ইহকাল-পরকাল

আল-কুরআনের আলোকে ‘ক্বিয়ামত’

ক্বিয়ামত হ’ল মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলার অলৌকিক শক্তির রূপায়ণ ও নিদর্শন। ক্বিয়ামতের বিভীষিকাময় পরিবেশের কথা জানার জন্য বিশ্ববাসীর চরম আগ্রহের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা‘আলা এর সময়কাল গোপন রেখেছেন। কোন নবী-রাসূল বা ফেরেশতারাও এর আসন্ন সময়কাল জানেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিশেষ করে উম্মতে মুহাম্মাদীর অনেকে বিষয়টি বার বার জানার আগ্রহ ব্যক্ত করলে, আল্লাহ তা‘আলা এর গোপনীয়তা সংরক্ষণের কথা বিভিন্নভাবে প্রত্যাদেশ করে পৃথিবীবাসীকে অবহিত করেন। মহান আল্লাহ বলেন, يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللهِ وَمَا يُدْرِيْكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْباً. ‘লোকেরা আপনাকে ক্বিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এর জ্ঞান আল্লাহর কাছেই আছে। আপনি কি করে জানবেন যে, সম্ভবতঃ ক্বিয়ামত শীঘ্রই হয়ে যেতে পারে’ (আহযাব ৬৩)

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, وَتَبَارَكَ الَّذِيْ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ. ‘বরকতময় তিনিই, নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু যাঁর। তাঁরই কাছে আছে ক্বিয়ামতের জ্ঞান এবং তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (যুখরুফ ৮৫)

ক্বিয়ামতের গোপনীয়তা রক্ষার ঘোষণায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ السَّاعَةَ ءاَتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى، فَلاَ يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لاَ يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى-

‘ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই, যাতে প্রত্যেকেই তার কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের জ্ঞান রাখে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তা থেকে নিবৃত্ত না করে। নিবৃত্ত হ’লে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে’ (ত্ব-হা ১৫-১৬)

একই বিষয়ে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلِلّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا أَمْرُ السَّاعَةِ إِلاَّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ إِنَّ اللهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ. ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের গোপন রহস্য আল্লাহর কাছেই রয়েছে। ক্বিয়ামতের ব্যাপারটি তো এমন, যেমন চোখের পলক অথবা তার চাইতেও নিকটবর্তী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান’ (নাহল ৭৭)। এ বিষয়ে এরশাদ হচ্ছে,

يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ لاَ يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَا إِلاَّ هُوَ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

لاَ تَأْتِيْكُمْ إِلاَّ بَغْتَةً يَسْأَلُوْنَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللهِ وَلَـكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَعْلَمُوْنَ.

‘আপনাকে জিজ্ঞেস করে, ক্বিয়ামত কখন অনুষ্ঠিত হবে? বলে দিন, এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে। তিনিই তা যথাসময়ে প্রকাশ করবেন। আসমান ও যমীনের জন্য সেটি অতি কঠিন বিষয় হবে। তোমাদের উপর আকস্মিকভাবেই তা এসে যাবে। তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর সংবাদ শুধু আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। কিন্তুঅধিকাংশ লোকই তা জানে না’ (আ‘রাফ ১৮৭)

ক্বিয়ামত দিবস হবে অকল্পনীয় ও অবর্ণনীয় এক মহাদিবস। মানব সৃষ্টির নেপথ্যে যে মহারহস্য নিহিত আছে, আসন্ন ক্বিয়ামত দিবসের ঘোষণায়ও অনুরূপ আশ্চর্যজনক রহস্য লুক্কায়িত আছে। এর মধ্য দিয়ে ক্বিয়ামতের সর্বোচ্চ ও সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সমূহ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

সর্বশক্তিমান আল্লাহর অসীম কুদরত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরও গভীরতর বিচার-বিশ্লেষণের অভাবে একটা বৃহৎ দল ধর্মদ্বেষী হয়ে ক্বিয়ামতে অবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয় দলের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা দেয়। সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা‘আলা এদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করে প্রত্যাদেশ করেন যে, إِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ لاَّ رَيْبَ فِيْهَا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يُؤْمِنُوْنَ ‘ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ্বাস স্থাপন করে না’ (মুমিন ৫৯)

মূলতঃ ক্বিয়ামতে অবিশ্বাসী হচ্ছে কাফের ও মুনাফিকদের দল। কাফেরদের ক্বিয়ামতে অবিশ্বাস সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন,

وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لاَ تَأْتِيْنَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّيْ لَتَأْتِيَنَّكُمْ عَالِمِ الْغَيْبِ لاَ يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلاَ فِي الْأَرْضِ وَلاَ أَصْغَرُ مِنْ ذَلِكَ وَلاَ أَكْبَرُ إِلاَّ فِيْ كِتَابٍ مُّبِيْنٍ-

‘কাফেররা বলে, আমাদের উপর ক্বিয়ামত আসবে না। বলুন, আমার পালনকর্তার শপথ! অবশ্যই তোমাদের নিকটে আসবে। তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে তাঁর অগোচর নয় অনুপরিমাণ কিছু, না তদপেক্ষা ক্ষুদ্র এবং না বৃহৎ, সমস্তই আছে সুস্পষ্ট কিতাবে’ (সাবা ৩)

একই বিষয়ে আরো বলা হয়েছে,قُل لَّكُمْ مِّيْعَادُ يَوْمٍ لاَّ تَسْتَأْخِرُوْنَ عَنْهُ سَاعَةً وَّلاَ تَسْتَقْدِمُوْنَ ‘বলুন, তোমাদের জন্য একটি দিনের ওয়াদা রয়েছে, যাকে তোমরা এক মুহূর্তও বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিতও করতে পারবে না’ (সাবা ৩০)

কাফেররা ক্বিয়ামতকে একটা মিথ্যা প্রচারণা মনে করে। ফলে তাদের মনে নানারূপ সন্দেহ-সংশয় ও অবিশ্বাস ভর করে এবং তারা বিভিন্নভাবে একে প্রত্যাখ্যান করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

وَلاَ يَزَالُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فِيْ مِرْيَةٍ مِّنْهُ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً أَوْ يَأْتِيَهُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَقِيْمٍ، الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ لِّلَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فَالَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصَّالِحَاتِ فِيْ جَنَّاتِ النَّعِيْمِ، وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَكَذَّبُوْا بِآيَاتِنَا فَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ-

‘কাফেররা সর্বদা সন্দেহ পোষণ করবে যে পর্যন্ত না তাদের কাছে আকস্মিকভাবে ক্বিয়ামত এসে পড়ে অথবা এসে পড়ে তাদের কাছে এমন দিবসের শাস্তি, যা থেকে রক্ষার উপায় নেই। রাজত্ব সেদিন আল্লাহরই, তিনিই তাদের বিচার করবেন। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তারা নে‘মতপূর্ণ কাননে থাকবে এবং যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াত সমূহকে মিথ্যা বলে তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি রয়েছে’ (হজ্জ ৫৫-৫৭)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرضِ وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَخْسَرُ الْمُبْطِلُوْنَ- ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (জাছিয়া ২৭)

