাতি সর্বোত্তম মর্যাদা পাবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُوْلَئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِيْنَ وَحَسُنَ أُوْلَئِكَ رَفِيْقًا ‘আর যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, তবে তারা ঐ ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নবীগণ, সত্য সাধকগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ। আর এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী’ (নিসা ৪/৬৯)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধাচরণ করবে সে জাহান্নামে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيْرًا ‘আর সুপথ প্রকাশিত হওয়ার পর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং বিশ্বাসীগণের বিপরীত পথের অনুগামী হয়, তবে সে যাতে অভিনিবিষ্ট আমি তাকে তাতেই প্রত্যাবর্তিত করব ও তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব এবং এটা নিকৃষ্টতর প্রত্যাবর্তন স্থল’ (নিসা ৪/১১৫)

কুরআন এবং ছহীহ হাদীছের কথা শুনার সাথে সাথে তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই মানব জাতির সফলতা। মহান আল্লাহ বলেন,  إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِيْنَ إِذَا دُعُوْا إِلَى اللهِ وَرَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ، وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَيَخْشَ اللهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُوْنَ- ‘মুমিনদের উক্তি তো এই, যখন তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তখন তারা বলবে, আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম, আর তারাই সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হ’তে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম’ (নূর ২৪/৫১-৫২)

আরও দেখুন:  সঠিক আক্বীদাই পরকালীন জীবনে মুক্তির উপায়

আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে, বিরুদ্ধাচরণ করলে জাহান্নামে যেতে হবে। যেমন হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত যে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, كُلُّ أُمَّتِىْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ، إِلاَّ مَنْ أَبَى. قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَنْ يَأْبَى، قَالَ مَنْ أَطَاعَنِىْ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ أَبَى- ‘আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে (সে নয়)। তারা বললেন, কে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সেই অস্বীকার করে’ (বুখারী হা/৭২৮০)

কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করলে মানুষ সঠিক পথ পাবে, বিরোধিতা করলে পথভ্রষ্ট হবে। হুযায়ফাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, يَا مَعْشَرَ الْقُرَّاءِ اسْتَقِيْمُوْا فَقَدْ سُبِقْتُمْ سَبْقًا بَعِيْدًا فَإِنْ أَخَذْتُمْ يَمِيْنًا وَشِمَالاً، لَقَدْ ضَلَلْتُمْ ضَلاَلاً بَعِيْدًا ‘হে কুরআন পাঠকারীগণ! তোমরা (কুরআন ও সুন্নাহর উপর) সুদৃঢ় থাক। নিশ্চয়ই তোমরা অনেক পশ্চাতে পড়ে আছ। আর যদি তোমরা ডান দিকের কিংবা বাম দিকের পথ অনুসরণ কর, তাহ’লে তোমরা সঠিক পথ হ’তে বহু দূরে সরে পড়বে’।[1]

কুরআন-সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরলেই মানব জাতি ধ্বংসের পথ থেকে বেঁচে যাবে। আবূ মূসা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ‘আমার ও আমাকে আল্লাহ যা কিছু দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হ’ল এমন যে, এক লোক কোন এক কওমের নিকট এসে বলল, হে কওম! আমি নিজের চোখে সেনাবাহিনীকে দেখে এসেছি। আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী। কাজেই তোমরা আত্মরক্ষার চেষ্টা কর। কওমের কিছু লোক তার কথা মেনে নিল, সুতরাং রাতের প্রথম প্রহরে তারা সে জায়গা ছেড়ে রওনা হ’ল এবং একটি নিরাপদ জায়গায় গিয়ে পৌঁছল। ফলে তারা রক্ষা পেল। তাদের মধ্যকার আর এক দল লোক তার কথা মিথ্যা মনে করল, ফলে তারা নিজেদের জায়গাতেই রয়ে গেল। সকাল বেলায় শুত্রুবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করল ও তাদের ধ্বংস করে দিল এবং তাদের মূল উৎপাটিত করে দিল। এটা হ’ল তাদের উদাহরণ যারা আমার আনুগত্য করে এবং আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করে। আর যারা আমার কথা অমান্য করে তাদের দৃষ্টান্ত হ’ল, আমি যে সত্য (বাণী) নিয়ে এসেছি তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা’।[2]

