সংবাদ

ভারতের ভয়ে ইসলামী রাষ্ট্র হয়নি বাংলাদেশ…

ভারতের ভয়ে ইসলামি রাষ্ট্র করেননি মোশতাক
উৎস: দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ

ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের ভয়ে বাংলাদেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত থেকেছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রের বেসামরিক নেতা খন্দকার মোশতাক। তিনি এমনকি মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ১৯৭২ সালের বহুল আলোচিত মৈত্রী চুক্তিকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৫ আগস্টের পর ভারত সীমান্তে সেনা মোতায়েন করার ফলে মোশতাক সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রতিবেদনের বরাতে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের সদ্য প্রকাশিত মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড বইতে এসব তথ্য ছাপা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট খুনি চক্রের পক্ষে মেজর শরিফুল হক ডালিম বেতার ভাষণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পাল্টিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো দ্রুততার সঙ্গে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে’ স্বীকৃতি দেন এবং সৌদি আরবসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছেও পাকিস্তানকে অনুসরণের আবেদন জানান। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ভুট্টোর ভুল ভাঙে। তারা বিবেচনায় নেয় যে, ভারতকে চটিয়ে মোশতাক চক্র ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। সে কারণে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদ ওয়াশিংটনে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে জানিয়েছিলেন, নতুন সরকার তাদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা চাইছে। কিন্তু তারা ঢাকাকে পরামর্শ দিয়েছে যে, ভারতকে তাদের বিরক্ত করা উচিত হবে না।

ওই বইতে উল্লেখ আছে, পঁচাত্তরের ২২ আগস্ট সিআইএর এক প্রতিবেদন বলেছে, ‘ভারত সীমান্ত সিল করেছে এবং সন্নিহিত এলাকায় পুলিশ ও সেনা ইউনিট মোতায়েন করেছে। কিন্তু ভারতে মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, এ পদক্ষেপ শুধুই সম্ভাব্য কোনো আকস্মিক অবস্থা মোকাবিলার জন্য। বাংলাদেশের হিন্দুরা ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে শঙ্কিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি সামলাতেই ভারতের ওই পদক্ষেপ।

‘ভারতীয়রা সম্ভবত বাংলাদেশে তেমন মাত্রায় অস্থিতিশীলতা না ঘটলে কিংবা নতুন সরকার কঠোরভাবে ভারতবিরোধী নীতি অনুসরণ না করলে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। মোশতাককে ভারতের প্রতি কিছুটা শীতল হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আবার ফিরে এসেছিল। কিন্তু নতুন সরকার তার সীমান্তবর্তী বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশীকে বিরক্ত না করার নীতি গ্রহণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে “ইসলামি প্রজাতন্ত্র” করার উদ্যোগ নিয়েও তারা সেখান থেকে সরে এসেছে।’

আরও দেখুন:  দেশে প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য যত ঘটনা - ২০১২

পঁচাত্তরের ২৯ আগস্ট অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নতুন সরকার অব্যাহতভাবে ভারতকে আশ্বস্ত করে চলেছে যে, তার সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক বজায় রেখে চলাই তার লক্ষ্য। ভারতীয়রা, বিশেষ করে মোশতাক সরকারের ইসলামি ভাবধারার দিকে ঝুঁকে পড়ায় উদ্বিগ্ন। এটা মুজিব সরকারের নীতি থেকে একটু বিচ্যুতি। মুজিব ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এখন ইসলামীকরণের ফলে বাংলাদেশের এক কোটি হিন্দুর পালিয়ে পূর্ব ভারতে আশ্রয় নেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নয়াদিল্লিকে আশ্বস্ত করতে নতুন সরকার বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতেও আগ্রহী। আর তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার দরকারও আছে, যদি তারা ইসলামি দেশের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’

পঁচাত্তরের ৫ সেপ্টেম্বর সিআইএর আরেকটি প্রতিবেদন বলেছে, মোশতাক ও তাঁকে পৃষ্ঠপোষকতাদানকারী সামরিক কর্মকর্তারা অবগত রয়েছেন যে, ভারতের শুভেচ্ছা তাঁদের দরকার এবং তাঁরা সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বুঝতে পেরেছে যে, প্রধানমন্ত্রী গান্ধী যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলাদেশে একটি সেনা হস্তক্ষেপ ভারতীয় স্বার্থের জন্য দরকার, তাহলে ভারত এখনো সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ এটাও অবগত যে, নয়াদিল্লির প্রতি কম অনুকূল নীতি গ্রহণের ফলে ভারত তাদের সন্দেহের চোখে দেখবে। ভারতের কথা মনে রেখেই ঢাকার সরকার বাংলাদেশকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা থেকে বিরত থেকেছে। এর পর পরই মোশতাক প্রধানমন্ত্রী গান্ধীর কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আশ্বাসসূচক বার্তা পাঠিয়েছেন। ভারতকে নির্দিষ্টভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান মৈত্রী চুক্তি এখনো দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ভারতীয়রা তাদের পক্ষ থেকে নতুন সরকারের পদক্ষেপগুলো ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে চলবে। তবে বর্তমানে ঢাকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে ভারত সচেষ্ট থাকবে।

পঁচাত্তরের ১৯ সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা পরিবর্তন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সিআইএ বলেছে, ‘মোশতাক এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও ভাবছেন। সম্ভবত তিনি ভারতীয় ও সোভিয়েত হস্তক্ষেপ থেকে তাঁর দেশকে রক্ষা করার ব্যাপারে চীনের ওপর ভরসা করছেন না। সোভিয়েত ও ভারতীয়দের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মোশতাকের উদ্বেগ সম্ভবত যথার্থ। কিন্তু ইসলামাবাদ কিংবা পিকিংয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা দৃশ্যত সুদূরপরাহত। মোশতাক উপলব্ধি করছেন যে, ভারতকে তাঁর অবশ্যই দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না। ভারত বাংলাদেশে যাতে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ না করে তার জন্য তিনি নয়াদিল্লিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সম্মত রাখছেন। ভারতীয়রা ইতিমধ্যেই মোশতাক সরকারের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা তার সরকারকে মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষ ভারতপন্থী সরকার থেকে একটি বিচ্যুতি হিসেবে দেখছে। যদিও মোশতাক মুজিব শাসনামলের ঘনিষ্ঠতা পরিহার করা থেকে ইতিমধ্যেই কিছুটা দূরে সরে এসেছেন। কিন্তু তার পরও মস্কো যাতে বিরূপ না হয়, সেদিকেও মোশতাক নজর রাখছেন। সামরিক বিমানের জন্য মোশতাক মস্কোর ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছেন।’

আরও দেখুন:  পিস টিভি বন্ধ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

বই পরিচিতি: মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড, মিজানুর রহমান খান, প্রথমা প্রকাশন, আগস্ট ২০১৩।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button