তিনি আরো বলেন,

وَإِذَا قِيْلَ إِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ لاَ رَيْبَ فِيْهَا قُلْتُم مَّا نَدْرِيْ مَا السَّاعَةُ إِنْ نَّظُنُّ إِلاَّ ظَنًّا وَمَا نَحْنُ بِمُسْتَيْقِنِيْنَ، وَبَدَا لَهُمْ سَيِّئَاتُ مَا عَمِلُوْا وَحَاقَ بِهِمْ مَّا كَانُوْا بِهِ يَسْتَهْزِئُوْنَ-

‘যখন বলা হয়, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং ক্বিয়ামতে কোন সন্দেহ নেই, তখন তোমরা বলে থাক আমরা জানি না ক্বিয়ামত কি? আমরা কেবল ধারণাই করি এবং এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তাদের মন্দ কর্মগুলো তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যে আযাব নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে গ্রাস করবে’ (জাছিয়া ৩২-৩৩)

বর্তমান বিশ্বে আধুনিক বিজ্ঞানী বা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় দ্বারা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছেন এবং বিগত কয়েক দশকে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দিন তারিখও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা এতটুকু কার্যকর হয়নি। অতএব বুঝা যায়, এ পৃথিবীর কোন কিছুই কার্যকর হয় না আল্লাহর হুকুম ব্যতীত। অবশ্য বিজ্ঞানীদের বর্ণনায় পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে ক্বিয়ামতের ধ্বংসযজ্ঞের যৎসামান্য সাদৃশ্য রয়েছে। বিজ্ঞানীদের এই তথ্যে বর্তমান বিশ্বের জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিনক্ষণ গোপন রেখেছেন। তিনি একদিন তা প্রকাশ করে দেবেন, আর সঙ্গে সঙ্গে ক্বিয়ামত শুরু হয়ে যাবে।

পার্থিব জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয়ে মানুষের কোন জ্ঞান নেই, যেমন কে কোথায় জন্মগ্রহণ করবে ও মৃত্যুবরণ করবে, আগামী কাল কি ঘটবে, কে ধনী হবে আর কে হবে দরিদ্র, কে হবে ভাগ্যবান আর কে হতভাগ্য, কে হবে অন্ধ, পঙ্গু আর কে হবে সর্বাঙ্গ সুন্দর, আর কখন হবে প্রচন্ড ঝড় ও বৃষ্টি, ভূকম্পন ও ভূমিধ্বস ইত্যাদি, কোন মানুষের পক্ষে তা জানা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু ক্বিয়ামতের মতই এগুলো আল্লাহর জানা। তাঁর পক্ষে অসম্ভব বলতে কোন কিছুই নেই। এ মর্মে আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَداً وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ إِنَّ اللهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছেই ক্বিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত’ (লোকমান ৩৪)

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

إِلَيْهِ يُرَدُّ عِلْمُ السَّاعَةِ وَمَا تَخْرُجُ مِنْ ثَمَرَاتٍ مِّنْ أَكْمَامِهَا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنْثَى وَلاَ تَضَعُ إِلاَّ بِعِلْمِهِ وَيَوْمَ يُنَادِيْهِمْ أَيْنَ شُرَكَائِيْ قَالُوْا آذَنَّاكَ مَا مِنَّا مِنْ شَهِيْدٍ-

‘ক্বিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র তাঁরই জানা। তাঁর অজ্ঞাতসারে বাইরে কোন ফল আবরণমুক্ত হয় না এবং কোন নারী গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব করে না। যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, আমার শরীকরা কোথায়? সেদিন তারা বলবে, আমরা আপনার নিকট নিবেদন করি যে, আমরা কিছুই জানি না’ (হা-মীম সাজদাহ ৪৭)

মূলতঃ ক্বিয়ামত হবে মানবজীবনের শেষ পরীক্ষা কেন্দ্র। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব জাতিকে এ পার্থিব জগতে আল্লাহর হুকুম মান্য করে এবং শয়তানের প্ররোচনা ও পরামর্শ হ’তে বেঁচে থেকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। যারা আল্লাহর হুকুম বা আদেশ-নিষেধ মেনে পরজগতে পাড়ি জমাতে পারবে, ক্বিয়ামত হবে তাদের জন্য আশীর্বাদ বা অভয় কেন্দ্র।  পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়ে শয়তানের মিথ্যা ধোঁকায় পৃথিবীতে নানা অনাচার ও অবিচার করে মৃত্যুবরণ করবে, ক্বিয়ামত তাদের জন্য অভিশাপ, দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

নির্ধারিত সময় উপস্থিত হ’লেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। তখন কেউ কোন কাজ করার বা কথা বলার সুযোগ পাবে না। ক্বিয়ামতের পূর্বাবস্থার একটি হাদীছ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করা হ’ল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ক্বিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না দু’টি বৃহৎ দল পরস্পর তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হবে। অথচ তাদের উভয় দলেরই মূল দাবী হবে এক ও অভিন্ন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে, তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর নবী বলে দাবী করবে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না ধর্মীয় ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে। ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাবে। সময়ের পরিধি সংকীর্ণ হয়ে আসবে। (অর্থাৎ সময় দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাবে)। ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। খুন-খারাবী, হত্যাকান্ড ও মারামারি-হানাহানি অত্যধিক বৃদ্ধি পাবে। এমনকি তোমাদের মধ্যে ধন-সম্পদের এমন প্রাচুর্য দেখা দেবে যে, সম্পদশালী ব্যক্তি, ধন-সম্পদের মালিক (তার ছাদাক্বা প্রদান করার জন্য) চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে পড়বে এজন্য যে, কে তার ছাদাক্বা গ্রহণ করবে? এমনকি যার নিকটই সে মাল উপস্থাপন করা হবে, সে বলে উঠবে আমার এ মালের কোন প্রয়োজন নেই। আর যতক্ষণ না জনগণ সুউচ্চ ও কারুকার্যখচিত ইমারত নির্মাণ কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা করবে। যতক্ষণ না কোন ব্যক্তি কোন কবরের নিকট দিয়ে গমন কালে (পরিতাপ করে বলবে) হায়! আমি যদি তার স্থানে হ’তাম! আর যতক্ষণ না পশ্চিম দিক হ’তে সূর্য উদিত হবে। অতঃপর সূর্য (পশ্চিম দিক হ’তে) উদিত হ’লে জনগণ তা প্রত্যক্ষ করে সকলেই (আল্লাহর প্রতি) ঈমান আনয়ন করবে। কিন্তুلاَ يَنفَعُ نَفْساً إِيْمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِيْ إِيْمَانِهَا خَيْرًا- ‘এখনকার ঈমান কোন লোকেরই উপকারে আসবে না। যে ব্যক্তি ইতিপূর্বে ঈমান আনয়ন করেনি কিংবা ঈমানদার অবস্থায় কোন সৎ ও ন্যায় কাজ করেনি’ (আন‘আম ১৫৮)। আর ক্বিয়ামত এমন পরিস্থিতি ও এমন অবস্থায় কায়েম হবে যে, দু’ব্যক্তি (ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রেতাদের সম্মুখে) কাপড় ছড়িয়ে ও খুলে বসবে। কিন্তু সে কাপড় ক্রয়-বিক্রয় কিংবা ছড়ান কাপড়টা গুটিয়ে নেয়া বা ভাঁজ করারও সুযোগ পাবে না। আর ক্বিয়ামত এমন পরিস্থিতি ও পরিবেশে অবশ্যই কায়েম হবে যে, এক ব্যক্তি উট দোহন করে নিয়ে আসবে, কিন্তু সে তা পান করারও সুযোগ পাবে না। ক্বিয়ামত অবশ্যই কায়েম হবে এমতাবস্থায় যে, এক ব্যক্তি তার পশুর জন্য চৌবাচ্চা বা জলাধার মেরামত বা নির্মাণ করতে থাকবে। কিন্তু তাতে সে পানি পান করাবার সুযোগ পাবে না। আর ক্বিয়ামত এমন পরিস্থিতি ও পরিবেশে অবশ্যই কায়েম হবে যে, এক ব্যক্তি খাদ্যের লোকমা বা গ্রাস তার মুখ পর্যন্ত উত্তোলন করবে কিন্তু সে তা খাওয়া ও গলধঃকরণ করার সুযোগ পাবে না। (বুখারী)