কুরআন-সুন্নাহকে মযবুতভাবে অাঁকড়ে না ধরলে এবং নিজের খেয়াল-খুশীমতে চললে মানুষ অবশ্যই পথভ্রষ্ট হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيْبُوْا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللهِ إِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِيْنَ-  ‘অতঃপর যদি তারা তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহ’লে জানবে যে, তারা তো শুধু নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে পথ-নির্দেশ করেন না’ (ক্বাছাছ ২৮/৫০)। অন্যত্র তিনি বলেন, أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلٰهَهُ هَوَاهُ  ‘তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে’? (জাছিয়া ৪৫/২৩)

কুরআন-সুন্নাহ জানার পরেও যদি কোন ব্যক্তি নিজের খেয়াল-খুশিমত চলে এবং সত্য বিষয় জানার পরেও যদি অধিকাংশ মানুষ যেদিকে চলছে সেদিকে চলে, তাহ’লে সে পথভ্রষ্ট হবে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوْكَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ إِنْ يَتَّبِعُوْنَ إِلاَّ الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلاَّ يَخْرُصُوْنَ-  ‘তুমি যদি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথার অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হ’তে বিভ্রান্ত করে ফেলবে, তারা তো নিছক ধারণা ও অনুমানেরই অনুসরণ করে। আর তারা ধারণা ও অনুমান ছাড়া কিছুই করছে না’ (আন‘আম ৬/১১৬)

নিজের খেয়াল-খুশীমত চললে মানুষ কখনও সঠিক পথ পেতে পারে না। এজন্য মহান আল্লাহ বলেন, يَا دَاوُوْدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيْفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلاَ تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ إِنَّ الَّذِيْنَ يَضِلُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيْدٌ بِمَا نَسُوْا يَوْمَ الْحِسَابِ-  ‘হে দাঊদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। কেননা এটা তোমাকে আল্লাহর পথ হ’তে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহর পথ পরিত্যাগ করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কারণ তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে’ (ছোয়াদ ৩৮/২৬)

ইবলীসের দিকে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, নিজের খেয়াল-খুশিমত চলার ফলে তার পরিণতি কি হয়েছিল? মহান আল্লাহ বলেন, قَالَ يَا إِبْلِيْسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْعَالِيْنَ، قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِيْ مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِيْنٍ، قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيْمٌ، وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِيْ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ- ‘তিনি বললেন, হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হ’তে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। তিনি বললেন, তুমি এখান হ’তে বের হয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত এবং তোমার উপর আমার লা‘নত স্থায়ী হবে প্রতিদান দিবস পর্যন্ত’ (ছোয়াদ ৩৮/৭৫-৭৮)

উপরোক্ত আয়াত থেকে মানুষের শিক্ষা নেওয়া উচিত। আর কুরআন-সুন্নাহকে মযবূত করে অাঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই তারা সাফল্য ফিরে পাবে। সেই সাথে যারা কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনপণ করেছে তাদের সাহায্য করতে হবে।

আরও দেখুন:  তাওহীদের গুরুত্ব ও শিরকের ভয়াবহতা

বেলাল বিন সা‘আদ বলেন, তিনটি বিষয় কোন আমলে পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা হবে না। তাহ’ল শিরকী ও কুফরী (কাজ) এবং নিজের রায় মত চলা (নিজের ইচ্ছা মত আমল করা)। আমি বললাম, হে আবূ ওমর! রায় কি জিনিস? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে নিজের ইচ্ছামত বলা এবং আমল করা।[4]

অকী‘ (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি হাদীছ যেভাবে এসেছে সেভাবে অন্বেষণ করে, তাহ’লে জানবে সে সুন্নাতের অনুসারী। আর যে ব্যক্তি হাদীছ অন্বেষণ করবে তার রায়কে (মতকে) শক্তিশালী করার জন্য তাহ’লে জানবে সে বিদ‘আতী।[5]

