আকাইদ

আল্লাহ কি সর্বত্র বিরাজমান?

হাফেয আব্দুল মতীন

অনেকের বিশ্বাস আছে যে, (১) আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। অথচ মহান আল্লাহ বলছেন, তিনি  আরশের উপর সমাসীন। এ মর্মে পবিত্র কুরআনে ৭টি আয়াত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও বলেছেন যে, আল্লাহ আসমানে আছেন। ছাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈগণ সকলেই বলেছেন আল্লাহ আসমানে আছেন। তাছাড়া সকল ইমামই বলেছেন, আল্লাহ আসমানে আছেন। এরপরেও যদি বলা হয়, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান তাহ’লে কি ঈমান থাকবে এবং আমল কবুল হবে?
আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান- একথা ঠিক নয়, বরং পবিত্র কুরআন বলছে, আল্লাহ আরশে সমাসীন। এ মর্মে বর্ণিত দলীলগুলো নিম্নরূপ-
(১) আল্লাহ বলেন, إِنَّ رَبَّكُمُ اللهُ الَّذِيْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِيْ سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ. ‘নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হচ্ছেন সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন’ (আ‘রাফ ৭/৫৪)
(২) ‘নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন’ (ইউনুস ১০/৩)
(৩) ‘আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত- তোমরা এটা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হ’লেন’ (রা‘দ ১৩/২)
(৪) ‘দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমাসীন’ (ত্ব-হা ২০/৫)
(৫) ‘তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তিনিই রহমান, তাঁর সম্বন্ধে যে অবগত আছে তাকে জিজ্ঞেস করে দেখ’ (ফুরক্বান ২৫/৫৯)
(৬) ‘আল্লাহ তিনি, যিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন’ (সাজদাহ ৩২/৪)
(৭) ‘তিনিই ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন’ (হাদীদ ৫৭/৪)
উল্লেখিত আয়াতগুলো দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশে সমাসীন আছেন। কিভাবে সমাসীন আছেন, একথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন,الاستواء معلوم والكيف مجهول والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعة. ‘ইসতেওয়া বা সমাসীন হওয়া বোধগম্য, এর প্রকৃতি অজ্ঞাত, এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ‘আত’।
আল্লাহ তা‘আলা আসমানের উপর আছেন। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,
أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَّخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُوْرُ، أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُّرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُوْنَ كَيْفَ نَذِيْرِ-
‘তোমরা কি (এ বিষয়ে) নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি আকাশের উপর রয়েছেন তিনি তোমাদের সহ ভূমিকে ধসিয়ে দিবেন না? আর তখন ওটা আকস্মিকভাবে থরথর করে কাঁপতে থাকবে। অথবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আকাশের উপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী বঞ্ঝাবায়ু প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে কিরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী’? (মুলক ৬৭/ ১৬-১৭)
২. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিছু সৃষ্টিকে উপরে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, بَل رَّفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ ‘বরং আল্লাহ তাকে (ঈসাকে) নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন’ (নিসা ৪/১৫৮)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيْسَى إِنِّيْ مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ. ‘স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি’ (আলে ইমরান ৩/৫৫)
৩. আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে আছেন, এর প্রমাণে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ-
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا قَضَى اللهُ الْخَلْقَ كَتَبَ فِيْ كِتَابِهِ، فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ : إِنَّ رَحْمَتِيْ غَلَبَتْ غَضَبِيْ-
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ মাখলূক সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করলেন, তখন তাঁর কাছে আরশের উপর রক্ষিত এক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন- অবশ্যই আমার করুণা আমার ক্রোধের উপর জয়লাভ করেছে’।