আরও দেখুন:  জান্নাত

ক্বিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে নিম্নে কয়েকটি আয়াত পেশ করা হ’ল। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيْمٌ، يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللهِ شَدِيْدٌ- ‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই  ক্বিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল। অথচ তারা মাতাল নয়, বস্ত্ততঃ আল্লাহর আযাব  অত্যন্ত কঠিন’ (হজ্জ ১-২)। মহান আল্লাহ বলেন,

فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ، وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً، فَيَوْمَئِذٍ وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ، وَانْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ، وَالْمَلَكُ عَلَى أَرْجَائِهَا وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ-

‘যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে একটি মাত্র ফুৎকার এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে এবং এক ধাক্কায় তারা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, সেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়বে এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আটজন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের ঊর্ধ্বে বহন করবে’ (হাক্বকাহ ১৩-১৭)

অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,

فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَلاَ أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَتَسَاءَلُوْنَ، فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِيْنُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ، وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِيْنُهُ فَأُوْلَئِكَ الَّذِيْنَ خَسِرُوْا أَنْفُسَهُمْ فِيْ جَهَنَّمَ خَالِدُوْنَ-

‘অতঃপর যখন সিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম এবং যাদের পাল্লা হাল্কা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা জাহান্নামেই চিরকাল বসবাস করবে’ (মুমিনূন ১০১-১০৩)

ক্বিয়ামত দিবসের প্রথম নিদর্শনই হবে সিংগায় ফুৎকারের বিকট আওয়াজ। সিংগায় এই ফুৎকারের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে। পাহাড়-পর্বত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে ধূলিকণার ন্যায় উড়ে বেড়াবে, আকাশ ও পৃথিবী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। পবিত্র কুরআন ও হাদীছ দ্বারা ক্বিয়ামতে শিংগায় দুইটি ফুৎকার প্রমাণিত হয়। প্রথম ফুৎকারে ধ্বংস অনিবার্য যা উপরের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর দ্বিতীয়বার সিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে। ফলে অকস্মাৎ সব মৃত জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহর পানে ধাবিত হবে। এমর্মে মহান আল্লাহর বাণী, وَنُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلاَّ مَن شَاءَ اللهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيْهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُوْنَ- ‘সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন। অতঃপর আবার সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে’ (যুমার ৬৮)

একইভাবে অন্যত্র ঘোষিত হয়েছে,

وَنُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُوْنَ، قَالُوْا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ-

‘সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন’ (ইয়াসীন ৫১-৫২)

একই বিষয়ে মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّوْرِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلاَّ مَنْ شَاءَ اللهُ وَكُلٌّ أَتَوْهُ دَاخِرِيْنَ- ‘যেদিন সিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে, অতঃপর আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করবেন, তারা ব্যতীত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যারা আছে, তারা সবাই ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে এবং সকলেই তার কাছে আসবে বিনীত অবস্থায়’ (নামল ৮৭)

যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী তারাই ক্বিয়ামতে সফলকাম হবে। পক্ষান্তরে যারা ক্বিয়ামতকে মিথ্যা ভাববে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহকে অবিশ্বাস করবে, তারা ক্বিয়ামতে কোপানলে পতিত হবে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সকল বান্দাকে সঠিকভাবে ক্বিয়ামতের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মহামূল্যবান আদেশ সমূহকে একাধিকবার বা বহুবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রত্যাদেশ করেছেন। তন্মধ্যে ক্বিয়ামতের ভীতিকর ও আতংকজনক আলোচনা নিঃসন্দেহে অন্যতম। ক্বিয়ামতের অচিন্তনীয় ও নিদারুণ শাস্তির প্রেক্ষাপটেই দয়াশীল আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের বহুমুখী আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সেরা বস্ত্তগুলির নামে বার বার শপথ করে প্রত্যাদেশ করতে থাকেন বান্দার হৃদয়ে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَالنَّازِعَاتِ غَرْقاً، وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطاً، وَالسَّابِحَاتِ سَبْحاً، فَالسَّابِقَاتِ سَبْقاً، فَالْمُدَبِّرَاتِ أَمْراً، يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ، تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ، قُلُوْبٌ يَوْمَئِذٍ وَاجِفَةٌ، أَبْصَارُهَا خَاشِعَةٌ-

‘শপথ সেই ফেরেশতাগণের, যারা ডুব দিয়ে আত্মা উৎপাটন করে। শপথ তাদের, যারা আত্মার বাঁধন খুলে দেয় মৃদুভাবে। শপথ তাদের, যারা সন্তরণ করে দ্রুতগতিতে, শপথ তাদের যারা দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয় এবং শপথ তাদের, যারা সকল কর্মনির্বাহ করে। যেদিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পিতকারী, অতঃপর পশ্চাতে আসবে পশ্চাদগামী, সেদিন অনেক হৃদয় ভীত-বিহবল হবে। তাদের দৃষ্টি নত হবে’ (নাযি‘আত ১-৯)

ক্বিয়ামতের অপরিসীম দৃঢ়তা ব্যক্ত করে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

وَالْمُرْسَلاَتِ عُرْفاً، فَالْعَاصِفَاتِ عَصْفاً، وَالنَّاشِرَاتِ نَشْراً، فَالْفَارِقَاتِ فَرْقاً، فَالْمُلْقِيَاتِ ذِكْراً، عُذْراً أَوْ نُذْراً، إِنَّمَا تُوْعَدُوْنَ لَوَاقِعٌ، فَإِذَا النُّجُوْمُ طُمِسَتْ، وَإِذَا السَّمَاءُ فُرِجَتْ، وَإِذَا الْجِبَالُ نُسِفَتْ، وَإِذَا الرُّسُلُ أُقِّتَتْ، لِأَيِّ يَوْمٍ أُجِّلَتْ، لِيَوْمِ الْفَصْلِ-