মানুষ অনেক বিদ‘আতী কাজ করে থাকে। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছে, مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا، فَهْوَ رَدٌّ ‘যে কেউ এমন কোন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের অনুমোদন নেই তা প্রত্যাখ্যাত’।[6] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে নেই এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, তা প্রত্যাখ্যাত’।[7]

ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, তোমরা কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ কর, বিদ‘আত কর না, (কুরআন-সুন্নাহই) তোমাদের জন্য যথেষ্ট এবং প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত জিনিসই বিদ‘আত। আর প্রত্যেক বিদ‘আত ভ্রষ্টতা।[8]

গাযীফ বিন হারেছ বলেন, বিদ‘আতী কাজ করলে তার স্থানে (আমলকৃত) সুন্নাতটি ছেড়ে দেওয়া হয়’।[9]

কুরআন-সুন্নাহর অনুসারীদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيْبًا وَسَيَعُوْدُ غَرِيبًا فَطُوْبَى لِلْغُرَبَاءِ  ‘ইসলাম শুরু হয়েছিল গুটিকতক লোকের মাধ্যমে, আবার সেই অবস্থা প্রাপ্ত হবে। অতএব সুসংবাদ সেই অল্প সংখ্যক লোকদের জন্য (যারা কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করে)।[10]

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক সৎ আমলের দিকে মানুষকে আহবান জানালে অশেষ ছওয়াব রয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলাম বিরোধী বা বিদ‘আতের দিকে মানুষকে ডাকলে তার জন্য গোনাহ রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُوْرِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُوْرِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا- ‘যে ব্যক্তি কাউকে সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সেই পরিমাণ নেকী রয়েছে, যে পরিমাণ নেকী তার কথার অনুসারী ব্যক্তি পাবে এবং তার নেকীর সামান্য পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি কাউকে বিভ্রান্তির পথে ডাকে তার জন্য সেই পরিমাণ পাপ রয়েছে, যে পরিমাণ পাপ তার কথার অনুসারী ব্যক্তি পাবে, তার পাপ থেকে সামান্য পরিমাণও কমানো হবে না’।[11]

যারা আল্লাহ ও রাসূলের অনুসারী তথা কুরআন-হাদীছ মেনে চলবে না, ক্বিয়ামতের দিন তারা আফসোস করবে এবং তাদেরকে যারা বিভ্রান্ত করেছিল, সেসব অনুসৃত লোকদের দ্বিগুণ শাস্তি কামনা করবে। মহান আল্লাহর বাণী, يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُوْلُوْنَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُوْلاً، وَقَالُوْا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّوْنَا السَّبِيْلاً، رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيْرًا-  ‘যে দিন তাদের মুখমন্ডল অগ্নিতে উলটপালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও রাসূলকে মানতাম! তারা আরো বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন এবং তাদেরকে দিন মহা অভিশাপ’ (আহযাব ৩৩/৬৬-৬৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا رَبَّنَا أَرِنَا اللَّذَيْنِ أَضَلاَّنَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُوْنَا مِنَ الْأَسْفَلِيْنَ- ‘কাফেররা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! যেসব জ্বিন ও মানব আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল তাদের উভয়কে দেখিয়ে দিন, আমরা উভয়কে পদদলিত করবো, যাতে তারা নিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়’ (হা-মী-ম সাজদাহ ৪১/২৯)

উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে অনুমিত হয় যে, সকল কল্যাণ নিহিত আছে কুরআন-সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরার মধ্যে এবং সকল শাস্তি নিহিত আছে কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে বাপ-দাদার পদাঙ্ক অনুসরণের মধ্যে। অথচ আজকে মানুষ কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে বাপ-দাদার কৃষ্টি-কালচার অনুসরণ করছে, ব্যক্তিপূজা করছে, ইমামগণ যা বলেছেন, সেটারই তাক্বলীদ করছে, যদিও তার নিকট কুরআন-সুন্নাহ মওজুদ রয়েছে। কোন মাসআলায় ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হ’লেও যদি তা ইমামের কথার বিপরীত হয় তাহ’লে হাদীছের উপর আমল না করে ইমামের রায় মেনে চলে, বাপ-দাদার কৃষ্টির উপরেই থাকার চেষ্টা করে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُوْلِ قَالُوْا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لاَ يَعْلَمُوْنَ شَيْئًا وَلاَ يَهْتَدُوْنَ- ‘আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান সমূহের দিকে এসো এবং রাসূলের দিকে এসো, তখন তারা বলে, আমাদের জন্য ওটাই যথেষ্ট, যার উপর আমাদের বাপ-দাদাদেরকে পেয়েছি; যদিও তাদের বাপ-দাদারা না কোন জ্ঞান রাখতো, আর না হেদায়াত প্রাপ্ত ছিল’ (মায়েদাহ ৫/১০৪)