৪. আমরা দো‘আ করার সময় দু’হাত উত্তোলন করে আল্লাহ্র নিকট চাই। এতে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ আরশের উপর আছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
عَنْ سَلْمَانَ الْفَارِسِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ اللهَ حَيِيٌّ كَرِيْمٌ يَسْتَحْيِيْ إِذَا رَفَعَ الرَّجُلُ إِلَيْهِ يَدَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا خَائِبَتَيْنِ-
সালমান ফারেসী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল ও মহানুভব। যখন কোন ব্যক্তি তাঁর নিকট দু’হাত উত্তোলন করে দো‘আ করে, তখন তাকে শূন্য হাতে ব্যর্থ মনোরথ করে ফেরত দিতে তিনি লজ্জাবোধ করেন’।
৫. প্রত্যেক রাতে আল্লাহ তা‘আলার দুনিয়ার আসমানে নেমে আসা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি আরশের উপর সমাসীন। এর প্রমাণ রাসূল (ছাঃ)-এর নিম্নোক্ত হাদীছ :
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُوْلُ : مَنْ يَّدْعُوْنِيْ فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِيْ فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِيْ فَأَغْفِرَ لَهُ-
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছ যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আছ যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে তা দান করব। কে আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দিব’।
৬. মু‘আবিয়া বিন আল-হাকাম আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَتْ لِيْ جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِىْ قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّئْبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِىْ آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُوْنَ لَكِنِّىْ صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ. قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَفَلاَ أُعْتِقُهَا؟ قَالَ ائْتِنِيْ بِهَا فَأَتَيْتُهُ بِهَا. فَقَالَ لَهَا : أَيْنَ اللهُ؟ قَالَتْ فِي السَّمَاءِ. قَالَ مَنْ أَنَا؟ قَالَتْ أَنْتَ رَسُوْلُ اللهِ. قَالَ أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ-
‘আমার একজন দাসী ছিল। ওহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ (ওহুদের নিকটবর্তী একটি স্থান) নামক স্থানে সে আমার ছাগল চরাত। একদিন দেখি, নেকড়ে আমাদের একটি ছাগল ধরে নিয়ে গেছে। আমি একজন আদম সন্তান (সাধারণ মানুষ)। তারা যেভাবে ক্রদ্ধ হয় আমিও সেভাবে ক্রদ্ধ হই। কিন্তু আমি তাকে এক থাপ্পড় মারি। অতঃপর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট আসলে একে আমি সাংঘাতিক (অন্যায়) কাজ বলে গণ্য করি। তাই আমি বলি যে, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমি কি তাকে আযাদ করব না? তিনি বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে আস। আমি তাকে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট নিয়ে আসলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। তিনি (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? তখন সে বলল, আপনি আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাকে মুক্তি দিয়ে দাও, কারণ সে একজন ঈমানদার নারী’।
৭. বিদায় হজ্জের ভাষণে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, তখন কি বলবে? ঐ সময় উপস্থিত ছাহাবীগণ বলেছিলেন, আমরা সাক্ষ্য দিব যে, আপনি আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন। একথা শুনার পর আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) তাঁর হাতের আঙ্গুল আসমানের দিকে উত্তোলন করে বলেছিলেন, হে আল্লাহ! তাদের কথার উপর সাক্ষি থাক’।
৮. আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন,
كَانَتْ زَيْنَبُ تَفْخَرُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَقُوْلُ: زَوَّجَكُنَّ أَهَالِيْكُنَّ وَزَوَّجَنِي اللهُ تَعَالَى مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَاوَاتٍ.
‘যয়নব (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রীগণের উপর গর্ব করে বলতেন যে, তাঁদের বিয়ে তাঁদের পরিবার দিয়েছে, আর আমার বিয়ে আল্লাহ সপ্ত আসমানের উপর থেকে সম্পাদন করেছেন’।
