সাত ধরনের পানীয়তে ক্ষতিকর উপাদান

এনার্জি ড্রিংক’ হিসেবে পরিচিত সাত ধরনের পানীয়তে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। এসব উপাদান ভোক্তাদের আসক্তি বৃদ্ধি, যৌনশক্তি হ্রাস ও হূদেরাগের কারণ হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বাজার থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন পানীয়র নমুনা নিজেদের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে। পরীক্ষার ফল নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি গত আগস্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিগো-বি, ম্যান পাওয়ার (স্বচ্ছ তরল), ম্যান পাওয়ার (অস্বচ্ছ তরল), হর্স ফিলিংস, রয়েল টাইগার, ব্ল্যাক হর্স ও স্পিড নামের সাতটি পানীয়তে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। পানীয়গুলোর মধ্যে প্রথম চারটিতে ‘অপিয়াম উদ্ভূত অপিয়েট’ ও ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’ নামের রাসায়নিক দ্রব্য পাওয়া গেছে। এ দুটি দ্রব্য ‘ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। পরের তিনটি পণ্যে পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল ক্ষতিকর উপাদান মেশানো এসব পানীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে জোর সুপারিশ করেছেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপিয়েট একধরনের নেশা বা নির্ভরতা সৃষ্টিকারী উপাদান। এমন উপাদানমিশ্রিত পানীয় পান করলে শরীরের ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি হয়, যখন শরীর উন্মুখ হয়ে থাকে কখন ওই উপাদান পাওয়া যাবে। আর সিলডেনাফিল সাইট্রেট ধীরে ধীরে যৌনশক্তি নিঃশেষ করে ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, একপর্যায়ে আরও কড়া নেশার দিকে ধাবিত হয় এই পানীয় গ্রহণকারীরা। এমন নেশাকে বড় নেশার জগতে প্রবেশের জন্য ‘ওয়েটিং রুম’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পরীক্ষিত পানীয়গুলোর একটি ‘হর্স ফিলিংস’। এর বোতলের গায়ে লেখা রয়েছে যে এটি ঔষধি গুণসম্পন্ন। এটি যৌন শক্তিবৃদ্ধিকারক, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিরাময়ক, হূদেরাগ প্রতিরোধক। এ ছাড়া এতে রক্তস্বল্পতা দূর হয়, চর্মরোগের জন্য উপকারী এবং মেদভুঁড়ি কমাতেও সহায়তা করে।
অধ্যাপক ফারুক বলেছেন, যৌন উত্তেজক পদার্থ সিলডেনাফিল সাইট্রেট মেশানো পানীয় যৌনশক্তি বৃদ্ধি দূরে থাক, পর্যায়ক্রমে এটি পুরুষত্ব নষ্ট করে ফেলবে। হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যকৃৎ ও কিডনি।
ফারুকের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন এ বি এম আবদুল্লাহ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এসব পানীয় দীর্ঘদিন পান করলে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গর্ভবতী নারীর সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে।
ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত ‘হর্স ফিলিংস’-এর বোতলের মোড়কে লেখা রয়েছে, এটি ‘পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরীক্ষিত ও অনুমোদিত।’ তবে ইনস্টিটিউটের পরিচালক আমিনুল হক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এটা একেবারেই মিথ্যা। ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে এমন কোনো পণ্য পরীক্ষা বা অনুমোদন করা হয়নি। তিনি এই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
ভিগো-বি, ম্যান পাওয়ার (স্বচ্ছ তরল), ম্যান পাওয়ার (অস্বচ্ছ তরল), হর্স ফিলিংসের নমুনায় অপিয়েট ও সিলডেনাফিল সাইট্রেটের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকলেও এসব পানীয়র বোতলে উৎপাদক কোম্পানির কোনো ঠিকানা উল্লেখ নেই।
বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্যে চার-পাঁচ গুণ বেশি ক্যাফেইন
উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন পাওয়া রয়েল টাইগার, ব্ল্যাক হর্স ও স্পিড ‘কার্বোনেটেড বেভারেজ’ হিসেবে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই অনুমোদিত। এসব পণ্য অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে চিহ্নিত। বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী, এক কেজি পণ্যে ক্যাফেইনের সহনীয় মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক পানীয়গুলোতে প্রতি লিটারে ক্যাফিনের পরিমাণ ৫০ মিলিগ্রাম, সেখানে রয়েল টাইগারের পরিমাণ ২৩০ দশমিক ৪০ মিলিগ্রাম। ব্ল্যাক হর্স ও স্পিডের ২৭০ মিলিলিটারের বোতলে ক্যাফেইনের পরিমাণ যথাক্রমে ২৩৫ দশমিক ৫০ ও ২২৮ দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম।
অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী ব্ল্যাক হর্স, স্পিড ও রয়্যাল টাইগারের নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ক্যাফেইন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এসব পানীয়তে ব্যবহূত হয় সিনথেটিক ক্যাফেইন, যা আরও ভয়াবহ। আমাদের দেশে ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণে কোনো আইন নেই।’
বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্যে উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইনের উপস্থিতি প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কমল প্রসাদ দাস প্রথম আলোকে বলেন, বিএসটিআই ‘কার্বোনেটেড বেভারেজ’-এর ক্যাফেইনের মাত্রা পরীক্ষা করে না। এসব পরীক্ষার ক্ষেত্রে ১২টি মানদণ্ড বিচার করা হয়। এ ক্ষেত্রে মোড়ক, আর্সেনিকসহ ১১ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য পরীক্ষা করা হয়। তিনি বলেন, ‘এসব পানীয়তে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আমরা দ্রুত বাজার থেকে এসব পণ্য কিনে তা পরীক্ষা করে দেখব। প্রমাণিত হলে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পানীয়তে ক্যাফেইনের মতো উত্তেজক পদার্থের অস্বাভাবিক উপস্থিতি সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলেন, এই পানীয় রুচি নষ্ট ও মেজাজ খিটখিটে করে দিতে পারে। শিশুদের জন্য এই পানীয় খুবই ক্ষতিকর, যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি হতে পারে।
অধিক ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় রয়েল টাইগার ও ব্ল্যাক হর্সের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এএসটি বেভারেজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. শাহনেওয়াজ মানতে রাজি নন যে তাঁদের পণ্যে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ক্যাফেইন আছে। তিনি বলেন, ‘পরিমাণ ঠিক না থাকলে আমরা অনুমোদন পেলাম কী করে?’
সহনীয় মাত্রার চেয়ে কোনোক্রমে বেশি ক্যাফেইন থাকতে পারে না বলে দাবি করেছেন স্পিড পানীয়টির উৎপাদক আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম তালুকদার। তাঁর দাবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরীক্ষাটি সঠিক হয়নি।
(প্রথম আলো)
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.







Thanks for this info.