‘কল্যাণের জন্য প্রেরিত বায়ুর শপথ, সজোরে প্রবাহিত ঝটিকার শপথ, মেঘ বিস্তৃতকারী বায়ুর শপথ, মেঘপুঞ্জ বিতরণকারী বায়ুর শপথ এবং অহী নিয়ে অবতরণকারী ফেরেশতাগণের শপথ, ওযর-আপত্তির অবকাশ না রাখার জন্য অথবা সতর্ক করার জন্য; নিশ্চয়ই তোমাদেরকে প্রদত্ত ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে। অতঃপর যখন  নক্ষত্রসমূহ নির্বাপিত হবে, যখন আকাশ ছিদ্রযুক্ত হবে, যখন পর্বতমালাকে উড়িয়ে দেয়া হবে এবং যখন রাসূলগণের একত্রিত হওয়ার সময় নিরূপিত হবে, এসব বিষয় কোন দিবসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে? বিচার দিবসের (ক্বিয়ামতের) জন্য’ (মুরসালাত ১-১৩)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

لاَ أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَة، وَلاَ أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ، أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّنْ نَجْمَعَ عِظَامَهُ، بَلَى قَادِرِيْنَ عَلَى أَنْ نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ، بَلْ يُرِيْدُ الْإِنْسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ، يَسْأَلُ أَيَّانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ، وَخَسَفَ الْقَمَرُ، وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ، يَقُوْلُ الْإِنْسَانُ يَوْمَئِذٍ أَيْنَ الْمَفَرُّ، كَلاَّ لاَ وَزَرَ، إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمُسْتَقَرُّ، يُنَبَّأُ الْإِنْسَانُ يَوْمَئِذٍ بِمَا قَدَّمَ وَأَخَّرَ-

‘আমি শপথ করি ক্বিয়ামত দিবসের, আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়। মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করব না? পরন্তু আমি তার অঙ্গুলিগুলো পর্যন্ত সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম। বরং মানুষ তার ভবিষ্যৎ জীবনেও পাপাচার করতে চায়। সে প্রশ্ন করে, ক্বিয়ামত দিবস কবে? যখন দৃষ্টি চমকে যাবে, চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। সেদিন মানুষ বলবে, পলায়নের জায়গা কোথায়? না কোথাও আশ্রয়স্থল নেই, আপনার পালনকর্তার কাছেই সেদিন ঠাঁই হবে। সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে, সে যা সামনে প্রেরণ করেছে ও পশ্চাতে ছেড়ে দিয়েছে’ (ক্বিয়ামাহ ১-১৩)

অতঃপর মানুষকে বিচারের সম্মুখীন হ’তে হবে এবং সে জানতে পারবে নিজের সৎ ও অসৎ কর্মের হিসাব। অপরাধীরা তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَنَضَعُ الْمَوَازِيْنَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلاَ تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئاً وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِيْنَ-

‘আমি ক্বিয়ামতের দিন ন্যায়-বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি সামান্যতম যুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট’ (আম্বিয়া ৪৭)

আরও দেখুন:  কিয়ামত আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবী

অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يُبْلِسُ الْمُجْرِمُوْنَ ‘যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে’ (রূম ১২)

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُوْنَ مَا لَبِثُوْا غَيْرَ سَاعَةٍ كَذَلِكَ كَانُوْا يُؤْفَكُوْنَ- ‘যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, এক মুহূর্তেরও বেশী অবস্থান করিনি। এমনিভাবে তারা সত্য বিমুখ হ’ত’ (রূম ৫৫)

ক্বিয়ামত দিবসের প্রতিকূল পরিবেশে অপরাধীদের বাস্তব অবস্থার বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

ﻭَﻟَﻮْ ﺃَﻥَّ ﻟِﻠَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﻣَﺎ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺟَﻤِﻴْﻌﺎً ﻭَﻣِﺜْﻠَﻪُ ﻣَﻌَﻪُ ﻻَﻓْﺘَﺪَﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﻣِﻦْ ﺳُﻮْﺀِ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻭَﺑَﺪَﺍ ﻟَﻬُﻢْ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻮْﻧُﻮْﺍ ﻳَﺤْﺘَﺴِﺒُﻮْﻥَ، ﻭَﺑَﺪَﺍ ﻟَﻬُﻢْ ﺳَﻴِّﺌَﺎﺕُ ﻣَﺎ ﻛَﺴَﺒُﻮْﺍ ﻭَﺣَﺎﻕَ ﺑِﻬِﻢ ﻣَّﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﺑِﻪِ ﻳَﺴْﺘَﻬْﺰِﺋُﻮْﻥ –

‘যদি গোনাহগারদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে অবশ্যই তারা ক্বিয়ামতের দিন সে সবকিছুই নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে দিবে। অথচ তারা দেখতে পাবে; আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনাও করত না। আর দেখবে তাদের দুষ্কর্ম সমূহ এবং যে বিষয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। তা তাদেরকে ঘিরে নিবে’ (যুমার ৪৭-৪৮) ।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন সবচেয়ে কম আযাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বলবেন, যদি গোটা পৃথিবী পরিমাণ সম্পদ থাকত তবে কি তুমি সে সমুদয়ের বিনিময়ে এ আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। আল্লাহ বলবেন, আদমের ঔরসে থাকাকালে এর চেয়েও সহজ বিষয়ের হুকুম করেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। কিন্তু তুমি তা অমান্য করেছ এবং আমার সাথে শরীক করেছ’ (বুখারী) ।

পবিত্র কুরআনে ক্বিয়ামতের বর্ণনা নানাভাবে নানা পর্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে। তবে এসব বর্ণনার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হ’ল ক্বিয়ামতের প্রতি বিদ্যমান অবিশ্বাস হ’তে মানব জাতিকে ফিরিয়ে আনা। কুরআন আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলী, রহমত, ছওয়াব, গযব ও আযাবের অদ্বিতীয় স্মারক। এজন্য ক্বিয়ামতের মহা নিনাদ, ভয়ঙ্কর গর্জন, ভীতিকর পরিবেশ ইত্যাদির মাঝে হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদান ও শাস্তির যে ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। অতঃপর বাস্তবায়ন মুহূর্তের কতিপয় অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে যে, অপরাধীরা তাদের দীর্ঘজীবনের অপকর্মের সময়কে খুবই সল্প সময় হিসাবে ব্যক্ত করে স্বস্তি লাভের চেষ্টা করবে। এক পর্যায়ে গোনাহগাররা পৃথিবীর সব ধন-সম্পদের বিনিময়েও আল্লাহ্র কঠোর আযাব হ’তে রক্ষা লাভের জন্য প্রলাপ করবে। এসব বিষয় উপরের আয়াতে সংক্ষেপে উপস্থাপিত হয়েছে। এই পাপী কাফেরদের জন্য রয়েছে শিকল, বেড়ি ও জাহান্নাম।

