পবিত্রতা

পবিত্রতা

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

ভূমিকা :

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং ইবাদতের যাবতীয় নিয়ম-পদ্ধতি অহী মারফত জানিয়ে দিয়েছেন, যা কুরআন ও হাদীছ গ্রন্থ সমূহে বিদ্যমান। আর সকল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হল ছালাত, যা পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত বৈধ নয়। এ কারণে সকল মুহাদ্দিছ এবং ফক্বীহগণ ত্বাহারাহ বা পবিত্রতা অধ্যায় দিয়ে কিতাব লিখা শুরু করেছেন। অতএব পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে এ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হ’ল।-

الطهارة (ত্বহারাহ্)-এর আভিধানিক অর্থ :  النظافة، والنزاهة، والنقاوة অর্থাৎ পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধতা।[1]

الطهارة (ত্বহারাহ্)-এর পারিভাষিক অর্থ : পারিভাষিক অর্থে الطهارة (ত্বহারাহ্) দু’টি অর্থ প্রদান করে। যথা :

১- طهارة معنوية তথা অর্থগত দিক থেকে পবিত্রতা : তা হ’ল طهارة القلب অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তকে শরীক করা থেকে নিজের অন্তরকে পবিত্র রাখা এবং আল্লাহ তা‘আলার মুমিন বান্দার উপর হিংসা-বিদ্বেষ ও গোপন শত্রুতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

আর এটা কোন অপবিত্র বস্ত্ত থেকে শরীর পবিত্র করার চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেননা শিরক দ্বারা অপবিত্র শরীরকে পানি দ্বারা ধৌত করে পবিত্র করা সম্ভব নয়। যদিও বাহ্যিক দিক থেকে তার শরীর অপবিত্র নয়। অর্থাৎ তার শরীর স্পর্শ করলে কেউ অপবিত্র হবে না এবং তার উচ্ছিষ্ট অপবিত্র নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنَ نَجَسٌ ‘হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মুশরিকরা নাপাক বা অপবিত্র’ (তওবা ২৮)

২- الطهارة الحسية তথা অনুভবযোগ্য বাহ্যিক পবিত্রতা : তা হ’ল, رفع الحدث و زوال الخبث অর্থাৎ শরীরের অপবিত্রতা এবং শরীরে লেগে থাকা অপবিত্র বস্ত্ত দূর করা।

ব্যাখ্যা : ১- رفع الحدث তথা শরীরের নাপাকী দূর করা। অর্থাৎ যে সকল কারণ ছালাত আদায়ে বাধা প্রদান করে তা হ’তে পবিত্রতা অর্জন করা। এটা দুই প্রকার। যথা :

(ক) حدث أصغر তথা ছোট নাপাকী। যা থেকে কেবল ওযূর মাধ্যমেই পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব। যেমন পেশাব-পায়খানা এবং বায়ু নিঃসরণ হ’লে ওযূর মাধ্যমেই পবিত্রতা অর্জন করে ছালাত আদায় করা যায়।

আরও দেখুন:  মিসওয়াক সম্পর্কিত মাসআলা

(খ) حدث أكبر তথা বড় নাপাকী। যা থেকে গোসল ব্যতীত পবিত্রতা অর্জন সম্ভব নয়। যেমন- স্ত্রী সহবাস করলে অথবা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটলে গোসল ওয়াজিব হয়ে যায়। এ অবস্থায় পানি না পেলে তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়।

২- زوال الخبث তথা শরীরে লেগে থাকা নাপাকী দূর করা। অর্থাৎ পেশাব, পায়খানা ইত্যাদি শরীরে বা কাপড়ে লেগে গেলে পানি দ্বারা ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা।[2]

পবিত্রতা অর্জনের হুকুম : নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন করা সক্ষম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ‘তোমার পোষাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ’ (মুদ্দাছছির ৪)

তিনি অন্যত্র বলেছেন, وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِيْنَ وَالْعَاكِفِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُوْدِ- ‘আর ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে তাওয়াফকারী, ই‘তিকাফকারী, রুকূ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম’ (বাক্বারাহ ১২৫)

হাদীছে এসেছে,

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ إِنِّىْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ- صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ لاَ تُقْبَلُ صَلاَةٌ بِغَيْرِ طُهُوْرٍ وَلاَ صَدَقَةٌ مِنْ غُلُوْلٍ-

ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘পবিত্রতা ব্যতীত ছালাত এবং হারাম মালের দান কবুল হয় না’।[3]

পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা :

(ক) বান্দার ছালাত ছহীহ্ হওয়ার পূর্বশর্ত হ’ল পবিত্রতা অর্জন করা। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : لاَ تُقْبَلُ صَلاَةُ مَنْ أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ-

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির ওযূ ভঙ্গ হয়েছে তার ছালাত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে ওযূ না করে’।[4]

(খ) আল্লাহ তা‘আলা পবিত্রতা অর্জনকারীর প্রশংসা করেছেন এবং তিনি তাদেরকে ভালবাসেন। আললাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِيْنَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِيْنَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে’ (বাক্বারাহ ২২২)

আরও দেখুন:  মোযা, পাগড়ী ও ব্যান্ডেজের উপর মাসাহ সম্পর্কিত মাসআলা

আল্লাহ মসজিদে কুবার অধিবাসীদের প্রশংসা করে বলেন, فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّوْنَ أَنْ يَتَطَهَّرُوْا وَاللهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِيْنَ ‘সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ (তওবা ১০৮)

(গ) কবরের কঠিন আযাব থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় হ’ল অপবিত্র বস্ত্ত থেকে দূরে থাকা। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ مَرَّ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا يُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ فِىْ كَبِيْرٍ أَمَّا هَذَا فَكَانَ لاَ يَسْتَنْزِهُ مِنَ الْبَوْلِ وَأَمَّا هَذَا فَكَانَ يَمْشِى بِالنَّمِيْمَةِ-

ইবনে আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দু’টি কবরের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এই দুই ব্যক্তি শাস্তি ভোগ করছে। কিন্তু তারা বড় কোন অপরাধের কারণে শাস্তি ভোগ করছে না। তার মধ্যে এই ব্যক্তি প্রসাব থেকে সতর্ক থাকত না। আর এই ব্যক্তি চোগলখোরী করে বেড়াত’।[5]



[1]. আল-মু‘জামুল ওয়াসীত, (বৈরুত : দারু এহইয়াইত তুরাছ আল-আরাবী), পৃঃ ৩৮৭।

[2]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে আলা যাদিল মুসতাকনি ১/২৫-৩২; ফিক্বহুল মুয়াস্সার, পৃঃ ১।

[3]. মুসলিম, হা/২২৫, মিশকাত, হা/২৮১।

[4]. বুখারী, ‘পবিত্রতা ব্যতীত ছালাত কবুল হবে না’ অনুচ্ছেদ, হা/১৩৫, বাংলা অনুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ১/৮৫; মুসলিম, হা/২২৫। মিশকাত, হা/২৮০, বাংলা অনুবাদ, এমদাদিয়া ২/৪৮।

[5]. আবু দাউদ, হা/২০, নাসাঈ, হা/৩১, ৬৯, ইবনু মাজাহ, হা/৩৪৭, হাদীছ ছহীহ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button