অন্যত্র তিনি বলেন, بَلْ قَالُوْا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُهْتَدُوْنَ، وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِيْ قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيْرٍ إِلاَّ قَالَ مُتْرَفُوْهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُوْنَ-  ‘বরং তারা বলে, আমরাতো আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের উপর এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে হেদায়াতপ্রাপ্ত। অনুরূপ তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন ওর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলতো আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের উপর এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি’ (যুখরুফ ৪৩/২২-২৩)

এ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, বাপ-দাদার কৃষ্টি-কালচার কি ছিল সেটার দিকে লক্ষ্য না করে  এবং কোন ব্যক্তি পূজা না করে কুরআন ও সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে অাঁকড়ে ধরতে হবে। যেমন ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমি দেখছি তারা অচিরেই ধ্বংস হবে। কেননা আমি বলছি, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন। কিন্তু ওরা বলছে, আবু বকর ও ওমর (রাঃ) নিষেধ করছেন।[12] অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। কারণ আমি বলছি, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, অথচ তোমরা বলছ, আবু বকর ও ওমর (রাঃ) বলেছেন।[13]

আরও দেখুন:  তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাত

ইমামগণও মানুষকে কুরআন হাদীছ অাঁকড়ে ধরার জন্য বলেছেন। যেমন ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও রাসূল (ছাঃ)-এর কথার (সুন্নাহ) বিরোধী কোন কথা বলে থাকি, তাহ’লে আমার কথাকে ছুড়ে ফেলে দিও’।[14] তিনি আরো বলেন, إذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ ‘যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব’।[15]

ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, السنة سفينة نوح من ركبها نجا، ومن تخلف عنها غرق،  ‘সুন্নাত হ’ল নূহ (আঃ)-এর নৌকা সদৃশ। যে তাতে আরোহণ করবে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যে তা থেকে পিছে অবস্থান করবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে’।[16]

তিনি আরো বলেন, আমি একজন মানুষ মাত্র। আমি ভুল করি, আবার ঠিকও করি। অতএব আমার সিদ্ধান্তগুলো তোমরা যাচাই কর। যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে হবে সেগুলো গ্রহণ কর। আর যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিকূলে হবে তা প্রত্যাখ্যান কর’।[17]

ইমাম শাফঈ (রহঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর কথার উপর অন্য কারো কথা চলবে না, এর উপর সকল মানুষ ঐক্যমত পোষণ করেছেন। এরপর বলেন, আমার কথা যখন কোন ছহীহ হাদীছের বিরোধী হবে তখন আমার কথাকে দেয়ালে ছুড়ে ফেল এবং ছহীহ হাদীছের উপর আমল কর।[18]

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, আশ্চর্য লাগে ঐ সকল সম্প্রদায়কে যারা ছহীহ হাদীছ ও (হাদীছের) ছহীহ সনদ জানার পরেও (মানুষকে) ছুফিয়ান ও অন্যান্য (ইমামদের) রায় গ্রহণ করার জন্য ডাকে এবং সে রায়ের দিকেই যেতে বলে। এরূপ করা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ। একাজের পরিণতি ভয়াবহ।[19]

আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন, فَلْيَحْذَرِ الَّذِيْنَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيْبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ ‘সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর কঠিন শাস্তি’ (নূর ২৪/৬৩)