৯. ইসরা ও মি‘রাজ-এর ঘটনায় আমরা লক্ষ্য করি যে, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-কে যখন একের পর এক সপ্ত আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল নবী-রাসূলগণের এবং আল্লাহ্র সান্নিধ্যের জন্য সপ্ত আসমানের উপর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর যখন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) পঞ্চাশ ওয়াক্ত ছালাত নিয়ে মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখন মূসা (আঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে বলেছিলেন, তোমার উম্মত ৫০ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতে সক্ষম হবে না। যাও আল্লাহ্র নিকট ছালাত কমিয়ে নাও। এরপর কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্ত হয়। এরপর মূসা (আঃ) আরও কমাতে বলেছিলেন, কিন্তু রাসূল (ছাঃ) লজ্জাবোধ করেছিলেন।এ সময় আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) ছালাত কমানোর জন্য সপ্ত আকাশের উপর উঠতেন। আবার ফিরে আসতেন মূসা (আঃ)-এর নিকট ষষ্ঠ আসমানে। এ দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে আছেন।
১০. ফেরাঊন নিজেকে আল্লাহ দাবী করেছিল। সে কাফের হওয়া সত্ত্বেও তার বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ আরশের উপর আছেন। ফেরাঊন বলল, ‘হে হামান! তুমি আমার জন্য এক সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর, যাতে আমি অবলম্বন পাই আসমানে আরোহণের, যেন আমি দেখতে পাই মূসা (আঃ)-এর মা‘বূদকে (মুমিন ৪০/৩৭-৩৮)
সালাফে ছালেহীন থেকে আমরা যা পাই তা হচ্ছে, আল্লাহ আসমানের উপর আরশে অবস্থান করছেন।  আবুবকর (রাঃ) থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর ওফাত হয়, আবু বকর (রাঃ) এসে তাঁর (ছাঃ) কপালে চুমু খেয়ে বলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনি জীবনে ও মরণে উত্তম ছিলেন। এরপর আবু বকর (রাঃ) বলেন, হে মানব জাতি! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখ যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্র ইবাদত কর তারা জেনে রাখ যে, আল্লাহ আকাশের উপর (আরশে)। তিনি চিরঞ্জীব।১০
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন, من قال لا أعرف ربي في السماء أم في الأرض فقد كفر لأن الله تعالى يقول الرحمن على العرش استوى وعرشه فوق سبع سموات. ‘যে বলবে যে, আল্লাহ আসমানে আছেন, না যমীনে তা আমি জানি না, সে কুফরী করবে। কেননা আল্লাহ বলেন, রহমান আরশে সমাসীন। আর তার আরশ সপ্ত আকাশের উপর।১১
ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, الله في السماء وعلمه في كل مكان لا يخلو منه مكان ‘আল্লাহ আকাশের উপর এবং তাঁর জ্ঞানের পরিধি সর্বব্যাপী বিস্তৃত। কোন স্থানই তাঁর জ্ঞানের আওতার বহির্ভূত নয়’।১২
ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেন,
القول في السنة التي أنا عليها ورأيت أصحابنا عليها أهل الحديث الذين رأيتهم وأخذت عنهم مثل سفيان ومالك وغيرهما الاقرار بشهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله وأن الله تعالى على عرشه في سمائه يقرب من خلقه كيف شاء وأن الله تعالى ينزل إلى سماء الدنيا كيف شاء-
‘সুন্নাহ সম্পর্কে আমার ও আমি যেসকল আহলেহাদীছ বিদ্বানকে দেখেছি এবং তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছি যেমন সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যরা, তাদের মত হল এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন (হক্ব) উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আললাহ্র রাসূল। আর আল্লাহ আকাশের উপর তাঁর আরশে সমাসীন। তিনি যেমন ইচ্ছা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং যেমন ইচ্ছা তেমন নীচের আকাশে অবতরণ করেন’।১৩
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন,
قيل لأبي ربنا تبارك وتعالى فوق السماء السابعة على عرشه بائن من خلقه وقدرته وعلمه بكل مكان قال نعم لا يخلو شيء من علمه.
‘আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করা হ’ল যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি থেকে দূরে সপ্তম আকাশের উপরে তাঁর আরশে সমাসীন। তাঁর ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিধি সর্বত্র বিস্তৃত। এর উত্তরে তিনি (ইমাম আহমাদ) বলেন, হ্যাঁ! তিনি (আল্লাহ) আরশের উপর সমাসীন এবং তাঁর  জ্ঞানের বহির্ভূত কিছুই নেই।১৪

আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন : যুক্তির নিরিখে

আরও দেখুন:  ওলীগণের কারামতি

ইতিপূর্বে পেশকৃত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন। এ বিষয়ে নিম্নে  যুক্তিভিত্তিক আলোচনা পেশ করা হ’ল-

(১) মানুষ যখন ছালাতের মধ্যে সিজদাবনত থাকে তখন তার মন-প্রাণ কোথায় যায়? অবশ্যই উপরের দিকে; নীচের দিকে নয়।

(২) মানুষ যখন দু’হাত উত্তোলন করে দো‘আ করে, তখন কেন উপরের দিকে হাত উত্তোলন করে? এক্ষেত্রে মানুষের বিবেক বলবে, আল্লাহ উপরেই আছেন; সর্বত্র নন।

(৩) মানুষ যখন টয়লেটে যায়, তখন কি সাথে মহান আল্লাহ থাকেন? আল্লাহর শানে এমন কথা বলা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়।

(৪) মানুষ যেমন তার নির্মিত বাড়ী সম্পর্কে সবই বলতে পারে যে, বাড়ীতে কয়টা ঘর আছে, কয়টা স্তম্ভ আছে। এক কথায় সবই তার জানা। তেমনি বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা আরশের উপর সমাসীন থেকে বিশ্ব জাহানের সব খবর রাখেন। আল্লাহ আরশের উপরে থাকলেও তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতা সর্বব্যাপী।

(৫) মানুষ যেখানেই যায় সেখানেই চন্দ্র-সূর্য দেখতে পায়। মনে হয় সেগুলো তার সাথেই আছে। চন্দ্রটা বাংলাদেশ, ভারত, সঊদী সব জায়গা থেকে মানুষ দেখতে পায়। চন্দ্র আল্লাহরই সৃষ্টি, তাকে সব জায়গা থেকে মানুষ দেখতে পাচ্ছে। অথচ সেটা আসমানেই আছে। অনুরূপ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ আরশের উপর থেকে সকল সৃষ্টির সব কাজ দেখাশুনা করেন- এটাই বিশ্বাস করতে হবে।

(৬) ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন,

من قال لا أعرف ربي في السماء أو في الأرض فقد كفر وكذا من قال إنه على العرش ولا أدري العرش أفي السماء أو في الأرض والله تعالى يدعى من أعلى لا من أسفل ليس من وصف الربوبية والألوهية في شيء.

‘যে বলবে যে, আল্লাহ আসমানে আছেন, না যমীনে আছেন আমি তা জানি না, সে কুফরী করবে। অনুরূপভাবে যে বলবে যে, তিনি আরশে আছেন। কিন্তু আরশ আকাশে, না যমীনে অবস্থিত আমি তা জানি না। সেও কুফরী করবে। কেননা উপরে থাকার জন্যই আল্লাহকে ডাকা হয়; নীচে থাকার জন্য নয়। আর নীচে থাকাটা আল্লাহর রুবূবিয়্যাত এবং উলূহিয়্যাতের গুণের কিছুই নয়’।[15] তাই আমরা বলতে পারি যে, আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপর থাকাটাই শোভা পায়, নীচে নয়। কেননা আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক, রিযিকদাতা, জীবন-মৃত্যু সব কিছুরই মালিক ও হক উপাস্য। তাঁর জন্য সৃষ্টির গুণের কোন কিছুই শোভা পায় না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপর সমাসীন; সর্বত্র বিরাজমান নন।

আরও দেখুন:  ইলমের ফযীলত

আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান মর্মে কুরআনুল কারীমের যেসব আয়াত উল্লেখ করা হয় তার জবাব নিম্নে আলোচনা করা হ’ল :

(১) মহান আল্লাহ বলেন, وَهُوَ اللهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ يَعْلَمُ سِرَّكُمْ وَجَهرَكُمْ وَيَعْلَمُ مَا تَكْسِبُوْنَ. ‘আকাশ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু জানেন এবং তোমরা যা অর্জন কর সেটাও তিনি অবগত আছেন’ (আন‘আম ৬/৩)

(২) আল্লাহ বলেন, وَهُوَ الَّذِيْ فِي السَّمَآء إِلَهٌ وَفِي الْأَرْضِ إِلَهٌ وَهُوَ الْحَكِيْمُ الْعَلِيْمُ. ‘তিনিই ইলাহ নভোমন্ডলে, তিনিই ইলাহ ভূতলে এবং তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ’ (যুখরুফ ৪৩/৮৪)

উপরোক্ত আয়াতদ্বয় পেশ করে যারা আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান বলে দাবী করেন, তাদের কথা বাতিল। কেননা আকাশে যত সৃষ্টি আছে তাদের সবার প্রভু, মা‘বূদ আল্লাহই। তারা সবাই আল্লাহর ইবাদত করে। তেমনি যারা যমীনে আছে তাদের প্রভু ও মা‘বূদও একমাত্র আল্লাহ। তারাও সবাই ভয়-ভীতি সহকারে আল্লাহরই ইবাদত করে।[16]

(৩) মহান আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُوْنُ مِنْ نَّجْوَى ثَلاَثَةٍ إِلاَّ هُوَ رَابِعُهُمْ وَلاَ خَمْسَةٍ إِلاَّ هُوَ سَادِسُهُمْ وَلاَ أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلاَ أَكْثَرَ إِلاَّ هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوْا ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوْا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمٌ.