আর মুমিন ও ইবাদতকারীদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত নে‘মত, যা তারা কল্পনা করতে পারবে না। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

ﻓَﻼَ ﺗَﻌْﻠَﻢُ ﻧَﻔْﺲٌ ﻣَّﺎ ﺃُﺧْﻔِﻲَ ﻟَﻬُﻢ ﻣِّﻦْ ﻗُﺮَّﺓِ ﺃَﻋْﻴُﻦٍ ﺟَﺰَﺍﺀً ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ، ﺃَﻓَﻤَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻣُﺆْﻣِﻨﺎً ﻛَﻤَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻓَﺎﺳِﻘﺎً ﻟَّﺎ ﻳَﺴْﺘَﻮُﻭْﻥَ، ﺃَﻣَّﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻭَﻋَﻤِﻠُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤَﺎﺕِ ﻓَﻠَﻬُﻢْ ﺟَﻨَّﺎﺕُ ﺍﻟْﻤَﺄْﻭَﻯ ﻧُﺰُﻻً ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ، ﻭَﺃَﻣَّﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻓَﺴَﻘُﻮْﺍ ﻓَﻤَﺄْﻭَﺍﻫُﻢُ ﺍﻟﻨَّﺎﺭُ ﻛُﻠَّﻤَﺎ ﺃَﺭَﺍﺩُﻭْﺍ ﺃَﻥْ ﻳَﺨْﺮُﺟُﻮْﺍ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺃُﻋِﻴْﺪُﻭْﺍ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﻭَﻗِﻴْﻞَ ﻟَﻬُﻢْ ﺫُﻭْﻗُﻮْﺍ ﻋَﺬَﺍﺏَ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﺗُﻜَﺬِّﺑُﻮْﻥَ –

‘কেউ জানে না তার জন্য কৃতকর্মের কি কি নয়ন প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে। ঈমানদার ব্যক্তি কি অবাধ্যের অনুরূপ? তারা সমান নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের আপ্যায়ন স্বরূপ বসবাসের জান্নাত। পক্ষান্তরে যারা অবাধ্য হয়, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম’ (সাজদাহ ১৭-২০) ।

মানব জাতির জন্য আল্লাহপাক বিশ্বজগতের যাবতীয় বস্ত্ত অতি সুন্দর ও নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে মানবের শ্রেষ্ঠত্ব বিকাশের জন্য এক বিশাল ও বিপুলায়তনের অন্তর্জগতও সৃষ্টি করেছেন নিখুঁত ও নিরঙ্কুশভাবে। এই অন্তর্জগতই হ’ল মানুষের সম্মান, খ্যাতি ও যশের একমাত্র লীলাভূমি। আবার কলংক, অধঃপন ও অমর্যাদার অতল তলে তলিয়ে যাওয়ারও পথ। সমগ্র বিশ্বজগতের অসীম অনন্ত ও অবাধ্য পরিবেশের চেয়ে, ব্যক্তিগত অন্তর্জগতের সীমাবদ্ধ ও বাধ্যগত পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক অনেক সহজ। এজন্য মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সার্বক্ষণিকভাবে স্মরণ করার জন্য মানুষকে বার বার আহবান জানিয়েছেন। অতঃপর যারা আল্লাহকে স্মরণ করে তারা, তাঁর সন্তুষ্টি লাভে সমর্থ হয় এবং সৎপথ প্রাপ্ত হয়। অপরদিকে যারা শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ্র স্মরণ ভুলে যায় বা অগ্রাহ্য করে, আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। ফলে তারা জাহান্নামের আমল করে নিজেদের ধ্বংস করে।

ক্বিয়ামতে আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে অন্ধ করে উঠাবেন। মহান আল্লাহ বলেন,

ﻭَﻣَﻦْ ﺃَﻋْﺮَﺽَ ﻋَﻦ ﺫِﻛْﺮِﻱْ ﻓَﺈِﻥَّ ﻟَﻪُ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺔً ﺿَﻨْﻜﺎً ﻭَﻧَﺤْﺸُﺮُﻩُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺃَﻋْﻤَﻰ، ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﻟِﻢَ ﺣَﺸَﺮْﺗَﻨِﻲْ ﺃَﻋْﻤَﻰ ﻭَﻗَﺪْ ﻛُﻨْﺖُ ﺑَﺼِﻴْﺮﺍً، ﻗَﺎﻝَ ﻛَﺬَﻟِﻚَ ﺃَﺗَﺘْﻚَ ﺁﻳَﺎﺗُﻨَﺎ ﻓَﻨَﺴِﻴْﺘَﻬَﺎ ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﺗُﻨْﺴَﻰ –

‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে ক্বিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াত সমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। অতএব তোমাকে আজ ভুলে যাব’

(ত্বোয়া-হা ১২৪-১২৬) ।

একইভাবে অন্যত্র বলা হয়েছে যে,

ﻳَﻮْﻡَ ﺗَﺸْﻬَﺪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺃَﻟْﺴِﻨَﺘُﻬُﻢْ ﻭَﺃَﻳْﺪِﻳْﻬِﻢْ ﻭَﺃَﺭْﺟُﻠُﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ، ﻳَﻮْﻣَﺌِﺬٍ ﻳُﻮَﻓِّﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟﻠﻪُ ﺩِﻳْﻨَﻬُﻢُ ﺍﻟْﺤَﻖَّ ﻭَﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻫُﻮَ ﺍﻟْﺤَﻖُّ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴْﻦُ –

‘যেদিন প্রকাশ করে দিবে তাদের জিহবা, তাদের হাত ও তাদের পা যা কিছু তারা করত। সেদিন আল্লাহ তাদের সমুচিত শাস্তি পুরোপুরি দিবেন এবং তারা জানতে পারবে যে, আল্লাহই সত্য স্পষ্ট ব্যক্তকারী’ (নূর ২৪-২৫) ।

আলোচ্য বিষয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়াসে আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় প্রত্যাদেশ করেন,

ﻭَﻳَﻮْﻡَ ﻳُﺤْﺸَﺮُ ﺃَﻋْﺪَﺍﺀَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ﻓَﻬُﻢْ ﻳُﻮْﺯَﻋُﻮْﻥَ، ﺣَﺘَّﻰ ﺇِﺫَﺍ ﻣَﺎ ﺟَﺎﺅُﻭْﻫَﺎ ﺷَﻬِﺪَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺳَﻤْﻌُﻬُﻢْ ﻭَﺃَﺑْﺼَﺎﺭُﻫُﻢْ ﻭَﺟُﻠُﻮْﺩُﻫُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ، ﻭَﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟِﺠُﻠُﻮْﺩِﻫِﻢْ ﻟِﻢَ ﺷَﻬِﺪﺗُّﻢْ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺃَﻧْﻄَﻘَﻨَﺎ ﺍﻟﻠﻪُ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﺃَﻧْﻄَﻖَ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﺃَﻭَّﻝَ ﻣَﺮَّﺓٍ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺗُﺮْﺟَﻌُﻮْﻥَ، ﻭَﻣَﺎ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﺴْﺘَﺘِﺮُﻭْﻥَ ﺃَﻥْ ﻳَﺸْﻬَﺪَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺳَﻤْﻌُﻜُﻢْ ﻭَﻻَ ﺃَﺑْﺼَﺎﺭُﻛُﻢْ ﻭَﻻَ ﺟُﻠُﻮْﺩُﻛُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻇَﻨَﻨﺘُﻢْ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻢُ ﻛَﺜِﻴْﺮﺍً ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ –

‘যেদিন আল্লাহ্র শত্রুদেরকে অগ্নিকুন্ডের দিকে ঠেলে নেওয়া হবে এবং ওদের বিন্যস্ত করা হবে বিভিন্ন দলে। তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, চক্ষু ও ত্বক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবে। তারা তাদের ত্বককে বলবে, তোমরা আমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিলে কেন? তারা বলবে, যে আল্লাহ সবকিছুর বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমাদের কান, তোমাদের চক্ষু এবং তোমাদের ত্বক তোমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে না, এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তোমরা তাদের কাছে কিছু গোপন করতে না। তবে তোমাদের ধারণা ছিল যে, তোমরা যা কর তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না’ (হা-মীম-সাজদাহ ১৯-২২) ।

ক্বিয়ামত হবে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আঃ) হ’তে শুরু করে শেষ দিবসের শেষ মানুষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সমস্ত মানুষের মিলন কেন্দ্র, পরীক্ষা কেন্দ্র তথা বিচার কেন্দ্র। সেখানে যা ঘটবে তার একটি ছোট্ট নমুনা। যা উপরের আয়াতে সকল মানবের অবগতির জন্য বর্ণিত হয়েছে। মানুষের হাত, পা, কান, চোখ, ত্বক ইত্যাদি তার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, এটা অবশ্যই বিস্ময়কর। ঐ দিন সকল মানুষ ক্বিয়ামতের ময়দানে সমবেত হবে, কেউ অনুপস্থিত থাকতে পারবে না এবং সকলকে একাকী অবস্থায় আল্লাহ্র দরবারে হাযির হ’তে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

ﺇِﻥْ ﻛُﻞُّ ﻣَﻦْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺇِﻟَّﺎ ﺁﺗِﻲَ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻋَﺒْﺪﺍً، ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺣْﺼَﺎﻫُﻢْ ﻭَﻋَﺪَّﻫُﻢْ ﻋَﺪّﺍً، ﻭَﻛُﻠُّﻬُﻢْ ﺁﺗِﻴْﻪِ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻓَﺮْﺩﺍً –

‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় আল্লাহ্র কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদেরকে গণনা করে রেখেছেন। ক্বিয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে’

(মারিয়াম ৯৩-৯৫) ।

অতঃপর ঐদিন আল্লাহ তা‘আলা সুদীর্ঘ সময়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের খতিয়ান বহিঃপ্রকাশ করে দিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। মহিমাময় পরওয়ারদেগার তাঁর অলৌকিক শক্তিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন। মানুষের কর্ম অনুযায়ী তাদেরকে পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত করা হবে। অতঃপর তাদের কর্মফল অনুযায়ী তাদের কারো ডান হাতে ও কারো বাম হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্তরা হবে সৌভাগ্যবান এবং বাম হাতে আমলনামাপ্রাপ্তরা হবে দুর্ভাগ্যবান। এদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন,

ﻓَﺄَﻣَّﺎ ﻣَﻦْ ﺃُﻭْﺗِﻲَ ﻛِﺘَﺎﺑَﻪُ ﺑِﻴَﻤِﻴﻨِﻪِ، ﻓَﺴَﻮْﻑَ ﻳُﺤَﺎﺳَﺐُ ﺣِﺴَﺎﺑﺎً ﻳَﺴِﻴﺮﺍً، ﻭَﻳَﻨْﻘَﻠِﺐُ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﻫْﻠِﻪِ ﻣَﺴْﺮُﻭْﺭﺍً، ﻭَﺃَﻣَّﺎ ﻣَﻦْ ﺃُﻭْﺗِﻲَ ﻛِﺘَﺎﺑَﻪُ ﻭَﺭَﺍﺀَ ﻇَﻬْﺮِﻩِ، ﻓَﺴَﻮْﻑَ ﻳَﺪْﻋُﻮْ ﺛُﺒُﻮْﺭﺍً، ﻭَﻳَﺼْﻠَﻰ ﺳَﻌِﻴْﺮﺍً-

‘যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ সহজ হয়ে যাবে এবং সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে হৃষ্টচিত্তে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিছনদিক থেকে দেয়া হবে, সে মৃত্যুকে আহবান করবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (ইনশিক্বাক্ব ৭-১২) ।

ক্বিয়ামত দিবস অবিশ্বাসী ও কাফেরদের জন্য হবে মারাত্মক, তারা প্রত্যেকেই তার কাজকর্ম স্বচক্ষে দেখতে পাবে; হয় আমলনামা হাতে আসার পরে দেখবে, না হয় কাজকর্ম সব স্বশরীরী হয়ে সামনে এসে যাবে। ফলে ক্বিয়ামতের অলৌকিক দৃশ্য কাফেরদের সামনে হাযার বছরের সমতুল্য মনে হবে। পক্ষান্তরে সৎকর্মপরায়ণদের সামনে এর কোন প্রভাবই পড়বে না। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

ﻳُﺪَﺑِّﺮُ ﺍﻟْﺄَﻣْﺮَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺛُﻢَّ ﻳَﻌْﺮُﺝُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻓِﻲْ ﻳَﻮْﻡٍ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻘْﺪَﺍﺭُﻩُ ﺃَﻟْﻒَ ﺳَﻨَﺔٍ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻌُﺪُّﻭْﻥَ، ﺫَﻟِﻚَ ﻋَﺎﻟِﻢُ ﺍﻟْﻐَﻴْﺐِ ﻭَﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓِ ﺍﻟْﻌَﺰِﻳْﺰُ ﺍﻟﺮَّﺣِﻴْﻢُ –

‘তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন। অতঃপর তা তাঁর কাছে পেঁŠছবে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাযার বছরের সমান। তিনিই দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী, পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু’ (সাজদাহ ৫-৬) ।

আরও দেখুন:  পুনরুত্থান

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﺗَﻌْﺮُﺝُ ﺍﻟْﻤَﻠَﺎﺋِﻜَﺔُ ﻭَﺍﻟﺮُّﻭْﺡُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻓِﻲْ ﻳَﻮْﻡٍ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻘْﺪَﺍﺭُﻩُ ﺧَﻤْﺴِﻴْﻦَ ﺃَﻟْﻒَ ﺳَﻨَﺔٍ ‘ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা‘আলার দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাযার বছর’ (মা‘আরিজ ৪) ।

