পাত্র বিষয়ক মাসআলা

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
الآنية -এর পরিচিতি : যে পাত্রে পানি অথবা অন্য কোন খাদ্য সংরক্ষণ করা হয় তাকে الآنية বলা হয়। এর আসল বা মূল হ’ল হালাল হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, هُوَ الَّذِيْ خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيْعًا ‘তিনি যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন’ (বাক্বারাহ ২৯)। আর পাত্র আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি সমূহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব পাত্র যতক্ষণ পর্যন্ত অপবিত্র হওয়ার যথাযথ দলীল পাওয়া না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তা পবিত্র।
স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী পাত্রের ব্যবহার এবং তাতে রক্ষিত পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের হুকুম :
স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী পাত্রে শুধুমাত্র খাওয়া ও পান করা হারাম। এছাড়া অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা জায়েয। হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ أَبِيْ لَيْلَى قَالَ خَرَجْنَا مَعَ حُذَيْفَةَ وَذَكَرَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : لاََ تَشْرَبُوْا فِيْ آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَلاَ تَلْبَسُوْا الْحَرِيْرَ وَالدِّيْبَاجَ فَإِنَّهَا لَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَكُمْ فِي الآخِرَةِ.
ইবনু আবি লায়লা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা হুযায়ফা (রাঃ)-এর সঙ্গে বাইরে বের হ’লাম। এ সময় তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর কথা আলোচনা করেন যে, তিনি বলেছেন, তোমরা স্বর্ণ ও রেŠপ্যের পাত্রে পান করবে না। আর মোটা বা পাতলা রেশম বস্ত্র পরিধান করবে না। কেননা এগুলো দুনিয়াতে তাদের (অমুসলিমদের) জন্য। আর তোমাদের জন্য রয়েছে আখিরাতে।[1] অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ : الَّذِيْ يَشْرَبُ فِيْ إِنَاءِ الْفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِيْ بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ.
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সহধর্মিনী উম্মু সালামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রেŠপ্যের পাত্রে পান করে সে তো তার উদরে জাহান্নামের অগ্নি প্রবিষ্ট করায়’।[2]
উলিলখিত হাদীছদ্বয়ে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্র শুধুমাত্র খাওয়া এবং পান করার কাজে ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা জায়েয। এসব পাত্রে রাখা পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করাও জায়েয। কেননা যদি অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যবহার অবৈধ হ’ত তাহ’লে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) শুধুমাত্র নির্দিষ্টভাবে খাওয়া ও পান করতে নিষেধ করতেন না।[3]
কাফিরদের পাত্র ব্যবহার করার হুকুম :
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, কাফিরদের ব্যবহারিক পাত্রে কোন অপবিত্র বস্ত্ত তোলা হয়নি, তাহ’লে তা ব্যবহার করা হালাল। আর যদি জানা যায় যে, তাতে অপবিত্র বস্ত্ত তোলা হয়েছে এবং সে পাত্র ছাড়া অন্য কোন পাত্র পাওয়া না যায়, তাহ’লে তা ভালভাবে ধৌত করে ব্যবহার করা জায়েয। হাদীছে এসেছে, আবু ছা‘লাবা খুশানী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমরা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের এলাকায় বাস করি, তাদের পাত্রে আহার করি। আর আমরা শিকারের অঞ্চলে থাকি, শিকার করি তীর ধনুক