‘তুমি কি লক্ষ্য কর না, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসাবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসাবে তিনি থাকেন না। তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক তারা যেখানেই থাকুক না কেন আল্লাহ (জ্ঞানের দিক দিয়ে) তাদের সাথে আছেন। অতঃপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত’ (মুজাদালাহ ৫৮/৭)

এ আয়াত দ্বারা অনেকে যুক্তি পেশ করে বলেন যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। তাদের এ দাবী ভিত্তিহীন। কারণ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, افتتح الآية بالعلم، واختتمها بالعلم. ‘মহান আল্লাহ আয়াতটি ইলম দ্বারাই শুরু করেছেন এবং ইলম দ্বারাই শেষ করেছেন’।[17] এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সাথে আছেন।

ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, ‘উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, আল্লাহর জ্ঞান তাদের সঙ্গে’। তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপর এবং তাঁর জ্ঞান তাদের সব কিছু অবহিত’।[18]

(৪) আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান বলে অনেকে নিম্নের আয়াত পেশ করে যুক্তি দেয়- وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ. ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি (জানার দিক দিয়ে) তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন’ (হাদীদ ৫৭/৪)

ইয়াহ্ইয়া বিন ওছমান বলেন, ‘আমরা একথা বলব না, যেভাবে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, সবকিছুর সাথে মিশে আছেন এবং আমরা জানি না যে তিনি কোথায়; বরং বলব আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং আরশের উপর সমাসীন, আর তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, দেখা-শুনা সবার সাথে। এটাই উক্ত আয়াতের অর্থ। ইবনু তায়মিয়া বলেন, যারা ধারণা করে আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান তাদের কথা বাতিল। বরং আল্লাহ স্বয়ং আরশের উপরে সমাসীন এবং তাঁর জ্ঞান সর্বত্র রয়েছে।[19]

উক্ত আয়াতের (হাদীদ ৪) ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেছেন,

أي: رقيب عليكم، شهيد على أعمالكم حيث أنتم، وأين كنتم، من بر أو بحر، في ليل أو نهار، في البيوت أو القفار، الجميع في علمه على السواء، وتحت بصره وسمعه، فيسمع كلامكم ويرى مكانكم، ويعلم سركم ونجواكم.

‘অর্থাৎ তিনি তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক এবং তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের কার্যসমূহের সাক্ষী। তোমরা ভূভাগে বা সমুদ্রে, রাতে বা দিনে, বাড়িতে বা বিজন মরুভূমিতে যেখানেই অবস্থান কর না কেন সবকিছুই সমানভাবে তাঁর জ্ঞান এবং তাঁর শ্রবণ ও দৃষ্টির মধ্যে আছে। তিনি তোমাদের কথা শোনেন, তোমার অবস্থান দেখেন এবং তোমাদের গোপন কথা ও পরামর্শ জানেন’।[20]

উছমান বিন সাঈদ আর-দারেমী বলেন,

أنه حاضر كل نجوى ومع كل أحد من فوق العرش بعلمه لأن علمه بهم محيط وبصره فيهم نافذ لا يحجبه شيء عن علمه وبصره ولا يتوارون منه بشيء وهو بكماله فوق العرش بائن من خلقه يعلم السر وأخفى (طه : 21) أقرب إلى أحدهم من فوق العرش من حبل الوريد قادر على أن يكون له ذلك لأنه لا يبعد عنه شيء ولا تخفى عليه خافية في السموات ولا في الأرض فهو كذلك رابعهم وخامسهم وسادسهم لا أنه معهم بنفسه في الأرض.

‘তিনি আরশের উপরে থেকেই প্রত্যেক গোপন পরামর্শ ও প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে উপস্থিত থাকেন। কেননা তাঁর জ্ঞান তাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছে এবং তাঁর দৃষ্টি তাঁদের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে। তাঁর জ্ঞান ও দৃষ্টি থেকে কোন কিছুই আড়াল করতে পারে না এবং তারা তাঁর নিকট থেকে কোন কিছুই গোপন  করতে পারে না। তিনি তাঁর পূর্ণ সত্তাসহ তাঁর সৃষ্টি থেকে দূরে আরশের উপরে সমাসীন আছেন। তিনি গোপন ও সুপ্ত বিষয় জানেন (ত্ব-হা ৭)। তিনি আরশের উপরে থেকেই তাদের কারো নিকট ঘাড়ের শাহ রগ অপেক্ষা নিকটে অবস্থান করেন। তাঁর জন্য এমনটি হওয়ার বিষয়ে তিনি সক্ষম। কারণ কোন কিছুই তাঁর থেকে দূরে নয় এবং আকাশমন্ডলী ও যমীনের কোন কিছুই তাঁর নিকট গোপন  থাকে না। তিনি গোপন পরামর্শের সময় চতুর্থ জন, পঞ্চম জন ও ষষ্ঠজন হিসাবে আবির্ভূত হন। তবে তিনি স্বয়ং তাঁর সত্তাসহ তাদের সাথে পৃথিবীতে বিরাজমান নন’।[21]