ক্বিয়ামতে সীমালংঘনকারীরাই সর্বাধিক আতংক, উৎকণ্ঠা ও হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হবে। কাফের, মুনাফিক ও অবিশ্বাসীরাও আতংকগ্রস্ত থাকবে এবং অপরাধের পরিমাণ অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। অতীত জীবনের স্থায়িত্ব কালকে খুবই সামান্য সময় হিসাবে ব্যক্ত করবে। তাদের সেই উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার অবগতির জন্য বাণী অবতীর্ণ করেন,

ﻛَﺄَﻧَّﻬُﻢْ ﻳَﻮْﻡَ ﻳَﺮَﻭْﻧَﻬَﺎ ﻟَﻢْ ﻳَﻠْﺒَﺜُﻮْﺍ ﺇِﻻَّ ﻋَﺸِﻴَّﺔً ﺃَﻭْ ﺿُﺤَﺎﻫَﺎ ‘যেদিন তারা (কাফেররা) একে (ক্বিয়ামত) দেখবে, সেদিন মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে’ (নাযি‘আত ৪৬) ।

একই বিষয়ে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

ﻓَﺎﺻْﺒِﺮْ ﻛَﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮَ ﺃُﻭْﻟُﻮﺍ ﺍﻟْﻌَﺰْﻡِ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺮُّﺳُﻞِ ﻭَﻻَ ﺗَﺴْﺘَﻌْﺠِﻞ ﻟَّﻬُﻢْ ﻛَﺄَﻧَّﻬُﻢْ ﻳَﻮْﻡَ ﻳَﺮَﻭْﻥَ ﻣَﺎ ﻳُﻮْﻋَﺪُﻭْﻥَ ﻟَﻢْ ﻳَﻠْﺒَﺜُﻮْﺍ ﺇِﻻَّ ﺳَﺎﻋَﺔً ﻣِّﻦ ﻧَّﻬَﺎﺭٍ ﺑَﻼَﻍٌ ﻓَﻬَﻞْ ﻳُﻬْﻠَﻚُ ﺇِﻻَّ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡُ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘُﻮْﻥَ –

‘ওদেরকে (কাফেরদের) সে বিষয়ে ওয়াদা দেয়া হ’ত, তা সেদিন তারা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা দিনের এক মুহূর্তেরও বেশী পৃথিবীতে অবস্থান করেনি। এটা সুস্পষ্ট অবগতি। এখন তারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, যারা পাপাচারী সম্প্রদায়’ (আহক্বাফ ৩৫) ।

এ বিষয়ে মুমিনদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মহান আল্লাহ বলেন,

ﺇِﻧِّﻲْ ﺟَﺰَﻳْﺘُﻬُﻢُ ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮُﻭْﺍ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﻫُﻢُ ﺍﻟْﻔَﺎﺋِﺰُﻭْﻥَ، ﻗَﺎﻝَ ﻛَﻢْ ﻟَﺒِﺜْﺘُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻋَﺪَﺩَ ﺳِﻨِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟَﺒِﺜْﻨَﺎ ﻳَﻮْﻣﺎً ﺃَﻭْ ﺑَﻌْﺾَ ﻳَﻮْﻡٍ ﻓَﺎﺳْﺄَﻝْ ﺍﻟْﻌَﺎﺩِّﻳْﻦَ –

‘আজ আমি তাদেরকে তাদের ছবরের কারণে এমন প্রতিদান দিয়েছি যে, তারাই সফলকাম। আল্লাহ বলবেন, তোমরা পৃথিবীতে কতদিন অবস্থান করলে বছরের গণনায়? তারা বলবে, আমরা একদিন অথবা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি। অতএব আপনি গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস করুন’ (মুমিনূন ১১১-১১৩) ।

ক্বিয়ামত দিবসের সর্বশেষ অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করে বিশ্বনবী (ছাঃ)-এর একটি হাদীছের উদ্ধৃতি দেয়া হ’ল। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! ক্বিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের রবকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে তোমরা সূর্য দেখতে কি কষ্ট পাও? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে তোমাদের যতটুকু কষ্ট হয়, তোমাদের রবকে দেখতেও তোমাদের ততটুকু কষ্ট হবে মাত্র। তারপর তিনি বললেন, সেদিন (ক্বিয়ামতের দিন) একজন ঘোষক ঘোষণা করে বলবে যে, যারা যে জিনিসের ইবাদত করতে, তারা সেই জিনিসের সাথে হয়ে যাও। সুতরাং ক্রুশধারীরা ক্রুশের সাথে চলে যাবে, মূর্তিপূজকরা মূর্তির সাথে হয়ে যাবে। এভাবে প্রতি মা‘বূদের অনুসারীরা তাদের উপাস্যের কাছে যাবে। তারপর যারা একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করত, তারাই শুধু অবশিষ্ট থাকবে। তারা গোনাহগার বা নেককার যাই হোক না কেন। সাথে সাথে আহলে কিতাবদের অবশিষ্ট কিছু লোকও থাকবে। এরপর জাহান্নামকে সামনে আনা হবে। তা মরীচিকার মত মনে হবে। তখন ইহুদীদের বলা হবে, তোমরা কিসের ইবাদত করতে? তারা বলবে আমরা আল্লাহ্র বেটা উযায়েরের ইবাদত করতাম। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা কথা বলছ। আল্লাহ্র তো কোন স্ত্রী বা সন্তান ছিল না। (তাদেরকে পুনরায় বলা হবে) তোমরা এখন কি চাও? তারা বলবে, আমরা চাই আপনি আমাদের পানি পান করতে দিন। বলা হবে ঠিক আছে, পানি পান করে নাও। তারপর তারা জাহান্নামের মধ্যে পড়ে যাবে। এরপর নাছারা (খৃষ্টান)-দেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহ্র বেটা (ঈসা) মসীহের ইবাদত করতাম। তাদের বলা হবে, তোমরা মিথ্যা কথা বললে। আল্লাহ্র তো স্ত্রী বা সন্তান ছিল না। (তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে) তোমরা এখন কি চাও? তারা বলবে, আমরা চাই আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে বলা হবে, ঠিক আছে পান করে নাও। তারপর তারা জাহান্নামের মধ্যে পড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদতকারীরা। তাদের মধ্যে নেককারও থাকবে, গোনাহগারও থাকবে। তাদের বলা হবে, সব লোক তো চলে গেছে, কিন্তু তোমাদেরকে কিসে বসিয়ে রেখেছে? তারা বলবে, আমরা তো তখনই তাদেরকে বর্জন করেছিলাম, যখন আজকের চাইতে তাদের বেশী প্রয়োজন ছিল। আমরা এমর্মে একজন ঘোষকের ঘোষণা শুনেছি যে, যে কওম যার জিনিসের ইবাদত করত, সেই কওম তার সাথে হয়ে যাও। আমরা (সেই ঘোষণা অনুসারে) আমাদের রবের জন্য অপেক্ষা করছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, এরপর মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ তাদের কাছে আসবেন। কিন্তু প্রথমবার ঈমানদারগণ যে আকৃতিতে তাঁকে দেখেছিলেন তিনি সেই আকৃতিতে আসবেন না। তিনি (এসে) বলবেন, আমি তোমাদের রব! সবাই বলবে, হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব। (সে সময়) নবীগণ ছাড়া আর কেউ তাঁর সাথে কথা বলবেন না। তোমরা কি তাঁর কোন চিহ্ন জান? তারা বলবে, সাক বা পায়ের নলার তাজাল্লী। সেই সময় সাক খুলে দেয়া হবে। তখন সব ঈমানদারই সিজদায় পড়ে যাবে। তবে যারা প্রদর্শনীর জন্য আল্লাহকে সিজদা করতো তারা থেকে যাবে। তার সেই সময় সিজদা করতে চাইলে, তাদের মেরুদন্ডের হাড় শক্ত হয়ে একটি তক্তার ন্যায় হয়ে যাবে। (তাই তারা সিজদা করতে পারবে না)।