দিয়ে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে এবং প্রশিক্ষণ বিহীন কুকুর দিয়েও। অতএব আমাকে বলে দিন, এর মধ্যে আমাদের জন্য কোন্টি হালাল? তিনি বললেন, তুমি উল্লেখ করেছ যে, তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের এলাকায় বসবাস কর, তাদের পাত্রে খানা খাও। তবে যদি তাদের পাত্র ব্যতীত অন্য পাত্র পাও, তাহ’লে তাদের পাত্রে আহার করো না। আর যদি না পাও, তাহ’লে ঐগুলো ধুয়ে নিয়ে তাতে আহার করবে। আর তুমি উল্লেখ করেছ যে তুমি শিকারের অঞ্চলে থাক। তুমি যা তীর ধনুক দ্বারা শিকার কর, তাতে তুমি বিসমিল্লাহ পড়বে এবং তা খাবে। তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে যা শিকার কর, তাতে বিসমিল্লাহ পড়বে এবং তা খাবে। আর তুমি যদি প্রশিক্ষণ বিহীন কুকুর দ্বারা শিকার কর, সেক্ষেত্রে যদি যবেহ করা যায়, তাহ’লে খেতে পার’।[4]
পক্ষান্তরে যদি জানা না যায় যে, কাফিরদের পাত্রে কোন অপবিত্র বস্ত্ত তোলা হয়েছে কি-না? তাহ’লে তা ব্যবহার করা জায়েয। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীদের একজন মুশরিক মহিলার মশক হ’তে পানি নিয়েছিলেন এবং তা পান করেছিলেন ও ওযূ করেছিলেন।[5]
মৃত পশুর চামড়া দ্বারা তৈরী পাত্র ব্যবহারের হুকুম :
যে পশুর গোশত খাওয়া হালাল সে পশু মৃত্যুবরণ করলে তার চামড়া লবণ বা অনুরূপ পদার্থ দ্বারা পাকা করলে তা পবিত্র হয় এবং তা ব্যবহার করা জায়েয। পক্ষান্তরে যে পশুর গোশত খাওয়া হারাম তার চামড়া পাকা করার মাধ্যমে পবিত্র হয় না এবং তা ব্যবহার করাও জায়েয নয়। এ প্রসঙ্গে হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ يَقُوْلُ : أَيُّمَا إِهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهُرَ.
ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে চামড়া পাকা করা হয় তা পবিত্র’।[6] অন্য হাদীছে এসেছে, মায়মূনা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, এক সময় মায়মূনার এক দাসীকে ছাদাক্বা হিসাবে একটি ছাগল দেওয়া হয়েছিল। একদিন সেটা মরে গেল (তা ফেলে দেওয়া হ’ল)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, তোমরা এর চামড়া খুলে পাকা করে নিলে না কেন? তাহ’লে প্রয়োজনে ব্যবহার করে উপকৃত হ’তে পারতে। সবাই বলল, ওটা মরে গিয়েছিল তাই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, মরে গেলে তো তা খাওয়া হারাম’ (কিন্তু তার চামড়া ব্যবহার করা তো হারাম নয়)।[7]
অতএব যে পশুর গোশত খাওয়া হালাল, সে পশু মারা গেলে তার পাকাকৃত চামড়া দ্বারা তৈরী পাত্র ব্যবহার করা জায়েয। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া এবং মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) অনুরূপ ফৎওয়া প্রদান করেছেন।[8]
[1]. বুখারী, ‘স্বর্ণের পাত্রে পানি পান করা’ অনুচ্ছেদ, হা/৫৬৩৩; বাংলা অনুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স ৫/২৯৩।
[2]. বুখারী, ‘স্বর্ণের পাত্রে পানি পান করা’ অনুচ্ছেদ, হা/৫৬৩৪; বাংলা অনুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স ৫/২৯৩।
[3]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে আলা যাদিল মসতাকনে ১/৭৫; ফিক্বহুল মুয়াস্সার, পৃঃ ৬।
[4]. বুখারী, ‘শিকার’ অধ্যায়, হা/৫৪৮৮; বাংলা অনুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স ৫/২৩০।
[5]. বুখারী, হা/৩৪৪; বাংলা অনুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স ১/১৭৪; ফিকহুল মুয়াস্সার, পৃঃ ৭।
[6]. মুসলিম, হা/৩৬৬; তিরমিযী, হা/১৬৫০।
[7]. মুসলিম, হা/৩৬৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩৬১০।
[8]. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২১/১০৩; শারহুল মুমতে আলা যাদিল মুসতাকনি, ১/৯২।
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.