উপরের আলোচনা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, কুরআন-সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অাঁকড়ে ধরলে তারা কখনও লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হবে না। তাছাড়া সকল ইমামই কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করে গেছেন এবং সকলকে কুরআন-সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরতে বলেছেন। তাঁরা তাঁদের কোন কথা কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হ’লে, তাদের কথা ছুড়ে ফেলে কুরআন-সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অাঁকড়ে ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং ব্যক্তিপূজা ও মাযহাবী গোঁড়ামি করতে নিষেধ করেছেন।

অপরদিকে রাসূল (ছাঃ) মানুষের মুক্তির জন্য দু’টি জিনিস রেখে গেছেন। তিনি বলেন, تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ ‘আমি তোমাদের নিকট দু’টি বস্ত্ত ছেড়ে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা ঐ দু’টি বস্ত্তকে মযবূতভাবে ধরে থাকবে, ততদিন (তোমরা) পথভ্রষ্ট হবে না। সে দু’টি বস্ত্ত হ’ল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাত’।[20]

সুতরাং যখন কেউ কোন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখবে  তখন সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের অনুসরণ করবে। যেমন নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে থেকে যারা জীবিত থাকবে, তারা অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব (মতপার্থক্যের সময়) আমার সুন্নাত এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের অনুসরণ করা হবে তোমাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। এ সুন্নাতকে খুব মযবূতভাবে মাড়ির দাঁত দিয়ে অাঁকড়ে ধরে থাকবে। আর সমস্ত বিদ‘আত থেকে বিরত থাকবে। কেননা প্রত্যেকটি বিদ‘আতই গুমরাহী (ভ্রষ্টতা)’।[21]

বিদ‘আতের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, من ابتدع في الإسلام بدعة يراها حسنة، فقد زعم أن محمداً خان الرسالة، لأن الله يقول : اليوم أكملت لكم دينكم، فما لم يكن يؤمئذ ديناً، فلا يكون اليوم ديناً ‘যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে বিদ‘আত চালু করে তাকে উত্তম মনে করে, সে যেন ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) রিসালাতের দায়িত্বে খিয়ানত করেছেন। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নে‘মতকে পরিপূর্ণ করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)[22]

– হাফেয আব্দুল মতীন



[1]. বুখারী হা/৭২৮২

[2]. বুখারী হা/৭২৮৩

[4]. আল-হারুবী, যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি, ২/২৫৯-৬০

[5]. আল-হারুবী, যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি, ২/২৬৯-৭০

[6]. বুখারী হা/২০; মুসলিম হা/১৭১৮

[7]. মুসলিম হা/১৭১৮

[8]. আল-হারুবী, যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি, ২/১৬৫

[9]. ইবনুল বাত্তাহ, শরহুল ইবানাহ, পৃঃ ১৪৩, সনদ জাইয়্যেদ

[10]. মুসলিম, মিশকাত হা/১৫৯

[11]. মুসলিম, আবূ দাঊদ হা/৪৬১১; ইবনু মাজাহ হা/২০৮; মিশকাত হা/১৫৮, সনদ ছহীহ

[12]. ইবনু আব্দিল বার্র, জামিউ বয়ানিল ইলম ও ফাযলিহী, ২/১২১০; যিয়াউদ্দীন আল-মাকদেসী, আল-আহদীছুল মুখতারাহ, ১০/৩৩১, সনদ হাসান

[13]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়া, ২০/২১৫, ২৫১

[14]. মাজমূউর রাসায়েল আল-মুনীরিয়া, ১/২৫-২৬

[15]. ইবনু আবেদীন, রদ্দুল মুহতার ১/১৬৭

[16]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়া, ৪/১৩৭

[17]. শাওকানী, আল-কওলুল মুফীদ ফী আদিল্লাতিল ইজতেহাদি ওয়াত তাকলীদ, পৃঃ ১৬; ইবনু হাযম, আল-আহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/৫৯-৬০, সনদ হাসান

[18]. ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন, ৪/২৩৩; মাজমূউর রাসায়েল আল-মুনীরিয়া, ১/২৭

[19]. ইবনুন নাজ্জার, শারহুল কাওকাবুল মুনীর ৪/৫৯০

[20]. মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৮৬, সনদ হাসান

[21]. আবূ দাঊদ হা/৪৬০৭, সনদ ছহীহ

[22]. তাফসীরুল উশরিল আখির, পৃঃ ৭৪

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button