তারপর পুলছিরাত এনে জাহান্নামের উপরে পাতা হবে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! পুল বা পুলছিরাত কি? তিনি বললেন, পিচ্ছিল জায়গা, যার উপর লোহার হূক এবং চওড়া ও বাঁকা কাঁটা থাকবে যা নজদের সা‘দান গাছের কাঁটার মতো। মুমিনগণ এ পুলছিরাতের উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ ছহীহ-সালামতে বেঁচে যাবে, আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে, তার দেহ জাহান্নামের আগুনে ঝলসে যাবে। এমনকি সর্বশেষ ব্যক্তি হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে কোন রকমে অতিক্রম করবে। আজ তোমরা হকের দাবীতে আমার তুলনায় ততখানি কঠোর নও, যতখানি কঠোর সেদিন (ক্বিয়ামতের দিন) ঈমানদারগণ প্রতাপশালী আল্লাহ্র কাছে হবে।

(আর তোমরা যে হকের দাবীতে আমার চাইতে বেশী কঠোর নও তা তো) তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। যখন তারা (ঈমানদারগণ) দেখবে যে, তাদের ভাইদের মধ্যে তারাই শুধু নাজাত পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেই সব ভাইয়েরা কোথায়, যারা আমাদের সাথে ছালাত পড়ত, ছিয়াম পালন করত ও নেক আমল করত? আল্লাহ বলবেন, যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদের (জাহান্নাম থেকে) মুক্ত করে আনো। আল্লাহ তাদের আকৃতিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। তাদের কারো দু’পা ও পায়ের নলা পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে ডুবে থাকবে। তারা (ঈমানদারগণ) যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে (জাহান্নাম থেকে) বের করে আনবে। তারপর ফিরে আসলে আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, যাও যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান দেখতে পাবে তাদেরকেও বের করে আন। সুতরাং তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে মুক্ত করবে এবং তারপর ফিরে আসলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বলবেন, যাও যাদের হৃদয়ে একবিন্দু পরিমাণ ঈমান পাবে তাদেরকে বের করে আনো। সুতরাং (এবারও) তারা যাদেরকে চিনবে তাদেরকে মুক্ত করে আনবে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না করো তাহ’লে ইচ্ছা করলে কুরআন মজীদের এ আয়াতটি পাঠ করো (তাতে একথার সত্যতার সমর্থন পাবে)। আল্লাহ (কারো প্রতি) একবিন্দু পরিমাণ যুলুমও করেন না। বরং কোন নেকীর কাজ হ’লে তিনি তা দ্বিগুণ করে দেন। এভাবে নবী, ফেরেশতা এবং ঈমানদারগণ শাফা‘আত বা সুপারিশ করবেন।

তারপর পরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এখন একমাত্র আমার শাফা‘আতই অবশিষ্ট আছে। তিনি এক মুষ্টি ভরে জাহান্নাম থেকে একদল লোককে বের করবেন, যাদের গায়ের চামড়া পুড়ে কাল হয়ে গেছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখ ভাগে অবস্থিত ‘হায়াত’ নামক একটি নহরে নামানো হবে। তারা এর দু’তীরে এমনভাবে তরতাজা হয়ে উঠবে, যেমন তোমরা পাথর বা গাছের পাশ দিয়ে প্রবাহিত স্রোতের কিনারে বীজকে দ্রুত অঙ্কুরোদ্গম করতে দেখ। এর মধ্যে যেটা রোদে থাকে সেটা সবুজ হয়, আর যেটা ছায়ায় থাকে সেটা সাদা হয়। তাদেরকে সেখান থেকে বের করা হবে। তখন তাদেরকে মোতির দানার মত মনে হবে। তাদের গলায় সীলমোহর লাগান হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করলে জান্নাতবাসীরা বলবে, এরা পরম দয়ালু আল্লাহ্র মুক্ত করা লোক। আল্লাহ তাদেরকে জান্নাত দিয়েছেন, অথচ (এজন্য) তারা কোন আমল বা কল্যাণের কাজ করেনি। (জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে) তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা দেখছো তা তোমাদেরকে দেয়া হ’ল এবং অনুরূপ পরিমাণ আরও দেয়া হ’ল’ (বুখারী) ।

ক্বিয়ামত সম্পর্কিত আলোচনার শেষ প্রান্তে বর্ণিত হাদীছটি মোটামুটি ভাবে মানবমন্ডলীর সর্বব্যাপক কর্মকান্ডের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে। মহানবী (ছাঃ) ক্বিয়ামত সম্পর্কিত বিপুলসংখ্যক আয়াতগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেই উপরের সংক্ষিপ্ত হাদীছটির অবতারণা করেন। আল্লাহ্র একত্বে বিশ্বাসী ধর্মীয় তত্ত্বের মেরুদন্ডে আঘাত হেনে অসংখ্য মা‘বূদের ইবাদতে আত্মোৎসর্গকারীদের পরিণতির পৃথক পৃথক ইতিহাস হাদীছটিতে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া এক মা‘বূদের ইবাদতকারীদের মধ্যে খাঁটি মুমিন এবং তুলনামূলকভাবে কিছু ত্রুটিযুক্ত মুমিন এবং আরও সামান্য ঈমান ওয়ালা মুমিনের সর্বশেষ অবস্থার বাস্তব চিত্রও হাদীছটিতে বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা এখানে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সঙ্গে উক্ত হাদীছটি পুরোপুরিভাবে সঙ্গতিপূর্ণ এবং উভয়ের মূল্যায়ন এক ও অভিন্ন।

ক্বিয়ামতের উপরোক্ত বিবরণ পড়ে আমাদের উচিত এখনই সাবধান হওয়া। সেই দিনের জন্য যথাসাধ্য প্রস্ত্ততি নেওয়া। যাতে ক্বিয়ামতের কঠিন দিনে আমরা নাজাত লাভ করতে পারি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

– রফীক আহমাদ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন
Close
Back to top button