আরও দেখুন:  ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও ইসলাম

(৫) وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيْدِ ‘আমি তার ঘাড়ের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটতর’ (ক্বাফ ৫০/১৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لاَّ تُبْصِرُوْنَ. ‘আর আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না’ (ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/৮৫)। যারা এ আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করে বলেন, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান তাদের ধারণা ঠিক নয়।

এখানে উভয় আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতারা মানুষের নিকটবর্তী। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ. ‘আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী’ (হিজর ৯)। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে জিবরীল (আঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট পবিত্র কুরআন পৌঁছে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে ও তাঁর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মানুষের ঘাড়ের শাহ রগ অপেক্ষা নিকটতর। আর মানুষের উপর ফেরেশতার যেমন প্রভাব থাকে, তেমনি শয়তানেরও। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلاَّ وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِيْنُهُ مِنَ الْجِنِّ وَقَرِيْنُهُ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ. قَالُوْا وَإِيَّاكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ وَإِيَّاىَ إِلاَّ أَنَّ اللهَ أَعَانَنِىْ عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلاَ يَأْمُرُنِىْ إِلاَّ بِخَيْرٍ.  

‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সাথে তার জিন সহচর অথবা ফেরেশতা সহচর নিযুক্ত করে দেয়া হয়নি। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সাথেও কি হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, আমার সাথেও, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছেন। ফলে সে আমার অনুগত হয়ে গেছে। সে আমাকে কেবল ভাল কাজেরই পরামর্শ দেয়’।[22] অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِيْ مِنْ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ. ‘শয়তান মানুষের মধ্যে তার রক্তের ন্যায় বিচরণ করে থাকে’।[23]

এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِيْنِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدٌ. ‘স্মরণ রেখো, দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে’ (ক্বাফ ৫০/১৭)। আল্লাহ আরো বলেন, مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلاَّ لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ. ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে’ (ক্বাফ ১৮)। আমরা যা কিছু বলি সবই ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই রয়েছে তোমাদের জন্য তত্ত্বাবধায়কগণ, সম্মানিত লেখকবর্গ, তারা জানে তোমরা যা কর’।[24]

আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন বলেন, উভয় আয়াতে নিকটবর্তী বুঝাতে ফেরেশতাদের নিকটবর্তী হওয়া বুঝাচ্ছে। অর্থাৎ এখানে উভয় আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে ফেরেশতাগণ।

(১) প্রথম আয়াতে (ক্বাফ ১৬) নিকটবর্তিতাকে শর্তযুক্ত (مقيد) করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيْدِ- إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِيْنِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدٌ- مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلاَّ لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ-

‘আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর। স্মরণ রেখো, দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে’ (ক্বাফ ৫০/১৬-১৮)। উল্লিখিত আয়াতে إِذْ يَتَلَقَّي শর্ত দ্বারা বুঝা যায় যে, দু’জন ফেরেশতার নিকটবর্তিতাই এখানে উদ্দেশ্য।

(২) দ্বিতীয় আয়াতে (ওয়াকি‘আহ ৮৫) নিকটবর্তিতাকে মৃত্যুকালীন সময়ের সাথে শর্তযুক্ত (مقيد) করা হয়েছে। আর মানুষের মৃত্যুর সময় যারা তার নিকট উপস্থিত থাকেন তারা হলেন ফেরেশতা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, حَتَّىَ إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لاَ يُفَرِّطُوْنَ. ‘অবশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমার প্রেরিত দূতগণ তার প্রাণ হরণ করে নেয় এবং তারা কোন ত্রুটি করে না’ (আন‘আম  ৬/৬১)

উল্লিখিত আয়াতে বুঝা যাচ্ছে যে, তারা হচ্ছেন ফেরেশতা। তারা সেখানে একই স্থানে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাই না।[25]

এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায় যে, যদি আয়াত দু’টিতে ফেরেশতাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহ’লে আল্লাহ নিকটবর্তিতাকে নিজের দিকে কেন সম্পর্কিত করলেন? এর জবাবে বলা যায় যে, ফেরেশতাদের নিকটবর্তিতাকে আল্লাহ নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছেন। কারণ তার নির্দেশেই তারা মানুষের নিকটবর্তী হয়েছে। আর তারা তার সৈন্য ও দূত। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ‘যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর’ (ক্বিয়ামাহ ৭৫/১৮)। এখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট জিবরীল (আঃ)-এর কুরআন পাঠ উদ্দেশ্য। অথচ আল্লাহ পাঠকে নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে যেহেতু জিবরীল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কুরআন পাঠ করেন সেহেতু আল্লাহ কুরআন পাঠকে নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছেন।[26]

আমরা কুরআন-হাদীছ থেকে এবং আলেমদের থেকে যা পাচ্ছি তা হ’ল আল্লাহ তা‘আলা আরশে সমাসীন; সর্বত্র বিরাজমান নন। কারণ কুরআন-হাদীছের সঠিক অর্থ না জানার কারণেই আমরা ভুল করে থাকি। তাই কুরআন-হাদীছের দলীল পাওয়ার পরেও যদি না বুঝার ভান করি তাহ’লে আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন আমাদেরকে ছেড়ে দিবেন না।


. ইমাম ইবনু তায়মিয়া, মাজমূউ ফাতাওয়া ৩/১৩৫।
. শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া, আর-রিসালা আত-তাদাম্মুরিয়্যাহ, পৃঃ ২০।
. বুখারী হা/৩১৯৪ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১; মিশকাত হা/২৩৬৪ ‘দো‘আ’ অধ্যায়, ‘আল্লাহ্র রহমতের প্রশস্ততা’ অনুচ্ছেদ।
. তিরমিযী হা/৩৫৫৬, ইবনু মাজাহ হা/৩৮৬৫, হাদীছ ছহীহ।
. বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮; আবুদাঊদ হা/১৩১৫; ইবনু মাজাহ হা/১৩৬৬; মিশকাত হা/১২২৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘তাহাজ্জুদের প্রতি উৎসাহিতকরণ’ অনুচ্ছেদ।
. ছহীহ মুসলিম হা/৫৩৭ ‘মসজিদ সমূহ ও ছালাতের স্থানসমূহ’ অনুচ্ছেদ।
. ছহীহ মুসলিম হা/১২১৮ ‘হজ্জ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৯।
. বুখারী হা/৭৪২০ ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২০।
. মুত্তাফাক্ব আলাইহ; মিশকাত হা/৫৮৬২।
১০. বুখারী, আত-তারীখ, ১ম খন্ড, পৃঃ ২০২; ইবনুল ক্বাইয়িম, ইজতিমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃঃ ৮৩-৮৪; আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃঃ ৪৭০।
১১. ইজতিমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃঃ ৯৯।
১২. ঐ, পৃঃ ১০১।
১৩. ঐ, পৃঃ ১২২।
১৪. ঐ, পৃঃ ১৫২-১৫৩।
[15]. ইমাম আবু হানীফা, আল-ফিক্বহুল আবসাত, পৃঃ ৫১।
[16]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ২৭৪।
[17]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৮/১২-১৩; ইমাম আহমাদ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃঃ ৪৯-৫১।
[18]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ৫/১৮৮-৮৯।
[19]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ৫/১৯১-৯৩।
[20]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৫৬০।
[21]. উছমান বিন সাঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, তাহকীক : বদর বিন আব্দুল্লাহ বদর (কুয়েত : দারু ইবনিল আছীর, ২য় সংস্করণ, ১৯৯৫), পৃঃ ৪৩-৪৪।
[22]. মুসলিম, মিশকাত হা/৬৭ ‘ঈমান’ অধ্যায়।
[23]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘কুমন্ত্রণা’ অনুচ্ছেদ।
[24]. ইনফিতার ৮২/১০-১২; তাফসীর ইবনে কাছীর, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০৪।
[25]. আল-কাওয়াইদুল মুছলা ফী ছিফাতিল্লাহি ওয়া আসমায়িহিল হুসনা, পৃঃ ৭০-৭১।
[26]. ঐ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button