সংবাদ

মুসাফিরদের প্রতি এত আবেগ এত ভালোবাসা

এমন দৃশ্য কেউ কখনও দেখেনি। চোখে না দেখলে এ দৃশ্য কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। আল্লাহ ও তার রাসুলের অবমাননার প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের ডাকে ঢাকায় আগত লংমার্চ কাফেলাকে খাদ্য, পানীয় এবং চিকিত্সাসেবা দেওয়ার এক অভাবনীয় দৃশ্য। রিকশাচালক, ঠেলাগাড়িচালক, কাঠমিস্ত্রি আড়তদার থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ সবাই এবং সাধারণ মানুষ যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী পানি, বিস্কুট, চিড়া, মুড়ি, কলা, পাউরুটি, শসা, গাজর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফল এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন আল্লাহর মেহমানদের সেবায়। মোড়ে মোড়ে খাবারের স্তূপ জমেছে। লংমার্চে আসা মেহমানদের একটু স্বস্তি দিতে এ যেন এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। চোখে পানি এসে যায়। আল্লাহ, তার প্রিয় রাসুল এবং মহান আদর্শ ইসলামের প্রতি এদেশের মানুষের এত আবেগ, এত ভালোবাসা! অবাক বিস্ময়ে দেখেছে সবাই।
গতকালের লংমার্চ পরবর্তী মহাসমাবেশের শুরু আর শেষ কোথায় ছিল তা কেউ জানে না। তবে সমাবেশস্থল এবং এর চারপাশে যেখানে যান না কেন চোখে পড়েছে কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে আছে পানি ও খাবার নিয়ে। কেউবা দাঁড়িয়ে ছিলেন টিস্যু হাতে। রিকশাচালক আমজাদকে দেখা গেল ফকিরাপুলে টিস্যু তুলে দিচ্ছে ইসলামি কাফেলার সদস্যদের হাতে; যেন তারা এই প্রচণ্ড গরমে মুখের ঘাম অন্তত মুছতে পারেন।
দৈনিক বাংলার মোড়ে পানি খাওয়াচ্ছিলেন আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেনের আবেগের যেন শেষ নেই—‘কারবালায় নবীর বংশধররা পানি পায়নি। এবার ঘরে বসে থাকতে পারিনি। রাসুলের সম্মান এবং ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে নিজের হাতে পানি দিতে পেরে ভালো লাগছে। দুনিয়ার লাভের জন্য এখানে আসিনি। মনের ডাকে এসেছি আমি। কেয়ামতের দিন আল্লাহ যদি জিজ্ঞেস করেন ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে কী করেছ? তখন তো আমি বলতে পারব, আমার সামর্থ্যে যা ছিল তা করেছি।’
আনোয়ার হোসেনের মতো অনেককে দেখা গেছে পানির পাশাপাশি শরবত এবং জুস খাওয়াতে।
‘ভাই একটু শরবত নিন, ঠাণ্ডা পানি নিন’—মগবাজার মোড়ে লংমার্চে আগত মুসল্লিদের এভাবেই কয়েক যুবক আহ্বান জানান। সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মুসল্লিরা ‘নারায়ে তাকবির/আল্লাহু আকবর’, ‘নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে যখন মতিঝিলের সমাবেশস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন যুবকরা তাদের দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছিলেন। মুসল্লিরা পানি খেয়ে স্লোগান দিতে দিতে সমাবেশের দিকে এগিয়ে যান।
এ দৃশ্য শুধু মগবাজারের নয়, কাকরাইল, পল্টনসহ যেদিকে সমাবেশ ছড়িয়ে পড়েছে সেদিকেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরবত, পানি, খাবার স্যালাইন ও শুকনো খাবারের ডালি নিয়ে এগিয়ে গেছে। এর সঙ্গে আর ছিল তরমুজ, শসা। মুসল্লিদের ঘাম মুছতে টিস্যু পেপারের ছিল না কোনো ঘাটতি। এসব নিয়ে সমাবেশে আগতদের উদ্দেশে অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘ভাই একটু পানি নিন, একটি শসা নিন, আল্লাহর রাহে আপনাদের একটু সেবা করতে দিন।’
আলেমদের এই সেবা করার সুযোগ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করতে চায়নি নারী ও শিশুরা। যাত্রাবাড়ী দনিয়া কলেজের মোড়ে দেখা গেল সালেহা বেগম তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে পানি ও খাবার বিতরণ করছেন। সালেহা বেগমের জীবনে এ এক পরম পাওয়া। তিনি বলেন, সারারাত এই পথ দিয়ে আলেমরা গেছেন, এখনও যাচ্ছেন। এই গরমে চরম কষ্টের মধ্যে আসছেন তারা। ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। আমার স্বামী এবং বাচ্চাদের নিয়ে পানি ও খাবার দিতে এসেছি। এমন সুযোগ জীবনে আর পাব না।
চানখারপুলে দেখা হল পুরান ঢাকার বাসিন্দা মাহবুব মিয়ার সঙ্গে। তিনি ভ্যানভর্তি বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছিলেন মতিঝিলের দিকে। তিনি জানান, আমরা ঢাকাবাসীদের একটা ঐতিহ্য আছে। সারাদেশ থেকে নবীপাগল আলেমরা এসেছেন। আমি একা নই। আমার মতো অনেকেই হাজার হাজার বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে হুজুরদের খেদমতে যাচ্ছে। খাবারের কোনো অভাব হবে না। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পেশাদার সংগঠনের পক্ষ থেকে খাবার ও চিকিত্সাসেবা দেওয়া হয়েছে।
মহাসমাবেশে খাবার পানি, স্যালাইন ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।
দলটির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে বিএনপি ও এর অঙ্গদলগুলোর নেতাকর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন স্পটে খাবার পানি, স্যালাইন, তরমুজ, কলা, বিস্কুট ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যতটুকু খবর এসেছে, সে অনুযায়ী কমপক্ষে ২৪টি স্পটে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বেলা ১১টা থেকে শাপলা চত্বর, হাটখোলা মোড়, আরামবাগ পুলিশ বক্সের সামনে, শাহজাহানপুর পুলিশ বক্সের সামনে, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ, পুরানা পল্টন ও নয়াপল্টনের ফকিরেরপুল মোড় ও দৈনিক বাংলা মোড়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশে আগতদের মধ্যে খাবার পানি, শরবত, শুকনো খাবার ও স্যালাইন সরবরাহ করেছেন।
বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি বলেন, মতিঝিলসহ কয়েকটি স্থানে ড্যাবের ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে চিকিত্সকরা বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করেছেন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, মুক্তিযোদ্ধা গণপরিষদের চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আজিজ উলফার ও মহাসচিব সাদেক আহমদ খান, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া এবং অতিরিক্ত মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বিভিন্ন স্পটে পানি ও খাবার বিতরণ করেন।
এছাড়া নাম না জানা কত মানুষ যে গতকাল তাদের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে এর হিসাব মেলাবে কে।
মানুষের এই আবেগ আর ভালোবাসায় রীতিমতো অভিভূত লংমার্চ কাফেলার মুসাফিররা। হেঁটে কুমিল্লা থেকে এসেছেন মাওলানা মো. আবজাল। আবেগাপ্লুত মাওলানা আবজাল তার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, ঢাকার নবীপ্রেমিকরা আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যেন সবাইকে উত্তম পুরস্কার দেন।

Daily Amardesh


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

Back to top button